Click on Menu button if you are using mobile.
মোবাইল হলে Menu বাটনে ক্লিক করুন।

Welcome to website of Dr. Sadequel Islam Talukder


Dr. Md. Sadequel Islam Talukder
MBBS, M Phil (Pathology), MACPSenior Consultant and Chief
Hospital Clinical Pathology
Community Based Medical College Hospital Bangladesh, Mymensingh

Ex-Associate Professor and Head
Department of Pathology
Mymensingh Medical College
Mymensingh Bangladesh

.

 

Send your comment to: sadequel@yahoo.com

বউ শাশুড়ি

বউ শাশুড়ি

(ছোট গল্প)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

আজকেও বাসায় ফেরার সাথে সাথে ডাঃ হুমায়ুনের কাছে তার মা তার বইয়ের বিরুদ্ধে নালিশ দিয়ে বসলো। এটা তার একটা বদভ্যাস। ছেলের বউয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা করে রাখবেন। হুমায়ুন বাসায় ফেরার সাথে সাথে অভিযোগগুলো ক্রমাগত উপস্থাপন করতে থাকবেন। ডাঃ হুমায়ুনের স্ত্রীও তাই করেন। শাশুড়ির বিরুদ্ধে যত অভিযোগ জমা করে রাখেন। মায়ের অভিযোগ পেশ করা শেষ হবার সাথে সাথে তার জমা করা অভিযোগগুলো একে একে পেশ করতে থাকেন। ডাঃ হুমায়ূন শিশু সার্জারীতে বিশেষজ্ঞ সার্জন। এম এস (শিশু সার্জারি) পাস করেছেন। বর্তমানে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চাকরিরত আছেন। দুপুরের খাবার ক্যানটিনেই সেড়ে নেন। আড়াইটা পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে কাজ করে সরাসরি চলে যান প্রাইভেট ক্লিনিকে অপারেশন করতে। তারপর বসেন প্রাইভেট চেম্বারে। রাত অবদি রোগী দেখে আবার চলে যান প্রাইভেট ক্লিনিকে অপারেশন করতে। রাত ৯ টা বা ১০ টার দিকে বাসায় ফেরেন। শরীর ক্লান্ত হয়ে থাকে সারাদিন পরিশ্রম করার পর। মনে চায় বাসায় প্রবেশ করে বিশ্রাম নেবেন। বাসার সবাই তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবে। বউ বাসায় গেলেই তার যত্ন নেবে। কিন্তু ডাঃ হুমায়ুনের সেই সুখ নেই। প্রত্যেক দিন কিছু না কিছু মা ও স্ত্রী একে অপরের বিরোধ্যে অভিযোগ দেবেনই। মা অভিযোগ করেন

– তুই ত সারাদিন বাইরে বাইরে থাকস। দুপুরেও বাসায় আসস না। তোর বউ সারাক্ষণ জানি কার সাথে মোবাইলে কথা কয়। মোবাইলে কথা কইতে টাকা খরচ হয় না? দিনের বেলায়ও লাইট নিভায় না। সারাক্ষণ লাইট জ্বলতে থাকে। এই জন্যই মাসের শেষে কারেন্ট বিল বেশী আসে। খালি বাপের বাড়ির দিকে টাইনা কথা কয়। কিছু কইলেই তালুকদার বাড়ির মেয়া বলে টেউ দেখায়। আমিও খোনকার বাড়ির মেয়া। তালুকদার বাড়ির মেয়ার তাবে থাকি না। নাতী ছেড়াডারে স্কুলে নিয়া গিয়া বাইরে থেকে কি জানি ছাই খাইয়া আইছে। পঁচা ঢেঁকুর পারতাছে। ঢেঁকুরের দুর্গন্ধে রান্নাঘরে যাওয়া যায় না। আমি কইছি বউয়ের গ্যাস্টিক হইছে। বউ কই কী, গ্যাস্টিক নামে কোন রোগ নাই। আমার মুখের উপর কথা? তুই নাকি কইছস গ্যাস্টিক নামে কোন রোগ নাই? বউ কইল।

– আসলে আমাদের চিকিৎসা বিদ্যায় গ্যাস্টিক বলতে কোন রোগ নেই।

– ক্যারা কইছে গ্যাস্টিক নামে কোন রোগ নাই? সারাদেশের মানুষ গ্যাস্টিকে ভোগতাছে। আর তুই ডাক্তার অইয়া কইতাছস গ্যাস্টিক নামে কোন রোগ নাই। তোর বউ কয় কি, গ্যাসটিক না, গ্যাট্রাইটিস।

বউ পেছন থেকে বলে উঠলেন “তুমিই ত বলেছ, গ্যাস্ট্রিক বলতে কোন রোগ নেই। গ্যাস্ট্রাইটিস, গ্যাস্ট্রিক আলসার এগুলোকে লোকে গ্যাস্ট্রিক বলে।

শাশুড়ি বললেন “তোমরা আমার চেয়ে বেশী বুঝ? পেটের নাইয়ের গোড়ায় ব্যাথা হ’লে বলে পেটের আলসার। আর পেটে গ্যাস হ’লে বলে গ্যাস্টিক।

ডাঃ হুমায়ুন শুধু নিরপেক্ষ একটা শব্দ উচ্চারণ করলেন “অইত্ত।” তিনি কখনো মা ও বউয়ের সাথে তর্কে যান না। কারো পক্ষ নিয়েও কথা বলেন না। ইতিপূর্বে বলে দেখেছেন তাতে বাসায় অশান্তি বেড়ে যায়। এই বয়সে মা ও স্ত্রীকে জ্ঞান দেয়া যায় না। বাসায় এসে শান্ত থাকলেই শান্তি। হুমায়ুন ওয়াস রুমে চলে গেলেন। শাশুড়ি বউকে বললেন

– সারাদিন পরিশ্রম করে পোলাডা বাড়ি আইলো, তারে শান্তি দিলা না। আসার সাথে সাথে এটা সেটা বলা শুরু করলা। যাও টেবিলে খাওন দেও গা।

– আপনেই ত আগে আগে গিয়ে আমার বিরুদ্ধে নালিশ করলেন।

– যাও। আমার মুখে মুখে তর্ক করবা না। আমি খোনকার বাড়ির মেয়া।

– আমিও তালুকদার বাড়ির মেয়ে। এত অবহেলা করা যাবে না।

– হইছে। খাবার বারো গা।

বউ-শাশুড়ি মিলে-মিশেই রান্না বান্না করেন। ডাঃ হুমায়ুনের পছন্দের খাবার সাধারণত রান্না করেন। ওয়াসরুমের কাজ শেষ করে হুমায়ুন আনিকা ও অনিককে ডেকে নিয়ে টেবিলে খেতে বসলেন। আনিকা হুমায়ুনের মেয়ে। বয়স ৯ বছর। অনিক হুমায়ুনের ছেলে। ওর বয়স ৭ বছর। বাসার সবাই মিলে একসাথে খেলেন।

