এডিসনের কুকুরটি

এডিসনের কুকুরটি
(বিজ্ঞানের গল্প)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

কথা একবার ছেড়ে দিলে আর মুখে ফেরৎ নেয়া যায় না। বাতাসে তা বিলিন হয়ে যায়। কারো কানে পৌছলে সে তা শুনতে পায়। আদি পিতা আদম (আ:) থেকে শুরু করে মানুষ কত কথাই না বলেছে! সেই সব কথা গুলি যদি রেকর্ড করা থাকতো! ১৮৭৭ সনের আগেও কেউ কথা বা শব্দ রেকর্ড করতে পারতো না। তবে বহু আগে থেকেই মানুষের এই ইচ্ছাটা ছিল। এই কাজটি আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন। তিনি জানতেন কোন কিছুর কম্পন হলে শব্দ তৈরি হয়। আমাদের গলার ভিতরের ভোকাল কর্ড কম্পন করিয়ে আমরা শব্দ তৈরি করি। জিব্বা, তালু, দাঁত ও নাক দিয়ে শব্দ নিয়ন্ত্রণ করে আমরা কথা তৈরি করি। চোংগার এক প্রান্তে পর্দা লাগিয়ে পর্দার উপর কথা বললে চোংগার অপর প্রান্তে লাগানো পর্দায় হুবহু শব্দ তৈরি হয়। এবং সেখানে কান লাগিয়ে শব্দ শুনা যায়। ছোট বেলায় আমরা দেশলাই দিয়ে এমন খেলনা তৈরি করেছি। এডিসনের সময়ও এমন খেলনা ছিল। এডিসন চেষ্টা করতে লাগলেন এমন কিছু তৈরি করতে যেটা দিয়ে একবার শব্দ হবার সময় যে কম্পন হয় সেই কম্পন হুবহু তৈরি করতে পারলে সেই শব্দ বার বার শুনানো যাবে। তার মানে শব্দ রেকর্ড করা যাবে।

এনিয়ে বিজ্ঞানী এডিসন সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতেন। নির্জনে কাজ করতেন। সংগী ছিল তার পোষা কুকুরটি। তিনি একটি কৌটার উপর টিনের ফয়েল লাগালেন। কৌটার মাঝখান দিয়ে একটা ডল্লা লাগালেন। ডল্লা ঘুরানোর জন্য একটা হাতল লাগালেন। ডল্লা ঘুরালে টিনের ফয়েল সহ কৌটা ঘুরত। একটা চাকতির উপর পাতলা পর্দা লাগালানেন। পর্দার এক পাশে একটা পিন লাগালেন। পিনের সুচালো মাথা টিনের উপর বসালেন। তিনি হাতল দিয়ে ডল্লা ঘুরালেন এবং পর্দার উপর কথা বললেন “গুড মর্নিং, হাউ ডো ইউ ডো?” মানে “শুভ সকাল। আপনি কেমন আছেন।” পর্দার উপর মুখের শব্দ পরে পর্দায় কম্পন হলো। তাতে পিন উঠানামা করলো টিনের ফয়েলের উপর। টিনের উপর ডেউ খেলে গেল পিনের দাগে। এবার তিনি ফয়েলের কাটা দাগের উপর পিন বসিয়ে ডল্লা ঘুরালেন। পর্দা কাপ্তে থাকলো হুবহু আগের মতো । এবং শব্দ হলো “গুড মর্নিং। হাউ ডো ইউ ডো?” ডল্লা গুরতেই লাগলো শব্দও বারবার হতে লাগলো। আনন্দে এডিসনের টয়লেট চেপে গেলো। তিনি টয়লেটে ঢুকে পড়লেন। এডিসনের কুকুরের ঘুম ভাংলো। কুকুরটি দেখলো তার মাস্টার রুমে নেই। অথচ তার কথা শুনা যাচ্ছে যন্ত্রটিতে। সে আর্চয্য হয়ে কান পেতে শুনলো তার মনিবের কথা অর্থাৎ “হিজ মাস্টারস ভয়েস।” এই যন্ত্রটির নাম হলো গ্রামোফোন রেকর্ড। পরেরদিন এডিসন যন্ত্রটি নিয়ে তার অফিসে গিয়ে তার রেকর্ড করা কথা শুনিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন। দ্রুত গ্রামোফোন কোম্পানি তৈরি হল। তারা তাদের লোগোতে এডিসনের গ্রামোফোন রেকর্ডের ছবি দিল এবং সামনে কুকুর বসে তার মনিবের রেকর্ড করা কথা শুনছে এমন ছবি দিল। রেকর্ডের কাজ তারা চাকতিতে করল। উপরে লিখে দিল “হিজ মাস্টারস ভয়েস। ”

আগের দিনে আমরা গ্রামোফোন রেকর্ডেই গান ও নাটক শুনতাম। কাজী নজরুলের অনেক গান গ্রামোফোন রেকর্ডে রেকর্ড করা হতো। সেই গুলি এখন ইউ টিউবে শুনা যায়।

এডিসনের রেকর্ড যন্ত্র আবিস্কারের একশত বছর পর ১৯৭৭ সনে এইচ এস সি ক্লাসে পড়ার সময় শ্রদ্ধেয় আবুল হোসেন স্যার আমাকে প্রশ্ন করলেন
– সাদেক, বলতো এডিসনের কুকুরটি ছেলে কুকুর না মেয়ে কুকুর ছিল?
– স্যার, ছেলে কুকুর ছিল।
– বুঝলে কেমনে?
– স্যার, যদি মেয়ে কুকুর হতো তবে কোম্পানিরা লিখতো “হার মাস্টারস ভয়েস। ”
– রাইট।
৮/৯/২০১৮ ইং

Leave a Reply

Your email address will not be published.