ছোট কাক্কুর ইলেকশন

ছোট কাক্কুর ইলেকশন
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ছোট কাক্কু, মানে আমার ছোট চাচা, বাবার চাচাতো ভাই, মরহুম আব্দুস সালাম তালুকদার। তিনি কালিয়া ইউনিয়ন কাউন্সিলের সেক্রেটারির চাকরি করতেন। এটা একটা সরকারি চাকরি। ভালই ছিলো এই চাকরি। বাড়ী থেকেই সাইকেল নিয়ে অফিসে যেতেন। হাটের দিনে কচুয়া ও বড় চওনা হাটে ঔষধ বিক্রি করতেন। সালাম সেক্রেটারি হিসাবে পরিচিত ছিলেন। যেমন সুন্দর ছিল তার চেহারা তেমনই সুন্দর ছিল তার ব্যবহার। তিনি বেশ ধার্মিক ছিলেন। ঈদের মাঠে ছোট খাটো বয়ান দিতে শুনেছি। তবে খুব ভালো বক্তা ছিলেন না। তাকে আমি রাজনীতি করতে দেখি নি। তবে রাজনৈতিক সচেতন ছিলেন। ১৯৬৫ সনের পাকিস্তান -ভারতের যুদ্ধের সংবাদ রেডিওতে শুনে আমার বাবা চাচাদের সাথে গল্প করতে শুনেছি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও তিনি রেডিওতে মুক্তিযোদ্ধাদের কোন বিজয়ের কথা শুনলে চাচাদেরকে নিয়ে উল্লসিত হতেন। স্বাধীন হওয়ার পর বড় চওনা মাঠে যখন কাদের সিদ্দিকীকে গণ সম্বর্ধনা দেয়া হয় সেই সমাবেশে তাকে মোনাজাত পরিচালনা করতে দেখেছি। এলাকার কোন সালিশ বিচারে তাকে দেখি নি। চাকরি করতেন, ব্যবসা করতেন, জমি আবাদ করাতেন, সন্তানদেরকে স্কুল কলেজে পড়াতেন এবং শুখে শান্তিতেই থাকতেন গ্রামে। তিনি আমার একজন ভালো অভিভাবক ছিলেন।

১৯৮৩ সনে আমি যখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এম বি বি এস থার্ড ইয়ারে পড়ি তখনকার ঘটনা। রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের শাসন আমলের সময়। কালিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন বড় চওনার জামাল হোসেন সাহেব। অর্থাৎ সালাম কাক্কুর চেয়ারম্যান। আমাদের ইউনিয়ন কাকরাজান। ছোট কাক্কুর মাথায় চাপলো চেয়ারম্যান হবেন। চেয়ারম্যানের অধীন চাকরি করবেন না। তার অধীনেই আরেক সেক্রেটারি সাহেব চাকরি করবেন। কাক্কু কোন দিন ইলেকশন করবেন আমি কল্পনাও করতে পারি নি। কাকরাজান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে লাঙল মার্কায় কাক্কু ইলেকশনে দাড়ায়েছেন শুনে আমি স্তম্ভিত হলাম। লাঙল ছিল এরশাদ সাহেবের জাতীয় পার্টির মার্কা। মনে হলো কাক্কু এই সরকারকে ভালোবাসেন অথবা পাব্লিক ভালো বাসে বলে লাংগলে ভোট দিবে ভেবে কাক্কু এই কাজ করেছেন। শুনলাম সবাই কাক্কুর জন্য মরিয়া হয়ে ইলেকশনের ক্যাম্পেইন করছে। আমি কি কাক্কুর জন্য কিছু না করে থাকতে পারি? মেডিকেলের প্রচুর পড়ার চাপ উপেক্ষা করে বাড়ী চলে গেলাম কাক্কুর জন্য কিছু করতে।
দেখলাম ইলেকশন করার জন্য কাক্কু বেশ সংগঠিত। মাওলানা সালাউদ্দিন দুলাভাই নির্বাচন পরিচালনা করছেন। খাওয়া দাওয়ার দায়িত্বে হাফিজ দুলাভাই। মিয়া কাক্কুকে দেয়া হয়েছে রান্না বান্না ও বিড়ি বিতরনের দায়িত্বে। আমাকে একটা দায়িত্ব দিতে অনুরোধ করলাম। সালাউদ্দিন দুলাভাই বললেন “তুমি বাড়ীতেই থাকবে। বসে বসে পড়বে। সকাল ও সন্ধায় মেহমানদের বসতে দিবে।”

