Click on Menu button if you are using mobile.
মোবাইল হলে Menu বাটনে ক্লিক করুন।

Welcome to website of Dr. Sadequel Islam Talukder


Dr. Md. Sadequel Islam Talukder
MBBS, M Phil (Pathology), MACP
Senior Consultant and Chief
Hospital Clinical Pathology
Community Based Medical College Hospital Bangladesh, Mymensingh

Ex-Associate Professor and Head
Department of Pathology
Mymensingh Medical College
Mymensingh Bangladesh

.

 

Send your comment to: sadequel@yahoo.com

অল্প বয়সের ডাইরেক্টর

অল্প বয়সের ডাইরেক্টর

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

টাঙ্গাইলে প্রথম প্রাইভেট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা হয় শহরের আকুর টাকুর পাড়ায় পুকুর পাড়ে। শহরতলীর কাইয়া মারা নিবাসী বীমা কোম্পানির ম্যানেজার মোয়াজ্জেম হোসেন ফারুক ভাই তার নিজস্ব ভবনে স্ত্রীর নাম দিয়ে “নাহার নার্সিং হোম” নামে হাসপাতালটি শুরু করেন। পরিচালক নিয়োগ দেন তার ছোট ভাইকে এবং ম্যানেজার নিয়োগ দেন তার শ্যালককে। মেডিকেল অফিসার নিয়োগ দেন ডাঃ নুর মোহাম্মদ ভাই ও ডাঃ সালেহা আপাকে। নিজ গ্রামের গরীব প্রতিবেশীদের ছোট খাটো পদে কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করেন তার হাসপাতালে।

১৯৮৬ সনে আমি ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং শেষ করে বেকার হয়ে পড়ি। অলস বসে না থেকে প্রাইভেট প্রাক্টিশ করতে থাকি। ছয় মাস এভাবে চলার পর আমি নাহার নার্সিং হোমে চাকরি নেই মাসিক ১৮০০ টাকা বেতনে। তখন সরকারি মেডিকেল অফিসারদের বেতনও এমন ছিলো। বারতি সুবিধার মধ্যে ছিলো ফ্রি থাকার হাসপাতাল সংলগ্ন একটি বাসা। আমি আসার আগে এই বাসায় ডাঃ নূর মোহাম্মদ ভাই থাকতেন। তিনি চাকরিটা ছেড়ে দেয়ায় আমি পাই। সালেহা আপা মেটার্নিটি লিভে গেলে আমাকেই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়।

হাসপাতালে কালেকশন ভালোই ছিলো, কিন্তু প্রতি মাসেই কিছু কিছু ভর্তুকী দিতে হতো মালিককে। আয়ের বেশী অংশই কনসালটেন্ট স্যারগণ নিয়ে নিতেন। মেডিকেল অফিসাররা ঠিক সময়েই বেতন পেতেন। গরীব কর্মচারীদের বেতন দিতে একটু সমস্যা হতো। এনিয়ে ফারুক ভাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকতেন। ম্যানেজার মনখুন্য হয়ে চলে যান। পরিচালকের প্রতিও ফারুক ভাই তেমন সন্তুষ্ট না থাকলে তিনিও চলে যান। এমতাবস্থায় আমিও চাকরিটা ছেড়ে দিতে চাইলে ফারুক ভাই আমাকে অনুরোধ করলেন হাসপাতালটা টিকিয়ে রাখতে। তিনি আমাকে মেডিকেল ডাইরেক্টর হিসাবে পদন্নোতি দিলেন। আমি রয়ে গেলাম। অল্প বয়স ছিল আমার, ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং শেষ করেছি মাত্র এক বছর। ছাত্রের গন্ধও যায়নি। এই বয়সেই ডাইরেক্টর! শুনতে ভালোই লাগে!

আমি ফারুক ভাইর সাথে পরামর্শ করে জাতীয় পত্রিকায় ম্যানেজার ও রিসেপশনিস্ট নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিলাম। উপযুক্ত প্রার্থীদের যথা সময়ে সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য ডাকা হবে। ডাক যোগে অনেক দরখাস্ত জমা পড়লো। একদিন মজিদ নামে এলেঙ্গার এক ছেলে এলো রোগী দেখাতে। আলাপ সালাপে জানতে পারলাম ঢাকার সাফেনা নার্সিং হোমের একাউন্টেন্ট। ম্যানেজার নিয়োগ করা হবে শুনে সে আগ্রহ প্রকাশ করলো। সে একজন ডাক্তারের ভাতিজা। তার অমায়িক কথাবার্তায় আমার পছন্দ হলো। ঠিকানা রেখে দিলাম। ফারুক ভাই এলেন। প্রার্থীদের দরখাস্তের ফাইল চেক করা হলো। একেকজন প্রার্থী এমন বেশী যোগ্য যে আমাকে বেঁচে দিতে পারবেন। কেউ কেউ সিভিল সার্জন, সচিব, এম পি এমন প্রভাবশালী লোকের সুপারিশও জমা দিয়েছেন। দেখে ফারুক ভাই বললেন “এদেরকে দিয়ে আপনি কাজ করাতে পারবেন না। এরা বেশী যোগ্যাতাসম্পন্ন। দেখি কি করা যায়।” আমি বললাম “বিজ্ঞপ্তি দিলাম যে! ইন্টারভিউ নিতে হবে না?” তিনি হেসে বললেন “ইন্টারভিউ নেব যোগ্য প্রার্থিদের। না ডাকলে মনে করে নিবে যোগ্য নয়, তাই ডাকব না। তাছাড়া বিজ্ঞপ্তি দেয়াতে লজ যায়নি। হাসপাতালের এডভার্টাইজ হয়েছে পত্রিকায়।”

ফারুক ভাই আমাকে নিয়ে তার এক খারখানায় যাচ্ছিলেন কারখানার ম্যানেজারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে যেন টাকা পয়সা কম পড়লে সেখান থেকে নেয়া হয়। পথে একটা ছেলের সাথে দেখা। সে ফারুক ভাইকে পা ছুয়ে সালাম করে মাথা নিচু করে দাড়ালো। ফারুক ভাইর কোন আত্মীয়ের ছেলে হবে হয়তো। ফারুক ভাই জিজ্ঞেস করলেন

– তুই এখন কি করস?

