আমার বুবু

আমার বুবু
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমাদের ৫ ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় হলো বোন। নাম লাইলী বেগম। আমাদের সময় আমাদের এলাকায় বড় বোনকে বুঝি, বু, আপা বলে ডাকা হতো। দাদীকে বুঝি বা বু বলে ডাকা হতো। আমরা লাইলী আপাকে বু বলে ডাকতাম। বুবু বা বুঝি সংক্ষিপ্ত হয়ে বু হয়েছে। গল্প লিখার সুবিধার জন্য আমি আজ বুবু লিখব। দুই সন্তানের জন্মের মাঝের সময়টাকে সেই সময় বলা হতো আঞ্জা। আমার মায়ের আঞ্জা লম্বা লম্বা ছিল। তাই আমরা ৪ বছর পর পর জন্মেছি। যাদের আঞ্জা খাটো ছিল তাদের সন্তান বেশী মারা যেতো। আমার বড় ফুফুর আঞ্জা খাটো ছিল। তার ঘন ঘন সন্তান হয় ১৪ জন। তারমধ্যে ৫ জনই মারা যায়। আমার বুবুর আঞ্জাও খাটো ছিল। তার ১০ জন সন্তানের মধ্যে ৪ জনই মারা যায়। আমার মায়ের আঞ্জা লম্বা হওয়াতে আমরা সবাই বেচে গেছি। আমার বয়স এখন প্রায় ৬০ বছর। আকবর ভাইর ৬৪ হবে। সেই হিসাবে বুবুর বয়স ৬৮ হবে। সোমেলার ৫৬ ও শাহীনুরের ৫২ হবে। বুবুর বিয়ের আগের কথা আমার মনে আছে। শাহীনুর যখন মায়ের পেটে সেটাও মনে আছে। বুবুকে নিয়ে কিছু লিখব বলে কিছু তথ্য জানার জন্য সেদিন মোবাইল করেছিলাম। বুবু চটপট করে সেই ছোটবেলার ঘটনাবলী বললেন। মনে হলো বুবুর স্মৃতি শক্তি কত প্রখর! হয়তো মেধাবী কম ছিলেন না। গত সপ্তাহে একটি সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ সাহলা খাতুন। তিনি যে বছর এম বি বি এস পাস করেছেন সেই বছর আমার জন্ম। অথচ এখনো কত ইয়াং! কত সুন্দর ভাবে গুছিয়ে পুরনো দিনের মুধুর স্মৃতি গুলি বলে যাচ্ছিলেন। ভাবলাম, আমার বুবুও যদি সাহলা ম্যাডামের মতো পরিবেশে জন্ম গ্রহন করতেন তা হলে হয়ত এখন জাতীয় অধ্যাপক হতে পারতেন।

আমার মা, বুবু ও ভাইকে নিয়ে আমার বাবা ভর অঞ্চল ভিয়াইল থেকে পাহাড় অঞ্চল ঢনডনিয়াতে চলে আসেন স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য। আমি তখন মায়ের পেটে ছিলাম। ঢ্নডনিয়াতেই আমার জন্ম। তালুকদারদের ঢ্নডনিয়াতে বেশ কিছু জমিজমা ছিল। মেঝো দাদা মেছের উদ্দিন তালুকদার তার ৫ ছেলে ও ১ মেয়ে নিয়ে আগেই এখানে এসে বসতি স্থাপন করেন। দেখাদেখি বড় দাদার তৃতীয় ছেলে রিয়াজ উদ্দিন তালুকদার, আমার দাদার বড় ছেলে, আমার বাবা, দলিল উদ্দিন তালুকদার ও ছোট দাদা জয়নাল আবেদীন তালুকদারও এখানে চলে আসেন। ঢ্নডনিয়ার সব তালুকদারদের কর্তা হন মেছের উদ্দিন তালুকদার। তিনি খুব রক্ষণশীল ধার্মিক লোক ছিলেন। তার কথামতো সবাইকে চলতে হতো। আমি বুঝমান হওয়ার আগেই আমাদের চাচাতো বোন নাহার আপার বিয়ে হয়। দাদু জানতে পারেন নাহার আপার স্বামী যাত্রা পালা শুনেছেন। দাদু নাহার আপাকে আটকিয়ে দেন। শশুর বাড়ী যেতে দেন না। দুলাভাইর সাথে দেখা করতেও দেন না। শর্ত দেন “নাহারের স্বামী যাত্রায় গিয়ে ভিন মেয়ের শরীর দেখেছে। ওদের বিয়ে হাল্কা হয়ে গেছে। আবার দোকরাইয়া বিয়ে পড়াতে হবে। তারপর তারা মেলামেসা করতে পারবে। ” দুলাভাই তওবা পড়ে মাফ চেয়ে দোকরাইয়া বিয়ে পড়িয়ে নাহার আপাকে নিয়ে যান। বুঝলেন কেমন ছিলেন আমার মেছের দাদু?
মেছের দাদুর ফরমুলা ছিল “মেয়েরা পর্দায় থাকবে, স্কুলে যাওয়ার দরকার নাই, কোরআন শরীফ পড়তে পারলে, হালাল-হারাম চিনতে পারলে এবং জরুরী মাসআলাগুলি জানতে পারলেই যথেষ্ট। সাবালক হওয়ার সাথে সাথে ভালো বংশ, মোটা ভাত মোটা কাপড় দেখে বিয়ে দিয়ে দাও। ” বুবুও এই ফর্মুলায় পড়ে গেলেন।

