Click on Menu button if you are using mobile.
মোবাইল হলে Menu বাটনে ক্লিক করুন।

Welcome to website of Dr. Sadequel Islam Talukder


Dr. Md. Sadequel Islam Talukder
MBBS, M Phil (Pathology), MACP
Senior Consultant and Chief
Hospital Clinical Pathology
Community Based Medical College Hospital Bangladesh, Mymensingh

Ex-Associate Professor and Head
Department of Pathology
Mymensingh Medical College
Mymensingh Bangladesh

.

 

Send your comment to: sadequel@yahoo.com

সমানে সমানে সাধারণত বন্ধুত্ব হয় না

সমানে সমানে সাধারণত বন্ধুত্ব হয় না

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

একবার মেডিকেল কলেজের একটি মেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলো। আমার উপর কারণ অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেলো সেই মেয়ের সাথে একই ব্যাচের আরেক মেয়ের বন্ধুত্ব ছিল খুব গভীর। তারা একই রুমে থাকতো, একসাথে পড়তো, এক সাথে ক্লাসে যেতো, একসাথে ক্লাসে বসতো, একসাথে রুমে ফিরতো, একসাথে খেতো, একসাথে বেড়াতে বের হতো এবং এক সাথে মার্কেটে যেতো।

গত কিছুদিন যাবত আত্মহত্যার চেষ্টাকারীর বান্ধবীটি অন্য রুমের এক মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব করছে এবং তাকে বাদ দিয়ে নতুন বান্ধবীকে নিয়েই সব করছে। নিজের রুমে না থেকে সেই রুমেই বেশী সময় কাটাচ্ছে। মাঝে মধ্যে নিজের রুমে আসে নেহায়েত প্রয়োজনে। ভুক্তভোগীর ধারণা পৃথিবীতে তাকে ভালোবাসার কেউ রইল না। একটিমাত্র বান্ধবী ছিলো, তাও আরেকজনে নিয়ে গেলো। পৃথিবীর কেউ তাকে পছন্দ করে না। বেচে থাকার কোন মানে হয় না। তাই, সে রুমের ফ্যানে ঝুলে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলো। ভাগ্যিস সেই সময় তার আগের বন্ধবী কোন একটা কাজে রুমে প্রবেশ করে দেখে ফেলে লোক ডেকে তাকে উদ্ধার করে। প্রিন্সিপালের কাছে খবর পৌঁছে গেলে তিনি আমাকে দায়িত্ব দিলেন তদন্তের।

আমি সব ঘটনা শুনে মেয়েটিকে বুঝালাম “তোমাকে কেউ ভালোবাসে না, এটা ঠিক না। তোমার বন্ধবী অন্য মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব করেছে এটা তার অধিকার আছে। এর মানে এই না যে সে তোমাকে আর ভালোবাসে না। সেও তোমাকে ভালোবাসে, ক্লাসের অন্যরাও তোমাকে ভালোবাসে। আমরা টিচাররা সবাই তোমাকে আদর করি। তুমি আগামী ফাইনাল পরীক্ষায় খুব ভালো করবে, আমরা বলাবলি করি। পাস করেই তুমি ডাক্তার হয়ে যাবে। ডাক্তার হলে বাবা মা, ভাই বোন, আত্মীয়সজন সবাই খুশি হবে। সবাই তোমার ডাক্তার হবার জন্য অপেক্ষা করছে। আমার সব উপদেশ শুনে সে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কান্না করতে লাগলো। আত্মহত্যা করবে না বলে সে প্রতিশ্রুতি দিল। তার রুমমেট তার রুমে ভয়ে আর থাকতে পারবে না বলে জানালো। অন্যরাও কেউ তার সাথে থাকতে পারবে না বলে জানালো। শেষে একজনকে রাজি করালাম।

তদন্তরিপোর্ট প্রিন্সিপাল স্যারকে জানালে তিনি মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে বিষয়টি ছেড়ে দিলেন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শক্রমে মেয়েটিকে ক্যাম্পাসের একটি বাসায় মায়ের সাথে রাখা হলো। পরে মেয়েটি সাভাবিক হয়ে ডাক্তার হয়ে চলে গেছে। তারপর আমি আর কিছু জানি না।

