নকল

নকল
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

নকল কথাটার সাথে পরিচিত হই প্রাইমারী স্কুলে পড়ার সময়। সখিপুর উপজেলার ঘোনারচালা ফ্রি প্রাইমারী স্কুলে পড়তাম। স্কুলে কয়েকজন ছাত্র বেশ চালাক চতুর ছিল। একবার একজনকে আমার চাচা, ঐ স্কুলের শিক্ষক, সোলায়মান তালুকদার, বেত মারতেছিলেন। তার অপরাধ কি জানতে চেয়ে জানলাম যে তিনি পরীক্ষায় নকল করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন। নকল মানে কি জানতে গিয়ে জানলাম যে পরীক্ষার খাতায় মুখস্থ না লিখে গোপন কাগজ দেখে লিখা। তবে এটা একটা চুরি বিদ্যা। এও জানলাম যে চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা যদি না পড় ধরা।

তখন পাঠ্য বইয়ে বাদশাহ নাছির উদ্দিনকে নিয়ে একটা গল্প পড়েছিলাম। বাদশাহ নাছির উদ্দিন খুব সৎ মানুষ ছিলেন। তিনি রাজকোষ থেকে কোন টাকা গ্রহণ করেন নি। তিনি কোরআন শরীফ নকল করে তা বিক্রি করে সংসার চালাতেন। আমি জানতাম নকল করা একটা খারাপ কাজ। তাহলে কোরআন নকল করেন কেমনে। জানতে গিয়ে জানতে পারলাম “কোন কিছু লেখাকে দেখে দেখে হুবহু সেই ভাবে লেখাকে নকল করা বলা হয়। ” প্রিন্টার মেশিন আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত সবাই কোরআন ও বই পুস্তক, দলিল দস্তাবেজ দেখে দেখে হাত দিয়ে লিখে কপি তৈরি করা হতো। এইগুলিকে বলা হত নকল। আজকের যুগেও দলিলের নকল নেয়া যায়। ফেইস বুকে দেখলাম একজন খুব বড় মাপের ডাক্তার প্রফেসর কোরআন শরীফ সম্পুর্ন নিজ হাতে লিখার কাজ হাতে নিয়েছেন। তিনি তার জন্য দোয়াও চেয়েছেন। আমি চিন্তা করলাম “এখন আধুনিক যুগ। অফসেট প্রেসে নির্ভুলভাবে শত শত কপি কোরআন বিনা পরিশ্রমে প্রিন্ট করা যাচ্ছে। হাতে লিখতে গেলে দুই একটা যায়গায় ভুলও হতে পারে। তাছাড়া প্রফেসর সাহেব যদি এই সময় কোরআন নিয়ে স্টাডি করেন, কোরআনের প্রচার করেন সেটাই তো বেশী ভালো। ” আমি তার পোস্টের কমেন্টে লিখলাম “স্যার, এভাবে হাতে কোরআন লিখার আপনার উদ্যেশ্য কি?” তিনি উত্তর লিখলেন “তা তুমি বুঝবেনা। ” আমি আর কমেন্ট লিখা ক্ষান্ত দিলাম। কয়েকদিন আগে তিনি স্ট্যাটাস দিয়েছেন “তার হাতে কোরআন লিখা প্রায় শেষের দিকে। ” আল্লাহ আমাকে স্যারের উদ্যেশ্য বুঝার তৌফিক দিন।
আগের দিনের কেরানীগনের কাজ ছিল চিঠিপত্র নকল করা। অফিসার মুল চিটি লিখে দিতেন। কেরানী মুল চিঠি দেখে দেখে লিখে চিঠির কপি করতেন। একবার একটা পুরাতন চিঠি নকল করার সময় তিনি দেখলেন যে একটা শব্দের উপর একটা মাছি মরে চেপ্টা হয়ে আছে। শব্দটা কি হতে পাড়ে তা তার মাথায় ধরলো না। অনেক্ষণ অপেক্ষা করার পর তার মাথায় একটা আইডিয়া এলো। একটা মাছি ঘন ঘন নাকে বসছিল। থাপড়া দিয়ে মাছিটা ধরে ফেলেন। যে পর্যন্ত তিনি লিখেছিলেন তার পরের স্পেসে মাছিটা বসিয়ে ভারী বই দিয়ে চাপ দিয়ে চেপ্টা করে রেখে দিলেন কয়েকঘন্টা। শুকিয়ে যাবার পর পরের শব্দ থেকে লিখা শুরু করলেন। দেখলেন হুবহু মুল চিঠির মতোই হয়েছে। মুলটাতে যেখানে চেপ্টা মাছি আছে নকলটাতেও সেখানে চেপ্টা মাছি আছে। এই ধরনের কেরানীকে বলা হতো মাছি মারা কেরানী। নিজের কোন বুদ্ধি নাই। না দেখা যাওয়া শব্দটি কি হতে পারে তা বুঝার তার ক্ষমতা নাই। অনেকে মনে করেন, কাজ নেই তাই বসে বসে মাছি মারাকে মাছিমারা কেরানী বলেন। গল্পটা তাদের জানা নাই, তাই। কেরানীদেরকে অভিজাত বাংলায় কারণিক বলা হতো। এখন অফিসে নকল করতে হয় না। কম্পিউটার দিয়ে কপি করা হয়। তাই কেরানী পোস্টটা অফিস সহকারী হয়েছে। তিনি কপি করতে সহকারী। অফিসারের অন্যান্য কাজেও সহকারী।

