Click on Menu button if you are using mobile.
মোবাইল হলে Menu বাটনে ক্লিক করুন।

Welcome to website of Dr. Sadequel Islam Talukder


Dr. Md. Sadequel Islam Talukder
MBBS, M Phil (Pathology), MACP
Associate Professor and Head [PRL]
Department of Pathology
Mymensingh Medical College
Mymensingh Bangladesh
.

 

Send your comment to: sadequel@yahoo.com

আজিরন

আজিরন

(সংগৃহিত হাস্তর ও গীত)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

[আমাদের সখিপুরের গ্রাম এলাকায় ছোটবেলা লোক মুখে কিছু গল্প শুনতাম। সেগুলোকে বলা হতো হাস্তর। সুর করে কিছু কবিতা ও গান গাওয়া হতো। সেগুলোকে বলা হতো গীত। আমি সেসব হাস্তর বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি গল্পাকারে আমার মতো করে। এসবের ভেতর দিয়ে আগের দিনের গ্রামবাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশ পাবে বলে আমি মনে করি। এই লেখাটি তারই একটি অংশ]

 

জিগিরনের হাস্তর শেষ হবার পর ময়ফল বললো, আমি এইডার পরে আজিরনের হাস্তর কমু। তার আগে আম্বাতন গীত গাবো। এই আম্বাতন, তর গীত মনে অইছে? আম্বাতন বললো

– আহারে! আংগ পাড়ার আজিরনের মেয়াডা জয়না গাছের ডাইলে ফাস দিয়া মইরা গেছে। মেয়াডা কী খপছুরত আছিলো! মেয়াডা মইরা গেলো।

– হেডার জানি কুনু বিয়া অইছাল?

– হাবলা পাড়ায় বিয়া অইছাল। অনেক দুরাপি। তার হশুরডা খুব হারামজাদা আছাল। হউরিডাও আছাল জাউরা। জামাইডা খালি মায়ের কান কথা হোনত। জামাইডা খালি ছেড়িডারে আইল্যা পাজুন দিয়া বাইরাইত। আজিরনের বাপের কাছে খালি টেহা পয়সা চাইত। ছেড়িডারে বাপের বাড়ি আইতে দিত না বেশী। ছেড়িডার বাপে কত কানত। গামছা দিয়া খালি চোউখ মুছত। মেয়াডা বিলাপ কইরা বাপেরে হুনাইয়া হুনাইয়া কইত

কত ভা ~ ত খাইছিলাম বাপজান, দূরে দিছালা বিয়া,

এহন ক্যানে কানছ গ বাপজান, চৌখে গামছা দিয়া?

আহারে, ছেড়িডা ফাস দিয়া ঝুইল্যা আছাল জয়না গাছের ডাইলে। এতানি জিবলা বাইরই আছাল। বড় বড় চোউক কইরা চাইয়া আছাল। মনে অইয়া ডর করতাছে। দেইখা মাইনষে ছেড়িডারে কিবা বকাঝকা করলো গ ! কয় কী, ছেড়িডা মইরা নিহি ভুত অইয়া যাবো। ছেড়িডারে নামাইয়া আইন্যা চাপড়া মাটি দিয়া ফালাইছে উত্তরমুরা জোংগলে। ভুতের ডরে অহন উমমুরা কেউ যায় না।

– এই ছেড়ি, এত রাইত কইরা ভুতের পেঁচাল পারতাছস? ডর করতাছে। আমি চাইছিলাম আজিরনের হাস্তর কইতে। ও কওন নাগল আজিরনের মেয়ার হাস্তর।

এমন সময় ঘরের ভেতর একটা বিশ্রী দুর্ঘন্ধযুক্ত বায়ুর উপস্তিতি সবার নাকে অনুভত হলো। গেন্দুর নানী শাশুড়ী বললেন, ক্যারা জানি ডরের চোটে পেটের বাতাস ছাইড়া দিছে। কুচ্চুইরা গোন্ধ ছোটছে। ঘরডা এহেবারে জ্বালাইয়া ফালাইছে। ওয়া, ওয়া। বিছুন দিয়া বাতাস করো। দুয়ার জানলা খুইলা দেও। আমি আর থাকবার পারলাম না। একটু বাইরে গেলাম। আত-মোক ধুইয়া আবার আইতাছি। আজিরনের হাস্তর হুনমুনি আইয়া।

বাইরে থেকে ফিরে এসে নানী বললেন,

– তোমগো বাওবেড়ার পিছন দিক দিয়া কী জানি দৌড়াইয়া গেলো। আন্ধাইরের ভিতর দিয়া ভালা বুঝা গেলো না। আমি অচম্বিতি চইমকা উঠছিলাম। মোনে অইল ওডা হেওজা। শৈলে কাটা কাটা মনে অইল।

– অইতে পারে। আংগ বাড়ির কাছে ঝোপের ভিতর দুইডা গেওজা থাহে। মইদ্যে মইদ্যে ঘরের পাছের মোতখাইরে হেওজার কাটা পইরা থাকে। নানী হোইন। অহন গোন্দ নাই।

– অবা কাম কেউ আর করবা না। ক্যারা জানি গীত গাবার চাইছিলা? গীত গাও।

আম্বাতন গীত ধরলো-

ঘরের পাছে নাড়ার পালা,

মোনে উঠে নানান জ্বালা।

ঘরের হাইনচায় কলি বাগুন,

মনে জ্বলে নানান আগুন।

আউস কইরা কিনলাম বৈয়ম,

বৈয়ম ভাংলাম বাপের বাড়ি।

নিজের যুদি স্বোয়ামী থাকত,

বৈয়ম থিগা মিঠাই খাইত।

পরাণ কানছে রে বিয়া ববার নিগা।

আউস কইরা কিনলাম থালি,

থালি ভাংলাম বাপের বাড়ি,

নিজের যুদি স্বোয়ামী থাকত,

থালি ভইরা ভাত খাইত।

পরাণ কানছে রে বিয়া ববার নিগা।

আউস কইরা কিনলাম গেলাস,

গেলাস ভাংলাম বাপের বাড়ি।

নিজের যুদি স্বোয়ামী থাকত,

গেলাস ভইরা পানি খাইত,

পরাণ কানছে রে বিয়া ববার নিগা।।

ময়ফল বললো,

– এই আম্বাতন, তুই খালি স্বোয়ামীর গীত গাস ক্যান। আসলে তোর অহন ভাতারের বাইত্যে যাওয়ের ইচ্ছা অইছে। কাক্কুরে কওন নাগব তোরে বিয়া দিবার জন্য।