– আমি বি এ পাস করে টিউশনি করছি।

– তুই আমার সাথে দেখা করিস।

আমি লক্ষ্য করলাম ছেলেটির চেহারা বেশ সুন্দর। ভদ্র নম্র প্রকৃতির। সুন্দর একটা ফুল হাতা শার্ট পরেছে, সুন্দর প্যান্ট পরেছে, সুন্দর জুতা পরেছে। সুন্দর করে চুল আচ্রিয়েছে। আমার খুব পছন্দ হলো। যেতে যেতে ফারুক ভাইকে বললাম

– ভাই, এই ছেলে তো বেকার। দেখে আমার খুব পছন্দ হলো। একে রিসেপশনিস্ট হিসাবে নেয়া যায় না?

– ঠিক বলেছেন। একেই নিয়ে নিন।

– মজিদ নামে এক ছেলে এসেছিলো। খুব ভালো মনে হলো। সাফেনা নার্সিং হোমে একাউন্টটেন্ট হিসাবে আছে। তাকে ম্যানেজার হিসাবে নিলে মনে হয় ভালোই হবে।

ফারুক ভাই বিস্তারিত শুনে তাকেও নিয়ে নেয়ার অনুমতি দিলেন। একজন সিকুরিরিটি গার্ড বদলিয়ে আমি আমার পছন্দের আরেকজন নিয়ে নিলাম। চালাতে লাগলাম হাসপাতাল। কথা কম বলি। ভারী গলায় কথা বলি ভাব নিয়ে। সবাই মানে। রাতে টেলিফোনে ফারুক ভাইর সাথে যোগাযোগ রাখি। ফারুখ ভাই পৌরসভার চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমার সাহস বেড়ে গেলো। পুরুদমে নিজের ইচ্ছামত হাসপাতাল চালাতে লাগলাম। লাভ হওয়া শুরু হলো। লাভের টাকা ফারুক ভাইর হাতে তুলে দেয়াতে অবাক হলেন। তিনি সেই টাকা থেকে আমাকে কিছু গিফট দিলেন। বাকী টাকা আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন “এই টাকা দিয়ে হাসপাতালের রিপেয়ারিং এর কাজ করবেন। আমার লাভ নিতে হবে না ।”

আমি নিয়মিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করতাম। সবাই সতস্ফুর্ত ভাবে কাজ করতো। কনসালটেন্টগণ রোগী দেখে অপারেশন করার পরামর্শ দিলে রোগীর লোকজন জানতে চাইতেন কোথায় অপারেশন করালে ভালো হয়। কনসালটেন্টগণ সরকারি হাসপাতাল ও প্রাইভেট ক্লিনিক দুটোরই অপশন দিতেন এবং ভালো মন্দ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতেন। প্রাইভেট ক্লিনিক পছন্দ করলে একটা স্লিপ ধরিয়ে দিয়ে বলতেন “এই স্লিপটা নাহার নার্সিং হোমের ডাইরেক্টরকে দিয়ে পছন্দমতো কেবিন নিয়ে ভর্তি হন। পার্টি ক্লিনিকে এসে রিসেপশনিস্টকে জিজ্ঞেস করতেন ” ডাইরেক্টর সাব আছেন?” রিসেপশনিস্ট আমার কক্ষ দেখিয়ে দিতেন। আমি রুমে বসে বসে বিসিএস পরীক্ষার গাইড বই পড়তাম। রোগীর লোক প্রবেশ করার আগেই বই ড্রয়ারে রেখে দিয়ে ভাব নিয়ে বসে থাকতাম। স্লিপ হাতে নিয়ে গম্ভীর স্বরে বলতাম

– কেবিন নিবেন, না ওয়ার্ডে ভর্তি হবেন?

-কেবিন নেব।

– সাধারণ কেবিন, না ভি আই পি কেবিন?

– কোনটার ভাড়া কেমন?

আমি ভাড়া ও সুবিধার ব্যাখ্যা দিলে বেশীভাগই ভি আই পি কেবিন পছন্দ করতেন। আসলে ভি আই পি কেবিন বানানো হয়েছিল ভি আই পি দের জন্যই। কিন্তু সাধারণ মানুষই বেশী থাকতেন ভি আই পি কেবিনে। আমরাও ভাড়া বেশী পেতাম সেই কারনে। ডাইরেক্টর হিসাবে ৬ মাসের বেশী আর থাকা হয়নি। মেডিকেল অফিসার হিসেবে সরকারি চাকরি হয়ে যাওয়ায় ডাইরেক্টরের চাকরিটি ছেড়ে দিতে হয় ১৯৮৮ সনের জুন মাসে। অল্প বয়সের ডাইরেক্টর হয়ে গেলাম মেডিকেল অফিসার ১৯৮৮ সনের ৩ জুলাই।

১৬/৪/২০২২

ময়মনসিংহ

আরো এমন গল্প পড়তে নিচের হ্যাস ট্যাগ এর উপর ক্লিক করুন।

#সাদেকেরস্মৃতিকথা

 

