ডাক্তার দেখাতে রোগীর করনীয়

ডাক্তার দেখাতে রোগীর করনীয়

(স্বাস্থ্য কথা)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

চিকিৎসা একটা সেবা। চিকিৎসা পেতে হলে রোগীর খরচ হয়। চিকিৎসা সেবা কিনে নিতে হয়। কেনাবেচাতে ঠকাজেতা আছে। যারা সরকারি হাসপাতালে ফ্রি চিকিৎসা করান বা বিভিন্ন কারনে ফ্রি চিকিৎসা পান সেখানেও কিন্তু সরকার বা কর্তৃপক্ষ রোগীর জন্য সেবা ক্রয় করে। চিকিৎসক যখন রোগীকে বিনা ফিতে দেখে দেন সেক্ষেত্রে হয়তো চিকিৎসা সেবা ক্রয় কর হয় না। কাজেই, টাকা দিয়ে যদি চিকিৎসা সেবা ক্রয় করতে হয় তবে সে ক্ষেত্রে ঠকলেন কি না সেটা দেখার বিষয় আছে। চিকিৎসা সেবা ক্রয় করতে গিয়ে যাতে আপনি না ঠকেন তার জন্য আমার সচেতনতা মূলক কিছু কথা আছে এই লেখায়।

অসুস্থ হলে প্রথম ধাপ হলো সঠিক ডাক্তার নির্বাচন করা। আমি আপনাকে পরামর্শ দেব প্রথমে একজন বিএমডিসি রেজিস্ট্রার্ড কমপক্ষে এমবিবিএস ডিগ্রিধারী ডাক্তার দেখাতে। ডাকারের ডিগ্রি ডাক্তারের চেম্বারের সামনে সাইনবোর্ডে লেখা থাকে। দশ বারো লাইনে লেখা অনেক কথা যুক্ত দুর্বোধ্য ডিগ্রিধারী ডাক্তারদের না দেখানোর জন্য পরামর্শ দিচ্ছি। আপনার এলাকার ডাক্তারগণ ভুয়া কিনা তাও মাথায় রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট জেলার প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সিভিল সার্জন সাহেব এটা যাচাই বাচাই করে থাকেন। কিন্তু তিনি বিভিন্ন বিষয়ে খুব ব্যস্ত থাকায় মাঝে মাঝে দু’একটা ভুয়া ডাক্তার তার অজান্তে প্রেক্টিস করতে পারে। তবে, আপনার দ্বারা ভুয়া ডাক্তার সনাক্ত সম্ভব না। তাই, কিছু কিছু ব্যাপারে আপনাকে একটু সতর্ক হতে হবে। কোন কোন অচেনা অজানা বড় বড় বিদেশি ডিগ্রিধারী ডাক্তার মাসে একবার বা দুইবার আপনার এলাকায় প্রভাবশালীদের মালিকানায় ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে মাইক মেরে উচ্চমূল্য ফিতে প্রেক্টিস করতে আসেন। এমন ডাক্তার দেখালে ঠকার সম্ভাবনা আছে। ডাক্তার আপনাকে দেখে কিছু পরীক্ষা করার জন্য এডভাইস স্লিপ দিতে পারেন। কিছু কিছু প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা আছে দিনের যেকোনো সময় সেম্পল দেয়া যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে সকালে খালি পেটে সেম্পল দিতে হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম পালন করে সেম্পল দিতে হয়। কাজেই, এডভাইস স্লিপ হাতে পেয়ে ডাক্তারের এসিস্ট্যান্ট-এর কাছ থেকে ভালো করে বুঝে নেবেন।

