বাওয়ার মাছ

বাওয়ার মাছ
(স্মৃতির পাতা থেকে)
(সখিপুর এলাকার পাঠকদের জন্য বেশী প্রযোজ্য)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আজকে বাওয়ার কথা মনে পড়লো। আমাদের এলাকার ভর অঞ্চলে অনেক বড় বড় বিল আছে। এইসব বিলে সারাবছরই পানি থাকতো। প্রচুর দেশী জাতের নানারকম মাছ পাওয়া যেতো এইসব বিলে। প্রাকৃতিক পরিবেশে এই মাছ বড় হতো বিধায় এইগুলি খুব স্বাদের ছিল। সাধারণত কার্তিক মাসে মাছে ভরে যেতো এইসব বিল। কার্তিক মাসের কোন এক নির্দিষ্ট শনিবারে এলাকার সবাই একযোগে পানিতে নেমে পলো, চাবী, চাক জাল, টেপারী, ঝাকি জাল, শিবজাল, জালী, খুইয়া ইত্যাদি নিয়ে নেমে পড়তো মাছ ধরতে। মাছেরা বে-উপায় হয়ে দিকবিদিক ছুটা ছুটি পারতো। এই সুযোগে মাছ ধরা সহজ হতো। এইভাবে মাছ ধরাকে বলা হতো। বাওয়ার মাছ। সব মাছ ছুটাছুটি করাকে বলা হতো মাছ গাবানো। গাবানো মাছ ধরতে বেশ আনন্দ লাগতো।

আমাদের বাড়ী থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিম দিকে ইন্দ্রজানীর পাদদেশে ভর অঞ্চলে চাপড়াবিল নামে বিরাট এক বিল আছে। এখন এটা কেমন আছে জানা নেই। ধীর্ঘদিন এই পথে যাওয়া হয় না। পাকা রাস্তা হয়ার আগে এই পথে নৌকাযোগে যাতায়াত করতাম। বর্ষাকালে বিল ভরে গিয়ে পানিতে থৈ থৈ করতো। পানি আর পানি। ছইওয়ালা নৌকায় চরে চাপড়া বিলের উপর দিয়ে জার্নি করার মজাই ছিল আলাদা। চৈত্র-বোশেখে শুকিয়ে পানি কমে যেতো। মাঝখানের গভীর জায়গায় পানি থাকতো। সেই পানিতেই বাস করতো নানা জাতের মাছ। বর্ষার পানি পাহাড় থেকে নেমে এসে বিল ভরে যেতো। পাহাড় থেকে গড়িয়ে আসা পানিতে মাছ উজিয়ে পাহাড়ে চলে গিয়ে ডিম দিতো। ডিম ফোটে পোনা বের হয়ে ঝড় ঝড়া হয়ে নেমে যেতো ঝোড়া (পাহাড়ি খাল) দিয়ে চাপড়া বিলে। পাহাড় বিধৌত পানির সাথে মাছের জন্য পুষ্টিও চলে যেতো চাপড়া বিলে। ভর অঞ্চল থেকে সাইল সিন্দুর খাল দিয়ে বন্যার পানি এসেও ভরে যেতো এই বিল। বন্যার পানির সাথেও আসতো পলিমাটির সাথে মাছের জন্য পুষ্টি। সেই পুষ্টি পেয়ে চাপড়া বিলের মাছ বড় হয়ে বিল ভরে যেতো। বর্ষার শেষে পানি নেমে যেতো খাল দিয়ে। তার সাথে চলে যেতো মাছেরা। কিন্তু এলাকার শত মানুষ সেই মাছ ধরার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখতো। অপেক্ষা করতো বাওয়ার দিনের জন্য। কিছু কিছু লোক বাওয়ার দিনের হিসাব জানতো। কার্তিক মাসের শনিবারে এক চাঁদনী রাতে শুরু হতো বাওয়ায় যাত্রা। বাওয়ায় যাওয়ায় আহবান করা হতো শিংগা ফুকিয়ে। আমাদের আজকালকের ছেলেমেয়েদের অনেকেই হয়ত শিং