ভান ধরা এক রুগী

 

১৯৮৮ সনে আমার বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়ন উপস্বাস্থ কেন্দ্রে পোস্টিং হয়। এটাই আমার প্রথম পোস্টিং। নবীন ডাক্তার আমি। গ্রাম এলাকা। সরকারী ডিউটির পর আমি প্রাইভেট প্রাক্টিস করতাম। মাঝে মাঝে আশে পাশে কলে যেতাম। একদিন আসরের নামাজের পর ২০/২৫ বছরের এক লোক আসল। অনুনয় করে বলল

-ডাক্তার সাব, আমার স্ত্রী খুব অসুস্থ। মনে হয় মরে গেছে। দয়া করে আমার বাড়ী চলেন।

-আমি এখন যেতে পারব না। রুগী নিয়ে আস।

-কোন উপায় নাই। দয়া করে চলুন।

আমি ব্যাগটা তার হাতে দিয়ে হেটে হেটে রুগীর বাড়ী গেলাম। আমার বাসা থেকে কাছেই। দেখলাম কয়েকশ লোক জড়ো হয়েছে। ঘরের মেঝেতে পাটিতে রুগী শুয়ে আছে। অজ্ঞান। রুগীর শাশুড়ির কাছ থেকে বিস্তারিত জানলাম।

রুগী এক বাচ্চার মা। বাচ্চার বয়স এক বৎসর। গত রাতে পাশের গ্রামে যাত্রা গানের অনুষ্ঠান ছিল। রুগীর স্বামী সারারাত বাড়ীতে ছিল না। যাত্রা শুনেছে। এক মাত্র শাশুড়ি বাড়ীতে ছিল বউকে নিয়ে। শীতকাল। সারারাত টিপ টিপ বৃষ্টি হয়েছে। ঘরের চাল ভাংগা ভাংগা ছিদ্র ছিদ্র। ঘরের বিভিন্ন জায়গায় পানি পরেছে। পোয়াতি মায়ের একা একা বাচ্চা নিয়ে কষ্ট হয়েছে। শাশুড়ি পাশের রুমে ঘুমিয়েছেন। ভোরে ফজরের নামাজ পড়ে খোজ নিয়ে দেখেন ছেলের বউ হোগলার পাতার পাটিতে চিত হয়ে শুয়ে আছে। পাটির কিছু অংশ উল্টিয়ে গায়ে দেয়া। বউ মরা মানুষের মত চিত হয়ে পরে আছে। বাচ্চাটা পেটের উপর শুয়ে দুধ খাচ্ছে। ডাকলেও সাড়া দেয় নাই। হাত দিয়ে দেখেন রুগী মরা মানুষের মত শক্ত।
আমি রুগী পরীক্ষা করা শুরু করলাম। পালস, ব্লাড প্রেসার, পিউপিল, রেস্পাইরেশন, রিফ্লেক্স সব ঠিক আছে। তলা পেট ভরা প্রশ্রাব। সমস্ত জয়েন্ট লক হয়ে আছে। রুগীর সারা শরীর বাশের মত শক্ত। বসাতে চেষ্টা করলাম। বাশের মত সোজা খারা হয়ে গেল। ছেড়ে দিলে বাশের মত পড়ে গেল। লোকজন ধরে ফেলল। চোখের উপরের সুপ্রাট্রক্লিয়ার নার্ভে জোড়ে চাপ দিলাম। রুগী পায়ের আংগুল নাড়ালো। আমি বুঝলাম। লোকজন বুঝল না। আমি বুঝতে পারলাম যেহেতু সব ঠিক আছে সেহেতু এটা আসলে রুগী না। রুগীর ভান ধরেছে। শত শত লোক তামাসা দেখছে। আমি এদেরকে সরে যেতে অনুরোধ করলাম। কিন্তু কাজ হল না। সবাই দেখতে আগ্রহী কিভাবে আমি মরা রুগী খারা করি। তাছাড়া আমি ছাড়া ইতিপুর্বে এই এলাকায় এম বি বি এস ডাক্তার কলে আসে নাই। দেখার মতই একটা বেপার।

একজন বললেন “রুগী বেচে আছে তো?”

-বেচে আছে, কিন্তু খুবই সিরিয়াস।

-বাঁঁচবে তো?

