অল্প বয়সের ডাইরেক্টর

অল্প বয়সের ডাইরেক্টর

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

টাঙ্গাইলে প্রথম প্রাইভেট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা হয় শহরের আকুর টাকুর পাড়ায় পুকুর পাড়ে। শহরতলীর কাইয়া মারা নিবাসী বীমা কোম্পানির ম্যানেজার মোয়াজ্জেম হোসেন ফারুক ভাই তার নিজস্ব ভবনে স্ত্রীর নাম দিয়ে “নাহার নার্সিং হোম” নামে হাসপাতালটি শুরু করেন। পরিচালক নিয়োগ দেন তার ছোট ভাইকে এবং ম্যানেজার নিয়োগ দেন তার শ্যালককে। মেডিকেল অফিসার নিয়োগ দেন ডাঃ নুর মোহাম্মদ ভাই ও ডাঃ সালেহা আপাকে। নিজ গ্রামের গরীব প্রতিবেশীদের ছোট খাটো পদে কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করেন তার হাসপাতালে।

১৯৮৬ সনে আমি ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং শেষ করে বেকার হয়ে পড়ি। অলস বসে না থেকে প্রাইভেট প্রাক্টিশ করতে থাকি। ছয় মাস এভাবে চলার পর আমি নাহার নার্সিং হোমে চাকরি নেই মাসিক ১৮০০ টাকা বেতনে। তখন সরকারি মেডিকেল অফিসারদের বেতনও এমন ছিলো। বারতি সুবিধার মধ্যে ছিলো ফ্রি থাকার হাসপাতাল সংলগ্ন একটি বাসা। আমি আসার আগে এই বাসায় ডাঃ নূর মোহাম্মদ ভাই থাকতেন। তিনি চাকরিটা ছেড়ে দেয়ায় আমি পাই। সালেহা আপা মেটার্নিটি লিভে গেলে আমাকেই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়।

হাসপাতালে কালেকশন ভালোই ছিলো, কিন্তু প্রতি মাসেই কিছু কিছু ভর্তুকী দিতে হতো মালিককে। আয়ের বেশী অংশই কনসালটেন্ট স্যারগণ নিয়ে নিতেন। মেডিকেল অফিসাররা ঠিক সময়েই বেতন পেতেন। গরীব কর্মচারীদের বেতন দিতে একটু সমস্যা হতো। এনিয়ে ফারুক ভাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকতেন। ম্যানেজার মনখুন্য হয়ে চলে যান। পরিচালকের প্রতিও ফারুক ভাই তেমন সন্তুষ্ট না থাকলে তিনিও চলে যান। এমতাবস্থায় আমিও চাকরিটা ছেড়ে দিতে চাইলে ফারুক ভাই আমাকে অনুরোধ করলেন হাসপাতালটা টিকিয়ে রাখতে। তিনি আমাকে মেডিকেল ডাইরেক্টর হিসাবে পদন্নোতি দিলেন। আমি রয়ে গেলাম। অল্প বয়স ছিল আমার, ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং শেষ করেছি মাত্র এক বছর। ছাত্রের গন্ধও যায়নি। এই বয়সেই ডাইরেক্টর! শুনতে ভালোই লাগে!

আমি ফারুক ভাইর সাথে পরামর্শ করে জাতীয় পত্রিকায় ম্যানেজার ও রিসেপশনিস্ট নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিলাম। উপযুক্ত প্রার্থীদের যথা সময়ে সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য ডাকা হবে। ডাক যোগে অনেক দরখাস্ত জমা পড়লো। একদিন মজিদ নামে এলেঙ্গার এক ছেলে এলো রোগী দেখাতে। আলাপ সালাপে জানতে পারলাম ঢাকার সাফেনা নার্সিং হোমের একাউন্টেন্ট। ম্যানেজার নিয়োগ করা হবে শুনে সে আগ্রহ প্রকাশ করলো। সে একজন ডাক্তারের ভাতিজা। তার অমায়িক কথাবার্তায় আমার পছন্দ হলো। ঠিকানা রেখে দিলাম। ফারুক ভাই এলেন। প্রার্থীদের দরখাস্তের ফাইল চেক করা হলো। একেকজন প্রার্থী এমন বেশী যোগ্য যে আমাকে বেঁচে দিতে পারবেন। কেউ কেউ সিভিল সার্জন, সচিব, এম পি এমন প্রভাবশালী লোকের সুপারিশও জমা দিয়েছেন। দেখে ফারুক ভাই বললেন “এদেরকে দিয়ে আপনি কাজ করাতে পারবেন না। এরা বেশী যোগ্যাতাসম্পন্ন। দেখি কি করা যায়।” আমি বললাম “বিজ্ঞপ্তি দিলাম যে! ইন্টারভিউ নিতে হবে না?” তিনি হেসে বললেন “ইন্টারভিউ নেব যোগ্য প্রার্থিদের। না ডাকলে মনে করে নিবে যোগ্য নয়, তাই ডাকব না। তাছাড়া বিজ্ঞপ্তি দেয়াতে লজ যায়নি। হাসপাতালের এডভার্টাইজ হয়েছে পত্রিকায়।”

ফারুক ভাই আমাকে নিয়ে তার এক খারখানায় যাচ্ছিলেন কারখানার ম্যানেজারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে যেন টাকা পয়সা কম পড়লে সেখান থেকে নেয়া হয়। পথে একটা ছেলের সাথে দেখা। সে ফারুক ভাইকে পা ছুয়ে সালাম করে মাথা নিচু করে দাড়ালো। ফারুক ভাইর কোন আত্মীয়ের ছেলে হবে হয়তো। ফারুক ভাই জিজ্ঞেস করলেন

– তুই এখন কি করস?

