Click on Menu button if you are using mobile.
মোবাইল হলে Menu বাটনে ক্লিক করুন।

Welcome to website of Dr. Sadequel Islam Talukder


Dr. Md. Sadequel Islam Talukder
MBBS, M Phil (Pathology), MACP
Associate Professor and Head [PRL]
Department of Pathology
Mymensingh Medical College
Mymensingh Bangladesh
.

 

Send your comment to: sadequel@yahoo.com

মুকুলের স্মরণে

মুকুলের স্মরণে

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আপনারা যাকে আসাদুজ্জামান তালুকদার নামে চেনেন তার ডাক নাম মুকুল। আমি কোনদিন আসাদ বলে ডাকিনি। আমি সবসময় মুকুল বলেই ডাকতাম। চাচাতো ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে কাছের ছিলো মুকুল। সে বয়সে আমার ছোট হলেও আমার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো। সে আমাদের ছেড়ে পরপারে চলে গেছে গত ১১ অক্টোবর ২০২০ আজ থেকে ১১ দিন আগে। সে নিপোর্ট শাখার ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার ভিজিটর ট্রেইনিং সেন্টারের প্রিন্সিপাল ছিলো। আমাদের বংশের দেখার মতো একটা চেহারা ছিলো তার। স্বভাব চরিত্র ছিলো অমায়িক।

মুকুল ছিলো বাবার চাচাতো ভাই আব্দুস সালাম তালুকদারের বড় ছেলে। সালাম কাক্কু ৫ ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন। তাই আমরা ছোট কাক্কু ডাকতাম। ছোট কাক্কুর বিয়ের আগের কথাও আমার মনে আছে। তখন তিনি ধলাপাড়া হাই স্কুলে মেট্রিকে (১০ম শ্রেণীতে) পড়তেন। তিনিও বেশ চেহারাবান ছিলেন। লম্বা চুল রাখতেন। আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে তিনি ধলাপাড়ার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। মা তার ভাবী হিসেবে ঠাট্টা করে বললেন “ছুট মিয়ার এহন বিয়া করার বয়স অইছে।” শুনে কাক্কু যে হাসি দিয়েছিলেন সেটা আমার দিব্যি মনে আছে। আমি তখন একদম ল্যাংটা পোলাপান ছিলাম। সেই বছরই কাক্কু মেট্রিক পাস করেন। বিয়েও করেন দাইমা গ্রামের হযরত গোলদাইরার মেয়েকে। সকালে মা আমাকে বললেন “নও, নয়া বউ দেইখা আহি।”

– নয়া বউ কেরা?

– তোমার নয়া কাক্কি।

– নয়া কাক্কিরে তো দেখছিই।

– এইডা আরেকটা নয়া কাক্কি। তোমার ছোট কাক্কুর বউ আনছে। নও দেইখা আহি।

ছোট কাক্কুর বড় ছিলেন মিয়া কাক্কু। মানে আবুল কাশেম তালুকদার। মিয়া কাক্কুর শশুর ছিলেন মাইজবাড়ির ঠান্ডু মিয়া। মিয়া কাক্কুর বড় মেয়ে কুলসুম আপা জন্মের পর কাক্কি মারা যান। পরে কাক্কির ছোট বোনকে বিয়ে করেন। তাই তিনি আমাদের নয়া কাক্কি। নয়া কাক্কি বৃদ্ধকাল পর্যন্ত আমাদের কাছে নয়াই ছিলেন। তিনি কয়েক মাস আগে মারা গেছেন। ছোট কাক্কুর স্ত্রী নয়া হয়েও নয়া খেতাব পাননি। তিনি হলেন আমাদের ছোট কাক্কি। আমি মার সাথে ছোট কাক্কিকে দেখতে গিয়েছিলাম। কাক্কি নতুন বউ হিসাবে লম্বা ঘুমটা টেনে লজ্জাবনত হয়ে মেঝের পাটিতে বসেছিলেন। পাড়ার মহিলারা এসে এসে ঘুমটা সরিয়ে সরিয়ে মুখ দেখছিলেন। সুন্দর কাক্কুর জন্য সুন্দরী কাক্কিই পছন্দ করে এনেছিলেন দাদু। মা আমাকে কাক্কির ঘুমটা সরিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বললেন “এই দেখো তোমার নয়া কাক্কি।” আমি কাক্কিকে দেখলাম। বিয়ের বছরান্তেই ছোট কাক্কির ঘরে তালুকদার বংশের সবচেয়ে সুন্দর ছেলেটি জন্মগ্রহণ করে। তার নাম মুকুল। কাক্কু নাম রাখলেন আসাদুজ্জামান তালুকদার মুকুল। কাক্কু মেট্রিক পাস করে কালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ অফিসের কেরানির চাকরি নিয়েছিলেন। তিনি সালাম কেরানি নামে পরিচিত হলেন। তারপর প্রমোশন পেয়ে সেক্রেটারি হন। তার পর থেকে সালাম সেক্রেটারি নামে পরিচিত হন। সারাসিয়ার মাইন ভাইর ছোট ভাইকে ছোটবেলা সালাম কেরানির মতো সুন্দর দেখা যেতো। তাই তাকে কেরানি বলে ডাকতো। ছোট কাক্কু সরকারি চাকরি করার পাশাপাশি ঔষধের ব্যবসা করতেন। ফার্মেসির নাম দিয়েছিলেন মুকুল ফার্মেসি। মুকুলের দাদীকে দাদী না ডেকে সব নাতিরা বাব্বু ডাকতো। কেনো বাব্বু ডাকতো তার কোন ভালো ব্যাখ্যা আমি পাইনি। আমাদের সবার বড় নুরজাহান আপা নাকি প্রথম দাদীকে বাব্বু ডেকে প্রচলন করেন। মুকুল মারা গেলে নুরজাহান আপা এসেছিলেন। শমে কাক্কুর নাতিরাও সেই ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য তাদের দাদীকে বাব্বু ডাকে। আগের দিনে অনেক মায়ের ৫-৬ জন করে সন্তান থাকতো। প্রায় সব মায়েরা ছোট ছেলেকে বেশি স্নেহ করতো। সেই হিসাবে বাব্বু ছোট কাক্কুকে বেশি স্নেহ করতেন। ছোট কাক্কুর প্রথম ছেলে হিসাবে মুকুলকে বাব্বু বেশী স্নেহ করতেন। ফুটফুটে চেহারার হওয়াতে, বাব্বুর অতি প্রিয় হওয়াতে এবং ছোট কাক্কুর প্রথম সন্তান হওয়াতে তালুকদার বাড়ির মুকুলকে সবাই আদর করতো। মাটিতে নামতেই দিতো না। দেখলেই তাকে কোলে নিয়ে নিতো। মুকুল যখন ৭-৮ মাসের তখন বসে বসে নিজ হাতে ফিডার ধরে দুধ খেতো। ভোলা ভোলা স্বাস্থ্য ছিল। পেটটা ডোবলা ছিলো। নাভিটা ফিডারের বোটার মতো বড় ছিলো। আসলে ওটা ছিল আমবিলিকাল হার্নিয়া। বড় হলে ওটা পেটের সাথে মিশে যায়। আমার এখনো মনে আছে মুকুল পিঠের বেতের পাটিতে ভুড়ি ভাসিয়ে বসে দুইহাতে বোতল ধরে ফিডার খেতো। এই বয়সে শিশুরা যখন তখন যেখানে সেখানে পায়খানা করে দিতে পারে। মুকুলও তাই করেছিলো। আকবর ভাই মুকুলকে পেলেই কাঁধে নিয়ে ঘোড়ায় চরার মতো করে বসিয়ে নাচানাচি করতেন। একদিন এইভাবে তিনি মুকুলকে কাঁধে নিয়ে নাচানাচি করছিলেন। মুকুলের পাছায় যে পায়খানা লেগেছিল সেটা তিনি জানতেন না। আকবর ভাইর কাঁধে পায়খানা লেগে চেরাবেরা হয়ে গেছিলো। ছোট কাক্কি দেখে বলেন “এল্লা, জাউরাডায় আঘাগারিডারে কান্দে নিছে কে।” ছালে আপা দেখে বলেন “এ খোদে! আইঘ্যা চেরাবেরা কইরা ফালাইছে আকবরের কান্দে।” সেই মুকুল দ্রুত বড় হয়ে যায় সবার যত্নে। আমি কৈশোরে থাকতে থাকতেই সে উচ্চতায় আমার কাছাকাছি হয়ে যায়। তার স্বভাব চরিত্র ও বুদ্ধিমত্বা ভালো হওয়ায় অল্প বয়সেই আমার বন্ধুর মতো হয়ে যায়। ওকে নিয়ে বাড়িময় এবং পাড়াময় ঘুরে বেড়াতাম। গলায় গলায় ধরে হাটতাম। পানি পাড়াতাম। পানিতে ঝাপ পাড়তাম, নল খেলতাম। বাব্বু সবসময় তাকে চোখে চোখে রাখতেন। পানিতে নামলে উঠে আসার জন্য তাগিদ দিতেন। তাতে মুকুল বাব্বুর প্রতি খুব বিরক্ত হতেন। আমি বলতাম “বাব্বুর আসলে পানির পাড়ে আসতে ভালো লাগে, তাই মুকুলকে ডাকার নাম করে পানির পাড়ে আসেন।” মুকুল মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে আমার “সোনালি শৈশব” নামের স্মৃতি কথার বইটি প্রকাশিত হয়। এর প্রচ্ছদ পরিকল্পনা আমি করেছি। প্রচ্ছদ অংকন করে দিয়েছে বাসার চালার ধলা মিয়া। প্রচ্ছদে দেখা যাচ্ছে দুইজন ছেলে গলাগলি ধরে পাহাড়ি পানি পাড়িয়ে হেটে যাচ্ছে। আসলে আমার কল্পনায় একজন আমি এবং আরেকজন মুকুল। আমি যখন আমার ছোট বোন শাহীনুরকে বইটি উপহার দিলাম, সে হাতে নিয়ে প্রচ্ছদের স্ক্যাচ দেখে মন্তব্য করলো “এরা কি মুকুল ভাই আর আপনে?” আমার মনে হলো প্রচ্ছদ পরিকল্পনা সার্থক হয়েছে। মুকুলের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমরা শৈশবেই ছিলাম। আমাদের মধ্যে কথা হতো শৈশবের আঞ্চলিক ভাষায়। তারাতাড়ির আঞ্চলিক শব্দ হলো ধাতুবাত। কিছুদিন আগেও মুকুল আমাকে বললো “ধাতুবাত করুন।”

