কোহিনূর

কোহিনূর
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

এই কোহিনূরকে আপনারা চিনবেন না। এই কোহিনূর একজন গরীবের মেয়ে। দেখতে ছিল রবি ঠাকুরের গানের কৃষ্ণকলির মতো। তার বাবার কাছে ছিল বৃটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত মোগল সম্রাজ্ঞীর ব্যবহার করা পৃথিবীর সবচেয়ে দামী হীরা কোহিনূরের মতো। ত্রিশ বছরেরও বেশী আগে আমার প্রথম পোস্টিং হয়েছিল বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়ন উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার হিসাবে। চিকিৎসা পেশার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা থাকায় দুঃসাহসিক ইচ্ছা নিয়ে আমি সেই গ্রামের জরাজীর্ণ টিনসেড হাসপাতালে গ্রামের মানুষের চিকিৎসা দিতে থাকি। পাশে একটা পরিত্যক্ত সরকারি বাসস্থান ছিল মেডিকেল অফিসারের জন্য। ইতিপূর্বে কোন এমবিবিএস ডাক্তার সেখানে পোস্টিং হয় নাই। আমিই প্রথম। ১০০ টাকা দামের চৌকি কিনে সেই বাসাতেই আমি থাকা শুরু করলাম। সাথে একটা রান্নাঘর ছিল। ওটার ভিতর কোহিনূরের বাবা ধানের ক্ষর রেখেছিলেন। আরেকটা বৈঠককখানা ছিল। ওটার ভিতর কোহিনূরের বাবা ধানের আটি রেখেছিলেন স্তুপ করে। বাড়ীর চারিদিকে পরিত্যক্ত সিমেন্টের খুটি ছিল টিনের বেড়ার। কিন্তু টিন ছিল না। একটা কামলা নিয়ে বাঁশ কিনে সেই খুটিতে বাঁশ বেঁধে বাঁশের উপর দিয়ে কলাপাতা ভাজ করে ঝুলিয়ে বেড়া তৈরি করালাম। বাড়ির পশ্চিমপাশ সংলগ্ন একটা বিরাট জমিদারি পুকুর ছিল। খুব স্বচ্ছ ছিল তার পানি। সেই পানিতে জ্যোৎস্নার আলো ঝলমল করতো। রান্নাঘর ও থাকার ঘরের গলি বরাবর পুকুরপাড়ে একটা শানবাঁধানো ঘাট ছিল। এইগুলি চরামদ্দির জমিদারদের ছিল। তারাই প্রজাদের জন্য বৃটিশ আমলে ডিসপেনসারি করেছিল। সেইটাই এখন হয়েছে সরকারি উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্র। এই বাড়ি বাংলাদেশের এক সময়ের প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আহসানুল্লাহ সাহেবের শশুরবাড়ি ছিল। সেখানে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা আছে। পুকুরের টলটলে পানিতে শানবাঁধানো ঘাটে আমি খালি গায়ে লুঙ্গী পরে গোসল করতাম। বয়স ছিল আমার ২৭ কি ২৮। দেখতে খুব সুদর্শন ছিলাম। খালি গা দেখে পুকুরের অপর দিকের মানুষ আমার দিকে চেয়ে থাকতো। তাই, শানবাঁধানো ঘাটে বাঁশ গেড়ে কলাপাতা ভাজ করে বেড়া দেওয়ালাম। ফার্মাসিস্ট এর সাথে পরামর্শ করে বৈঠকখানা খালি করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কোহিনূরের বাবাকে ডেকে বললাম “আমি সরকারি মেডিকেল অফিসার। এখানে থেকে আমি চাকরি করব। বিকেলে একটু প্রাইভেট প্রেক্টিশ করব। আপনি ধানের আটি গুলি সরিয়ে ফেলুন। এখানে চেম্বার বানাবো। রান্নাঘর থেকে ক্ষর সরিয়ে ফেলুন। এখানে রান্না করার ব্যবস্থা করব।” শুনে কোহিনূরের বাবা আমার দিকে ফেল ফেল করে তাকিয়ে রইলেন। তার গায়ে জামা ছিল না। বুকের হার সবগুলি বের করা ছিল। পেট চিমটা লাগা ছিল। নাভীর নিচে লুঙ্গী পরা ছিল। লুঙ্গীর দুই পাশ খাটো করার জন্য দুই পাশে গুজে দেয়া ছিল। উপরের পাটির দাত উঁচু ছিল। দাঁত বের করার জন্য হাসতে হয় নি। অসহায় ভাবে দাঁড়িয়েছিল আমার সামনে। যেন এক জমিদারের সামনে প্রজা দাঁড়িয়ে আছে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর কোহিনূরের বাবা বললেন
– সায়েব, আমি খুব গরীব মানুষ। জমি জমা কিচ্ছু নাই। অন্যের জমি চাষ করে কয়েকটা ধানের আটি পাইছি। এইগুলি রাখার জাওয়গাও নাই আমার। সংসারে বুড়া মা, বউ, আর দুগগা মাইয়া। আমি বাজার থাইক্কা ধান কিন্না আনি। সিদ্ধ কইরা শুকাইয়া ঢেকিতে পাড় দিয়া চাইল বানায় কোহিনূরের মায়। বেইচা যা অয় তাই দিয়া কোন মতে চালাইয়া নেই। আপ্নে যা কইছেন বুইজ্জি।
– ঠিক আছে। একটু তাড়াতাড়ি কইরেন।