– আমি বি এ পাস করে টিউশনি করছি।

– তুই আমার সাথে দেখা করিস।

আমি লক্ষ্য করলাম ছেলেটির চেহারা বেশ সুন্দর। ভদ্র নম্র প্রকৃতির। সুন্দর একটা ফুল হাতা শার্ট পরেছে, সুন্দর প্যান্ট পরেছে, সুন্দর জুতা পরেছে। সুন্দর করে চুল আচ্রিয়েছে। আমার খুব পছন্দ হলো। যেতে যেতে ফারুক ভাইকে বললাম

– ভাই, এই ছেলে তো বেকার। দেখে আমার খুব পছন্দ হলো। একে রিসেপশনিস্ট হিসাবে নেয়া যায় না?

– ঠিক বলেছেন। একেই নিয়ে নিন।

– মজিদ নামে এক ছেলে এসেছিলো। খুব ভালো মনে হলো। সাফেনা নার্সিং হোমে একাউন্টটেন্ট হিসাবে আছে। তাকে ম্যানেজার হিসাবে নিলে মনে হয় ভালোই হবে।

ফারুক ভাই বিস্তারিত শুনে তাকেও নিয়ে নেয়ার অনুমতি দিলেন। একজন সিকুরিরিটি গার্ড বদলিয়ে আমি আমার পছন্দের আরেকজন নিয়ে নিলাম। চালাতে লাগলাম হাসপাতাল। কথা কম বলি। ভারী গলায় কথা বলি ভাব নিয়ে। সবাই মানে। রাতে টেলিফোনে ফারুক ভাইর সাথে যোগাযোগ রাখি। ফারুখ ভাই পৌরসভার চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমার সাহস বেড়ে গেলো। পুরুদমে নিজের ইচ্ছামত হাসপাতাল চালাতে লাগলাম। লাভ হওয়া শুরু হলো। লাভের টাকা ফারুক ভাইর হাতে তুলে দেয়াতে অবাক হলেন। তিনি সেই টাকা থেকে আমাকে কিছু গিফট দিলেন। বাকী টাকা আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন “এই টাকা দিয়ে হাসপাতালের রিপেয়ারিং এর কাজ করবেন। আমার লাভ নিতে হবে না ।”

আমি নিয়মিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করতাম। সবাই সতস্ফুর্ত ভাবে কাজ করতো। কনসালটেন্টগণ রোগী দেখে অপারেশন করার পরামর্শ দিলে রোগীর লোকজন জানতে চাইতেন কোথায় অপারেশন করালে ভালো হয়। কনসালটেন্টগণ সরকারি হাসপাতাল ও প্রাইভেট ক্লিনিক দুটোরই অপশন দিতেন এবং ভালো মন্দ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতেন। প্রাইভেট ক্লিনিক পছন্দ করলে একটা স্লিপ ধরিয়ে দিয়ে বলতেন “এই স্লিপটা নাহার নার্সিং হোমের ডাইরেক্টরকে দিয়ে পছন্দমতো কেবিন নিয়ে ভর্তি হন। পার্টি ক্লিনিকে এসে রিসেপশনিস্টকে জিজ্ঞেস করতেন ” ডাইরেক্টর সাব আছেন?” রিসেপশনিস্ট আমার কক্ষ দেখিয়ে দিতেন। আমি রুমে বসে বসে বিসিএস পরীক্ষার গাইড বই পড়তাম। রোগীর লোক প্রবেশ করার আগেই বই ড্রয়ারে রেখে দিয়ে ভাব নিয়ে বসে থাকতাম। স্লিপ হাতে নিয়ে গম্ভীর স্বরে বলতাম

– কেবিন নিবেন, না ওয়ার্ডে ভর্তি হবেন?

-কেবিন নেব।

– সাধারণ কেবিন, না ভি আই পি কেবিন?

– কোনটার ভাড়া কেমন?

আমি ভাড়া ও সুবিধার ব্যাখ্যা দিলে বেশীভাগই ভি আই পি কেবিন পছন্দ করতেন। আসলে ভি আই পি কেবিন বানানো হয়েছিল ভি আই পি দের জন্যই। কিন্তু সাধারণ মানুষই বেশী থাকতেন ভি আই পি কেবিনে। আমরাও ভাড়া বেশী পেতাম সেই কারনে। ডাইরেক্টর হিসাবে ৬ মাসের বেশী আর থাকা হয়নি। মেডিকেল অফিসার হিসেবে সরকারি চাকরি হয়ে যাওয়ায় ডাইরেক্টরের চাকরিটি ছেড়ে দিতে হয় ১৯৮৮ সনের জুন মাসে। অল্প বয়সের ডাইরেক্টর হয়ে গেলাম মেডিকেল অফিসার ১৯৮৮ সনের ৩ জুলাই।

১৬/৪/২০২২

ময়মনসিংহ

আরো এমন গল্প পড়তে নিচের হ্যাস ট্যাগ এর উপর ক্লিক করুন।

#সাদেকেরস্মৃতিকথা