Click on Menu button if you are using mobile.
মোবাইল হলে Menu বাটনে ক্লিক করুন।

Welcome to website of Dr. Sadequel Islam Talukder


Dr. Md. Sadequel Islam Talukder
MBBS, M Phil (Pathology), MACP
Associate Professor and Head [PRL]
Department of Pathology
Mymensingh Medical College
Mymensingh Bangladesh
.

 

Send your comment to: sadequel@yahoo.com

রোগীর পথ্যই খেয়ে ফেললেন

রোগীর পথ্যই খেয়ে ফেললেন

(হাস্তর)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

অনেক অনেক দিন আগের কথা। রহিম বকস ও করিম বকস নামে অত্যন্ত চালাক চতুর দু’জন লোক ছিলেন। তারা দু’জনই মেট্রিক পাশ করেছিলেন। কোথাও বেড়াতে গেলে পাজামা পাঞ্জাবি পরে বের হতেন। গ্রামের অনেকে ধুমপান করলেও তারা ধুমপান করতেন না। তাদের পান খাবার অভ্যাসও ছিলো না। তবে বিবাহের দাওয়াত বা ফয়তার দাওয়াত খাওয়ার পরে তাদেরকে পান খেতে দেখা গেছে। তারা মাঝে মাঝেই হাসির কান্ড করে বসতেন। এজন্য সাত গ্রামের মানুষ তাদের নাম জানতেন। তাদের মধ্যে খাতির থাকলেও তারা কিন্তু একই গ্রামের মানুষ নন। রহিম বকসের বাড়ি ছিলো আড়ইংগা চালা। করিম বকসের বাড়ি ছিলো অরতকি চালা। একজনের বাড়ি থেকে আরেকজনের বাড়ির দুরুত্ব ছিল প্রায় তিন মাইল। অর্থাৎ সারে চার কিলোমিটারেরও বেশী। তারা সংসারের কাজ কর্ম তেমন করতেন না। কামলা জামলারাই শুকধান আবাদ করতো। সময় কাটাতেন একজন আরেকজনের বাড়িতে গিয়ে গল্প করে। টাঙ্গাইল গ্যাঘের দালানের সাথের সিনেমা হলে গিয়ে এক সাথে টগি দেখতেন। একে অপরের স্ত্রীকে ভাবী ডাকতেন। তবে বয়সে কে বড় ছিলো আর কে ছোট ছিলো তা কেউ বলতে পারতেন না। তাদের মধ্যে এই খাতিরের কথা সবাই জানতেন। তাদের নিয়ে অনেক মজার ঘটনা আমাদের এলাকায় শুনা যায়। তারই একটা ঘটনা আমি এখানে উল্লেখ করছি।

 

একবার এক শীতের দিনে রহিম বকসের খুব বড় এক বেরামে ধরলো। শান্তিপাত জ্বর হয়েছিলো। জ্বর মাঝে মাঝে উঠতো আবার ছেড়েও যেতো। যখন জ্বর উঠতে থাকতো শরীর থৈরালে কাঁপতো। আবার যখন শরীর ঘেমে নিচুইটা জ্বর ছেড়ে ঠান্ডায় শান্যিক উঠে যেতো। তখন চামচে তেল রসুন গরম করে বুখে পিঠে ও হাতে পায়ে মালিশ করে দিতেন রহিম ককসের স্ত্রী। তবে তাদের সন্তানাদি কি ছিলো আমার জানা নেই। এমন যাওয়াদশা অসুখের কথা শুনে তার সব আত্নীয়স্বজন দেখে গেলেন। সবাই রোগীর জন্য কিছু না কিছু পথ্য নিয়ে এসেছিলেন। আগেরদিনে জ্বরের রোগীকে ভাত খেতে দিতো না। ভাতের পরিবর্তে সুজি, জাউ, আটার নুটানি, এবারুট বার্লি ইত্যাদি খেতে দিতো। রহিম বকসের আত্নীয়স্বজনরাও রোগী দেখতে এসেছিলেন এসব পথ্য নিয়ে। রোগীর শিতানে সব পথ্য সাজিয়ে রেখেছিলেন রহিম বকসের স্ত্রী। খবর পেয়ে করিম বকসও এলেন যোহরের নামাজের জের ওয়াক্তের সময়। দোস্তকে পেয়ে রহিম বকসের একটু ভালো লাগছিলো। খাটের পাশে শিতানের দিকে একটা কারুকাজ করা কাঠের চেয়ার ছিলো। সেই চেয়ারে বসে রহিম বকস করিম বকসের সাথে কেরাই করা শুরু করলেন। কেরাই করা দু’জনেরই অভ্যাস ছিলো। করিম বকস কেরাই করে রহিম বকসকে বললেন

– দোস্ত, তোমার কপালে হাত দিয়ে দেখলাম জ্বর নাই। তুমি কি ভাব ধরছ নাকি?

– ভাব ধরমু কেন?

– এই যে তোমাকে সবাই দেখতে আসবে পাকা পেপে, ডালিম, আতাফল, কমলা ইত্যাদি নিয়ে তুমি মজা করে খাবে। তাই তো দেখছি ফল ফলাদিতে ভরে গেছে তোমার শিতান।

– বসো এখানে। শরীর খুব খারাপ। শরীর ব্যাথা করছে।

– হ, ভাবীকে দিয়ে যেনো শরীর টেপানো যায় সেই ভাব ধরছো।

– শোনো, তুমি মাইনসের সাথে কেরাই করো করোগে। আমার সাথে কেরাই করবা না।

– কেরাইর কি দেখলা? যা সত্যি তাই বলছি।

– চুপ করে বসে থাকো। নাহলে ভালো ভালো কথা বলো। কেরাই শুনতে ভালো লাগছে না।

এমনতরো কথা বলতে বলতে বেলা ডুবে গেলো। রহিম বকস করিম বকসকে বললেন

– করিম, বেলা তো ডুবে গেলো। রাস্তা অন্ধকার হয়ে যাবে। জঙ্গইলা রাস্তা। আগে ভাগেই চলে যাও। থেকে গেলে ভালো হতো। কিন্ত থাকবা যে, খাবা কি? তুমি তো আমার জন্য কিছুই নিয়ে আসোনি যে তাই তোমাকে খাওয়ায়ে দেবো। তুমি তো আবার কৃপ্টে মানুষ।