– এবা কইরা কতা কইলে গীত গাওন যাবো? আমি গীত গাবার পামু না। তুই আজিরনের হাস্তর ক।

– হোন তাইলে।

আজিরনের চেহারা ছিলো খপছুরুতের। হে আছাল দীগলা। তার জামাইডা আছাল খাট্টা। খাট্টা অইলে কি অব বেডা বড় খাইচ্চুইরা আছাল। কতায় করায় আজিরনের গতরে আত তুলত। মইদ্যে মইদ্যে আইল্যা পাজুন দিয়া বউরে বাইরাইত। জামাইর নাম আছাল আলী। আলীর মাও জাউরা আছাল। হেও আজিরনের উপুর আত তোলত। এই জন্যে পাড়ার পোলাপান ছিলকি বানাইছাল, নাইল্যা ক্ষেতে বেজির ছাও, বউ কিলাইন্যা আলীর মাও। আজিরনের হশুরডাও হারামজাদা আছাল। আজিরন কতা কইত মিলাইয়া মিলাইয়া।

– কিবা কইরা কইত?

– মিলাইয়া মিলাইয়া। একবার একটা কাইতান্যা দিনে আজিরন রান্ধন ঘরে আইসাল পাড়ে বইয়া আগুন তাপাইতাছাল। আজিরনের হশুর বইয়া আছাল বড় ঘরের ওশারে। রান্ধন ঘরে থনে কয়েকটা শব্দ পাইল আজিরনের হশুরে।

বৌরে হইছ করলো – বৌ ফোট্টে কী?

আজিরন কইল – কাঠঠলের বিচি।

হশুরে কইল – আনছে বৌ খাই।

আজিরন কইল – পুইড়া অইছে ছাই।

হশুর আজিরনের হউড়িরে কইল, দেহছে রান্ধন ঘরে ঠাস ঠুস শব্দ অয় কোন থিগা। বউরে হইছ করলাম, কইল কাঠলের বিচি ফোঠে। আনবার কইলে কয় যে পুইড়া গেছেগা। হউড়ি রান্ধন ঘরে গিয়া দেখলো কাঠলের বিচির নাম গোন্ধও নাই। আছে দুর্গোন্ধ। কিয়ের গোন্ধ তাও বুইজা ফালাইল হউড়ি। বৌইয়ের চালাকির কতা হশুরেরে কইয়া দিল। হশুর রাগ কইরা বইশুইদ্ধা পোলারে ভিনো কইরা দিল। আজিরনেরা পশ্চিমমুরা চালায় গিয়া নয়া বাড়ি বানাইল।

আজিরনেরা নয়া বাইত্যে ভালাই আছাল। অচমবিতি একদিন আজিরনের জামাই আজিরনরে আইল্যা পাজুন দিয়া থরা দিছিল ভাত রান্ধন অইতে একটু দেরি অইছাল দেইখ্যা। থরা খাবার পর আজিরন রাগ কইরা ততা ভাতের মইদ্যে পানি দিয়া রান্ধন ঘরের ছিকায় রাইখা হুইয়া রইলো। এবা কইরা তিন দিন গেলো, আজিরন জামাইর নগে রাগ কইরা কথা কয় না। আজিরনের পোলাইপান ছোলাইপান আছাল না। তাই বাড়িডা এহেবারে নিঝঝুম মাইরা গেছাল। হেদিন আছাল হুনিবার। হুনিবার- মোঙ্গলবারে চাপড়া বিল বাইয়া সবাই মাছ মারত। হেদিন ধল পহরের সোময় থিগা আশ পাশের গেরামের শয় শয় মানুষ চাপড়া বিলের বাওয়ার মাছ মারতে যাইতাছাল। বিলে যত বেশি মানুষ নামবো মাছও তত বেশী গাবাবো। তাই ডাকাডাকি পাইরা সবাই মাছেরে যাইতো। অনেকেই শিংগা ফুয়াইয়া ডাকতো ভো ভো কইরা। বড় বড় মইষের শিংগা হেগনা। দুই তিন মাইল দূর থিগা হেই শিংগার আওজ হোনা যাইতো। আজিরনের জামাই রান্ধন ঘরের ডেহির উপুর বইয়া উক্কা খাইতাছাল। আজিরন চিন্তা করলো ভালা অউক মোন্দ অউক স্বোয়ামীই ত মারছে। রাগ কইরা থাকলে নিজেগ সোংসারেরই নোকসান। তাই সোজাসুজি কতা না কইয়া বেহা কইরা কতা কইতে নাগল।

আজিরন জামাইরে হুনাইয়া হুনাইয়া কইল-

ভ্যা বাজে, ভো বাজে, বাওয়ায় ক্যানে যায় না?

জামাইয়ে কইল –

তিন দিন ধইরা খাই না ভাত

ক্যামনে মারমু বাওয়ার মাছ?

আজিরন কইল –

সিকার উপুর পান্তাভাত পাইরা ক্যানে খায় না।

জামাই আজিরনের থনে খাটা আছাল। ছিকার ভাতের ভুরকা নগুল পাইল না। তাই কইল-

কেই দিলগা কেউ খাটা নগুল ত পাই না।

আজিরন কইল-

ফিড়ার উপর ফিড়া থুইয়া পাইরা ক্যানে খায় না।

জামাই ফিড়ার উপুর ফিড়া রাখার পর দেহে যে ফিরা থুকুরবুকুর নড়ে। তহন কয়-

ফিড়া নরে টাকুর টুকুর,

পইড়া যুদি মরি!

আজিরন কয়-

আগে ক্যানে জানছিল না মর্দা মাগি ধইরা থরি?

এটুকু শোনার পর আম্বাতন বললো,

– আসলে যারা বৌরে ধইরা থরা দেয় তারা মর্দা মানুষ না। তারা অইল মাইগ্যা মানুষ।

শুনে ময়ফল বললো,

– তরে মাইগ্যা মাইনষের কাছেই বিয়া দিওন নাগব। যাতে তরে থরে।

– অবা মাইনষের কাছে বিয়াই বমু না।

– তর কাছে হুইন্যা কি তরে বিয়া দিবো? কাক্কু যার নগে তর বিয়া ঠিক করে তার কাছেই কবুল কইতে অইবো। বাদ দে। অহন হাস্তর হোন।

ফিড়ার উপর ফিড়া বহাইয়া তার উপর খারইয়া কাপতে কাপতে আজিরনের জামাই সিকার উপর থনে পান্তাভাত নামাইয়া এক নলা মুখে দিয়া দেহে যে পাইছা। খুটির থনে নুন নিতে গিয়া দেহে নুনের মইধ্যে পানি উঠছে। হেইজন্যে আইসাল পাড়ে দিয়া রাখলো হুকানোর। নুন হুকাইয়া যেসুম গটগটা শক্ত অইয়া গেছে হেসুম নুন খুটির থনে আর তুলতে পারে না। হেসুম জামাই কয়-

