মুক্তাগাছার মন্ডা

 

(স্মৃতির পাতা থেকে)

১৯৮৪ সনে আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ৪র্থ বর্ষে পড়তাম। সে সময় ৪র্থ বর্ষে কমিউনিটি মেডিসিন বিষয়ে পড়তে হতো। এই বিষয়ের অংশ হিসাবে দুই সপ্তাহ ফিল্ড ট্রেইনিং করতে হতো। উপজেলা লেভেলে গ্রামে গিয়ে বাড়ি বাড়ি স্বাস্থ্য অবস্থা জরিপ করতে হতো। আমাদের ব্যাচের ফিল্ড নির্ধারিত ছিল মুক্তাগাছার আশেপাশে। জরিপের বিষয় ছিল ঐ এলাকায় শিশু মৃত্যুর হার বের করা। আমাদের ক্লাশের সমস্ত ছাত্রছাত্রীদেরকে ৫টি ব্যাচে ভাগ করা ছিল। প্রতি ব্যাচে ছিলাম ৩৩ জন করে। আমি ছিলাম এ ব্যাচে।

মুক্তাগাছায় এ ব্যাচের যাতায়াত শুরু হল। কলেজ বাসে চড়ে সকাল দশটায় মুক্তাগাছা যেতাম। ফিল্ড সার্ভে করে হোস্টেলে এসে লাঞ্চ করতাম। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম শেষের দিন সবাই মিলে মুক্তাগাছার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি মন্ডা খাব। একদম আসল খাটি মালিকের কারখানা থেকে খাব। এর পূর্বে নতুন বাজারে কয়েকবার মন্ডা খেয়েছিলাম মুক্তাগাছার মন্ডা নামে। আসলে সেগুলি মুক্তাগাছার কিনা

সন্দেহ ছিল। এবার আসলটা খাওয়া হবে। আমরা বাড়ি বাড়ি ঘুড়ে বাড়ির মহিলা প্রধানের কাছ থেকে তত্ব সংগ্রহ করতাম। তত্ব সংগ্রহের জন্যে মেডিকেল কলেজ থেকে কোয়েশনিয়ার ফরম সরবরাহ করা ছিল। আমরা মহিলাদিগকে প্রশ্ন করতাম ফরমে দেয়া প্রশ্ন অনুযায়ী। উত্তরের ঘরে টিক চিহ্ন দিতাম। অনেক মহিলা ঠিক মতো উত্তর দিত না। তখন খুব রৌদ্র ছিল। অনেকের গ্রামে ঘুরাফিরা করা কষ্টকর ছিল। তাই দুই একজনকে দেখতাম বাড়িতে না গিয়ে আমগাছ জাম গাছ তলায় দাঁড়িয়ে পেপার বোর্ডের উপর ফরম রেখে মুস্কি মুস্কি হেসে কাল্পনিক ভাবে উত্তরের ঘরে টিক চিহ্ন দিয়ে আমাদের সাথে যোগ দিয়ে তৃপ্তির হাসি দিয়ে আমাদেরকে বোকা মনে করত। এখন তারা অনেক বিত্তের মালিক হয়েছে। তারা এখনো আমাদেরকে বোকাই মনে করে। আমি তাদের কে চালাক মনে করি। জ্ঞানী মনে করি না।

 

শেষের দিন মন্ডা কেনার জন্য আমরা সবাই চাঁদা জমা দিলাম আব্বাসের কাছে। কত টাকা করে দিয়েছিলাম মনে নেই। আব্বাস মন্ডা কারখানার মুল মালিকের কাছে স্পেশাল ভাবে ৩৩ জন মেডিকেল স্টুডেন্টদের জন্য মন্ডা বানানোর অর্ডার দিল। আমরা সবাই ফিল্ডের কাজ শেষ করে বাসে ফিরলাম। একযোগে মন্ডা দোকানের মালিকের ড্রইংরুমে গিয়ে বসলাম। বন্ধুদের মধ্যে নানা হাসিঠাট্টা গল্পগুজব চলছে। মন্ডা কাকা মন্ডা নিয়ে আসবেন। পেটে মন্ডার ক্ষুধা লেগেছে। এমন সময় এনামেলের বোলে করে মন্ডা কাকা মন্ডা এনে আমাদের মাঝখানে রেখে বললেন “ভাতিজারা, মন্ডা খাও। ” সাথে সাথে আলম টপ করে একটা মন্ডা মুখে দিয়ে গিলে ফেললো। সবাই একযোগে হুমরি খেয়ে যে যতটা পারে টপাটপ মন্ডা গিলে ফেললো। আমি কয়টা গিললাম মনে নেই। বোলের মন্ডা মুহুর্তের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল। সবাই সোজা হয়ে বসলাম সোফাতে। মন্ডা কাকা কর্নারে চেয়ারে বসাছিলেন। বললেন “ভাতিজারা, মন্ডা কেমন লাগলো?” আলম আমার দিকে তাকালো। আমি নজরুলের দিকে তাকালাম। নজরুল দীপকের দিকে তাকালো। দীপক স্বপনের দিকে, স্বপন জামিলের দিকে তাকালো। এভাবে সবাই সবার দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে মন্ডা কাকার দিকে তাকালো। আমি বললাম “আমি খুব তাড়াতাড়ি গিলে ফেলেছি। কেমন স্বাদ হয়েছিল বলতে পারছি না। ” সবাই আমার মতোই বলল। কাকা বললেন “মন্ডা খেতে হয় একটু একটু করে জিব্বা দিয়ে স্বাদ নিয়ে নিয়ে। ”

==

ডাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

২৬/৩/২০১৮

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.