বুবুকে বিয়ে উপলক্ষে বরপক্ষ দেখতে এলেন। বুবুর বয়স ১২ কি ১৩ বছর। সোমেলা খুব ছোট। আমি ৪ কি ৫ বছর। ১০/১২ জন লোক এলেন আমাদের বাড়ীতে। কাছারিঘরে খাওয়াদাওয়া করলেন। আছর নামাজ পর্যন্ত তারা গল্পগুজব করলেন। আছরের পর উঠানে এসে সবাই বসলেন। পশ্চিম মুখ করে একটা চেয়ার খালি রাখা হলো। সবাই সামনে দিয়ে ঘেরাও হয়ে বসলেন। বুবু দক্ষিণ দরজা বড় ঘর থেকে বেড়িয়ে আসলেন নানার সাথে। খালি চেয়ারে পশ্চিম মুখ করে বুবু বসলেন। আমি সামনে থেকে বুবুকে দেখছিলাম। রান্নাঘরের পিছনের কলাগাছের ফাক দিয়ে হাল্কা লাল সুর্যের আলো এসে পড়েছিল বুবুর মুখে। বুবু এমনি মায়ের মতো ফর্সা ছিলেন। আলো পড়ে আরো সুন্দর হলেন। দেখে মাশা আল্লাহ্‌ সবাই পছন্দ করলেন। একজন মুরুব্বি জিজ্ঞেস করলেন
– আচ্ছা মা, সুরা বলতে পারবা?
বুবু কিছুই বললেন না।
আমাদের মধ্যে কেউ বললেন
– কও, একটা সুরা কও।
বুবু চিকনসুরে সুরা তেলাওয়াত করলেন
-আউজুবিল্লাহি মিনাশশাই তানিররাজিম।…।…দোয়াল্লিন। আমিন।
এইভাবে সব প্রশ্নের জবাব দেয়ার পড় ইন্টার্ভিউ শেষ করে বুবুকে বড় ঘরে নেয়া হলো। সবাই প্রশংসা করলেন। আমি বুঝতে পাড়লাম এইবার বুবুর রক্ষা নাই। তাকে শশুরবাড়ী নিয়েই ছাড়বে।

এর কয়েকদিন পর বুবুর বিয়ের দিন ঠিক হল। সব কথা মনে নেই। কিছু কিছু মনে আছে। বিয়ে দাওয়াত ইষ্টিরা (মেহমান) বাংলাঘরে বসে খেলেন। পাড়া প্রতিবেশীদের সাথে আমি উঠানে বসেছিলাম। উঠানে পাটি বিছিয়ে বসতে দেয়া হয়েছিল লাইন ধরে। সবাই খেয়ে উঠে পড়েছিল। আমি নালায়ে নালায়ে (ধীরে ধীরে) খাচ্ছিলাম। একাই এক পাটিতে এক পায়ের উপর বসে আরেক পা খারা করে হাটু ভেংগে পেট ভরে খাচ্ছিলাম। শেষে চিনি দই খাচ্ছিলাম। মিয়া কাক্কু (আবুল কাশেম তালুকদার) নকিদারী (খাওয়াচ্ছিলেন) করছিলেন। তিনি আমাকে “এই তুই কত খাস” বলে এক হাতে ডেনা (বাহু) ধরে আরেক হাতে আমার খাওয়ার প্লেট ধরে রান্না ঘরে বসিয়ে দিয়ে “এখন আসতে আসতে খা” বলে চলে গেলেন। তারপরের ঘটনা কিছুই জানি না। সন্ধ্যা রাতেই আমি ঘুমিয়ে পড়তাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাড়ী নিস্তব্ধ। বুবুকে নিয়ে গেছে শশুর বাড়ী। মা আচল দিয়ে চোখ মুচ্ছেন। চোখের পানি নাক বেয়ে পড়ছিল। আড়ালে গিয়ে নাক ঝাড়ছিলেন। আমারও তাই হচ্ছিল। আমিও তাই করলাম। বড় ঘরের ও রান্নাঘরের পশ্চিম কোনায় একটি পেয়ারা গাছ ছিল উচু। আমি পেয়ারা পাড়তে পাড়তাম না। ভাইও পাড়তেন না। বুবু আমাকে পেয়ারা পেড়ে দিতেন। আমি পেয়ারা গাছের নিচে গিয়ে দাড়ালাম। গাছের আগ ডালে একটা পেয়ারা পেকেছিল। আমি মনে মনে ভাবলাম “এখন আমাকে কে হরবি (পেয়ারা) পেড়ে দিবে!” আমার চোখ বেয়ে পানি ঝড়ছিল। সেই পানি কেউ দেখেনি। বুক ফিকুরে কান্না করছিলাম। কেউ দেখতে পায় নি সেই কান্না। আমিই জানি সেই কান্না কত কষ্টের। সেই হরবি গাছটি এতদিনও ছিল। ভাতিজা ঘর দেয়ার সময় কেটে ফেলেছে। তাতে নাকি ভাই খুব রাগ করেছিলেন। আমি জানি ভাইর কষ্টের কথা। পেয়ারা গাছটি যে ছিল আমাদের শৈশবের সাথী। আমাদের বাইর বাড়ীতে যে কাঠাল গাছটা আছে না, ওটার বয়স আমার বয়সের থেকে কিছু বেশী। আমার জন্মের কিছুদিন আগে ওটা লাগানো হয়েছিল।