গটগটা গট।

আজিরন কয়-

নাহইর কাঠি ল নাহইর কাঠি।

জামাই নাহইর দিয়া ঘইষা নুন তুইলা পান্তাভাত খাইয়া চাক জাল কান্দে নইয়া বিয়ান বেলা বাওয়ার মাছ মারতে গেলো। হারাদিন পরে বিয়ালপারা ইয়া বড় একটা আইড় মাছ নিয়া বাইত্যে আইলো। আজিরন দেইখ্যা খুশী অইয়া জামাইর কান্দে থিকা মাছ নামাইয়া নিলো। এতো বড় একটা আইড় মাছ।

জয়তনের নানী বললেন, হাস্তরডা ভালাই নাগলো। গলা হুকাই গেছে। পানি তুলাস নাগছে। দোয়াত ধরাও। ময়ফল বললো, নানী, জিয়াবাতি আনি নাই। দোয়াত ধরামু কী দিয়া। দোয়াতে মনে অয় কেরাইস তেলও নাই।

২৪/১/২০২১ খ্রি.

Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/




জিগিরন

জিগিরন

(সংগৃহিত হাস্তর ও গীত)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

[আমাদের সখিপুরের গ্রাম এলাকায় ছোটবেলা লোক মুখে কিছু গল্প শুনতাম। সেগুলোকে বলা হতো হাস্তর। সুর করে কিছু কবিতা ও গান গাওয়া হতো। সেগুলোকে বলা হতো গীত। আমি সেসব হাস্তর বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি গল্পাকারে আমার মতো করে। এসবের ভেতর দিয়ে আগের দিনের গ্রামবাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশ পাবে বলে আমি মনে করি। এই লেখাটি তারই একটি অংশ]

 

নাক কাটার হাস্তর শুনার পর নানী বললেন, হাস্তরডা খুব ভালা অইছে। কিছুক্ষণ পর নানী একটা হাই তুললেন। ময়ফল বললো, নানী, অবা আম নিয়াস পারতাছুন ক্যা, ঘুম আইতাছে নিহি? নানী বললেন, ব্যাল ঘুম আইছিলাম। কও আরও হাস্তর কও। আম্বাতন বললো, তার আগে আমার গীত হুনুন। নানী বললেন, গাও তুমি গাও।

বাইর বাড়ি করাতি,

দুধের আওটা চড়াইছি।

দুধ থুইছি জুরাইয়া

কলা থুইছি এরাইইয়া

আমার বাবা খাবরে সাইকল দৌড়াইইয়া।…

 

তারপর জানি কি? মন নাই, আরেকটা গাই।

 

জাংলা তলে খারই রইছি দুলাভাই আইতাছে।

অ দুলাভাই দুলাভাই গ, বুবু কিবা আছে গ?

তোমার বুবুর কান্দনে, নদীর কূল ভাংগনে।

জাংলা তলে খারই রইছি ভাই আইতাছে।

অ ভাই ভাই গ, ভাবী কিবা আছে গ?

তোমার ভাবীর কান্দনে, নদীর কূল ভাংগনে।

জাংলা তলে খারই রইছি খালু আইতাছে,

অ খালু খালু গ, খালা কিবা আছে গ?

তোমার খালার কান্দনে, নদীর কূল ভাংগনে।

জাংলা তলে খারই রইছি, ফুবা আইতাছে।

অ ফুবা ফুবা গ, ফুবু কিবা আছে গ?

তোমার ফুবুর কান্দনে, নদীর কূল ভাংগনে।

জাংলা তলে খারই রইছি বাজান আইতাছে।

অ বাজান বাজান গ, মাইয়া কিবা আছে গ?

তোমার মায়ের কান্দনে, নদীর কূল ভাংগনে।।

 

এতটা গাওয়ার পর ময়ফল বললো, এই ছেড়ি, তুই এবা কইরা গীত গাইলে ত হারা রাইতেও তর গীত গাওয়া হেষ অবো না। তোর আত্মিয়স্বজন, ভাই বেরাদর আইতেই থাকপ। তুই গীত গাইতেই থাকপি। এইডা বাদ দিয়া আরেকটা গা। আম্বাতন বললো, তাইলে এইডা গাই-

আতে দিছি মেন্দি, পায়ে দিছি আলতা।

দেহুন ছে গ দুলাভাই কিবা দেহা যায়।।

হাতে দিছি মেন্দি, পায়ে দিছি আলতা।

দেহুন ছে গ মিয়া ভাই কিবা দেহা যায়।

– আবারও তুই একই কতা বারবার কইতাছস?

– এবা কইরাই ত গীত গাইতে অয়।

– ভালা দেইখ্যা একটা গা।

– মেসি দিলে ঝিক ঝিক করে,

সুরমা দিলে চিক চিক করে।

– আংগ নাহার বু দাঁতে মেসি দেয়, কিবা ঝিক ঝিক করে। তাই না?

– নাহার বুর জামাই চোখে সুরমা নাগায়। কিবা চিক চিক করে। তাই না?

– মাইনষের জামাইর আলাপ না কইরা তুই গীত গা।

– তুই হাস্তর ক। আমি গীত মনে কইরা নই। অনেকদিন ধইরা গীত গাইনা ত। এই, জিগিরনের হাস্তরডা ক।

এক দেশে আছাল এক রাজা। রাজার বউয়ের নাম আছাল জিগিরন। জিগিরনের পোলাইপান অইত না। তাই রাজারে বেক্কে আটকুরা কইত। রাজায় একরাইতে স্বপ্নে দেখলো এক দরবেশ কইতাছে, তুই যুদি বিরাট একটা পুস্কুনি খোদস তাইলে তর বউয়ের সোন্তান অব। রাজায় তাই বিরাট কইরা একটা পুস্কুনি খোদলো। জিগিরনের পেটে একটা মেয়া সন্তান আইল। মেয়া অইলে রাজা খুব খুশী অইল। অনেক গাতা কইরা পুস্কুনি খোদলো তারপরেও পুস্কুনিতে পানি উঠল না। তাই রাজার মন খারাপ অইলো। রাজায় আবার স্বপনে দেখলো দরবেশ কইতাছে, জিগিরনেরে গয়নাগাটি পরাইয়া পুস্কুনির মধ্যেহানে খারা কইরা রাখলে পুস্কুনিতে পানি উঠপ। রাজায় তাই করলো। জিগিরনের সারা শইলে গয়না পরাইয়া পুস্কুনির মধ্যেহানে খারা কইরা রাখল। আর রাজায় পুস্কুনির পারে খারই রইল। জিগিরনের পায়ের তল দিয়া ঝিরঝিরাইয়া পানি বাইরন শুরু অইল।