এদিকে একদিন আমি এই কেইসটি নিয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলি। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন

– সমানে সমানে সাধারণত বন্ধুত্ব হয় না। দুই বন্ধুর মধ্যে এক বন্ধুর উপর আরেক বন্ধুর কিছুটা আধিপত্য থাকতে হয়। তা না হলে বন্ধুত্ব টিকে না।

– একটু বুঝিয়ে বুলুন, ভাই।

– তুমি দেখবে, ক্লাসের ছেলে ও মেয়ের মধ্যে যখন জুটি বা বন্ধুত্ব হয়, তখন সাধারণত ছেলেটি মেয়েটির উপর আধিপত্য করে। এর উল্টাও হয়। মানে মেয়েটি ছেলেটির উপর আধিপত্য করতে পারে।

– আধিপত্য করে কিভাবে বুঝলাম না।

– ধরো, দুইজন মেয়ের মধ্যে বন্ধুত্ব হলো। তারা সব কাজ এক সাথে করে। ছাতা নিয়ে বের হলে দেখবে ছাতা শুধু একটাই ব্যবহার করে। একজন ছাতা ধরে হাটে আরেকজন ছাতার নিচে মাথা দিয়ে হাটে। রিক্সায় উঠার সময় একজন সব সময় ভাড়া ঠিক করে। সব সময় সে আগে রিক্সায় উঠে। রিক্সা ভাড়াও বেশি ভাগ সময় সেই দেয়। বাজারের ব্যাগটাও সাধারণত এক জনে বহন করে। এখন বুঝতে পেরেছ আধিপত্য কী? একজনের উপর আরেকজনের আধিপত্য না থাকলে ঠেলাঠেলি করে সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়। মানে সমানে সমানে বন্ধুত্ব হয় না। যে মেয়েটি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল সে মেয়েটি অন্য মেয়ের উপর পুরাপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। বন্ধবী অন্য মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব করায় সে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিল।

২২/৫/২০২২ খ্রি.

ময়মনসিংহ

#স্মৃতিকথা

 

ঈদের চাঁদ দেখে জাহৈর দিতাম

ঈদের চাঁদ দেখে জাহৈর দিতামঃ

(#স্মৃতিকথা)

ছোট বেলায় আমরা ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখে জাহৈর দিতাম। তারাতাড়ি ইফতার সেরে আমরা সবাই চাঁদ দেখার জন্য আমাদের বাড়ির পশ্চিমের ক্ষেতে জড়ো হতাম। ছোট দাদার শিমুল গাছের ফাঁক দিয়ে নওপাড়াদের গাছ গাছরার উপর দিয়ে চিকন চাঁদ চোখে পড়লেই বলে উঠতাম “চান ওঠছে গো….।”

সবাই বলে উঠতো “হৈ হৈ…..।”

এক সাথে অনেকগুলো ছেলেমেয়ে এভাবে সমস্বরে হৈ হৈ করে উঠলে তাকে জাহৈর দেয়া বলা হতো।

নওপাড়ার দিক থেকেও জাহৈর শোনা যেতো। চনপাড়ার দিক থেকেও জাহৈর শোনা যেতো। সাড়াসিয়া, বাসারচালা, রামখা, জিতাশ্বরী, উত্তর পাড়া থেকেও জাহৈরের শব্দ কানে ভেসে আসতো। জাহৈরের শব্দে শব্দে ঈদের অনন্দে মন আন্দোলিত হতো। রাত পোহালেই ঈদ। খির নাস্তা খেয়ে কাগজের টুপি মাথায় দিয়ে নতুন জামা-কাপড় পরে দল ধরে বড় চওনা ঈদের মাঠে চলে যেতাম তাকবির দিতে দিতে মুরুব্বিদের পিছে পিছে।

