আমাদের এলাকার মেম্বারগণ

আমাদের এলাকার মেম্বারগণ
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারদেরকে গ্রামে শুধু মেম্বার বা মেম্বর বলা হতো। আমাদের ইউনিয়নের নাম কাকরাজান। ইউনিয়ন পরিষদের অফিসের নাম ছিল বোর্ডঘর। আমাদের বোর্ডঘর ছিল কাকরাজান গ্রামে। স্বাধীনতার কয়েক বছর পর ইন্দ্রজানীর শামছুল হক পান্না পরপর কয়েকবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে তিনি বোর্ডঘর তার এলাকা গড়বাড়ীতে স্থানান্তরিত করেন। কাকরাজান ইউনিয়নের কোন বোর্ডঘরে আমি কখনো যাইনি। গ্রামের উন্নয়নের জন্য মেম্বারগণ সরকারী অনুদান আনতেন। সেই অনুদানে রাস্তাঘাট, সাকো ও কালভার্ট নির্মান করা হতো। কিছু কিছু অনুদান মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণ ও মেরামতের কাজে ব্যায় করা হতো। গরীবদের জন্য রিলিফের গম, আটা, কাপড় চোপড় ও ঢেউটিন আসলে সেগুলি মেম্বারগণ বিতরণ করে দিতেন। এইজন্য তাদেরকে বলা হতো গ্রামের জনগনের সেবক। তাই তারা পোস্টারে এইভাবে লিখতেন “আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে গেন্দু মিয়াকে মোরগ মার্কায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দিন।” যারা চেয়ারম্যান মেম্বার পদপ্রার্থী ছিলেন তাদেরকে বলা হতো ভোটে দাড়াইছেন। ছোট বেলায় আমি ভোটে দাঁড়ানো কথাটার মানে বুঝতাম না। দাঁড়ানোকে আমরা বলতাম খাড়ানো। ভোটে আবার খাড়ায় কিভাবে, এটা ছিল আমার প্রশ্ন। মুরুব্বীদের থেকে জানতে পারলাম যে ভোটের সময় আসন্ন হলে গ্রামের সবাই একজায়গায় সভায় মিলিত হয়। সেখানে গণ্যমান্য ব্যাক্তি জানতে চাইতেন “আগামী ভোটে কে কে প্রার্থী হবেন দাড়ান।” একজন বা দুইজন বা তিনজন দাঁড়িয়ে ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। কেউ না দাঁড়ালে গ্রামের লোকেরাই জোড় করে একজনকে দাঁড়া করিয়ে দিতেন। খুব সম্ভব এভাবেই এসেছে ভোটে দাঁড়ানোর কথাটি। সাধারণত গ্রামের প্রভাবশালীরাই ভোটে দাঁড়াতেন। স্বাধীনতার পর প্রভাবশালীদের ক্ষমতা কিছুটা খর্ব হলে সাধারণ পরিবার থেকে আমরা মেম্বার চেয়ারম্যান পাই। কোন কোন সময় অস্ত্রবাজ ও চাঁদাবাজদের হাতে প্রভাব চলে যায়। তখন তারাই রাজনীতির মারপ্যাচে চেয়ারম্যান মেম্বার নির্বাচিত হন বা নির্বাচিত করেন। ছোট বেলা গ্রামে কাটলেও এখন চাকরি ও প্রেক্টিসের ঝামেলার জন্য গ্রামে বেশী যাওয়া হয় না। গ্রামের লোকজন চেম্বারে আসে। গ্রামে গিয়ে লোকজনের সাথে কথা বলি। কোন কোন মেম্বারের খুব প্রশংসা শুনি আবার কোন কোন মেম্বারের বদনাম শুনি। বেশী কিছু না জানলেও আমার এ ক্ষুদ্রজীবনে আমাদের এলাকার কয়েকজন মেম্বারের স্মৃতি আমার মনে আছে। তাদের নিয়ে আমি কিছু লিখতে চাই আজ।

