Click on Menu button if you are using mobile.
মোবাইল হলে Menu বাটনে ক্লিক করুন।

Welcome to website of Dr. Sadequel Islam Talukder


Dr. Md. Sadequel Islam Talukder
MBBS, M Phil (Pathology), MACP
Associate Professor and Head [PRL]
Department of Pathology
Mymensingh Medical College
Mymensingh Bangladesh
.

 

Send your comment to: sadequel@yahoo.com

ঢাকার নশা

ঢাকার নশা

(সংগৃহিত হাস্তর ও গীত)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

[আমাদের সখিপুরের গ্রাম এলাকায় ছোটবেলা লোক মুখে কিছু গল্প শুনতাম। সেগুলোকে বলা হতো হাস্তর। সুর করে কিছু কবিতা ও গান গাওয়া হতো। সেগুলোকে বলা হতো গীত। আমি সেসব হাস্তর বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় সংগ্রহ সীতাকরে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি গল্পাকারে আমার মতো করে। এসবের ভেতর দিয়ে আগের দিনের গ্রামবাংলার আঞ্চলিক ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশ পাবে বলে আমি মনে করি। এই লেখাটি তারই একটি অংশ]

 

গেন্দুর নানী-শাশুড়ী আম্বাতনকে আরেকটা গীত গাইতে বললে আম্বাতন এই গীতটা গাইল –

ঘরের ভিতর খারইয়া ক্ণ্যা পাও ডুলাইছে,

ঢাহা থিগা নশা মিয়া গোলখারু পাঠাইছে।

ও গোলখারু ভালা না দস্তা মিশাইছে।

আমারতা দিয়া জানি কারে ভুলাইছে।

ঘরের ভিতর খারইয়া কণ্যা মাঞ্জা ঢুলাইছে,

ঢাহা থিগা নশা মিয়া পানতারা পাঠাইছে,

ও পানতারা ভালা না, দস্তা মিশাইছে।

আমারতা দিয়া জানি কারে ভুলাইছে।

ঘরের ভিতর খারইয়া কণ্যা গলা খাউজাইছে,

ঢাহা থিগা নশা মিয়া মপচেইন পাঠাইছে,

ও মপচেইন ভালা না দস্তা মিশাইছে।

আমারতা দিয়া জানি কারে ভুলাইছে।

ধরের ভিতর খারইয়া কণ্যা কান ঢুলাইছে,

ঢাহা থিগা নশা মিয়া মাড়কি পাঠাইছে।

ও মাড়কি ভালা না তামা মিশাইছে।

আমারতা দিয়া জানি কারে ভুলাইছে।

ঘরের ভিতর খারইয়া কণ্যা নাক সিটকাইছে,

ঢাকা থিগা নশা মিয়া নোলক পাঠাইছে।

ও নোলক ভালা না, তামা মিশাইছে।

ময়ফল বললো,

– আম্বাতন, তুই একবার কস দস্তা মিশাইছে, আরেকবার কস তামা মিশাইছে। ইডার মানে কি।

– যে গয়না রুপার মোতন দেহা যায় হেডার মইদ্যে হস্তা দস্তা মিশাইছে। যে গয়না সোনার মোতন দেহা যায় হেডার মইদ্যে হস্তা তামা মিশাইছে। রুপাও দলা, দস্তাও দলা। আবার তামাও যেবা দেহা যায় সোনাও হেবা দেহা যায়। অনেকসুম চালাক নশারা ভ্যাবলা বউগ এবা কইরা ভুলাইয়া গয়না দেয়।

– ঢাহাইয়া নশার কাছে বিয়া না বয়াই ভালা। আংগ পাড়ার ছত্তরে ঢাহা থাহে। কী যে করে, আল্লাহই জানে। বাইত্যে আইয়া কী যে ফ্যারাংগি করে! ভাষা কথা কয়। জারেরে কয় শীত। টেলকারে কয় টালকা। কয় কী, আইজকা খুব শীত করতাছে। আবার পানি ছাইন্যা কয় কী, পানিডা কুব টালকা। ঠান্ডা না কইয়া কয় টালকা। বাদাইম্মা জান কুনকার! অবা টাউন্যা নশার কাছে বিয়া বমু না।

– ক্যা, তরে কি হে বিয়া করবার চাইছে?

– থোছে, আবার বিয়া বিয়া করতাছস?

– তুইতিই ত বিয়া বিয়া করতাছস।

নানী বললেন, তোমরা ঠেটাম কইরো না। গীত ভালাই হোনা যাইতাছে। যেঠার মইদ্যে বিয়া বিয়া নাই হেইডা গাও। আম্বাতন আবার গাইলো-

ডালিম গাছ রুইছি আলানে,

জিংগা গাছ বুনছি পালানে,

সসা, বাংগির বিচি বুনছি আমি

গোয়াইল ঘরের পা ~য়াছে রে ।।

বাপ অইছে আমার নিদারুন,

টেহা নইছেন জানি কী কারন,

আমারে বিয়াছে গ বিয়া

ঐ না দূরে দেশান্তর।।

দূর দেশের মানুষ পাই,

পংখী হইয়া আমি উইরা যাই,

উরিয়া দেখি আমি

দরদী মায়ের মুখ অ রে।

উরিয়া দেখি আমি

দরদী বাবার মুখ অ রে।।

নাও অ কিনলাম আমি চরিবার,

বৈঠা কিনলাম আমি বাইবার,

ইছামতির গাংগে দিছি

বাইছা বাইছি খেলিবার।

ময়ফল বললো, এই ছেড়ি, এইডাও ত বিয়ার গীত অইল।

আম্বাতন বললো, আইজকা ত গেন্দু ভাইর বিয়ার রাইত। আইজকা বিয়ার গীত গামু, না কবে গামু?