যেই নিহি জিগিরনের খারু পানি অইল, পায়ের গোলখারুডা খুইল্যা রাজার দিকে মেইল্যা মাইরা কইল, এই দিয়া পতি তুমি আরেক বিয়া কইরো। জিগিরনের ময়াদয়া ছাইড়া দিও।

যেই নিহি জিগিরনের কোমর হোমান পানি অইল। কোমরের বিছা খুইল্যা রাজার মুহি মেইল্যা মাইরা কইল, এই দিয়া পতি তুমি আরেক বিয়া কইরো। জিগিরনের ময়াদয়া ছাইড়া দিও।

যেই নিহি জিগিরনের গলা পর্যন্ত পানি অইল, গলার আরডা থুইল মেইল্যা মাইরা জিগিরন কইল, এই দিয়া পতি তুমি আরেক বিয়া কইরো। জিগিরনের ময়াদয়া ছাইড়া দিও।

যেই নিহি জিগিরনের কান পর্যন্ত পানি উডলো, কানের মাড়কি খুইলা মেইল্যা মাইরা কইল, এই দিয়া পতি তুমি আরেক বিয়া কইরো।

যেই নিহি জিগিরনের নাক পর্যন্ত পানি অইল জিগিরন আতের বালা, বাজু আর নাকের নোথ খুইল্যা মেইল্যা মাইরা কইল, এই দিয়া পতি তুমি আরেক বিয়া কইরো। জিগিরনের ময়াদয়া ছাইড়া দিও। এই কতা কোওয়ার পর জিগিরন ডুইব্যা গেলো পুস্কুনির পানিতে। পানি উইঠ্যা পুস্কুনি ভইরা গেলো।

এমমুরা দিয়া জিগিরনকে না পাইয়া জিগিরনের গেন্দি মেয়াডা দুধ খাওনের নিগা ধাওয়া কান্দন শুরু কইরা দিল। হারাদিন হারারাইত কান্দিল। কানতে কানতে মেয়াডা খালি পুস্কুনির মুহি আংগুল দেহাইল। রাজায় মেয়াডারে কোলে নিয়া পুস্কুনির পাড়ের গেলো। মেয়াডার কান্দন হুইন্যা জিগিরন পানিত থিগা মাথা বাইর করলো। রাজায় দেখল যে জিগিরন রাজার মুহি চাইয়াও দেহে না। আবার মেয়াডার দিকে ময়া কইরা চাইয়া থাহে। রাজায় একসুম মেয়াডারে পুস্কুনির পাড়ে বহাইয়া একটু দূরে গিয়া পিতরাজ গাছের পাছে পলাইয়া রইল। দেহে, জিগিরন পানিত থিগা উইঠা আইয়া মেয়াডারে বুকের দুধ খাওয়াইয়া আবার ডুব দিয়া চইল্যা গেলো। রাজায় কয়দিন এবা কইরা মেয়াডারে দুধ খাওয়াইয়া বাচাইয়া রাখলো। একদিন রাজায় একটা চালাকি করলো। জিগিরন যেসুম মেয়ারে দুধ খাওয়ার নবো, হেসুম ঝাহিজাল ফালাইয়া আটকাইয়া ফালাব। ঠিক তাই। যেই জিগিরন দুধ খাওয়ান শুরু করলো হেসুম রাজায় ঝাকিজাল ফালাইল জিগিরনের উপুর। জিগিরন জাল ছিড়ড়া ছুইট্টা গিয়া এই যে ডুব দিলো আর কোন্দিন মেয়াডারে দুধ খাওয়াইতে আইল না।

নানী ঘুমাই পরছুন?

– না, ঘুমাই নাই। হোন্তাছি। ভালাই নাগতাছে। আরেকটা কও।

২১/১/২৯২১ খ্রি.

সৌজন্যে – হাসনা ভানু বুবু, সালমা বুবু ও আজহার ভাই।

Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/




নাক কাটা

নাক কাটা

(হাস্তর ও গীত)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

[আমাদের সখিপুরের গ্রাম এলাকায় ছোটবেলা লোক মুখে কিছু গল্প ও গান শুনতাম। সেগুলোকে বলা হতো যথাক্রমে হাস্তর ও গীত। আমি সেসব হাস্তর ও গীত বন্ধুদের সহযোগিতায় সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি আমার মতো করে। হাস্তর ও গীতের ভেতর দিয়ে আগের দিনের গ্রামবাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশ পাবে বলে আমি মনে করি। এই লেখাটি তারই একটি অংশ]

 

গেন্দুর বিয়ের রাতে নায়রিদের সাথে শুয়ে শুয়ে গেন্দুর ছোট বোন ময়ফল হাস্তর বলছিলো কাক ও চড়ুই পাখির। শুনে গেন্দুর নানীশাশুড়ী বললেন, খুব ভালা অইছে। অহন আরেকটা হুনাও। ময়ফল বললো, তার আগে আম্বাতন একটা গীত হুনাইয়া দেইক। নানী বললেন, হ, আগে একটা গীত হুনাও। আম্বাতন গীত গাইল।

ঘরে গেছিলাম পান খাবার

জায়ে ছক্কল ধরলো ল

জায়ে ছক্কল ধরলো।।

জায়ের জালায় রান্ধন ঘরে গেছিলাম

পিড়পায় ছাইক্কা ধরলো ল

পিড়পায় ছাইক্কা ধরলো।।

পিড়পার জ্বালায় ঘরের পাছে গেছিলাম

চেল্লায় ঠোক্কর মারলো ল

চেল্লায় ঠোক্কর মারলো।।

চেল্লার জ্বালায় পাট ক্ষেতে গেছিলাম

হিয়ালে ছপ্পন ধরলো ল

হিয়ালে ছপ্পন ধরলো।।

হিয়ালের জালায় গাছে উঠলাম

কাউয়ায় গলগল করল ল

কাউয়ায় গলগল করলো।।

 

এই পর্যন্ত গীত গাওয়ার পর ময়ফল বললো, এই ছেড়ি, এবা কইরা গীত গাইলে তর গীত হারা রাইতেও শেষ অবোনা। তুই এহন চুপ কর। আমার হাস্তর হোন।