ঐবছর আরো যারা ইলেকশনে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম আমার মনে আছে। ইন্দ্রজানীর সামসুল হক পান্না মামা গরুর গাড়ী মার্কা, সরিষা আটার আবুবকর সিদ্দিক খেজুর গাছ মার্কা, ছোট চওনার শওকত ডাক্তার আনারস মার্কা। সকাল বেলা বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোকজন আসতেন ক্যাম্পেইনে যাওয়ার জন্য। আমি বাংলাঘরে পাটি বিছিয়ে বসতে দিতাম। ডিসেম্বর মাস ছিল সেটা। সকাল বেলা গরম ভাতের সাথে মাসের ডাল দিয়ে পেট ভরে ভাত খেতেন কর্মিরা। নয়টা দশটার দিকে কুয়াশা কেটে মিষ্টি রোদ ওঠে যেতো। কর্মিরা গায়ের চাদর ও সুয়েটার খুলে কোমড়ে বেধে তার নিচে বিড়ির বান্ডিল বেধে চলে যেতো বিভিন্ন গ্রামে। সন্ধার সময় একে একে ফিরে আসতে থাকতো কর্মিরা। আমি পাটি বিছিয়ে বসতে দিতাম কর্মি ভাইদেরকে। একপাশে বোকার মতো বসে কর্মিবাহিনী ভাইদের আলাপ শুনতাম। উপভোগ করার মতো সেই আলাপ। তাদের সংলাপগুলি ছিল এই রকম:
– আমি গেছিলাম বইলারপুর গ্রামে। সেখানকার সবাই ভোট দিবে লাংগলে। কয়েক বান্ডিল বিড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম।মুহুর্তেই শেষ। বিড়ি না দিয়া কি কারো সাথে ভোটের আলাপ করা যায়?
– আমি গিয়েছিলাম গড়বাড়ী। সেখানকার সবাই ভোট দিবে তালুকদার সাবকে। আমারো একই কথা। নিমিষেই বিড়ির সব বান্ডিল শেষ। কি আর করি। নিজের টাকায় আরো ৫ বান্ডিল বিড়ি কিনে ভোটারদের দিয়ে ভোট চেয়েছি। ভোটাররাও খাচ্চর আছে। একটা নিয়ে কানে বাজিয়ে রাখবে আরেকটা ধরিয়ে টানতে টানতে যাবে। তবে তাদের ভাব দেখে মনে হয় সবাই লাংলেই ভোট দিবে।
– আরে শুনুন, আমি গেছিলাম ভুয়াইদ। সেখানে তো কাক্কুর মামুর বাড়ী। কাক্কুর মামুই ১১ জন। তাদের গুষ্টির সবাই যদি ভোট দেয় কাক্কু তো এমনি উঠে যায়। তবে সেখানে অল্প বিড়ি নিয়ে গিয়ে ভুল করেছি। তারা বলছে যে ভাইগ্নার জন্য আমাদের ভোট চাইতে হয়। আমাদের কাছে কিছু বিড়ি বেশী রাখা দরকার।

কেউ কেউ আমার কানে কানে বলছিল
-যারা এরকম চাপাবাজি করছে তারা আসলে চোর। কাক্কুর বিড়ি নিয়ে গিয়ে অন্য ক্যান্ডিডেটের কর্মীর কাছে সস্তায় বিক্রি করে দিয়ে এসে এখানে গল্প করছে চাচাকে ফুলানোর জন্য।
– ভোট দিবে সবাই ইন্দারজানীর সামসুরে গরুর গাড়ী মার্কায়। তার কথা মুখে কেউ বলে না। কোন রকম মার্কা বা পোষ্টার ছাপায় নাই। তার কর্মিও নাই। একাই বিভিন্ন গ্রামে চাদর গায় দিয়ে ঘুরে আর বলে “চাচা, ইলেকশনে খারাইছি। দেশের ভালো চাইলে একটা ভোট দিয়েন। মার্কাটা গরুর গাড়ী। কোছে বিড়ি থাকলে একটা দেন খাই।