– দোস্ত, খোটা দেও কেনো। আমি জানি খালি হাতে এলে তুমি কিছু মনে করবে না। দেখো, যারা ফলফলাদি নিয়ে এসেছিলেন তারা সবাই তোমাকে ফেলে চলে গেছে। আমিই একমাত্র ব্যক্তি যা তোমাকে সময় দিচ্ছি।

– তোমার ভাবী আমাকে নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত ছিলো। তোমার জন্য কিছুই রান্না করেনি। তুমি চলেই যাও।

– দোস্ত, তুমি আমার খাওয়া নিয়ে চিন্তা করোনা। আমি তোমার শিতানের কাছে বসে বসে কথা বলেছি আর তোমার জন্য আনা মেহমানদের ফল ফলাদি খেয়ে পেট ভরেছি। আর খেতে পারবো না আজ।

– দোস্ত, নিজে তো কিছু আনলেই না, বরঞ্চ আমার পথ্যগুলোও খেয়ে ফেললে?

২৬/১১/২০২০ খ্রি.

 

শব্দার্থঃ

হাস্তর – লোক মুখে শোনা টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক গল্প

কেরাই – হেয়ালিপনা

শিতান – বালিশের পেছনের দিক

ফয়তার দাওয়াত – মৃত ব্যক্তির দোয়ার জন্য দাওয়াত খাওয়া

শুকধান – শস্য

টগী – টকিজ বা সবাক চলচ্চিত্র

বেরাম – রোগ

থৈরালে – থরথরি

নিচুইটা – সম্পুর্ণ

শান্যিক – হিম

নুটানি – পেস্ট

জের – শেষ

Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


 

মরার পরেও জ্বালায়

মরার পরেও জ্বালায়

(হাস্তর)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

অনেক অনেক দিন আগের কথা। সেই স্বাধীনতার আগের দিনের কথা। তখন এক গ্রামের এক মোড়ল ছিলো খুব পাঁজি। সারাটা গ্রাম জ্বালিয়ে ফেলেছিলো অত্যাচার করে গ্রামের সহজ সরল মানুষকে। মানুষে মানুষে পেঁচ লাগাতে খুব অস্তাদ ছিলো। শয়তানি করায় খুব পটু ছিলো। সাথে কিছু হোমরা চোমরা রাখতো সুবিধার জন্য। মোড়লের বিরোদ্ধে টু শব্দ করার সাহস গ্রামবাসীর ছিলো না।

মোড়ল অতিশয় বৃদ্ধ হয়ে পড়লে তার মনে জান দিলো তিনি আর বেশী দিন বাঁচবেন না। মৃত্যুর পর তার শয়তানী করা আর সম্ভব হবে না। কিন্তু তিনি এমন কিছু একটা করে যেতে চান যেন তার মৃত্যুর পরও তার আমল নামায় শয়তানি লেখা হতে থাকে। বাস, গ্রামের সবাইকে চৌকিদার দিয়ে ডেকে আনালেন তার বাড়িতে। বাড়ির আঙ্গিনায় খর বিছিয়ে বসতে দিলেন সবাইকে। সবাই ভাবলো মোড়ল না জানি কার বিচার করেন। কার পাছায় যে আজ চাবুকের বারি পড়ে? সবাই ভয়ে ভয়ে বসে রইলো মোড়লের অপেক্ষায়। এক সময় চামচাদের সাথে নিয়ে মোড়ল হাজিরানা মজলিসে এলেন। কারুকার্য করা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। তারপর তার বক্তব্য পেশ করলেন। তিনি বক্তব্যে যা বললেন তা ছিলো এমন “আমি তোদের গ্রামের মোড়ল। আমার বাপ দাদারাও এই গ্রামের মোড়ল ছিলেন। কিন্তু আমি আমার বাপ দাদাদের মতো হতে পারিনি। সারাজীবন তোদের উপর অন্যায় অত্যাচার করেছি। আমি অন্যায়কে অন্যায় বুঝেও অন্যায় করেছি। এটা আমার নেশা ছিলো। অন্যায় করে আমি আনন্দ পেতাম। তোদেরকে খুব জ্বালিয়েছি। তোরা হয়তো আমার মৃত্যু কামনা করছিস। তোদের প্রতি অন্যায় অবিচার করেছি বলে আমার অনুশোচনা হচ্ছে। এই জন্য তোদেরকে ডেকেছি একটা কথা বলার জন্য। আমি মনে হয় বেশী দিন বাচবো না। আমার মৃত্যুর পর তোরা আমার লাশের উপর প্রতিশোধ নিবি। মৃত্যুর খবর শুনে তোরা দল বেঁধে আমার বাড়ি আসবি। একটা বৌড়া বাঁশ কাটবি সোব থেকে। তারপর ওটার এক মাথা চোখা করে আমার নিম্নদেশ দিয়ে প্রবেশ করাবি। সড়কের চৌরাস্তার মোড়ে খোন্তা দিয়ে গাতি দিয়ে ঐ বাঁশটা খারা করে গেড়ে দিবি যাতে অনেক দূর থেকে মানুষ দেখতে পায়। বাঁশের আগায় আমার লাশ রেখে উল্লাশ করবি। মিষ্টি খাবি আর গালি গালাজ করবি। তাতে তোদের জ্বালা কিছুটা কমবে।”

 