৩০/১/২০২১

শব্দার্থঃ

নশা – নওশা, বর

কণ্যা – কণে

মাঞ্জা – কোমর

ঢাহা – ঢাকা

থিগা – থেকে

গোলখারু – পায়ের রিং

আমারতা – আমারটা

পানতারা – কোমরের বিছা

খারইয়া – দাড়াইয়া

মপ চেইন – গলার মোটা চেইন

মাড়কি – মাকড়ি (কানের গহনা)

হস্তা – সস্তা

মোতোন – মতো

যেবা – যেরকম

হেবা -সেরকম

হেডা – সেটা

মইদ্যে – মধ্যে

টেলকা – ঠান্ডা

ভাষা কথা – শুদ্ধ ভাষায় কথা

ছাইন্যা – ছুয়ে

বাদাইম্মা – বখাটে

কুনকার – কোথাকার

তুইতি – তুই

ঠেটাম – তরকাতরকি

বিয়া – বিয়ে

আলানে – আংগিবায়

পালানে – বাড়ির সামনের ক্ষেত

গোয়াইল ঘর – গুরুর ঘর

নিদারুণ – নিষ্ঠুর

নইছেন – নিয়েছেন

পংখী – পাখি

নাও – নৌকা

Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/




বুইড়া কিলায় দারুম দুরুম

বুইড়া কিলায় দারুম দুরুম

(সংগৃহিত হাস্তর ও গীত)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

[আমাদের সখিপুরের গ্রাম এলাকায় ছোটবেলা লোক মুখে কিছু গল্প শুনতাম। সেগুলোকে বলা হতো হাস্তর। সুর করে কিছু কবিতা ও গান গাওয়া হতো। সেগুলোকে বলা হতো গীত। আমি সেসব হাস্তর বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি গল্পাকারে আমার মতো করে। এসবের ভেতর দিয়ে আগের দিনের গ্রামবাংলার আঞ্চলিক ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশ পাবে বলে আমি মনে করি। এই লেখাটি তারই একটি অংশ]

 

জয়গনের নানী হাস্তর ও গীত শুনতে শুনতে পান চিবাচ্ছিলেন। মুখভর্তি পানের পিক জমছিল। তিনি বললেন, এজাল্যা পান মুহে দিছিলাম। পানের পিচকি ফালামু কুনু? চিলুঞ্চি আছে? ময়ফল বললো, নানী, চিলুঞ্চি একটা আছে। হেডা ভাইগ ঘরে দিছে। অহন আলা বেড়া ফাক কইরা বাইরে পিচকি ফালাইন। নানী বললেন, বেড়ার ফাক দিয়া পিচকি ফালাইলে ঘরের পিড়ার উপুর পড়ব। হেইন্যা আবার আমার নাতিনেরই নেপন নাগব।

– নানী, আন্নের নাতীনে কি উঠান হোরবার পায়?

– পায়। নাতীনের মায়ে হগল কামই হিকাইছে।

– দেকবাইন, বিয়াইন্নাবালা পাড়ার মানুষ ভাইংগা চুইরা নয়া বউ দেকবার আইব। ভাবী যেসুম হলা দিয়া উঠান হোরা দিব হেসুম হগলেই কুতকুতাইয়া চাইয়া থাকব। বাড়িভর্তি বিয়াবাড়ির আওজা। সব আওজা ভাবীরই হোরা দিওন নাগব। পাবত?

– পাব, আংগ নাতীনের ক্ষেম আছে। অহল আলা গীত গাও।

আম্বাতন বললো,

-আংগ গেন্দু ভাই বিয়ার আগে বাইত্যে নাপিত আইন্যা চুল কাটছাল। নাপিত আংগ বাইত্যে বছরগারী চুল কাটে। তারজন্যে আমরা উনা মাসে আর বাইস্যা মাসে বছরে দুইবার ধান দেই। হেই নাপিত গেন্দু ভাইর চুল কাইটা ১০০ টেহা নিলো গা। ৫০ টেহা হাদছাল। নাপিতে মজ্জাল নিলনা। খেউরি করার সময় নছুর বউরে আনছাল গীত গাবার নিগা। এই গীত গাইছাল-

নাপিত ভাইয়ো, নাপিত ভাইয়ো,

আংগ বাইত্যে আইয়ো রে,

আংগ বাইত্যে আইয়ো রে।।

আমার ছেলেরে কামাইয়ো রে

আমার ছেলেরে কামাইয়ো রে।।

ভালা কইরা না কামাইলে,

জুতার বারি খাইবা রে।

ভালা কইরা কামাইলে নাপিত

ভালা সিদা পাইবা রে।

ভালা কইরা না কামাইলে,

খরমের বারি খাইবা রে।

ভালা কইরা কামাইলে নাপিত,

কলসি পাইবা মাইন রে।

ভালা কইরা না কামাইলে,

পয়টার বারি খাইবা রে।

ভালা কইরা কামাইলে নাপিত,

ধুতি পাইবা মাইন রে।।

-নানী, গেন্দু ভাইরে যেসুম গোসল করাইল হেসুম যে গীত গাইছাল হেইডা গাই?