দেখেছেন কিন্তু শিংগা দেখেন নি। শিংগা বানানো হতো মহিষের শিং দিয়ে। মহিষের শিং অনেক বড় হয়। এর চোকা দিক কেটে দিলে শিংগা তৈরি হয়। শিংগায় ফু দিলে এর প্রশস্ত দিক দিয়ে উচ্চ শব্দ তৈরি হয়। আমি যখন ১৯৮৮ সনে বাকেরগঞ্জের চরামদ্দিতে চাকরি করতাম সেখানে এই শিংগার ব্যবহার দেখেছি। চরামদ্দি থেকে বরিশাল ও বাকেরগঞ্জে যেতাম ইঞ্জিনচালিত নৌকা যোগে। নৌকা ঘাটে ভিড়ার আগে অনেকদূর থেকে শিংগায় ফু দিত। আমরা শিংগার শব্দ শুনে ঘাটে যেতাম। শিংগার শব্দ সবচেয়ে বড় শব্দ। ফেরেস্তা ইসরাফিলের শিংগার ফুৎকারে একদিন কিয়ামত হয়ে যাবে। আল্লাহ্‌র সৃষ্টির সব কিছু সেদিন শিংগার ফুৎকারে ভেংগে চুরমার হয়ে যাবে। আমাদের চাপড়া বিলের বাওয়ার মাছ ধরার আহবানের জন্যও শিংগায় ফু দেয়া হতো। অনেক দূর দুরান্ত থেকে অনেক লোক আসতো শিংগা ফুপিয়ে। সেই ভালুকার মল্লিক বাড়ী, আংগার গাড়া থেকেও আসতো লোকেরা বাওয়ার মাছ ধরতে। তারা যখন রাতে শিংগা বাজাতো সেই শিংগার শব্দ দুই তিন কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা যেতো। মানুষ যার হাতে যা আছে তাই নিয়ে বেরিয়ে পড়তো। দলে দলে চলে যেতো হ্যামিলনের বংশীবাদকের পিছনে ছোটা পোলাপানের দলের মতো।

বাওয়ায় যাওয়া নিয়ে আমার একটা হাস্তর মনে পড়লো। আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় গল্প, ছড়া ও কবিতাকে হাস্তর বলা হয়। আমি অনেক মজার মজার হাস্তর জানতাম। একগ্রামে এক গরীব কৃষক ছিল। গরীব হলেও সে খুব ভালো ছিলো। সে তার স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতো। তার স্ত্রীও তাকে খুব ভালোবাসতো। স্বামী খুব পরিশ্রম করতো। একদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হালচাষ করে পরিশ্রান্ত ও ক্ষুধার্থ হয়ে লোকটি বাড়ী এসে খাবার খেতে এসে দেখে স্ত্রীর রান্না শেষ হয় নি। রাগ করে সে স্ত্রীকে প্রহার করে বসে। স্ত্রী অভিমান করে স্বামীর সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয় তিন দিন পর্যন্ত। রান্নাবান্নাও বন্ধ করে দেয়। কেউ কারো সাথে কথা না বললেও একে অপরের জন্য টান কম ছিলো না। কথা বলতে ইচ্ছে করে কিন্তু অভিমান করে থাকার জন্য কথা বলে না। ঐ রাতে মানুষ শিংগা বাজিয়ে বাওয়ায় যাচ্ছিল। স্ত্রীরও ইচ্ছা হলো তার স্বামী বাওয়ায় যাক। কিন্তু কিভাবে বলবেন স্বামীকে? সে তো অভিমান করে আছে। তাই সে পরোক্ষভাবে কথা বলতে লাগলো এইভাবে। স্ত্রী বললো
– ভ্যা বাজে, ভো বাজে, বাওয়ায় কেনে যায় না?(শিংগা বাজে ভ্যা ভো করে বাওয়ায় যাচ্ছো না কেনো?)