ক্লাস নাইনে উঠে আমি চলে যাই ভালুকার বাটাজোর বি এম হাই স্কুলে। তারপর থেকেই মূলত মুকুল থেকে দূরে দূরে থাকতে হয়েছে। ১৯৭৭ সনের মার্চ মাসে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করে আমি প্রায় তিন মাস বড়িতে অবস্থান করি। আমি অংকে বেশ ভালো ছিলাম। সাধারণ গনিতে ৯৫ এবং নৈর্বাচনিক গনিতে ৯৮ পেয়েছিলাম ১০০-তে। ছোট কাক্কু আমার মেধার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন “বাজান, রেজাল্টের আগ পর্যন্ত তো তোমার কাজ নাই। এই কমাস আমগ মুকুলেরে দৈনিক একঘন্টা করে অংক করা শিখাবে। আমি তাই করি। মুকুল তখন এইটে পড়ে।” কাক্কু আমাকে বেশ কিছু টাকা দিয়েছিলেন। সেই টাকা আমি ইচ্ছেমতো খরচ করেছি। মুকুলের ছোট ভাই-বোনরা আমাকে সহোদর বড় ভাইয়ের মতো দেখতো। আমিও ওদেরকে সহোদর ছোট ভাই-বোনদের মতো দেখতাম। ওদের মুখের ভাই ডাক আপন বোনের ডাকের মতো লাগে আমার কাছে। নকলা উপজেলায় চাকরিকালীন একজন বাচ্চা রোগী চিকিৎসা করেছিলাম। সেই বাচ্চার মা আমাকে এমন ভাবে ভাই ডাকতো, শুনে মনে হতো মেয়েটা আসলেই আমার ছোট বোন। আমি আউলিয়াদের আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ১৯৮০ সনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ক্লাস শুরু করি। ছোট কাক্কুও তাই মুকুলকে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজে ভর্তি করে দেন। আমার বিয়ের সময় যখন মুকুল আমার শশুরবাড়ি যায় তখন আমি পরিচয় করিয়ে দেই আমার ছোট ভাই বলে। চাচাতো ছোট ভাই না বলে শুধু ছোট ভাই বলি। চাচীশাশুরী, খালাশাশুরী, মামীশাশুড়ীরা একে অপরকে বলেন “ঐটা জামাইর ছোট ভাই।” কি কারনে যেন তারা মুকুলকে দেখে সবাই খুব খুশী ছিলেন। তাদের সবারই মেয়ে ছিলো। এইজন্য কিনা জানিনা। এমন সুন্দর ছেলে দেখলে অনেক মেয়ের মাই খুশী হয়। এটা আমি মনে করতাম। মুকুল এইসএসসি পাস করে করটিয়ার সাদত কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়। তার সময় ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন বর্তমান সখিপুর -বাসাইলের এম পি জননেতা এডভোকেট জোয়াহের ভাই। মুকুলের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা ছিলো। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে এম পি মহোদয় মুকুল ও আমাকে কথা দিয়েছেন আমাদের গ্রামের সিরিরচালা প্রাইমারি স্কুল থেকে বাসারচালা প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত বেহাল দসার রাস্তাটি পাকা করে দেবেন। এটা এলাকার জনগণের প্রাণের দাবী। ফেরুয়ারির সমবর্ধ সভায় আমি ও মুকুল বিশেষ অতীথি ছিলাম। আমরা দুজনই আমাদের বক্তৃতায় এই রাস্তাটি পাকা করে দেয়ার দাবী জানিয়েছিলাম। এমপি মহোদয় তার বকৃতায় কথা দেন “ডাক্তার সাহেব যে রাস্তাটির দাবী করেছেন সে রাস্তাটি হবে আগামী বাজেটে, ইনশাআল্লাহ।” আমি মনে করলাম মুকুলের প্রতি মোহব্বতের কারনেই তিনি রাস্তাটা পাকা করার ওয়াদা করেছেন। সেই রাস্তাটি হবে হয়তো। কিন্তু মুকুল দেখে যেতে পারলো না। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেনো আমি দেখে যেতে পারি। মুকুলের জন্য মসজিদের কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। আমরা চাই মসজিদ এক তলা বিশিষ্ট হবে। মুকুল চায় মসজিদ দোতলা বিশিষ্ট হবে। তার ইচ্ছা ছিল দোতলায় হুজুর পাড়ার পোলাপানদের আরবি পড়াবেন। আমরা বলি কি দরকার পাড়ায় ত একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসা আছেই। যাহোক, শেষে এক তলার মসজিদ নির্মাণই শুরু হয়। সে গত শীতের মজদিদের ওয়াজ মাহফিলে মসজিদ নির্মাণের জন্য বেশ বড় অংকের টাকার ওয়াদাও করেছিল। নির্মাণের কাজ ভালোভাবেই শুরু হয়। কিন্তু করোনার লকডাউন ও বর্ষার কারনে নির্মাণ কাজ বন্ধ আছে। যারা জানাজা পড়তে এসেছিলেন তারা রাস্তার অবস্থা ও মসজিদের অবস্থা দেখে অনেকেই ক্ষুব্ধ হন। মুকুল মসজিদ দেখে যেতে পারলো না। আল্লাহ যেনো আমাকে মসজিদ দেখিয়ে নেন।