সারাক্ষণ বুবুর কথা মনে হচ্ছিল। মা শত কাজে ব্যস্ত থাকতেন। বুবুই আমাদেরকে সামলিয়ে রাখতেন। কত রকম গল্প ও ছড়া যে শুনাতেন! সেসব ছড়া ও গল্প আমি এখন মনে করতে পারছি না। এগুলিকে এক কথায় হাস্তর বলা হতো। হাস্তর বলতে বলাতে বুবু সেইসব ছড়া ও গল্প বলতেন। কিছু কিছু লাইন মনে আসছে:
“আম পাতা জোড়া জোড়া…
পাগলা ঘোড়া খেপেছে….
বাইর বাড়ী করাতি, দুধের আওটা চড়াইছি…
জাংলাতলে খাড়াইয়াছি ভাই আইতাছে, ও ভাই ভাই গো, ভাবী কিবা আছে গো?
তোমার ভাবীর কান্দনে, নদীর কুল ভাংগনে…। ”
রাজকুমারের গল্প শুনতাম। সেই গল্পে রাজকুমারী শত সখী নিয়ে গাংগে গোসল করছিলো। ভিনদেশের রাজ কুমার পংখীরাজ ঘোরা নিয়ে এসে দেখে রাজকুমারীকে গাংগে গোসল করতে। সখীদের লম্বা লম্বা চুল গজানোর কথা বলে মাথা নেড়া করে এক শত একটা ডুব দিতে বলে রাজকুমার। সখীরা মাথা নেড়া করে একশত একটা ডুব দেয়। এই ফাকে রাজকুমারীকে পংখীরাজ ঘোড়ায় তুলে নিয়ে যায় রাজকুমার। এদিকে ডুব শেষ হবার পরও চুল না গজানোয় তারা ডুপ পাড়তে থাকে আর বলে “অপ, অ বু, তোর চুল জালাইছে?” আমরা বলতাম “তারপর? ” বুবু বলতেন “তারা ডুপ পাড়ছে আর বলছে অ বু তোর চুল জালাইছে? ” শুনতে শুনতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়তাম। আজ বুবু নেই। আজ কে আমাকে হাস্তর শুনাবে? আমি গাছে গাছে চেয়ে থাকি। আজ যেন বেশী বেশী ঘুঘু ডাকে।

সেদিন বুবুকে ফোনে জিজ্ঞেস করেছিলাম
– আপনি যেদিন প্রথম শশুরবাড়ী গেলেন কিভাবে গেলেন, ডুলি চড়ে না গরুর গাড়ীতে?
– গরুর গাড়ীতে। মাক্কু মামুর গরুর গাড়ীতে।
– সাথে কে কে গিয়েছিল?
– সাথে নানা ও হেলেনা (আমার চাচাত বোন, বুবুর ছোট) গিয়েছিল। হেলেনা ওখানে গিয়ে তার নানাবাড়ি চলে গিয়েছিল (ঐ গ্রামেই)। আর নানা চলে গিয়েছিল রৌহা (নানাবাড়ি পাশের গ্রাম রৌহা। বুবুর শশুরবাড়ী আমজানি)।
– কোন সময় রওনা দিয়েছিলেন?
– এশা নামাজের পড়। আমজানি যেতে যেতে প্রভাত হয়ে যায়। বিয়ে পড়ানো ও সাগরানা খেতে খেতে রাত পোহায়ে যায়।
– কেন? আমাদের বাড়িতে বিয়ে পড়ানো হয় নাই?
– তোমার দুলাভাই তো চইলা যায় নি। যেসব বর চইলা আসে তাদের বিয়ে মেয়ের বাড়ীতে হয়। মেয়ে শশুরবাড়ী এনে বিয়ে পড়ানোকে বলা হয় তুইলা আনা। আমাকে তুইলা এনে বিয়ে পড়ায়েছে। এখনো এই রকম নিয়ম আছে।
নতুন বউ প্রথম শশুরবাড়ী যাবার সময় দাদা-দাদী বা ছোট ভাই-বোন যেতেন সাথে। বউরা সাধারণত ডুলি চড়ে শশুরবাড়ী যেতেন। ডুলি হলো ছোট আকারের পালকি। যারা বউয়ের সাথে যেতেন তাদেরকে বলা হতো ডুলিধরা। বুবুর ডুলিধরা ছিলেন নানা ও হেলেনা আপা। পাহাড়ের বিয়েতে ডুলির প্রচলন কম ছিল। এখানে গরুরগাড়ীতে বউ নেয়া হতো। গাড়ীর দুইপাশে দুইটা কলাগাছের গুড়ি বাধা হতো। বাঁশের বাতি বাকা করে কলাগাছে গাথা হতো। এর উপর দিয়ে চাদর ফেলে ছই বানানো হতো। ছইয়ের ভিতর নতুন বউ বসতো। গরুরগাড়ীতে গেলেও বলা হতো ডুলিধরা। ডুলিধরারা বড় রকমের মাইন (সন্মানী) পেতেন। মাক্কু মামার গাড়ীতে বুবু ফিরানি আসেন। এইবার সাথে আসেন আমার সুন্দর দুলাভাই নুর মোহাম্মদ। মা নানা রকম পিঠা, পায়েস বানান। অন্য দুলাভাইরাও আসেন নিতা (দাওয়াত) খেতে। বাসার ভাই, মোতালেব ভাইদের সাথে দুলাভাইর খাতির জমে। দুলাভাই তাদের সাথে তাস খেলায় মেতে যান। অন্য দুলাভাইরা আমাকে শিখিয়ে দেন “পিছন থেকে চুপি চুপি গিয়ে নতুন দুলাভাইয়ের কান মলে দিবে। ” ভালো এক খেলা পেলাম। সুযোগ পেলেই দুলাভাইর কান মলে দিতাম। আর দুলাভাইর কান মলা খাইতাম। খেতেও ভালো লাগতো, দিতেও ভালো লাগতো।