রশিদ মেম্বার, আলী আজগর ও নুরু মেম্বার:
রশিদ মেম্বারের পুর্ণ নাম ছিল আব্দুর রশিদ। আমাদের এলাকার সাধারণ লোক “র”-কে “অ” উচ্চারণ করতেন। তাই সাধারনের কাছে তিনি অশিদ মেম্বর নামে পরিচিত ছিলেন। আরও সংক্ষেপ করে অনেকে বলতেন অশু মেম্বর। রশিদ চাচা মেম্বার ছিলেন আমি বুঝমান হবার আগে। ওনার বাড়ি জিতাশ্বরি পাড়ায়। মেম্বর বাড়ি নামে পরিচিত ছিল। তিনি স্বাধীনতার পর পবিত্র হজ্জ পালন করে হাজী খেতাব পান এবং রশিদ হাজী নামে পরিচিতি লাভ করেন। এখন ওটা হাজীবাড়ি হয়ে গেছে। হাজী হবার আগ থেকেই রশিদ মেম্বার লম্বা দাড়ি রাখতেন। লম্বা সাদা পাঞ্জাবী, সাদা পাজামা ও সাদা চোক্কা গোল টুপি পড়তেন। গলায় ঝুলিয়ে রাখতেন চকচকে মেটালের খিলাল। মৃদু চিকণ স্বরে কথা বলতেন। আমরা বড়বাইদপাড়া, নওপাড়া, চনপাড়া, বিন্নাখাইরা, ধলি, সিরিরচালা, পাইন্নাবাইদ, জিতেশ্বরি, ঢ্নডনিয়া পাড়া, মরিচকুড়িপাড়া, ভুয়াইদ, চটানপাড়া, শ্রীপুর ও আশেপাশের সব মানুষ বড় চওনা ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ পরতাম। আমরা বড় কাক্কু সোলায়মান তালুকদারের পিছে পিছে তাকবীর দিতে দিতে বড় চওনার ঈদের মাঠের দিকে যেতাম। আমাদের রাস্তা ও জিতেশ্বরির রাস্তা মিলিত হয়েছিল সিরিরচালা প্রাইমারী স্কুলের কাছে গিয়ে। আমরা দেখতাম রশিদ মেম্বারের নেতৃত্বে এক বিশাল কাফেলা আসতে। তিনি সামনে হেলেদুলে হেটে আসতেন। বড় চওনা হাটে যাওয়ার সময়ও এমন দেখা যেতো। তাকে ডিংগিয়ে কেউ আগে যেতে পারতো না। কেউ সাইকেল নিয়ে আসলেও সাইকেল থেকে নেমে সাইকেল ধাককিয়ে তার পিছে পিছে হাটতেন। জরুরী হলে তার কাছে অনুমতি নিয়ে এগিয়ে যেতেন। এমন ছিল তার সম্মান।