কথাগুলো শুনে সবাই খুশী হলো। দিন গোনতে লাগলো মোড়লের মৃত্যু কামনা করে। অবশেষে মাঘ মাসের শীতের এক রাতে মোড়লের মৃত্যু হলো। মোড়লের ওয়াসিয়ত অনুযায়ী বাঁশ ঢুকিয়ে চৌরাস্তার মোড়ে বাঁশ গেড়ে দেয়া হলো। অনেক দূর থেকে মোড়লের লাশ দেখা যাচ্ছিলো। দেখে মনে হচ্ছিল কাক তাড়ুয়া। গ্রাম শুদ্ধ জানাজানি হয়ে গেলো মোড়লের লাশের পরিনতির কথা। পোলাপানরাও দেখতে এলো। গ্রামের মুন্সি- মৌলবিরা প্রতিবাদ করলনেন “লাশের উপর অত্যাচার করা গুনাহের কাজ।” চৌকিদার গিয়ে থানায় খবর দিলেন। থানা থেকে পুলিশ এসে গ্রামের সব বেটা মানুষ ধরে নিয়ে থানা হাজতে ঢুকালেন। রিমান্ডে নিয়ে মারধর করলেন। গ্রামের মানুষ পুলিশের মার খেয়ে বলতে লাগলেন “শালার মোড়ল, বেঁচে থাকতেও যেমন জ্বালিয়েছি, মরার পরেও জ্বালাচ্ছে।”

২৪/১১/২০২০ খ্রি.

শেষ দেখা মুখ

শেষ দেখা মুখ

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

মানুষ মানুষকে অনেকদিন পর্যন্ত মনে রাখে। মনে রাখে তার কথা, তার কাজ, তার মুখ, তার চেহারা। কেউ কেউ বেশী দিন মনে থাকে, কেউ কেউ মন থেকে হারিয়ে যায়। বা ভুলে যায়। দীর্ঘদিন না দেখতে দেখতে ভুলে যায়। দীর্ঘদিন নাম না ডাকতে ডাকতে নাম ভুলে যায়। এমনও আছে চেহারা মনে আছে কিন্তু নাম মনে নেই। নাম মনে আছে কিন্তু চেহারা মনে নেই। আমি আমার এক আত্নীয়কে দীর্ঘদিন না দেখতে দেখতে সে যে আমার কেউ ছিলো সেটাই ভুলে গিয়েছিলাম। হটাৎ এক অনুষ্ঠানে তাকে দেখে মনে পড়লো এ তো আমাদের আত্নীয়। আমি ভুলে গিয়েছিলা! আমি যখন ক্লাস সিক্স বা সেভেনে পড়তাম তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়া কচুয়ার সামাদ ভাই আমাদের স্কুলে বেড়াতে এসে অফ পেরিয়ডে ক্লাসে আমাদের সাথে গল্প করতেন। তিনি আমাকে বেশ স্নেহ করতেন। আমাদের স্কুলের একজন শিক্ষক ক্লাসে সামান্য একটু ভুল গ্রামার শিখিয়েছিলেন। আমি শুদ্ধ সেন্টেন্স বললেও স্যার ভুল ধরছিলেন। সেই কথাটা সামাদ ভাইকে বলেছিলাম। তিনি বললেন “তোমারটাই সঠিক। কিন্তু তুমি সেটা তোমার স্যারকে বলবে না। স্যার ইজ অলওয়েজ রাইট। স্যার যা বলেন তাই ঠিক। স্যারের ভুল ধরবে না।” আমি তার এই শিক্ষাটুকু সারাজীবন মনে রেখেছি। আমিও মেডিকেল কলেজে ২৮ বছর শিক্ষকতা করেছি। আমিও হয়ত অনেকবার ভুল পড়িয়েছি। আমার ছাত্ররা হয়তো সেই ভুল ধরতে পেরেছে। তারা আমাকে শ্রদ্ধা করে বলেই হয়তো আমার ভুল আমাকে শুধ্রে দিতে চায়নি। ক্লাস সেভেন অর্থাৎ ১৯৭৩ সনের পর থেকে আর সামাদ ভাইকে কোনদিন দেখিনি। প্রায়ই সামাদ ভাইকে মনে পড়তো। এভাবে না দেখতে দেখতে আমি সামাদ ভাইকে ভুলে যাই এক সময়। সামাদ ভাই চাকরি থেকে অবসরে গিয়ে কিছুদিন আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজে কি একটা পদে যেন কাজ করেন। প্রাক্তন ছাত্র হিসাবে তিনি একদিন আমাকে মোবাইল করেন অফিসের নাম্বার থেকে। আমি তার সাথে অনেক কথা বললাম অতীতের অনেক কথা স্মরণ করে। কিন্তু আমি সামাদ ভাইর মুখ মনে করতে পারলাম না। তারপর পেরিয়ে গেছে কয়েক বছর। অনেক চেষ্টা করেও সামাদ ভাইর মুখ মনে করতে পারছি না। এজন্য আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। এত প্রিয় একটা মুখ ভুলে গেলাম!

 

নাটকে-সিনেমায় বিচ্ছেদের নাটকে দেখেছি শেষ দেখার দিন একজন আরেকজনকে বলছে “এটাই হয়তো আমাদের ভাগ্যে ছিলো। আমাকে মনে করে কষ্ট পেয়ো না। যেখানেই থাকো ভালো থেকো। আমার সব কিছু ভুলে যেয়ো।” তারপর থেকে কেউ কাউকে ভুলে যেতে পারে না সারাজীবন। প্রতি রাতে ঘুমাবার আগে তাদের শেষ ডায়ালগটার কথা মনে করে ভুলে যেতে চায়। কী কী জিনিস ভুলে যেতে হবে তার একটা হিসাবও করতে থাকে। তাই, প্রতি রাতেই তাকে মনে করে ভুলে যাওয়ার জন্য। ভুলে আর যাওয়া হয় না। শেষবার দেখা মুখটি ভেসে আসে তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখের সামনে।

 