ছোট কাক্কি তালুকদার বাড়ি এসে প্রতি দেড় বছর অন্তর একজন করে সন্তান উপহার দিতে থাকেন। মুকুলের পর একে একে জন্ম নেয় ছফুরা, শিরি, কায়সার, মাজে, আকতার, সাজে ও জোবে। এদের আসল নাম যথাক্রমে ছফুরা খাতুন, শিরিনা খাতুন, আনোয়ার হোসেন, মাজেদা খাতুন, আকতার হোসেন, সাজেদা খাতুন ও জোবেদা খাতুন। জোবেদা ফেইসবুক খুলেছে তালুকদারের ছোট কন্যা নাম দিয়ে। ছফুরাকে দুল্লাকালেই ছোট কাক্কু বিয়ে দিয়ে দেন পাড়ায়ই সবচেয়ে ধনি বাড়িতে আলী মাহমুদের সাথে। ছফুরা খুব হাশি খুশি বোন ছিলো আমাদের। অল্প কিছুতেই হেসে গলে পড়তো। অল্প বয়সেই সন্তান সম্ভাবনা হয়। শশুর বাড়িতেই সন্তান ডেলিভারি করানো হয়। জমজ দুই বাচ্চা হয়ে মারা যায়। ছফুরাও অধিক রক্তক্ষরণ হয়ে মারা যায়। একজন তাজা স্বতঃস্ফূর্ত মেয়ে এমন ছোট বয়সে মরে গেলো! ছোট কাক্কু ও কাক্কি মহা শোক পেলেন। মুকুলও পিঠাপিঠি বোনকে হাড়িয়ে ভেংগে পড়ে। সে আমাকে তার এ বিষয়ে খোভের কথা আমার কাছে ব্যক্ত করে। কাক্কু অনেক মাস পর্যন্ত ছফুরার কবরের কাছে বসে কেঁধে কেঁধে দোয়া কালাম পাঠ করতেন। একবার কাক্কুর টাঙ্গাইল যাওয়ার কারন জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম তিনি কয়েক হাজার টাকার ইসলামি বই কিনে বিভিন্ন মাদ্রাসা ও মসজিদে দান করে এসেছেন। কাক্কু আমাকে বুঝালেন যে ছফুরা বেঁচে থাকলে বাপের সম্পত্তি পেতেন, তার পেছনে অনেক খরচ হতো। সেই পরিমান টাকা মানুষকে না খাওয়ায়ে সদকায়ে জাড়িয়া করে দিলেন। এর সওয়াব ছফুরা বহুকাল পর্যন্ত পেতে থাকবে। চল্লিশ বছর বয়সে কাক্কুর কিডনি রোগ ধরা পড়ে। প্রথম দিকে আমি ময়মনসিংহে ডাক্তার দেখাই। সেই চিকিৎসায় তৃপ্তি না পেয়ে কাক্কু হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের পাল্লায় ঘুরপাক খান অনেক বছর। রোগ বেড়েই চলে। কাক্কু তার বাল্য বন্ধু সার্জারীর প্রফেসরকে দেখান ময়মনসিংহ। হোমিওপ্যাথি ঔষধ সেবনের হিস্ট্রি শুনে প্রফেসর ছোট কাক্কুকে আমার সামনেই পাহাইড়া বলে টিটকারি দেন। তাতে তারপ্রতি মনক্ষুন্ন হয়ে ঢাকায় চলে যান। আমজানির ডাক্তার শাহ আলম তালুকদার দাদার মামতো ভাইয়ের ছেলে। সেই হিসাবে তিনি কাক্কুর ভাই সম্পর্কে। কাক্কু শাহ আলম কাকার পরামর্শ নিয়ে ঢাকায় নেফ্রোলজিস্ট দিয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসা করান। মুকুলই কাক্কুকে সাথে নিয়ে যেতেন।

এদিকে মুকুল করটিয়া থেকে অনার্স এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স পাস করে বেকার হয়ে পড়ে অনেকদিন পর্যন্ত। কাক্কুর আটজন সন্তান, অল্প বেতনের চাকরি, ব্যয়বহুল চিকিৎসা, মুকুলের বেকারত্ব, সব মিলিয়ে একটা কেমন অবস্থার যেনো সৃষ্টি হয়। কাক্কু এক সময় সরকারি চাকরি রিজাইন দিয়ে চেয়ারম্যান পদে ইলেকশন করে তিন পাখি জমি বিক্রি করে দেন। ইলেকশনে ভরাডুবি খেয়ে সরকারি চাকরি হাড়িয়ে তিনি জিতাশ্বরি রশিদিয়া দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক হন। কায়সার খুব দুষ্ট ছিলো। বড় বড় মাছের টুকরা তাকে দিতে হতো। ভালো মানুষ বানানোর জন্য তাকে মাদ্রাসায় হোস্টেলে রাখা হয়। হোস্টেলে গিয়েও সে দুষ্টামি করে বলে পড়া ক্ষান্ত দিয়ে বাড়িতে এসে পড়ে। ভিলেজ পলিটিক্সে জড়িয়ে পড়ে। তাকে নিয়ে কাক্কু অশান্তিতে পড়ে। পাঠিয়ে দেয়া হয় মিডল ইস্টে চাকরি নিয়ে। ভালো কাটে সেখানে তার।

আকতার পড়তো হাফেজি। হাফেজ হয়েছিলো। মুকুল মাস্টার্স পাস করে ঢাকার খিলগাওয়ে মেসে থেকে একটি কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করতে থাকে। আকতারকেও মেসে রাখে। সে আরবি লাইনে পড়তে থাকে। আমি বিসিএস ও পোস্ট গ্রাজুয়েট এডমিশন টেষ্ট দিতে গিয়ে মুকুলের মেসেই থাকতাম। তার তখন বিয়ে করার উপযুক্ত বয়স। এই বেকারত্বর সময় কেই রাজি হয়? মুকুল একজন এম পির কাছে যেতো ঘন ঘন। এমপি নাকি তাকে খুব পছন্দ করতেন । মুকুলের ধারনা ছিল এম পি সাবের সাথে ঘুরাফেরা করলে একটা চাকরি হবে। আমি বুঝালাম এমপির সাথে থাকলেই চাকরি দেবেন এটা আমি মনে করিনা। মুকুলের চাকরি হলে মুকুল আর এমপির কাছে যাবে না। কাজেই মুকুল যতদিন বেকার থাকবে ততদিন এম পি তাকে কাজে লাগাবে। তারপর থেকে সে এমপির কাছে যাওয়া কমিয়ে দেয়।

১৯৯৫ সনে আমি শাহবাগ পিজি হোস্টেলে ছিলাম এমফিল থিসিস পার্টে ছিলাম। একদিন মুকুল তার সরকারি চাকরির এপয়েন্ট লেটার নিয়ে এলো আমার হোস্টেল কক্ষে। খুব খুশী হলাম। মনে মনে ভাবলাম মুকুলের বিয়ের বাঁধা দূর হয়ে গেলো। ওর ছোট ভাই একাই সিদ্ধান্ত নিয়ে আগেই বিয়ে করে ফেলেছিলো। ভালোই করেছিলো আমার মতে। বিয়ের বয়স হয়েছে বিয়েতো করবেই। চাকরি পাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে মুকুল আবার এলো আমার হোস্টেলে এই বলে যে তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে শাহ আলম কাকার ইডেন কলেজে অনার্স পড়ুয়া শ্যালিকার সাথে। ছোট কাক্কু ও শাহ আলম কাকার ইচ্ছায় এই বিয়ে হচ্ছে। আমি আলহামদুলিল্লাহ, ভালো হবে বলে আকদের অনুষ্ঠানে গেলাম। পরে একদিন অনুষ্ঠান করে বউ নিয়ে এলাম বাড়িতে। মুকুলের ভাগ্যে সরকারি ভালো চাকরি ও বিয়ে দুইটাই জুটে গেলো। প্রথমে প্রভাষক পদে যোগদান করেছিলো। পরে নিপসম থেকে ডিপিএইচ ডিগ্রি করে প্রিন্সিপালের পোস্ট পায়। বিয়ের প্রথম কয়েকদিনের মধ্যেই মুকুল তার বউকে নিয়ে কি বিষয়ে যেনো হালকা একটি মন্তব্য করে। আমি সাথে সাথে রিয়েক্ট করি। বলি “সাবধান, নিজের বউকে নিয়ে কারো কাছে মন্তব্য করবে না।” মুকুল ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। সে বুঝতে পারে আমি তার শুধু বন্ধুই না, একজন শিক্ষক এবং বড় ভাইও। এইবার যে শিক্ষাটা আমার কাছে পেয়েছিলো সেই কথাটা সে কৃতজ্ঞতার সাথে আমার কাছে বেশ কয়েকবার বলেছে। সম্মানজনক চাকরি, ভালো ফ্যামিলিতে বিয়ে এবং ভালো একজন বউ পাওয়ার সবাই খুশী হয়। মুকুল তার ছোট দুই বোনকে ঢাকায় বাসায় রেখে ভালো স্কুল ও কলেজে পড়ায়।

