মর্জিনার বিয়ে

মর্জিনার বিয়ে
(গ্রামের কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

মর্জিনার বাবা দীর্ঘদিন সৌদিআরব শ্রমিকের চাকরি করেন। পাঁচ বছর পর পর তিনি ২ মাসের জন্য দেশে আসেন। বিয়ের ২ মাসের মধ্যেই তিনি বিদেশ গেছেন। প্রথমববার যখন তিনি দেশে আসেন তখন মর্জিনা পেটে আসে। দ্বিতীয়বার যখন দেশে আসেন তখন মর্জিনার ছোট ভাই পেটে আসে। মর্জিনারা এক ভাই এক বোন। বাবার পাঠানো টাকায় সংসার ভালোই চলে তাদের। মর্জিনা এস এস সি ফেল করার পরই আত্বীয় স্বজন বিয়ে দেয়ার জন্য উঠে পরে লাগে। চার কিলোমিটার দূরের গ্রামে এস এস সি ফেল এক ছেলের কাছে মর্জিনাকে বিয়ে দেয়া হয়। মর্জিনার শশুর শাশুড়ি কেউ বেচে নেই। মর্জিনার স্বামীর বড় ৬ বোন। বড় নোনাশ স্বামী নিয়ে মর্জিনার শশুর বাড়িতে থাকেন। অন্য বোনগুলি যার যার স্বামী বাড়ি থাকেন। মর্জিনার বিয়ের সর্ত্য ছিল জামাইকে বিদেশ পাঠাতে ১ লাখ টাকা দেয়া। বিয়ের সময় মর্জিনা নাকে, কানে গলায় মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ টাকার গহনা পেয়েছিলো। মর্জিনার স্বামী খুব ভালো ছেলে। বড় বোনদের কথার বাইরে সে কোন কাজ করে না। মর্জিনার বাবার দেয়া ১ লাখ এবং বাকী টাকা বোনদের কাছ থেকে সুদী করে মর্জিনার স্বামী দুবাই চলে যায় শ্রমিকের চাকরি নিয়ে বিয়ের দুই মাস পরেই। কিছুদিন বাবার বাড়ি, কিছুদিন স্বামীর বাড়ি থাকতে থাকলো মর্জিনা। নোনাশের সমস্ত কাজ করে দিতে হতো মর্জিনাকে। টাকা পয়সা পাঠাতো ঐ নোনাশের ব্যাংক একাউন্টেই। স্বামী বাড়ি থাকে না গহনা পরে কি হবে অজুহাত দেখিয়ে ঋণের টাকা পরিশোধ করার জন্য নোনাশ মর্জিনার সব গহনা বিক্রি করে দেন। মর্জিনা কয়েকটা ইমিটেশনের গহনা পরে থাকে। ধীরে ধীরে নোনাশদের সাথে মর্জিনার দূরত্ব বাড়তে থাকে। ফোনে মর্জিনার স্বামীর কান ভারী করতে থাকে নোনাশেরা।

এক মাসের ছুটি নিয়ে মর্জিনার স্বামী দেশে আসে। বিশ্বাস অবিশ্বাসের মনোমালিন্যে কেটে যায় তাদের ছুটির দিন রাতগুলি। দুবাই ফিরে গিয়ে প্রায় ১ টি বছর সে মর্জিনার সাথে যোগাযোগ করে নাই। সমাজ ব্যাপারটি বুঝতে পেরে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রস্তাব দেয়। বোনদের সালিশে ডাকা হয়। বোনরা সবাই এক কথা বললেন “আমাদের ভাই থাকে বিদেশ। ভাই আমাদের কথা শোনে না। আপনারা যা করতে চান করেন।” সালিশে সাব্যস্ত হলো মর্জিনার বিয়েতে দেয়া ১ লাখ টাকা ফেরৎ ও বিবাহ বিচ্ছেদ। বোনরা গহনা বেচা টাকা থেকে ১ লাখ টাকা ফেরৎ দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ সম্পাদন করালো।

মর্জিনাদের গ্রামের আব্দুল মজিদ ১৫ পারার হাফেজ হয়ার পর আর পড়তে পারে নাই। এতিম গরীব ছেলে। মক্তব পড়িয়ে কিছু টাকা পান। আর মসজিদে জুম্মার নামাযে ইমামতি করে কিছু পান। পাড়ার মেম্বর ঘটকালী করলেন মর্জিনার জন্য। মজিদ বললো “বিয়েতে দেন মোহর দিতে আমার টাকা নাই। সামান্য নাক ফুল ও দশ হাজার টাকা দেয়া ছাড়া আমার সামর্থ্য নাই। সাব্যস্ত হলো ১০ হাজার টাকা দেন মোহরানায় মজিদের সাথে মর্জিনার বিয়ে। আগের স্বামী থেকে ফেরৎ পাওয়া ১ লাখ টাকা দিয়ে গলায়, হাতে ও কানে গহনা বানানো হলো। এই গহনা এখন কেউ বিক্রি করতে পারবে না। কারন, এই গহনা দিয়েছেন মর্জিনার বাবা। গরীব হলেও এখন মজিদ ও মর্জিনার দিন কাটে সুখে।
১৮/৩/২০১৯
ময়মনসিংহ
বি:দ্র: নামগুলি কাল্পনিক।