আমাদের মজিবর ভাই খুব চালাক চতুর ছিলেন। তিনি একদিন খুব পরিশ্রম করে সুন্দর একটা পরীক্ষার নকল স্ক্রিপ্ট তৈরি করলেন। দেখার মতো। যত সময় নিয়ে তিনি ওটা তৈরি করলেন তার চার ভাগের একভাগ সময় পড়াশুনা করলে উত্তরটা মুখস্ত হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা না করে তিনি নকল স্ক্রিপ্ট তৈরি করলেন। দুই ইঞ্চি পাশ আর দুইফুট লম্বা করে সাদা কাগজ কাটলেন। দুই ইঞ্চি পর পর ক্যাচি দিয়ে ভি (V) সেইপ করে দুই পাশে কেটে দিলেন। তারপর এদিক সেদিক ভাজ করে হাতের তালুতে বসানোর মতো করলেন। তারপর আন্ডারওয়ারের পকেটে নিয়ে পরীক্ষা হলে বসলেন। কিছুক্ষণ লেখার পর বাথ রুমে যাওয়ার ছল করে নকলটি হাতের তালুতে বসিয়ে চুরি করে দেখে দেখে লেখা শুরু করলেন। তিনি ক্লাস ফোরে পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। আমি থ্রিতে। শাহজাহান ভাই তার ক্লাসমেট। তার পাশেই বসেছিলেন। শাহজাহান ভাই টের পেয়ে বলে উঠলেন “স্যার, এই যে নকল করতাছে।” সাখাওয়াত স্যার এসে নকলটা নিয়ে বাম হাতে মজিবর ভাইকে ধরে ডান হাতে বেত নিয়ে সপাৎ সপাৎ মারতে লাগলাম। আমি উপভোগ করছিলাম আর ভাবছিলাম তার নকল তৈরির প্রজেক্টের কথা।
পরীক্ষার পর শাহজাহান ভাই আর মজিবর ভাই এনিয়ে তর্কাতর্কি করলেন। মজিবর ভাই বললেন যে আজ যদি এটা হাই স্কুল হতো শাহজাহানের পিঠের কিল একটাও মাটিতে পড়তো না। মানে হাই স্কুলে কেউ যদি নকলের কথা কাউকে বলে দেয় সবাই মিলে তাকে কিলায়। এর আগে আমি একবার লুৎফর ও বারীর নামে নালিশ দিয়ে ছিলাম যে তারা আমাকে বিরক্ত করে। সাখাওয়াত স্যার এসে দুইজনকেই বেতান। এরপর তারা আমাকে হেদায়েত করে যে আজ যদি হাই স্কুল হতো তোমাকে আমরা সবাই মিলে কিলাইতাম। মানে, হাই স্কুলে নালিশ দেয়ার রীতি নাই। নালিশ দিলেই মাইর খেতে হবে। শুনার পর আমার হাইস্কুল দেখার সখ হলো। একদিন আমি সড়ক দিয়ে হাটতে হাটতে কচুয়া হাই স্কুলে গেলাম। আমি তখন ক্লাস ফোরে পড়তাম। ১৯৭০ সন। কচুয়া স্কুলের বারান্দা দিয়ে হাটছিলাম। টিন সেড স্কুল ঘরের সব পার্টিশন খুলে হল রুম করা হয়েছিল। সবাই সারিবদ্ধভাবে পশ্চিম দিকে মুখ করে বসে মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। কোন সাড়াশব্দ ছিল না হলে। আমি বারান্দা দিয়ে হেটে হেটে জানালা দিয়ে হাই স্কুলের ছাত্র দেখছিলাম। জানালার পাশে বসা এক বড় ভাইকে নকল করতে দেখলাম। ছাত্র ভাইটি চোখ দিয়ে ইশারা করে ফিস ফিস করে বললেন “এই কাগজটা ঐ পিছনের জানালার কাছে বসা ছাত্রটাকে গোপনে দিয়ে আসো। ” আমার হাই স্কুলের ছাত্রদের স্বভাব আগে থেকেই জানা ছিল। তার কথামতো কাজ না করলে পিঠের কিল একটাও মাটিতে পড়বে না। কাজেই আমি নিয়ে নিলাম নকলটি। মুঠিতে নিয়ে পিছনের দিকে বারান্দা দিয়ে হাটলাম। একজন লম্বা স্যার, বেত হাতে সামনে পড়লেন। আমি চোরের মতো তার মুখের দিকে তাকালাম আত্বা ধড়ফড় করছিল। গলা শুকিয়ে গেলো। চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। স্যার, বললেন “তোমার হাতেরটা দাও। ” আমি হাত তুলে মুষ্টি মেলে ধরলাম। স্যার, নকালটা হাত থেকে নিয়ে বেতটা উচু করে বললেন “মারব একটা, ভাগো।” আমি দিলাম একটা নোড় (দৌড়)। এ নোড়ে কচুয়া বাজারে ঢুকে পড়লাম। পেছনে আর তাকাই নি। ঘটনাটি লজ্জায় আর কারো কাছে বলিনি। বড় হয়ে কচুয়া স্কুলে পড়ার সময় চিনলাম স্যারকে। তিনি আমাদের প্রিয় ইনসান স্যার। ভাজ্ঞিস স্যার আমাকে সেদিন দেখে মনে রাখতে পারে নাই। চিনতে পারলে ক্লাসে লজ্জা দিতেন।

ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় পরীক্ষায় ইংলিশ সাবজেক্ট -এ পরীক্ষায় এসে লিখতে আসতো । অনেক নম্বর থাকতো। পরীক্ষার আগের রাতে আমি একটা এসে মুখস্থ করলাম। কিন্তু কোন প্যারার পর কোন প্যারা লিখতে হবে ভুলে যাচ্ছিলাম। এক ইঞ্চি বাই এক ইঞ্চি এক টুকরা কাগজে প্রতি প্যারার প্রথম শব্দটি লিখে নিলাম যাতে প্যারাগুলি ধারাবাহিক ভাবে লিখতে পারি। নকলবাজরা হাতের তালুতে নকল রাখতো। কিন্তু আমি এই টুকরা কাগজটি রাখলাম আমার ফুলহাতা শার্টের হাতার কব্জির বোতামের উপর। এখানে কেউ খোজ করার কথা না। এটাই আমার জীবনে প্রথম এবং শেষ নকলের অভিজ্ঞতা। যথাসময়ে আড়চোখে হাতার বোতামের দিকে তাকালাম। স্কুলের পিছন দিক থেকে জানালা দিয়ে নতুন এক স্যার গোয়েন্দাগিরি করছিলেন। তিনি ঝরের বেগে ভিতরে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন “দাও।” আমি দাঁড়িয়ে হাত মেললাম। কি আশ্চর্য। হাতে কিছু নেই! স্যার, সার্চ করে যথা স্থানে কাগজের টুকরাটি পেলেন। সিনিয়র স্যারগনকে আমার এ অভিনব কৌশলের কথা জানালেন। মহসিন স্যার বললেন “মারেন বেত। ” সপাৎ করে সজোরে নতুন স্যারটি বেতের আগা গিয়ে আমার হাতে বেত মেরে বসলেন। আমি লজ্জায় লাল হয়ে গেলাম। ব্যাথায় চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। আমার চেয়ে মহসিন স্যার ও ইনসান স্যার বেশী ব্যাথা পেলেন। আমি ক্লাসে ফার্স্ট বয় ছিলাম। আমি এমন কাজ করতে পারি স্যারদ্বয় ভাবতে পারেন নি। বিশ্বাসে আঘাত করেছি ভেবে মরে যেতে ইচ্ছে হল। বেত খেয়ে হাত জ্বলছিল। মহসিন স্যার বা ইনসান স্যার যদি আমাকে বেত মারতেন হয়তো বেতের গোড়া দিয়ে মারতেন। যিনি মেরেছেন তিনি আমাকে চিনতেন না। তাই আগা দিয়ে মেরেছেন। জীবনে দ্বিতীয় বার বেত খেলাম। প্রথমবার বেত খেয়েছিলাম নিজের দোষে না। ক্লাসে গণমাইরের মধ্যে পড়ে বেত খেয়েছিলাম। সেই ঘটনা “ক্লাসে সীট নিয়ে মারামারি ” গল্পে লিখেছি। আরেকবার একটা বেত খেয়েছিলাম বাটাজোর হাই স্কুলে ক্লাস নাইনে মৌলানা টিচারের হাতে পড়া না পাড়ার কারনে। সর্বমোট এই তিনবার বেত মারা খেয়েছি।