শ্বাস, শ্বাস, শ্বাস

শ্বাস, শ্বাস, শ্বাস
(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
আমরা এমবিবিএস পাস করার পর ১৯৮৬ সনে ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং করেছি এক বছর। এখন ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং না বলে ইন্টার্ন বলা হয়। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে বিভিন্ন মেয়াদে ট্রেইনিং করা হতো। একেকটা বিভাগের অধীন কয়েকটা করে ইউনিট থাকতো। প্রতি ইউনিটের প্রধান থাকতেন একজন প্রফেসর অথবা এসোসিয়েট প্রফেসর অথবা এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। প্রতি ইউনিটে একজন রেজিস্ট্রার থাকতেন। প্রতি ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকতেন একজন এসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার। এসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রারের নেতৃত্বে আমরা ১৫-২০ জন করে ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং করতাম। ওয়ার্ডের রোগীদের ফলো আপ দেয়ার জন্য আমাদের বেড নির্ধারণ করা ছিলো। আমরা প্রতিদিন সকালে এসে রোগীর সমস্যা, পালস, ব্লাড প্রেসার, স্বাস প্রশ্বাসের রেট, ইত্যাদি দেখে রোগীর ফাইলে লিখে রাখতাম। ইমপোর্টেন্ট ফাইন্ডিংগুলো নিয়ে সহকারী রেজিস্ট্রারের সাথে আলোচনা করতাম। সহকারী রেজিস্ট্রার রেজিস্ট্রারের সাথে আলোচনা কতেন। যাদের ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং শেষ হয়ে গেছে অথচ উপজেলা লেভেলের হাসপাতালে পোস্টিং হয়নি তারা সুপেরিয়র ডিউটি ডক্টর হিসেবে ওয়ার্ডে ডিউটি করতেন। সুযোগ পেলে আমাদের পড়াতেন। রেজিস্ট্রারগণ নিয়মিত ওয়ার্ডে ছাত্রদেরকে সকালে ও রাতে পড়াতেন। সার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রারগণ প্রফেসরের সাথে অথবা স্বাধীনভাবে সহকারী রেজিস্ট্রার নিয়ে অপারেশন করতেন।
প্রফেসরগণ সকালে এসে গ্যালারিতে বড় বড় লেকচার ক্লাস নিতেন। ক্লাস না থাকলে লাইব্রেরিতে বসে বই ও জার্নাল পড়তেন। সকাল ১০ টায় দলবল নিয়ে ওয়ার্ডে রাউন্ড দিতেন। এপ্রোন গায় দিয়ে গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে হেলেদুলে হেটে হেটে রোগীর বেডের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেন “চাচা আজ কেমন আছেন?” কথা বলতে বলতে রোগীর হাতের পালস গুনতেন। স্টেথোস্কোপ দিয়ে হার্টের সাউন্ড ও স্বাস প্রশ্বাসের সাউন্ড শুনতেন। প্রফেসর সব রোগী দেখতেন না। এসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার যেগুলি দেখার জন্য ইঙ্গিত করতেন সাধারণত সেগুলো দেখতেন।
রোগী দেখে কি কি পরীক্ষা করতে হবে, কি কি ঔষধ লিখতে হবে তা প্রফেসর বলতেন। আমরা হাতে থাকা প্যাডে শর্টহ্যান্ডে তা লিখে ফেলতাম। রাউন্ড শেষে ডক্টরস রুমে বসে সেগুলো ফ্রেস করে লিখে নার্সকে দিতাম। প্রেস্ক্রিপশন অনুযায়ী নার্স পরীক্ষা করানোর জন্য রোগী এক্সরে অথবা প্যাথলজি ল্যাবরেটরিতে পাঠাতেন এবং নিজ হাতে রোগীকে ঔষধ খাইয়ে দিতেন। পরীক্ষা তেমন কিছু ছিলো না। তখন আমরা আল্ট্রাসনোগ্রাফি দেখিইনি। শুনেছিলাম জাপান দেশে এটা আছে। প্রশ্রাব, পায়খানা ও দুয়েকটা রক্তের পরীক্ষা করানো হতো। রোগীর সমস্যা শুনে, রোগীর শরীরে হাত দিয়ে পরীক্ষা করে, দুয়েকটা প্যাথলজি পরীক্ষা করে অথবা এক্সরে করেই রোগ ধরা হয়ে যেতো। হয়তো ভুলও হতো। হয়তো, লাংসের ক্যান্সারকে টিবি রোগ মনে করে টিবির চিকিতসা দেয়া হয়েছে।
একদিন শিশু ওয়ার্ডে রাউন্ড দেয়ার সময় প্রফেসর ডাঃ হামিদ্ শেখ স্যার বললেন “এই রোগীকে কৃমির ঔষধ লিখে দাও।” আমি ফাইলে কৃমির ঔষধ লিখে দিলে নার্স তাকে এক ডোজ কৃমির ঔষধ খাইয়ে দেন। পরেরদিন রোগীর পায়খানার সাথে ৮-১০’টা বড় কৃমি পড়ে। রোগীর বয়স ছিল ৬-৭ বছর। সাথে তার নানি থাকতেন। হামিদ শেখ স্যার পরেরদিন রাউন্ডে এসে জিজ্ঞেস করলেন “এই রোগীকে কৃমির ঔষধ খাওয়াছিলেন?” রোগীর নানি বললেন “কৃমির ঔষধ খাওয়ায় নাই, ডাক্তার সাব কৃমির ঔষধ লেখছিলেন। তাতেই এতুগুনা কৃমি পড়ছে।” শুনে হামিদ শেখ স্যার মুসকি হেসে বললেন “দেখছেন আমাদের এই ডাক্তার কেমন, ওষুধ লেখছেন, তাতেই কৃমি পড়ে গেছে।”
প্রফেসর রোগীর গায়ে হাত না দিলে রোগীরা সাধারণত সন্তুষ্ট হতেন না। তাই আমাদের একজন প্রফেসর সব রোগীর সাথেই অল্প কিছু কথা বলতেন এবং বুকের উপর, পেটের উপর একটু একটু করে স্টেথোস্কোপ টাচ করে বলতেন “শ্বাস, শ্বাস, শ্বাস।” আসলে যাকে ভালো করে দেখার দরকার তাকে ভালো করেই দেখতেন। যাকে দেখার দরকার নেই তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য শুধু স্টেথোস্কোপ টাচ করে বলতেন “শ্বাস শ্বাস শ্বাস।”
আমি শুনেছি, একদিন এই স্যার এমনভাবে একদিক থেকে শুরু করে ৪-৫ জন রোগী দেখে ফেলেছেন এবং প্রত্যেককেই বলেছেন “স্বাস, শ্বাস, শ্বাস।” পরের রোগীর কাছে গেলেই রোগী হেসে বলে উঠলেন “ডাক্তার সাব, স্টেথোস্কোপ দিয়ে কিভাবে শুনছেন, আপনি তো স্টেথোস্কোপ গলায় লাগিয়ে রেখেছেন, কানে লাগান।”
স্যার বললেন “ও তাই তো।” স্টেথোস্কোপ কানে লাগিয়ে বুকের উপর ধরে বললেন “শ্বাস, শ্বাস, শ্বাস।”
১৩/৬/২০২২
আরও স্মৃতি কথা পড়তে নিচের হ্যাস ট্যাগ এর উপর ক্লিক করুন।