মানুষ যখন একজন আরেকজনকে স্মরণ করে তখন প্রথমেই তার শেষ দেখা মুখটি ভেসে উঠে কল্পনায়। তারপর চেষ্টা করে করে অতীতের আরও কিছু মুহুর্তের মুখ ভেসে উঠতে পারে। মুখের মধ্যে সবচেয়ে বেশী মনে দাগকাটে রাগান্বিত মুখটি। রাগান্বিত মুখটি মানুষ বেশীদিন মনে রাখে। এজন্য আমাদেরকে সদা হাস্যজ্বোল মুখ নিয়ে থাকতে হবে। যেনো কেউ আমাকে মনে করলে তার কাছে আমার সুন্দর মুখটিই ভেসে উঠে। ক্রোধান্বিত মুখ কুতশিত দেখায়। তাই ক্রোধ পরিহার করে থাকা ভালো। আমি পারতপক্ষে কারো সাথে রাগারাগি করি না। আমাকে যখন শেষে দেখেছেন তখন আমাকে ক্রোধান্বিত দেখেছেন এমন কেউ থেকে থাকলে জানাবেন আমি তার সাথে আবার হাসিমুখে দেখা করে আসতে চাই যেন তিনি আমার হাসিমুখটাই মনে রাখে।

 

মানুষ দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হলে মৃত্যু চিন্তা এসে যায়। মারা যাওয়ার আগে সব প্রিয়মুখ তিনি দেখে যেতে চান। তাই সবাই তাকে দেখতে যান। রোগীকে দেখতে যেতে হয়। আপনজনদের মুখ দেখে রোগী মনে প্রশান্তি পায়। সাথে করে কিছু ফল মুল ও পথ্য নিয়ে যেতে হয়। আগের দিনে রোগীর জন্য বেদেনা, আতাফল, ডালিম পেপে, আনারস, ডাব, মিশ্রি, দুধ ইত্যাদি নিয়ে যেতো। এখন রোগী দেখতে যাওয়ার প্রচলন প্রায় উঠেই গেছে। গেলেও দুই হালি মালটা নিয়ে যায়। মালটা যেনো রোগীদের জাতীয় ফল হয়ে গেছে। খেতে লাগে পানসে। রোগী খেতেও চায় না। এত মাল্টা দিয়ে কি করবে? অনেকেই কেউ অসুস্থ হলে ফেইসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেয় অমুকের জন্য দোয়া করতে। সেই স্যাটাসে অনেক লাইক পড়ে। এত লাইক দিয়ে রোগী কি করবে তা আমি জানি না। অসুস্থ অবস্থার ছবি দিয়েও কেউ কেউ স্ট্যাটাস দেয়। আমি মনে করি তাও ঠিক না। সবাই চায় তার সুন্দর ছবিটি সবাই দেখুক। অসুস্থ খালি গায় অথবা লুঙ্গি পরা গেঞ্জি গায়ের ছবি সামাজিক মিডিয়ায় দেখাতে পছন্দ করেন না। অনেকে দেখতেও পছন্দ করেন না। হাতে সেলাইন লাগানো, নাক দিয়ে নল লাগানো ছবি দেখানো আমি ভালো মনে করি না। হ্যা, কেউ মারা গেলে স্ট্যাটাস দিয়ে জানিয়ে দেয়া যায় জানাযায় শরীক হওয়ার জন্য অথবা দোয়া করার জন্য অথবা মৃত্যু সংবাদটা জানিয়ে দেয়ার জন্য। কেউ কেউ এমনও করেন যে লাশের ছবি দিয়ে মৃত্যু সংবাদ প্রচার করেন। তা ঠিক না। ছবি দিতে হলে সুস্থ্য কালের সুন্দর একটা ছবি দিন যে ছবিতে মানুষ তাকে বেশী চেনে। মানুষ মারা যাবার পর শেষ দেখা দেখানো হয় মুখ বের করে। অনেকেই আছেন মারা যাবার পরের মুখ দেখতে পছন্দ করেন না। অনেকেরই মুখ বিকৃত হয়ে যায়। আমি একজনের মুখ দেখেছিলাম হা করে রয়েছে। তারপর থেকে আমি যখন তাকে মনে করি তার ঐ হা করা মুখ মনে পরে। কারন, হা করা মুখই ছিল আমার কাছে তার শেষ দেখা মুখ। সেদিন ইউটিউবে পিলখানা হত্যাকান্ডে নিহত এক আর্মি অফিসারের স্ত্রীর সাক্ষাৎকার শুনছিলাম। তিনি বলছিলেন যে তিনি তার স্বামীর লাশটি ইচ্ছে করেই দেখলেন না। কারন, তিনি মনে করেছেন গলিত অবস্থায় লাশ নিশ্চয়ই বিকৃত হয়ে গেছে। শেষ দেখা মুখটি তার সারাজীবন মনে পড়বে। তিনি চান তার স্বামী তার আগের সুন্দর চেহারা নিয়ে তার স্মৃতিতে থাকুক। মারা যাবার পর লাশের ছবি মিডিয়ায় দিলে একজন না দেখতে চাইলেও তার চোখের সামনে পড়ে যাবে সেই মুখটি। সারাজীবন মনে পড়ে থাকবে সেই শেষ দেখা মুখটি।

১৯/১১/২০২০ খ্রি.

Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


 