-দেখি চেষ্টা করে।

আমি রুগীর সুপ্রাট্রক্লিয়ার নার্ভে বারবার চাপ দিয়ে ব্যথা দিতে লাগলাম। কিন্তু রুগী ছাড়া কেউ টের পেল না। এক সময় ব্লাড প্রেসার মেশিনের ফিতা রুগীর ডান বাহুতে বেধে সাভাবিকের চেয়ে একটু বেশী সময় চাপ দিয়ে রেখে দিলাম। রুগী ব্যাথা অনুভব করল। কেউ জানল না। ভয়ে রুগী ডান হাত নরম করে ফেলল। নরম হাত নড়া চড়া করলাম। এক জন বললেন

-মনে হয় এই হাত নরম হয়েছে!

-নরম হবে না মানে? স্ট্রোক দিয়েছি না? স্ট্রোক দিলে নরম হতে বাধ্য।

-তাহলে বাম হাতেও স্ট্রোক দিন।

 

আমি বাম হাতে ফিতা বেধে কিছু প্রেসার উঠাতেই বাম হাত নরম করে ফেলল। লোকটি বলললেন

-এই হাতও দেখছি নরম হয়েছে। তাহলে পায়েও স্ট্রোক দিন।

-অনেক সময় হাতের স্ট্রোক পায়েও সঞ্চারিত হয়। দুই তিন মিনিটের মধ্যে পা নরম না হলে পায়েও স্ট্রোক দিব।

দুই মিনিট পর দুই পা নরম হয়ে গেল। সবাই খুশী খুশী ভাব। তারা মনে করল স্ট্রোকে ভাল কাজ হয়েছে। স্ট্রোক কথাটি হঠাৎই আমার মুখ থেকে বেরিয়েছিল। ব্লাড প্রেসার মেশিন দিয়ে চাপ দেওয়ার বেপারটাকেই স্ট্রোক দেয়া হিসাবে চালিয়ে দিলাম।
-বেচে যাবে বলে মনে হচ্ছে?
-বেচে উঠবে আশা করি।
-রুগী গত রাত থেকে পেছাব পায়খানা করে নাই। পেট ফুলে মারা যাবে না তো?
-তলা পেটের ব্লাডার ভর্তি প্রশ্রাব জমা আছে। কয়েক দিন পায়খানা না করলেও চলবে। তবে আজই প্রশ্রাব করাতে হবে।
-প্রশ্রাব করাবেন কিভাবে। রুগী নরম হলেও জ্ঞান ফিরে নাই।
-প্রশ্রাব করানোর জন্য বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হবে। সেখানে গেলে ডাক্তারগন প্রশ্রাবের রাস্তা দিয়ে রাবারের নল ঢুকিয়ে প্রশ্রাব বের করবেন।
-ব্যাথা পাবে না?
-সামান্য ব্যাথা পাবে। করার কিছু নাই। প্রশ্রাব করাতে হবে তো!
-আজ বেলা ডুবে যাচ্ছে। বরিশাল নেয়া সম্ভব হবে না। ঔষধ দিয়ে প্রশ্রাব করানো যাবে না?
-আমার ব্যাগে একটা ট্যাবলেট আছে। ওটা খাওয়ালে প্রশ্রাব হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
-খাওয়াবেন কিভাবে? রুগীর দাত লেগে গেছে।
-আমি স্ট্রোক দেয়ার পর দাত লাগা ছেড়ে দেয়ার কথা। না ছাড়লে আরেকটা স্ট্রোক দিব। দেখুনতো দাত খোলে কিনা।
-হালকা খোলে। চায়ের চামুচ ঢুকবে।
-তা হলে চলবে। সামান্য চিনি আনুন। এক গ্লাস পানি আনুন। একটা চায়ের চামুচ আনুন।

আমি এক চামুচ পানিতে সামান্য চিনির সাথে একটা ভিটামিন ট্যাবলেট গুলে দাতের ফাক দিয়ে মুখের ভিতর ঢেলে দিলাম। রুগী বিভৎস এক রকম গলা থেকে শব্দ করে হাত পা নাড়াতে থাকল আর গোংরাতে থাকল। জনতা ভয় পেয়ে গেল।