লাংগলসহ অন্যান্য ক্যান্ডিডেট যেখানে বিড়ি ও পোস্টার বিলিয়ে ভোট চাইছে কর্মি বাহিনী দিয়ে সেখানে পান্না মামা খালি হাতে একা ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছেন। নিজে তো বিড়ি দিচ্ছেন না। উলটা তিনি অন্য ক্যান্ডিডেটের দেয়া বিড়ি নিয়ে খাচ্ছেন।

কেউ কেউ আমাকে জানালেন “তালুকদার সাহেব রাজনীতি জানেন না। তার টাকাগুলি খসানোর জন্য তাকে অনেকে কুবুদ্ধি দিয়েছেন। দুনিয়াটা এত সোজা মানুষের জন্য না। চাকরি ত গেলোই টাকা পয়সাগুলিও শেষ করবেন ইলেকশনে খরচ করে। টাউটদের পকেটভারি হচ্ছে।
রাত নয়টার দিকে ঘর ভরে যেতো কর্মি বাহিনীতে। তাদের মন্তব্য শুনতাম বসে বসে। একেকজন একেকভাবে চাপা মারতো। আর আমি একেকবার একেকজনের মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে শুনতাম। হাফিজ দুলাভাই নেতার মতো মাঝখানে দাঁড়িয়ে শুনতেন। তিনি মিটি মিটি হাসতেন সামনের দুই দাতের আগা বের করে গালে টোল ফেলে। কর্মিদের কথা শেষ হলে হাফিজ দুলাভাই বিজ্ঞের মতো আংগুল খাড়া করে বলতেন ” শুনুন, আপনারা চুপ করুন, আমার কথা শুনুন। তেলধারা গ্রামে এত ভোট। সেখানে পুরুষ ভোট এতো। মহিলাভোট এতো। কাক্কু পাবে এতো ভোট। নাইন্দা ভাংগা গ্রামে এত ভোট। কাক্কু পাবে তার ৯০ ভাগ। অমুক গ্রামে এত ভোটের মধ্যে কাক্কু প্রায় সব ভোট পাবেন। কাজেই সব গ্রামের ভোট হিসাব করে দেখা গেলো যে কাক্কু বিপুল ভোটে বিজয়ী। দেন খাবার।” সবাই সমস্বরে বলে উঠতো “দেন খাবার। দেন খাবার।” আমি প্লেট ভর্তি আমন ধানের ভাত দিতাম। কাপাভর্তি করে মাস কয়ালাইর ডাইল দিতাম। পেট ভর্তি করে খেয়ে ডিগডিগি চলে যেতো কর্মিরা। আবার চলে আসতো সকালে। পেট ভরে খেয়ে বিড়ি নিয়ে চলে যেতো গ্রামে গ্রামে।