– গাও।

গোসল মিয়া গোসল করে,

ঐ বাবাজির সানেবান্ধা ঘাটে।

ঐ চাচাজির চিতলবান্ধা ঘাটে।

সেওনা সানের আশে গ পাশে,

ময়ুর কি উড়ে ঝাকে ঝাকে।

সেওনা সানের আশে গ পাশে,

জবা ফুল রুইলাম সাইরে সাইরে।

বকুল ফুল রুইলাম সাইরে সাইরে।

কেওয়া ফুল রুইলাম সাইরে সাইরে।

সেওনা সানের আশে গ পাশে,

কবুতর উড়ে ঝাকে ঝাকে।

গোসল মিয়া গোসল করে,

বাবাজির সানেবান্ধা ঘাটে।

চাচাজির চিতলবান্ধার ঘাটে।

– তারপর, আর মোনে নাই। বুইড়ার গাহানডা গাই?

– গাও। ভালাই নাগতাছে।

বুইড়ার নিগা ভাজলাম পিঠা,

বুইড়া রইলো চালে উইডা।

আমি মইলাম, মইলাম রে,

দারুণ বুইড়ার জ্বালায় মইলাম।

আমি মইলাম, মইলাম রে,

দারুণ বুইড়ার জ্বালায় মইলাম।

বুইড়ার নিগা ভাজলাম উরুম,

বুইড়া কিলায় দারুম-দুরুম।

আমি মইলাম, মইলাম রে,

দারুণ বুইড়ার জ্বালায় মইলাম।।

ময়ফল বললো -তরে বুইড়া জামাই দেইখা বিয়া দিওন নাগব। খালি দারুম দুরুম কিলাব।

আম্বাতন বললো – দেহুনছে নানী, এবা করলে কি গাহান করন যায়?

২৭/১/২০২১ খ্রি.

 Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/




পায়েস চোর নশা

পায়েস চোর নশা

(সংগৃহিত হাস্তর ও গীত)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

[আমাদের সখিপুরের গ্রাম এলাকায় ছোটবেলা লোক মুখে কিছু গল্প শুনতাম। সেগুলোকে বলা হতো হাস্তর। সুর করে কিছু কবিতা ও গান গাওয়া হতো। সেগুলোকে বলা হতো গীত। আমি সেসব হাস্তর বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি গল্পাকারে আমার মতো করে। এসবের ভেতর দিয়ে আগের দিনের গ্রামবাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশ পাবে বলে আমি মনে করি। এই লেখাটি তারই একটি অংশ]

 

ময়ফল বললো, অহনআলা কণ্যার পক্ষের গীত হুনমু। বিয়ানি একটা গীত হুনাইন। জয়গনের বোন বললো, আমি অত গীত জানি না। জয়গন বুবুর বিয়ার আগের দিন আইয়রির বারা ভানার সুম আমরা যে গীত হুনছিলাম হেইডার কিছু কিছু মোনে আছে। আংগ পাড়ার গাদূর বউ বরা গীত জানে। বিয়ার দিন তারে বেইক্কেই নাইয়র নেয় গীত গাওনের নিগা। কেউ মরলেও মউতা বাড়ি গিয়া গালে আত দিয়া বইয়া বইয়া বিলাপ কইরা কান্দে। তার একটা পোলা ছোট থাকতেই মইরা গেছিল। হেসুম এবা কইরা বিলাপ কইরা কানছিল।

আমার বাবা খাইল না, নইল না এক্কু ছেইরে মইল রে, অ বাবা। বিয়ার আগের দিন আংগ পাড়ার সব ছেড়িরা মিল্যা আইয়রির বারা বানছি গীত গাইয়া গাইয়া গাদুর বউয়ের নগে। কিছু কিছু আমার মনে আছে। তাইলে গাই আয়োরির গীত-

ডেহির গলায় গুগুরা,

ডেহির গলায় মেগুরা।

ওরপাইয়া দিছি আমরা

নানান শাইলের বারা রে।।

হেওনা বারা পারাইতে,

উঠিয়া গেল আমার দীঘল ঠ্যাংগের বিষ অ রে।

হেওনা বারা আলাইতে

উঠিয়া গেল আমার আতের কব্জার বিষ অ রে।।

হেওনা বারা ঝারিতেতে

উঠিয়া গেল আমার দীঘল ডেনার বিষ অ রে।।

হশুর আমার কবিরাজ,

ভাশুর আমার ইজাদার,

ঝাড়িয়া নামায় আমার দীঘল ঠ্যাংগের বিষ অ রে।

ঝাড়িয়া নামায় আমার দীঘল পাখনার বিষ অ রে।

ঝাড়িয়া নামায় আমার দীঘল ডেনার বিষ অ রে।

জয়গন বুবুরে যেসুম বিদায় দিল হেসুম গাদুর বউ ওশারে বইয়া বইয়া বিয়ার গীত যাইতাছাল এবা কইরা –

উত্তর থিগা আইল রে ভোমরা সোনার মেকুর পায় রে,

সুন্দর ময়না আ রে।

আগে যদি জানতামরে ময়না তরে নিবো পরে রে,

সুন্দর ময়না আ রে।

ময়নার মায়ে কাইন্দারে কইছে, ময়না নাই তার ঘরে রে, সোনার ময়না আ রে।

আমি পাটার চন্দন পাটায় রে থুইয়া ময়না আনতাম ঘরে রে সোনার ময়না আ রে।

ময়নার বাপে কাইন্দারে রে কইছে, ময়না নিবো পরে রে, সোনার ময়না আ রে।

আলের গরু বন্ধক রে থুইয়া ময়না আনতাম ঘরে রে সোনার ময়না আ রে।

ময়নার চাচি কাইন্দারে কইছে, ময়না নাই তার ঘরে রে সোনার ময়না আ রে।

কাইল এমুন সোম ময়নারে আমার ঘরে কোরান পড়ে রে সোনার ময়না আ রে।

উত্তর থিগা আইল রে ভোমরা সোনার মেকুর পায় রে সোনার ময়না আ রে।।

অহন আলা হাস্তর কইন ময়ফল বিয়ানি।

ময়ফল হাস্তর শুরু করলো।

এক গেরামের এক নশা বিয়া করতে হশুর বাড়ি গেলো। নশার বাড়ির অবস্থা মোটামুটি ভালা অইলেও তারা খুব কিরপিন আছাল। কোনদিন ভালা জিনিস কিন্যা খায় নাই। তরকারি না থাকলে সাদা জাউ রাইন্দা খাইত। কোনসুম মিঠা জিনিস খাইতে মোনে চাইলে মিঠাই দিয়া নাল খির রান্না কইরা খাইত। তারা বেশী দাম দেইখ্যা জাবা চিনি কিনত না। খালি কিনত কুশাইরা চিনি আর খেজুইরা মিঠাই আর পাটাগুর।

– জাবা চিনি কোনডা?

