বরিশালের দুরা

(স্মৃতির পাতা থেকে)
আমাদের এলাকায় কচ্ছপ ছিল তিন রকম। সুন্দর সুন্দর ছোট সাইজের চেপ্টা কচ্ছপকে বলতাম কাছিম। ছোট বেলায় কাছিম দেখে মজা পেতাম। শীতকালে পুকুরে ডুবানো নৌকার গলুইয়ে বসে কাছিম রৌদ পোহাত। আমি পাতিল ভাংগা চেরা দিয়ে ঢিল ছোড়তাম। কাছিম ঢিল দেখে টুব করে ডুব দিত। পানিতে পানার নিচে আরেক প্রকার সামান্য একটু বড় সাইজের কচ্ছপ ছিল তাদের পীঠ উটের পিঠের মত উচু ছিল। এদের বলতাম দুরা। দুরা দেখতে নোংরা ছিল। চেপ চেপা বিলের পানির কাদার ভিতর চার পাচ কেজি ওজনের এক প্রকার দুরা ছিল। কোন কোন উপজাতিরা দুরা শিকার করে খেত। লম্বা চোখা রড ঢুকিয়ে দিত কাদার ভিতর। দুরার পিঠে লেগে এক প্রকার অনুভুতি পেত। তারপর দুরাকে কাদার ভিতর থেকে বের করে এনে রান্না করে খেত। আরেক জাতী দুরা থাকত পাহারের বনে। পাতার ভিতর লুকিয়ে থাকত বিরাট বিরাট দুরা। পাহারের কোন কোন উপজাতিরা লোহার শিক দিয়ে পাতার স্তুপে ঘা দিয়ে দুরা শিকার করে খেত। মুসলিমদের জন্য দুরা খাওয়া নিষেধ বা হারাম।

১৯৮৮ সনে ৩রা জুলাই বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরমদ্দি ইউনিয়ন সাবসেন্টারে আমার মেডিকেল অফিসার হিসাবে প্রথম পোস্টিং হয়। সরকারি ডিউটির পর প্রাইভেট প্রাক্টিশ করতাম। বাসার চেম্বারে রুগী দেখে ২০ টাকা ভিজিট নিতাম। আমার বেতন ছিল ১,৮৫০ টাকা। এক কিলোমিটারের ভিতরে কলে যেতাম নৌকা করে অথবা হেটে। কল ফি ছিল ১০০/১৫০ টাকা।

হাসপাতালে সকাল বেলা প্রচুর রুগী আসত। রুগীরা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকত আমাকে দেখানোর জন্য। পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ার জন্য রুগীকে বেশীক্ষন পরামর্শ দিতে পারতাম না। কি কি খাওয়া যাবে না তা বলে দিতাম। একবার এক রুগী বলল
– স্যার, দুরা খাওয়া যাবে?
-আপনি মুসলমান না?
-মুসলমান।
-তা দুরা খাওয়ার ইচ্ছা হল কেন?

এই ভাবে কয়েকদিন পর পর কয়েকজন রুগী একইভাবে আমার কাছে দুরা খাওয়া যাবে কিনা জিজ্ঞেস করল। আমি তাদের প্রতি কিছুটা বিরক্ত হলাম। কিন্তু আমার কৌতূহল লাগছিল এই দুরা খাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে।

একদিন ভিরের মধ্যে এক রুগীকে প্রশ্ন করলাম
-কি সমস্যা?
-মাথায় ঝুনা পরছে।
-বুঝলাম না।
-বুঝলেন না? আমার মাথায় ঝুনা পরছে। মাথা ব্যাথা করতাছে।