– তিনদিন ধইরা খাই না ভাত, কেমনে মারমু বাওয়ার মাছ?
– শিকার উপর পান্তা ভাত, পাইরা কেনে খায় না?
– কেউ খাট্টা, কেউ দিগলা, নগুল ত পাই না। (আমি খাটো, তুমি লম্বা, শিকা নাগাল পাই না, কিভাবে ভাত পেড়ে খাবো?)
– ফিড়ার উপর ফিড়া থুইয়া পাইরা কেনে খায় না? (পিড়ির উপর পিড়ি বসিতে তার উপর দাঁড়িয়ে ভাত পেড়ে খাও)
– ফিড়া নড়ে টাকুর টুকুর পইড়া যদি মরি?
– আগে কেন মনে ছিল না মর্দার মাগি ধইরা থরি?
যাহোক স্বামী পিড়ির উপর পিড়ি রেখে তার উপর দাঁড়িয়ে পান্তাভাত পেড়ে খেতে বসলো। কিন্তু লবন খুঁজে পেলো না। বললো
– নিমক ছাড়া পান্তাভাত পাইন্সা পাইন্সা লাগে।
– চুলার পারের নিমক নিয়া পান্তা কেনে খায় না?
(চুলার পাড়ে লবন রাথায় শুকিয়ে শক্ত ঘটঘটা হয়ে যাওয়ায় লবন নিতে না পেড়ে বললো)
– ঘট ঘটা ঘট ঘট।
– নাহইর কাঠিরে, নাহইর কাঠি।
বুঝতে পেড়ে স্বামী নাকইর কাঠি দিয়ে খুচিয়ে লবন নিয়ে পান্তাভাত খেয়ে বাওয়ায় গেলো মাছেরে। মাছ ধরতে যাওয়াকে বলা হতো মাছেরে যাওয়া। তদ্রূপ, ঘাস কাটতে যাওয়াকে আঞ্চলিক ভাষায় বলা হতো ঘাসেরে যাওয়া।

ছোট বেলায় একবার আমার ইচ্ছে হলো বাওয়ায় যাওয়ার। এতলোক কিভাবে এক যোগে মাছ ধরে দেখতে ইচ্ছে হলো। বাবার কাছে বায়না ধরলাম এবার বাওয়ায় যাবো। বাবার মাছ ধরার অভ্যাস ছিল না। বাড়ীতে বাড়ীর আশ পাশ থেকে মাছ ধরার ছোট খাটো সরঞ্জাম ছিল কয়েকটি। একটি শিপজাল, একটি জালী ও একটি খুইয়া ছিল আমাদের। স্কুল থেকে এসে মাঝে মাঝে এগুলি দিয়ে আমিই মাছ ধরতাম। বাওয়ায় যাওয়ার জন্য বাবা বড় দেখে একটা খালুই কিনলেন। খালুই হলো মাছ ধরে রাখার জন্য বাঁশ দিয়ে বুনানো সরঞ্জাম। বাবা খালুইর চারপাশে সোলার মুঠি বেঁধে দিলেন যাতে খালুই পানিতে ভাসে। এক শুক্রবার দিন গত রাতে পুর্বদিক থেকে শিংগা বাজাতে বাজাতে বাওয়ার মানুষ আসা শুরু করলো। আমি বাবার সাথে ধল পহরের আগেই রওনা দিলাম বাওয়ায়। বাবার কাধে ছিল জালী। আমার হাতে ছিল খালুই। এলাকার সব গ্রাম থেকে শিংগা বাজিয়ে ও মুখে হাত দিয়ে থাপড়া দিয়ে আবা বা শব্দ করতে করতে বাওয়ার মানুষ আসতে লাগলো। মল্লিক বাড়ী, আংগার গাড়া, ডাকাতিয়া, আড়াই পাড়া, কালিয়া, কচুয়া, রাম