খাবারের সন্ধানে

খাবারের সন্ধানে
(স্মৃতির পাতা থেকে)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

কয়েকদিন আগে ভোরে ফজরের নামাজের পর ময়মনসিংহের মাসকান্দার ব্রহ্মপুত্র আবাসিক এলাকার বাসা থেকে কিশোরগঞ্জ যাবার উদ্যেশ্যে রওনা দিয়েছিল। রাস্তায় কোন মানুষজন দেখলাম না। আবাসিক এলাকার প্রবেশ পথে এসেই দেখলাম নতুনবাজারের দিক থেকে একটা তরুণী আসছে। আমাকে পলিটেকনিক মোড় পর্যন্ত কেটে গিয়ে রিক্সায় করে ব্রিজ মোড় পর্যন্ত যেতে হবে। তরুণীকে দেখে আমার হাটার গতি কমিয়ে দিলাম। মেয়েটি হাটছিল রাস্তার ডান দিক দিয়ে। মোটামুটি দ্রুতগতিতেই বলা যায়। আমি তার থেকে নিরাপদ দুরুত্বে থেকে রাস্তার বাম দিক দিয়ে হাটলাম। এত সকালে একটি মেয়ে এভাবে একা হাটার কারনি বা কি তা বুঝার চেষ্টা করলাম। প্রথমে মনে হলো কাজের মেয়ে টেয়ে হবে। হয়তো বাসায় আটকিয়ে রেখে কাজ করায়, নির্যাতন করে। ভোরে সুযোগ পেয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। না, এত নোংরা মেয়ে কাজের মেয়ে হতে পারে না। এমন নোংরা মেয়ের রান্নাবান্না কেউ খাবে না। সেলোয়ার কামিজ গায়ে আছে। কিন্তু ময়লায় ভরা। খাটো করে সেলোয়ার পরা। খালি পা। খালি পায়েই হেটে চলেছে। হাটার নমুনা দেখে তাকে দুর্বল ও ক্ষুধার্তই মনে হচ্ছিল। সে কি ভিক্ষা করে? তাকে ডেকে কি ভিক্ষা হিসাবে কিছু টাকা দিব? না, ঝামেলায় পড়ে যেতে পাড়ি সকাল বেলা নির্জন রাস্তায়। একদিন ভিক্ষুক মনে করে এক পাগলী মেয়েকে টাকা সেধে চোখ রাংগানী খেয়েছিলাম।

মেয়েটি পলিটেকনিক মোড়ের ঢাকা-ময়মনসিংহ রোড পার হয়ে চরপাড়ার দিকে যেতে লাগলো রাস্তার ডান দিক দিয়ে। তবে শুধু ফুটপাথ দিয়েই যাচ্ছিল। নিয়ম মতোই হাটছিল। তার সামনে একটা কুকুর খারা হলে সে থামলো। কুকুরের সাথে সে যেনো কি কথা বললো। মনে হলো কুকুরটি তার পুর্বপরিচিত। কুকুরটি পথ ছেড়ে দিয়ে বিদ্যুতের খুকির গোরায় নাক দিয়ে কিছু ঘ্রাণ নিয়ে পিছনের বাম পা উচু করে সামান্য প্রস্রাব করে ধীর গতিতে মেয়েটির পিছু পিছু দৌড়ালো। একটা রিক্সা এসে থামলো আমার সামনে।
– রিক্সা, যাবেন?
– কই যাবেন?
– ব্রিজ।
– ওঠেন।
– ভাড়া কত?
– ভাড়া আর কত দিবেন, যা দেন।
– যা দেন আবার কি? ভাড়া কত বলেন।
– আপনি যা দিবেন তাই ভাড়া।
– না। তা না। নিয়ম হলো আপনার ভাড়া যা আছে তা চাবেন। আমি পোশালে উঠব। না পোশালে কম দিতে চাবো। আপনি পোশালে নিবেন, না পোশালে নিবেন না।
– আপনাদের সাথে দরদাম কইরা ভাড়া নিতে অইব?
– এটা ইসলামী বিধান। বিধান মতে কেউ কাউকে দিয়ে কাজ করাতে চাইলে আগেই দাম ফুড়িয়ে নিতে হবে। যেহেতু দুইজনের সম্মতি থাকে দরদামে সেহেতু কাজ শেষে কারোরই অসন্তোষ হবার সম্ভাবনা নাই। বিধান মানলে উভয়ের জন্যই মংগল।
– এইগুলি কয়জন মানে?
– কেউ মানুক বা না মানুক আমি মানি।
– উঠুন, ৩০ টাকা দিয়েন।
– এইবার হয়েছে। চলেন।