১২ বছর পর গ্রামের বাড়ি ঈদ করতে এসেছি। ইচ্ছা ছিল ইফতার সেরে মাগরিবের নামাজ পড়ে বাড়ির পশ্চিম পাশের সেই ক্ষেতে ঈদের চাঁদ দেখতে যাবো। ঈদের চাঁদ দেখাও সুন্নত। ঠিক এই সময় এক মাস্টার সাব এলেন আমাকে রোগীর কাগজপত্র দেখাতে। তিনি জানতেন এই সময়ে ডাক্তার সাবকে বাড়িতেই পাওয়া যাবে। তিনি সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন। আমি ভুলে গেলাম চাঁদ দেখতে।

কিন্তু আমি রাত ১০ টার সময় সেই কথা মনে করে আফসোস করছি “ইচ্ছা ছিলো ঈদের চাঁদ দেখার। দেখতে পেলাম না।” কাউকে জাহৈর দিতেও শোনলাম না। মোবাইল হাতে নিলেই দেখি ফটোশপে তৈরি করা গুগল থেকে কালেকশন করা ঈদ মোবারক লেখা কিছু কৃত্রিম কার্ড। আমি লাইক দেই, আর সরিয়ে ফেলি।

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ঈদ মুবারক

২/৫/২০২২

 

মাল নাই

মাল নাই

(স্মৃতিকথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

মাল বলতে আমরা সাধারণত জিনিসপত্রকে বুঝি। যেমন, বলে থাকি, “মালগুলো চোরে নিয়ে গেলো।” দুষ্ট ছেলেরা অশ্লীল ভাষায় মেয়েদেরকে মাল বলে। কেউ একজন টকশোতে ভালো চাপাবাজী করতে পারলেও অনেকে বলে থাকে “মালটা ভালোই।” মেয়েরাও অনেক সময় বলে থাকে “ভালো মাল মসলা দিয়ে রান্না করলে রান্না স্বাদ হবেই।” অনেকে ভালো একটা লেখা বা কবিতা পাঠ করে মন্তব্য করতে পারে “মালটায় ভালোই লিখেছে।” এমনই মাল শব্দের বিবিধ ব্যবহার রয়েছে।

১৯৯২ সনে তদানিন্তন আইপিজিএমআর (বর্তমানের বিএসএমএমইউ) এম ফিল প্যাথলজি কোর্সে প্রবেশ করে আমাদেরকে হিস্টোপ্যাথলজিক্যাল স্পেসিমেন গ্রস এক্সামিনেশন করতে অর্থাৎ কাটাকাটি করতে হতো। তাও আবার দুপুরের খাবারের আগে, দেড়টার দিকে। এই সময় আমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। সিনিয়ররা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখিয়ে দিতেন। আমরা জুনিয়ররা পরিশ্রমের কাজগুলো করতাম। জিনিসপত্র গুছিয়ে সিনিয়রদের ডাকতাম। একদিন একজন টেকনোলজিস্টকে গ্রস দেয়ার জিনিসপত্র রেডি করতে বলাতে তিনি বললেন “আজ গ্রস হবে না।”

– কেন?

– মাল নাই।

আমি খুশি হয়ে চলে গেলাম।

পরেরদিনও বললেন

– আজ গ্রস হবে না।

– কেন?

– মাল নাই।

খুশি হয়ে চলে গেলাম।

তৃতীয় দিনও বললেন “মাল নাই।”

এবার খুশি হতে পারলাম না। কারন, কাজের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। তিন দিনের কাজ একদিনে করতে হবে। রোগীদের রিপোর্ট পেতেও বিলম্ব হবে। আমি বললাম

– কী মাল নাই বলেন। আমি ব্যবস্থা করতে পারি কি না দেখি।

– মাল নাই।

– সেইটাই বলেন, কোন মাল নাই?

তিনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলতে বলতে চলে গেলেন “বার বার বলছি যে মাল নাই, তারপরও বলতেছেন কী নাই।”

আমি ঘটনাটা সিনিয়র ভাইকে জানালে বললেন “আপনি জানেন না। মাল মানে এলকোহল, মানে মদ। স্টকে এলকোহল নেই। এলকোহলের চাহিদা দেন।”

এখন বুঝলাম টেকনোলজিস্ট আমাকে তিনদিন আগেই জানিয়েছিলেন এলকোহল নেই। আরো মনে পড়লো লোকে মদ খাওয়াকে মাল খাওয়াও বলে।

(হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা করার জন্য বিভিন্ন ক্যামিক্যালের সাথে এলকোহল ব্যবহার করা হয়)

১৭/৫/২০২২ খ্রি.