সহজ স্বাস্থ্য কথা

সমস্যাঃ ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া
ইউটিউব ভিডিও

পরীক্ষার জন্য কোন সময়ের ইউরিন নেয়া দরকার?
ইউটিউব ভিডিও

রক্ত ভরার সময় ফোটা বাড়িয়ে দিলে কি সমস্যা?
ইউটিউব ভিডিও


Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/




Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/




পাগল নিয়ে যতো কথা

পাগল নিয়ে যতো কথা
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
ছোট বেলা গ্রামে নানান কিছিমের পাগল দেখেছি। সব পাগল ক্ষতিকর ছিলো না। খেপা পাগল বা ভোর পাগল ক্ষতিকর ছিলো। যারা হাল্কা পাগলামি করতো তাদের বলা হতো আধপাগলা বা আতপাগলা। আতপাগলা মানুষ যেখানে সেখানে অবর জবর কথা বলে ফেলতো অথবা কান্ড করে বসতো। কিছু কিছু লোক ছিলো তাদেরকে বলা হতো ভাবের পাগল। তারা বেশী কথা বলতো না। সারাক্ষণ ভাব ধরে থাকতো আজব আজব পোষাক পরে। কিছু মানুষ ছিলো সব সময় আল্লাহর ধ্যান খেয়ালে মগ্ন থাকতেন। তাদেরকে বলা হতো দেওনা পাগল (দেওয়ানা পাগল)। কোনো কোন মানুষ মাথায় চুলের জট পাকিয়ে ভাব ধরে থাকতো আর বুঝাতো যে তাদের লগে কিছু একটা আছে। এগুলোকে বলা হতো জৌটা পাগল। কিছু মহিলা পাগল ছেড়া কাথা গায় গিয়ে ঘুরতো। এদের বলা হতো খেতা পাগল। যারা ঘন ঘন বিয়ে করতে চাইতো তাদের বলা হতো বিয়ার পাগল। যেসব মেয়েরা সারাক্ষণ স্বামীর প্রশংসা করে গল্প করতো তাদের বলা হতো ভাতাড়ের পাগল। কিছু কিছু লোক মাঝে মাঝে মাতলামি করতো কিন্তু তারা সব কিছুতেই সাভাবিক ছিলো। অনেকে তাদেরকে কটাক্ষ করে বলতো “জাতে মাতাল, তালে ঠিক”, সংক্ষেপে জিএমটিটি।
গ্রামের পোলাপানরা পাগল দেখলে মজা পেতো। পাগলের পিছে পিছে হাটতো। যেসব পাগল ল্যাংটা থাকতো তাদেরকে ল্যাংটা পাগল বলা হতো। ল্যাংটা পাগল দেখলে পেছন থেকে পোলাপানরা ইটা দিয়ে ঢিল ছোড়তো। বিরক্ত হয়ে পাগলারা মা বাপ তোলে গালি দিতো। পোলাপানরা গ্রামের ঝগড়া বিবাদ দেখেও মজা পেতো। পাশাপাশি দুই বাড়ির মধ্যে মাঝে মাঝে বিবাদ বেঁধে যেতো। যার যার বাইর বাড়িতে দাঁড়িয়ে মায়ে ঝিয়ে মিলে যে যতো রকম বকা ঝকা করতে পারে করতো। পোলাপানরা অদুরে দাঁড়িয়ে সেইসব বকাঝকা ও ঝগড়াটেদের অঙ্গভঙ্গি দেখে উপভোগ করতো। এখনো শহরের শিক্ষিত মানুষ টেলিভিশন নাটকে পারিবারিক ঝগড়া দেখে উপভোগ করে।
কালিয়ার হাসমত ভাই ছিলেন কচুয়া পাবলিক হাই স্কুলের ছাত্র সংসদের জি এস। তিনি খুব মজা করে কথা বলতেন। তিনি কথা বললে আমরা মজা করে শুনতাম। ক্লাসের ফাঁকে তিনি প্রায়ই ঝইড়া পাগলার কথা বলতেন। ঝইড়া পাগলা কি কইলো, কি করলো, এসব হাসির কথা বলতেন। মজা পেতাম। তাতে ঝইড়া পাগলাকে আমার দেখার ইচ্ছে হয়েছিলো। এক রাতে কালিয়া বাজারে মঞ্চ নাটক দেখছিলাম। সেই মঞ্চে উঠে ঝইড়া পাগলা গান গাইতে চাইলেন। কর্তৃপক্ষ তাকে গান গাওয়ার অনুমতি দিলে দর্শক শ্রোতারা হাসাহাসি করছিলেন। আমি সেদিন তাকে প্রথম দেখলাম। এরপর আর আমি তাকে দেখিনি। তিনি হাতে এক তারা নিয়ে গাই ছিলেন ভক্তিমূলক বাউল গান “আর আমার নালিশের জায়গা নাই…. ….।” গান শুনে আমার মনে হলো তিনি পাগল নন। তিনি বাউল ফকির। আমি কচুয়া স্কুলে পড়াকালীন স্কুলের লাইব্রেরী থেকে বই তুলে তুলে পরতাম। তাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরতচন্দ্র চট্রপাধ্যায় ও জসিম উদ্দিনের বেশ ক’টি বই পড়া হয়ে যায়। এদের মধ্যে পল্লী কবি জসিমউদদীনের স্মৃতির পট বইখানি আমার মনে খুব প্রভাব ফেলে। কবি ময়মনসিংহের গ্রামে গ্রামে ঘুরে লোকগীতি ও লোক সংস্কৃতি সংগ্রহ করতেন। তিনি গ্রাম্য বাউলদের বাড়িতে থেকেছেন, খেয়েছেন, গান শুনেছেন। সেসব মজার অভিজ্ঞতা তিনি স্মৃতির পট বইয়ে লিখেছেন। আমার স্মৃতি কথাগুলো লিখতে এই স্মৃতির পট বইটি বেশ প্রভাব ফেলেছে। সেই বইয়ে আছে কবি এক বাউলের গান শুনেন সারারাত ধরে। বাউলের গানের কথা ও সুর কবি জসিমউদদীনকে বিমোহিত করে। তিনি “আর আমার নালিশের জায়গা নাই” গানটি বিশেষভাবে লিখেছেন। সেই গান ঝইড়া পাগলা গাইছেন নাটকের মঞ্চে। আমি তখন খুব সম্ভব ক্লাস নাইনে পড়ি। তখনই আমি মনে করি তিনি পাগল নন, গ্রাম্য এক বাউল ফকির।