– ঐ যে, সাদা চিনি। যেডারে সাব চিনি কয়। সাব চিনি দিয়া পায়েস রান্ধন করলে সাদা জাউয়ের নাগালই দেয়া যায়। নশায় কোনদিন পায়েসই দেখছাল না। বিয়া করতে গিয়া মোরগের গোশত দিয়া নশায় পেট ভইরা ভাত খাইছাল। ভাত খাওয়া শেষে নিয়া আইল পায়েস। পায়েস দেইখা নশা মোনে করলো জাউ আনছে। নশা মোনে মোনে গোসা করলো, বিয়ার দিন একটু মিঠা খির খামু, তা না, নিয়া আইছে সাদা জাউ। খামু না সাদা জাউ। কিন্তু নশা দেখলো সবাই থালি ভইরা সাদা জাউ খাইল মজা কইরা। থালি চাইটা খাইলো, আংগুল চাইটা খাইলো। ব্যাপার কী? ভরা পেটে এত জাউ খাবার রহস্য কী? সাদা জাউ এবা কইরা খাইল বেকেই? সব ইস্টি ঘরে থনে বাইরে গেলে নশা করলো কী, দুই চাইরডা পায়েসের ছিটা দস্তরখানায় পইড়া আছাল। হেইগনা খুইটা মুখে দিয়া দেহে, হায়রে মিঠা। জাউ এবা মিঠা অইল কিবায়? ভাগগেতনা গ, বেবাকেই মজা কইরা খাইল। কী ভুলডাই না করলাম জাউ মোনে কইরা ইডা না খাইয়া। নশা সারাক্ষণ আফসোস করতে নাগল মোনে মোনে। বাসর ঘরে বইয়াও তার হেই আফসোস। বউয়ের হোমকে বইয়া ঐ এক ধ্যান, কী ভুলডাই না অইছে জাউ না খাইয়া! নয়া বউয়ের নগেও তিমন কতা কইল না। দোয়াত নিভাইয়া হুইয়া পড়লো। বউ ঘুমাই পইরা নাক ডাকতে নাগল। নশার আর ঘুম আহে না। হে করল কী, অসতে কইরা দুয়ার খুইল্যা, দুয়ারের পাল্লা চাপাইয়া দিয়া রান্ধন ঘরে ঢুইক্যা পড়লো। আন্ধাইর ঘরে আতাপাতা কইরা সিকার উপর একটা বুরকা পাইল। বুরকার ঢাকনি খুইলা ভিতরে আত দিয়া আংগুল দিয়া আইনা চাইকা দেহে হেই মিঠা জাউ। বুরকা পাইরা আন্ধার গুইন্ধারই গ্যাতগ্যাতি খাইয়া সব পায়েস শেষ কইরা ফালাইল। নশার হউরি সকালে পায়েস নাস্তা দেওয়ার জন্য এক বুরকা পায়েস রাইখা দিছাল। হেই পায়েস নশায় চুরি কইরা খাইয়া ফালাইল। যেই বুরকাডা আবার সিকায় উঠাবার নুইছে অবাই আত থিগা পইরা ভাইংগা গেছে মাটির বুরকা। শব্দ হুইন্যা নশার হউরি তার পোলারে কইছে, দেখছেগ গেদা, রান্ধর ঘরে চোর আইছে নিহি। কীবা জানি শব্দ পাইলাম। নশার সুমুন্দি রান্ধন ঘরের দুয়ারে কাছে গেতেই নশায় টের পাইয়া দিছে নোড়। সুমুন্দিয়ে চোর মনে কইরা নশারে ঝাপটাইয়া ধইরা ফালাইয়া কয়, চোর ধরছি, চোর ধরছি। হউরি দোয়াত নিয়া আইয়া দেহে নশারেই ধইরা রইছে সুমুন্দিয়ে।

২৬/১/২০২১ খ্রি.

 
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/




আজিরন

আজিরন

(সংগৃহিত হাস্তর ও গীত)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

[আমাদের সখিপুরের গ্রাম এলাকায় ছোটবেলা লোক মুখে কিছু গল্প শুনতাম। সেগুলোকে বলা হতো হাস্তর। সুর করে কিছু কবিতা ও গান গাওয়া হতো। সেগুলোকে বলা হতো গীত। আমি সেসব হাস্তর বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি গল্পাকারে আমার মতো করে। এসবের ভেতর দিয়ে আগের দিনের গ্রামবাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশ পাবে বলে আমি মনে করি। এই লেখাটি তারই একটি অংশ]

 

জিগিরনের হাস্তর শেষ হবার পর ময়ফল বললো, আমি এইডার পরে আজিরনের হাস্তর কমু। তার আগে আম্বাতন গীত গাবো। এই আম্বাতন, তর গীত মনে অইছে? আম্বাতন বললো

– আহারে! আংগ পাড়ার আজিরনের মেয়াডা জয়না গাছের ডাইলে ফাস দিয়া মইরা গেছে। মেয়াডা কী খপছুরত আছিলো! মেয়াডা মইরা গেলো।

– হেডার জানি কুনু বিয়া অইছাল?