ময়মনসিংহ

 

সত্যায়িত

সত্যায়িত

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৭৯ সনে এইচএসসি পাস করার পর আমাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ও বুয়েটে বিএসসি (ইঞ্জিনিয়ারিং) এই দুইটি কোর্সে ভর্তি হতে দরখাস্ত ও কাগজপত্র জমা দেয়ার প্রয়োজন পড়ে। স্বহস্তে লেখা আবেদনপত্র, তিন কপি করে পাসপোর্ট আকারের সত্যায়িত ছবি, এসএসসি ও এইচএসসি পাসের সার্টিফিকেট অথবা টেস্টিমোনিয়ালের সত্যায়িত নকল, সত্যায়িত নম্বর পত্রের নকল, চরিত্রগত সার্টিফিকেট ও নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট জমা দিতে হয়। সত্যায়িত করাতে হয় আবার প্রথম শ্রেনীর গেজেটেড সরকারি কর্মকর্তা দিয়ে। তখন উপজেলা সিস্টেম ছিল না, ছিল থানা সিস্টেম। কালিহাতি, সখিপুর, ঘাটাইল এসব স্থানে বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিলো না। জেলাশহর টাঙ্গাইলে বিদ্যুৎ থাকলেও ফটোকপি মেশিন ছিলো না। ঢাকায় গুলিস্তানে কয়েকটি ফটোকপি মেশিন ছিলো। প্রতিকপি ফটোকপি করাতে ৫ টাকা করে লাগত। তখনকার ৫ টাকা মানে এখনকার ৫০ টাকা। টাঙ্গাইল শহর থেকে সার্টিফিকেটের কপি টাইপ করিয়ে আনলাম। টাইপ মেশিন দিয়ে টাইপ করলে একসাথে প্রায় ৭ কপি করে কার্বন কপি হতো। উপরে লিখা থাকতো হুবহু নকল। স্বাক্ষরের জায়গায় টাইপ করা হতো “স্বাক্ষর অস্পষ্ট”। ফার্স্ট ক্লাস গেজেটেড কর্মকর্তারা সত্যায়িত কেন করতেন তা আমি জানতাম না। সত্যায়িত করার নিয়ম ছিল তাই করাতাম। অফিসার হবার পর বুঝেছি।

কে ফার্স্ট ক্লাস গেজেটেড অফিসার আর কে সেকেন্ড ক্লাস অফিসার তা আমি বুঝতাম না। নিজের আত্মীয় কেউ গেজেটেড অফিসার ছিলো বলে মনে পড়ছে না। টাঙ্গাইল থেকে টাইপ করিয়ে একদিন কালিহাতীতে সত্যায়িত করতে নিয়ে গেলাম। আমাদের বাড়ি থেকে কালিহাতী প্রায় ২০ কিলোমিটার। এই পথ আমরা হেটে যেতাম। থানার সবচেয়ে বড় অফিসার ছিলেন সার্কেল অফিসার (সিও) । সার্কেল অফিসারদের পদবী পরে থানা নির্বাহী অফিসার (টিএনও) হয়। এখন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)। আমি ধরে নিলাম সিও-ই ফার্স্ট ক্লাস গেজেটেড অফিসার। তার ছেলে লুতফর রহমান মুক্তা আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজে আমার ক্লাসমেট ছিল। সে আমার সাথে এইএসসি পাস করে বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে। আমি তার সাথে আর যোগাযোগ করতে পারিনি। শুনেছি বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। বর্তমানে কারো সন্তান বুয়েটে পড়ছে শুনলে আমি কল্পনায় ধরে নেই আমেরিকা, কানাডা অথবা অস্ট্রেলিয়াবাসী হিসেবে তৈরি হচ্ছে। আজ ফজলুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম মুক্তার কোন খোঁজ জানে কিনা। সে বলল যে মুক্তা বুয়েটে এক রুমেই থেকেছে, একই ব্যাচেই পড়েছে। কিন্তু পাস করার পর আর কোন যোগাযোগ হয় নি। প্রসঙ্গক্রমে বলে নেই যে আমরা আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে ‘৭৯ সনে পাস করা আমি, নজরুল, বেলায়েত, সদর ও নারায়ন ডাক্তার হয়েছি। ফজলু ও লুতফর (মুক্তা) বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে। বুলবুল বিমানের ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে। অনেক ক্লাস মেট কৃষিবিদ ও বিভিন্ন বিষয়ে ভালো করেছে। যাহোক, সেদিন সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছিল। সিও সাহেবের বাসায় গেলাম কাগজপত্র সত্যায়িত করাতে। অফিসারের বাসায় যাওয়া যে সঠিক নয় সেই জ্ঞানবুদ্ধি তখন আমার হয়নি। আমি বাহিরের ড্রইং রুমের দরজায় করা নাড়লে সিও সাবই খুলে দিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন

– কী চাই?

– স্যার, কিছু কাগজপত্র সত্যায়িত করতে হবে।

– অফিসে আসবে। আজ ছুটির দিন।

– স্যার, আমি ১২-১৩ মাইল দূর থেকে এসেছি।

তিনি আমার আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে বসতে বললেন। তখন অফিসাররা ৫৭ বছর বয়সে অবসরে যেতেন। এই ঘটনার পরও তিনি চাকরি করতেন বলে মনে পড়ছে। কাজেই তার বয়স ৫৫ এর মত ছিল। আমি অবসরে গিয়েছি ৫৯ বছর বয়সে। তাও আবার দুই বছর আগে। তার চেহারা যতদূর মনে পড়ছে তিনি এখন আমাকে যেমন বৃদ্ধ দেখা যায় তার থেকেও বৃদ্ধ ছিলেন। আমি চিন্তা করে দেখেছি সত্যায়িত করতে যে রকম ঝামেলা তাতে কিছু অতিরিক্ত কাগজ একসাথেই সত্যায়িত করে রাখি। একটা একটা করে কাগজ দিচ্ছিলাম, আর তিনি সই করছিলেন। এক সময় তিনি বিরক্ত হয়ে উঠে পড়লেন। বললেন “এতগুলো কাগজ লাগে না কি?” আমি বিনয়ের সাথে বললাম “স্যার, আমি মুক্তার ক্লাস মেট। আবার কার কাছে যাবো, তাই আপনাকেই বিরক্ত করছি।” তিনি নরম হয়ে আমার অবস্থান জেনে নিলেন এবং সব কাগজপত্র সত্যায়িত করে দিলেন। চলে আসার সময় মনে মনে ভাবলাম “আল্লাহ যদি আমাকে ফার্স্ট ক্লাস গেজেটেড অফিসার বানান আমি কাউকে সত্যায়িত করতে ফেরত দিব না।”

সেই সত্যায়িত কাগজপত্র জমা দিয়ে আমি বুয়েটে এডমিশন টেস্ট দিয়েছিলাম। চাঞ্চ পাই নি। চাঞ্চ পেলেও আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তাম না, মেডিকেলে চাঞ্চ পেলে। আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে চাঞ্চ পেয়ে ডাক্তার হয়ে ১৯৮৮ সনে সরকারি চাকরি পেলাম ফার্স্ট ক্লাস গেজেটেড অফিসার হিসেবে মেডিকেল অফিসার পদে। সেদিনই একটা কথা ভেবে ভালো লাগছিলো যে আমি ফার্স্ট ক্লাস গেজেটেড অফিসার হয়েছি এবং আমার কাছে মানুষ সত্যায়িত করাতে আসবে। মানুষের চরিত্র ভালো আছে কি না সেই সার্টিফিকেট আমি দিব।

আমার প্রথম পোস্টিং হলো বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে। সেখানে আমাকে ছাড়া ১২ কিলোমিটার ব্যাসের মধ্যে আর কোন ফার্স্ট ক্লাস গেজেটেড অফিসার ছিলনা। প্রচুর লোক আসতো সত্যায়িত করাতে। আমি বিরক্ত হতাম না। আমি সত্যায়িত করার মাহাত্ম্য কী তা সিনিয়র অফিসারদের থেকে জেনে নিলাম। এর মাহাত্ম্য এখনো কোন কোন অফিসার জানেন না। তাই, একটু বলে নিচ্ছি।