অল্প কিছু সংখ্যক পাগল ছিলো তারা ক্ষেপে গিয়ে জিনিসপত্র ভাংচুর করতো ও মানুষের শরীরে আঘাত করতো। এদের বলা হতো ভোর পাগল বা ঘোর পাগল বা ক্ষেপা পাগল। ক্ষেপা পাগল নিয়ে খুব ভয় ছিলো। যেকোনো সময় যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারতো। তাই তাদেরকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। তখন বলা হতো বান্ধা পাগল। পাগলিকে আমরা বলতাম পাগুল্লি। বর্গা গ্রামে এক ভোর পাগুল্লি ছিলো। বাড়ি থেকে দূরে রাস্তার ধারে ছোট্ট এক কুঁড়ে ঘরে তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। সেই ঘরে কোন বাতি ছিলো না। সেই পাগুল্লি সারাক্ষণ চিল্লাচিল্লি করতো সেই নির্জন কুঁড়ে ঘরে। বুবুদের বাড়িতে যাবার সময় রাতে তার চিল্লাচিল্লি শুনতে পেতাম। বুবুকে জিজ্ঞেস করেছি
– পাগুল্লিকে বাড়িতে রাখে না কেন?
– পাগুল্লির চিল্লাচিল্লিতে বাড়ির মানুষের ঘুম অয় না। তাই দুরের চড়া ক্ষেতে কুইড়া ঘর বানাইয়া দিছে থাকবার জন্য।
– পাগুল্লির অন্ধকার রাতে চড়া ক্ষেতে কুইড়া ঘরে ডর করে না?
– পাগলের আবার ডর আছে?
আমি সেই পাগুল্লির কষ্টের কথা ভুলতে পারিনা। আমজানি গ্রামেও এক ভোর পাগল ছিলো সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাকেও বেঁধে রাখতে হতো শিকল দিয়ে। আমি দেখেছি পালানের ক্ষেতে তাকে গরুর মতো করে বেঁধে রাখতে, যেনো হাচার দিয়ে রেখেছে। তার করুণ চাহনি আমাকে এখনো কষ্ট দেয়। রৌহা নানা বাড়িতেও নানার এক ভাই ভোর পাগল ছিলেন। তিনি সিজনাল পাগল হতেন। বছরে এক দু’মাস। সারাক্ষণ আবোল তাবোল বকতেন। মাঝে মাঝে ক্ষেপে যেতেন। তার ছেলেরা ধরে পিঠ মোড়া করে পুকুরে নিয়ে একশ একটা করে ডুব দেওয়াতেন। তাতে পাগলামি থেমে যেতো। সবাই মনে করতো পাগলের মাথা গরম হয়। পানিতে চুবাইলে মাথা ঠান্ডা হয়ে শান্ত হয়। আমি মনে করি, ডুব পারতে পারতে ক্লান্ত হয়ে পাগলারা শান্ত হয়ে যেতো। এই ধরনের চিকিৎসা ছিলো পাগলদের প্রতি নিষ্ঠুরতা। একবার এই নানাকে বারান্দার খামের সাথে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। নানা বারান্দার চালে উঠে বসেছিলেন। তার স্ত্রীর কাছে এক গ্লাস পানি চান। নানী ভয়ে পানি দিয়ে আসেন বারান্দার মেঝেতে। কিন্তু নানা আবদার করেন তার হাতে পানির গ্লাস তুলে দিতে। নানি মায়া করে যেই পানির গ্লাস হাতে তুলে দিচ্ছেন অমনি নানির চুলের মুঠি ধরে টান মেরে চালে তুলে ঘার মটকে দেন। মার কাছে এই ঘটনা শোনার পর আমি এই নানাকে দেখে খুব ভয় পেতাম। একদিন দুই ঘরের চিপা রাস্তা দিয়ে আমি আসছিলাম। হটাৎ সামনে পড়লেন সেই নানা। আমার আত্মা শুকিয়ে গেলো। নানা জিজ্ঞেস করলেন “এই তর নাম কি?” আমি কাপতে কাপতে বললাম “সাদেক আলী।” নানা বললেন “তর ভাইর নাম কি?” বললাম “আকবর আলী।” নানা “আকবর আলী, সাদেক আলী” স্লোগান দিতে দিতে পুকুরের দিকে চলে গেলেন। তিনি সারাদিন সারারাত এই দুই নাম জপলেন। একই কথা বারবার বলতে থাকা পাগলের লক্ষণ। তিনি একবার সারারাত জপলেন “আল্লাহর নাম হয়না যেন ভুল, মওলা দিনের রসুল।” কোন একটা হাটে সেই নানাকে পাবলিক বুঝতে না পেরে বেদম নির্জাতন করে। তারপরই মর্মান্তিক ভাবে তার মৃত্যু হয়।
আমাদের বাড়ির দক্ষিণে চন পাড়ার আজগর ভাই প্রতিবছর বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে ভোর পাগল হতেন। সারা বছর ঝিম মেরে থাকতেন। গরম কাল এলেই তার পাগলামি ভার হতো। দা, বটি নিয়ে মানুষকে মারতে যেতেন। সবাই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিতো। আমরা দৌড়ে যেতাম তামাশা দেখতে। তাকে বাগে আনতে খুব ব্যাগ পেতে হতো। তিন চার জন যুবক দিয়ে তাকে ধরে কুয়ার পাড়ে নিয়ে ঠিলার পানি মাথায় ঢেলে ঢেলে মাথা ঠান্ডা করা হতো। আমি মনে করি অতিরিক্ত পানি ঢালার কারনে শরীর অবসন্ন হয়ে পাগলামি কমে যেতো। আজগর ভাইর জন্য মায়া হয়।
আমি যখন এমবিবিএস থার্ড ইয়ারে পড়ি তখন মেডিসিনের অংশ হিসেবে কিছুদিন মনোরোগ বিভাগে ক্লাস করেছি। ওখানে গিয়ে বেশ কিছু পাগল দেখার সৌভাগ্য হয়। ক্লাসটি ছিলো ক্লিনিক্যাল। এধরণের ক্লাসে একজন রোগী নিয়ে স্যারগণ পড়ান। যে রোগী নিয়ে স্যার পড়াচ্ছিলেন সেই রোগী আমাদের এক ক্লাসমেট মেয়েকে তার ছেলের বউ মনে করে নানান কথা বলতে লাগলেন এবং বউ মা, বউ মা করে ডাকতে লাগলেন। ক্লাসমেট ক্লাসে অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। স্যার বললেন “এটা মানসিক রোগের লক্ষণ প্যারাময়েড ইলুশন। সে এই মেয়েকে তার ছেলের বউয়ের মতো দেখছে। তার দোষ না। সে এমন দেখছে। মানসিক রোগের আরেকটা লক্ষণ হলো হ্যালুসিনেশন। এতে এখানে যা উপস্থিত নেই তা দেখা, শোনা বা অনুভব করা। ধরো, লোকটার ছেলের বউ এখানে নেই। আমরা তাকে দেখতে পারছি না। কিন্তু সে তাকে দেখতে পারছে, তার সাথে কথা বলছে। এই জন্য পাগলেরা একা একা কথা বলে, একা একাই হাসে, কাঁদে।
মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা করার আগে আমি উপজেলা লেভেলে চাকরি করেছি। প্রথম একবছর ছিলাম বরিশালের এক গ্রামের সাবসেন্টারে। তারপর আড়াই বছর নকলা উপজেলা হাসপাতালে। বিকেল বেলা প্রাক্টিস করতাম। গ্রামে গ্রামে কলেও যেতাম। হাসপাতালে ভর্তিযোগ্য রোগী হাসপাতালে যেতে অপারগ হলে রোগীর বাড়ির বাংলা ঘরকে হাসপাতাল বানিয়ে চিকিৎসা দিতাম। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে যেভাবে চিকিৎসা করতে শিখেছিলাম সেভাবেই চিকিৎসা দিতাম। এভাবে অনেক ধনুষ্টংকার, এক্লাম্পসিয়া, এনক্যাফালাইটিস ইত্যাদি জটিল রোগের চিকিৎসা গ্রামেই করে ফেলেছি। তিন কিলোমিটার দূরে থেকে একটা কল এলো। তারা আমাকে রিক্সা দিয়ে নিয়ে গেলো। রোগী চেয়ারম্যান সাবের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে অনার্স পড়ে। ইউনিভার্সিটির হল থেকে রিক্সা ভাড়া করে নকলার গ্রামের বাড়িতে এসেছে আনুমানিক দু’শ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে। কিন্তু কেনো? কেউ বলতে পারছে না। ছেলেটি বাড়ি এসে অনবরত আবোল তাবোল কথা বলে যাচ্ছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে তখন এরশাদ বিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলছিলো। নেতাদের ভাষন তার ব্রেইনে গেঁথে গেছে। অনবরত সেসব ভাষন দিয়ে যাচ্ছে কারো দিকে না তাকিয়ে। চেয়ারম্যান সাব ঘুমিয়েছিলেন। তাকে ডেকে আমার কাছে এনে বসানো হলো। বুজতে পারলাম চেয়ারম্যান ব্যাপারটা তেমন জানেন না। চেয়ারম্যানের সাথে দু’চার কথা আলাপ হলো। রোগীকে কাছে নিয়ে আসতে বললাম। রোগী এসে সালাম দিয়ে এক হাত বাড়িয়ে দিলেন নেতার স্টাইলে হ্যান্ড সেইক করার জন্য। চেয়ারম্যান হাত বাড়ালেন না। আমার দিকে হাত বাড়ালে আমি হ্যান্ড সেইক করলাম। ছেলেটি “ডাক্তার স্যাব আমি একটু বাথরুমে যাবো” বলে বেড়া দেয়া টিউবওয়েল পাড়ের দিকে চলে গেলো। চেয়ারম্যান উচ্চারণ করলেন “বেয়াদব ছেলে!” হাত বাড়িয়ে হ্যান্ড সেইক করার একটা আদব আছে। সালাম বা আদাব বা নমস্কার বিনিময়ের পর হ্যান্ড সেইক করার জন্য সাধারণত বড়রা ছোটদের দিকে হাত বাড়িয়ে দেবে। ছোটরা আগে হাত বাড়াবে না। তাই, চেয়ারম্যান ছেলেটাকে বেয়াদব বলেছেন। আমি আরও অনেক্ষণ চেয়ারম্যানের সাথা গল্প করে কাটালাম। তার পিত্তে পাথর আছে। মাঝে মাঝে তীব্র ব্যাথা হয় এসব জানালেন। সেই ব্যাথা প্যাথেডিন ইঞ্জেকশন ছাড়া কমেনা তাও জানালেন। প্রায় এক ঘন্টা কেটে গেলো ছেলেটা আসছে না টিউবওয়েল পাড় থেকে। সমানে গায়ে পানি ঢালছে আর পেচাল পাড়ছে। কেটে গেল প্রায় দেড় ঘন্টা। বার বার তাকিদ দিলাম রোগী নিয়ে আসার জন্য। শরীরে পানি ঢালতেই লাগলো। আমার ডাক্তারি ব্যাগে সব সময় কিছু ইমার্জেন্সি ঔষধ রাখতাম। তারসাথে ক্ষেপাপাগলকে পুশ করার জন্য একটা ইঞ্জেকশনও ছিলো। নিরুপায় হয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম একটা মেরে দেই। চারজন তাগড়া যুবককে বুজিয়ে বললাম “আমি এর গায়ে পুশ করার জন্য একটা ইঞ্জেকশন ভরে রাখবো। আমি চোখ ইশারা দেয়ার সাথে সাথে একযোগে তাকে চেপে ধরবেন। সেকেন্ডের মধ্যে পুশ করে দেব ইঞ্জেকশন। কয়েক মিনিটের মধ্যে শান্ত হয়ে যাবে মাথা। যেই কথা সেই কাজ। কিছু খাওয়ার ট্যাবলেট প্রেস্ক্রিপশন করে দিয়ে চলে এলাম বাসায়। পরদিন সকালে একজন লোক সাথে নিয়ে সেই পাগলা ছেলেটি এলো আমার কাছে। একদম সাভাবিক কথা-বারতা ও আচরণ। তার নতুন সমস্যা ছিলো হাতের আঙ্গুল কাপছিলো। বুজতে পারলাম ইঞ্জেকশনের সাইড ইফেক্ট হয়েছে। তার জন্য ঔষধ লিখে দিয়ে বললাম “এবার সব ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
একদিন আমার চেম্বারের সামনের বারান্দা দিয়ে চেম্বারের দিকে যাচ্ছিলাম। একজন লোক একাকি চুপ করে বসেছিলো চেয়ারে। অন্য রোগীরা ছিলো ওয়েটিং রুমে। আমি লোকটার সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। তাকে ক্রস করার সাথে সাথে জোড়ে আমার পায়ে একটা লাথি মারলো যে আমার আত্মা ধরে গেলো। আমি তারাতাড়ি রুমে ঢুকে পড়লাম। খোঁজ নিয়ে জানলাম যে লোকটা ভোর পাগল। পায়ে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব হলো। আমি যে লাথি খেয়েছি তা কাউকে বললাম না। বললে অপমানিত হতাম। শুধু বললাম পাগল রোগী তাড়াতাড়ি বিদায় করে দাও যে কাউকে লাথি মারতে পারে। সেই আঘাত সারতে আমার এক সপ্তাহ লেগেছিলো।