হুমায়ুন মাকে বললেন “মা, তোমরা বসে টিভি দেখো আমি আনিকা-অনিকের সাথে গল্প করি।” অনেক বাবাই বাসায় ফিরে সন্তানদের কাছে যান পড়া লেখা যতদুর করেছে তার ফিরিস্তি নিতে। হুমায়ুন তা করেন না। পড়ালেখার ভার তার স্ত্রী ও টিউটরদের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। ছেলে মেয়েরা দুষ্টুমি করা শুরু করলে অথবা কোন কিছু নিয়ে বাহানা করলে অথবা টিভি দেখাতে ডিস্টার্ব করলে অনেক মা-ই সন্তানদেরকে শাস্তি হিসাবে পড়তে বসতে বলেন। হুমায়ুন তার স্ত্রীকে বলে দিয়েছেন এমন না করতে। তার যুক্তি হলো “পড়তে বসাকে শাস্তি হিসাবে গণ্য করা যাবে না। সন্তানরা যেনো বুঝে না নেয় যে পড়তে বসা একটা শাস্তি। তার মতে পড়তে বসা হলো একটা আনন্দের ব্যাপার। হুমায়ুন সন্তান্দেরকে বেশীক্ষণ সময় দিতে পারেন না। তাই অল্প সময় যা পান তা যেনো সন্তানরা উপভোগ করতে পারে। তাই তাদের নিয়ে গল্প করেন, মজা করেন। শাশন ও আদরের ভার তিনি স্ত্রীর উপর ছেড়ে দিয়েছেন। সন্তানদের জন্য তিনি স্কুল শিক্ষক টিউটর হিসাবে রাখেননি। অনার্স পড়ুয়া মেধাবী ছাত্রদেরকে আর্থিক সুবিধা দেয়ার চিন্তা করেই সন্তানদের জন্য চার বিষয়ে চারজন ছাত্রকে টিউটর হিসাবে রেখেছেন। তারা বাসায় এসে পড়িয়ে যায়। তাদেরকে ভালো চা নাস্তার ব্যবস্থা করাতেও পরামর্শ দিয়েছেন স্ত্রীকে। বাংলা, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের টিউটর সবার খামেই মাস শেষে চার হাজার করে টাকা দেন নিজ হাতে টিউটরদেরকে। খাম হাতে দিয়ে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানান। ক্লাশে আরবী ও কোর আন শিক্ষার বিষয়ও আছে। স্ত্রী একদিন হুমায়ুনকে বললেন ” একজন আরবি পড়ানোর টিউটর পাওয়া গেছে আরবিতে অনার্স পড়ুয়া। বেতন বেশী দিতে হবে না। মাসে দু’হাজার টাকা। অনিকের বন্ধুকেও পড়ায় সেই চছেলেটা। খুব ভদ্র ছেলে, দরীদ্র।” তাকেও টিউটির হিসাবে রাখা হলো। হমায়ুন ভাবলেন “অন্যসব টিউটর অনার্স পড়ুয়া, দেয়া হয় চারহাজার টাকা করে। আরবির টিউটরও অনার্স পড়ুয়া। তাকে মাত্র দু’হাজার টাকা দিয়ে ঠকাব কেন?” দেয়ার সময় তার খামেও চারহাজার টাকা ভরে দিলেন। আরবির টিউটর হোস্টেলে ফিরে খাম খুলে দেখে চারহাজার টাকা। পরদিন ডাক্তার সাবকে অতিরিক্ত দুইহাজার টাকা ফেরত দিয়ে বলে “স্যার, ভুল করে আপনি খামে দু’হাজার স্থলে চারহাজার দিয়েছেন।” ডাক্তার হুমায়ুন বলেন “ভুল করে নয়। এটাই তোমার প্রাপ্য।” এরপর থেকে রেগুলার চারহাজার টাকা করেই পেতে থাকেন আরবির টিউটর। একবার মাসের প্রথম সপ্তাহে ডাঃ হুমায়ুন এক্সটার্নাল এক্সামিনার হিসাবে খুলনা মেডিকেল কলেজে পরীক্ষা নিতে যান সাত দিনের জন্য। আরবির টিউটর অনিকের মাকে বলল

– ম্যাডাম, কী বলবো, বলতে লজ্জা পাচ্ছি, ডাইনিংএর বিল বকেয়া পড়েছে। স্যারও নাই। আমার গত মাসের খামটা দেয়া হয়নি।

– ও সরি, ওকে, নো প্রোবলেম। এখনি দিয়ে দিচ্ছি। একটু বসো।

অনিকের মা একটা খামে দুইহাজার টাকা ভরে আরবির টিউটরের হাতে দিলেন। হোস্টেলে গিয়ে খুলে দেখেন মাত্র দুইহাজার টাকা। পরের দিন আবার পড়াতে এসে আরবির টিউটর বলে

– ম্যাডাম, কী বলবো, আপনি মনে হয় ভুল করে চারহাজার স্থলে দুইহাজার টাকা ভরেছিলেন খামে।

– কেনো, ভুল করবো কেনো? তোমাকে তো দুইহাজার টাকা দেয়ারই কথা। আমার সাথেই ত কথা হয়েছিলো তোমার।

– তা হয়েছিলো। তবে স্যার আমাকে প্রথম থেকেই চারহাজার করে দিয়ে যাচ্ছেন তো, তাই।

– আসলে আমি তা জানতাম না। ওকে, নো প্রোবলেম। আমি এখনই দিয়ে দিচ্ছি আরও দুই হাজার।

এমন দয়ার মন ডাক্তার হমায়ুনের। চাইল্ড বেডরুমে গিয়ে বাচ্চাদের সাথে নিয়ে শুয়ে শুয়ে গল্প করার জন্য প্রবেশ করলেন হুমায়ুন। আনিকা ও অনিক হুমায়ুনের দুপাশে শু’লো। আনিকা বলল

– বাবা, তুমি হাসপাতালে কী করো?

– আমি শিশুদের অপারেশন করি।

– কী অপারেশন করো?

– অনেক ধরনের অপারেশন করি। কোন কোন শিশু মায়ের গর্ভ থেকেই পায়খানার রাস্তা বন্ধ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। পায়খানা করতে না পেরে তিন চার দিন পরই শিশুটি মারা যেতে পারে। আমি অপারেশন করে পায়খানার রাস্তা বানিয়ে দেই। বাচ্চা বেঁচে যায়। বাচ্চার বাবা মা খুশী হয়। আরও অনেক ধরনের সমস্যা বাচ্চাদের হয়। সেগুলোর অপারেশন করে আমি বাচ্চা বেঁচে যাওয়ার ব্যবস্থা আমি করে দেই আল্লাহর রহমতে। প্রতিদিন এমন অনেক বাবা মা দাদা দাদীকে খুশী করে ক্লান্ত হয়ে আমি বাসায় ফিরি।

– বাবা, তোমার জন্য আমার খুব কষ্ট হয়। তুমি সারাদিন কষ্ট করে ক্লান্ত হয়ে রাতে বাসায় ফেরো। আর দাদী ও আম্মু তোমার কাছে হাজারো নালিশ দিতে থাকে। ওনারা এমনটা না করলেও তো পারতেন। শুধু শুধু হালকা ব্যাপার নিয়ে তোমাকে বিরক্ত করে। আচ্ছা বাবা, যে সব বৃদ্ধ মহিলা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায় তারা বাসায় ঝামেলা করতো?

– তোমার মা ও দাদী দু’জনই ভালো মানুষ। তারা একে অপরকে ভালো বাসে। কিন্তু ওনাদের একটু পার্সনালিটি ডিসর্ডার আছে।

– সেটা কেমন?

– পৃথিবীতে যত মানুষ আছে একজন মানুষের চেহারাও আরেকজন মানুষের মতো না। এটা আল্লাহর একটা বিরাট মহিমা। তেমনই একজনের মনের অবস্থা আরেকজনের মনের অবস্থার মতো না। কারো ধৈর্য বেশী, কারো দৈর্য কম। আমি সারাদিন বাসায় থাকি না। তোমার আম্মু ও দাদী বাসায় থাকে। পেটে অনেক কথা জমা থাকে। আমি এলেই ছেড়ে দেয়। কথা ধরে রাখার দৈর্যগুণ তোমার আম্মুরও নেই, আমার মারও নেই। কিন্তু ওনাদের আর সব ঠিক আছে। আমি এটা বুঝতে পারি তাই দৈর্য ধরে থাকি। মা যত বিরক্তই করুক ‘উ’ শব্দটি উচ্চারণ করা যাবে না। মা আমাদের জন্য কত কষ্ট করেছেন! পিচ্ছিকালে কত অসহায় ছিলাম! একটা মশা তাড়ানোর জ্ঞানও ছিলো না। মায়ের কোলেই পেছাব পায়খানা করতাম। মা পরিস্কার না করে দিলে পঁচেগলে মরে যেতাম। মায়ের কষ্টের কথা বলে কি শেষ করা যাবে? এমন দরদী মা যত কষ্টই দিক না, একটুও বিরক্ত হবো না। যত ঝামেলাই করুক না মাকে আমি বৃদ্ধাশ্রমে দেব না।

– আমার স্কুলের এক বান্ধবির দাদী বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন। বাসায় থাকলে নাকি তাদের বাসায় খুব ঝামেলা হয়। আমাদের কী মজা! আমাদের বাসায় দাদী আছে। দাদী আমাদের কত আদর করে! দাদীর কাছে বসে থাকলে আমার মাথায় চুলের ভেতর দিয়ে আঙ্গুল চালায়। বলে নিক আইনা দেই। বলি নিক কী? নিক নাকি উকুনের ডিম। উকুন পাবো কই? আমি ত নিয়মিত শেম্পু দিয়ে গোসল করি।

– আসলে তোমার দাদী মাথায় নিক খোঁজে না। তোমার মাথায় হাত বুলাতে তার ভালো লাগে, তাই। দাদী আমার মাথায় হাত বুলালে আমারও ভালো লাগে। অনিক দাদীকে মাথায় হাত বুলাতে দেয় না। ওর কার্টুন দেখতে অসুবিধা হয়, তাই।

অনিক বলে

– আমি কার্টুন দেখি না।

হুমায়ুন বলেন

– ঠিক আছে, অনিক কার্টুন দেখে না। আনিকা, তোমরা কি মনে করো তোমার দাদী আর তোমার আম্মুর মধ্যে সম্পর্ক ভালো না? তারা কি বাসায় সারাক্ষণ ঝগড়া করে?