রিক্সা চলছিল রাস্তার বাম দিক দিয়ে। মেডিকেল কলেজ গেইট পার হলো। মেডিকেল কলেজ গেইট ও হাসপাতাল গেইটের মাঝখানে হাসাপতালের ওয়াল ঘেষে রাস্তার অর্ধেক পর্যন্ত জুড়ে আগে ময়লাস্তুপ দেখতাম। এখন আর দেখা যায় না। সিটি কর্পোরেশনের লোকেরা রাত ১০টার পর এসে সব ময়লা তুলে নিয়ে ব্রিজের ওপারে ময়লার ভাগারে ফেলে আসে। নদী পার হওয়ার পর সেই পচা ময়লার দুর্ঘন্ধে যাত্রীরা নাক চেপে ধরে। যারা গাড়ীতে ঘুমিয়ে থাকে তাদের ঘুম ভাংগে। আমি গল্প টাইপ করা বাদ দিয়ে মোবাইল পকেটে রেখে দেই। আমাদের আগে আগে একদল গরু যাচ্ছিল লাইন ধরে। এরাও একটি নিয়ম মেনে হাটছিলো। সবাই এক লাইনে হাটছিলো। অস্ট্রেলিয়ান ও দেশী ও হাইব্রিড নানান জাতের গরু যাচ্ছিলো সেই দলে। হাটার কি স্টাইল গরুদের। যেন ফ্যাশন শো করছে। সাথে কোন রাখাল নেই। কার গরু কোথায় যায়? একেকটি গরুর দাম লাখ লাখ টাকা। অথচ চোরেরা এদেরকে কেন নেয় না? চোরেরা এত কষ্ট করে ৩/৪ তলা বিল্ডিং-এর জানালা ভেংগে বর্শী দিয়ে মাত্র ২/৩ হাজার টাকা দামের মোবাইল সেট নিয়ে যায়। অথচ লাখ টাকা দামের গরু কেন নেয় না? এমন ভাবনা এলো মাথায়। গরুগুলি চরপাড়া মোড় পর্যন্ত গিয়ে ডান দিকে ঘুরে অবৈধ ডাস্টবিনে ময়লা আবর্জনায় ফেলা সবজি খাওয়া শুরু করলো। সাথে দেখলাম সেই নোংরা মেয়েটি বসে বসে ফেলে দেয়া বিরিয়ানির প্যাকেট থেকে বিরিয়ানি খাচ্ছে। সাথে আছে সেই কুকুরটিও। আছে আরও কয়েকটি কাক। অর্থাৎ মানুষ, কুকুর, গুরু ও কাক সবাই মিলে মিসে একসাথে ময়লা আবর্জনা থেকে খাবার খাচ্ছে।