এক গেরামের এক বেটা বরুই গাছে উঠছাল বরুই পারবার। মাথার উপুর একটা লাল টুকটুকা চিনিখোট বরুই দেইখা যেই ছুইছে অবাই বোটা থিগা বরুই খইয়া পইরা বেটার নাক দিয়া ঢুইকা নাকের আইড়া কোনায় আইটকা গেছে। বেটা হোমানে নাকে বাদা পারতাছাল। কিন্তুক বরুইডা আর বাইরল না। গাছের নিচ দিয়া যাইতাছাল একটা নাপিত। বেটা নাপিতেরে কইল, দাদা, তোমার খুর দিয়া আমার নাকের বরুইডা বাইর কইরা দেওচে একটু। নাপিত খুর দিয়া বরুই বাইর করনের সুম বেটার নাক কাইটা ফালাইল। লাইগা গেলো একটা কেওয়াস। বেটা নাপিতরে কইল, অয় আমার নাক দিবি, নয় তোর খুর দিবি। নাপিত না পাইরা খুর দিয়া গেলোগা। বেটায় খুর নিয়া রাস্তা দিয়া যাইতাছাল। রাস্তায় দেখল একটা কুমার আতের আঙ্গুল দিয়া মাটি তুলতাছে মাটির পাক পাইল্যা বানানোর নিগা। বেটার আতে খুর দেইখ্যা কইল, তোমার আতের খুরডা দেও কিছু মাটি কাইটা তুলি। বেটায় তারে খুর দিলো। মাটি কাটার সুম মট্টশ কইরা খুরডা ভাইঙ্গা গেলোগা। বেটায় কইল, অয় আমার খুর দেও, নইলে তোমার মাটির দোনা দেও। না পাইরা কুমারে দোনা দিয়া দিল। বেটা দোনা নিয়া আইটা যাইতাছাল। দেহে এক বেটা কচুর পাতার মুদে গাই পানাইতাছে। দোনা দেইখা কইল যে তোমার দোনাডা দেও একটু গাই পানাই। বেটায় যেসুম দোনার মইদে গাই পানাইতে নিছে অবাই গাই নাথি দিয়া দোনা ভাইংগা ফালাইছে। অহন বেটায় কয়, অয় আমার দোনা দিবা নয় তোমার গাই বাছুর দিবা। শেষে তারে গাই বাছুর দিয়াই বিদায় করল। বেটাডা গাই বাছুর নিয়া পথ দিয়া যাইতাছাল। দেহে, এক বেটা আল বাইতাছে। জোয়ালের একমুরা একটা গরু জোরছে আরেকমুরা জোরছে বেটার বউরে। নাক কাটা বেটায় কইল, কী মিয়া, গরুর জোয়াল বউয়ের কান্দে জোরছ? আইল্যা বেটা কইল, গরু আমার মাত্র একটা। তোমার গরুডা দেও, আলে জুরি। হের জন্য আমার বউডা নিয়া যাও। নাক কাটা বেটা গরু দিয়া বউ পাইল। পথ দিয়া বউ নিয়া আইটা যাইতাছাল। এক বেটা দুতী পইরা ঢোল বাজাইয়া নাচতে বাচতে আইতাছাল। দেইখা তার ঢোল নিবার খুব ইচ্ছা অইল। কইল, আমার বউডা নিয়া তোমার ঢোলডা দেও। আমি বাজাইতে বাজাইতে যাই। ঢুলি রাজী অইল। ঢোল দিয়া বউ নিয়া গেলো।

নাক কাটা বেটা নাইচা নাইচা ঢোল বাজাইয়া বাজাইয়া গাহান গাইয়া যাইতাছাল এই কইয়া-

নাক দিয়া পাইলাম খুর,

খুর দিয়া পাইলাম দোনা,

দোনা দিয়া পাইলাম গাই,

গাই দিয়া পাইলাম বউ,

বউ দিয়া পাইলাম ঢোল।।

ডুম ডুমা ডুম ডুম,

ডুম, ডুমা, ডুম, ডুম।।

বেটায় চোউক মুইঞ্জা নাচতে নাচতে যাইতাছাল। পথের নগেই আছাল একটা আন্ধা কুয়া। নাচতে নাচতে গিয়া পড়লো হেই কুয়ায়।

২০/১/২০২১ খ্রি.

ময়মনসিংহ

সৌজন্যেঃ সোনা ভানু বুঝি ও সালমা বুবু।

 
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/




কাক ও চড়ুই

কাক ও চড়ুই

(হাস্তর)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

[আমাদের সখিপুরের গ্রাম এলাকায় ছোটবেলা লোক মুখে কিছু গল্প শুনতাম। সেগুলোকে বলা হতো হাস্তর। আমি সেসব হাস্তর বন্ধুদের সহযোগিতায় সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি আমার মতো করে। হাস্তরের ভেতর দিয়ে আগের দিনের গ্রামবাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশ পাবে বলে আমি মনে করি। এই লেখাটি তারই একটি অংশ]

গেন্দু ও গেন্দুর বউকে বাসর ঘরে রেখে প্রায় সবাই রাতের খাবার খেয়ে শুতে গেলো। বাড়ি ভর্তি নাইয়রি। গেন্দুর মা সবাইকে গোছিয়ে বিভিন্ন ঘরে শোবার ব্যবস্থা করলেন। গেন্দুর বাবা উঠানে টুলে বসে হুকা টানতে টানতে তার নিজের বিয়ের স্মৃতিচারণ, গেন্দুর জন্ম হওয়ার স্মৃতিচারণ এবং আরও বিভিন্ন বিষয়ে স্মৃতিচারণ করতে লাগলেন। পূবের চৌহদ্দির ঘরে সব নাইয়রির শোবার ব্যাবস্থা হলো। বড়রা চৌকির উপর শুইলেন। ছোটরা মেজেতে ঢালাই বিছানায় শুইল। গেন্দুর ছোট বোন ময়ফল, গেন্দুর চাচাতো বোন আম্বাতন, গেন্দুর শ্যালিকা জয়তন নিচের ঢালাই বিছানায় শুলো। গেন্দুর নানীশাশুড়ী শুলো চৌকির উপর। তার সাথে গেন্দুর দাদীও শুলো। ঘরে কুপি বাতি জ্বালানো ছিলো। গেন্দুর নানীশাশুড়ী বললেন “দোয়াতটা নিবাইয়া দেও। দোয়াত জ্বালাইন্যা থাকলে আমার ঘুম আহে না।” ময়ফল কুপিবাতি নিভিয়ে দিল। ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। ময়ফল বললো “নানী, ঘর না আন্ধআইর অইয়া গেল?”