আমার দেখা বুলেট প্রবেশের চিহ্ন

আমার দেখা বুলেট প্রবেশের চিহ্ন
(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
আমাদের বড়বাইদপাড়ার পশ্চিম পাশে ঢনডনিয়া পাড়া। এটা পড়েছে সখিপুর উপজেলার কাকরাজান ইউনিয়নে। এই ঢনডনিয়া পাড়ায় বেশিভাগ মানুষই ছিল বংশী সম্প্রদায়ের। তাদের অনেকেই বন্য আলু, বন্য খরগোশ ও বন্য শুকর খেতেন। আমি স্বাধীনতার যুদ্ধের আগের কথা বলছি। আমাদের গ্রামের বনে এক প্রকার লতানো গাছ ছিলো । গোড়ায় লম্বা লম্বা বন্য আলু ধরতো। খোন্তা দিয়ে গর্ত করে আলু তুলে খালই ভরে নিয়ে যেতেন তারা। সিদ্ধ করে খেতেন। এই আলুকে আমরা জোংগুইলা আলু বলতাম। আমরা জোংগুইলা আলু খেতাম না। আমি চুপি চুপি এই আলু অনেক খেয়েছি। তারা জংগল থেকে বন্য খরগোশ ও শুকর শিকার করে খেতেন। খরগোশকে আমরা ফৈটা এবং শুকরকে জুংলি বলতাম। দিনের বেলা বিশ পঁচিশজনের একটা দল বনের এক দিক থেকে ঝোপ ঝার লাঠি দিয়ে পিটাতে পিটাতে আরেক দিকে যেতেন। খরগোশরা ভয় পেয়ে মুক্ত দিকে দৌড়ে গিয়ে জালের মধ্যে আটকা পড়তো। সন্ধার সময় বনের ধারে খরগোশ ঘাস খেতে আসতো। সেখানেও জাল পেতে রেখে তারা খরগোশ শিকার করতেন।
আমাদের বাড়ির আশে পাশের বনে জোংগুইলা আলু, খরগোশ ও শুকর ছিলো । খরগোশ রাতে মাঠে ঘাস খেতো। শুকর রাতে কচু, ঘেচু ও আলু তুলে খেতো। শুকরগুলো রাতে দল বেঁধে চলাফেরা করত। ঘোতর ঘোতর শব্দ করতো নাক দিয়ে। কোন মানুষ যদি রাগের চোটে ঘোতর ঘোতর করত তাইলে আমরা বলতাম “অবা জুংলির নাগাল ঘোতর ঘোতর করস ক্যা?”
পিটিয়ে শুকর মারা খুব কঠিন কাজ ছিলো। এইজন্য তারা বন্দুক দিয়ে গুলি করে শুকর শিকার করতেন। যারা বন্দুক দিয়ে গুলি করে শুকর মেরে দিতেন তাদেরকে পলান বলা হতো। খুব সম্ভব পালোয়ান থেকে পলান হয়েছে। যে বাড়িতে পলান থাকতো সেই বাড়িকে পলান বাড়ি বলতো। কালিয়া পাড়ার রিয়াজ উদ্দিন চাচা পালোয়ান ছিলেন। তিনি এক সময় গ্রাম সরকার নির্বাচিত হয়ে রিয়াজ সরকার নামে পরিচিত হন। রিয়াজ চাচাকে আমি একবার শুকুর গুলি করে মারতে দেখেছি। বিড়াট শুকর ছিল, ছোট খাটো ষাড়ের সমান। রিয়াজ চাচা সুঠাম দেহী জোয়ান ছিলেন।
একদিন আমি বড়বাইদে কুয়ারপাড়ের ক্ষেত থেকে কেহইর তুলে খাচ্ছিলাম। আমন ধান কাটা শেষ হলে নাড়া ক্ষতে এক প্রকার লম্বা ঘাসের গোড়ায় ছোট ছোট এক ধরনের গোটা হতো। ওগুলো ছেনি দিয়ে খুচিয়ে তুলে ছিলিয়ে কচকচিয়ে চিবিয়ে খেতাম। কেহইরের স্বাদ বিলের পানি ফল বা শিংগারা ফলের মতো। কুয়ার পাড়ের ক্ষেত থেকে বড়বাইদের উজানের ক্ষেত নাটু নানাদের বাড়ি পর্যন্ত দেখা যেতো। নওপাড়াদের ঘোনা, মনো ভাইদের ঘোনা ও নাটু নানাদের ঘোনাও দেখা যেতো। আমাদের জংগল ও বুইদ্দাচালার মাঝখানের ঘোনাকে নওপাড়াদের ঘোনা বলতাম। বুইদ্দাচালা ও জোয়াদালী কাক্কুদের চালার মাঝখানের ঘোনাকে জোয়াদালী কাক্কুদের ঘোনা বলতাম। বংশীগণ আমাদের জংগল পিটানো শুরু করলে ঐ বড় শুকরটা দৌড়ে ঘোনা পাড় হয়ে বুইদ্দাচালার জংগলে প্রবেশ করার সময় আমি দেখেছি। এই সময় দেখলাম পলান চাচা বন্দুক হাতে দৌড়ে বড় বাইদ দিয়ে উজানের দিকে যাচ্ছেন। বংশীগণ বুইদ্দাচালার জংগল পিটাতে থাকলে শুকরটি যেই দৌড়ে জোয়াদালী কাক্কুদের জংলে পালানোর জন্য মনো ভাইদের ঘোনা পাড়ি দিচ্ছিল এমন সময় ডান দিক থেকে একটা গুলি ছোড়লেন পলান চাচা। শব্দ শুনে দৌড়ে গেলাম সেখানে। গিয়ে দেখি বিশাল আকার শুকরটা মরে কাত হয়ে শুয়ে আছে। ডান বুকে গুলি প্রবেশ করেছে, আমি লক্ষ্য করলাম। এটাই আমার দেখা প্রথম এবং শেষ দেয়া বুলেট প্রবেশের চিহ্ন। রিয়াজ উদ্দিন পালোয়ান চাচা আনন্দে উৎফুল্ল ছিলেন। বংশীগণও আনন্দিত ছিলেন। তারা শুকুরের সামনের ও পিছনের পা জোড়া রশি দিয়ে বেঁধে দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে বাঁশ প্রবেশ করিয়ে সামনে দুইজন ও পেছনে দুইজন কাঁধে নিয়ে হাটা দিলেন ঢনঢনিয়ার দিকে। শুকুরের মাথাটি নিচের দিকে দোল খাচ্ছিলো। চার জন বংশী পালকি কাঁধে নিয়ে হাটার মতো করে হাটতে হাটতে পশ্চিম দিয়ে চলে গেলেন।
১০/৬/২০২২
#সাদেকেরস্মৃতিকথা