আকতারকেও ঢাকায় মেসে রেখে পড়ায়। মুকুলের বউ ওদেরকে ছোট ভাই বোনের মতো স্নেহ করে। মুকুল কায়সার ও আকতারকে অনেক টাকা খরচ করে বিদেশ পাঠিয়ে দেয় চাকরি করতে। কাক্কুর ব্যহবহুল চিকিৎসা চালিয়ে যেতে থাকে। একসময় কাক্কু চলে যান পরপারে। কাক্কু জীবিত থাকতে মুকুলের সব বোনকে এনে একাত্র করে ঈদ ও বিভিন্ন রকমের আয়োজন করতেন। সেই দায়িত্ব কাধে নেয় মুকুল। কাক্কু যাযা করতেন মুকুলও তাই তাই করতো।

দীর্ঘদিন হয়ে গেলো মুকুলের কোন সন্তান হলো না। দেশে বিদেশে অনেক চেষ্টা তদবির করে কোন ফল হলো না। নিজের ঔরস দিয়ে দুইবার টেষ্ট টিউব বেবি নিয়েও ব্যর্থ হয়ে পাগল প্রায় হয়ে গেলো দুজনে। কায়সারের ঘরে এক কন্যা সন্তান হলে তাকে তারা মেয়ের মতো করে যত্ন করতে থাকে। সেই মেয়ে বড় হয়ে ময়মনসিংহ এক কলেজে ভর্তি হয়। সেখানে ম্যাল ভালো পায় না। কি কারনে যেন সে আত্বহত্যা করে মারা যায়। মুকুল মহা শোক পায়। শাহ আলম কাকার ফুটফুটে মেয়েকেও মুকুলের বউ নিজের সন্তানের মতো করে যত্ন নিতো। সেই মেয়ে আমেরিকা গিয়ে কলেজে ভর্তি হয়। সেও একদিন অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরন করে। সেই মৃত্যুতেও তারা শোকে ভেংগে পড়ে।

বিয়ের প্রায় যুগ পেরিয়ে যাবার পর আল্লাহ মুকুলকে একটা ছেলে সন্তান দেয়। সেই সন্তানকে পেয়ে মুকুল ও তার বউ মনে করে সোনার টুকরো। তার কোন কিছুর অভাব হয় না। যা চায় তাই খায়। এমন বড় সড় হয়ে গেছে বেটা বেটা দেখা যায়। অথচ বয়স এখন মাত্র ১২ কি ১৩ বছর। ইংলিশ মিডিয়ামে ঢাকার নামীদামি স্কুলে পড়ে। মাত্র ক্লাস ফাইভে পড়ে। এবার সিক্সে উঠবে। ছেলে বাপ ছাড়া কিছু বুঝে না। অথচ এই ছেলেটা ছেড়ে আল্লাহর ডাকে চলে যেতে হলো আজীবন সংসার সংগ্রামী মুকুলকে। আল্লাহ তার সন্তান ও স্ত্রীকে শোক সইবার এবং ধৈর্য ধারণ করবার তৌফিক দান করুন।

গত ছয় সাত বছর আগে ওরা যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়ে সেটল হতে চেয়েছিল। ভিসাও হয়েছিলো। বউ বাচ্চা নিয়ে দুইবার গিয়েছিলো। মুকুল সেসময় তার ছেলের কথা আমাকে বারবার বলতো। ওরা স্কাইপিতে কিকি বলতো তা আমাকে মোবাইল করে জানাতো। তাতে আমি বুঝতে পারতাম মুকুল ছেলেকে খুব মিস করে। মুকুল চাকরি ছেড়ে ছেলের কাছে চলে যেতে চায়। এনিয়ে আমার সাথে কথা বলে মোবাইলে অনেক্ষণ। এক দিকে অনেকগুলি ভাইবোন ও মায়ের টান, আরেকদিকে ছেলে ও বউয়ের টান। মানষিক দ্বিধাদন্দে কাটতে থাকে তার রাতদিন। আমাকে সিন্ধান্ত দিতে বলে কি করবে সে। আমি বললাম “তোমার ভালো-মন্দ তুমি দেখবে। তোমার যেখানে সুখ সেখানে তুমি থাকবে। আমেরিকা যারা গিয়েছে তারা বাংলাদেশে আসার তেমন সময় পায় না। আমার পরিচিত জনদের দেখে আমার এই ধারণা হয়েছে। তুমি কেমন করবে আমি জানি না। তবে তুমি চলে গেলে কাক্কি অসহায় হয়ে পড়বে, তুমি আছো বলে বোনগুলা আসে একসাথে। তুমি প্রতিবছর ঈদ করো বাড়িতে সবাইকে নিয়ে। আমি বাড়ি গেলে তুমিও বাড়ি আসো। সেই সুখগুলো বিলীন হয়ে যাবে। তবে তোমার ছেলে হয়তো ওদেশে এদেশের থেকে ভালো থাকবে। তুমিই সিদ্ধান্ত নাও কি করবে। কয়েকদিনের মধ্যে সে চীন সফর করে এসে আমাকে ফোন দিলো “ভাই, আমি আমেরিকা যাবো না।” মুকুল আর আমেরিকা গেলো না।

আমি যখনই বাড়ি যেতাম যাবার আগেরদিন মুকুলকে জানাতাম । মুকুলও বাড়ি এসে পড়তো । কত রকম না বলা কথাই যে বলতো । সব জমানো কথা আমার কাছে শেয়ার করতাম । আমিও আমার না বলা জমানো কথা মুকুলের কাছে শেয়ার করতাম ।

ওদিকে কায়সারও বিদেশে কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন অসুস্থতার ভেতর দিয়ে অতিবাহিত করতে লাগলো। কায়সার আমার খুব ভক্ত ছিলো। আমার সামনে কোনদিন তাকে বেয়াদবি করতে দেখি নি। বাড়িতে গেলে সে সব সময় আমার সাথে সাথেই থাকতো। বিদেশ থেকে সে আমাকেই বেশী ফোন দিতো। অসুস্থ হওয়াতে আরও বেশী ফোন দিতো। তার কষ্টের কথা আমাকে জানাতো। তার ডাক্তার ছিল আমার সিনিয়র ডা. আনোয়ার ভাই। অনেকে আনোয়ার -আসাদ জুটি হিসাবে চেনেন। কায়সার ভাইগো বলে ডাক দিয়ে ফোন করতো। আমি আনোয়ার ভাইর সাথে কিডনির কন্ডিশন নিয়ে কথা বলতাম। আনোয়ার ভাইর কথায় বুঝা গেলো কায়সারের আয়ু আর বেশী দিন নেই। তার কষ্টের কথা শুনে আমার বুক হু হু করে কেধে উঠতো। আমি বললাম

– কায়সার, ভাই তুমি চাকরি বাদ দিয়ে দেশে আইয়া পড়।

– এত সুন্দর চাকরি ছাইড়া আইয়া পড়মু? কোন পরিশ্রমের কাজ নাই। খালি কর্মচারী সুপারভাইস করতে হয়। দেশে আইয়া করমু কি?