না বুঝেই মাথা ব্যাথার ঔষধ লিখে দিলাম।

একদিন বিকেলে একটা কলে যাচ্ছি হেটে। আমার ডাক্তারি ব্যাগটা কলকারির হাতে। আমি খালি হাতে। খাল পার হলাম চার পেরিয়ে। চার হল এক বাশের সাকো। একটা মোটা বাশ হাটার জন্য আর একটা চিকন বাশ ধরার জন্য। পার হওয়ার সময় নড়বড় কাপতে থাকে। পরে গেলে বাবুগিরি শেষ। যাহোক চার দিয়ে পার হলাম। পথে যেতে যেতে কলকারির সাথে বরিশাল অঞ্চল নিয়ে টুক টাক আলাপ করি। মাঠে কর্মরত লোকরা জিজ্ঞেস করে
-তোমার সাথে মেহমান কে?
-ইনি আমাদের সরকারি এম বি বি এস ডাক্তার।
-অসুখ কিয়ার?
-মোগো মাঐর।

চরামদ্দি গ্রামে অনেক খাল ছিল। জোয়ারের সময় খাল ভরে যেত। ভাটার সময় খালে হাটু পানি হয়ে যেত। খালের পার দিয়ে হেটে যাচ্ছি। কতেক জন কিশোর খালের পানির নিচ থেকে ধরে এনে বোটায়ে বোটায়ে যেন কি খাচ্ছিল। ঠিক আমরা যেমন ছোটবেলায় বিলে পানির নিচ থেকে শালুক তুলে খেতাম। শালুক তো শাপলা গাছের গোড়ায় থাকত। খালে তো কোন গাছ নেই। তাহলে তারা খায় কি? আমার সংগের লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম
-বাচ্চারা পানির নিচ থেকে কি এনে খাচ্ছে?
-দুরা খাচ্ছে।
-কি বললেন?
-দুরা খাচ্ছে?
-আমার কাছে মনে হচ্ছে চিংড়ি মাছের মাথা ছিড়ে ফেলে দিয়ে শক্ত অংশ খাচ্ছে।
-ওগুলি চিংগইর না, ওগুলি দুরা।
-তার মানে ছোট জাতের চিংড়ি?
-এইগুলিই দুরা। আপনারা কি বলেন?
-আমরা গুরা চিংড়ি বলি। এক জাতের কাছিমকে আমরা দুরা বলি। তাই তো বলি রুগীরা কেন জিগায় যে দুরা খেতে পারবে কিনা। চিংড়ি বললে বুঝতে পারতাম।

হঠাৎ পানিতে কি যেন একটা ঝপ করে পরল। জিগালাম
-কি পরল?
-ঝুনা পরল।
-মানে?
-এই গাছ থেকে ঝুনা পরেছে।
-আমি তো দেখছি একটা নারিকেল ভাসছে।
-ওটাই তো পরেছে। ওটাই ঝুনা।
-তাই তো বলি। মহিলা রুগীর মাথায় তাহলে নারিকেল পরেছিল। আমি বুঝি নাই। নারিকেল পরেছে বললেই তো হত।

রুগীর বাড়ী পৌছলাম। তাড়াতাড়ি রুগী দেখাতে বললাম। তারা আমাকে হাত মুখ ধোবার পানি দিল জগে। আমি বললাম
-রুগী দেখে হাত মুখ ধুই।
-না, আগে একটু নাস্তা পানি খেয়ে নিন। রুগী দেখার পর কেউ খান না।

হাত মুখ ধোবার পর বারান্দায় চেয়ারে বসলাম। অনেকেই কৌতুহল নিয়ে আমার দিকে চেয়ে আছে। কেউ কেউ শোলার বেড়া ফাক করে আমাকে দেখছে। আমাকে কাচের গ্লাসে পানি দেয়া হল। পানিতে কি যেন গুড়া গুড়া ভাসছে।
-পানিতে ময়লা নাকি?
-না, ডাক্তার সাব, এগুলি ডাবের পানি তো। ডাবের আশ।

ঢকঢক করে ডাবের পানি খেলাম। এবার আনা হল পায়েস। পায়েস খেলাম। পান খাব কিনা জিজ্ঞেস করলে মানা করলাম। পান খেতে ইচ্ছে করছিল তবুও মানা করলাম। কারন আমি দেখেছি কেউ কেউ তাদের বাচ্চাদের নাকের পেটা ডান হাত দিয়ে ধরে আছার মেরে পাটিতে ফেলে আংগুলে লেগে থাকা পেটা মাজায় পেছানো শাড়ীতে মুছে নেন। পান বানানোর সময় পানের পানিটুকু ঝেরে ফেলে অবশিষ্ট টুকু মাজার ঐ পেটা মুছা জায়গাতেই ঘষা মেরে শুপারী, খর ও চুন মিশিয়ে পান পরিবেশন করে থাকেন।