-ডাক্তার সাব, আপনি তো রুগী মেরে ফেললেন!
-আমি মেরে ফেললাম, না বাচালাম? আমার ঔষধ যদি একটুও পেটে গিয়ে থাকে তবে এখনি সুস্থ হয়ে উঠবে। আর যদি পুর্ন এক চামচ পেটে যায় তবে আজ রাতের মধ্যেই প্রশ্রাব হবে। বরিশাল নেয়ার প্রয়োজন হবে না। এক চামচ খাওয়ার পরও যদি প্রশাব না হয় তবে বরিশাল নিতে হবে। আরেকবার চেষ্টা করে দেখুন এক চামচ ঔষধ খাওয়াতে পারেন কিনা।

এবার এক চামচ ঔষধ সহজেই খেয়ে ফেলল।

-এক চামচ ঔষধ খেয়ে ফেলেছে।
-এবার প্রশ্রাব হবে। এর দাদী কে?
-আমি।
-নানী কে?
-আমি।
-দাদী ও নানী রুগীকে নিয়ে বাথ রুমে যান। একটা বদনা থেকে একটা গামলার পানির উপর কলকল করে পানি ফেলবেন। রুগী প্রশ্রাব করে কিনা দেখবেন।

তারা রুগীকে ধরে ধরে বাথ রুমে নিয়ে গেলেন। আমার কথা মত কাজ করলেন। সবাই আমার মুখের দিকে চেয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর দাদী পান পুখে দিয়ে কালচে দাত বের করে হাসতে হাসতে বলল “প্রশ্রাব করছে। এক কলসের মত প্রশ্রাব করছে। তাজ্জব বেপার। ” আমি বললাম “বরিশাল নেয়া থেকে বেচে গেলেন। আপনারা সবাই চলে যান। আমি কিছু ঔষধ দিব। রুগীর স্বামী আমার সাথে যাবে। ”
রুগীর স্বামী আমার সাথে আসল। রাস্তায় এসে তাকে বললাম
-বাড়ীতে মা, পোয়াতি বউ, বাচ্চা রেখে রাতে যাত্রা দেখতে যাও কেন?
-পাড়ার সেবাইত যায়।
-তুমি যাবে না। তোমার বউ খুব চালাক। তোমাকে বিপদে ফেলবে। জেলের ভাত খাওয়াবে। বুঝতে পারছ?
-পারছি।
-আমি তোমাকে কয়েকটি ট্যাবলেট দিলাম। এইগুলি ফ্রি। কিন্তু বাড়ীতে গিয়ে মায়ের কাছে বউকে শুনিয়ে বলবে ডাক্তারকে তিনশ টাকা ভিজিট দিয়েছি আর তিনশ টাকার ঔষধ কিনে আনলাম।
-বুঝছি স্যার। এই নিন আপনার তিনশ টাকা ভিজিট।
-তুমি এখান থেকে একশত টাকা নাও। এই টাকা দিয়ে রুস্তমের বেকারি থেকে কেক কলা নিয়ে যাও। রাতে বউকে আদর করে এগুলি খাওয়াবে। আগামীকাল আমাকে এসে জানাবে।
– কেউ যদি জিজ্ঞেস করে রোগের নাম কি?
-বলবে মেলিংগারিং।

পরেরদিন লোকটি এসে হাসতে হাসতে আমাকে জানাল
-স্যার, আপনি খুব ভালা ডাক্তার। আমাকে বাচাইছেন।
-তোমার বউ রাতে খেয়েছিল?
-খেয়েছিল মানে! সব কেক ও কলা রাক্ষসের মত একাই খেয়েছে। অনেক রাত পর্যন্ত আমরা গল্প করেছি। বলেছি আর কোনদিন তাকে রেখে কোথাও রাত কাটাব না। খুবই খুশী।

এখনো সেই কথা আমার মনে পড়ে। ইচ্ছা করলে ঝামেলা এড়ানোর জন্য বরিশাল পাঠিয়ে দিতে পারতাম। তাতে গরীব লোকটির আর্থিক ক্ষতি হত। তাছাড়া তার সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট হত না। আমি তার রোগ ধরেছিলাম মেলিংগারিং। অর্থাৎ রুগীর ভান ধরা। আমি জানতাম রুগী রুগীর অভিনয় করছে। রুগীও জানে ডাক্তার ঠিকই তার ভান ধরা টের পেয়ে ডাক্তারের অভিনয় করছে। নবীন ডাক্তার হিসাবে আমার একটা চেলেঞ্জও ছিল এই রুগী যেভাবেই হউক সারিয়ে তোলা। আমি পেরেছিলাম।
===
ডাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
১৬/১২/২০১৭

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.