বুবুর বিয়ে হয়েছিল ফাল্গুন মাসে। বাবা মাঝে মাঝে বুবুকে দেখতে যেতেন আমজানী। আমিও বাবার সাথে যেতে চাইতাম। বাবা নিতেন না। একবার খুব রাগ করলাম। বাবা প্রতিশ্রুতি দিলেন নিয়ে যাবেন। একদিন আমি বড় ক্ষেত থেকে বুইদ্দাচালার ভিতর দিয়ে বাড়ীর দিকে আসছিলাম। পথে বাবার সাথে দেখা। জিগালাম “কোথায় যাচ্ছেন?” বললেন “তোমার বুর বাড়ী। ” আমি রাগে কিছু না বলে এক দৌড়ে বাড়ী গিয়ে শার্টটা গায়ে দিয়ে আরেক দৌড় দিলাম বাবাকে ধরার জন্য। ঢ্নডনিয়াপাড়া পর্যন্ত গেলাম। বাবাকে ধরতে পারলাম না। আর যেতে সাহস পেলাম না। হারিয়ে যেতে পারি। গাছের নিচে দাড়ালাম। বংশী বাড়ীর ৪টি কুকুর দৌড়িয়ে কাছে এলো। ঘেউ ঘেউ করে নানা রকম প্রশ্ন করছে। আত্বা ধরফরিয়ে উঠলো। চতুরদিকে ধেরাও করেছে। কোন দিকে যাই? চিৎকার করারো সাহস পাচ্ছি না। দৃশ্যটা দেখে এক মহিলা কুকুরগুলিকে নিয়ে গেলো ডেকে। আমি বাড়ীর দিকে চলে এলাম। বাড়ীর কাছে মনো ভাইদের বারান্দায় দেখি বাবা বসে গল্প করছে আবেজ মামার সাথে। যে বাবাকে ধরার জন্য আমি প্রায় এক কিলোমিটার চলে গিয়েছিলাম। বাবা আমার শার্ট গায়ে দেখে অবাক হলেন। ঘটনা জানতে চাইলেন। আমি রাগে ফোস ফোস করলাম। বাবা আমাকে কোলে নিলেন। আমি হাতপা ছুটাছুটি করে খোভ প্রকাশ করলাম। তিনি আশ্বস্ত করলেন” আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই আমরা গরুর গাড়ী করে তোমার বুকে আনতে যাবো। তুমি সেই গাড়ীতেই যেতে পারবে।”

একদিন মাগরীবের নামাজের পর আমরা রওনা দিলাম আমজানীর উদ্যেশ্যে। জামাল ভাইর গরুর গাড়ী নিয়ে। আমি, বাবা ও জামাল ভাই। জামালভাই গাড়ী হাকাচ্ছিলেন। আমি জামাল ভাইর সামনে বসে হইট হইট করে আনন্দ পাচ্ছিলাম। ঢ্নডনিয়া বাইদ পাড় হয়ে তেল ধারা, গড়বাড়ী হয়ে বৈলারপুর পর্যন্ত গেলাম। এক সময় গাড়ীর বলদ একযোগে থেমে গেলো। রাত অনেক হবে। মনে হচ্ছে কিছু দেখে বলদ ভয় পাচ্ছে। কিন্তু আমরা কিছু দেখতে পাচ্ছি না। জামালভাই খুব চেষ্টা করলেন। বলদ পিটালেন। কাজ হলো না। আমার ভয় লাগা শুরু হলো। এমন কোন শকশ সামনে পড়েছে যা হয়তো আমরা দেখছিনা। গরু দেখতে পারছে। শকশ হলো ভুত জাতীয়। বুবুর কাছ থেকে শুনেছি। আমরা না দেখলেও পশুপাখি শকশ দেখতে পারে। এক সময় বাবা বললেন “জামাল, সামনে ঐ সাদা গোডাউনটা দেখে হয়তো গরু ভয় পাচ্ছে। ” জামাল ভাই বললেন “হতে পারে।” আমিও ব্যাপারটা বুজতে পারলাম।