মেডিকেল কলেজের আমাদের ক্লাসমেটদের মধ্যে কদাচিৎ দুই একজন খুব কৌশলে টুকটাক নকল করেছে বলে জানতাম। তবে তারা ডাক্তার হয়ে খুব একটা ভালো করতে পারে নি। তবে তারা অন্য লাইনে খুব ভালো করেছে। তারা খুবই চালাক চতুর।

নকলের প্রবনতা যুগে যুগে বাড়ে কমে। এমন একটা সময় ছিল, আমি দেখেছি, এস এস সি পরীক্ষায় প্রায় সবাই বেঞ্চের উপর বই খুলে লিখছে। এটাকে নকল করা বলা হয় না। বলা হয় দেখে লেখা। সেই সময় যারা এইভাবে লিখে পাশ করেছে তাদেরকে বলা হয় বাহাত্তুরা।

আমি ১৯৯২ সন থেকে মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা করছি। মেডিকেলের ছাত্ররা নকল করে না। নকল করতে দেওয়া হয় না। পরীক্ষার সময় ইনভিজিলেটর হিসাবে অনেক ডিউটি করেছি। নকল ধরতে গিয়ে কিছু কিছু মজার অভিজ্ঞতা হয়েছে। একবার এক মেডিকেল কলেজে গেলাম প্রাক্টিক্যাল পরীক্ষা নিতে। দেখলাম তারা খুব ভালো একেছে। ছবিগুলি একেছে আমার লিখা বইয়ের ছবির মতোই। আমি খুশী হলাম। পরের দিন তাদের ডেস্কের নিচে সার্চ করে লক্ষ্য করলাম বেশ কিছু ছাত্র তাদের ডেস্কের নিচের তাকে আমার লিখা বই রেখে দিয়েছে। বুঝলাম আগেরদিন তারা বই দেখে দেখে আকায় অনেকের আকা সুন্দর হয়েছে। আমি সব বই নিয়ে নিলাম। এই দিন আকা ভালো হলো না। পরের দিন তাদের ডেস্কে বই পেলাম না। আকাও ভালো হলো না। তার পরের দিন পরীক্ষার্থীর আকা ভালো হলো। ডেস্কে বই পেলাম না। পকেট সার্চ করে মোবাইল পেলাম। অন করে দেখি আমার লিখা বইয়ের পিকচারের ইমেজগুলি সেইভ করে রাখা আছে। এনালগ নকল ডিজিটাল হয়ে গেছে। তাও আবার আমার লেখা বইয়ের ডিজিটাল নকল। হতাশ হয়ে পড়লাম। আমার বই নিয়ে আরেকটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিল। এক কলেজে পরীক্ষা নিতে গিয়েছি। দেখি নাস্তা আনার প্যাকেটে আমার ছবি। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখি আমার পুরাতন বই দিয়ে ঠোঙ্গা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ ছাত্ররা পরীক্ষা শেষে পুরাতন কাগজের সাথে পুরাতন বইও বিক্রি করে দিয়েছে। সেই বইয়ে লেখক হিসাবে আমার ছবি ছিল। সেই ছবিওয়ালা পাতা দিয়ে ঠোঙ্গা তৈরি করা হয়েছে।
কিছু কিছু ছাত্রের প্রবনতা থাকবে নকল করার। মেডিকেলেরই হোক বা অন্য বিষয়েরই হোক। আর তা প্রতিহত করাই হলো ইনভেজিলেটরের দায়িত্ব। আমি একটি ছাত্রীকে লক্ষ্য করেছি প্রথম বর্ষ থেকেই লেখাপড়ায় মনোযোগী না। সময়ে অসময়ে সে বাইরে যেতো। ক্লাসে দেরীতে প্রবেশ করতো, পরীক্ষার হলেও দেরীতে প্রবেশ করতো। কারো সাথে বেশী মিশতো না। ক্লাসমেটরা পাশ করে উপরের ক্লাসে উঠে গেলো। সে পড়ে রইল নিচের ক্লাসেই। আমি পড়াতাম ফোর্থ ইয়ারের পড়া। মেয়েটি পরীক্ষা দিচ্ছিল সেকেন্ড ইয়ারের। আমি হলে ইনভেজিলেটর ছিলাম। মেয়েটি অনুমতি নিয়ে টয়লেটে গেলো। কিন্তু অনেকক্ষণ হলো ফিরে এলো না। একসময় সে হলে ফিরে এলো। আমি মঞ্চে বসা ছিলাম। মেয়েটি তার সীটের দিকে ফিরছিলো। মেয়েটি কেন এতক্ষণ টয়লেটে ছিল এনিয়ে ভাবলাম। মেয়েটির গায়ে এপ্রোন ছিল। পরীক্ষার হলে সাধারণত ছাত্রছাত্রীরা এপ্রোন পরে না। মেয়েটাকে বেশ মোটাসোটা দেখাচ্ছিল। এনিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলাম। আমার আইডিয়া এলো মেয়েটি বই নিয়ে এসেছে। সেই বই টয়লেটে গিয়ে পড়ে