– হাবলা পাড়ায় বিয়া অইছাল। অনেক দুরাপি। তার হশুরডা খুব হারামজাদা আছাল। হউরিডাও আছাল জাউরা। জামাইডা খালি মায়ের কান কথা হোনত। জামাইডা খালি ছেড়িডারে আইল্যা পাজুন দিয়া বাইরাইত। আজিরনের বাপের কাছে খালি টেহা পয়সা চাইত। ছেড়িডারে বাপের বাড়ি আইতে দিত না বেশী। ছেড়িডার বাপে কত কানত। গামছা দিয়া খালি চোউখ মুছত। মেয়াডা বিলাপ কইরা বাপেরে হুনাইয়া হুনাইয়া কইত

কত ভা ~ ত খাইছিলাম বাপজান, দূরে দিছালা বিয়া,

এহন ক্যানে কানছ গ বাপজান, চৌখে গামছা দিয়া?

আহারে, ছেড়িডা ফাস দিয়া ঝুইল্যা আছাল জয়না গাছের ডাইলে। এতানি জিবলা বাইরই আছাল। বড় বড় চোউক কইরা চাইয়া আছাল। মনে অইয়া ডর করতাছে। দেইখা মাইনষে ছেড়িডারে কিবা বকাঝকা করলো গ ! কয় কী, ছেড়িডা মইরা নিহি ভুত অইয়া যাবো। ছেড়িডারে নামাইয়া আইন্যা চাপড়া মাটি দিয়া ফালাইছে উত্তরমুরা জোংগলে। ভুতের ডরে অহন উমমুরা কেউ যায় না।

– এই ছেড়ি, এত রাইত কইরা ভুতের পেঁচাল পারতাছস? ডর করতাছে। আমি চাইছিলাম আজিরনের হাস্তর কইতে। ও কওন নাগল আজিরনের মেয়ার হাস্তর।

এমন সময় ঘরের ভেতর একটা বিশ্রী দুর্ঘন্ধযুক্ত বায়ুর উপস্তিতি সবার নাকে অনুভত হলো। গেন্দুর নানী শাশুড়ী বললেন, ক্যারা জানি ডরের চোটে পেটের বাতাস ছাইড়া দিছে। কুচ্চুইরা গোন্ধ ছোটছে। ঘরডা এহেবারে জ্বালাইয়া ফালাইছে। ওয়া, ওয়া। বিছুন দিয়া বাতাস করো। দুয়ার জানলা খুইলা দেও। আমি আর থাকবার পারলাম না। একটু বাইরে গেলাম। আত-মোক ধুইয়া আবার আইতাছি। আজিরনের হাস্তর হুনমুনি আইয়া।

বাইরে থেকে ফিরে এসে নানী বললেন,

– তোমগো বাওবেড়ার পিছন দিক দিয়া কী জানি দৌড়াইয়া গেলো। আন্ধাইরের ভিতর দিয়া ভালা বুঝা গেলো না। আমি অচম্বিতি চইমকা উঠছিলাম। মোনে অইল ওডা হেওজা। শৈলে কাটা কাটা মনে অইল।

– অইতে পারে। আংগ বাড়ির কাছে ঝোপের ভিতর দুইডা গেওজা থাহে। মইদ্যে মইদ্যে ঘরের পাছের মোতখাইরে হেওজার কাটা পইরা থাকে। নানী হোইন। অহন গোন্দ নাই।

– অবা কাম কেউ আর করবা না। ক্যারা জানি গীত গাবার চাইছিলা? গীত গাও।

আম্বাতন গীত ধরলো-

ঘরের পাছে নাড়ার পালা,

মোনে উঠে নানান জ্বালা।

ঘরের হাইনচায় কলি বাগুন,

মনে জ্বলে নানান আগুন।

আউস কইরা কিনলাম বৈয়ম,

বৈয়ম ভাংলাম বাপের বাড়ি।

নিজের যুদি স্বোয়ামী থাকত,

বৈয়ম থিগা মিঠাই খাইত।

পরাণ কানছে রে বিয়া ববার নিগা।

আউস কইরা কিনলাম থালি,

থালি ভাংলাম বাপের বাড়ি,

নিজের যুদি স্বোয়ামী থাকত,

থালি ভইরা ভাত খাইত।

পরাণ কানছে রে বিয়া ববার নিগা।

আউস কইরা কিনলাম গেলাস,

গেলাস ভাংলাম বাপের বাড়ি।

নিজের যুদি স্বোয়ামী থাকত,

গেলাস ভইরা পানি খাইত,

পরাণ কানছে রে বিয়া ববার নিগা।।

ময়ফল বললো,

– এই আম্বাতন, তুই খালি স্বোয়ামীর গীত গাস ক্যান। আসলে তোর অহন ভাতারের বাইত্যে যাওয়ের ইচ্ছা অইছে। কাক্কুরে কওন নাগব তোরে বিয়া দিবার জন্য।

– এবা কইরা কতা কইলে গীত গাওন যাবো? আমি গীত গাবার পামু না। তুই আজিরনের হাস্তর ক।

– হোন তাইলে।

আজিরনের চেহারা ছিলো খপছুরুতের। হে আছাল দীগলা। তার জামাইডা আছাল খাট্টা। খাট্টা অইলে কি অব বেডা বড় খাইচ্চুইরা আছাল। কতায় করায় আজিরনের গতরে আত তুলত। মইদ্যে মইদ্যে আইল্যা পাজুন দিয়া বউরে বাইরাইত। জামাইর নাম আছাল আলী। আলীর মাও জাউরা আছাল। হেও আজিরনের উপুর আত তোলত। এই জন্যে পাড়ার পোলাপান ছিলকি বানাইছাল, নাইল্যা ক্ষেতে বেজির ছাও, বউ কিলাইন্যা আলীর মাও। আজিরনের হশুরডাও হারামজাদা আছাল। আজিরন কতা কইত মিলাইয়া মিলাইয়া।

– কিবা কইরা কইত?

