ব্যাঙ দিয়ে প্রেগন্যান্সি টেস্ট

ব্যাঙ দিয়ে প্রেগন্যান্সি টেস্ট
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমি যখন ১৯৮০ সনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এম বি বি এস প্রথম বর্ষে অধ্যয়ন করি তখন ঘাটাইল থেকে আমার এক পরিচিত লোক আসেন তার স্ত্রীকে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে। তার কি কি সমস্যা ছিল আমার এখন মনে নেই। তবে তাকে দেখায়েছিলাম স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডাঃ জোবায়েদ হোসেন স্যারকে। স্যারের চেম্বার কাম বাসস্থান ছিল ময়মনসিংহ শহরের আম্লাপাড়ায়। বাসায় একাই থাকতেন। স্যারের বাড়ি খুব সম্ভব খুলনা বা সাতক্ষিরার দিকে ছিলো। জোবায়েদ স্যারকে পেয়েছিলাম আমরা তৃতীয় বর্ষ থেকে। তাকে দেখে সবাই বাগের মতো ভয় পেতো। যেহেতু তখন আমি প্রথম বর্ষে ছিলাম সেহেতু জোবায়েদ স্যার কি জিনিস আমি জানতাম না। তাই অত্যন্ত সাহসের সাথেই সেদিন স্যারের সাথে কথাবার্তা বলেছিলাম। স্যার রুগী পরীক্ষা করে বললেন “রুগী গর্ভধারণ করেছে কি না আমি নিশ্চিত না। প্রেগন্যান্সি টেস্ট করে নিশ্চিত হয়ে চিকিৎসা দিতে হবে।” তিনি প্রেগন্যান্সি টেস্ট লিখে একটা এডভাইস স্লিপ দিলেন প্রফেসর ডাঃ এম এ জলিল স্যারের প্যাথলজি ল্যাবরেটরি থেকে টেস্টটি করে আনার জন্যে। তখন কয়েকটি মাত্র ল্যাবরেটরি ছিল চড়পাড়ায়।মাত্র কয়েকটি টেস্ট হতো তাতে। ল্যাবরেটরিটরিগুলির নাম ছিল না। চরপাড়া মোড়ে প্যাথলজি বিভাগের প্রফেসর আব্দুল হক স্যারের আত্তাহলিল নামে একটা ছোট্ট ল্যাবরেটরি ছিলো। নিজ হাতে রক্ত টানতেন, নিজ চোখে পরীক্ষা করতেন এবং নিজ হাতে রিপোর্ট লিখতেন। রিপোর্ট ভুল হবার প্রশ্নই উঠতো না। প্রফেসর জলিল স্যার দেশী হিসাবে আমাকে একটু বেশী স্নেহ করতেন। প্রেগন্যান্সি পরীক্ষার এডভাইস নিয়ে জলিল স্যারের নিকট গেলাম। তিনি তার টেকনিশিয়ান গোলাম মোস্তফা ভাইর কাছে পাঠালেন। মোস্তফা ভাই বললেন
– এই পরীক্ষাটা করতে হলে একটা স্ত্রী কোণো ব্যাং এনে দিতে হবে।
– কোণো ব্যাং পাবো কোথায়?
– গ্রামে থেকে আনতে হবে।

রুগীর লোক রুগী নিয়ে গ্রামে চলে গেলেন ব্যাং আনতে। গ্রামের মাটির ঘরে অন্ধকার কোনায় উগার অথবা চৌকির নিচে কোণো ব্যাং পাওয়া যেতো। এই ব্যাংগুলি খুব নিরিহ প্রজাতির ছিল। শরীরের চামড়া মেটে রংগের খসখসে ছিলো। আমরা এস এস সি পড়ার সময় কোণো ব্যাং কেটে প্রাণী বিজ্ঞানের ব্যাবহারিক ক্লাস করতাম। সেই ব্যাংগের উপর প্রেগন্যান্সি টেস্ট হবে জেনে আমার খুব কৌতূহল জাগলো দেখতে। আমি মোস্তফা ভাইকে বললাম
– ভাই, ব্যাং দিয়ে কিভাবে প্রেগন্যান্সি টেস্ট করবেন?
– রুগীর লোক যেদিন ব্যাং নিয়ে আসবেন সেদিন একটি শিশিতে সকালের প্রথম প্রস্রাব নিয়ে আসবেন। আমি ব্যাংগের শরীরে রুগীর প্রস্রাব ইঞ্জেকশন করে দিব। পরেরদিন ব্যাংকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে পেট কেটে দেখব তার ডিম ফুটেছে কিনা। যদি ডিম ফুটে তবে বুঝব প্রেগন্যান্ট বা পজিটিভ। না হলে নেগেটিভ।
– এরকম হয় কেনো?
– এটা স্যার বলতে পারবেন। অথবা আপনি বই পড়ে শিখতে পারবেন।

রুগী ও রুগীর লোক গ্রামে চলে গেলেন ব্যাং ও সকালের প্রস্রাব আনতে। আমি হোস্টেলে গিয়ে প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিভাবে করা হয় ও তার মুলনীতি কি পড়ে ফেললাম।