খা, ঢ্নডনিয়া, সারাসিয়া, বাসারচালা, দেবল চালা, তৈল ধারা, নাইন্দা ভাংগা, দিঘীর চালা, হামিদপুর, বাঘের বাড়ী, গড়বাড়ী, বৈলারপুর, গোবর চাক্কা, ভুয়াইদ, ভাতগড়া, ছোট চওনা, বড়চওনা, পাইন্নার বাইদ, সিরিরচালা, শ্রীপুর, খুইংগারচালা, কুতুবপুর, পোড়াবাসা ইত্যাদি গ্রাম থেকে সব বাওয়ার মানুষ জড়ো হলো চাপড়া বিলের পাড়ে। শত শত মানুষের কলরবে বিলের পাড় উৎসবে পরিণত হলো। বেলা ওঠার সাথে সাথে বাওয়ার কাজ শুরু হলো। শত শত মানুষ এক কাতারে পলো ও চাবী নিয়ে দাড়ালো বিলের দিকে মুখ করে। বাওয়ার লিডার মুখে হাত থাপড়িয়ে আ বা বা শব্দ করলো। শত শত পলো ও চাবীওয়ালা একযোগে জাহইর দিয়ে হই হই শব্দ করে ডানে বামে পলো ও চাবি চাপতে চাপতে অগ্রসর হতে থাকলো। মাছেরা দিক বিদিক ছুটাছুটি ও লাফালাফি করতে লাগলো। চাবী ও পলোর নিচে পড়তে লাগলো বোয়াল, শৈল, গজার, চিতল ইত্যাদি। খুব বড় বড় বোয়াল ও চিতল থাকতো বিলের মাঝখানের গভীর পানিতে। ওখানে পলো মারা যেতো না। ওখানে চাক জালওয়ালারা চাক জাল চাপ দিয়ে বোয়াল মাছ চিতল মাছ আটকিয়ে ডুব দিয়ে ধরে আনছিল। যারা ঝাকি জাল, জালী, খুইয়া ও শিপজাল এনেছিলো তারা পাড়ের দিকের অগভীর পানিতেই মাছ ধরছিলেন। শিপজাল ও জালীতে পুটি, পাবদা, টেংরা, গোলশা, নোন্দা মাছ উঠছিল। খুইয়ায় উঠছিল গুড়া চান্দা, চাটা ও ইচা মাছ। বাবা যেহেতু জালী নিয়ে গেছিলেন সেহেতু আমরা শুধু পুটি টেংরাই পেলাম। কয়েক খেওয়েই খালুই ভরে গেলো। গামছায় বেঁধে আরো কিছু মাছ নিলাম। হায়রে মাছ! মাছ আর মাছ! জালী আর খুইয়া নিয়ে আসা হাস্যকর এখানে। খালুই ভর্তি বাওয়ার মাছ নিয়ে চলে এলাম বাবার সাথে। আমার বাওয়ার মাছ ধরার অভিজ্ঞতা হলো। আর কোন দিন আমার বাওয়ায় যাওয়া হয় নাই। এই চাপড়া বিলের উপর দিয়ে অনেকবার নৌকায় যাতায়াত করেছি। স্ত্রী স্বপ্নাকে নিয়ে যখন ছইওয়ালা নৌকা চরে চাপড়া বিলের ঢেউয়ের উপর দিয়ে যেতাম স্বপ্না ঢেউ দেখে বলতো “কি ঢেউ, যেনো সমুদ্রের ঢেউ!” সেই ঢেউয়ের কথা প্রায়ই মনে পড়ে শহরে থেকে। আজকে কেনো জেনো চাপড়া বিলের বাওয়ার মাছের কথা মনে পড়লো।


তারিখ : ২৯/১/২০১৯ ইং
স্থান: চেম্বারে কাজের ফাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.