– মিলাইয়া মিলাইয়া। একবার একটা কাইতান্যা দিনে আজিরন রান্ধন ঘরে আইসাল পাড়ে বইয়া আগুন তাপাইতাছাল। আজিরনের হশুর বইয়া আছাল বড় ঘরের ওশারে। রান্ধন ঘরে থনে কয়েকটা শব্দ পাইল আজিরনের হশুরে।

বৌরে হইছ করলো – বৌ ফোট্টে কী?

আজিরন কইল – কাঠঠলের বিচি।

হশুরে কইল – আনছে বৌ খাই।

আজিরন কইল – পুইড়া অইছে ছাই।

হশুর আজিরনের হউড়িরে কইল, দেহছে রান্ধন ঘরে ঠাস ঠুস শব্দ অয় কোন থিগা। বউরে হইছ করলাম, কইল কাঠলের বিচি ফোঠে। আনবার কইলে কয় যে পুইড়া গেছেগা। হউড়ি রান্ধন ঘরে গিয়া দেখলো কাঠলের বিচির নাম গোন্ধও নাই। আছে দুর্গোন্ধ। কিয়ের গোন্ধ তাও বুইজা ফালাইল হউড়ি। বৌইয়ের চালাকির কতা হশুরেরে কইয়া দিল। হশুর রাগ কইরা বইশুইদ্ধা পোলারে ভিনো কইরা দিল। আজিরনেরা পশ্চিমমুরা চালায় গিয়া নয়া বাড়ি বানাইল।

আজিরনেরা নয়া বাইত্যে ভালাই আছাল। অচমবিতি একদিন আজিরনের জামাই আজিরনরে আইল্যা পাজুন দিয়া থরা দিছিল ভাত রান্ধন অইতে একটু দেরি অইছাল দেইখ্যা। থরা খাবার পর আজিরন রাগ কইরা ততা ভাতের মইদ্যে পানি দিয়া রান্ধন ঘরের ছিকায় রাইখা হুইয়া রইলো। এবা কইরা তিন দিন গেলো, আজিরন জামাইর নগে রাগ কইরা কথা কয় না। আজিরনের পোলাইপান ছোলাইপান আছাল না। তাই বাড়িডা এহেবারে নিঝঝুম মাইরা গেছাল। হেদিন আছাল হুনিবার। হুনিবার- মোঙ্গলবারে চাপড়া বিল বাইয়া সবাই মাছ মারত। হেদিন ধল পহরের সোময় থিগা আশ পাশের গেরামের শয় শয় মানুষ চাপড়া বিলের বাওয়ার মাছ মারতে যাইতাছাল। বিলে যত বেশি মানুষ নামবো মাছও তত বেশী গাবাবো। তাই ডাকাডাকি পাইরা সবাই মাছেরে যাইতো। অনেকেই শিংগা ফুয়াইয়া ডাকতো ভো ভো কইরা। বড় বড় মইষের শিংগা হেগনা। দুই তিন মাইল দূর থিগা হেই শিংগার আওজ হোনা যাইতো। আজিরনের জামাই রান্ধন ঘরের ডেহির উপুর বইয়া উক্কা খাইতাছাল। আজিরন চিন্তা করলো ভালা অউক মোন্দ অউক স্বোয়ামীই ত মারছে। রাগ কইরা থাকলে নিজেগ সোংসারেরই নোকসান। তাই সোজাসুজি কতা না কইয়া বেহা কইরা কতা কইতে নাগল।

আজিরন জামাইরে হুনাইয়া হুনাইয়া কইল-

ভ্যা বাজে, ভো বাজে, বাওয়ায় ক্যানে যায় না?

জামাইয়ে কইল –

তিন দিন ধইরা খাই না ভাত

ক্যামনে মারমু বাওয়ার মাছ?

আজিরন কইল –

সিকার উপুর পান্তাভাত পাইরা ক্যানে খায় না।

জামাই আজিরনের থনে খাটা আছাল। ছিকার ভাতের ভুরকা নগুল পাইল না। তাই কইল-

কেই দিলগা কেউ খাটা নগুল ত পাই না।

আজিরন কইল-

ফিড়ার উপর ফিড়া থুইয়া পাইরা ক্যানে খায় না।

জামাই ফিড়ার উপুর ফিড়া রাখার পর দেহে যে ফিরা থুকুরবুকুর নড়ে। তহন কয়-

ফিড়া নরে টাকুর টুকুর,

পইড়া যুদি মরি!

আজিরন কয়-

আগে ক্যানে জানছিল না মর্দা মাগি ধইরা থরি?