– না, যা কিছু বলে তুমি বাসায় এলেই বলে। সারাদিন মিলে মিশেই কাজ করেন। এক সাথে রান্না করেন। এক সাথে টিভি দেখেন।

– তোমার আম্মু আর দাদীর মধ্যে আসলে সম্পর্ক খুবই ভালো। তারা যত খারাপ কথাই বলুক না কেন তোমরা তা কানে নিবে না। এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে কথা বের করে দেবে। অনিক, তোমার সাথে আমি আগামীদিন গল্প করবো।

– তুমি না একদিন তোমার আব্বা কিভাবে মারা গেলেন বলতে চেয়েছিলে? আজকেই বলো।

– আমি যখন অনিকের বয়সের ছিলাম তখন আমার বাবা মারা যান। তোমার কাশেম চাচ্চু ছিলেন তখন আনিকার বয়সের। আমাদের বড় করতে এবং পড়ালেখা করাতে তোমার দাদীকে অনেক সংগ্রামী জীবন যাপন করতে হয়েছে। বাবা ছিলেন মস্তবড় আলেম। ইসলামী ওয়াজ মাহফিলে মস্তবড় বক্তা ছিলেন। অনেক দূর দূরান্ত থেকে দাওয়াত করে নিয়ে যেতো ওয়াজ করার জন্য। একবার সেই দক্ষিণের সাগরপাড়ের জেলা পটুয়াখালি গিয়েছিলেন ওয়াজ করতে। সেই সময় সাগরে বিরাট জলোচ্ছাস হয়ে হাজার হাজার মানুষ সাগরে ভেসে যায়। রটনা উঠেছিলো তোমার দাদাও সেই পানিতে সাগরে ভেসে গিয়ে লাশ হারিয়ে গেছে। তিনি আমাদের এলাকার বড় মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ছিলেন। মাদ্রাসার মাঠে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ বিরাট এক গায়েবানা জানাজার আয়োজন করে। গ্রামের মানুষও ঈদগাহ মাঠে বিরাট এক গায়েবানা জানাজা পড়ে। আরেকটা জায়গায় আরেকটা গায়েবানা জানাজা হয়েছিল। তার অসংখ্য ভক্ত ছিলো। তাই এতবার জানাজা হয়েছে। খোদার কি কাম, পরের দিন ভোরে বাবা বাড়ি এসে হাজির। খবর শুনে অনেক মানুষ বাবাকে দেখতে এলেন। তারা বলাবলি করছিলেন, মাওলানা সাব, আপনি না মারা গেছেন? আমরা তিনবার আপনার জানাজা পড়েছি। হাজার হাজার মানুষ জানাজায় আপনার জন্য বেহেস্ত বাসীর জন্য দোয়া করা হয়েছে। এসব কথা শুনে বাবার মন ভেঙ্গে পড়ে। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অল্পদিন পারেই ইন্তেকাল করেন। আরও অনেক ঘটনা, সেসব আরেকদিন বলবো। এখন ঘুমিয়ে পড়। আমি তোমার আম্মুকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমি মার কাছে যাই।

হুমায়ুনের স্ত্রী বাচ্চাদের ঘুম আনিয়ে নিজ ঘরে চলে আসেন শাশুড়িকে ঘুমিয়ে পড়তে বলে। শুয়ে শুয়ে হুমায়ুনের সাথে কথা বলেন আর কিছুক্ষণ পরপর বাথরুমে যান। হুমায়ুন জিগেস করেন

– তুমি এত ঘন ঘন বাথরুমে যাচ্ছ কেন?

– পঁচা ঢেঁকুর উঠতাছে। ঢেকুরের গ্যাস খুবই দুর্গন্ধ। রুমে ঢেকুর দিলে থাকতে পারবা না।

– কী খেয়েছিলে দুপুরে?

– কী জানি নিয়ে এনেছিলেন হ্যাপি ভাবি। সবাইকে দিলেন। আমি খেলাম। মনে হয় বদ হজম হচ্ছে। বমি করতে পারলে বাঁচি।

– দুটো এন্টাসিড ট্যাবলেট চিবিয়ে খেয়ে ফেলো।

এভাবে কিছুক্ষণ জেগে জেগে কথা বলার পর উভয়েই ঘুমিয়ে পড়েন। ডাঃ হুমায়ুন পরের দিন যথারীতি হাসাপাতাল ও চেম্বার করে রাতে বাসায় ফিরে দেখেন অবাক কান্ড। আজ আর কারও অভিযোগ নেই। দড়জা খুলে দিয়েছে আজ আনিকা। “মা কোথায়” জিজ্ঞেস করাতে আনিকা তার মায়ের ঘরে নিয়ে গেলেন। অনিকও এলো। তিন জন দড়জায় দাড়িয়ে যা দেখলেন তা হলো হুমায়ুনের বউ পেট খারাপ হয়ে পানির মতো পাতলা পায়খানা হচ্ছে। দুর্বল হয়ে তিনি বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না। পাতলা পায়খানা বিছানার চাদর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে। সেই পায়খানা হুমায়ুনের মা পুরান কাপড় দিয়ে মুছতেছেন। এই দৃশ্য দেখে হুমায়ুন আনিকা ও অনিককে একটু সরিয়ে নিয়ে নিচু স্বরে বললেন “এই দৃশ্য দেখার পর কি বুঝতে পেরেছ যে তোমার দাদী তোমার মাকে কত ভালো বাসেন? অবশ্যই আমার মা তোমার মাকে নিজের মেয়ের মতো করে স্নেহ ও যত্ন করেন।”

১২/৩/২০২১

ময়মনসিংহ
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 4.00 out of 5)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/





 

মা বউ সন্তান

মা বউ সন্তান

(ছোট গল্প)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

দোতলায় উঠে দরজার সামনে এসে মানিক মাস্কটার বাম ফিতা কান থেকে খুলে ফেললেন। তাতে ওটা ডান কানে ঝুলতে লাগলো। মানিক হাত ঘড়িতে লক্ষ্য করলেন রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে। কলিং বেল টিপ দিলে মানিকের বউ মণিকা দরজা খুলে দিলেন। মণিকা মানিকের চোখের দিকে তাকিয়ে মুসকি হাসলেন। দেখলেন চোখের নিচে মাস্কের চাপ খেয়ে কেমন দাগ পড়ে গেছে। সেই সকাল থেকে মাস্ক পরে আছে ডাঃ মানিক। তিনি শিশু রোগ বিদ্যায় এম ডি পাস করে শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হয়েছেন। সরকারি হাসপাতালে চাকরি করেন। আবার বিকেলে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বসে প্রাইভেট প্রাক্টিস করেন। এম বি বি এস পাস করার পর থেকে এম ডি পাস করার আগ পর্যন্ত তিনি প্রাক্টিস করেননি। এরই মইধ্যে ফ্যামিলি কম্পলিট হয়ে গেছে। দুই ছেলের বাবা হয়েছেন। বড় ছেলের বয়স ৫ বছর, নাম রেখেছেন সৌরভ। ছোট ছেলের বয়স ৩ বছর, নাম রেখেছেন গৌরব। মানিকের কাছে মনে হয় ছেলেদের মুখের আকৃতি হয়েছে ট্রাম্পের মুখের আকৃতির মতো। মানিকের মা বলেন মানিকের মুখও ছোট বেলায় সৌরভ গৌরবের মতোই ছিলো। আসলে ট্রাম্পের মুখের আকৃতিটাই হলো শিশুদের মুখের আকৃতির মতো। তাই সৌরভ গৌরব ও মানিকের বেলাও এমন হয়েছে।