বৈলারপুর একটি সরকারি গোডাউন ছিল। এটা একটি সাদা বিল্ডিং। সরকার কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য মুল্যে শস্য কিনে এখানে স্টোর করতো। এটা এখনো আছে। এটা বৈলারপুর তালুকদার বাড়ীর কাছাকাছি রাস্তার সাথে। দবে তালুকদার সাহেব ছিলেন আমার চাচা সোলাইমান তালুকদার মাষ্টারের ভায়েরা (রাজ্জাক তালুকদারের খালু ও শশুর)। ইব্রাহীম তালুকদার ছিলেন আমার চাচা রিয়াজ উদ্দিন তালুকদারের ভায়েরা (জামাল ভাইর খালু)।

জামাল ভাই গরুর কাধ থেকে জোয়াল খুলে দক্ষিণ দিক দিয়ে ঘুরিয়ে গোডাউনের আড়াল দিয়ে নিয়ে সামনে বলু তাঐ (দুলাভাইর মামা) বাড়ীর কাছে নিয়ে গাছের সাথে বেধে রেখে ফিরে এলেন। অনেক সময় লাগলো। এতক্ষণ আমি গাড়ীতে বাবার থোড়াতে (উরুতে) মাথা রেখে চিত হয়ে শুয়ে আকাশে পৃর্ণিমা চাঁদ উপভোগ করছিলাম। চারিদিকে নি:শব্দ ছিল। শুধু একটাপাখী ডেকে যাচ্ছিল এক নাগারে “পুত ক্ষেত কর, পুত ক্ষেত কর। ” আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম “পাখী পুত ক্ষেত কর বলে কেন?” বাবা বললেন “শুনা যায় এক কৃষক কোদাল দিয়ে ক্ষেত কোপাচ্ছিল। তার পুত (ছোট শিশু ছেলে) হঠাৎ কোদালের নিচে মাথা দিলে কোদালের আঘাতে ছেলেটি মারা যায়। তারপর থেকেই পাখী ছেলের শোকে ডেকে যাচ্ছে পুত ক্ষেত কর। ” আমি এখনো বাড়ী গেলে সেই পাখীর ডাক শুনতে পাই পুত ক্ষেত কর। বাবাকে মনে পড়ে, বুবুকে মনে পড়ে। মনে পড়ে গোডাউন। মনে পড়ে বৈলারপুর। জ্যোস্না রাত।

জামালভাই ফিরে এলেন। বাবা ও জামালভাই দুই জোয়ালে ধরে গাড়ী টেনে সোজা রাস্তায় গোডাউনের পাশ দিয়ে চলে গেলেন গরু বাধা গাছ পর্যন্ত।
আমি আরামে বসে রইলাম গাড়ীতে। গভীর রাতে পৌছলাম বুবুর বাড়ী আমজানিতে। বুবুকে নিয়ে পরদিন আমাদের বাড়ী এলাম। বুবু সন্তান সম্ভবা ছিলেন তাই আমাদের বাড়ীতেই রয়ে গেলেন। যথা সময়ের কিছুদিন আগেই এক মেয়ে সন্তান ভুমিষ্ঠ হলো। আমি মামা হলাম। নাম রাখা হলো সহিদা। সহিদা সাইজে ছোট ছিল। সাত দিন পরই অসুস্থ হয়ে পড়লো। নিশ্বাস কম নিত। শরীরের রঙ লাল নীল সাদা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রঙ ধারন করতো। বুবুর শশুর বাড়ীর একজন আত্বীয়া এসেছিলেন। তিনি বললেন “খারাপ কিছুতে ধরেছে। দেখেন না শরীরের একেক অংশ একেক বার একেক রঙ হচ্ছে। ” অনেকে সেটা বিশ্বাস করলেন। ছোট মানুষ। ধরতেও পাড়ে। এক মাসের মধ্যেই সহিদার মৃত্যু হলো। সহিদার জন্য আমার মায়া তৈরি হয় নি। সহিদাকে নিয়ে যখন আমাদের গোরস্থানের দিকে গেলো তখন আমি গোরস্থানের দিকে না গিয়ে বুবুর সাথে ছিলাম। বুবু অসহায় ভাবে সহিদার পথের দিকে চেয়ে চেয়ে চোখ মুছছিলেন। বুবু সহিদাকে নয় মাস পেটে ধারন করেছিলেন। সেই সহিদা বুবুকে কয়েকদিনের জন্য দেখা দিয়ে চলে গেলো। এই কষ্টটা আমি বুঝতে পেড়ে বুবুর কষ্টের জন্য আমি কাঁদলাম। সহিদার জন্য না। ডাক্তার হবার পর বুঝেছি সহিদার নিউমোনিয়া হয়েছিল। অক্সিজেন কমে গেলে নীল হয়ে যেতো। অক্সিজেন পেলে লাল হতো।