– তুমি বিদেশে একা রইছো। তোমার কষ্ট দেখার কেউ নাই। তুমি দেশে এসে কষ্ট কর। আমরা তোমার কষ্ট দেখমু।

– ভাই, আমি মনে হয় আর বাচমু না। আমার কিডনি ডায়ালাইসিস করতে অইব।

– যদি মরতেই হয়, আমাদের কাছে এসে মরো। তোমার কষ্ট দেখার কেউ নাই, এটা ভেবে আমার খুব কষ্ট হয়। আইয়া পড়।

কায়সার এসে পড়লো। ময়মনসিংহে ডায়ালাইসিস শুরু করলো। প্রতি সপ্তাহে খরচ হতো ১০ হাজার টাকা করে। টাকার উপর আল্লাহয় বাচিয়ে রাখলেন তিন বছর। তার কামাই করা গচ্ছিত টাকা সব শেষ হয়ে গেলো। শেষে মুকুল তার জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করলো। অবশেষে সেই আমাদের ছেড়ে পরপারে চেলে গেলো দুবছর আগে। চলে যাওয়ার আগে তার এক কন্যা সন্তান হলো। বড় ছেলে নিলয় ইন্টারে পড়তো। তার চাকরির জন্য আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম। আলহামদুলিল্লাহ সে আর্মিতে প্রবেশ করেছে।

ছোট কাক্কি একে একে হারালেন ছফুরাকে, কাক্কুকে, কায়সারের মেয়ে বিন্তিকে, কায়সারকে শেষে মুকুলকে। কি করে কাক্কি এই শোক সইবেন? আল্লাহ কাক্কিকে সব শোক সইবার ধৈর্য দিন। দাফরাইয়া দাফরাইয়া কাদেন। আমরা বারন করে বলি দোয়া পড়ুন। কতক্ষণ আর দোয়া পড়ে চুপ থাকা যায়। বাবা করে চিতকার দিয়ে উঠেন। মুকুলের বোনগুলায় আক্ষেপ করে বলে উঠে আমার ভাইগুলারেই আল্লাহ্য় নিয়া যায় কেন? আমি ওদেরকে বুঝ দিতে পারি। আমি বুঝ দেবার ভাষা গুছিয়ে বলতে পারি না।

মুকুলের কাছে ফোন করলে ঠিকমতো কথা বলতে পারতো না। পাশ থেকে ছেলে ডিস্টার্ব করতো। সেই ছেলে এখন বাপছাড়া হয়ে কেমন করবে। আল্লাহ এই ছেলের যেমন মঙ্গল আমাদের মুকুল চেয়েছিলেন তার চেয়েও বেশী মঙ্গল করুন।

করোনাকালীন সময়ে মুকুলের সাথে আমার দেখা হয়নি। মোবাইলে করোনা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। রিস্ক নিয়ে এবার কুরবানির ঈদ বাড়িতেই করেছে। আমি ছিলাম ময়মনসিংহ। ঈদের আগে পাছের ঘটনা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। করোনাকালিন সময়ে মুকুল ফ্যামিলি নিয়ে ঢাকার নিজস্ব ফ্লাইট ছেড়ে কর্মস্থল ঘাটাইল থাকতো। মোবাইল করে বুঝা গেছে মুকুল অসুস্থ্য। কিন্তু আমাকে কিছু বলে নি। তার কিডনি খারাপ হয়েছিলো। তেমন চিকিৎসা করেনি সম্ভবতঃ। যে ছোট ভাইয়ের চিকিতসার জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করলো তার নিজের জন্য কেন করলো না? নাকি করোনার ভয়ে ডাক্তারের কাছে যায় নি। যেদিন খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে সেদিন দেখা গেলো কিডনির অবস্থা এতো খারাপ যে ডায়ালাইসিস করতে হবে, রক্তশুন্যতা এতো যে কমপক্ষে ৪-৫ ব্যাগ রক্ত ভরতে হবে। হাসপাতালে ভর্তির সময় পরীক্ষা করে ধরা পড়লো করোনা পজিটিভ। কয়েকদিনেই করোনা নেগেটিভ হলো। কিন্তু তার হার্ট এটাক করলো। করোনার কষ্ট নিয়েই এক রাতে মোবাইলে তার সাথে কথা হয়। বলে “ভাই, গলায় খুব কষ্ট। বুকে খুব কষ্ট। আমি আসার সময় আপনেরে জানাইতে পারি নাই।” আমি বললাম “অসুবিধা নাই। আমি জানি। আমরা সবাই দোয়া করতাছি। আল্লাহ আল্লাহ করো।” আমি ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে মেডিসিন কলসালন্স খুজে বের করে মুকুলকে বিশেষভাবে যত্ন নিতে বলি। তারা বিশেষভাবে যত্ন নেয় এবং আমাকে দৈনিক আপডেট দেয়। তাদের একজন আমার প্রাক্তন প্রিয় ছাত্র মাহবুব। ভাগ্য খারাপ করোনা ভালো হয়ে গেলেও আমার ভাইয়ের হার্ট এটাক করলো। নেয়া হলো ইউনাইটেড কার্ডিয়াক হাসপাতালে। আই সি ইউতে ভর্তি রইলো। মোটামুটি সুস্থ্য হলে কেবিনে আনা হলো। অনেকের সাথে অল্প অল্প কথা বলেছে মোবাইলে। তার ক্লাসমেট বন্ধু, আমার চাচাতো শ্যালক কাম মামাতো ভায়েরা রফিক তার কেবিনে গিয়ে ফেইসবুক মেসেঞ্জারে ভিডিও কল দেয়। তাতে আমি অসুস্থ মুকুলকে দেখতে পাই গালভর্তি সাদা দাড়ি। এযেনো অন্য রকম মুকুল। সে শুধু বলে ভাই, ভাই, কদ্দুছ? আমি মোবাইল কদ্দুসকে দেই। কদ্দুছের সাথে বেশ কিছু কথা বলেছে কিন্তু কদ্দুস বুঝতে পারেনি। তারপর আমি আমার শ্যালক সুমুনের কাছে দেই। মুকুল সুমনের সাথেও কথা বলেছে। পরদিন নাকি সারাদিন চেষ্টা করেছে সিদ্দিক ভাইকে কিছু বলার জন্য। কিন্তু সিদ্দিক ভাইর মোবাইল সেদিন নষ্ট ছিল। খুব সম্ভব মসজিদের ব্যাপারে কিছু বলতো। তার কাছে কে কত টাকা পায় তার একটা লিস্ট করায় সেদিন। তারপর আবার হার্ট এটাক করে তীব্রভাবে। প্রথমে আই সিইউ পরে লাইফ সাপোর্টে। একদিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর ১১ অক্টোবর ২০২০ শনিবার সকাল ৭-৩০ টায় তাকে মৃত ঘোষণা করে। শাহ আলম কাকা আমাকে জানান ৭-৩৭ টায়। ফেইসবুকে নিউজ দিয়ে চলে যাই বাড়িতে।

বিকেল ৫ টার পর জানাজা পড়ে মুকুলকে সমাহিত করা হলো তালুকদার বাড়ির গোরস্থানে ছোট কাক্কুর কাছাকাছি। আমি সকালে কবর জিয়ারত করতে গিয়েছিলাম, সভাবত আগের মতই বাড়ি গিয়ে পরেরদিন সকালে যা করি। হাটতে হাটতে চলে গেলাম বাবা-মার কবরের কাছে। কল্পনা করলাম আমাকেও এখানে মাটির নিচে শোয়ায়ে রাখা হবে। রাস্তায় দাড়িয়ে পশ্চিম দিকে মুখ করে দাড়িয়ে কবরবাসীর জন্য দোয়া করলাম। এবার দোয়া করার সময় আমার পাশে মুকুলকে পেলাম না। মুকুলের কবরটা সামনে পড়লো। কি নির্মম! ছয় ফুট লম্বা মুকুল আজ আমার সামনে মাটির নিচে শুইয়ে আছে। না জানি ফেরেস্তাদের কি কি প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে? আল্লাহ মুকুলকে মাফ করে দিন। আমাকেও মাফ করে দিন। বিনিময়ে বেহেশত দান করুন যেন আমরা আবার একসাথে বেড়াতে পাড়ি আপনার প্রতিশ্রুত উদ্যানে। চলে এসেছি ময়মনসিংহে। আবার কাজে যোগ দিয়েছি। আপনারা আমাকে ব্যস্ত রেখেছেন। চারটি জার্নাল সম্পাদনা করছি। আপনারা আপনাদের সার্থে আমাকে চাপে রেখেছেন আপনাদের কাজটা আগে করে দেয়ার জন্য। বিকেলে চেম্বারে আমাকে চাপে রেখেছেন আপনাদের পরীক্ষার রিপোর্ট আগে দেয়ার জন্য। মুকুলের জন্য আমাকে কাদবারও সময় দেন না। আমার কান্না বাইরে থেকে দেখা যায় না। আমার মন খুব শক্ত। আমি মাকে রাতে কবর দিয়ে সকালে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি বোর্ডের। শত শোকেও আমি থেমে থাকার লোক না। যতদিন বেচে আছি আমি পৃথিবীর বুকে কিছু করে রেখে যেতে চাই আমার কর্মকে, আমার মনের কথাকে। তাই, শত শোকের মধ্যেও আমি কাজ করে যাই। বৃষ্টি কমে গেলে রাস্তার কাদা শুকালে আমি আবার বাড়ি যেতে চাই। মসজিদের কাজ শেষ করতে চাই। কবরের বাউন্ডারি ওয়াল করতে চাই। কাদা রাস্তায় কাউচি ফেলতে চাই। আল্লাহ যেন আমাকে মসজিদ ও পাকা রাস্তা দেখিয়ে দুনিয়া থেকে তুলে নেন।