করোনা রোগের কোভিড-১৯ টিকার এক ডোজ নেয়ার পর থেকে ডাঃ মানিকের সাহস একটু বেরে গেছে। এখন তিনি নিয়মিত হাসপাতালে যান এবং প্রাইভেট প্রাক্টিস করেন। ডাঃ মানিক মাস্ক পরলেও তার রোগীরা অধিকাংশ মাস্ক পরে না। তাই মানিকের যত ভয়। ডান কান থেকে অপর ফিতাটি খুলে মাস্কটি ডাস্টবিনে ফেলে দিলেন। সোজা ঢুকে পরলেন ওয়াসরুমে। মণিকা লিভিং রুমে বসে গেলেন স্টার জলসার প্রোগ্রামের বাকী টুকু দেখে নিতে। মানিক ফ্রেস হয়ে প্রবেশ করলেন মায়ের রুমে। মা ঈশার নামাজ শেষ করে কিছুক্ষণ তাসবী জপছিলেন। এখন খাটে উচু বালিশে মাথা রেখে বই পড়ছেন। প্রবেশ করে মানিক বললেন

– মা, কী বই পড়ছ?

– বইয়ের নাম শৈশবের একাত্তর।

– একাত্তর আবার শৈশবের হয় কেমনে?

– লেখক একাত্তুরের স্মৃতি কথা লিখেছেন। তিনি তখন ক্লাস ফাইভে পড়তেন। তাই নাম দিয়েছেন শৈশবের একাত্তর।

– সত্য কথা লিখেছেন তো?

– সরলভাবে সত্য কথাই লিখেছেন। যা দেখেছেন, তাই লিখেছেন। ভালোই লাগে পড়তে। তুমি পড়ে দেখতে পারো।

– আমার কি সাহিত্যের বই পড়ার সময় আছে? মেডিকেলের বই পড়তে পড়তেই জান শেষ।

এভাবে আলাপ করে কেটে গেলো প্রায় বিশ পঁচিশ মিনিট।

ওদিকে মণিকা ডাইনিং টেবিলে খাবার রেডি করে ডাক দিলেন “মা, খেতে আসুন।” মা বললেন “চল্ , মানিক, খেয়ে নেই।” মানিক নাম মা-ই রেখেছিলেন। মানিক হলো খুবই দামী পাথর। মণি পাথর থেকেও দামী। মণি পাথর তৈরি হয় সাপের মাথায়। আর মানিক পাথর তৈরি হয় বেঙের মাথায়। মানিক ডাইনিং টেবিলে বসার আগে প্রবেশ করলেন চাইল্ড বেড রুমে। সৌরভ-গৌরভ মশারির নিচে ঘুমিয়ে পড়েছে পাশাপাশি বালিশে। গৌরবের ডান পা-টা সৌরভের হাটুর উপর রেখে ঘুমিয়েছে। সৌরভের চুলগুলো মোটা মোটা খারা খারা। মানিকের মতোই। গৌরবের চুলগুলো পাতলা লেপ্টানো। ঘুমন্ত সন্তানদের মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন মানিক। তিনি সকালেও সন্তানদেরকে এভাবে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখেই হাসপাতালে গিয়েছিলেন। আগামীকাল হাসপাতালে যাওয়ার সময়ও হয়তো এভাবেই ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে যেতে হবে। শুক্রবার ডাঃ মানিক হাসপাতালে যান না। চেম্বারও করেন না। সকালে কিছুক্ষণ বাজার করার জন্য বাইরে যান। তাছাড়া সারাক্ষণই পরিবারের সাথে সময় কাটান। সৌরভ-গৌরবের সাথে ছোট মানুষের মতো হয়ে খেলা করেন। দু’জনের মাথা দু’বাহুতে রেখে শুয়ে শুয়ে গল্প করেন। মোবাইলে কার্টুন দেখান। কোন কোন সময় গল্প শুনতে শুনতে গৌরব মানিকের নরম পেটের উপর ঘুমিয়ে পড়ে। অনেকেই শুক্রবার প্রাক্টিস করতে মফস্বল শহরে চলে যান। মানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি তা করবেন না। তিনি সপ্তাহে একটা দিন পুরাপুরি পরিবারের সাথে কাটাবেন। গফরগাঁও থেকে একটা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন ডাঃ মানিক যেন তাদের সেন্টারে শুক্রবার বসেন। তাদের গাড়ি দিয়েই ময়মনসিংহ থেকে গফরগাঁও আনা নেয়া করবেন এবং পারিশ্রমিকটাও পুশিয়ে দিবেন। পরিবারের কথা চিন্তা করে মানিক সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন।

মানিক খাবারের টেবিলে বসলেন। মা বললেন

– বাবা, মানিক, বিকেলের প্রাক্টিসটা বাদ দিতে পারনা? নাতি ছেড়াগুলার সাথে তো তোমার কথাই হয় না শুক্রবার ছাড়া।

– মা, তোমাদের দোয়ায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হয়েছি। প্রাক্টিস বাদ দিলে চলবে। চেম্বারে ৪০-৫০ জন করে রোগী আসে মা-বাবার সাথে। তারা সবাই আমাদের সৌরভ-গৌরবের মতো শিশু। তারা অসুস্থ হলে তো তোমার মানিকের কাছেই আসবে। তাদেরকে সুস্থ না করে আমি কি ঘরে বসে থাকতে পারি? সৌরভ-গৌরব অসুস্থ হলে আমার যেমন কষ্ট হয় অন্যের বাচ্চা অসুস্থ হয়ে আমার চেম্বারে এলেও আমার কষ্ট হয়। চিকিৎসায় যখন তারা সুস্থ হয়ে উঠে তখন আমারও আনন্দ লাগে।

– তুই ডাক্তার হলে কী হবে, আমার বাতের চিকিৎসাই ত করতে পারস্ না।

– মা, তুমি তো আমাদের বড় শিশু। আমি বড় শিশুর ডাক্তার না। তোমার বাতের চিকিৎসা ত ডাঃ আজিজ ভাই-ই করছে। আবার আজিজ ভাইর বাচ্চার চিকিৎসা করছি আমি। তোমার চিকিৎসা হলেই হলো।

রাতের খাবার শেষ করে মানিক তার বেড রুমে গেলেন। মাও তার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। মণিকা শোবার আগে সৌরভ-গৌরবের মুখদু’টি কিছুক্ষণ চেয়ে চেয়ে দেখে তার রুমে শুতে এলেন।

মানিক মণিকাকে বললেন

-আমি রাতে বাসায় এসে প্রথমেই মা-র রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ সময় দেই। তোমার রুমে আসি সবার পরে। এতে তোমার কোন অভিযোগ নেই?

– অভিযোগ থাকবে কেনো? আমার বাবাকেও আমি তাই করতে দেখেছি। মায়ের অধিকার সবার আগে। আমি আমার সৌরভ -গৌরবের জন্য কত কী করি। মাও তোমার জন্য কত কী করেছেন। কাজেই তুমি এসে প্রথমেই মায়ের কাছে যাবে, এটাই সাভাবিক। হিসাব করে দেখো, মা আজ তোমাকে পেলেন মাত্র ৩০-৪০ মিনিট। আমি পাব বাকী সারারাত। সকাল পর্যন্ত তুমি আমার কাছে থাকবে। কে বেশী সময় তোমাকে পেলো?