রাতে প্রেগন্যান্সি টেস্টের নিয়মটা পড়ে নিলাম। কেন গর্ভধারিণীর প্রস্রাব ব্যাংগের শরীরে ইঞ্জেকশন করলে ব্যাংগের ডিম ফোটে তা শিখে নিলাম। গর্ভধারিণীর গর্ভের প্লাসেন্টা বা ফুলে থাকে করিয়নিক কোষ। এই কোষ থেকে গোনাডোট্রপিন নামে এক ধরনের হোরমোন বা রস নি:সরিত হয়ে রক্তে মিশে যায় এবং প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যায়। এটাকে বলা হয় হিউম্যান করিয়নিক গোনাডোট্রপিন সংক্ষেপে এইচসিজি। এই হোরমোনের প্রভাবে প্রাণীর ওভারি বা ডিম্বাসয়ে ওভাম বা ডিম ফোটে। গর্ভধারিণীর সকালের প্রশ্রাবে বেশী ঘনত্বে হোরমোন থাকে। তাই এই প্রশ্রাব স্ত্রী ব্যাংগের শরীরে ইঞ্জেকশন করলে ১২/১৩ ঘন্টা পর ব্যাং কেটে ওভারি পরীক্ষা করে দেখা হয় ডিম ফোটেছে কি না। মানবজাতীর পরীক্ষার প্রয়োজনে ব্যাং মেরে পরীক্ষা করলে দোষ নেই। তবে সাধারণের সামনে বা জানিয়ে ব্যাং মারা সঠিক না। তাতে কেউ মনোকষ্ট পেলে ক্ষতিপুরণের মামলা করতে পারে। উন্নত দেশগুলিতে নাকি তাই করে।

পরেরদিন ব্যাং পৌঁছে গেলো ময়মনসিংহ আমার রুমে । দেখলাম, কলাগাছের দুইটি খোল দুইখানে ভেংগে বাঁশের কঞ্চি গেঁথে খালুই তৈরি করে তার ভিতর ব্যাং বসানো হয়েছে। আমরা ছোটবেলায় এমন খালুইয়ে কবুতরের বাচ্চা বাজারে নিয়ে যেতে দেখেছি। এখন অনেকেই বাঁশের অথবা জি আই তারের খাচায় অথবা প্লাস্টিকের ফলের খাচায় কবুতরের বাচ্চা নিয়ে বিক্রি করতে যায়। যাহোক, ব্যাং ও প্রস্রাব মোস্তফা ভাইর কাছে দিয়ে আসলাম। এবং পরের দিন রেজাল্ট নিতে আসতে বললাম রুগী সহ। রেজাল্ট পেলাম প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ অর্থাৎ রুগী গর্ভধারিণী। জোবায়েদ স্যার রিপোর্ট দেখে প্রেস্ক্রিপশন করে দিলেন।

প্রেগন্যান্সি টেস্টের এই জটিল পদ্ধতিটা আমাকে যেমন কষ্ট দিয়েছিল তেমন ইন্টারেস্টও পেয়েছিলাম। যিনি আবিষ্কার করেছিলেন তার নাম আমার মনে নেই। তবে অশেষ ধন্যবাদ পাবার যোগ্য তিনি। ক্লাশে প্রেক্টিক্যাল ক্লাসে এই পদ্ধতিতেই থিউরিটিক্যালি শিখানো হয়েছিল প্রেগন্যান্সি টেস্ট। তবে বলা হতো বিদেশে বা দেশে উন্নত ল্যাবরেটরিতে স্লাইড প্রিসিপিটেশন ম্যাথডে দুই মিনিটে সহজে এই টেস্ট করা যায়। অল্পদিনের মধ্যেই ময়মনসিংহ-এর ল্যাবগুলিতে এই স্লাইড মেথড এসে গেলো। ফি-ও খুব বেশী না। ব্যাংরা বেচে গেলো ডাক্তারদের হাত থেকে। ধন্যবাদ স্লাইড মেথড আবিষ্কারককে। এরপর আবিষ্কার হলো ইমিনোক্রমাটোগ্রাফি মেথডে ঘরে বসেই একটা লম্বা সরু কাগজের টুকরা গর্ভধারিণীর প্রস্রাবে চুবিয়ে নিলে যদি পজিটিভ হয় হয় তবে দুইটি লাল দাগ আর নেগেটিভ হলে একটি লাল দাগ হয়। এই প্রেগন্যান্সি টেস্ট স্ট্রিপ আজকাল বাড়ির কাছে ফার্মেসীতেই পাওয়া যায়। ল্যাবরেটরিতে এই স্ট্রিপ মেথডে আজকাল অনেক পরীক্ষা করা হয়। স্লাইড ও স্ট্রিপ মেথড হলো ইমিউলোজিক্যাল মেথড। এখানেও প্রশ্রাবে এইচ সি জি-এর উপস্থিতি নির্ণয় করা হয়। তবে ব্যাংগের যুগের চেয়ে এখনকার যুগে মানুষ কম প্রেগন্যান্ট হয়।


তারিখ : ৩০/৩/২০১৯ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ- ঢাকা – ময়মনসিংহ জার্নি