রোগজীবাণু গুলে সরবত

রোগজীবাণু গুলে সরবত
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমরা যখন মেডিকেল কলেজে পড়তাম তখন বই পড়ে জেনেছি যে পাকস্থলীতে কোন জীবাণু থাকে না। মেডিকেল মাইক্রোবায়োলজি পড়েছি ১৯৮৪ সনে। এর ঠিক ১০ বছর পর ১৯৯৪ সনে আমি যখন এম ফিল থিসিস পার্ট-এর গবেষণা করার জন্য সেম্পলের খোজে বার্ডেম হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগে যাই তখন প্রফেসর আনিসুর রহমান স্যার বলেন “জাপানের বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন যে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি নামে এক প্রকার জীবাণু স্টোমাক ও ডিওডেনামের অনেক রোগের জন্য দায়ী। আপনি বাংলাদেশের রুগীদের নিয়ে গবেষণা করে দেখতে পারেন।” আমি এ ব্যাপারে রেফারেন্স সংগ্রহ করতে মহাখালীর ন্যাশনাল লাইব্রেরী ও আইসিডিডিআরবি লাইব্রেরী এবং শাহবাগের বার্ডেম লাইব্রেরী ও আইপিজিএমআর লাইব্রেরী থেকে কিছু আর্টিকেল ফটোকপি করে এনে সারারাত ধরে পড়লাম। পড়ে খুব ইন্টারেস্ট পেলাম। জানতে পারলাম জীবাণু বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকে জানতে পারতেন যে প্রাণীর পাকস্থলীতে এক প্রকার স্পাইরাল (পেচানো) জীবাণু পাওয়া যায়। এই জীবাণু মানুষের পাকস্থলীতে থাকে কি না কারো জানা নেই। ডাঃ বারী জে মার্শাল নামে একজন অস্ট্রেলিয়ান ডাক্তার ১৯৮৪ সনে যখন মেডিসিন ওয়ার্ডে কাজ করেন তখন তার ধারনা হয় যে এই স্পাইনাল জীবাণুই মানুষের পাকস্থলীর প্রদাহ বা গ্যাস্ট্রাইটিস ও আলসার বা খত করে। ১৯৮৫ সনে জার্নালে নিশ্চিত করে জানালেন যে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি নামের এক রোগজীবাণু পাকস্থলীর আলসার বা ঘা করে। কিন্তু কেউ তার এই থিউরি বিশ্বাস করলেন না। তিনি প্রাণীর পাকস্থলি থেকে জীবাণু কালচার করে প্রাণীর পাকস্থালীতে সংক্রমণ করে রোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হলেন। যেহেতু এই থিউরিটি মানুষের শরীরে টেস্ট করা বৈধ না সেহেতু তিনি নিজের উপরই এই পরীক্ষাটি চালালেন। তিনি এন্ডোস্কোপি পরীক্ষা করায়ে তার পাকস্থলীতে যে কোন রোগ নেই তা নিশ্চিত হলেন। আমি তখন এম বি বি এস ফাইনাল ইয়ারে পড়তাম। তিনি প্রাণীর পাকস্থালী থেকে জীবাণু নিয়ে ল্যাবরেটরিতে কালচার করলেন। তিনি কালচার করা জীবাণু এক গ্লাস পানিতে ঘুটা দিয়ে সরবত বানালেন। তিনি নিজেই এই জীবানু মিশ্রিত সরবত পান করলেন। তার মাকে জানালেন যে তিনি কি করেছেন। তার মা লক্ষ করলেন যে মার্শাল তিনদিন পর পেটের ব্যাথায় ভুগছেন। এন্ডোস্কোপি করে দেখা গেলো যে তার পাকস্থলীতে প্রদাহ (গ্যাস্ট্রাইটিস) হয়েছে। দিন দিন পেটের ব্যাথা বেড়েই চললো। কয়েকদিন পর আবার এন্ডোস্কোপি করে দেখা গেল যে তার পাকস্থলীতে আলসার হয়েছে। তিনি এক কোর্স এন্টিবায়োটিক খেয়ে সেরে উঠলেন। তার এই অব্জার্বেশনের ফলাফল আবার জার্নালে প্রকাশ পেলো। তার এই আজব অভিজ্ঞতার নিউজ গ্রুত ছড়িয়ে পড়তে লাগলো জীবাণুবিদ ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোজিস্টদের মাঝে। সেই আর্টিকেলটি সবচেয়ে বেশী পঠিত আরটিকেল। শুরু হয়ে যায় মানুষের শরীরে এই জীবাণুর পরীক্ষা নিয়ে প্রচুর গবেষণা বিশেষ করে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে।