– অইক আন্ধাইর। আমরা ত ঘুমাইয়াই থাকমু।

– নানী, বিয়া বাড়িতে নাইয়রিরা কেউ ঘুমায় না।

– তে কী করে?

– হাস্তর কয়, গীত গায়।

– তে হাস্তর কও।

– নানী, আপ্নেই হাস্তর কইন। আংগ আম্বাতন গীত জানে। অইতি গীত গাবো।

– আমি অনেক হাস্তর জানি। আগে তোমরা হাস্তর কও। তোমগ গুনা হোনার পর আমার হাস্তর হুনামু।

– তে কোনডা কমু?

– কইতে থাহ একটা একটা কইরা।

আম্বাতন বললো “এই ছেড়ি, অস্তে কতা ক। কাক্কু উঠানে বইয়া গুড়্গুড়াই উক্কা খাইতাছে। বকা দিব।”

– অস্তেই কইতাছি। তাইলে আগে আমি কাউয়া আর চড়ুই পক্কির হাস্তর কই। সবাই চুপ কইরা হুনুন।

– এই মশায় ধরতাছে। কাক্কু, আংগ ঘরে একটা বুন্দা ধরাই দিয়া যাইন। মশায় খাইতাছে।

– এক বাইত্যে এক গিরস্তের মেয়ায় বাইরবাড়ির উঠানে ধান নাড়তো কাঠল গাছের ছেয়ায় বইয়া। আতে একটা কোটা নিয়া বইতো কুরকা খেদাবার নিগা। মধ্যে মধ্যে একটা কাউয়া আর একটা চড়ুই আইয়া ধানের মধ্যে ঠোক্কর দিতো। মেয়াডার পৌকের নিগা পরণ পড়তো। তাই ধান হুকান শেষ অইলে এক মোট ধান চড়ুইরে দিল আর এক মোট ধান কাউয়ারে দিয়া ডাহি ভইরা ধান নিয়া বাইত্যে গেলো গা।

– মেয়াডার কি বিয়া অইছাল?

– অই ছেড়ি, মেয়াডার বিয়া অইছাল কিনা গেডা দিয়া তর দরকার কী। ভেদা পেঁচাল না পাইরা হাস্তর হোন।

– কাউয়া আর চড়ুইয়ে যার যার ধান হে হে খাইতে নাগলো। চড়ুই ঠোঁট দিয়া ধানের তুষ ছিলাইয়া ছিলাইয়া চাইল বাইর কইরা খায়। আর কাউয়ায় না ছিলাইয়াই ঠোকরাইয়া ঠোকরাইয়া মুখ ভইরা আমান আমান ধান খায়। চড়ই আর কাউয়ার মধ্যে দোস্তালি ভাব আছিলো।

– অই ছেড়ি, কাউয়া অইল কত বড়, আর চড়ুই অইল কত ছোট। এত ছোট বড় পৌকের নগে কোন্দিন দোস্তালি অয়?

– এই ছেড়ি, ঠেটামি না কইরা হাস্তর হোন। খাওনের সময় কাউয়ায় চালাকি কইরা কইল, আহ আমরা পাল্লা ধরি। যে আগে খাওন শেষ করব হে জিতপ। তুমি যদি জিত আমার শইলের গোসত ঠোকরাইয়া খাবা, আর আমি জিতলে তোমার শইলের গোসত ঠোকরাইয়া খামু। চড়ুই সহজেই রাজি অইয়া গেল। কাক তাত্তারি ঠোকরাইয়া ঠোকরাইয়া সব ধান খাইয়া শেষ কইরা ফালাইল। চুড়ুই অতখোনে মাত্র কয়েকটা ধান খাইল ছিলাইয়া ছিলাইয়া। কাউয়ায় কইল, দোস্ত, তুমি ঠইকা গেছ। আমি অহন তোমার গোসত খামু।

চড়ুই, চইমকা গিয়া কইল, আমি ত মনে করছিলাম, আমরা মসকরা কইরা কইছি ! আর, আমি যে ছোট, তুমি ঠোকর দিলে তো আমি মইরাই যামুগা। কাউয়ার কতা একটাই, সে বাজিতে জিতছে, তাই শর্ত মতে তারে এহন চড়ুইয়ের গোসত খাইতে দিতেই অবো।

শেষমেশ কোন কতাতেই কাউয়াকে বারন না করতে পাইরা, চড়ুই কইল – আইচ্ছা, বাজিতে যখন আইরা গেছি, তোমার শর্ত মতই অবো।

 

তুমি আমার গোসত খাবা। তয়, আমার একটা অনুরোধ আছে। হেইডা অইল – ঐ ঠোঁট দিয়া তুমি কত ময়লা পঁচা ধচা জিনিস খাও। আমার গোসত খাওনের আগে, দয়া কইরা তোমার ঐ নোংরা ঠোঁট গাংগের পানি দিয়া ধুইয়া পরিস্কার কইরা আহ।

চড়ুই এঁর অনুরোধ হুইন্যা কাউয়া বিরাট খুশী। হে এই অনুরোধ রাখতে রাজী অইয়া গাংগের পাড়ে গিয়া, গাংগেরে কইল –

গাং ভাই, গাং ভাই,

দিবা পানি, ধোব ঠোঁট,

তেসে খামু চড়ুইর গোসত।

গাং কাউয়ার কতা হুইন্যা কইল, তোর এই নোংরা ঠোঁট আমার পরিস্কার টুলটুলা পানিতে ডুবাইলে, আমার পানি নোংরা হইয়া যাব। তুই কুমারের কাছ থিগা একটা ঘটি নিয়া আয়। ঘটিতে পানি ভইরা, পাড়ে বইয়া ঠোঁট ধুইয়া নিস।

কাউয়া হেসুম উড়ান দিয়া কুমারের বাড়ি গিয়া, কুমারকে কইল-

কুমার ভাই, কুমার ভাই,

দিবা ঘটি, ভরব জল, ধোব ঠোঁট,

তেসে খামু চড়ুইর গোসত।

কুমারের কাছে বানানো ঘটি ছিল না। তাই, কাউয়ারে মাটি নিয়া আইতে কইল। হেই মাটি দিয়া হে ঘটি বানাইয়া দিব।

মাটি খোঁদার জন্যে ধারআলা কিছু না পাইয়া, মাঠে এক মোইষ দেইখা ভাবল, মোইষের শিং অইলে মাটি খুঁদতে সুবিধা অব। তাই, মোইষের কাছে গিয়া কইল –

মইষ ভাই, মইষ ভাই,

দিবা শিংগা, খুঁদমু মাটি, বানামু ঘটি,

ভরব জল, ধোব ঠোঁট,

তেসে খামু চড়ুইর গোসত।

 