বাড়ি গিয়ে পাড়াময় ঘুরে বেড়াবো আমার পিছে আর মুকুলকে পাবো না। নাপিতের চালায় গিয়ে দাড়াবো। মুকুলকে কাছে দেখবো না। বাব্বুর চালায় গিয়ে দাড়াবো মৌচাকটার কাছে। মুকুল ছোট বেলায় মনোভাইগ খুইংগা চাকের কামর খাওয়ার আলাপ আর করবে না। মসজিদে গিয়ে সুন্নত নামাজ পড়ে বসে থাকবো। হুজুর মুকেলে আসার পর কুদবা শুরু করবেন বলে অপেক্ষা করবেন। মুকুল আর আসবে না। মোটকথা প্রতিটি মুহুর্তে মুকুলকে মিস করতে হবে আমাকে।

২৩/১০/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


Interviews

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদারের সাথে সাক্ষাৎকারসমুহঃ

মেডিভয়েসের সাথে সাক্ষাৎকার: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ খ্রি.
Click Here

এনামুল হাসানের সাথে সাক্ষাৎকার ৯ অক্টোবর ২০২০ খ্রি.

Click Here

 

 

আমাদের অনেকেই বনসাই

আমাদের অনেকেই বনসাই

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বনসাই হলো এক ধরনের হটিকালচার শিল্প। শুরু হয়েছিল জাপান থেকে। এই পদ্ধতিতে বড় বড় জাতের গাছকে ছোট একটি টবে লাগিয়ে ডাল পালা ছেটে ছেটে টবের মধ্যে বেটে অথচ মোটা আকারে জীবিত রাখা হয়। গাছের কাণ্ডে তার পেঁচিয়ে বা বেঁধে এর বিভিন্ন আকৃতি দেয়া হয় সৌন্দর্যের জন্য। মোট কথা গাছটির সাভাবিক বৃদ্ধিকে সুকৌশলে নিয়ন্ত্রণ করে অল্প জায়গাতে ছোট একটি পাত্রে ছোট আকারে বেঁচে থাকতে দেয়া হয়। গাছেরও জীবন আছে। তাই বনসাই পদ্ধতিতে এই জীবের প্রতি অন্যায় করা হয়। যে গাছ পর্যাপ্ত পুষ্টি পেলে, কোন রকম বাঁধা না পেলে জমিনের উপর ৫০-৬০ ফুট উচু ও ২০-৩০ ফুট বিস্তৃত হতো সেই গাছকে বনসাই করে মানুষ মাত্র ২-৩ ফুট উচু ও ১-২ ফুট বিস্তৃত হতে দেয়। এই অবস্থায় গাছ ফুল ও ফলও দেয়।

 

আমার বাড়ির ২,৪০০ বর্গফুট ছাদের উপর একটি বাগান করেছি সখ করে। সেখানে ফুল, ফল ও সবজি আবাদ করি। দেখতেও ভালো লাগে, খেতেও ভালো লাগে। এটা একটি নির্মল আনন্দের খোরাক আমার। এর এক ত্রিতীয়াংশ ছাদ খালি রেখেছি। ১৬০০ বর্গফুট জায়গায় ১০০ টি ফল গাছ লাগিয়েছি, ১৫-১৬ টি ফুল গাছ লাগিয়েছি। সবজি বেডে অনেক রকম সবজি লাগাই। প্রায় ৪৯ রকমের সবজি চাষ করে খেয়েছি। প্রায় ৩২ রকমের ফল খেয়েছি এই বাগানের। নানা জাতের ফুল ফুটিয়েছি তাতে। গাছ লাগিয়েছি টবে। সভাবতই ছাদের উপর ওজন কম রাখতে এবং গাছের সীমিত খাবার বা পুষ্টি ঠিক রাখতে আমাকে গাছগুলোর ডাল পালা ছেটে ছোট রাখতে হয়। যে আম গাছ জমির উপর লাগালে ৫ হাজার আম ধরে সেই জাতের গাছই ছাদে মাত্র ৪০-৫০ টি আম দেয়। তাতেও খুশি আমরা। লক্ষ্য করে দেখুন, মনের অজান্তেই আমি আমার ছাদের গাছগুলোকে বনসাই করে রেখেছি। কি নিষ্ঠুর কাজ করছি আমি!

এতক্ষণ আমি গাছের বনসাইয়ের কথা বললাম। মানুষও বনসাই হয়। কি কারনে যেন আমার এক জুনিয়র কলিগ আমার জন্য দঃখ করে বললেন “স্যার, আপনি তো আমাদের কাছে একটি বট বৃক্ষ। আপনাকে বনসাই করে রাখা হয়েছে।” এই কথা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। আমি কি বট বৃক্ষের মতো বড় হতে পারতাম? আসলেই কি আমার ডালপালাগুলো ছেটে ফেলা হয়েছে? এখন এমন অনেক বনসাই মানুষ আমার চোখে পড়ে। এরা অল্প অল্প কিছু ফল দিয়ে যাচ্ছে। বড় হতে দিলে কত যে ফল দিতো! কিন্তু যারা ডালপালা ছেটে দেয় তারা বনসাই পেয়েই খুশি।