জখমের সার্টিফিকেট

জখমের সার্টিফিকেট

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

নকলা উপজেলা স্বাস্থ্য প্রকল্পে চাকরি করেছি ১৯৮৯ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত। নবীন ডাক্তার ছিলাম। মাত্র ১৮৫০ টাকা সরকারি বেতন ছিল। তাই, প্রাইভেট প্রাক্টিশ করতে হতো। দোতলা সরকারি বাসভবনের দোতলায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতাম। বাসবভনের বৈঠকখানায়ই প্রাইভেট রোগী দেখতাম বিকেল বেলা। অল্প কয়েকজন করে রোগী আসতো। রোগী দেখার ফাঁকে ফাঁকে পোস্ট গ্রাজুয়েট কোর্সের এডমিশন টেস্টের প্রস্তুতির পড়া পড়তাম। কলিগরা সন্ধায় অফিসারস ক্লাবে গিয়ে যখন সময় কাটাতেন তখন আমি আমার স্ত্রী ও সন্তানদের সময় দিতাম। রোগী দেখে ২০ টাকা ফি নিতাম। সেটাও কম ছিলো না। ২০ টাকায় একটা বড় বোয়াল মাছ কেনা যেতো।

গ্রামে জমি নিয়ে অনেক মারামারি হতো। তারা মার খেয়ে জরুরী বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসতো। যে ডাক্তার চিকিৎসা দিতো তাকেই ইনজুরির সার্টিফিকেট দিতে হতো। সেই সার্টিফিকেট দিয়ে কোর্টে মামলা করতো। তখন উপজেলায়ই কোর্ট কাছারি ছিল। তাই, মামলা মোকোদ্যমা করা সহজ ছিলো। কিছু লোককে দেখতাম সবসময় মারামারির রোগীর সহায়তা করতো। মাঝে মাঝে রোগীকে বাইরে দাড়া করিয়ে রেখে আমার কাছে এসে বলতেন “রোগী খুব ভালো মানুষ। রোগী মামলা করবে একটা সার্টিফিকেট দিয়েন, স্যার।” বাইরে গিয়ে হয়তো বলতেন “আমি ডাক্তার সাবকে রাজি করিয়েছি একটা সার্টিফিকেট দিতে। এসব ব্যপারে পয়সাকড়ি লাগে। আপনাদের সামনে বলবেন না। আমার মাধ্যমেই দিতে হবে।” আমি বুঝেও কিছু করতে পারতাম না। আমি সবাইকেই ন্যায্য সার্টিফিকেট দিতাম বিনামূল্যে। মাঝখানে লাভবান হতো ঐ টাউটরা।

একবার আমি দুপুরে খাবার পর শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। এক ভদ্রলোক এলেন ব্রিফকেস হাতে নিয়ে।

– আপনার কী সমস্যা?