এটুকু শোনার পর আম্বাতন বললো,

– আসলে যারা বৌরে ধইরা থরা দেয় তারা মর্দা মানুষ না। তারা অইল মাইগ্যা মানুষ।

শুনে ময়ফল বললো,

– তরে মাইগ্যা মাইনষের কাছেই বিয়া দিওন নাগব। যাতে তরে থরে।

– অবা মাইনষের কাছে বিয়াই বমু না।

– তর কাছে হুইন্যা কি তরে বিয়া দিবো? কাক্কু যার নগে তর বিয়া ঠিক করে তার কাছেই কবুল কইতে অইবো। বাদ দে। অহন হাস্তর হোন।

ফিড়ার উপর ফিড়া বহাইয়া তার উপর খারইয়া কাপতে কাপতে আজিরনের জামাই সিকার উপর থনে পান্তাভাত নামাইয়া এক নলা মুখে দিয়া দেহে যে পাইছা। খুটির থনে নুন নিতে গিয়া দেহে নুনের মইধ্যে পানি উঠছে। হেইজন্যে আইসাল পাড়ে দিয়া রাখলো হুকানোর। নুন হুকাইয়া যেসুম গটগটা শক্ত অইয়া গেছে হেসুম নুন খুটির থনে আর তুলতে পারে না। হেসুম জামাই কয়-

গটগটা গট।

আজিরন কয়-

নাহইর কাঠি ল নাহইর কাঠি।

জামাই নাহইর দিয়া ঘইষা নুন তুইলা পান্তাভাত খাইয়া চাক জাল কান্দে নইয়া বিয়ান বেলা বাওয়ার মাছ মারতে গেলো। হারাদিন পরে বিয়ালপারা ইয়া বড় একটা আইড় মাছ নিয়া বাইত্যে আইলো। আজিরন দেইখ্যা খুশী অইয়া জামাইর কান্দে থিকা মাছ নামাইয়া নিলো। এতো বড় একটা আইড় মাছ।

জয়তনের নানী বললেন, হাস্তরডা ভালাই নাগলো। গলা হুকাই গেছে। পানি তুলাস নাগছে। দোয়াত ধরাও। ময়ফল বললো, নানী, জিয়াবাতি আনি নাই। দোয়াত ধরামু কী দিয়া। দোয়াতে মনে অয় কেরাইস তেলও নাই।

২৪/১/২০২১ খ্রি.

Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/




জিগিরন

জিগিরন

(সংগৃহিত হাস্তর ও গীত)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

[আমাদের সখিপুরের গ্রাম এলাকায় ছোটবেলা লোক মুখে কিছু গল্প শুনতাম। সেগুলোকে বলা হতো হাস্তর। সুর করে কিছু কবিতা ও গান গাওয়া হতো। সেগুলোকে বলা হতো গীত। আমি সেসব হাস্তর বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি গল্পাকারে আমার মতো করে। এসবের ভেতর দিয়ে আগের দিনের গ্রামবাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশ পাবে বলে আমি মনে করি। এই লেখাটি তারই একটি অংশ]

 

নাক কাটার হাস্তর শুনার পর নানী বললেন, হাস্তরডা খুব ভালা অইছে। কিছুক্ষণ পর নানী একটা হাই তুললেন। ময়ফল বললো, নানী, অবা আম নিয়াস পারতাছুন ক্যা, ঘুম আইতাছে নিহি? নানী বললেন, ব্যাল ঘুম আইছিলাম। কও আরও হাস্তর কও। আম্বাতন বললো, তার আগে আমার গীত হুনুন। নানী বললেন, গাও তুমি গাও।

বাইর বাড়ি করাতি,

দুধের আওটা চড়াইছি।

দুধ থুইছি জুরাইয়া

কলা থুইছি এরাইইয়া

আমার বাবা খাবরে সাইকল দৌড়াইইয়া।…

 

তারপর জানি কি? মন নাই, আরেকটা গাই।

 

জাংলা তলে খারই রইছি দুলাভাই আইতাছে।

অ দুলাভাই দুলাভাই গ, বুবু কিবা আছে গ?

তোমার বুবুর কান্দনে, নদীর কূল ভাংগনে।

জাংলা তলে খারই রইছি ভাই আইতাছে।

অ ভাই ভাই গ, ভাবী কিবা আছে গ?

তোমার ভাবীর কান্দনে, নদীর কূল ভাংগনে।

জাংলা তলে খারই রইছি খালু আইতাছে,

অ খালু খালু গ, খালা কিবা আছে গ?

তোমার খালার কান্দনে, নদীর কূল ভাংগনে।

জাংলা তলে খারই রইছি, ফুবা আইতাছে।

অ ফুবা ফুবা গ, ফুবু কিবা আছে গ?

তোমার ফুবুর কান্দনে, নদীর কূল ভাংগনে।

জাংলা তলে খারই রইছি বাজান আইতাছে।

অ বাজান বাজান গ, মাইয়া কিবা আছে গ?

তোমার মায়ের কান্দনে, নদীর কূল ভাংগনে।।

 

এতটা গাওয়ার পর ময়ফল বললো, এই ছেড়ি, তুই এবা কইরা গীত গাইলে ত হারা রাইতেও তর গীত গাওয়া হেষ অবো না। তোর আত্মিয়স্বজন, ভাই বেরাদর আইতেই থাকপ। তুই গীত গাইতেই থাকপি। এইডা বাদ দিয়া আরেকটা গা। আম্বাতন বললো, তাইলে এইডা গাই-

আতে দিছি মেন্দি, পায়ে দিছি আলতা।

দেহুন ছে গ দুলাভাই কিবা দেহা যায়।।

হাতে দিছি মেন্দি, পায়ে দিছি আলতা।

দেহুন ছে গ মিয়া ভাই কিবা দেহা যায়।

– আবারও তুই একই কতা বারবার কইতাছস?

– এবা কইরাই ত গীত গাইতে অয়।

– ভালা দেইখ্যা একটা গা।

– মেসি দিলে ঝিক ঝিক করে,

সুরমা দিলে চিক চিক করে।

– আংগ নাহার বু দাঁতে মেসি দেয়, কিবা ঝিক ঝিক করে। তাই না?