স্বাধীনতার পর তিনি হজ্জ করেন। এর আগে জিতেশ্বরি পাড়া থাকে কেউ হজ্জ করেন নি। আমাদের বড় বাইদ পাড়া থেকে অনেক আগেই তোয়াজ হাজী হজ্জ করেছিলেন। ছোট চওনায় ছিলেন শমশের হাজী। জিতেশ্বরি থেকে রশিদ মেম্বার হাজী হলেন। অনেকেই নতুন হাজী সাহেবকে অভিনন্দন জানাতে তার বাড়ি গেলেন। খোর্মা খেজুর ও জমজমের পানি মিশ্রিত পানি পান করলেন পুণ্য পাওয়ার আশায়। আমাদের শামসুদ্দিন তালুকদার ওরফে শমে কাক্কু ছিলেন একজন পল্লী চিকিৎসক এবং ধার্মিক মানুষ। তিনি হাজী সাহেবকে অভিনন্দন জানাতে যান নি। শোনা যায় হাজী সাহেবের একজন অতিভক্ত লোক হাজী সাহেবকে জানিয়ে বললেন “সবাই হাজী সাবকে দেখতে আইলো। শুধু শমে ডাক্তর আইলো না।” শুনে আরেক ভক্ত বললেন “আরে শমে তালুকদার অইল হুইন্না মুসলমান। আর আমাগো আজী সাব অইল দেইখা মুসলমান। অজে গিয়া তিনি সব দেইখা আইছেন।” আমি রশিদ হাজী সাবকে খুব শ্রদ্ধা করতাম। তিনি আমাকে বেশ ভালো বাসতেন। মুলত তার সাথে আমার কথাবার্তা হয় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে তৃতীয় বা চতুর্থ বর্ষ পড়ার সময়। তিনি তার বড় ছেলে আলী আজগর ভাইকে নিয়ে এসেছিলেন ডাক্তার দেখাতে। আলী আজগর ভাই তখন মেম্বার হয়েছিলেন। তার পায়খানার রাস্তার চারিদিকে অনেকগুলি ঘা (ফিস্টুলা) হয়েছিল। তিনি সেই ঘা নিয়ে অনেক বছর কষ্ট করে বেচেছিলেন। অনেকবার সার্জারির স্যারকে দিয়ে অপারেশন করানো হয়েছিলো। কিন্তু আজগর আলী ভাইর দুর্ভাগ্য ছিলো তিনি আর সুস্থ হলেন না। রশিদ হাজী সাহেবের আরেক ছেলে নুরুল ইসলাম ভাই এরপর মেম্বার হন। তিনিও অনেকবছর সুনামের সাথে মেম্বারগিরি করেন। হাজী সাহেব তার বাড়ির মসজিদ সংলগ্ন একটি দাখিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তার নামানুসারে এই মাদ্রাসার নামকরণ করা হয় জিতেশ্বরি রশিদিয়া দাখিল মাদ্রাসা। এই মাদ্রাসা ও মসজিদ ঘিরে প্রতিষ্ঠা হয়েছে উন্নত মানের বাজার ও দোকানপাট। এদের সাথে পাল্লা দিয়ে বড়বাইদ পাড়ায় আজিম সিকদারের নামে সিকদার পরিবারের উদ্যোগে আজিম নগর নাম দিয়ে গড়ে উঠেছে বাজার, দোকানপাট, কমিউনিটি ক্লিনিক, সরকারি প্রাইমারী স্কুল ও ডনডনিয়া বড়বাইদ পাড়া হাই স্কুল।

চন্দ মেম্বার:
আমি স্কুলে যাওয়ার আগেই বড়দের পড়া শুনে শুনে বাংলা রিডিং শিখে ফেলি। বানান কৌশল শিখে পত্রিকা পড়তে পারতাম। আমি তখন খুবই ছোট। স্বাধীনতার আগের কথা। তিনজন হাল্কা মংগোলিয়ান চেহারার লোক এলেন আমাদের বাড়িতে। তাদের দেখে কিছুটা আদিবাসী গোত্রের মনে হলো। আমাদের গ্রামের ঢনডনিয়া পাড়ায় কয়েকটি বংশী আদিবাসী পরিবার বাস করতেন। তারা খুব ভালো স্বভাবের মানুষ ছিলেন। পাশের মহানন্দপুর গ্রামে আরও বেশ কিছু মান্দাই ও বংশী আদিবাসী বাস করতেন। তারা সবাই ভালো মানুষ ছিলেন। দেখতে প্রায় এক রকম হলেও চেহারায় সামান্য পার্থক্য ছিলো। দেখে আমরা বুঝতে পারতাম কে মান্দাই আর কে বংশী । ছোটবেলায় সন্ধার সময় পশ্চিম-দক্ষিণ দিক থেকে কাশার প্লেট বাজানোর শব্দ ভেসে আসতো কানে। জিজ্ঞেস করলে বাবা বলতেন মহানন্দপুরের মান্দাইরা সন্ধ্যা পুজা করছে কাশার প্লেট ও খুঞ্জুরি (মন্দিরা) বাজিয়ে কির্তন গেয়ে গেয়ে। শুনতে যেতে ইচ্ছে করতো। কিন্তু হুজুরের মানা ছিলো।