– আমি রোগী না। আমি ঢাকায় থাকি। এখানে গ্রামে আমার কিছু জমিজমা আছে। সেগুলো যারা দেখাশোনা করে তাদেরকে কিছু দুস্কৃতিকারী মারধর করেছে। তারা আপনার অধীন হাসপাতালে ভর্তি আছে। অপরাধীদেরকে একটা শিক্ষা দিতে হবে। তাই, আপনি মারাত্মক জখমের একটা সার্টিফিকেট দিবেন।

– ওরা মারাত্মক জখম হয় নাই। মারাত্মক জখমের সার্টিফিকেট দেয়া যাবে না।

এনিয়ে অনেক কথা খরচ করার পর কোনভাবেই যখন আমি রাজি হলাম না তখন আমার টেবিলের উপর রাখা তার ব্রিফকেসটি টাস করে খুলে পাশশত টাকার কচকচে নোটগুলো প্রদর্শন করলেন। বললেন “এখানে সত্তর হাজার টাকা আছে। আপনার সম্মানি।”

আমি ব্রিফকেস চাপ দিয়ে বন্ধ করে বললাম “আমি টাকা নেই না। প্লিজ আপনি চলে যান। আমি যা সত্য তাই লিখব। ”

অনেক পিরাপিরি করেও আমাকে রাজি করাতে পারল না। আমি তার পিঠে আদর করতে করতে দরজার বাইরে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলাম। কিছুক্ষণ পর সিরিতে ধরাম করে কিছু পড়ার শব্দ পেলেম। গিয়ে দেখি লোকটা সিরিতে কাত হয়ে পড়ে আছে। আমি ধরাধরি করে উঠালাম। লোকটা ঘোরের মধ্যে বিরবির করে বললেন “সত্তর হাজার টাকা একজন উপজেলার মেডিকেল অফিসার হয়ে নেয় না, এটা আমি বিশ্বাস করতাম না।” আমি তাকে বুজিয়ে সুজিয়ে বিদায় করলাম। আবার শুয়ে পড়লাম। শুয়ে শুয়ে হিসাব করলাম “৭০ হাজার টাকা ছিলো। ৭০ হাজার টাকা ভাগ ২০ টাকা সমান ৩,৫০০ জন রোগী দেখে যা উপার্জন করা যায়। ৭০ হাজার টাকা দিয়ে আগামীকালই একটা ভালো মানের মোটর সাইকেল কিনতে পারতাম। ভো ভো করে কলে যেতাম। ইনকাম আরও বেড়ে যেতো। কিন্তু সব যে দেখে ফেলছেন আল্লাহয়। সব যে লিখে ফেলছেন কেরামামান কাতেবিন। আমার মিথ্যা সার্টিফিকেট পেয়ে একজন বিনা কারনে জেল খাটবেন। কি করে এমন কাজটি করি? ভালোই করেছি না নিয়ে।”

আরেকদিন আমি দুপুরের পর ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। দরজায় লাথি দেয়ার শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো। দরজা খুলে দেখি একজন হোমরাচোমরা লোক রাগে ফোসফাস করছে।

– আমি ঘুমাচ্ছি, আর আপনি দরজায় এভাবে শব্দ করছেন?

– খুব তো আরামে আছেন। এটা কী সার্টিফিকেট দিয়েছেন? মাথায় কোপ দিছে লেখেন?

– চলুন, টি এইচ এ সাবের কাছে যাই। দেখি কী লেখা যায়।

আমি ইউএইচএফপিও সাবকে ডেকে তুলে লোকটার আচরণের কথা জানালাম। লোকটা ক্যাম্পাসে দাড়িয়ে নায়কের মতো উচ্চস্বরে ডায়ালগ দিচ্ছিল “ডাক্তাররা সব ঘুষখোর। ঘুষ না দিলে ঠিকমতো সার্টিফিকেট দেয় না। ঔষধ চুরি করে বেইচা দেয়” ইত্যাদি। ডাঃ হাবীব ভাই লোকটার চিতকার শুনে উঠে এলেন। আমার কাছে বিস্তারিত শুনে মোটর সাইকেল স্টার্ট দিয়ে আমাকে পেছনে বসিয়ে একটানে থানায় গিয়ে উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন “ও সি সাব কোথায়? ঘুমাইতেছেন? হাসপাতাল ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী প্রবেশ করে যাতা করছে, আর আপনারা এখানে আরামে আছেন?” ও সি তৎক্ষনাৎ পুলিশ পাঠিয়ে লোকটাকে ধরে এনে কাস্টোডিতে ঢুকিয়ে ফেললেন। আমাদেরকে চা নাস্তা করালেন। ফেরার সময় লোকটাকে দেখলাম মেঝেতে ল্যাটা দিয়ে করুনভাবে বসে আছে। আমার মায়া হলো। লোকটা হাত জোড় করে আমার কাছে অনুনয় করে বলতে লাগলেন “স্যার, আমি মুর্খ মানুষ। রাগের মাথায় কী করছি। আমাকে মাফ করে দিন।” আমি ও সি-কে বললাম “ওনাকে ছেড়ে দিন। উনি বুজতে পারেন নি।” ও সি বললেন “ওনারে আপনাদের কেসে ধরে আনিনি। উনি মেম্বার। উনি সরকারি গম মেরে খেয়েছেন, তাই ধরে এনেছি। তার জেল হবে। ”

সার্টিফিকেট দিলে কোন কোন সময় চিকিৎসকদের কোর্টে যেতে হয় স্বাক্ষ্য দিতে। আমি মাত্র একবারই গিয়েছিলাম স্বাক্ষ্য দিতে। সেখানে একটা মজার কাণ্ড হয়েছিলো, শুনুন।