তখন ছিল ডিসেম্বর মাস, শীত কাল। আমন ধান কাটা হয়ে গেছে। গ্রামের লোকের কোন কাজ ছিল না তখন। ইলেকশন আসাতে একটা উৎসব উৎসব ভাব সবার মনে। ছাত্রদেরও পরীক্ষা শেষ হয়েছিল। সবাই ইলেকশন নিয়ে মেতে উঠেছিল। একদিন সকালে দেখলাম এক গ্রামের একজন প্রভাবশালী কাক্কুর বাড়ীতে এসেছেন। উঠানে চেয়ার পেতে বসেছিলেন রোদে। দেখলাম ছোট কাক্কু তার হাত ধরে ফুফিয়ে কাঁদছেন। আমার কাছে ব্যাপারটা বেখাপ্পা মনে হচ্ছিল। কাকরাজান ইউনিয়নে এমন কোন ব্যাটা নাই যে তার হাতে ধরে তালুকদারদের কাঁদতে হবে। আমি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম “ব্যাপারটা কি?” তিনি আমাকে বুঝালেন “ইনি তার এলাকায় প্রভাবশালী। তার কথায় সবাই ভোট দিবেন। অথচ ছোট কাক্কু ইলেকশনে দাঁড়িয়ে তার সাথে দেখাও করেন নাই, কথাও বলেন নাই। তিনি বিদ্রোহী হয়ে অন্যজনের জন্য ভোটের ক্যানভাস করছেন। তাই, তার হাত ধরে কাক্কু কান্নার অভিনয় করছেন। ইলেকশনটা শেষ হোক। তারপর দেখা যাবে কে কার হাত ধরে কাঁদেন।” আরেক রাতে অন্য পাড়ার একজন লিডার এলেন সবাইকে নিয়ে। পাড়ার লিডার তালুকদারদের দেখে রাস্তা চেড়ে দিতেন। তাকে দেখে মনে হলো বেশ প্রভাবশালী। কিছু একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে বলে মনে হলো। আমি আগ্রহ নিয়ে বসলাম। মিয়া কাক্কু, ছোট কাক্কুর বড়জন, আবুল কাশেম তালুকদার, মাদবর শুরু করলেন “আমরা এখন একটা বিরাট কাজ হাতে নিয়েছি। আমাদের এই এলাকা থেকে কোন চেয়ারম্যান নির্বাচন না করাতে এলাকার কোন উন্নয়ন হয় নাই। এবার আব্দুস সালাম ইলেকশনে দাঁড়িয়েছে। সবাই সতস্ফুর্তভাবে তারজন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইনশাল্লাহ, আমাদের বিজয় হবেই। তোমার মতন। ” বলার সাথে সাথে পাড়ার লিডার ক্ষেপে গিয়ে বললেন “এই মোতনের মধেই দোষ। আপনাদের এই মোতনের মধেই দোষ। আমাদেরকে আপনারা মানুষই মনে করেন না। কিছু হলেই বলেন তোমার মোতন অমুক। আমরাও মানুষ। আমাদের মানুষ বলে মনে করবেন। আমি এইজন্যই আপনাদের বাড়ী আসতে চাই নি। থাকুন আপনাদের তালুকদারি নিয়ে।” সাথে আশা অনেকে তাকে বুঝিয়ে শান্ত করলেন। বুঝালেন “তালুকদার সাব কি বলতে চেয়েছিলেন আমরা শুনি।” মিয়া কাক্কু বললেন “আমি যা বলতে চেয়েছিলাম তা তুমি না শুনেই রাগ করা শুরু করলা। আমি বলতে চেয়েছিলাম তোমার মতোন অমুক আর আমার মতোন কাশেম যদি এক থাকি তাহলে আমাদের সাথে কেউ পারবে না। ” সবাই বললেন “তালুকদার সাব ঠিক কথাটাই কইছে। আমাদের কথা অইল তারা আমাদের যত বিড়ি আর টাকা পয়সা দেইক না কেন আমরা ভোট দিব তালুকদার সাবকেই। ” আমি কানে কানে জানতে পারলাম অন্য ক্যান্ডিডেটের দেয়া বিড়ি ও টাকা পেয়ে এই মাদবর লাঙল বাদ দিয়ে অন্য ক্যানভাস করছিলেন। তাই, এই ব্যবস্থা। আসলে মিয়া কাক্কু প্রথমে তাকে তিরস্কার করতেই চেয়েছিলেন। অবস্থা বেগতিক দেখে সুর পালটিয়ে তোমার মোতনের সাথে আমার মোতন লাগিয়ে দিয়েছেন। আমার মোতন সাদেকেরও বুঝতে অসুবিধা হলো না যে ইলেকশনের পর চাচায় যে তারে কি করে।

কাক্কু এবার চেয়ারম্যান হবেন। সবার মধ্যে আনন্দ আনন্দ ভাব ছিল। বাড়িতে অনেক নায়রী এসেছিল। কাক্কুর শশুর বাড়ির সবাই এসেছিল। আসাদুজ্জামান মুকুল তালুকদার ও আনোয়ার হোসেন কায়সার তালুকদার কাক্কুর ছেলে। আরেক ছেলে আক্তার তালুকদার তখন ছোট ছিল। মুকুল ও কায়সার মিছিলে অংশগ্রহণ করতো। আকতারের খেলার বয়স ছিল । সে ইলেকশন বুঝত না। মুকুলের মামাদের টেলিভিশন এনেছিল এই বাড়ীতে। যাদের কাজ নেই তারা উঠানে পাটিতে বসে টিভি দেখতো সারাক্ষণ । সাদাকালো টিভির যুগ ছিলো তখন। লম্বা বাঁশের আগায় এন্টিনা বেধে টিভি দেখা হতো। ঢাকা ও ময়মনসিংহ থেকে টিভি সিগনাল আসতো প্রায় ১০০ কিলো মিটার দূর থেকে। তাই ছবি ঝিরঝির করতো। বাতাসে একটু নড়ে গেলে ছবি চলে যেতো। বাইরে গিয়ে একজনে বাঁশ ঘুরিয়ে বলতো “ছবি আইছে?”
– আইছে। পরিষ্কার না। আরেকটু ঘুরাও। এখন আইছে। এই গেছে গা। এখন আবার আইছে। থাউক। এইভাবেই থাউক। নড়াইও না।