হাল্কা মংগোলিয়ান চেহারার কিছু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন মহানন্দপুর ও আশেপাশের গ্রামে। তারা বংশী মান্দাইদের থেকে একটু বেশী লম্বা ছিলেন। তারা অনেকেই বেশ বুদ্ধিমান ও সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। নামের শেষে তারা বর্মণ লিখতেন। সেই তিনজন লোককে দেখে আমার বর্মণ বলে মনে হলো। তারা একটা ঘোড়ার ছবিওয়ালা কাগজ আমাদের বাড়ির দক্ষিণের পাটসোলার বাও বেড়ার সোলার চিপায় আটকিয়ে চলে গেলেন। আমি এগিয়ে গিয়ে বানান করে পড়লাম “আসন্ন কাকরাজান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মেম্বার পদে চন্দ্রমোহন বর্মণকে ঘোড়া মার্কায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দিন।” বারবার পড়ছিলাম আর বুঝবার চেষ্টা করছিলাম। আর ঘোড়ার ছবিটা দেখছিলাম। নাদুস নুদুস টাট্টু ঘোড়ার ছবি। ভোস্কা কাগজে ছাপানো ছিল পোস্টারটি। একটা ছোট বইয়ের পাতার সমান। আগে সবাই নিউজপ্রিন্ট কাগজে সাদাকালো পোস্টার ছাপাতেন। রঙিন গ্লোসি পেপারে পোস্টার ছাপানো শুরু হয়েছে মাত্র কয়েক বছর থেকে। ১৯৯৪ সনে আমি প্রথম দেখলাম ডাক্তাররা বিএমএ নির্বাচনে রঙিন পোস্টার ছাপিয়েছিলেন। এনিয়ে অনেককে সমালোচনা করতে শুনেছি। এখন যে কোন ইলেকশনে ছবিযুক্ত চার কালার রঙিন পোস্টার থাকে। কেউ কেউ বলেন এই খরচ তাদের পড়ে উঠে আসে।

যাহোক, ঘোড়ার ছবিটি দেখে আমি পোস্টারটি সোলার বেড়া থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে খোলার চেস্টা করছিলাম। কোত্থেকে যেন বাবা এলেন। তিনি ওটা খুলতে নিশেধ করলেন। খোললে কি ক্ষতি জিজ্ঞেস করায় তিনি আমাকে সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন। যার মর্মকথা হলো “চন্দ বাবু খুব ভালো মানুষ। তিনি মোটামুটি লেখাপড়া করেছেন। তিনি এবার মেম্বারে দাঁড়াইছেন। তিনি মেম্বার হলে এলাকার মানুষের ভালো হবে। তিনি টাকা খরচ করে পোস্টার ছাপিয়েছেন। তার মার্কা যে ঘোড়া এটা জানিয়ে দিয়েছেন এই পোস্টার দিয়ে। তার পোস্টার আমরা খুলে নিবনা।”
– মার্কা দেওয়ার দরকার কি? নাম লিখে দিলেই তো হয়।
– ভোট দেওয়া হয় একটা গোপন ঘরে। গ্রামের অনেকেই নাম পড়তে পারে না। তাই নামের পাশে একটা মার্কা দেয়া থাকে চিনে ভোট দেয়ার জন্যে।
– ভোট দেয় কেমনে?
– একটা কাগজে যারা যারা ভোটে দাঁড়িয়েছে তাদের নাম ও মার্কা ছাপানো থাকে। ভোটার গোপন রুমে গিয়ে মার্কার উপর সীল মেরে একটা বাক্সে জমা দেয়। শেষে ভোট গননা করে মেম্বার বানানো হয়।