এসেছে। আমি মেয়েটির কাছে গিয়ে বললাম “তোমার বাম পকেটের বইটা দাও। ” অনুমান করেই বললাম। মেয়েটি অবাক হয়ে তাকালো। বললো “নাই, স্যার।” বললাম “আছে, তাড়াতাড়ি দিয়ে দাও। ” মেয়েটি এপ্রোনের নিচ থেকে প্যান্টের পকেট থেকে একটি আস্ত বই বের করে আমার হাতে দিলো। আমি বললাম “এবার ডান পকেটেরটা দাও। ” আন্দাজিই বললাম। মেয়েটি ডান পকেট থেকে আরেকটি আস্ত বই বের করে আমার হাতে দিলো। আমি হল সুপারের কাছে নিয়ে গিয়ে বুঝালাম “মেয়েটি টয়লেটে গিয়ে এই বই পড়ে এসেছে। প্যান্টের পকেটে এই বই দুইটি ছিল। ” সুপার বললেন “সমস্যা নেই। আমি তাকে মৌখিক পরীক্ষায় আটকিয়ে দেব। ” মৌখিক পরীক্ষায় মেয়েটি ফেল করে সেকেন্ড ইয়ারেই রয়ে গেলো। ছয়মাস পর আবার পরীক্ষায় বসলো। এবারো আমার ডিউটি ছিল। এবারো মেয়েটি টয়লেটে গিয়ে অনেক্ষন পর ফিরলো। এবার মোটা দেখা গেলো না। টয়লেটে পিয়ন পাঠালাম দেখতে যে মেয়েটি টয়লেটে কোন বই রেখেছে কিনা পড়ার জন্য। বই পাওয়া গেলো না। আমি ওঠে মেয়েটার কাছে গেলাম। বললাম “তোমার কাছে একটা এন্ড্রয়েড মোবাইল আছে দিয়ে দাও। ” মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে অবাক হলো। এপ্রোনের নিচ থেকে প্যান্টের পকেট থেকে ইয়া বড় একটা মোবাইল সেট বের করলো। অন করে দেখালাম “তুমি টয়লেটে গিয়ে মোবাইল থেকে এই উত্তরগুলি বের করে পড়ে এসেছো। ” আমি মোবাইলের মাহাত্ব বর্ননা করে হল সুপারের নিকট মোবাইলটি দিলেন। তিনি বললেন “আমি তাকে মৌখিক পরীক্ষায় আটকিয়ে দেব। ” তাই হলো। কয়েকবছর পর সে পাস টাস করে আমার সাবজেক্টে এলো। আমার পরীক্ষায় নকল করার চেষ্টাও করলো না। পাসও করতে পারলো না। এক বিকেলে দেখি সে একটি রিসিট বই হাতে নিয়ে কোন একটি ক্লাবের পক্ষ হয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগন থেকে আর্তমানবতার সাহাহ্যের জন্য চাদা ওঠাচ্ছে। বললাম
– একা একা চাদা ওঠাচ্ছ কেন?
– স্যার, আমার উপর দায়িত্ব পড়েছে ক্লাব থেকে।
– একা একা টাকা উঠানো ঠিক না। তুমি এবার তো ফিফথ ইয়ারে?
– না স্যার। পাশ তো করালেন না।
– আমি পাশ করালাম না, না, তুমি পাশ করতে পারলে না?
– স্যার, আপনি পাশ না করালে কি আমি পাশ করতে পারবো?
– চাদা তোলা বাদ দিয়ে হোস্টেলে ফিরে গিয়ে পড়াশুনা কর গে। না পড়ে পাশ করতে পারবে না।
সেই মেয়ের কয় বছর লেগেছিল পাশ করতে আমার মনে নেই।
ছাত্র মাত্রই ভুল করতে পারে। শিক্ষকের কাজ হলো ছাত্রের ভুল ধরে দেয়া। শাসন করা। ছাত্ররা নকল করবে। শিক্ষকরা নকল ধরবেন। শিক্ষকেরও ভুল হতে পারে। তবে কেউ তা ধরে না। আমি সব সময় ছাত্রের ভালো চাই। সবচেয়ে বেশী ভালো চাই ছাত্রের বাবা মার। ছাত্রদেরকে ভয় দেখাই যে ক্লাস না করলে, পড়া ফাকি দিলে, দুষ্টামি করলে বাবাকে মোবাইলে জানিয়ে দেব। কিন্তু কোনদিন জানাই না। কারন, আমি জানি, জানালে বাবা মা খুব কষ্ট পাবেন। আমার দ্বারা অপমানিত হবেন। এমনকি ছাত্রদের বলে দেই “তোমাদের কষ্টের কথা আমাকে বলবে। বাবা মাকে বলবে না। ” পরীক্ষা কেমন হয়েছে জিজ্ঞেস করলে সবসময় বলবে “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো হয়েছে।” খারাপ হয়েও থাকলে তোমার বাবা মা ভালো করে দিতে পারবে না। ভালো করার জন্য তোমাকেই চেষ্টা করতে হবে। ভালো ভালো সংবাদ দিয়ে বাবা মাকে সবসময় খুশী রাখবে।