হাসপাতেলের সামনের আবর্জনাগুলি রাতেই পরিষ্কার করে ফেলেছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু মোড়ের এই টুকু আবর্জনা পরিষ্কার না করার জন্য এখানে বঞ্চিতদের রেজেক রয়ে গেছে। হায়, এই আবর্জনাটুকুও যদি পরিষ্কার করে ফেলতো এই পাগলী কোথায় খাবার পেতো। আল্লাহ জীব সৃষ্টি করেছেন। জীবের জন্য জীবিকাও দিয়েছেন প্রয়োজনের চেয়ে বুহুগুণ বেশী। মানুষ ছাড়া আর যত জীব আছে তাদের খাবার কিনে খেতে হয় না। পৃথিবীতে স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারলে তাদের আহারের অভাব নাই। মানুষই একমাত্র জীব তাদের খাবার কিনে খেতে হয়। যার টাকা আছে সে কিনতে পারে অথবা আবাদ করে উৎপাদন করতে পারে। যার নাই তাকে শ্রমের বিনিময়ে খাবার সংগ্রহ করতে হয়। যার শারীরিক সামর্থ্য নাই তাকে চেয়ে খেতে হয়। আমার প্রতিবেশীরা লাখোপতি, কোটিপতি। কাজেই, আমাকে খাবারের জন্য প্রতিবেশীর খোঁজ নিতে হয় না। কিন্তু এই পাগলী মেয়েটি আমার প্রতিবেশী না। তাই, সে অভুক্ত থাকে কিনা খোঁজ নেই না। হয়তো পাগলী মেয়েটি যে বস্তিতে থাকে তারা নিজেদের খাবারই ঠিকমতো জোগার করতে পারে না। পাগলীকে খাওয়াবে কেমনে? তাই, পাগলী খোঁজ করে বের করে নিয়েছে তার আহার আবর্জনায় কুকুরের সাথে। এতো কিছু ভাবতে ভাবতে আমি রিক্সাওয়ালাকে বললাম “দেখেছেন, এই পাগলী মেয়েটি মাসকান্দা থেকে এসেছে এই ময়লা থেকে উচ্ছিষ্ট খাবার তুলে খেতে। ”
– পেটের জ্বালা পাগলেও বুঝে?
– যত পাগলই হউক, ক্ষুধা লাগলে সে খেয়ে নিবে।