আমি দেখেছি কোহিনূরের মা ও বাপকে সব সময় এক সাথে কাজ করতে। তারা সবসময় হাসিখুসি থাকতেন। হাসপাতালের সামনের খালি জায়গায় ধান শুকাতেন। বৃষ্টি এলে হাসপাতালের বারান্দায় ধান উঠাতেন। বারান্দায় রেলিং-এ বসে কতো যে সুখের আলাপ তারা করতো! এতো সুখি দম্পতি খুব কমই দেখেছি। এত ভালো মানুষ আমি কমই দেখেছি।

পরেরদিন একজন পরিপাটি লোক এলেন। পরিচয় দিলেন ঢাকায় ডিসি অফিসে চাকরি করেন। খুবই ভদ্র। তিনি বললেন
– পুকুরের দক্ষিণ পারের বাড়িটাই আমাদের। কোহিনূরের মা আমার ছোট বোন। গরীব ঘরে বিয়ে হওয়াতে বড় সমস্যায় আছি। আপনি যা করতে বলেছেন তা ঠিকই আছে। আমি ওদের বলেছি খুব শীঘ্র ঘর খালি করে দিতে। দেরী হলে ক্ষমা করে দিয়েন।
– ঠিক আছে। আমি দেখব।

কোহিনূরের বাবা আমার ঘর খালি করে দিলেন। আমি পরিষ্কার করে চেয়ার টেবিল বসিয়ে চেম্বার বানিয়ে নিলাম। কোহিনূরের দাদী কোহিনূর ও তার ছোট বোনকে নিয়ে আমার থাকার ঘরে ঢুকে পড়লেন “দাদু, দাদু” করে ডাকতে ডাকতে। দেখলাম একটা দেড় দুই বছরের বাচ্চাকে পাতালি কোলে নিয়ে দুধ খাওয়াচ্ছেন বুড়ি। ব্লাউজ ছিল না তার গায়। গ্রামের এমন বুড়িরা ব্লাউজ প্রেটিকোট পরতেন না। শুধু ১৩ হাত সুতীর কাপড় এক পেচ দিয়ে পরতেন। তিনি বাচ্চাটাকে দুধ মুখে দিয়ে রেখেছিলেন প্রকাশ্যে। এজন্য আমি তার দিকে না তাকিয়েই বললাম
– একি ঘরের ভিতরে এলেন কেন? বাইরে থাকুন।
– দাদু, আমি কোহিনূরের দাদী। খালের ঐ পাড়েই থাকি। এইটা আমার নাত্নী কোহিনূর। কোলেরটা কোহিনূরের ছোট।
– নাত্নীকে কি কেউ দুধ খাওয়ায়।
– ও আল্লাহ, দাদু, কি বুলায়। আমি বুড়া মানুষ। দুধ শুকাইয়া গেছে। অর মায় সারাক্ষণ কাম করে। আমার কোলে দিয়া রাখে। খালি কান্দে। তাই দুধের বোটা মুখে দিয়া রাখি। দুধ নাই। খালি বোটা চাটে।
– আমারে দাদু বলছেন কেনো। আমি সরকারি অফিসার।
– হেই ছোট কাল থাইকাই সায়েব দেইখা আইতাছি। এইহানেই বাড়ি। সবাই আমারে আপনা মানুষই ভাবছে। আপনের আগের সায়েব বুড়া মানুষ ছিল। এইখানে অনেকদিন ছিল। এইখান থাইকাই তার চাকরি শেষ অইছে। তারে আমি দাদু ডাকতাম। আপনেও আমার দাদু।
– ঠিক আছে, এখন যান।
– দাদু, এই মাইয়াউগগার একছের পাতলা পায়খানা অয়।
– হাসপাতাল টাইমে আইসেন।
– আমি যামু হাসপাতালে? আমি হাসপাতালে যাই না। দাদু আমাকে বাসায় থাইকাই ঔষধ দিয়া দিতেন।
– খাবার সেলাইন লাগবে। আমার কাছে নাই। এখন যান।
– আগের দাদুর সময় টিনের বেড়া গুলি অমুকে নিয়ে তার বাড়িতে লাগাইছে। চার দিক দিয়া বেড়া ছিল।

আমি ফার্মাসিস্ট-এর কাছ থেকে জেনে নিলাম কে এই টিনের বেড়া নিয়ে গেছে। তার সাথে পরামর্শ করে ডেকে এনে টিনগুলি উদ্ধার করে কলারপাতা ফেলে দিয়ে টিনের বেড়া দেয়ার ব্যবস্থা করলাম।