কোর্টে স্বাক্ষ্য দেয়ার জন্য আমার কাছে সমন এলো। পরদিন নকলার কোর্টে স্বাক্ষ্য দিতে যেতে হবে। প্রথমবার কোর্টে স্বাক্ষ্য দিতে যাবো। তাই, আগের রাতে এনিয়ে অনেক্ষণ ভাবলাম। কোর্টের কার্যক্রম বাংলা সিনেমায় ও নাটকে বহুবার দেখেছি। এবার বাস্তবে দেখতে হবে। স্বাক্ষ্য দিতে হবে। মনে পড়লো সিনেমার কোর্টের কথা। অনেক দিনেমায় আজিজুল কাদের কোরেশী (এ কে কোরেশী) বিচারকের অভিনয় করতেন। তাকে বিচারক হিসেবে খুব মানাতো। সাদা ধবধবে পাকা চুল। ক্লিন সেভ করা মুখমন্ডল। টেবিলে কাঠের হাতুড়ি ঠক ঠক করে “অর্ডার, অর্ডার, বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা মোতাবেক আসামীকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হলো।’ অনেক বাংলা সিনেমার সুপরিচিত সংলাপ এটি।

জজ এমনই হবে আমার কল্পনায় ছিল। অভিনেতা কায়েস সাধারণত উকিল ব্যারিস্টারের অভিনয় করতেন কালো গাউন পরিধান করে। প্রতিপক্ষ উকিলের উদ্দেশ্যে বলতেন “অবজেকশন, ইউর অনার।” জজ বলতেন “অবজেকশন সাসটেইনড।” এমনই হবে নকলার কোর্ট, এই কল্পনা নিয়ে স্বাক্ষ্য দিতে হাজির হলাম। “যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বই মিথ্যা বলিব না” শপথ বাক্য পাঠ করলাম। আসামি পক্ষের উকিল আমাকে জেরা করা শুরু করলেন। তিনি আমার খুব প্রিয় মানুষ ছিলেন। এক সাথে বাজার করতাম। এক রকম মাছ কিনতাম। ঠাট্টা মশকরা করতাম। কোর্টে তিনি এমন ভাব দেখালেন যেন আমাকে চেনেনই না। তাকে সাধারণ মানুষের মতোই মনে হলো। অভিনেতা কায়েসের মতো মনে হলো না। ম্যাজিস্ট্রেটও আমার বন্ধুর মতোই। এজলাসে বসে মনে হলো চুইংগাম চিবাচ্ছেন। সিনেমার জজের মতো মনে হলো না। হঠাৎ উকিল আমার সামনে এসে জিজ্ঞেস করলেন

– আপনি কি ডাক্তার?

– জি।

– কোথায় চাকরি করেন?

– উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স, নকলা।

– আপনার নাম কী?

– ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার।

– আপনার বয়স কতো?

– ২৯ বছর।

– আপনার জন্ম তারিখ মনে আছে?

– আছে, ১৫ এপ্রিল ১৯৬১।

– ইউর অনার, ইনি একজন ডাক্তার। নিজের বয়সটা ঠিকমতো বলতে পারেন না। ইনার বয়স হলো ৩১ বছর। বলেন কিনা ২৯ বছর। ইনি কিভাবে ডাক্তারি করেন!

– আমি তো হিসাব করে বলিনি। হয়তো তাই হবে।

(আমি তখন সুস্থ্য বিবাহিত পুরুষ ছিলাম। বয়সের হিসাব রাখতাম না। সাধারণত অবিবাহিত ও রোগীরা বয়সের হিসাব রাখে। জিজ্ঞেস করার সাথেসাথেই আন্দাজি বয়স বলে দিলাম। উকিল যে জন্ম তারিখ জিজ্ঞেস করবে তা তো জানতাম না)

উকিল জিজ্ঞেস করলেন

– এই সার্টিফিকেট কি আপনি দিয়েছেন? এই স্বাক্ষর কি আপনার?

– জি।

– এটা কি অরিজিনাল?

– এটা ফটোকপি। অরিজিনাল না।

– ফলস সার্টিফিকেট। অরিজিনাল না। এই সব ডাক্তার এমন কাজই করে থাকেন। অরিজিনাল না। ফলস, ফলস, ফলস। নিজের বয়সটা ঠিকমতো বলতে পারেন না। ফলস সার্টিফিকেট তো দিবেনই।

উকিল এদিক সেদিক হাটাহাটি করেন, আর বাংলা ইংরেজি মিশিয়ে যেন কি কি বলতে থাকেন। উকিলের আচরণে মর্মাহত হই। মুখ লাল হয়ে যায়। ভেবাচেকা হয়ে পড়ি। এমন অপমানজনক কথা জীবনেও শুনিনি। তাও আমার একজন প্রিয় মানুষের মুখে। ম্যাজিস্ট্রেট বসে বসে চুইংগাম চিবাচ্ছিলেন কোন কিছু ভ্রুক্ষেপ না করে। উকিল ঘুরতে ঘুরতে আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন “কিছু মনে করবেন না। আমার মক্কেলকে শুনাচ্ছি।” হঠাৎ খেয়াল হলো আমি কোর্টে আছি। উকিল মক্কেল থেকে টাকা খেয়েছেন। বাহাদুরি দেখানোর জন্য এমনই করবেন। আমি আশ্বস্ত হলাম। এতক্ষণ ম্যাজিস্ট্রেট কী কী যেন লিখছিলেন। আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বলেন “ডাক্তার সাব, এখানে সই করুন।” আমি জিজ্ঞেস করলাম “এটা কী?” তিনি বললেন “আপনি যা বলেছেন তা আমি লিখেছি। নিচে সই করুন।” আমি ইতস্তত না করে সই করলাম। আল্লাহই জানেন, কী লেখা ছিলো। তিনি বললেন “ডাক্তার সাব, ধন্যবাদ। এবার আসুন।” আমি কোর্ট থেকে বেড় হয়ে রিক্সা নিয়ে সোজা চলে এলাম বাসায়।