কিছুক্ষণ এমন মধুর মধুর কথা বলতে বলতে উভয়েই ফেইসবুকে চলে গেলেন। বন্ধুদের পোস্ট করা স্টেটাসে লাইক কমেন্ট করে একসময় ঘুমিয়ে পড়লেন।

আবার সকাল হলো। হাসপাতালে যাবার সময় হলো। রেডি হয়ে সৌরভ-গৌরভের রুমে গিয়ে দেখলেন তারা ঘুমিয়েই আছে। করোনা মহামারির কারনে স্কুল সব ছুটি। স্কুল খোলা থাকলে হয়তো আগেই ঘুম ভাঙিয়ে এদেরকে রেডি করতে হতো। স্কুল খুললেই গাড়ির প্রয়োজন পড়বে। গাড়ি কেনার জন্য মণিকাও মাঝে মাঝে তাকিদ দেন। মণিকাও চান নানিক প্রেক্টিসে বেশী সময় দিক, যাতে গাড়ি বাড়ি তারারারি হয়ে যায়। প্রাক্টিস জমেছে ভালো। প্রায় ত্রিশ লাখ টাকা জমিয়েছেন প্রাইভেট কার কেনার জন্য। প্রিমিও সিরিজের কিনবেন, না এলিওন কিনবেন এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। তার আগ পর্যন্ত রিক্সাই ভরসা। সৌরভের মুখটা উপর হয়ে আছে বালিশের উপর। ল্যাব্রা পড়ে বালিশ আঠা আঠা হয়েছে। সৌরভের এডেনয়েড টনসিল বড় হয়ে গেছে। তাই, হা করে ঘুমায়। তাতে বালিশে ল্যাব্রা পড়ে। নাক কান গলা রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ বিনয়কে দেখানো হয়েছে। অপারেশন করতে হবে এডেনয়েড টনসিল। মানিক ঘড়ি দেখলেন। সময় নেই। মার কাছ থেকে বিদায় নিলেন। মণিকা দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। মোবাইল, চশমা, মানিব্যাগ, কলম, চাবি, মাস্ক, ব্যাগ নিয়েছেন কিবা চেক করলেন। ছিটকিনি বন্ধ করে বেড রুমের বারান্দায় গিয়ে দাড়ালেন। মাও তার রুমের বারান্দায় গিয়ে দাড়িয়েছেন। দু’টি বারান্দাই পূর্ব দিকে। উভয়েই দেখলেন ডাঃ মানিক গেইট দিয়ে বের হয়ে পূর্ব দিকের রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছেন। হাটার সময় মানিকের ডান পায়ের স্টেপটা বাম পায়ের স্টেপ থেকে একটু লম্বা হয়। এমনো হতে পারে বাম পা সামান্য খাটো। তাতে অসুবিধা নেই। এভাবে হাটাতেই মানিককে আরো বেশী ভালো লাগে। রাস্তাটা ডান দিকে বাঁকা। বাঁকা অংশে প্রবেশ করতেই ডাঃ মানিক দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলেন।

৫/৩/২০২১ খ্রি.

ময়মনসিংহ

 
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 2.00 out of 5)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/




হক স্যার টুপি ঘুরাতেন

হক স্যার টুপি ঘুরাতেন

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

[প্রফেসর ডা. আব্দুল হক স্যার ছিলেন একজন সৎ ও আদর্শবান মানুষ। তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন। তিনি উক্ত কলেজের প্রিন্সিপাল এবং ময়মনসিংহ বিএমএ-র প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। আমি উক্ত বিভাগে দুইবার বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছি। ভয়ে ভয়ে স্যারের চেয়ারটিতে বসেছি। স্যারকে নিয়ে আমার অল্প কিছু স্মৃতি কথা আছে। তারই কিছু ধারাবাহিকভাবে লিখে যেতে চেষ্টা করছি]

 

প্রথম দেখাতেই প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যার আমার হাত থেকে নতুন বইগুলো ছুড়ে মারাতে আমি মনক্ষুন্ন হই। নজরুল দেখে ফেলাতে আমি অপমান বোধ করি। মনে মনে ভাবী ইনি কেমন মানুষ? আমাকে তো সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতে পারতেন। যদি এমন করে বলতেন “বাবা, তুমি তো বেস থার্ড ইয়ারে উঠেই নতুন বই কিনে ফেলেছো। খুব ভালো করেছো। তবে এই সব লাল নীল দেশী লেখকদের বই পড়ে ভালো ডাক্তার হওয়া যাবে না। তুমি বরং বিদেশী লেখকদের বই কিন। এসব বই পড়ে পাস করা যাবে না।” তা না করে তিনি আমার সাথে কিছুই না বলে বই ছুড়ে মেরে তার রুমে প্রবেশ করলেন। এই ক্ষোভ আমার ভেতরে অনেকদিন পর্যন্ত ছিলো, যতদিন না আমি স্যারের খুব কাছে আসতে পেরেছি।

 

তখন থার্ড ইয়ার থেকেই প্যাথলজি ক্লাস শুরু হতো। প্রফেসর ডাঃ আব্দুল মান্নান সিকদার স্যার অল্প বয়সের শিক্ষক ছিলেন। তিনি সুটেড-বুটেড হয়ে ক্লাসে আসতেন। তিনি তখন প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। প্রফেসর হক স্যার ছিলেন সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। এটা কিন্তু ১৯৮৩ সনের কথা বলছি। সিকদার স্যার সব কথা ইংরেজিতে বলতেন। আমি গ্রামের ছেলে। ইংরেজি খুব কম বুঝতাম। যদিও আমি ইন্টারমেডিটে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছি। বইয়ের ইংলিশ মিডিয়াম বাংলা মিডিয়ামের চেয়ে সহজ ছিলো। কিন্তু ইংলিশ মিডিয়ামের লেকচার শোনা আমার জন্য কঠিন ছিলো। সিকদার স্যার গ্যালারির ভেতরে ছাত্রদের কাছে এসে পড়া ধরতেন। তাও আবার ইংরেজিতে কথোপকথন করে। আমি সবসময় ভীতসন্ত্রস্ত থাকতাম এবং স্যারের মুখের দিকে চেয়ে থাকতাম। স্যার আমার এই দুর্বলতা বুঝে ফেলে আমাকে পেয়ে বসেন। আমার এই অবস্থার কথা ক্লাসের সবাইকে বলতে থাকেন। আমি লজ্জিত হয়ে পড়ি। আমি যখন প্যাথলজির সহকারী অধ্যাপক হয়ে সেই একই গ্যালারিতে ক্লাস নিতাম মান্নান সিকদার স্যারের কথা মনে পড়তো। তাই, আমি ক্লাসে ইংরেজি বলার পাশাপাশি সরল বাংলায় ছাত্রদের বুঝিয়ে দিতাম। মান্নান স্যার ছাত্রদের মাঝে এসে পড়াতে ছাত্ররা অন্য মনস্ক হতে পারতো না। আমিও মাঝে মাঝে তাই করি। সিকদার স্যার পরের বছর বদলি হয়ে যান অন্য কোন মেডিকেল কলেজে। দীর্ঘদিন পর আমি যখন এম ফিল পড়ি তখন স্যারের দেখা পাই প্যাথলজি সোসাইটির এক সম্মেলনে। শুনলাম তিনি চট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। তারপর থেকে স্যারের স্যাথে আমার অনেক দেখা সাক্ষাত হয়। মোবাইলে অনেক কথা বলেন। অনেক স্নেহ করেন আমাকে। তিনি আমার সাহিত্যের বইয়ের একজন ভালো রিভিউয়ার।