অবশেষে সেই প্রতিক্ষিত ইলেকশনের দিন এলো। সেইদিন বাড়ীতে কোন কাজ ছিল না। মাওলানা সালাউদ্দিন দুলাভাই সবাইকে ডিউটি দিয়ে পাঠালেন বিভিন্ন কেন্দ্রে। আমাকে পাঠালেন সবচেয়ে দূরের কেন্দ্র চকপাড়ায়। আমাকে কেন এত দূরে পাঠালেন এনিয়ে আমি অনেক চিন্তা করে একটা কারন খুজে পেয়েছি। আমি ছিলাম তেমন কাজের না, তাই। চকপাড়া কেন্দ্রের ভোট পাওয়ার কথা সরিষা আটার ক্যান্ডিডেট আবুবকর সাহেব, খেজুরগাছ মার্কা। এখানে ইম্পোর্টেন্ট লোক পাঠিয়ে লাভ নেই। কিছু বিড়ির বান্ডিল নিয়ে আমি নাস্তা করে চলে গেলাম চকপাড়া কেন্দ্রে। অনেকদিন হয় শহরে থাকি। হাটা হয় নাই তেমন। বাড়ী থেকে হেটে চকপাড়া কেন্দ্রে যেতে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। দুলাভাইর প্রতি খুব মনোক্ষুণ্ণ হয়েছিলাম। এতো কষ্ট আমায় দিলেন! যাহোক কেন্দ্রে পৌছে একটা বেডশীট বিছিয়ে বসে পড়লাম বিড়ির দোকান্দারের মতো। সবার মুখে শুধু খেজুর গাছ। আমার দিকে এসে লাঙল মার্কা দেখে ফিরে যায়। কেউ কেউ বলে “এই ক্যান্ডিডেটকে তো কোন দিন চিনলামই না। ” এইটা সালাম সেক্রেটারি।
ইনি আবার সেক্রেটারিগিরি বাদ দিয়ে চেয়ারম্যান হতে চায় কেন?
আমার বিড়ি নিতেও কেউ আসে না।
নিজেকে অসহায় মনে হলো। অনেকে দূর থেকে তাকায় আমার দিকে। আমি ফিরে যেতে মনস্থির করলাম। কিন্তু এতগুলি বিড়ি কি করবো? এমন সময় জিতেশ্বরির এক কাক্কু এলেন। তিনি কিছুক্ষণ আমার সাথে বসে উঠে গিয়ে একজন উপজাতী ভাইকে নিয়ে এলেন। বললেন “কাক্কু, ওকে কয়েক প্যাকেট বিড়ি দিন। ও লাংগলে ভোট দিবে। ” এইভাবে একজন একজন করে কয়েকজনকে নিয়ে এসে মাটি হাতে নিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে বিড়ি দিলেন লাংগল মার্কায় ভোট দেয়ার জন্য। আমি বললাম “কাক্কু, মাটি হাতে নিয়ে কিরা করার দরকার নাই। এমনি বিশ্বাস করে দেন। ভোট দিলে দিবে না দিলে না দিবে। গরীব মানুষ এমনি দিয়ে দেন।” কিছুক্ষণ পর সব বিড়ি শেষ হয়ে গেলো। আমিও হাল্কা হয়ে বেচে গেলাম। বাড়ীর দিকে পথ ধরলাম। রাস্তা দিয়ে যাই লোকে বলাবলি করে যে যাই বলুক পাশ করবে গরুর গাড়ী। সবার খেয়ে ভোট দিবে সামসুরে। আমি উচ্চস্বরে বলি “লাঙল, লাঙল, যাবেই যাবে, লাংগল।।।” ছোট চওনা কেন্দ্রে গিয়ে দেখি আমাদের বাড়ীর সবাই উৎসবে মেতেছে। অযথা আমাকে পাঠিয়েছে চকপাড়ায়। ফুলাভাইর প্রতি আরেকবার রাগ হলো। মুকুল ও কায়সার এখানেই ছিল। চাচার নির্ঘাত পরাজয় ভেবে কেন্দ্র ত্যাগ করলাম। কিছুক্ষণ পর মুকুলও কেন্দ্র ত্যাগ করলো। ভোট গননা অর্ধেক হলে কায়সারও কেন্দ্র ত্যাগ করে চলে আসলো। জিতেশ্বরি পর্যন্ত এলে একদল কিশোর জিজ্ঞেস করলো “কায়সার ভাই, খবর কি?” কায়সার ফাল দিয়ে বলে উঠলো “উইঠা গেছি। ” কিশোরের দল খুশীতে আত্বহারা হয়ে কায়সারকে কাধে নিয়ে নাচতে লাগলো আর স্লোগান দিল “উইঠা গেছে, লাংগল। উইঠা গেছে, লাংগল।” অবস্থা বেগতিক দেখে কায়সার বলে দিলো “এই পোলাপান উঠি নাই। মিছা কথা।” শুনে কিশোরের দল থেকনা দিয়ে কায়সারকে কাধ থেকে ছেড়ে দিলো।” এই টুকু কায়সার পরে আমাদেরকে বলেছে।
ইলেকশনের পরেরদিন শুনলাম সামসুল হক পান্না মামা গরুর গাড়ী মার্কা বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। ইলেকশনে কোনরূপ কারচুপি হয় নাই। জনগণ স্বাধীনভাবে বিড়ি খেয়েছে, স্বাধীনভাবে টাকা খেয়েছে, স্বাধীনভাবে ক্যানভাস করেছে আর স্বাধীনভাবে চুপি চুপি কর্মীবিহীন ও পোস্টারবিহীন সামসুল হক পান্নাকে ভোট দিয়েছে। একেই বলা হয় ফেয়ার ইলেকশন। ছোট কাক্কু যতই ভালো মানুষ হউন না কেনো তাকে চেয়ারম্যান হিসাবে ভোটাররা পছন্দ করে নাই। নয় মামাদের গ্রাম থেকে নয়টি ভোটও পান নি। আমার চকপাড়ার কেন্দ্রে যারা কিরা করে বিড়ি নিয়েছিল তারাও ভোট দেয় নি হিসাব করে দেখেছি। আচ্ছা, আপনিই বলুন, আমি যে এতো ভালো এবং আপনাদের প্রিয় মানুষ, গ্রামের মেম্বার পদে ইলেকশন করলে কি আমাকে কেউ ভোট দিবে? কাজেই, যার জন্য যে কাজ মানায়। ছোট কাক্কুর চেয়ারম্যানে ইলেকশন করা ঠিক হয় নি। তিনি সেক্রেটারি হিসাবেই ভালো ছিলেন। শুধু শুধু সরকারি চাকরিটি হারালেন। এই ইলেকশনে তিনি হারিয়েছিলেন বানিয়াসিটের জমিটি, জিতাশ্বরি বাইদের জমিটি, কয়েকশ মন আমন ধান ও মাস কালাইর ডাইল।