২৫/৫/২০২২

ময়মনসিংহ




সমানে সমানে সাধারণত বন্ধুত্ব হয় না

সমানে সমানে সাধারণত বন্ধুত্ব হয় না

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

একবার মেডিকেল কলেজের একটি মেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলো। আমার উপর কারণ অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেলো সেই মেয়ের সাথে একই ব্যাচের আরেক মেয়ের বন্ধুত্ব ছিল খুব গভীর। তারা একই রুমে থাকতো, একসাথে পড়তো, এক সাথে ক্লাসে যেতো, একসাথে ক্লাসে বসতো, একসাথে রুমে ফিরতো, একসাথে খেতো, একসাথে বেড়াতে বের হতো এবং এক সাথে মার্কেটে যেতো।

গত কিছুদিন যাবত আত্মহত্যার চেষ্টাকারীর বান্ধবীটি অন্য রুমের এক মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব করছে এবং তাকে বাদ দিয়ে নতুন বান্ধবীকে নিয়েই সব করছে। নিজের রুমে না থেকে সেই রুমেই বেশী সময় কাটাচ্ছে। মাঝে মধ্যে নিজের রুমে আসে নেহায়েত প্রয়োজনে। ভুক্তভোগীর ধারণা পৃথিবীতে তাকে ভালোবাসার কেউ রইল না। একটিমাত্র বান্ধবী ছিলো, তাও আরেকজনে নিয়ে গেলো। পৃথিবীর কেউ তাকে পছন্দ করে না। বেচে থাকার কোন মানে হয় না। তাই, সে রুমের ফ্যানে ঝুলে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলো। ভাগ্যিস সেই সময় তার আগের বন্ধবী কোন একটা কাজে রুমে প্রবেশ করে দেখে ফেলে লোক ডেকে তাকে উদ্ধার করে। প্রিন্সিপালের কাছে খবর পৌঁছে গেলে তিনি আমাকে দায়িত্ব দিলেন তদন্তের।

আমি সব ঘটনা শুনে মেয়েটিকে বুঝালাম “তোমাকে কেউ ভালোবাসে না, এটা ঠিক না। তোমার বন্ধবী অন্য মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব করেছে এটা তার অধিকার আছে। এর মানে এই না যে সে তোমাকে আর ভালোবাসে না। সেও তোমাকে ভালোবাসে, ক্লাসের অন্যরাও তোমাকে ভালোবাসে। আমরা টিচাররা সবাই তোমাকে আদর করি। তুমি আগামী ফাইনাল পরীক্ষায় খুব ভালো করবে, আমরা বলাবলি করি। পাস করেই তুমি ডাক্তার হয়ে যাবে। ডাক্তার হলে বাবা মা, ভাই বোন, আত্মীয়সজন সবাই খুশি হবে। সবাই তোমার ডাক্তার হবার জন্য অপেক্ষা করছে। আমার সব উপদেশ শুনে সে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কান্না করতে লাগলো। আত্মহত্যা করবে না বলে সে প্রতিশ্রুতি দিল। তার রুমমেট তার রুমে ভয়ে আর থাকতে পারবে না বলে জানালো। অন্যরাও কেউ তার সাথে থাকতে পারবে না বলে জানালো। শেষে একজনকে রাজি করালাম।

তদন্তরিপোর্ট প্রিন্সিপাল স্যারকে জানালে তিনি মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে বিষয়টি ছেড়ে দিলেন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শক্রমে মেয়েটিকে ক্যাম্পাসের একটি বাসায় মায়ের সাথে রাখা হলো। পরে মেয়েটি সাভাবিক হয়ে ডাক্তার হয়ে চলে গেছে। তারপর আমি আর কিছু জানি না।

এদিকে একদিন আমি এই কেইসটি নিয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলি। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন

– সমানে সমানে সাধারণত বন্ধুত্ব হয় না। দুই বন্ধুর মধ্যে এক বন্ধুর উপর আরেক বন্ধুর কিছুটা আধিপত্য থাকতে হয়। তা না হলে বন্ধুত্ব টিকে না।

– একটু বুঝিয়ে বুলুন, ভাই।

– তুমি দেখবে, ক্লাসের ছেলে ও মেয়ের মধ্যে যখন জুটি বা বন্ধুত্ব হয়, তখন সাধারণত ছেলেটি মেয়েটির উপর আধিপত্য করে। এর উল্টাও হয়। মানে মেয়েটি ছেলেটির উপর আধিপত্য করতে পারে।

– আধিপত্য করে কিভাবে বুঝলাম না।

– ধরো, দুইজন মেয়ের মধ্যে বন্ধুত্ব হলো। তারা সব কাজ এক সাথে করে। ছাতা নিয়ে বের হলে দেখবে ছাতা শুধু একটাই ব্যবহার করে। একজন ছাতা ধরে হাটে আরেকজন ছাতার নিচে মাথা দিয়ে হাটে। রিক্সায় উঠার সময় একজন সব সময় ভাড়া ঠিক করে। সব সময় সে আগে রিক্সায় উঠে। রিক্সা ভাড়াও বেশি ভাগ সময় সেই দেয়। বাজারের ব্যাগটাও সাধারণত এক জনে বহন করে। এখন বুঝতে পেরেছ আধিপত্য কী? একজনের উপর আরেকজনের আধিপত্য না থাকলে ঠেলাঠেলি করে সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়। মানে সমানে সমানে বন্ধুত্ব হয় না। যে মেয়েটি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল সে মেয়েটি অন্য মেয়ের উপর পুরাপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। বন্ধবী অন্য মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব করায় সে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিল।

২২/৫/২০২২ খ্রি.

ময়মনসিংহ

#স্মৃতিকথা