প্রফেসর ডাঃ আব্দুল মজিদ সিদ্দিকী স্যার ও রজব আলী স্যার আমাদের জুরিস্প্রুডেন্স পড়াতেন। ফরেনসিক মেডিসিনকে তখন জুরিস্প্রুডেন্স বলা হতো। আমি ছিলাম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ১৭তম ব্যাচের ছাত্র। তার মানে কলেজের বয়স ছিল ১৭ বছর। এমন বয়সে কলেজে শিক্ষক সংকট থাকে। মজিদ সিদ্দিকী স্যার রেডিওলজি (এক্স-রে) বিভাগের ডাক্তার হয়ে জুরিস্প্রুডেন্স লেকচার ক্লাস নিতেন। এমন সমস্যা দিনাজপুর মেডিকেল কলেজেও ছিলো। এই কলেজের বর্তমান নাম এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ। আমার মেয়ে ডা. মার্জিয়া ইসলাম দীনা এই কলেজের ১৭ ব্যাচের ছাত্রী ছিলো। তখন আমিও এই মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলাম। দীনাদের বায়োকেমিস্ট্রির প্রফেসর লেভেলের শিক্ষক না থাকাতে প্রথম দিকে আমিই অনেকগুলো বায়োকেমিস্ট্রি লেকচার ক্লাস নিয়েছি। মজিদ সিদ্দিকী স্যারের বাড়ি আমাদের পাশের উপজেলা ঘাটাইলে হওয়াতে তার কথাবার্তা আমার কাছে খুব পরিস্কার লাগতো। চিকন মানুষ, টনটনে কথা ছিলো মজিদ স্যারের। রজব আলী স্যার পরিপাটি ও দেখতে সুন্দর ছিলেন। ফরেনসিক মেডিসিনের পড়ায় বেশ কিছু লজ্জার কথা আছে। সেইগুলি বলার সময় রজব আলী স্যার স্মীত হাসতেন এবং তার গালে টোল পড়তো। এখনো স্যারের সেই টোল পরা গাল আর মোটা সুন্দর দাঁতের মিষ্টি হাঁসি আমার মনে আছে। ফিজিওলজির প্রফেসর এম এ জলিল স্যার আমাকে খুব ভালোবাসতেন। টাঙ্গাইলের মানুষ হওয়াতে তার কাছে খুব যেতাম। তিনি পড়াতেন খুব ভালো। খুব জ্ঞানী ছিলেন। কিন্তু তিনি যখন ব্লাকবোর্ডের কাছে গিয়ে কিছু লিখতেন তখন নিচু স্বরে কথা বলতেন যেগুলো আমি ফলো করতে পারতাম না। আমি যতদিন শিক্ষকতা করেছি সেই কথাটি মনে রেখেছি। তবে সব ক্লাস তারাতারি ডিজিটাল হয়ে যাওয়াতে আমাকে ব্লাকবোর্ডের দিকে ঘুরতে হয় নি। আমি ক্লাস নেই সামনে ক্যাপটপ রেখে। স্ক্রিনের দিকে তাকাই না বেশী। যেহেতু দৃষ্টি থাকে সামনের দিকে সেহেতু ছাত্ররা গন্ডগোল করতে পারে না। এনাটমির প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হাই ফকির স্যার সবসময় সুট টাই পরে থাকতেন। খুব পরিস্কার করে কথা বলতেন। শোনতে খুব ভালো লাগতো। তিনি বোর্ডে তেমন কিছু লিখতেন না। ইপিডায়াস্কোপে বইয়ের পাতা প্রজেক্ট করে স্ক্রিনে ফেলতেন। আমার কাছে স্যারের পড়ানোর স্টাইল ভালো লাগতো। এনাটমিতে হারুন স্যার নামে আরেকজন স্যার ছিলেন। তিনি কবিতা লিখতেন। পড়ানোর সময় মুখে হাসি লেগেই থাকতো। তিনি এপ্রোন পড়ে ক্লাসে আসতেন। ফার্মাকোলজির প্রফেসর ডাঃ জগদীশ চন্দ্র স্যার প্রথম দিন পরিচিতি মূলক ক্লাসে খাটি নেত্রকোনার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিলেন মনে আছে। তিনি বলছিলেন এই কলেজটা যেইহানে অইছে সেইহানে পাট কেত আছিল। সহজ করে সুন্দর পড়াতেন। সার্জারীর প্রফেসর ডাঃ এনায়েত কবীর স্যার ক্লাসে খুব রাগারাগি করতেন। কেন করতেন তা বুঝতে পারতাম না। রাগারাগির এক পর্যায়ে পকেট থেকে ট্যাবলেট বের করে খেতেন। তারপর শান্ত হয়ে আবার পড়াতেন। বেস ভারী শরীর ছিলো স্যারের। জ্যাকেট গায়ে দিয়ে থাকতেন। দুই হাত প্রসারিত করে কথা বলতেন। একদিন সহকারীকে বললেন মাইকের মাউথ পিচটা সুতা দিয়ে গলায় ঝুলিয়ে দিতে। তারপর তিনি দুই হাত ছোড়াছুড়ি করে পড়ালেন। তিনি ছাত্রদেরকে তুই করে বলতেন। একদিন হঠাৎ তিনি ক্লাসে অনেককেই প্রশ্ন করা শুরু করলেন কে কোন কলেজ থেকে পাশ করে এসেছে। আমাকে যখন প্রশ্ন করলেন “তুই কোন কলেজ থেকে পাস করেছিছ?” আমি দাঁড়িয়ে গর্বের সাথে বললাম “আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে, স্যার?” তিনি সাথে সাথে তাচ্ছিল্যের সাথে বলে ফেললেন “বাহ, আলাউদ্দিনের মিষ্টি, অপুর্ব সৃষ্টি।” তিনিও হাসলেন, ছাত্ররাও হাসলো। কারন, কেউ তো জানতো না যে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কার দাদার নাম। সার্জারীর প্রফেসর ডাঃ আব্দুস শাকুর স্যার ছিলেন মাটির মানুষ। ধীরে ধীরে পড়াতেন। আমাকে বেশ স্নেহ করতেন। কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডাঃ মোফাখখারুল ইসলাম স্যারকে রাগ করতে দেখিনি। তিনি ইংরেজ স্টাইলে থাকতেন। হাসি হাসি মুখ ছিল সব সময়। তিনি কিছুক্ষণ লেকচার দিয়েই বিলাতের কথা বলতেন। কথায় কথায় কমিউনিটি বেইজড মেডিকেল এডুকেশন, আলমা আটা, জেনেভা ডিক্লারেশন শব্দগুলো উচ্চারণ করতেন। শুনতে ভালোই লাগতো। মেডিসিনের অধ্যাপক শামসুল ইসলাম স্যার ছিলেন একটু ভার বুদ্ধিসম্পন্ন। তিনি ক্লাসে এসে কিছুক্ষণ সিগারেট টেনে শক্তি সঞ্চয় করে কেশে পড়ানো শুরু করতেন। তখন সিগারেট খাওয়াটা এখনকার মতো অতো দোষের ছিলো না। তিনি ক্লাসে পড়া ধরতেন না। তিনি সাধারণত সাদা হাফ শার্ট পরতেন। কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সাদেক স্যার ছিলেন খুবই মাটির মানুষ। খুব বিনয়ের সাথে পড়াতেন। হাটার সময় তিনি এদিক সেদিক তাকাতেন না। চুক্ষু বিভাগের প্রফেসর মুক্তাদির স্যার ছাত্রদের সাথে বেশ মিশুক ছিলেন। তিনি দেখতে সুন্দর ছিলেন। সাফারি পরতেন সাধারণত। বিভাগীয় প্রধান ছিলেন প্রফেসর ডাঃ শামসুদ্দিন স্যার। তিনি জোক করে পরাতেন। একবার ক্লাসে আমি একটু অন্যমনস্ক ছিলাম। হঠাৎ তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন “এই, তিন মাসের বাচ্চার ভিটামিন কম পড়লে কি করবে।” আমি বলে দিলাম “সবুজ শাক সবজি খেতে দেব।” স্যার মুখের এক অদ্ভুত ভঙ্গি করে বললেন “হ্যা, তিন মাসের বাচ্চা ত শাক খেতে পারবেনা। নাকইর দিয়া ঠেলে ঠেলে পাছা দিয়ে শাক ঠুকাতে হবে।” আমি ত লজ্জা পেয়ে ঝিম মেরে গেলাম। স্যারের সামনে ত হাসা যায় না। বন্ধুদের কারো কারো শরীর ঝাকুনি দিতে দেখলাম চিপা হাসিতে। শামসুদ্দিন স্যার কোট-টাই পরতেন। হাটতেন দৈত্যে মতো। প্রফেসর ডাঃ জোবায়েদ হোসেন স্যার ছিলেন খুব জাদরেল এক শিক্ষক। সবাই তাকে ভয় পেতো। তিনি গাইনি বিভাগের প্রধান ছিলেন। প্রথম দিকে আর্মি অফিসার ছিলেন। হাটতেনও আর্মি স্টাইলে। লম্বা ছিলো স্যারের শরীর। টাই পরতেন। সার্জারীর প্রফেসর গাফফার তালুকদার স্যার বাংলা উচ্চারণ করতেন বিলাত প্রবাসী মানুষের মতো। তিনি শার্টের উপর জ্যাকেট পরতেন। সার্জারির আরেকজন শিক্ষক ছিলেন প্রফেসর ডাঃ সেলিম ভুইয়া স্যার। খুব নরম মানুষ ছিলেন। স্যারের আন্ডারে আমি ৬ মাস সার্জারিতে বিশেষ ট্রেইনিং নিয়েছিলাম। তিনি কথায় কথায় ইংল্যান্ডের ব্যবস্থার কথা বলতেন। আমি আমার কয়েকজন শিক্ষকের কথা এখানে উল্লেখ করলাম যারা আমাদের লেকচার ক্লাস নিতেন। আরও অনেক শিক্ষক ছিলেন, তারাও লেকচার ক্লাস নিতেন। সবার কথা লেখলে আপনি অধৈর্য্য হতে পারেন। হক স্যারকে নিয়ে লেখতে গিয়ে কয়েকজন শিক্ষকের নাম এসে গেলো। আমাদের সব শিক্ষকই অত্যধিক বিজ্ঞ ছিলেন। সবাই ভালো পড়িয়েছেন। একেকজন শিক্ষক একেক ভাবে স্মৃতিতে রয়ে গেছেন। আজ লিখবো হক স্যারকে নিয়ে। তার আগে একটু প্রফেসর আবু আহমেদ স্যারকে নিয়ে বলে নেই। স্যার ছিলেন প্যাথলজি বিভাগের সেকেন্ড স্যার। পড়াতেন মাইক্রোবায়োলজি। স্যারের লেখচার আমার খুব পছন্দ হতো। গল্প করে করে মজা করে পড়াতেন। যেদিন তিনি ফিতাকৃমি পড়ালেন সেদিন ক্লাস শুরুতেই একটি গল্প শুনালেন।