২১/১০/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


উদ্দেশ্য ভালো থাকলে সমস্যা হবে না

উদ্দেশ্য ভালো থাকলে সমস্যা হবে না
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
আজ থেকে প্রায় ২২ বছর আগের কথা। তখন ময়মনসিংহে কম্পিউটারের দোকান ছিলো না। ঢাকার কলাবাগানের সুপার কম্পিউটার শপ থেকে ১৯৯৮ সনে একটি ডেস্কটপ কম্পিউটার কিনেছিলাম। বই পড়ে মেডিকেলের ছাত্রদের জন্য কম্পিউটারে টাইপ করে ক্লাস নোট তৈরি করতাম। ট্রান্সপারেন্ট সীটে প্রিন্ট করে ওভারহেড প্রজেক্টরে ক্লাস নিতাম। এটাই ছিলো আমার কম্পিউটার কেনার আসল উদ্দেশ্য। কিছু কিছু বিষয় ড্র করে প্রেজেন্ট করতে হয়। কম্পিউটারে এটা আমার জন্য একটি সমস্যা ছিলো। আবুল মনসুর ভাই থেকে জানতে পেলাম স্ক্যানার নামে একটি কম্পিউটার ডিভাইস আছে, সেটা দিয়ে বইয়ের পাতা হুবহু ফটো আকারে কম্পিউটারে সেইভ করা যায়। এটাকেই স্ক্যান করা বলা হয়। আমি চলে গেলাম ঢাকায় এলিফ্যান্ট রোডের ইস্টার্ন প্লাজায় কম্পিউটারের দোকানে। ইতিমধ্যে ইস্টার্ন প্লাজায় অনেক কম্পিউটারের দোকান বসে গেছে। আমার মামাতো শ্যালক শিপনও ওখানে কম্পিউটারের দোকান দিয়েছিল। তার দোকানে স্ক্যানার ছিলো না। তাই আমাকে অন্য দোকানে নিয়ে গেলো। সেই দোকানের প্রোপাইটার ছিলেন একজন ইয়াং মেয়ে, শ্যালকদের বয়সের। শিপন আমাকে মেয়েটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে ভালো একটা স্ক্যানার দিতে বললো। আট হাজার টাকা দিয়ে একটি ক্যানন ব্রান্ডের স্ক্যানার কিনলাম। তখনকার আট হাজার এখনকার ৪০ হাজারের সমান হবে। ফেরার সময় মেয়েটিকে বললাম “কোন সমস্যা হবে না তো?” অনেকেই কোন যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ কেনার সময় এমন কথা জিজ্ঞেস করে থাকে। আমিও তাই করেছিলাম। উত্তরে দোকানিরা সাধারণত বলে “সমস্যা হবার কথা না। যদি হয়েই যায় তবে নিয়ে আসবেন। ঠিক করে দেবো।” অথবা বলে “এক বছরের ওয়ারেন্টি আছে।” কিন্তু মেয়েটি আমাকে তা না বলে বললেন “উদ্দেশ্য ভালো থাকলে সমস্যা হবে না।” কথাটি বেয়াদবির মতো মনে হলো। আমি আর কোন কথা না বলে স্ক্যানার নিয়ে চলে এলাম। বইয়ের ছবি স্ক্যান করে কম্পিউটার কম্পোজ করলাম আমার ক্লাস প্রেজেন্টেশন। কি মজা! আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন আমাদের স্যারগণ বইয়ের পাতা প্রজেক্ট করে পর্দায় ফেলতেন। আমিও স্যার হয়েছি। আমি বইয়ের পাতা প্রজেক্ট না করে স্ক্যান করে প্রথম দিকে ট্রান্সপারেন্ট পেপারে প্রিন্ট করে প্রোজেক্ট করতাম, পরে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন করে প্রোজেক্ট করতাম। এখনো সেই স্ক্যানার আছে আমার ড্রয়ারে। ভালোই আছে। কিন্তু প্রয়োজন পড়ে না। কোন কিছু স্ক্যান করতে হলে মোবাইলের সিম্পল স্ক্যানার (simple scanner) এপ দিয়ে স্ক্যান করে ফেলি নিমিষেই। আমার মৃত্যুর পর ঐ স্ক্যানারের স্থান কোথায় হবে জানি না।
একদিন মনসুর ভাইর চেম্বারে বসেছিলাম। ভাই বললেন “সাদেক ভাই, টাকা বানিয়ে দেখাবো?”
– কিভাবে?
– স্ক্যানার দিয়ে।
– দেখি।
তিনি একটি কাগজের এপিঠ-ওপিঠে ৫০০ টাকা নোট স্ক্যান করে প্রিন্ট দিয়ে অবিকল নকল নোট তৈরি করলেন। আমি দেখে আশ্চর্য হলাম। তিনি বললেন “ফান করলাম।” আমি মনসুর ভাইর কাছে বললাম “স্ক্যানার কেনার সময় বিক্রেতা মেয়েটি বলেছিলেন উদ্দেশ্য ভালো থাকলে সমস্যা হবে না। আমার মনে হয় তিনি টাকা বানানোর খারাপ উদ্দেশ্যর কথাই বুঝিয়েছেন।” তিনি বললেন “ঠিক তাই। কেউ কেউ এই কাজ করে।”
গতকাল টিভি নিউজে দেখলাম এক লোক ল্যাপটপ ও কালার প্রিন্টারের সাহায্যে ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোট প্রডাকশন করছে ভাড়া বাসায় বসে নিজের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। সারা দেশে এই নকল টাকা সরবরাহের জন্য ফিল্ড ওয়ার্কার রেখেছেন। তিনি দুইটি কম্পিউটার ব্যবহার করে প্রতিদিন ৫ লাখ টাকা প্রডাকশন করেন। ধরা পড়ে জেলও খেটেছেন। জেল হয় মাত্র দেড় বছর। দেখতে দেখতে দেড় বছর কেটে যায়। বর্তমানে তিনি জামিনে বের হয়েছেন। আবার প্রোডাকশনে নেমেছেন। কত সহজ ইনকাম! মাসে ২০-৩০ হাজার টাকা কামাই করার জন্য আমাদের প্রবাসী ভাইয়েরা বছরের পর বছর প্রবাসে কাটিয়ে দিলেন। শ্রমিক ভাইয়েরা অল্প বেতনে দেশের ইন্ডাস্ট্রিতে হাড়ভাংগা পরিশ্রম করে কোন রকমে সংসার চালিয়ে নিচ্ছেন। রিক্সা ওয়ালা ভাইয়েরা অল্প টাকার বিনিময়ে আমাদেরকে বয়ে বেড়াচ্ছেন। কি আর বলবো? আমার কথাই ধরুন। সকালে সরকারি চাকরি করে অল্প কিছু মাইনে পেলাম। বিকেল ও রাতটুকু বিশ্রাম ও উপভোগ না করে প্রাইভেট প্রাক্টিস করলাম। কি আর কামাই করলাম তাতে? আর ওরা অল্প পরিশ্রমে ঘরে বসে প্রতিদিন প্রডাকশন দিচ্ছে ৫ লাখ টাকা। ওদের উদ্দেশ্য ভালো না। ওরাই সমস্যায় পড়ছে ইহকালে। পরকালেও সমস্যা আছে ওদের। আর আমাদের উদ্দেশ্য ভালো। আমাদের সমস্যা নেই কোন কালেই, ইনশাআল্লাহ।
২০/১০/২০২০ খ্রি.
ময়মনসিংহ

বাসের ইঞ্জিন নষ্ট হলো

বাসের ইঞ্জিন নষ্ট হলো

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বাসে উঠে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা যাচ্ছিলাম। সিট নিয়েছিলাম সি লাইনের বাম পাশে করিডোরে। অর্থাৎ সি-২। আমি সবসময় সম্ভব হলে এই সিটের টিকিট করি। না পেলে পরের লাইনে। বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে সাধারণত ড্রাইভারের সামনের অংশে লেগে দোতরিইয়ে ড্রাইভার সহ পেছনের দুই তিন সিটের যাত্রী মারা যায়। বাম দিক সাধরনত কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জানালার সাথের সিট নেই না দুই কারনে। একটি কারন হলো বাস ওভারটেক করার সময় লেগে গেলে জানালার সাথের যাত্রী আঘাত প্রাপ্ত হতে পারে। আরেকটি কারণ হলো সামনের যাত্রী বমি করা শুরু করলে জানালা দিয়ে ছিটা ছিটা আসে। তাই করি ডোরের সাথের সিটে বসি।