ফটো সত্যায়িত করার মানে হলো, ফটোর পেছনে যে নামটি লেখা হয়েছে, সেই নামটি যার ফটো, তারই। আমি তার নাম জানি, এটা সত্য। ফটোনামধারীকে যেহেতু আমি চিনি তাই সে নিজে না আসলেও চলবে। সার্টিফিকেট ও মার্কশীট সত্যায়িত করার মানে হলো টাইপ করা নকল বা ফটোকপি যা আমি সই করেছি, এটার মূল কপি কাছে আছে, আমি দেখেছি, সত্য। এটার জন্যও নিজের আসতে হবে না। চরিত্রগত সার্টিফিকেট দেয়ার জন্য ব্যক্তিকে আগে থেকে চিনতে হবে এবং চরিত্র সম্পর্কে জানতে হবে। বাস্তবে এই নিয়ম মেনে সত্যায়িত করতে গেলে পাবলিকের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়তে হয়। তারা যুক্তি দেখায়

– আমার চেহারার সাথে কি এই ছবির মিল নাই?”

– চেহারার মিল আছে। ফটোর পেছনের নাম যে আপনারই তা তো আমি নিশ্চিত না

মানুষ নাম বদলিয়ে অন্যের সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরি নিতে পারে, অন্যের নামে আসা টাকার চেক ভাঙাতে পারে, ইত্যাদি।

ভুয়া সার্টিফিকেট, নম্বরপত্র, টাইপ করে অথবা ফটোকপি করে সত্যায়িত করতে আসতে পারে। সরল বিশ্বাসে মূল সার্টিফিকেট না দেখে সত্যায়িত কললে ক্ষতি হতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষিতে কাউকে চরিত্রগত সার্টিফিকেট দিতে অস্বীকার করা যায় না।

একবার চরামদ্দিতে এক ছেলে এলো সার্টিফিকেট সত্যায়িত করাতে। আমি দেখলাম তার এসএসসি সার্টিফিকেটের ফটোকপিতে কোন্ট্রোলারের স্বাক্ষর নেই। আমি বললাম

– এটা সঠিক না। মূলটা দাও।

– এই যে মূল কপি।

– এটাতে ভুল আছে।

– কী ভুল আছে?

– তুমিই ভুল বের করো।

– আমি তো কোন ভুল দেখছি না।

– দেখো, কন্ট্রোলারের স্বাক্ষর নেই।

– হায়, হায়! স্যার, আমি এই সার্টিফিকেটের ফটোকপি জমা দিয়ে এইচএসসি, অনার্স এবং এমএসসি ভর্তি হয়েছি এবং নিয়মিত পাসও করেছি। এখন বিসিএস পরীক্ষার জন্য জমা দেব। এখন জানলাম আমার এসএসসি সার্টিফিকেট ভুল। কেউ কেন ধরলো না?

মনে মনে বললাম “সবাই তো আর সাদেক না।”

একবার চরামদ্দিতে এক ছেলে মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে আমার চেম্বারে এলো।

– মিষ্টি কেনো?

– স্যার, আপনি যে আমার দরখাস্ত সত্যায়িত করে দিয়েছিলেন, তাতেই আমার চাকরি হয়েছে। তাই, চাকরি পেয়েই আপনার জন্য মিষ্টি নিয়ে এলাম।

সরকারি চাকরি জীবনে আমি সত্যায়িত করতে এলে কাউকে ফেরত দিতাম না। তবে আমি সরকারি সীল বাসায় বা প্রাইভেট চেম্বারে রাখরাম না। বেশিভাগ মানুষ আসতো আমার বাসায় অথবা প্রাইভেট চেম্বারে। তাই, বেশি ভাগ মানুষই সত্যায়িত করতে এসে ফেরত গেছে। অবসরে গেছি দুই বছর হয়। এখন আর আমাকে সত্যায়িত করতে হয় না।

২৩/৫/২০২২

ময়মনসিংহ

#স্মৃতিকথা