আমার সামনে খালি চেয়ারে রুগী এসে বসলেন। “আপনার কি কি কষ্ট বলেন, মা” বলে আমি রুগীর সমস্যাগুলি শুনছিলাম। বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় তিনি তার সমস্যার কথা বর্ননা করছিলেন। আমি মনযোগ গিয়ে শুনছিলাম। রুগীর মুখের দিকে চেয়ে দেখি হুবহু আমার মায়ের চেহারা। মার থেকে একটু স্বাস্থ্য ভাল। মা রুগ্ন না থাকলে হয়ত এমনই হতেন। মা ইন্তেকাল করেছেন ১৯৭৯ সনে আমার এইচ এস সি পরীক্ষা চলাকালীন। মায়ের স্মৃতি মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো। আমি কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেলাম। ঘামতে লাগলাম। বললাম
-আমার খারাপ লাগছে। আমাকে একটু শুতে হবে।

পাশের রুমে খাটে শুয়ে পরলাম। কিছুক্ষন নিরবে কাদলাম।

কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। কিছুক্ষণ পর উঠে ঔষধ পত্র লিখে চলে আসলাম। সংগের লোকটি বাহির বাড়ি এসে আমার পকেটে দুইশত টাকা দিতে চেষ্টা করলেন। আমি ফিরিয়ে দিলাম।
-নিন, আমরা খুশি হয়ে দিচ্ছি।
-রুগীকে দেখতে আমার মায়ের মত দেখা গেছে আমি কিছুতেই টাকা নিতে পারব না।

আমি টাকা না নিয়েই চলে এলাম।

একদিন হাসপাতালে খুব ব্যাস্তভাবে রুগী দেখছি। এসিস্টেন্ট এসে খবর দিল যে বাসায় আমার মা এসেছেন। কিছুটা আন্দাজ করতে পারলাম যে কে এসেছেন। কাজ কমিয়ে বাসায় গিয়ে দেখি সেই মায়ের মত দেখতে রুগীটি শুয়ে আছেন। তাকে যথার্থ সমাদর করা হল।

কেউ একজন বললেন
-আমি যখন হাসপাতালে আপনার কাছে খবর দেই যে মা এসেছেন। তখন তিন চারজন মেয়ে বাসায় আসেন আপনার মাকে দেখতে। আপনার মা তখন কাত হয়ে মুখ আড়াল করে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এক জন মহিলা আপনার মাকে তাল পাখা দিয়ে বাতাস করছিল। অনেকক্ষন পর হঠাৎ করে মুখ সোজা করেন। তখন মহিলা “এইডা না মোগো মাঐ” বলে বাতাস দেয়া বাদ দিয়ে গল্প শুরু করল ।

এরপর অনেকবার সেই মায়ের সাথে আমার দেখা হয়েছে। তাদের বাড়িতে গিয়েছি। খেয়েছি। চলে আসার পর আস্তে আস্তে তার সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দিয়ে এক সময় বন্ধ করে দিয়েছি। মনে ভয় ছিল আমি যদি তাকে আমার মায়ের মর্যাদা দিতে না পারি! কিন্তু আমার মনে ঠিকই পড়ে। ঠিকই মনে পড়ে বরিশালের চরামদ্দির অনেক মধুর স্মৃতি। কাজের গভিরে আবার হারিয়ে ফেলি সেই সব স্মৃতি। ভুলে যাই অচেনা সেই মায়ের কথা, ভুলে যাই বরিশালের ঝুনা, ভুলে যাই বরিশালের দুরার কথা।
===
ডাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
ফেইসবুক পোস্ট
২১/১১/২০১৭

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.