– নাহার বুর জামাই চোখে সুরমা নাগায়। কিবা চিক চিক করে। তাই না?

– মাইনষের জামাইর আলাপ না কইরা তুই গীত গা।

– তুই হাস্তর ক। আমি গীত মনে কইরা নই। অনেকদিন ধইরা গীত গাইনা ত। এই, জিগিরনের হাস্তরডা ক।

এক দেশে আছাল এক রাজা। রাজার বউয়ের নাম আছাল জিগিরন। জিগিরনের পোলাইপান অইত না। তাই রাজারে বেক্কে আটকুরা কইত। রাজায় একরাইতে স্বপ্নে দেখলো এক দরবেশ কইতাছে, তুই যুদি বিরাট একটা পুস্কুনি খোদস তাইলে তর বউয়ের সোন্তান অব। রাজায় তাই বিরাট কইরা একটা পুস্কুনি খোদলো। জিগিরনের পেটে একটা মেয়া সন্তান আইল। মেয়া অইলে রাজা খুব খুশী অইল। অনেক গাতা কইরা পুস্কুনি খোদলো তারপরেও পুস্কুনিতে পানি উঠল না। তাই রাজার মন খারাপ অইলো। রাজায় আবার স্বপনে দেখলো দরবেশ কইতাছে, জিগিরনেরে গয়নাগাটি পরাইয়া পুস্কুনির মধ্যেহানে খারা কইরা রাখলে পুস্কুনিতে পানি উঠপ। রাজায় তাই করলো। জিগিরনের সারা শইলে গয়না পরাইয়া পুস্কুনির মধ্যেহানে খারা কইরা রাখল। আর রাজায় পুস্কুনির পারে খারই রইল। জিগিরনের পায়ের তল দিয়া ঝিরঝিরাইয়া পানি বাইরন শুরু অইল।

যেই নিহি জিগিরনের খারু পানি অইল, পায়ের গোলখারুডা খুইল্যা রাজার দিকে মেইল্যা মাইরা কইল, এই দিয়া পতি তুমি আরেক বিয়া কইরো। জিগিরনের ময়াদয়া ছাইড়া দিও।

যেই নিহি জিগিরনের কোমর হোমান পানি অইল। কোমরের বিছা খুইল্যা রাজার মুহি মেইল্যা মাইরা কইল, এই দিয়া পতি তুমি আরেক বিয়া কইরো। জিগিরনের ময়াদয়া ছাইড়া দিও।

যেই নিহি জিগিরনের গলা পর্যন্ত পানি অইল, গলার আরডা থুইল মেইল্যা মাইরা জিগিরন কইল, এই দিয়া পতি তুমি আরেক বিয়া কইরো। জিগিরনের ময়াদয়া ছাইড়া দিও।

যেই নিহি জিগিরনের কান পর্যন্ত পানি উডলো, কানের মাড়কি খুইলা মেইল্যা মাইরা কইল, এই দিয়া পতি তুমি আরেক বিয়া কইরো।

যেই নিহি জিগিরনের নাক পর্যন্ত পানি অইল জিগিরন আতের বালা, বাজু আর নাকের নোথ খুইল্যা মেইল্যা মাইরা কইল, এই দিয়া পতি তুমি আরেক বিয়া কইরো। জিগিরনের ময়াদয়া ছাইড়া দিও। এই কতা কোওয়ার পর জিগিরন ডুইব্যা গেলো পুস্কুনির পানিতে। পানি উইঠ্যা পুস্কুনি ভইরা গেলো।

এমমুরা দিয়া জিগিরনকে না পাইয়া জিগিরনের গেন্দি মেয়াডা দুধ খাওনের নিগা ধাওয়া কান্দন শুরু কইরা দিল। হারাদিন হারারাইত কান্দিল। কানতে কানতে মেয়াডা খালি পুস্কুনির মুহি আংগুল দেহাইল। রাজায় মেয়াডারে কোলে নিয়া পুস্কুনির পাড়ের গেলো। মেয়াডার কান্দন হুইন্যা জিগিরন পানিত থিগা মাথা বাইর করলো। রাজায় দেখল যে জিগিরন রাজার মুহি চাইয়াও দেহে না। আবার মেয়াডার দিকে ময়া কইরা চাইয়া থাহে। রাজায় একসুম মেয়াডারে পুস্কুনির পাড়ে বহাইয়া একটু দূরে গিয়া পিতরাজ গাছের পাছে পলাইয়া রইল। দেহে, জিগিরন পানিত থিগা উইঠা আইয়া মেয়াডারে বুকের দুধ খাওয়াইয়া আবার ডুব দিয়া চইল্যা গেলো। রাজায় কয়দিন এবা কইরা মেয়াডারে দুধ খাওয়াইয়া বাচাইয়া রাখলো। একদিন রাজায় একটা চালাকি করলো। জিগিরন যেসুম মেয়ারে দুধ খাওয়ার নবো, হেসুম ঝাহিজাল ফালাইয়া আটকাইয়া ফালাব। ঠিক তাই। যেই জিগিরন দুধ খাওয়ান শুরু করলো হেসুম রাজায় ঝাকিজাল ফালাইল জিগিরনের উপুর। জিগিরন জাল ছিড়ড়া ছুইট্টা গিয়া এই যে ডুব দিলো আর কোন্দিন মেয়াডারে দুধ খাওয়াইতে আইল না।

নানী ঘুমাই পরছুন?

– না, ঘুমাই নাই। হোন্তাছি। ভালাই নাগতাছে। আরেকটা কও।

২১/১/২৯২১ খ্রি.

সৌজন্যে – হাসনা ভানু বুবু, সালমা বুবু ও আজহার ভাই।

Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/