ইলেকশনের পরদিন আমি সকাল ৯টার দিকে ছোট কাক্কুর বাড়ীতে গেলাম। মিয়া কাক্কু বিছানা থেকে ওঠেনি। ছোট কাক্কু উঠানে রান্না ঘরের দিকে মুখ করে মাথায় আলখেল্লা রেখে রোদ পোহাচ্ছিলেন। সাথে কেউ নেই। বিড়ি ও ডাইল খেকোরা কেউ নেই। শিশু কিশোর ও মহিলারা টেলিভিশন দেখার চেষ্টা করছে। ছোট কাক্কুর যে কি ক্ষতি হয়ে গেছে টেলিভিশন দর্শনার্থীদের বুঝার কথা না। আমি কাক্কুর কাছে গিয়ে শান্তনা দেয়ার চেষ্টা করলাম “কাক্কু, আপনি মন খারাপ করুন না যে, সব ঠিক হয়ে যাবে।” কাক্কু বললেন “আমরাই জিতেছি। আমি মন খারাপ করি নাই। আমাগো নাতী সামসু চেয়ারম্যান হওয়া মানে আমরাই চেয়ারম্যান হওয়া। আমি আমাদের গ্রামের জন্য যা করতে চেয়েছিলাম সামসুকে বললে তা করবে। তাই, বলি, আমরাই জিতেছি।” এদিকে টেলিভিশনে সিগনাল আসছিল না। কায়সার শত চেষ্টা করে এন্টিনা ঘুরিয়েও সিগনাল আনতে পারলো না। আমি বললাম “পিছনের জেকটা চেক করো। জেক লুজ হয়ে যেতে পারে।” কায়সার একবার জেক লাগায়, একবার খুলে। টেলিভিশনে ছেত ছেত শব্দ করে। ঝিরঝির করে। ছবি আসে না। ছোট কাক্কু বিরক্ত হয়ে বললেন “থো রে। বাদ দে তোরা টেলিভিশন দেখা। তোর মামুর টেলিভিশন, আর আমার ইলেকশন, একই রকম।” আমি হাসি চেপে রাখতে না পেরে বাব্বুর কাঠাল গাছের পিছনে গিয়ে দাড়ালাম। গাছে কটা (কাঠ বিড়ালী) লাফালাফি করছিল। দেখতে ভালোই লাগছিল।