মোইষ সব শুনে রাজী অইল। কিন্তু সমস্যা অইল, শিং ভাঙ্গা নিয়ে। আরেকটা মোইষের সাথে নাড়াই কইরা শিং ভাইংগা কাউয়াকে দিতে অব। তাই, হে কাউয়াকে কইল, ঘাস নিয়া আইতে। সেই ঘাস খাইয়া, তার শক্তি বাড়ব। তারপর, নাড়াই কইরা শিং ভাইংগা কাউয়ারে দিব। ঘাস কাটতে কাঁচি লাগব। তাই কাউয়া হেসুম গেল কামারের কাছে। গিয়া কইল-

কামার ভাই, কামার ভাই,

দিবা কাঁচি, কাটমু ঘাস,

খাব মইষ, করব লড়াই, পড়ব শিংগা,

খুঁদমু মাটি, বানামু ঘটি,

ভরমু জল, ধোমু ঠোঁট,

তেসে খামু চড়ুইর গোসত।

কামার কইল, আইচ্ছা। তুই এহনই গিরস্তের কাছ থিগা আগুন নিয়া আয়। আমি লোয়া পুইড়া তোরে কাঁচি বানাইয়া দিমু। কাউয়া গিরস্তের বাইত্যে উইড়া গিয়া কইল-

গিরস্ত ভাই, গিরস্ত ভাই,

দিবা আগুন, বানামু কাঁচি, কাটমু ঘাস,

খাব মইষ, করব নাড়াই, পড়ব শিংগা,

খুঁদমু মাটি, বানামু ঘটি,

ভরমু জল, ধোমু ঠোঁট,

তেসে খামু চড়ুইর গোসত।

গিরস্ত সব হুইন্যা রাজী অইল, আগুন দিতে। কিন্তুক সমস্যা দেহা দিল, আগুন নেয়া নিয়া। কাউয়া কিভাবে আগুন নিব?

অজি পরতম ঠোঁট দিয়া নিবার চেষ্টা কইরা পারল না। এরপরে কয়, পায়ে বাইন্দা দেও। বাঁন্ধার সময়, গরম লাগলে কয় , পাখে দিয়া দেও। তহন, গিরস্ত কাউয়ার পাখে আগুন বাইন্ধা দিল।

কাউয়া যেই না উড়ান দিল, হেই আগুন দপ কইরা জ্বইল্যা উইঠ্যা কাউয়ার গতরে ধইরা গেল, আর কাউয়া পুইড়া মরল।

এমমুরা এরই মইধ্যে চড়ুই তার ভাগের সব ধান খাইয়া শেষ কইরা ফালাইছে। চড়ুই হোনল যে কাউয়ার পাখে আগুন ধইরা পুইড়া মরছে। খুব ভালা অইছে। চড়ুইয়ের খুশী এহন দেখে কে। খুশিতে চড়ুই লাফাইতে নাগল। তেমবালা, চড়ুই কাউয়ারে ঠোঁট ধুইয়া আইতে কইছাল!

১৩/১/২০২১

(সহযোগিতায় সালমা আপা)
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/




 

গেন্দু বাসর রাতে বিড়াল মারলো

গেন্দু বাসর রাতে বিড়াল মারলো

(হাসির হাস্তর)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

[আমাদের সখিপুরের গ্রাম এলাকায় ছোটবেলা লোক মুখে কিছু গল্প শুনতাম। সেগুলোকে বলা হতো হাস্তর। আমি সেসব হাস্তর বন্ধুদের সহযোগিতায় সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি আমার মতো করে। হাস্তরের ভেতর দিয়ে আগের দিনের গ্রামবাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশ পাবে বলে আমি মনে করি। এই লেখাটি তারই একটি অংশ]

 

গেন্দুর বিয়ের দু’দিন আগে সে করিম বকসের কাছে যায় বিয়ে সংক্রান্ত কিছু জ্ঞান নিতে। করিম বকস গেন্দুকে মোটামুটি যা যা শিখিয়ে দেয়ার কথা ভালো করে শিখিয়ে দিলেন। বলে দিলেন

– বউ বাড়িতে আসার পর বরণ করবে বাড়ির মেয়েরা। তারপর তোমাকে ও তোমার বউকে পাশাপাশি বসিয়ে সাগরানা খাওয়াবে।

– সাগরানা কী কিবা খাওন?

– সাগরানা আলাদা কোন খাবার না। এটা হলো গুড়ের পায়েস। প্রথম তোমার মা তোমাকে ও তোমার বউকে চামচ দিয়ে পায়েস খাইয়ে দিবেন। তোমার মা সরে যাবেন। তারপর তোমার ভাবীরা একটা পয়সা দিয়ে একটু করে পায়েস উঠায় তোমার হাতে দিবেন। তুমি তা তোমার বউয়ের মুখে তুলে দিবে। তারপর তোমার বউ ঠিক একইভাবে তোমাকে খাইয়ে দিবে।

– মিয়া ভাই, ইডা ত খুবই শরমের কথা। এত মানুষের সামনে বউয়ের আতে খাবার পামু?

– দূর, বোদাই। শরম পাবো তোমার বউ। তুমি পাবা কেন? তারপর শাহী নজর করা হবে।

– ওডা আবার কিবা নজর?

– তুমি বিয়ের রাতে তোমার মুখের দিকে তোমার বউ তাকাবে আর তুমি তাকাবে তোমার বউয়ের মুখের দিকে। এটার হলো শাহী নজর।

– আমি এত মাইনষের সামনে বউয়ের মুখের দিকে চাবার পামু না।

– এইজন্য তোমাদেরকে আয়নার মাধ্যমে মুখ দেখানো হবে। তোমার ভাবীরা তোমাদের সামনে একটা গোল আয়না ধরবে। তুমি দেখবা আয়নায় তোমার বউয়ের মুখ। তোমার বউও তোমার মুখ দেখবে আয়নায়। আয়নায় কিন্তু তোমার বউয়ের চুলের শিথি উলটা দিকে দেখা যাবে।

– হ বুঝছি। আমি আয়নায় দেখছি আমার মাথার বায়ের হিতি ডাইন দিকে দেহা যায়।

– এরপর তোমাদেরকে নিয়ে যাবে বাসর ঘরে। আগে থেকেই তোমার ছোট ভাই-বোনেরা বাসর ঘর রঙিন কাগজ কেটে কেটে সাজিয়ে রাখবে। তারা বাসর ঘরের ভিতরেই দরজায় আড় লাগিয়ে খারাইয়া থাকবে । তাদেরকে মাইন দিয়ে ভিতরে ঢোকতে হবে। তারপর দরজায় আড় লাগিয়ে চৌকিতে বসে বউয়ের সাথে কথা বলবে।

– কী কথা কমু? বউরে আপনে কইরা কমু, না তুমি কইরা কমু?