সম্প্রতি নকল ধরাকে কেন্দ্র করে একটা অত্যন্ত দু:খজনক ঘটনা ঘটে গেছে রাজধানীর নামকরা একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। একটা মেয়ে মোবাইল নিয়ে পরীক্ষা হলে গিয়েছিল। মোবাইল দেখে নকল করেছিল কিংবা করে নাই। হলে মোবাইল সাথে রাখাই অন্যায়। শিক্ষক মেয়েটির বাবাকে ডেকে এনে মেয়ের সামনে অপমান করেছে এবং ফোর্স টিসি দিয়ে স্কুল থেকে বের করে দেবে বলে হুমকি দিয়েছে। বাবাকে অপমান করার ক্ষোভে দু:খে মেয়েটি বাসায় গিয়ে আত্বহত্যা করেছে। আমি নকল করার অপরাধের জন্য ছাত্রের পিতা মাতাকে অবগত করাকে পছন্দ করি না। প্রত্যেক শিক্ষকই এক সময় ছাত্র ছিলেন। যে ছাত্র একদিন নকল করেছিল সেই ছাত্রই শিক্ষক হয়ে এখন নকল ধরেন। ছাত্রের কাজ ছাত্র করবে, শিক্ষকের কাজ শিক্ষক করবেন।

তারিখ : ১৮/১২/২০১৮ ইং

Leave a Reply

Your email address will not be published.