আমি চলে এলাম ময়মনসিংহ। এদিকে ছোট কাক্কু চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন। যোগ দেন শিক্ষকতায়। তিনি নিজগ্রাম জিতেশ্বরী পাড়ায় প্রতিষ্ঠিত রশিদিয়া দাখিল মাদ্রাসায় আজীবন শিক্ষকতা করেন। ১৯৮৩ সনের সেই ইলেকশন থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৬ টি বছর কেটে গেছে। কতরকম ইলেকশন আসে যায়। ইলেকশন আসলে কাক্কুর ইলেকশনের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে কাক্কুর কালজয়ী উক্তি “থোরে, তোর মামুর টেলিভিশন, আর আমার ইলেকশন, একই রকম।” সেই সামসুল হক পান্না মামা এরপর ৪ বার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ১৯৮৩, ১৯৮৮, ১৯৯৫ ও ২০১১ সনের নির্বাচনে। ২ বার ফেল করলেও সেকেন্ড হন। কোন রকম পোষ্টার, লিফলেট ও মিছিল ছাড়াই। যে সময় তিনি চেয়ারম্যান থাকতেন না সেসময় তিনি ময়মনসিংহে মাঝে মাঝে রুগী নিয়ে আসতেন আমার চেম্বারে। না আসতে পারলে চিঠি লিখে রুগী পাঠাতেন আমার কাছে। এলাকায় হেলথ ক্যাম্প করে রুগী সেবা করতেন। শুনেছি তার এলাকায় বেপক উন্নয়ন করেছেন। ওদিকে আমার তেমন যাওয়া হয় না। তিনি আমাদের গ্রামের মাদ্রাসা, ব্রিজ ও কালভার্ট করে দিয়েছেন সরকারি অনুদানে।

সামসু চেয়ারম্যান মামা বেশ সাহসী মানুষ। তিনি একবার রাত ১২ টার পর আমাদের ময়মনসিংহের বাসায় এলেন। সাথে ছিল তার মোটর বাইক চালক। তিনি এসেছিলেন আমার কাছে পরামর্শ নিতে গড়বাড়িতে একটা হেলথ ক্যাম্প করার ব্যাপারে। রাত একটার সময় চলে যেতে চাইলে আমি বাসায় থাকতে বললাম। তিনি রাজী হলেন না। আমি বললাম “এতো রাতে রাস্তায় বেরোনো রিস্ক আছে। আমার জানামতে আপনার অনেক শত্রু আছে।” তিনি বললেন “আমি এখন ময়মনসিংহ থেকে ইন্দ্রজানী যাবো। এমন কোন বাপের ব্যাটা নাই যে আমার সামনে খারাবো।” মামা চলেই গেলেন।