কিছুদিন পর বুবু শশুর বাড়ী ফিরে গেলেন। শুরু হল অনুসন্ধান কি করে সহিদাকে জীনে ধরলো। বাড়ীতে মহিলা ফকির দিয়ে ভরন বসানো হলো। সেই ভরনে আমিও উপস্থিত ছিলাম। ফকির বালিশের উপর হাত থাপরিয়ে, মাথার চুল ছুড়া ছুড়ি করে মুখে অদ্ভুত অদ্ভুত শব্দ করে জিকির করে অদ্ভুত স্বরে কিছু অদ্ভুত কথা বললেন। তার পরিচয় আমি দিতে চাই না। তবে সারাজীবন আমি তাকে অপছন্দ করেছি। তিনি বললেন “সহিদাকে পেটে নিয়ে রাত দুপুরে উঠানে বের হয়েছিল। সেই সময় জিন তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছিল। সেই থেকে তাকে জিনে পেয়ে বসে। পরের সন্তানগুলি বাচাতে হলে বাপের বাড়ী থাকা যাবে না সন্তান পেটে থাকা অবস্থায়। সেই বিধান অনুযায়ী দ্বিতীয় সন্তান পেটে থাকাকালীন বুবু আমাদের বাড়ী আসেন নি। সুন্দর ফুটফুটে মেয়ে হয় দ্বিতীয় বার। নাম রাখা হয় নুরজাহান। এক বছর বয়সের সময় যখন সে হাটা শিখেছে আমি তাকে কত আদর করতাম! দেখার মতো একটি মেয়ে ছিল। তার জন্মের কয়েকমাস পরেই বুবুর পেটে আরেক সন্তান আসে। সন্তান হবার প্রাক্কালে বুবু শশুরবাড়ী ছিলেন। দুপুরের পরে রান্নাঘরে কাজ করছিলেন। বুবুর জায়ের মেয়ে রাশিদা, যে নুরজাহানের থেকে একটু বড় ছিল, সে এসে বললো “চাচী, নুরজাহান পাগারের পানিতে ডুব দিয়েছে।” বুবু একটা চিৎকার দিয়ে দৌড় দেন। উঠানের মাঝ বরাবর গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ধরা ধরি করে ঘরে নেয়া হয়। পেটের বাচ্চা প্রসব হয়ে যায়। সেই বাচ্চাই আজকের লুৎফর রহমান (তারা)। একই দিন বুবু মেয়ে নূরজাহানকে হারালেন আর ছেলে তারাকে পেলেন। আমরা নূরজাহানের পানিতে পড়ে মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে আমজানি গিয়ে দেখি বুবুর ছেলে হয়েছে। বুবু মেয়ে হারানোর কান্না গলাছেড়ে করতে পারেন নি। আজো আমার ভাগ্নি নূরজাহানের কথা মনে পড়ে। এখনো তার চিল্লানী আমার কানে বাজে।

প্রতি দুই বছর অন্তর অন্তর বুবুর ১০ জন সন্তান হয়। এতগুলি সন্তানের পিছনে বুবুকে অনেক পেরেশানি হতে হয়েছে। ১৯৭৩/৭৪ এর দিকে বুবুর আরও দুইজন ছেলে কয়েদিনের ব্যবধানে রক্ত আমাশয় হয়ে মারা যায়। একজনের বয়স প্রায় তিন বছর হয়েছিল। সবার চেয়ে দেখতে সুন্দর হয়েছিল। আমি নাম রেখেছিলাম আমার ঘনিষ্ঠ ক্লাসমেট বন্ধু লুৎফর রহমানের নামে। বন্ধু লুৎফর আমার সাথে প্রাইমারী থেকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত একসাথে পড়েছে। সে নাট্য বিভাগে পি এইচ ডি করেছে। ড. লুৎফর রহমান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্য বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান। সেই নামটি এখন তারার অফিসিয়াল নাম হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে। আরেকজন যে মারা গিয়েছিল তার বয়স মাত্র তিন/চার মাস হয়েছিল।
ভাগ্নে তারা দেখতে খুবই সুন্দর। আমার প্রথম ভাগ্নে। আমি খুব আদর করতাম। এখনো করি। তাই আমি ঘন ঘন বুবুর বাড়ী যেতাম। একবার তারাকে নিয়ে বিপদে পড়েছিলাম। বুবুকে বলেকয়ে একবার আমি আমজানি থেকে তারাকে নিয়ে আমাদের বাড়ী গেলাম। কিছুদূর যাবার পর সে আর হাটে না। আমি তাকে কাধে নিয়ে হাটলাম। আমিও হাটতে পারছিলাম না। এদিকে বেলা ডুবে যাচ্ছে। তেল ধারার জংগলে রাত হলে আমি কি করব? মহা বিপদ হবে ভেবে কষ্ট করে চলতে থাকলাম। কাধে আমার তারা ভাগ্নে। যাহোক, বেলা ডোবার আগেই তেল ধারা পাড়ি দিয়ে ঘাট চওনা পৌছলাম। তখন ছোট চওনার খালে সাকোও ছিল না গুদারাও ছিল না। পড়লাম আরেক মুস্কিলে। ওপারে একটা ডিঙি নৌকা বাধা ছিল। নৌকায় এক লোক লুঙ্গী পড়া খালী গায় আড়া আড়ি টুপি মাথায় একান্তচিত্তে নামাজ পড়ছিল। ভাবলাম নামাজ শেষ করার পর পাড় করে দেয়ার জন্য অনুরোধ করবো। কিন্ত বেটার নামাজ আর শেষ হয় না। এদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। জিতাশ্বরীর বন পাড়ি দিব কেমনে? ধৈর্য হারা হয়ে নামাজের মধ্যেই ডাকা শুরু করলাম “এই যে গো, একটু পাড় কইরা দেইন। রাত অইয়া যাইতাছে। ” ভাইগ্না প্যা প্যা করে কান্না করতে লাগলো। ভাইগ্নাও বুঝতে পারলো যে আমরা বিপদে পড়েছি। লোকটা ডানে বামে সালাম ফিরায়ে লগিটা হাতে নিয়ে আসতে আসতে নৌকা নিয়ে আসলো। পাড় করে দিলো। অন্ধকারের ভিতর দিয়ে অতি কষ্টে বাড়ী পৌছলাম।