বললেন, একবার এক রাজকন্যার পেট থেকে ১৮ ফুট লম্বা একটা মাছ বের হলো পায়খানার সাথে। আমি শুনে তাজ্জব বনে নড়েচড়ে বসলাম। শোনার জন্য ব্যাকুল হলাম। আসলে এই গল্প থেকে স্যার চলে গেলেন ফিতা কৃমি পড়াতে। পদ্ধতিটা আমার খুব ভালো লেগেছিল। স্যার পড়ানোর সময় একটা কিছু বলে সামান্য হা করে জিহবার আগা নাড়াতেন এবং গাল ও ঠোঁটে হাসির ঢেউ খেলে যেতো। খুব ভালো লাগতো। থেমে থেমে পড়াতে বুঝতেও সুবিধা হতো। স্যারের দেখাদেখি আমিও ক্লাসে প্রসংগের সাথে মিল রেখে ছোট একটি গল্প বা ঘটনা শুনিয়ে দেই। ছাত্ররা যাতে গল্পটা মনে রাখতে গিয়ে পড়াটাও মনে রাখে এটাই আমার উদ্দেশ্য। একবার লন্ডন থেকে এক মেয়ে আমাকে মোবাইল করলো। সালাম দিয়ে কেমন আছি তা জানতে চাইল। কুশল বিনিময়ের পর জানতে চাইলাম

– কী মনে করে ফোন করেছ।

– স্যার, গভীর রাত এখানে। ঘুম আসছিলো না। দেশের কথা মনে হলো। শেষে আপনার ক্লাসের কথা মনে পড়লো। আপনি একদিন ভুত দেখেছিলেন। সেই কথা মনে হবার পর আপনাকে ফোন করেছি।

– আমার ভুতের গল্প ত মনে আছে। কেনো বলেছিলাম তা কি মনে আছে?

– জি স্যার, ট্রমাটিক ফ্যাট নেক্রোসিস হলে ফ্যাট সেল মরে গিয়ে তার শুধু আবসা আবসা আউট লাইন দেখা যায়। মানে মৃত কোসের ছায়ার মতো দেখা যায়, যেটাকে বলা হয় ঘোস্ট সেল। আপনার গল্পগুলো মনে হলে প্যাথলজির পড়াও মনে এসে যায়।

ভুতের গল্প প্রায় সবাই ভালোবাসে। সেদিন ফেইসবুকে একটা পড়েছি এমন। গোরস্থানে পাসের বাড়িতে সাধারণত কেউ থাকিতে চায় না। এমন একটি বাড়ি ছিলো গোরস্থানের পাশে। আসেপাশে আর বাড়ি ছিলো না। সস্তা পেয়ে এই বিল্ডিংয়ের দোতলা ভাড়া নিলেন এক শিক্ষিত ভদ্রলোক। এক রাতে এক একা ভালো লাগছিলো না তার। সিদ্ধান্ত নিলেন তৃতীয় তলার ভদ্রলোকের সাথে কিছুক্ষণ আলাপ করে আসা যাক। তাই, টিপ টিপ করে সিড়ি বেয়ে তৃতীয় তলায় উঠে বেল টিপ দিলেন। শীর্ণকায় লম্বা এক ভদ্রলোক দরজা খুলে দিয়ে বসতে দিলেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর লক্ষ্য কিরলেন ভদ্রলোকের হাতের আঙুলগুলো অত্যধিক লম্বা এবং গলাও বেশ লম্বা। তাকে ভুত বলে সন্দেহ হলো। জিজ্ঞেস করলেন “আচ্ছা ভাই, আপনি কি ভুত আছে বলে বিশ্বাস করেন?” উপর তলার সেই লোকটি জবাব দিলেন “মরার আগে বিশ্বাস করতাম না। এখন করি।” শুনে নিচ তলার লোকটির ভয়ে শরীম হীম হয়ে এলো। তারাতাড়ি কথা সেরে চলে এলেন।

 

আমি ক্লাসে গল্পের সাথে পড়া মিলিয়ে ছাত্রদেরকে শেখাতে চেষ্টা করি। ফলো করেছিলাম আবু আহমেদ স্যারকে।

আপনি বিরক্ত হচ্ছেন, হক স্যারের কথা লিখতে গিয়ে এসব কী লিখছি। আসছি এখন হক স্যারের কথায়। আজ হয়তো হক স্যারের কথা আপনার কাছে ভালো লাগবে না। আসলে হক স্যারের আমি প্রথম দিকে শুধু বাইরেরটাই দেখছিলাম। তাই প্রথম দিকে তিনি আমার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কেউ ছিলেন না। অনেক বছর পর যখন আমি হক স্যারের ভেতরের জিনিস আবিস্কার করলাম তখন থেকে আমি জানি স্যার একজন অসাধারণ মানুষ। সেই সময় টুপিওয়ালা স্যার মাত্র দু’জনই ছিলেন। দু’জন আবার দূরকম। একজন হলেন ফিজিওলজির দাদু স্যার আরেকজন হলেন প্যাথলজির হক স্যার।দাদু স্যারের নাম খুব সম্ভব ডাঃ আমিনুল ইসলাম ছিলো। দাদু স্যারের গালে লম্বা সাদা চাপ দাড়ি ছিলো। লম্বা জুব্বা পরতেন। বয়স্ক দাদাদের মতো করে কথা বলতেন। তাই, ছাত্ররা দাদু স্যার বলত। দাদু স্যার বলতে বলতে স্যারের আসল নামটি ভুলে গেছি হয়তো । হক স্যার টুপি মাথায় দিতেন, কিন্তু শার্ট পরতেন। হক স্যারের টুপির ধরনটি অনেকটা ডাঃ জাকির নায়েকের টুপির মতো গোল। স্যার মাথার চুল সবসময় চেঁছে রাখতেন। তাতে মাথার সাথে টুপি লেপটিয়ে থাকতো। চুল না থাকায় টুপিটি সহজেই মাথার উপর ঘুরানো যেতো। আমি যতদিন ছাত্র ছিলাম ততদিন স্যারের দাড়ি ছিলো না। দাড়ি রেখেছেন পরে। স্যারের চোখের উপর ভ্রু কম ছিলো। স্যার একটি বিশেষ ধরনের শার্ট গায় দিতেন। সাভাবিকের চেয়ে একটু লম্বা শার্ট। শার্টের কলারও ছিলো সাভাবিকের চেয়ে বেশ লম্বা। শার্টের রঙ ছিলো সাদাটে। আমরা অফ হোয়াইট বলতে পারি। মোটা কাপড়ের শার্ট ছিলো। ছেড়ার কথা না সহজে। আমি এক যুগ ধরে একই অথবা একই রকম শার্ট দেখেছি। একই রকম শার্ট কয়েকটি ছিলো কি না আমি জানি না। আমার কাছে মনে হতো একই। পাজামা, না ফুল প্যান্ট পরতেন তা বুঝা যেতোনা। মোটা অফ হোয়াইট কাপরের এক ধরনের ফুল প্যান্ট পরতেন শার্টের নিচ দিয়ে টাকনুর উপর পর্যন্ত। ফিতাবিহীন শু পরতেন পায়। হাটতেন সামনের ৪-৫ ফুট মাটির দিকে তাকিয়ে । স্যারকে প্রাইভেট কারে চড়তে দেখিনি। স্যারের স্ত্রী ডাঃ বীণা হক ম্যাডাম ছিলেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ। তাকে আমি সবসময় প্রাইভেট কারে চলাফেরা করতে দেখেছি। স্যারকে রিক্সায় উঠতেও দেখিনি। চরপাড়ায় রাস্তা দিয়ে দু’হাতে ভারী ভারী বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাসার দিকে হেটে যেতে দেখেছি। আমি একদিন একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম হক স্যার নিজের জন্য গাড়ি কেনেন না কেনো। উত্তরে জানতে পেলাম তিনি গাড়িতে চলা পছন্দ করেন না। আমেরিকা প্রবাসী তার বুয়েট থেকে পাস করা ইঞ্জিনিয়ার ছেলে দেশে এসে স্যারের জন্য একটি কার কিনে দিয়ে যান। স্যার সেটা ব্যবহার না করে জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসায় দান করে দেন। জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার মাঠে একটি টীন সেডে প্রাইভেট কার দেখেছি। খুব সম্ভব ওটাই হবে।

