মাগনা কামলা

মাগনা কামলা
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় মাগনা কথাটার অর্থ ছিল ফ্রি বা মুল্যবিহীন। কামলা মানে ছিল যিনি অন্যের কাজ করে দেন। যিনি কাজ করে দিয়ে টাকা নিতেন তাকে বলা হতো টেহার (টাকার) কামলা। যিনি কাজ করে দিয়ে টাকা নিতেন না তাকে বলা হতো মাগনা কামলা। যিনি এককালীন টাকা নিয়ে একই বাড়ীতে সারাবছর কাজ করতেন তাকে বলা হতো বছরকারী কামলা। যিনি অভাবের সময় কিছু টাকা অগ্রিম নিয়ে রাখতেন কাজের সময় কামলা দেয়ার চুক্তিতে তাদের বলা হতো ঠুকা কামলা। যারা দলবদ্ধভাবে মাঠে কাজ করতেন তাদের বলা হতো ছাটা কামলা। পাড়ার ধনি-গরীব সবাই মিলে ছাটা বাঁধতেন। এই ছাটায় ১৮/২০ জন কামলা থাকতেন। পালাক্রমে তারা একেকদিন একেকজনের ক্ষেতে কাজ করতেন। যার নিজের ক্ষেত ছিল না তিনি একদিন সবগুলি একজন ধনি লোকের কাছে বিক্রি করে দিতেন। সেদিন তিনি ১৮ কামলার টাকা একসাথে পেতেন। ছাটা কামলাগণ একসাথে গান গেয়ে গেয়ে কাজ করতেন। এইগানগুলিকে বলা হতো ছাটা গান বা ধুয়া গান। ছাটাগান আমাদের এলাকার ঐতিহ্য বাহী গান। এটা গাওয়ার আলাদা ধরন আছে। বাংলার ফোকগান সংগ্রহকারীগণ এই গান সংগ্রহে রাখতে পারেন। এই গান হারিয়ে যাচ্ছে। সারাসিয়ার গাদু ভাইয়ের কাছ থেকে এই গান সংগ্রহ করতে পারেন। এই গানের মাধ্যমে তারা নানারকম কিস্যা কাহিনী শুনাতেন। ইমাম হোসাইন (রা:) কারবালায় শহীদ হওয়ার কাহিনী আমি এই ছাটা গানে শুনেছি। গানে একটা সাধারণ বোল ছিলো “এ এহে এ এ “। শত শহীদের বিনিময়ে যখন ইমাম হোসাইন (রা:) ফোরাত নদীতে নেমে পানি পান করার জন্য অঞ্জলি ভরে পানি নিলেন তখন শহীদদের কথা স্মরন করে পানি পান করতে পারছিলেন না। মনের দু:খে তিনি বলছিলেন “এ পানি খাব কেমনে!” গানে এই লাইন বলার পর ছাটারা ধীর কন্ঠে বলতেন “এ এহে এ এ।” যমুনার চর অঞ্চল থেকে কিছু কামলা আসতেন ধান কেটে দিতে তাদের বলা হতো চৌরা বা দাওয়াইল্লা কামলা। ময়মনসিংহের আলাপসিংহ অঞ্চল থেকে কিছু কামলা আসতেন ধান রোপনের সময় তাদের বলা হতো আলকসিংগা কামলা। হঠাৎ কোন ক্ষেতের ফসল একসাথে পেকে গেলে এত কামলা একসাথে পাওয়া যেতো না। তখন পাড়ার সবাই মিলে তার ফসল কেটে দিতেন মাগনা মাগনা। এই মাগনা কামলাদের খুব ভালোভাবে খাইয়ে দিতেন ফসলের মালিক। ডেকড়া মোরগ জবাই করতেন। খির পায়েস রান্না করতেন। সবাই মিলে আনন্দ করে খেতেন মাগনা কামলারা।

আমি ১৯৭৭ সনে এস এস সি পরীক্ষা শেষে রেজাল্ট বের হয়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত গ্রামে বাড়ীতেই ছিলাম। কোন কাজ ছিল না আমার। বসে বসে রেডিও শুনতাম। এমনি এক দুপুরে আমি ছোট কাক্কু মরহুম আ: সালাম তালুকদারের বাইর বাড়ী বসে রেডিও শুনছিলাম। ঐদিন ছোট কাক্কু মাগনা কামলা নিয়েছিলেন। তাদেরকে কাছারি ঘরে খাবার দেয়া হয়েছিল পাটি বিছিয়ে। কাছারিঘর ভর্তি মাগনা কামলারা বসেছিলেন। ছোট কাক্কু দরজায় দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকলেন। মাগনা কামলাদের সাথে বসে খেতে বললেন। আমি মানা করলে জোড় করেই বসালেন। আমি মরহুম রিয়াজ উদ্দিন তালুকদার কাক্কুর (রিজু) ডান পাশে বসলাম। কাক্কুর বাম পাশে বসেছিলেন একজন টেহার কামলা। তার বাম পাশে একজন বছরককারী কামলা। অন্য সবাই ছিলেন মাগনা কামলা। আমি কোন কামলার পর্যায়েই পড়লাম না। আমার যেনো কেমন লাগছিল। কাজ না করেই কামলাদের সাথে খাচ্ছিলাম। টেহার কামলাগণ বেশী কাজ করতেন। তাই, তারা খেতেনও বেশী। বেশী না খেলে এনার্জি আসবে কোত্থেকে? ছোট কাক্কু খাওয়াচ্ছিলেন। আমাকে ও রিয়াজ উদ্দিন কাক্কুকে বেশী বেশী খাওয়াচ্ছিলেন। জোর করে রিজু কাক্কুর পাতে খাবার দিলে রিজু কাক্কু বললেন “অনেক খেয়ে ফেললাম। টেহার কামলার সমান খেয়ে ফেললাম। ” শুনে টেহার কামলা কাক্কুর দিকে ফেলফেলিয়ে তাকিয়ে রইলেন। আমি কাক্কুকে খোচা দিয়ে বুঝালাম যে পাশে টেহার কামলা আছে। কাক্কু লজ্জিত হলেন।

মাগনা কামলা নিয়ে একটা হাস্তর (গ্রাম্য গল্প) শুনেছিলাম। গ্রামের এক বৃদ্ধ কৃষক ছিলেন। বৃদ্ধের সংসারে তার স্ত্রী ছাড়া আর কেউ ছিল না। বৃদ্ধ লোকটির সব দাঁত পড়ে গিয়েছিল। মুখটা বেশ শুকনা ছিল। চাপাভাংগা ছিল। হাসার সময় হা করে হাসতেন। ফাহ করে সামান্য শব্দ হতো। একদিন তার ক্ষেতের সরিষা সব একযোগে পেকে গেলো। ছোটদেরকে বলা হতো পোলাপান। তিনি কয়েকজন পোলাপানকে বললেন “তোরা আমার সরিষা তুলে দে। তোদেরকে জাবা (সাদা চিনি) চিনি দিয়ে খির নাস্তা রান্না করে খাওয়াবো ।
যথারীতি পোলাপান মাগনা কামলা দিয়ে সরিষা তুলে দিলেন। এদিকে লোকটি খুঁজে কোথাও জাবা চিনি পেলেন না। পোলাপান একযোগে খেতে আসলে তিনি হেসে বললেন “চিনি নাইরে, পোলাপান। ফাহ। ”


তারিখ : ১/২/২০১৯ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ থেকে সখিপুর জার্নিতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.