প্রতি বর্ষায় বুবুদের বাড়ী যেতাম। ইন্দাজানী হাট হয়ে নৌকায় যেতাম। আরেক ইন্দাজানী হাট হয়ে চলে আসতাম। উনা মাসেও (শুকনা সিজন) যেতাম। সপ্তাহ কাল কাটিয়ে আসতাম। বুবু আমার জন্য নানারকম রান্না করতেন। বুবুর হাতের রান্না মার রান্নার মতোই। একনো আমজানি যাই। বুবুর হাতের রান্না খেয়ে মার রান্নার স্বাদ পাই। বুবু ঘুরের সামনে ছায়লাতে চুলাতে লাকড়ি দিয়ে রান্না করেন। ডেকরা ডেকরা (অল্প বয়সের) মোরগ রান্না করেন। পাতিল থেকে বাস্না (সুঘ্রান) আসে বাস্পের সাথে। আমি নাক খারা করে ঘ্রাণ নেই। ইচ্ছে করে বুবুর কাছে গিয়ে পিড়িতে বসে আগুন পোহাই। আর মোরগের ঘ্রান নেই। কিন্তু বুবু পিড়িতে বসতে দেন না। কারন, আমি মেডিকেল কলেজের প্রফেসর। আমি বসি চেয়ারে। বুবুর কাছে। পাড়ার পরিচিত জনেরা আসেন। জিজ্ঞেস করেন “ডাক্তার ভাই, কখন আইলেন?” এরা অনেকেই আমার খেলার সাথী ছিলেন ছোট বেলা। এদের সাথে পাশের গাংগে সাতার কেটেছি, নল (ডুব) খেলেছি কতো! বর্শি দিয়ে বাইম মাছ, পাবদা মাছ আরো কত জাতের মাছ ধরেছি। মশারি টেনে পালানের ক্ষেত থেকে মলা, ঢেলা ও চেলা মাছ ধরেছি। নৌকা সেচে পুঁটিমাছ ধরেছি। উনা মাসে হা ডু ডু, গোদুল্লা ও গোল্লাছুট খেলেছি। তারা কেউ কেউ মারা গেছেন, কেউ কেউ প্রবাসে আছেন, কেউ কেউ বাড়ীতে আবার কেউ কেউ শহরে আছেন। অনেকেই দেখতে আমার চেয়ে বৃদ্ধ মনে হয়। মনে পড়ে রশিদ ভাই, এবাদত ভাই, আবুবকর, হায়দর আরও অনেকের কথা। শিশু সার্জারি বিভাগের প্রফেসর ডাঃ শাহ আলম তালুকদার এই গ্রামেরই সন্তান। তিনি আমার দাদার মামাতো ভাইয়ের ছেলে। তাই চাচা হন। তিনি যখন বর্গা হাই স্কুলে পড়েন তখন আমি বুবুদের বাড়ীতে এসেছিলাম। শাহ আলম কাকা কয়েকজন ছাত্রের সাথে ডিংগি নৌকা নিয়ে স্কুল থেকে ফিরছিলেন। বুবু আমাকে বললেন “ঐযে, সুন্দর ছেলেটে যার হাতে লগি, ওর নাম শাহ আলম। আমাদের চাচা হয়। খুব ভালো ছাত্র। ফাইভে বৃত্তি পেয়েছে। তোমাকেও পেতে হবে।

বুবুর ছেলেরা সবাই চাকরী করে। নাতী নাত্নীরাও মেধাবী হয়েছে। সবাই ভালো করছে। ছেলে মেয়ে সবাই শহরে বাড়ী করে শহরে বসবাস করছে। শুধু ছোট ছেলেটা প্রবাসে থাকে। ছোট ছেলের বউ বাচ্চা নিয়ে বুবু গ্রামের বাড়ীই থাকেন বেশী সময়। ছেলে মেয়েরা জোড় করেই শহরের বাসায় নিয়ে যায়। নানান বাহানা করে বুবু গ্রামে চলে আসেন। আমিও বার বার তাকিদ দেই আমার বাসায় এসে কিছুদিন থাকার জন্য। তিনি আসেন। আমি আমার স্ত্রী স্বপ্নাকে বলি বুবুর হাতের রান্না স্বাদ লাগে। বুবুকে রাধতে দাও। ” স্বপ্না বলে “আপা বলেন, স্বপ্নার হাতের রান্না ভালো লাগে। ” আসলে দুইটাই ঠিক। আমার ইঞ্জিনিয়ার মেয়েও এখন আলাদা সংসার করছে। সেও আমার জন্য রান্না করে। খুব স্বাদ হয়। জিজ্ঞেস করে
-কেমন হয়েছে?
– খুব ভালো। কিন্তু ফার্স্ট সেকেন্ড না।
– ফার্স্ট সেকেন্ড কে?
– তোমার দাদী, তোমার ফুফুরা।
– আমি না তোমার মা।
– তুমি আমার দুই নম্বর মা। আমার এক নম্বর মা ফাতেমা বেগম।