সেবার চন্দ্রমোহন বর্মণ বাবু মেম্বার নির্বাচিত হন। তিনি চন্দ মেম্বর নামে পরিচিতি পান। চন্দ বাবুর শরীর অনেক বড় সড় ছিল। শুনেছি তিনি এক শের (প্রায় ১ কেজি) চালের ভাত ও একটি মোরগ এক বৈষ্ঠায় খেতে পাড়তেন । চন্দ মেম্বর একজন ভালো মেম্বার ছিলেন।

আহাইল্লা মেম্বার:
আমাদের এলাকার বিন্নাখাইরা পাড়ায় আবালি ফকির নামে একজন নামকরা ফকির ছিলেন। সারাজীবন তিনি ফকিরান্তি করেছেন। আমি তাকে অত্যন্ত বৃদ্ধ অবস্থায় পেয়েছি। তার শরীর খুব শুকনা ছিল। পাঞ্জাবী, টুপি ও লুঙ্গী পড়ে সারাগ্রাম ঘুরে ঘুরে তিনি রুগীর জন্য পানি পড়া দিতেন। গ্রামে বাচ্চারুগীদেরকে সাধারণত ঔষধ খাওয়ানো হতো না। মানুষ মনে করতো বাচ্চাদের উপর জিন ও মানুষের বদনজর পড়ার কারনে বাচ্চা অসুস্থ হয়। কাজেই বাচ্চাদের জন্য ডাক্তারি ঔষধ না দিয়ে পানি পড়া দেওয়াই উত্তম। আবালি ফকিরের নিকট মানুষ এক গ্লাস পানি নিয়ে যেতেন। তিনি মুখে বিড়বিড় করে কি যেনো বলতেন। বলে পানির উপর ফু দিতেন। পানিটা সকাল বিকাল খাওয়াতে বলতেন। আর বলতেন “আল্লাহয় দিলে বালা অইয়া যাবো। এক শের চাইল আর সোয়া পাচ আনা পয়সা জুম্বা ঘরে দিয়া দিবাইন। ” অর্থাৎ “ভালো করবেন আল্লাহয়। এক কেজি চাল আর এক টাকা পঁচিশ পয়সা মসজিদে দান করে দিয়েন।” আবালি ফকিরের উছিলায় আমাদের মসজিদগুলিতে বেশ দান উঠতো। তার এই ফকিরান্তি মসজিদের জন্যও মংগলজনক ছিল। আবালি ফকির চেয়ে কিছু নিতেন না। সবাই নিজেদের দায়িত্ব মনে করে তাকে এক শের চাউল হাদিয়াসরূপ দিতেন। একদিন দেখলাম আবালি ফকির পানিতে ফুক দিয়ে সেই পানি বাচ্চারুগীর নাক চোকে আঙুল দিয়ে ছিটিয়ে দিলেন। বাচ্চাটি হাঁচি দিলে তিনি বললেন “লক্ষণ ভালো। হাঁচি দিয়েছে। বেঁচে যাবে। ”

সেই আবালি ফকিরের এক মাত্র ছেলে আব্দুস সালাম ভাইকে স্কুলে পড়িয়ে এস এস সি পাস করালেন। একজন ফকির হিসাবে এটা তার বিরাট সাফল্য ছিল। সালাম ভাইর ডাক নাম ছিল আহাইল্লা। তিনি খুব ভাল ছেলে হিসাবে পরিচিত ছিলেন। সাধীনতার পর তিনি মেম্বার পদে ইলেকশন করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। আমাদের পাড়ায় অনেকেই আমাদের ছোট কাক্কু সালাম তালুকদারের কথায় ভোট দিতেন। আমি কাক্কুকে বলতে শুনেছি “ছোটবেলায় আবালি ফকিরের পানি পড়া খায় নাই এমন কেউ আমাদের পাড়ায় নাই। তিনি পানি পড়া দেওয়ার জন্য কোনদিন একটি ছেন্দা পয়সাও চান নি। তার ছেলে আহাইল্লা মেম্বারে দাড়াইছে। তারে ভোট দিব না তো কারে দেব?” সালাম ভাই মেম্বার হন এবং সুনামের সাথেই কাজ করে যান। সামনাসামনি সালাম ভাই বললেও জনগণ তাকে আহাইল্লা মেম্বর হিসাবেই জানতো। তিনি খুব সৎ জীবন যাপন করতেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি গজারি কাঠের ব্যবসা করতেন।