রনি ভাইর লেখায় আমি পড়েছি “পাগলেও একটা নিয়ম মেনে চলে। তাহলো, পাগল কোন দিন পুলিশের গায়ে হাত তুলবে না।” তার মানে পাগলেরও কোন কোন ব্যাপারে হুস থাকে। একবার মনে হলো “আমাকে এত টাকা পয়সা আল্লাহ দিলেন। যা দিয়েছেন হাজার ভাগের এক ভাগও প্রয়োজন পড়ে না আমাদের আহার, বস্ত্র ও বাসস্থানের জন্য। আমরাই কি আল্লাহ্‌র দেয়া সম্পদ নিজেদের মধ্যে রেখে এই পাগলীদেরকে বঞ্চিত করে রাখি না। মনটা উদাস হলো। আকাশের দিকে তাকালাম। এক ঝাক পাখী উড়ে যাচ্ছিল পুর্ব দিকে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর দিয়ে। আমার মন ছুটে গেলো শৈসবের গ্রামে। বাইরবাড়ী ঘোড়াকাঠের উপর যখন গাছের নিচে ছায়ায় শুইতাম আকাশের দিকে চেয়ে, দেখা যেতো মেঘমালা ঘেষে শকুনেরা দলবদ্ধভাবে ঘুরতে থাকতো জমিনের দিকে চেয়ে, কোথাও কোন গরু মরে পড়ে আছে কি না। কাজ একটাই, খাবারের সন্ধান করা। সকালের দিকে দেখতাম বাদুরের ঝাক উড়ে উড়ে পুর্ব দিকে যাচ্ছে। আর বক ও নারইল্লার ঝাক পশ্চিম দিকে যাচ্ছে। আবার সন্ধার দিকে দেখতাম বাদুরের ঝাক পুর্বদিক থেকে পশ্চিম দিকে যাচ্ছে। বক ও নারইল্লা যাচ্ছে পশ্চিম দিক থেকে পুর্ব দিকে। তারা একই নিয়মে দৈনিক যাতায়াত করতো আমাদের বাড়ীর উপর দিয়ে। আমার জানতে ইচ্ছে হতো কোথা থেকে আসে পাখী কোথায় চলে যায়? হাই স্কুলে পড়ার সময় কচুয়া পাব্লিক উচ্চ বিদ্যালয়ে যাতায়াতের সময় এর উত্তর খুঝে পেয়েছিলাম। স্কুলের উত্তর পাশে একটা সম্ভ্রান্ত মান্দাই গোত্রের বাড়ী ছিল। সেই বাড়ীতে থেকে আমাদের বিজ্ঞানের শিক্ষক ভিমচন্দ্র স্যার শিক্ষকতা করতেন। ১৯৭৪ সনের শেষের দিকে তিনি নিরুদ্যেশ হন। ক্লাস নাইনে প্রথম ৩ মাস পর্যন্ত বিজ্ঞানের শিক্ষক না থাকাতে আমি এই স্কুল ছেড়ে ১৯৭৫ সনের পহেলা এপ্রিল বাটাজোর বি এম হাই স্কুলে চলে যাই। পড়ে শুনেছি স্যার এদেশ ছেড়ে ভারত চলে গিয়েছেন ইতিহাসের এক নির্মম সময়ে। যাহোক, এই মান্দাই পরিবার খুব ভালো ছিলেন বলে অত্র অঞ্চলের সব বক, বাদুর ও নারইল্লা এদের বাঁশ গাছে বাসা বেধে ও ঝুলে থাকতো। দিনে থাকতো বাদুর আর রাতে থাকতো বক ও নারইল্লা। নারইল্লা হলো কাকের মতো কালো বালি হাস জাতীয় পাখী। এই পাখীরাই আমাদের বাড়ীর উপর দিয়ে উড়ে যেতো খাবারের সন্ধানে। বক ও নারইল্লারা যেতো ছোট চওনার ঝোড়া, চাপড়া বিল, সাইল সিন্দুরের খাল, বংশী নদী ও আরো অনেক জলাশয় ও ধান ক্ষেতে। খাবার খেয়ে ও বাচ্চাদের জন্য কিছু নিয়ে ফিরে আসতো সন্ধ্যা বেলায় কচুয়ায়। বাদুরেরা দিনে চোখে দেখে না। তাই তারা সন্ধায় চলে যেতো কচুয়া ছেড়ে কলাগাছ ও খেজুরগাছপ্রধান গ্রামগুলিতে। পাকা কলা ও খেজুরের রস ছিল বাদুরের প্রধান খাবার। এরাও সারারাত খেয়ে কিছু বাচ্চাদের জন্য নিয়ে ফিরে যেতো সকালবেলায় কচুয়ায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো আমি এমন সকাল বেলায় প্রত্যহ কোথায় যাই। আমিও যাই জীবিকা প্রাপ্তির কর্তব্যের তাকিদেই। যদিও এতো জীবিকার আমার প্রয়োজন নাই। আল্লাহ্‌র দেয়া নিয়ামত তো উপেক্ষা করতে পারি না! সম্ভুগঞ্জের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী ব্রিজ পাড় হয়ে যাচ্ছিল বাস। ইতি মধ্যেই আমি মোবাইল বের করে গল্প লেখা শুরু করে দিয়েছিলাম। ওপারের ময়লার ডাম্পিং স্থল থেকে জানালা দিয়ে অককত করে নাকে দুর্ঘন্ধ ঢুকে পড়লো। মোবাইল রেখে নাক চেপে ধরলাম। জানালা দিয়ে দেখলাম ছিন্নমূল বাচ্চারা, কুকুর, গরু ও কাকেরা ঘুরাফিরা করছে ময়লার উপর দিয়ে খাবারের সন্ধানে।


তারিখ : ২৬/১/২০১৯ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ -ঢাকা-ময়মনসিংহ জার্নি

Leave a Reply

Your email address will not be published.