ছোট মেয়ে ডাক্তার। সেও ইউটিউব দেখে আধুনিক কি সব ফ্রাই জাতীয় রান্না করে। ওগুলোও আমার কাছে ভালো লাগে।

বুবু কয়েকদিন আমার বাসায় কাটেই চলে যান। আমি জানি, আমার এই ২৪০০ স্কয়ার ফুট ফ্লোরের বাসাও বুবুর কাছে কবুতরের খোপ মনে হয়। তাই তো বুবু চলে যান গ্রামে আমজানি। তিনি বাড়ীর পশ্চিম পালানে গিয়ে দাড়াবেন, বিস্তির্ন সবুজ মাঠ দেখবেন। দেখবেন বিস্তির্ন মরা বিলের কচুরি পানা। দেখবেন বোরো ক্ষেত যেখানে দুলাভাই উড়া (আগাছা) বাছতেন। চেয়ে থাকবেন গোরস্থানের দিকে যেখানে ঘুমিয়ে আছেন দুলাভাই ও বুবুর তিন সন্তান, বড় ও সমবয়স্ক মৃত মানুষগুলি। কিছুক্ষণ গাংগের পাড়ে জালাক্ষেতের বাতর দিয়ে হাটবেন। যেখানে জালা (ধানের চারা) তুলতেন তার প্রিয় স্বামী নূর মোহাম্মদ।

অফিসে সরকারি কর্তব্য করে বিকেল ও সন্ধায় কিছুক্ষণ প্রাইভেট ল্যাবরেটরি প্রাক্টিস করি। প্রতিদিনই বেশ কিছু রুগী ও রুগী নিয়ে কিছু লোক দেশ থেকে আসেন। কাজের ফাকে ফাকে আমি গ্রামের লোকদের সাথে কথা বলি। ভালো লাগে। ডাক্তার দেখায়ে, পরীক্ষা নিরিক্ষা করিয়ে প্রেস্ক্রিপশন নিয়ে একে একে সবাই চলে যান। আমি একা রুমে বসে প্যাথলজি স্লাইড দেখতে থাকি। সেই সব স্লাইডে কারো কারো ক্যান্সার রোগ ধরা পরে। তাদের ভবিষ্যৎ পরিনতির কথা মনে করে মন টা খারাপ হয়ে যায়। নিস্তব্ধ রুম। মন ছুটে যায় অতীতে। আমার কৈশোর জীবনে। বন বনানী, নদী, খাল, বিল এসব মাথায় ঘুরপাক করতে থাকে। মনে পড়ে বুবুর কথা। কল্পনা করি বুবু হয়তো একা বারান্দায় গালে হাত দিয়ে বসে আছেন। সমবয়সী অনেকেই পরপাড়ে চলে গেছেন। যারা বেচে আছেন তারাও বাড়ী ছেড়ে শহরে চলে গেছেন। মোবাইলটা হাতে নিয়ে লাইলী বুবু নাম্বারে কল দেই। বুবুর কমন কথা “তুমি কেমন আছো, মুনার মা কেমন আছে, মুনা-দিনা কেমন আছে, তুমি ওদের নিয়ে কবে আসবা, ইত্যাদি। ” জানতে পারি নাতী নাত্নীদের নিয়ে বুবুর সময় ভালোই যাচ্ছে। মনটা শান্ত হয় আমার।

আমার এই গল্প পড়তে পড়তে ধৈর্যহারা হয়ে অথবা বিরক্ত হয়ে অনেকেই হয়তো মাঝপথে পড়া ক্ষান্ত দিয়েছে। আপনি যেহেতু ধৈর্যহারা হন নি তাই আপনাকে বলছি। আপনি হয়তো বলবেন এসব লিখে আমার লাভ কি। লাভ কিছুই না। গাড়ীতে জার্নি করার সময় বোরিং লাগে। কোন কাজ নেই। তাই মোবাইল টিপে গল্প লিখতে লিখতে গন্তব্যে চলে যাই। কখন জার্নি শেষ হয়ে গেছে টের পাই না। মনের কথা কিছু স্মৃতির পাতায় লিখে রাখলাম। কেউ না কেউ পড়বে। কারো না কারো ভালো লাগতেও পারে। আমিও কিছুটা হাল্কা হলাম।

তারিখ: ৮/১২/২০১৮ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ -কিশোরগঞ্জ -ময়মনসিংহ জার্নি

Leave a Reply

Your email address will not be published.