চাচার থাপ্পরে এক চোখ নষ্ট

চাচার থাপ্পরে এক চোখ নষ্ট
(রোগীর গল্প)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

একবার গ্রাম থেকে এক বাবা তার অবিবাহিত মেয়েকে নিয়ে এলো। তার মেয়ের সমস্যা হলো মেয়ের ছোট চাচা রাগ করে মেয়ের মুখের বাম চোখের উপর চর মারে। তারপর থেকে মেয়েটি বাম চোখে দেখতে পাচ্ছিল না। মেয়ের বাবা চাচাদের মধ্যে খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো। চাচায় ভাতিজিকে থাপ্পর মেরেছে এতে কেউ অসন্তুষ্ট নয়। এমন জোরে কেনো থাপ্পর মারলো যে মেয়ের চোখ নষ্ট হয়ে গেলো, এতে সবাই অসন্তুষ্ট ছোট চাচার উপর। মেয়ের বাবাও অসন্তুষ্ট ছোট ভাইয়ের উপর। বাবায় ছোট ভাই থেকেও মেয়েকে বেশী স্নেহ করে। পাড়ায় সবাই বলাবলি করছিলো চাচার কান্ড নিয়ে। বাবায় ভাবছিল এই মেয়েকে বিয়ে দিতে সমস্যা হবে। পাড়াপ্রতিবেশিরা বাবাকে বুদ্ধি দিতে লাগল ছোট ভাইয়ের নামে মামলা করে দেয়ার জন্য। যেহেতু চোখ নষ্ট হয়েছে সেহেতু ৩২৬ ধারায় মামলা হবে। ভালো লোকেরা বুদ্ধি দিলো চিকিৎসা করোনোর জন্য। চিকিৎসায় যে খরচ হবে সে খরচ চাচার কাছ থেকে তারা আদায় করে দিবে। মামলা পড়ে হোক। বাবায় আমাকে বললেন
– ডাক্তার সাব, আমার ভাই যতই আপন হউক, তাকে আমি ছাড়ব না। আগে আমার মেয়ের চোখ ভালো করে দিন।
– কি কারনে তোমার মেয়েকে থাপ্পর মেরেছে?
– কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে হঠাৎ করে থাপ্পর মেরেছে। তারপর থেকেই সে এক চোখে দেখে না।
– এত ভারী অন্যায় করে ফেলেছে। এভাবে চোখের উপর কেউ মারে?
– ছোট ভাই বলেছে যত টাকা লাগুক সে দেবে। কাজেই, ডাক্তার সাব, ভালো একজন চোখের ডাক্তার দেখিয়ে দিন।

আমি একজন চুক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে চিঠি লিখে মেয়েটিকে চিকিৎসা করতে পাঠালাম। ডাক্তার সাব চিকিৎসাপত্র দিয়ে সাত দিনের ঔষধ লিখে দিলেন এবং সাত দিন পর ফলো আপে আসতে বললেন।

সাত দিন পর রোগী এসে আবার দেখাল। বাবায় এসে বলল
– চোখের ডাক্তার বললেন যে আমার মেয়ের বাম চোখ নাকি জন্ম থেকেই সমস্যা। জন্ম থেকেই নাকি আমার মেয়ে বাম চোখে দেখে না। থাপ্পরে নাকি মেয়ের কোন ক্ষতি হয় নি।
– তাই নাকি?

আমি চুক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞকে মোবাইল করলাম
– ভাই, আমার রোগীর নাকি জন্ম থেকেই বাম চোখে দেখে না?
– হ্যা, থাপ্পরে তার চোখের ক্ষতি হয় নি। তার বাম চোখে জন্ম থেকেই দেখে না।
– এখন বয়স ১৮ বছর। এতদিন পর্যন্ত সে এটা জানে না?
– হ্যা, মানুষ তো এক চোখ দিয়েই দেখতে পারে। যেহেতু তার জন্ম থেকেই দেখতে কোন সমস্যা হয় না তাই সে জানে না। থাপ্পর খাবার পর সে ডান চোখ হাত দিয়ে ঢেকে দেখেছে যে সে বাম চোখে দেখে না। তাই, তার এখন মনে হচ্ছে থাপ্পর মারার কারনেই তার চোখ নষ্ট হয়েছে। অনুগ্রহপূর্বক, আপনি রোগীকে বুঝিয়ে বলুন।

আমি রোগী ও রোগীর বাবাকে ভালো করে বুঝিয়ে বললাম। বেচে গেলো ছোট চাচা বিরাট এক জরিমানা ও বদনাম থেকে। টিকে গেলো ভাই ভাইয়ের মজবুত বন্ধন।
১৬/১/২০২০ খ্রি.
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
প্যাথলজি বিভাগ
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