জিন্নত আলী মেম্বার :
আমাদের বাড়িটা পড়েছে কাকরাজান ইউনিয়নের একদম শেষ সীমানায়। কালিয়া ইউনিয়নের সাড়াসিয়া গ্রামের পকেটের ভিতর। বাইদ পাড় হলেই সাড়াসিয়া। আমাদের গ্রামের নাম ঢনডনিয়া। বলতে ভালো লাগে না অনেকেরই। কাজেই বাড়ি ঢনডনিয়া না বলে অনেই সাড়াসিয়া বলে। লিখার সময় ঢনডনিয়াই লিখে। তাই আমাদের গ্রামটির তেমন পরিচিতি নাই। আমি কিন্তু সব সময় ঢনডনিয়াই বলি। আমাদের বাড়ির দক্ষিনের বাইদের টানেই সাড়াসিয়ায় জিন্নত মেম্বারের বাড়ি। জিন্নত মেম্বারের বাবার নাম ছিলো আলী মুন্সী। তিনি মুন্সী খেতেন ও মিলাদ পড়াতেন। আমি যখন খুব ছোট তখন জিন্নত চাচা মেম্বার ছিলেন। শুনেছি তিনি মেম্বার হিসাবে খুব ভালো ছিলেন। আমাদের বাংলা পাঠ্য বইয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ছবির সাথে আমি জিন্নত মেম্বারের চেহারার মিল পাই। তার চেহারাও আমার কাছে খুব প্রিয় ছিল। তাকে কোন কাজ করতে দেখি নি কোন দিন। তিনি একটি হাফ শার্ট গায় দিয়ে সামনের বোতাম খুলে বেড়াতেন। গাছের নিচে বাঁশের মাচায় অথবা স্কুলঘরের বেঞ্চির উপর চিত হয়ে শুয়ে নাক ডেকে ঘুমাতেন। তার এক ছেলে মোসলেম উদ্দিন গ্রামে খুব মেধাবী ছাত্র হিসাবে পরিচিতি পেতে থাকে। তাকে নিয়ে মেম্বার সাহেবের খুব আশা ছিলো। তিনি আমার সাথে তার স্কুল, পড়া, বৃত্তি পরীক্ষা, কলেজ পছন্দ ও ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক কথা ও সিদ্ধান্ত নিতেন। তিনি আমার পরামর্শ খুব শুনতেন। মোসলেমও আমাকে বড় ভাই ও অভিভাবকের মতো মনে করে। মোসলেম টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পি এইচ ডি করেছে। এখন সে একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা।
আহাম্মদ মেম্বার:
জিতেশ্বরির আহাম্মদ চাচা যখন মেম্বার হন তখন আমি তেমন এলাকায় তাকাতাম না। তাই আহাম্মদ মেম্বারের সময়কার কথা আমার বেশী মনে নেই। তিনি আমার বাবার বয়সের মুরুব্বী ছিলেন। তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি আমার মাতাব্বর চাচা আবুল কাশেম তালুকদারকে সাথে নিয়ে আমাদের এলাকার উন্নয়নমুলক কাজ করেছেন। বিশেষ করে তার সময় চনপাড়া থেকে জিতেশ্বরি রাস্তার সংযোগ রাস্তার উন্নয়ন হয়। তার নামেই এখন জিতেশ্বরির তার বাড়ি মেম্বর বাড়ি হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে।

