রক্তের কি পরীক্ষা করলে কিডনির অবস্থা জানা যায়?

রক্তের কি পরীক্ষা করলে কিডনির অবস্থা জানা যায়?
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আজকাল অনেকেই কিডনি নিয়ে চিন্তিত। বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে কিডনি খারাপ হয়ে মরে যাওয়ার সংবাদ শুনেই এমনটি হচ্ছে। অনেকে কোমড়ে ব্যাথা অনুভব হওয়াতেই মনে করে নিচ্ছে তার কিডনি খারাপ হয়ে গেছে। অনেকেই ছাগল গরুর কিডনি দেখেছেন। স্বাধারণত এগুলিকে গুর্দা বলা হয়। ভালো নাম বৃক্ক। মানুষের কিডনি এমনই। পেটের পিছনের দিকে মেরুদন্ডের দুই পাশে পর্দা দিয়ে আবৃত দুইটি কিডনি থাকে। সীমের বীজের মতো একদিকে বাকা থাকে। কিডনি একটি নষ্ট হয়ে গেলেও আরেকটি দিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে। কিডনি রক্তের ছাকনির মতো কাজ করে। রক্ত ভালো মন্দ সব পদার্থ এনে কিডনিতে ছেড়ে দেয়। কিডনি তা বাছাই করে যেগুলি দরকারি সেগুলি রেখে অদরকারিগুলি প্রশ্রাবের সাথে বের কর দেয়। প্রশ্রাব কিডনিতে তৈরি হয়ে দুষিত পদার্থ সহ ইউরেটার নল দিয়ে পুত্র থলিতে এনে জমা করে। পুত্রথলি ভরে গেলে প্রশ্রাবের চাপ হয়।

ক্রিয়েটিনিন (Creatinine) শরীরের কোষে তৈরি হয়ে রক্তে প্রবাহিত হয়। এটা একটা দুষিত ক্ষতিকর পদার্থ। রক্তের সাথে কিডনিতে গেলে কিডনি এটাকে প্রশ্রাবের সাথে বের করে দেয়। যেহেতু সবসময় শরীরে ক্রিয়েটনিন তৈরি হচ্ছে সেহেতু সবসময়ই রক্তে কিছু ক্রিয়েটিনিন থাকবে। এটাই হল ক্রিয়েটিনিনের স্বাভাবিক মাত্রা। যদি কোন কারনে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী ক্রিয়েটিনিন তৈরি হয় অথবা কিডনির সমস্যার কারনে ক্রিটিনিন বের হতে না পারে তাহলে রক্তের ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বেড়ে যায়। এইজন্য কিডনি খারাপ হয়েছে কিনা তা জানার জন্য রক্তের ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা দেখা হয়। কিডনির অবস্থা জানার জন্য এটা একটা সস্তা, সাধারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেদের ক্রিয়েটিনিনের স্বাভাবিক মাত্রা ০.৬ থেকে ১.২ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার, আর মেয়েদের ০.৫ থেকে ১.১ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার। এক কিডনি বিশিষ্ট মানুষের বেলায় এর স্বাভাবিক মাত্রা হবে ১.৮ বা ১.৯ পর্যন্ত।

শিশুদের যদি ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা ২.০ ছেড়ে যায় অথবা বড়দের যদি এর মাত্রা ৫.০ এর উপরে উঠে যায় তবে মনে করতে হবে কিডনি মারাত্বক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তখন কিডনির বিশেষজ্ঞগণ রক্তের ব্লাড ইউরিয়া নাইট্রোজেন (BUN), ক্রিয়েটিনিন, পটাসিয়াম লেভেল এবং শরীরে কি পরিমান পানি জমা রয়েছে ইত্যাদি দেখে রক্ত ডায়ালাইসিস বা পরিশোধনের ব্যবস্থা নেন। অনেকের ভুল ধারনা যে ডায়ালাইসিস একবার শুরু করলে সারাজীবন ডায়ালাইসিসের উপরই থাকতে হয়। আসলে তা না। কিডনির অবস্থা যতদিন খুব বেশী খারাপ থাকবে বেঁচে থাকার জন্য ততদিনই ডায়ালাইসিস করতে হবে। যে কারনে কিডনি খারাপ হয়েছিল সেই কারন দূর হয়ে গেলে আর ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হবে না। নিয়মিত ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করে কিডনির অবস্থা জানা যাবে।

শুধু কিডনির নিজস্ব রোগেই কিন্তু কিডনি বিকল হয় না। রুগীর ডায়াবেটিস ও হাই ব্লাড প্রেসার থাকলে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি ডিজিজ হয়। কাজেই ডায়াবেটিস ও হাই ব্লাড প্রেসারের চিকিৎসা না করায়ে শুধু কিডনির চিকিৎসা করালে হবে না।

কোন কোন সময় সিমেটিডিন নামক ঔষধ খেলেও ক্রিয়েটিনিন বাড়তে পারে। আজকাল অনেকেই রাস্তাঘাট থেকে আবোলতাবোল ঔষধ কিনে খাচ্ছে। কে জানে যে এইসব থেকেও ক্রিয়েটিনিন লেভেল বাড়ছে কি না। খাদ্যে ভেজাল কেমিক্যাল খেলেও ক্রিয়েটিনিন বাড়তে পারে। হঠাৎ বেশী করে মাংস খেলেও হঠাৎ করে কিছুক্ষণের জন্য ক্রিয়েটিনিন বাড়তে পারে। কাজেই ক্রিয়েটিনিন বেশী পেলেই কিডনি নষ্ট হয়েছে বলা যাবে না।

এক্সিডেন্ট হয়ে শরীরের মাংস থেথলিয়ে গিয়ে মাংস গলে গিয়ে বেশী বেশী ক্রিয়েটিনিন তৈরি হয়ে লেভেল বাড়তে পারে। কিডনিতে ইনফেকশন হলেও ক্রিয়েটিনিন বাড়ে। মুত্রথলি থেকে মুত্রনালী দিয়ে প্রশ্রাব বের হয়। এই পথে কোন কারনে বাধা পেলে প্রশ্রাব বন্ধ হয়ে ক্রিয়েটিনিন লেভেল বাড়ে। পাথর আটকে গিয়ে, প্রস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে, টিউমার/ক্যান্সার হয়ে মুত্রনালী বন্ধ হয়ে ক্রিয়েটিনিন বাড়তে পারে।

9/6/2019

ময়মনসিংহ