এরপর থেকে আমি বাসায় খাবার সেলাইন রাখতাম। কেউ পাতলা পায়খানার কথা বললে আমি সেলাইন দিয়ে দিতাম। কিন্তু কোহিনূরের কোন দিন পাতলা পায়খানা হয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করিনি। আমি জানতাম যে তার দাদী পাতলা পায়খানার কথা বলে সেলাইন নেয়। কোহিনূরের বয়স তখন ৬ বছরের মতো ছিল। দাদীর সাথে আসতো। তার দিকে তাকালে চোখ নিচু করে মিষ্টি করে হাসতো। আমি জানতাম দাদী খাবার সেলাইন নিতেন নিজে খাওয়ার জন্য। খেয়ে তিনি শক্তি পেতেন। কোহিনূরের নাম ভাংগিয়ে নিতেন সেলাইন।

একা এক বাড়িতে থাকতাম। মাঝে মাঝে শুয়ে বিশ্রাম নিতাম। প্রকৃতি খুব শান্ত ছিল। মাঝে মাঝে কোহিনূরের বাবার কন্ঠের ডাক ভেসে আসতো “কনুরে…।” তার বাবা মা তাকে কোহিনূর না ডেকে কনুর ডাকতেন। এক বছর আমি চরামদ্দি চাকরি করেছি। শেষের চার পাচ মাস আমার ফ্যামিলি নিয়ে ছিলাম। কোহিনূরকে আমার স্ত্রী আদর করতো। কোহিনূরের মা আমার স্ত্রীর খোজ খবর নিতেন। আমার স্ত্রী তাকেও ভালবাসতো। এখনো আমার স্ত্রী মাঝে মাঝে চরামদ্দির স্মৃতিচারণ করার সময় কোহিনূর, কোহিনূরের মা ও বাবার কথা বলে। বলে “তারা খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তাদের জন্য মায়া হয়। তাদের বাড়ি যেতে খাল পার হতে হতো। খালের উপর দিয়ে একটা তালগাছ না কি গাছ যেনো ফেলে সাকো বানানো হয়েছিল।” ওটা আসলে ছিল তাল গাছ। জোয়ারের সময় খাল পানিতে ভরে যেতো। ভাটার সময় তলা দেখা যেতো।

সেই ১৯৮৯ সনে চরামদ্দি থেকে বিদায় নিয়ে এসেছিলাম। রেখে এসেছিলাম ভালো একটি প্রতিবেশী পরিবার। এর ঠিক ১০ বছর পর ১৯৯৯ সনে বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজে এক্সটারনাল হিসাবে পরীক্ষা নিতে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে কির্তনখোলা নদী পার হয়ে কাউয়ার চর হয়ে রিক্সায় চরামদ্দি বেড়াতে গিয়েছিলাম, আমার স্মৃতি বিজড়িত কোহিনূরদের গ্রামে। সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম বরিশালে এই মেডিকেল কলেজে ৫ম বর্ষের ছাত্র আমার ভাতিজা শহিদুল্লাহ হুমায়ুন কবীর (এখন এনাস্থেসিওলজিস্ট)। ঘুরে ঘুরে আগের দিনের অনেক কিছুই দেখি। সেই টিনসেড হাসপাতাল নেই। বিল্ডিং হয়েছে। সেই পরিত্যক্ত বাড়ি নেই। কোয়ার্টার হয়েছে বহুতল। পুকুরের ঘাট সংস্কার করা হয়েছে। আমার শুভাকাঙ্ক্ষী মকবুল দফাদারের ছেলে মাসুদকে নিয়ে সব দেখলাম। তুলনা করলাম দশ বছর আগেকার চরামদ্দির সাথে। কত উন্নত হয়েছে আজ! কোহিনূরের বাবাকে পেলাম সামনে। সেই আগের হাসি। সেই আগের মতোই লুঙ্গী পরা খালি গায়। আমি বললাম “আপনার বাচ্চা দুইটিকে দেখতে চাই। কোহিনূরের মা কই?” তিনি খাল পেড়িয়ে বাড়ির দিকে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর কোহিনূরের মা, একজন শাড়ী পরা কিশোরী ও একজন পাজামা পরা মেয়েকে নিয়ে এলেন। কোহিনূরের দাদী এলেন কি না আমার মনে নেই। ৩০ বছর আগের কথা তো! সব মনে করতে পারি না। আমি বললাম
– কোহিনূর কই?
– এইটাই তো কোহিনূর।

সেই শাড়ী পরা কিশোরীটিই কোহিনূর। আমি চমকে গেলাম। আমার দেখা সেই হাফ প্যান্ট পরা কোহিনূর কই? সেই কোহিনূর, যার গায়ে জামা থাকতো না। গলায় থাকতো ৪ আনা দামের সীসার রুপালী চেইন। যার চোখের দিকে তাকালে চোখ নত করে মিষ্টি হাসি দিতো। সেই কোহিনূর আমাকে দেখে একটু ঘোমটা টেনে পাশ ফিরে তাকালো। কারন, এখন সে ৬ বছরের শিশু নয়, এখন ১৬ বছরের এক গ্রাম্য কিশোরী, কোহিনূর।
৪/৮/২০১৯ ইং