সাইদ মেম্বার:
আবু সাইদ ভাইকে আমি প্রথম চিনেছি মুক্তি যুদ্ধের সময়। তিনি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্য ছিলেন। তার হাতে একটা বেত থাকতো সেই সময়। চেহারা সুন্দর ছিলো। ফিটফাট থাকতেন। তার বাড়ি তৈলধারা। দেখা হলে আমার সাথে কথা বলতেন। খুবই আন্তরিক ছিলেন আমার সাথে। তিনি খুব জনপ্রিয় মেম্বার ছিলেন। তাই তিনবার মেম্বার হয়েছেন।

এছাক মেম্বার:
এছাক মেম্বারের আসল নাম ইসহাক আলী মেম্বার। এছাক ভাই আমার থেকে একটু বয়সে বড়। চাচাত ভাই হয়। একই পাড়ায় থাকি। আমার বাইল্যবন্ধু। এক সাথে মক্তবে আরবি কায়দা, সিপাড়া ও কোরআন পড়েছি। বাংলা লাইনে বেশীদূর পড়েন নি। কিন্তু তার মেধা খুব প্রখর। ছোট বেলা থেকেই গ্রাম্য পলিটিক্সে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৯৬ সনের দিকে তিনি মেম্বার পদে নির্বাচন করেন। আমাদের বড়বাইদ পাড়ায় প্রথম মেম্বার পদে নির্বাচন করায় সবাই স্বতঃস্ফূর্ত ভোট দিয়ে তাকে মেম্বার বানান। তিনি আমাদের পাড়ায় রাস্তাঘাটের বেপক উন্নয়ন করেন। মসজিদ মাদ্রাসায় অনেক সরকারি অনুদান আনেন। কমিউনিটি ক্লিনিক, সরকারি প্রাইমারি স্কুল, হাই স্কুল ও বাজার প্রতিষ্ঠায় ভালো ভুমিকা রাখেন। আমরা আশা করছিলাম পরেরবার মেম্বার হয়ে তিনি রাস্তাগুলি পাকা করে দিবেন সরকারি টাকায়। কিন্তু পড়ের বার পাড়ার মানুষ জাতীয় রাজনীতির দুই দলে বিভক্ত হয়ে দুইজন ক্যান্ডিডেট দাঁড় করিয়ে মেম্বার হাতছাড়া হয়ে যায়। আর কেউ তার অসমাপ্ত কাজগুলি সমাপ্ত করে দেন নি। রাজনীতির ঠেলাঠেলিতে কেউ আগাতে পারছেন না। এই ঠেলাঠেলির জন্য যারা বাইরে থাকেন তারাও গ্রামের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। আমি মনে করি এছাক ভাই আরেকবার মেম্বার হলে আমাদের গ্রামের রাস্তা নিয়ে দু:খ থাকতো না।

হযরত মেম্বার:
এছাক মেম্বারের মেয়ে-জামাই হযরত আলী অনেক বছর প্রবাসে থেকে বাড়ি এসে মেম্বারে নির্বাচন করে। পাড়ার ছেলে হিসাবে এবং এছাক ভাইর জামাতা হিসাবে তাকে সবাই ভোট দিয়ে মেম্বার বানিয়েছে। তাকে আমি মাঝে মাঝে উপদেশ দেই গ্রাম উন্নয়নের। সমস্যা হলো তার কাছে সরকারি অনুদান তেমন আসে না। তবে তার মন ভালো। যতটুকু আসে আমাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে তা উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। দোয়া করি আল্লাহ তার মাধ্যমে আমাদের গ্রামের উন্নয়ন করুন।

আমাদের এলাকায় আরও অনেকেই মেম্বার ছিলেন। লেখাপড়া ও চাকুরির কারনে আমাকে জীবনের বেশী সময় এলাকার বাইরে থাকতে হয়েছে। নাড়ীর টানে এলাকার খোজ খবর রাখার চেষ্টা করি। সব মেম্বার সম্পর্কে আমার জানা সম্ভব হয় নাই। লেখাটি আমি গবেষণা করে লিখি নাই। এটা একটা স্মৃতিচারণ মাত্র। স্মৃতিতে যা এসেছে তাই লিখেছি।


তারিখ : ১২/৪/২০১৯ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ – ঢাকা জার্নি