ল্যাবে গিয়ে পরীক্ষার মূল্য তালিকা দেখে নেবেন। পরীক্ষার রিপোর্টকারী ডাক্তারের নাম ও ডিগ্রি দেখে নেবেন। দেখবেন, তিনি কমপক্ষে একজন এমবিবিএস পাস করা বিএমডিসি রেজিস্ট্রার্ড ডাক্তার, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, প্যাথলজি, প্রতিটি ক্ষেত্রেই। এমন ডাক্তার ছাড়া কোন ল্যাবকে সরকার অনুমোদন দেননি। রিপোর্টকারী ডাক্তারের ডিগ্রি ও অভিজ্ঞতার উপর তার রিপোর্ট করার দক্ষতা নির্ভর করে। নিশ্চই আপনি আপনার রিপোর্টের জন্য একজন দক্ষ প্যাথলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট বা সনোলজিস্ট পছন্দ করবেন। রিপোর্ট যেমন হবে আপনার চিকিৎসাও তেমন হবে। প্যাথলজি রিপোর্ট পেয়ে পড়ে নিজে নিজে বুঝতে চেষ্টা না করে যিনি রিপোর্ট সই করেছেন তার নাম ও ডিগ্রি ঠিক আছে কিনা দেখে নিন। সই আছে নাম নেই। মানে, “নাম নাই যার দাম নাই তার।” এমন রিপোর্ট ফেরত দেন। প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা করেন প্যাথলজিস্ট, টেকনোলজিস্ট ও ল্যাব সহকারীর একটা টিম। এখানে সর্বোচ্চ পার্সন হলেন একজন ডাক্তার, প্যাথলজিতে প্রশিক্ষণ বা উচ্চতর ডিগ্রিপ্রাপ্ত। তার সই ও নাম না থাকলে আপনি ঠকেছেন। সই করে তিনি রিপোর্ট থেকে একটা ফি নিয়ে থাকেন। সই দেয়া না থাকলে ল্যাব মালিক রিপোর্টকারী ডাক্তারকেও ঠকিয়েছেন। ইদানীং আরেক সমস্যা হয়েছে, রিপোর্টে সই-এর ইমেজ বসিয়ে দিয়ে লেখা থাকে ডিজিটাল সিগনেচার। এমন রিপোর্টে উভয়েরই ঠকার সম্ভাবনা আছে। প্রশ্ন করতে পারেন এগুলো কি ভুয়া? না, ভুয়া না। পরীক্ষা করেছেন ডাক্তারের পরিবর্তে টেকনোলজিস্ট অথবা অটেকনোলজিস্ট। জিতেছেন মালিক। ঠকেছেন রোগী ও ডাক্তার। আলট্রাসনোগ্রাফির বেলায়ও প্যাথলজির অনুরূপ। এক্স-রের বেলায় অনূরূপ। তবে কিছু ল্যাব এক্স-রে রিপোর্টই দেন না। বলেন “এই ফিল্ম হলেই চলবে। এখানেই সব দেখা যায়। আপনার ডাক্তারের রিপোর্ট লাগে না। তিনি নিজেই এক্স-রে বুঝেন।” জিতলেন ল্যাবের মালিক। ঠকলেন আপনি ও রেডিওলজিস্ট। কোন কোন ক্ষেত্রে আপনার প্রেস্ক্রিপশনকারী ডাক্তারেরও লাভ থাকে এখানে। এই জন্য তিনি রিপোর্ট চান না। অনেক সময় তারাহুরো করলে রিপোর্ট ছাড়াই ফিল্ম দিয়ে দেয়া হয়। রিপোর্টকারী রেডিওলিজিস্ট পড়াশোনা করে ডিগ্রি নিয়েছেন এক্স-রের ফিল্ম দেখে বিশ্লেষণ করে রিপোর্ট লেখার উপর। তাকে ছাড়া এক্স-রে ল্যাবের লাইসেন্স দেয়া হয় না। তাহলে, রিপোর্ট ছাড়া আপনার এক্স-রে ফিল্ম ছাড়বে কেমনে?

পরীক্ষা নিরিক্ষার রিপোর্ট নিয়ে আসুন আপনার প্রেস্ক্রিপশনকারী ডাক্তারের কাছে। তিনি আপনার রোগের সংক্ষিপ্ত সাইন সিম্পটম ও রোগের নাম প্রেস্ক্রিপশনের বাম পাস দিয়ে লিখে ডান পাসে ঔষধের নাম ও ডোজ লেখবেন। যদি হাতে লিখে থাকেন তবে স্পষ্ট লেখেছেন কিনা দেখে নিন। না বুঝা গেলে বুঝে নিন। প্যাডে ডাক্তারে বিএমডিসি রেজিষ্ট্রেশন প্রিন্ট করা আছে কিনা চেক করুন। না থাকলে ঠিক নাই আইন অনুযায়ী।

ফার্মেসি থেকে ঔষধ কেনার সময় ঔষধের দাম যাচাই করে নেবেন। এক্সপাইরি ডেট দেখে নিন। ডাক্তারে লেখা ঔষধ বদলিয়ে অন্য কোম্পানির ঔষধ দিল কি না দেখে নিন। অন্য কোম্পানি নাম করা বা দামে সস্তা হলেও ঔষধের ব্রান্ড বদলাবেন না।

এবার বাড়ি এসে ঔষধ সেবন করুন। যদি ডাক্তার নিয়ে কোন সন্দেহ থাকে তবে যাচাই করে নিন। বিএমডিসির ওয়েবাসাইটে প্রবেশ করে রেজিস্ট্রার্ড ডাক্তারের লিস্টে নাম আছে কিনা, ডাক্তারের মুখের সাথে ওয়েবসাইটের ডাক্তারের মুখের ছবির মিল আছে কিনা মিলিয়ে দেখুন। বর্তমানে সার্চ করার ওয়েবসাইট লিংক https://www.bmdc.org.bd/search-doctor । অনেক সময় আসল ডাক্তারের নাম ও রেজিষ্ট্রেশন বসিয়ে ভুয়া ডাক্তার সেজে প্রেক্টিস করে। গত বছর পাবনায় এমন এক ভুয়া ডাক্তার পাওয়া গেছিল।আমার এক বন্ধু মাস্ক পরে রোগী দেখছিলেন। রোগী ছিলেন সচেতন মহিলা। তিনি রোগী দেখা শেষে রোগী বললেন “ডাক্তার সাব, মুখ খুলুন। কেনো জিজ্ঞেস করাতে রোগী উত্তর দিলেন ” ডাক্তার চিনে ডাক্তার দেখাতে হয়।” মনে রাখবেন, মূল্যবান জিনিসই নকল হয়। চিকিৎসা সেবা একটা মুল্যবান সেবা। এটাও নকল হয়। আসল নকল চিনে চিকিৎসা সেবা নিন।

১১/৯/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ
কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)

Loading...
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/