একদিন আমি ফজলু মুন্সিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম “আপনারা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বারের সাথে ফার্মেসিতে বসেন। পাগল রোগীরা উৎপাত করে না?” তিনি বললেন “রোগী তেরিবেরি করলে দুইতিনজনে চাইপ্পা ধইরা একটা ইঞ্জেকশন মাইরা দেই। সব ঠান্ডা অইয়া যায়। স্যারেই বইলা দিছে এই ইঞ্জেকশন দিতে।” হাসপাতালের মানসিক রোগীদের ওয়ার্ডেও সব রোগী খোলামেলা আছে। কেউ কাউকে আঘাত করে না। সবই ঐ ঔষধের গুণে।
একবার এক মানসিক রোগীর বাবার সাথে আমার আলাপ হলো। রোগী ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু পাগল। তাই তাকে পরিবার থেকে পৃথক রাখতে হয়। চার তলা বাড়ির নিচতলার এক পাশের একটা ফ্লাটে একাই সে থাকে দরজা জানালা বন্ধ করে। নিজের খাবার নিজেই রান্না করে খায়। বাবার কাছ থেকে মাস মাস টাকা নেয় খরচ করার জন্য। এতে কোন অসুবিধা নেই। অসুবিধা হলো হঠাৎ করে তার ছোট ভাইটার মুখের মধ্যে একটা ঘুষি মেরে দিলো। বা ঘরের জিনিসপত্র ভাংতে শুরু করলো। এমন অবস্থা হলে প্রাইভেট মানসিক হাসতালে ভর্তি করে রাখতে হয়। একটানা ৪০ দিন বা ৫০ দিন করে রাখতে হয়। প্রতিদিন ৪ হাজার টাকা করে ভাড়া দিতে হয়। লাখ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে চিকিৎসা করে। ভালো হয়ে বাড়ি ফিরে আসে কিন্তু আবার যেতে হয় হাসপাতালে। কারন, বাড়ি এসে সে ঔষধ সেবন করে না। আমি জিজ্ঞেস করলাম
– হাসপাতালে নেন কিভাবে?
– হাসপাতালে যেতে চায় না। তারা পিক আপ নিয়ে আসে। চারজন ইয়া মোটা তাগড়া জোয়ান কপ করে ধরে পিকআপে করে নিয়ে যায়।
– আপনার ছেলের জন্য মায়া লাগে না?
– মায়া লাগে। কি করবো? যদি বড় কোন অঘটন ঘটিয়ে ফেলে তাই পাঠাতে হয়।
– তাগড়া জোয়ান লোকেরা হাসপাতালে নিয়ে চিপা মাইর মারে না তো?
– মারতেও পারে। মারলে পাগলের কথা কি কেউ বিশ্বাস করবে? তারা যেভাবে শান্ত করে রাখতে পারে পারুক। ছেলেটা নিয়ে আমরা বড় পেরেশানিতে আছি।
সম্প্রতি একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেছে অনুমোদনহীন এক মানসিক হাসপাতালে। খবরে দেখলাম সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারন করা একটা ভিডিও। জানা গেছে যে বিসিএস পাস এক পুলিশ কর্মকর্তা মানসিক অসুস্থতার জন্য উক্ত হাসপাতালে যান। সেখানে গিয়ে নাস্তাও করেন। নাস্তা করার পর তিনি ওয়াসরুমে যেতে চান। হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় জাতীয় কিছু তাগড়া জোয়ান ছেলে, ৮ জনের মতো হবে, তাকে নিচ তলা থেকে তিন তলায় নিয়ে যায়। রোগীর সাথে আসা তার সহোদর বোনও একজন ডাক্তার নাম নিচেই বসা ছিলেন । তিনি মনে করেছেন ভালো টয়লেটে নিয়ে যাচ্ছে উপর তলায়। ভিডিওতে দেখা গেলো ঐ যুবকরা তাকে ছোট এক সাউন্ড প্রূফ কক্ষে ঢুকানোর চেষ্টা করছে। তিনি প্রবেশ করবেন না। তাই তারা টেনে হিছড়ে ভেতরে নিয়ে চেপে ধরছে ও কনুই দিয়ে বুকে আঘাত করছে। এক সময় চিত করে শোয়ানো হলে সেই পুলিশ অফিসার নিস্তেজ হয়ে যায়। ধস্তাধস্তি করার সময় পুলিশ অফিসার প্রস্রাব করে দেন মেঝেতে যার জন্য তিনি ওয়াসরুম খুজছিলেন। তারা ক্লিনার ডেকে প্রস্রাব পরিস্কার করায়। মুখে পট থেকে পানি নিয়ে খেতে দেয়। নাকে মুখে পানি ছিটায়। ডাক্তার ঢাকে। নিচ তলা থেকে ডাক্তার এসে বাচানোর চেষ্টা করেন। শেষে ঘোষণা দেন রুগী মারা গেছে। কি মর্মান্তিক ঘটনা! কি রহস্যময় কারবার। কোন যুগে আছি আমরা?
১২/১১/২০২০
ময়মনসিংহ

Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

<script async src=”//pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js”></script>

<!– mobileads –>
<ins class=”adsbygoogle”
style=”display:block”
data-ad-client=”ca-pub-9696652946187583″
data-ad-slot=”4053143233″
data-ad-format=”auto”
data-full-width-responsive=”true”></ins>

<script>
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

</script>