 

দোতলায় প্যাথলজি ডিপার্টমেন্ট। সিড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে এসে ক্লাসের মঞ্চে এসে নিঃশ্বাস ছাড়তেন। খুব সিরিয়াস হয়ে পড়ানো শুরু করতেন। যা বলতেন সবই যেনো গুরুত্বপূর্ণ। মানে প্যাথলজির কোন কিছুই বাদ দেয়া যাবে না। সবাই নিরব হয়ে স্যারের লেকচার শুনতাম। স্যারের টেবিলের সামনে বিদেশি বিরাট টেক্সট বই খোলা রাখতেন। কিছুক্ষণ পর পর বইয়ের দিকে চোখ দিতেন। ডান হাতে চক আর বাম হাতে ডাস্টার ধরা থাকতো। কথা বলার সময় ডান হাত ঘুরাতেন। চট করে ব্লাকবোর্ডে গিয়ে কিছু লিখতেন। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতেন কাউকে নির্দিষ্ট না করে। কেউ উত্তর দিয়ে দিলে গুড বলে আবার শুরু করতেন। কেউ উত্তর না দিলে বলতেন “এই লিসান জামিল কই? লিসান বলো।” অথবা “দীপক কুমার ধর বলো।” দীপক আমাদের মধ্যে সবসময় ফার্স্ট হতো । লিসান জামিল সেকেন্ড হয়েছিল। তারপরই ছিল মিজানুর রহমান স্বপন। শেষের দিকে স্বপন সেকেন্ড হতো। আমি ওদের মতো না হলেও ৮ম, ৯ম অথবা ১০ম অবস্থানেই সাধারণত থাকতাম। বেশী ভালো ভালো না। সেই ভালো ছাত্ররা মাতৃভূমি ছেড়ে চলে গেছেন সুখের দেশে। এদেশ তাদের চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। হক স্যারও বিদেশে গিয়েছিলেন উচ্চ শিক্ষা অর্জন করতে। ফিরে এসে দেশের সেবাই করেছেন। কিন্তু স্যার তার ইঞ্জিনিয়ার ছেলেকে দেশে রাখতে পারেননি। যাহোক, যখন স্যার যা পড়াতেন তাকেই বলতেন ভেরি ভেরি ইমপোর্টেন্ট। তিন বার করে বলতেন ভেরি ভেরি ইমপোর্টেন্ট। বলার সময় প্রত্যেকবার মাথার টুপি ঘুরাতেন। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে তিনি লোবার নিউমোনিয়া চারটি স্টেজ বলার সময় চার বার টুপি ঘুরিয়েছিলেন। বলছিলেন, লোবার নিউমোনিয়ার চারটি স্টেজ আছে – স্টেজ অব কঞ্জেশন, স্টেজ অব রেড হেপাটাইজেশন, স্টেজ অব গ্রে হেপাটসিজেশন অ্যান্ড স্টেজ অব রেজুলুশন। হক স্যার বাংলা ও ইংরেজি সংমিশ্রণ করে পড়াতেন। তাই ভালো বুঝতে পারতাম। আমি স্যারের এই বৈশিষ্ট্যটা অনুসরণ করে ক্লাস নেই। আমি আরেকটা ব্যাপারে স্যারকে অনুসরণ করি। সেটা হলো আমি ঠিক সময়ে ক্লাসে উপস্থিত হই। স্যার কোনদিন ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতেন না। আমিও কোনদিন ক্লাসে অনপস্থিত থাকি না, একান্ত জরুরি অবস্থা ব্যাতিরেকে। ছাত্রাবস্থায় স্যারের ভেতরের মহত্ব আবিস্কার করার মত জ্ঞান আমার ছিলো না। ছাত্রাবস্থায় স্যার আমার সাথে কয়কবার দুরব্যাবহার করেছিলেন বলে মন থেকে স্যারকে কম পছন্দ করতাম। পছন্দ করা শুরু করলাম সেদিন থেকে যেদিন থেকে স্যারের ভেতরের জিনিসটা আবিস্কার করতে পারলাম। সে কথা পরে লিখবো।

১৬/১২/২০২০

ময়মনসিংহ
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/





 

শৈশবের একাত্তর

বইয়ের নামঃ শৈশব একাত্তর

লেখকঃ ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্রকাশকঃ বাংলানামা

পৃষ্ঠাঃ ৩৮

কভারঃ হার্ড

মূল্যঃ ১৫০ টাকা

বিবরণঃ

শৈশব একাত্তর একটি স্মৃতিকথার কথা সাহিত্যের বই। লেখক ১৯৭১ সনের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ৫ম শ্রেণীতে পড়তেন। সেই সময়ের স্মৃতিকথা লিখেছেন এই বইয়ে । মুক্তিযুদ্ধের সময়ের বাস্তব কথা কার না শুনতে ইচ্ছে হয়?

পাওয়ার উপায়ঃ

১। নিকটস্থ লাইব্রেরি।

২। অনলাইন শপ (লেখকের নিয়ন্ত্রণে): www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

৩। অনলাইন শপ (প্রকাশকের নিয়ন্ত্রণে):  www.rokomari.com

৪। কুরিয়ার সার্ভিসেঃ মোবাইল নম্বর 01711683046 তে অর্ডার করে।

৫। সরাসরি লেখকের চেম্বারের সহকারীর কাছ থেকে।

সোনালি শৈশব

বইয়ের নামঃ সোনালি শৈশব

লেখকঃ ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্রকাশকঃ ছায়াবীথি

পৃষ্ঠাঃ ১৪৪

কভারঃ হার্ড

মূল্যঃ ২৫০ টাকা

বিবরণঃ

সোনালি শৈশব  একটি স্মৃতিকথার কথা সাহিত্যের বই। লেখক অতীতের গ্রাম বাংলার প্রকৃতি, পরিবেশ, মানুষ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ইত্যাদি  মজার  মজার মজার কথা দিয়ে এই বইয়ে তুলে ধরেছেন।

পাওয়ার উপায়ঃ

১। নিকটস্থ লাইব্রেরি।

২। অনলাইন শপ (লেখকের নিয়ন্ত্রণে): www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

৩। অনলাইন শপ (প্রকাশকের নিয়ন্ত্রণে):  www.rokomari.com

৪। কুরিয়ার সার্ভিসেঃ মোবাইল নম্বর 01711683046 তে অর্ডার করে।

৫। সরাসরি লেখকের চেম্বারের সহকারীর কাছ থেকে।