আরেকদিন মামাকে চোখ অপারেশন করানোর জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পেইং বেড ওয়ার্ডে ভর্তি করালাম। কোন কিছু লাগলে বা কোন কিছুর অসুবিধা হলে সিস্টারকে জানানোর জন্য উপদেশ দিলাম। তিনি এক কান্ড করে বসলেন। তার সিটের উপরের ফ্যানটা ধীরে ধীরে ঘুরতো। তিনি সিস্টারের রুমে গিয়ে বললেন “সিস্টার, আমার সিটের ফ্যান্টা এখনি ঠিক করে দেন।” সিস্টার কর্ণপাত না করায় তিনি বললেন “সিস্টার, আমার সিটের ফ্যানটা খুলে এনে আপনার রুমে লাগান। আর আমারটা খুলে এনে আপনার রুমে লাগান। ” সিস্টার কর্নপাত না করাতে তিনি ক্ষেপে গিয়ে বলেন “যদি না পারেন, তবে যে পারেন তাকে পাঠান আমার কাছে। ” সিস্টার নার্সদের সেক্রেটারিকে ডেকে আনেন বিচার দিতে। সেক্রেটারি এসে বললেন “কি হয়েছে? আপনি আমাদের সিস্টারকে কি বলেছেন?” মামা বললেন “আপনি কে?
– আমি নার্সেস এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি।
– ভালোই হলো। সেক্রেটারি সাহেব, দয়া করে আমার ফ্যানটি আপনার নার্সের রুমে লাগান আর নার্সেরটা আমার উপর লাগান।
– আপনি কে?
– আমি রুগী।
– আপনার পরিচয়?
– পরিচয় পরে হবে। আগে ফ্যান লাগান। গরমে আমার মাথা গরম এখন।

নার্সারা কথা না বাড়িয়ে ইলেক্ট্রিশিয়ান ডেকে ফ্যান বদলিয়ে দিলেন। কেউ আর মামার পরিচয় জানার সাহস পেলো না।
আমাদের তালুকদার বাড়ীর অনেকেই এখন শহরে থাকি। নাড়ির টানে বাড়ী যেতে হয়। আমাদের অনেকেরই প্রাইভেট কার আছে। আমাদের গ্রামের রাস্তাঘাট একদম খারাপ। তাই কার নিয়ে যাওয়া খুবই বিপদের। কাক্কুর ইলেকশনের পর আর কেউ আমাদের গ্রাম থেকে ইলেকশন করে নাই। আমাদের একজন চেয়ারম্যান থাকলে হয়তো এতো দুর্গতি হতো না। ছোট চওনার হাজী বাড়ীর রফিক ঘন ঘন রুগী নিয়ে আমার চেম্বারে আসতো। আমি বুঝতে পারলাম এটাও নেতা হওয়ার চেষ্টায় আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম
– হাজী বাড়ীর সমসের হাজী ১৫ বছর চেয়ারম্যানি করেছিলেন। তার ছেলে শওকত ডাক্তারও ৫ বছর চেয়ারম্যান ছিলেন। এখন ঐ বাড়ীর নেতা কে?
– ধরতে পারেন, আমিই। আমিই কিছু কিছু জনসেবা করে থাকি।
– খুব ভালো। চেয়ারম্যান হয়ে আমাদের গ্রামের রাস্তাঘাট গুলা পাকা করবা।

খোদার কি কাম। সেই হবু চেয়ারম্যান স্ট্রোক করে প্যারালাইসিস হয়ে গেছে। হুস জ্ঞান তেমন নাই। তালুকদার বাড়ীতে এই লাইনে আর কেউ আসে নি। চাচাতো ভাইয়ের এক ছেলে বিরোধী দল করে বার বার জেলে যাচ্ছে। আরেক চাচাতো ভাইয়ের ছেলে মামুন তালুকদার এখন রাজধানীতে থেকে পড়াশুনা করে ছাত্রনেতা হয়েছে সরকারি দলের। বড় বড় নেতাদের সাথে ঘুরা ফিরা করছে। ভবিষ্যৎ ভালো বলে মনে হচ্ছে। দোয়া করি চেয়ারম্যান না, এম পি মন্ত্রী যেনো হয়। বাড়ীতে যেনো ভালো ভাবে যেতে পারি। ছোট কাক্কুর ইচ্ছা পুরন হউক।


তারিখ : ১৮/১/২০১৯ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ -ঢাকা -ময়মনসিংহ জার্নি

Leave a Reply

Your email address will not be published.