যে কাজে যাচ্ছিলাম সে কাজের জন্য দুপুর ১২টার আগে অফিসে উপস্থিত হতে হবে। বাস সাভাবিক গতিতেই চলছিলো । তখন বাসে সামনের দিকের টিভি মনিটরে মিউজিক ভিডিও চলতো। যাত্রিরা ভিডিও দেখতে দেখতে ঢাকায় চলে যেতো। ড্রাইভার কুরুচির চরিত্রের হলে কুরুচিপূর্ণ ভিডিও চালাতো। যেসব যাত্রী ধার্মিক ছিলো তারা মাথা নিচু করে তাজবি জপতে জপতে জার্নি করতো। উঠতি বয়সের পোলাপানরা বেশ মজা করে উপভোগ করতো সেই ভিডিও। বাচ্চা পোলাপানরা ভিডিওর সিনগুলোকে মজার খেলা মনে করে দেখতো। মহিলারা লজ্জা পেয়ে মাথা অবনত করে থাকতেন। এমন অস্বস্তিকর ছিল সেই সময়ের জার্নি। আমি মাঝে মাঝে চোখ উচু করে দেখছিলাম কী দেখাচ্ছে। এক মহিলা যাত্রীকে বলতে শুনেছিলাম “দূর, খাইচ্চুইরা ব্যাডায় কি দেহাইতাছে?” আমার কাছেও মনে হলো ড্রাইভার বেটা একটা খাচ্চর। কন্ট্রাক্টরকে হাত ইশারায় ডেকে কাছে এনে শান্ত গলায় বললাম “এই যে টেলিভিশন মনিটরের পর্দায় তোমার ড্রাইভার যে ভিডিওগুলো দেখাচ্ছেন এগুলো কোন সেন্সর করা সিনেমা নাটকের দৃশ্য না। ফাজিল লোকেরা এগুলো বানিয়েছে। এই ড্রাইভারের মতো কুরুচিপূর্ণ মানুষ এগুলো দেখে। এই বাসের ৯০% যাত্রী এগুলো পছন্দ করেন না। হুজুর ও মহিলারা মাথা নিচু করে বসে আসে। বাচ্চারা খেলা মনে করে দেখছে। তোমার ড্রাইভারকে বলো এগুলো পালটিয়ে ভালো কিছু দেখাতে।” হঠাৎ হার্ড ব্রেক করে বাস থেমে গিয়ে বাম দিকে কাত হলো। অল্পতের জন্য খাদের গিয়ে পড়লো না। পাশের যাত্রী বলে উঠলো “লায়লাহা, লায়লাহা।” আমি শুধরিয়ে দিলাম “লায়লাহা না, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।” তিনি তখন বললেন “লা ইলাহা, লা ইলাহা।” আমি বললাম “আপনি শুধু লা ইলাহা বলছেন, যার অর্থ হচ্ছে ইলা (আল্লাহ) নাই। তার মানে, আপনি বলছেন আল্লাহ নাই। ইল্লাল্লাহ মানে আল্লাহ ছাড়া। আপনাকে পূর্ণ করে বলতে হবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া ইলা (মাবুদ) নাই।” কন্ট্রাক্টর আমার কথাগুলো ড্রাইভারের কাছে গিয়ে বললেন। ড্রাইভার ভিডিও বন্ধ করে ক্যাসেট ট্যাপ বাজানো শুরু করলেন। ফকিরি গান বাজানো শুরু হলো। “এ দেহ পিঞ্জরে বসাইয়া খোদারে, তার তরে করো প্রর্থনা…..।” গানের অর্থ বোধগম্য না হলেও সুরটা আমার ভালো লাগছিলো। এক ইয়াং যাত্রী চিতকার দিয়ে বলে উঠলো “এই ব্যাটা ড্রাইভার, ইগুলা কি হুনাইতাছো? বন্ধ করো।” ড্রাইভার গানের ক্যাসেট বন্ধ করে দিলেন। কিছুক্ষণ পর আবার ছেড়ে দিলেন অন্ধ হুজুরের ওয়াজ। হুজুর কিছুক্ষণ পর পর বাম কান চেপে ধরে চিতকার করে বলে উঠেন “এ্যাই। ” সেই চিতকারে কোন কোন যাত্রীও কান চেপে ধরে। গাজীপুর গজারি বনে এসে গাড়িটা থেমে গেলো। যাত্রীরা সমস্বরে বলে উঠলো “কি হলো, ড্রাইভার, থামলা কেন? আমাদের অফিস ধরতে হবে। তাড়াতাড়ি যাও।” ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেন। ইঞ্জিন “থ্যা ক, থেক, থেক থেক” বলে থেমে যায়। কিছুক্ষণ থ্যাক থ্যাক করে পুরা পুরি চুপ করে রইলো। গাড়ির লোকেরা মেশিন টুলস নিয়ে ইঞ্জিন মেরামত শুরু করলো। যাত্রীরা চিল্লাতে লাগলো –

“এই শালারা ছাড়ার সময় চেক করস নাই?”

“অফিস টাইম শেষ হইয়া যাইবো, অহন কিবা অইবো?”

এক মহিলা তার স্বামীকে ভর্তসনা করে “আমি প্রথমেই তোমাকে বলছিলাম এই গাড়ির টিকিট না করতে।” তার স্বামী উত্তর দেন “কেউ কি জানতো গাজীপুর এসে গাড়ি নষ্ট হবে?

এক যাত্রী ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বললেন ” গাড়ি ছাড়ার আগে ইঞ্জিন চেক করেন নাই?” ড্রাইভার বলেন “ইঞ্জিন তো চেক করেছি। ইঞ্জিন ভালোই ছিলো। ইঞ্জিন নষ্ট হলো এখন। কখন ইঞ্জিন নষ্ট হয় বলা যায় না। আপনারা শান্ত হয়ে বসুন। আমরা ঠান্ডা মাথায় কাজ করি। যাত্রিরা অস্থির, চেচামেচি করতেই থাকলো।” আমি নির্লিপ্ত বসে ছিলাম। কোন টেনশন করলাম না। আমারও কাজের টাইম শেষ হয়ে যাবে। করার কিছু নেই। আমি টেনশন করলেও যা হবে, না করলেও তাই হবে। বরং টেনশন করলে ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাবে। হার্ট ডিজিজ হবে। সর্বদা ঠান্ডা মেজাজে থাকাই ভালো। বরঞ্চ, এই সময়টা এঞ্জয় করা যাক। জানালা দিয়া দেখলাম সুন্দর গজারির বন। বনের পাশেই বাইদের জমিতে ক্ষেত ভর্তি আধাপাকা ধান। আস্তে করে সামনে গিয়ে ড্রাইভারকে বললাম “তাড়াহুড়ো করবেন না। ঠান্ডা মাথায় কাজ করুন। আমি নিচে নামলাম। সি-২ সিটে বসেছি। আমাকে রেখে চলে যাইয়েন না। ইঞ্জিন ঠিক হলে ডাক দিয়েন।”

গজারির বনে কিছুক্ষণ হাটলাম। টেওড়াকাটা গাছে ফুল ফুটেছিল। ভ্রমর বসেছিল তাতে। প্রজাপতিরা নেচে নেচে ফুলে ফুলে উড়াউড়ি করছিলো। নানা জাতের পাখির গানে মুখরিত ছিল সেই বন। বাইদের ধান ক্ষেতের বাতরে এসে দাড়ালাম। ক্ষেতের মাঝখানে একটি কঞ্চি গাড়া ছিলো। সেই কঞ্চিতে বসেছিলো এক ফেইচ্চা (ফিঙ্গে) পাখি। উড়ে গিয়ে ধান ক্ষেত থেকে ফড়িং ধরে এনে কঞ্চিতে বসে খাচ্ছিল। ক্ষেতের বাতরের এক পাশে জোড় কাটা ছিল। সেখানে একটা পানির জোড়া ছিলো। ওখানেও এক কঞ্চি গাড়া ছিলো। সেই কঞ্চিতে বসা ছিলো একটি সুন্দর মাছরাঙা পাখি। নষ্ট গাড়ি থেকে হর্নের আওয়াজ এলো। দ্রুত এসে সিটে বসলাম। যাত্রীরা চিতকার চেচামেচি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সবার অফিস টাইম ওভার হয়ে গেছে। সবাই তা নিয়ে আফসোস করছে। আমি ব্যাগ থেকে বই বের করে পড়তে পড়তে মহাখালী বাস টার্মিনালে পৌছলাম। অফিসে গিয়ে আমার কাজ হলো না। ফিরে এলাম বাস টার্মিনালে। ফেরিওয়ালা টসটসে পেয়ারা কুঁচি কুঁচি করে কেটে কাসুন্দি ও বিট লবণ মিশিয়ে কৌটার ভেতর ভরে হাতের তালুতে থাপথুপ করে বিক্রি করছিলো। খুব খেতে ইচ্ছে হলো। মেডিকেল কলেজের শিক্ষক হয়ে খোলা খাবার খাওয়া ঠিক না। ছাত্রদেরকে তাই শেখাই। কাজেই না খাওয়াই ভালো। কিন্তু মনে মানছিলো না। কাছে গেলাম। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলাম পরিচিত কেই নেই। অর্ডার দিলাম ১০ টাকার। আমার নির্দেশ মতো বোতলের পানি দিয়ে পেয়ারা ধুইয়ে পরিস্কার ছুড়ি দিয়ে কেটে বানিয়ে দিলো। বেঞ্চে বসে টুথ পিক দিয়ে গেথে গেথে মজা করে খেলাম। ফিরতি টিকিট করে ফিরে এলাম ময়মনসিংহ। ফেরার সময় ইঞ্জিন নষ্ট হয়নি। হলে নেমে এঞ্জয় করতাম।

১৪/১০/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ – ঢাকা জার্নি

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/