– তুমি করে বলবা।

– কী কথা কমু?

– কী কথা বলবে তাও আমার বলে দিতে হবে? বলবি যে তোমারে অনেক সুন্দর লাগতাছে। তারপর দেখবি আরও কথা বাইরবো মুখ দিয়ে সেটা আমার বলে দিতে হবে না। দেন মোহরের টাকা বাকী আছে কিছু?

– বাকী আছে।

– সেটা কবে দিবে?

– ধান কাটার পর দিওন নাগব।

– সিনেমায় দেখছ না জামাই বউ বাসর ঘরে কী কথা কয় আর কেমন কেমন করে, তোমরাও তেমন করবা। আর একটা কথা মনে রাখবা, দেন মোহরের টাকা পরিশোধ না করে বউয়ের গায়ে হাত দেয়া যাবে না।

– কিবা কতা কইন? ছোওন যাবো না?

– ছোওন যাবো, এর চেয়ে বেশী কিছু না। তবে তুমি দেন মোহরের টাকা ধান কাটার পর দিয়ে দিবা কিরা করে বলে যদি সেই পযর্ন্ত মাফ চাও আর বউ মাফ করে দেয় তাইলে সব কিছুই করতে পারবা।

– বউয়ের কাছে নাফ চাওন ঠিক অইবো?

– আরে, এটা অন্য রকম মাফ। টাকার মাফ নাই। টাকা তোমার দিতে হবে, কিছুদিন পরে। এই সময়ে জন্য মাফ চাওয়া। বাসর রাতে একটু সাহস দেখাবে। বউ যেন টের না পা যে তুমি বোদাই।

বউকে বরণ করার পর বিয়ে পড়ানো হলো মসজিদের ইমাম দিয়ে। দু’জনকে পাটিতে পাশাপাশি বসানো হলো। সাগরানা খাওয়ানো হলো। গেন্দুর মুখের কাছে যখন জয়গন পায়েসসহ কয়েন ধরলো গেন্দুর পিঠের উপর তার চাচাতো ভাই হাটু দিয়ে একটু ধাক্কা মারলো। সম্পুর্ণ কয়েন গেন্দুর মুখের ভিতর চলে গেলো। সবাই হেসে দিলো। গেন্দুর দুলাভাই বললেন “শালায় পয়সাসহই খাইয়া ফালাইছে।” গেন্দু মুখ থেকে পয়সা বের করে দিলো। সাগরানা খাওয়া শেষে শাহী নজর করা হলো।

এবার বাসর ঘরে প্রবেশের পালা। গেন্দুর দুলাভাই ও ভাবীরা ওদেরকে নিয়ে বাসর ঘরের দরজার সামনে গিয়ে টোকা দিলেন। যারা ঘর সাজিয়েছিল তারা দরজা খুলে সামনে দাঁড়িয়ে বললো

– আমরা খরচা করে কষ্ট করে ঘর সাজাইছি। মাইন দেওন নাগব।

– কত টাকা দিতে হবে?

– ১০ টেহা দিওন নাগব।

– ৫ টাকা দিমু।

– ১০ টার নিচে একটা ছেন্দা পয়সাও কম নিমু না।

গেন্দুর চাচা ডাক দিয়ে বলনেন

– এই গেইট ছাইড়া দেও গ।

– কাক্কুর অনেক কথা হুনছি। আইজকা হুনমু না। আইজকা ১০ টেহা না নিয়া গেইট ছাড়মু না।

– দামান্দে, ওগরে ১০ টেহাই দিয়া দেও।

১০ টাকা নিয়ে গেইট ছেড়ে দিলো। দুলা ভাই ও ভাবীরা নতুন বর-কণে বাসর ঘরে বুঝিয়ে রেখে চলে গেলেন। চৌকির কিনারে গেন্দু ও গেন্দুর বউ পা ঝুলিয়ে বসে রইলো অনেকক্ষণ। কেউ কোন কথা বললো না। দু’জনই অস্বস্তি অনুভব করছিলো। একসময় গেন্দু অল্প অল্প কাশতে শুরু করলো কিছুক্ষণ পরপর। জয়গন প্রথম কথা বললো

– আপনে কতক্ষণ পরপর গলা খাউর পারতাছুন ক্যা? সর্দি নাগছে?

– না মানে, সর্দি নাগে নাই। মেওপোলা মানুষ দেখলে আমার গলা খাউর দিবার অভ্যাস আছে।

– হেডাত ভিন মেয়ামানুষ দেখলে। আমি ত ভিন মেয়া মানুষ না। আমি ত আপনের বউ।

– অ হ হ। আর কাশমু না। একটা কতা কী, দেন মোহরের যে কয় টেহা বাকী আছে এই কয় টেহা আমি ধান কাটার পর দিয়া দিমুনি। হেই পর্যন্ত আমারে মাফ কইরা দেওন নাগবো। মাফ না করলে নিহি আপনের শরীলে ছানন যাবো না।

 

জয়গন চুপ করে বসে রইলো। গেন্দু বারবার একই কথা বলছিলো। জয়গনও এই সুযোগে চুপ করে থেকে মজা পাচ্ছিল। গেন্দুর মেজাজ খারাপ হচ্ছিল। বোকা মানুষের মেজাজ খারাপ হলে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। একসময় গেন্দুর মনে পড়লো করিম বকসের পরামর্শের কথা। তিনি বলেছিলেন বাসর রাতে সাহস দেখাতে। গেন্দু ভাবছিলো কী করে সাহস দেখানো যায়। এমন সময় চৌকির নিচ থেকে সেই হুলো বিড়ালটি মিয়াও মিয়াও করা শুরু করলো। গেন্দু ভয় দেখালো “এই বিলাই ধইরা কিন্তু আছাড় মারমু, চুপ করবি?” জয়গন একটু ভয় পেলো। এরপরও যখন বিড়ালটি মিয়াও মিয়াও করতেই থাকলো গেন্দু রাগান্বিত হয়ে “হালার বিলাই” বলে খপ করে বিড়ালের ঘারে ধরে উঁচু করে মেজেতে জোড়ে একটা আছাড় মারলো। বিড়াল গোংরানি দিয়ে চৌকির নিচে গিয়ে নিরব হয়ে গেলো। জয়গন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে মৃদুস্বরে বললো “মাফ কইরা দিলাম।”

৬/১/২০২১

ময়মনসিংহ
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/