আমি পড়ে দেখলাম বিজ্ঞানীরা, বিশেষকরে জাপানী গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টরা নিশ্চিত হয়েছেন যে এই হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি জীবাণুই ক্রনিক গ্যাস্ট্রাইটিস, গ্যাস্ট্রিক আলসার, ডিওডেনাল আলসার (পেপ্টিক আলসার) এমনকি গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারের জন্য দায়ী। আমার মাথায় প্রশ্ন এলো “বাংলাদেশেও কি পাকস্থলীর রোগগুলির জন্য এই জীবাণু দায়ী? এই দেশেও কি এই জীবাণু আছে?”

আমি পিজির মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে গিয়ে পুরাতন থিসিসগুলির শিরোনাম পড়ে দেখলাম কয়েক বছর আগে একজন থিসিস স্টুডেন্ট প্রাণীর পাকস্থলী থেকে এই জীবাণু আইসোলেট করেছেন। তিনি এখন দেশ ত্যাগ করেছেন। এর বেশী কিছু আমি জানতে পারলাম না। আমার এই কথাগুলি আমার থিসিস গাইড অধ্যাপক বি আর খান, অধ্যাপক বদরুল ইসলাম ও অধ্যাপক এম কামাল ও অধ্যাপক অসীম রঞ্জন বরুয়া স্যারগনকে জানালাম। সবাই খুব ইন্টারেস্ট পেলেন। পিজির গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মাহমুদ হাসান স্যারের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিলেন বি আর খান স্যার। আমি গিয়ে পরিচয় দিয়ে বিস্তারিত জানালাম। তিনি খুব আগ্রহ দেখালেন। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন “আমরা আপনাকে গ্যাস্ট্রিক বায়োপ্সি দেব যত লাগে। আপনি রিসার্চ করেন।” শুরু হলো আমার গবেষণা। আমার গবেষণার শিরোনাম দিলাম “এসোসিয়েশন অব হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি উইথ গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সার এন্ড আদার গ্যাস্ট্রোডিওডেনাল লিসন্স।” আইপিজি এম আর ও বার্ডেম-এর গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগ থেকে এন্ডোস্কপি করার সময় বায়োপ্সি সেম্পল নিতাম। আইপিজিএম আর হিস্টোপ্যাথলজি ল্যাব, ধানমন্ডিতে অবস্থিত প্রফেসর কে এম নজরুল ইসলাম স্যারের দি ল্যাবরেটরি ও অধ্যাপক সৈয়দ মোকাররম আলী স্যারের ডেল্টা ল্যাবরেটরি থেকে পাকস্থলীর স্পেসিমেন আনতাম। হাটখোলা মার্কেট থেকে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি ডিটেকশন ও কালচার করার জিনিসপত্র আনতাম। কালচার করার জন্য বার্ডেম-এর ল্যাবরেটরি ব্যবহার করলাম। আমার সাথে গবেষণায় যোগ দিলেন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজির একজন রিসার্চার ও পিজির গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের পি এইচ ডি রিসার্চার ডাঃ মিয়া মাসুদ ভাই। আমরা কালচার মিডিয়ায় বাংলাদেশে প্রথম হিউম্যান স্টোমাক থেকে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি কালচার করলাম। সেদিন নিজেকে বিজ্ঞানী বিজ্ঞানী মনে হলো। কালচার মিডিয়ার জীবাণুর কলোনির ছবি তুললাম আরিফ ভাইর এনালগ ক্যামেরা দিয়ে। আনন্দ পেলাম। ইতিমধ্যে ঢাকায় প্রফেসর আজাদ খান স্যারের নেতৃত্বে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি গবেষণা গ্রুপ নামে একটা টিম গঠন করা হয়েছিল। সেই টিমের মিটিং-এ এই জীবানুর প্লেট দেখানো হলো। সর্ট নিউজ জানিয়ে দেয়া হল বিশ্ব হেকিকোব্যাক্টার পাইলোরি রিসার্চ গ্রুপে। কালচার মিডিয়ার জীবাণু স্টেইন করে ও হিস্টোপ্যাথলজির স্লাইড স্টেইন করে দেখানো হলো আমার গাইডগনকে। সবাই আগ্রহ নিয়ে কাজ করতে থাকলাম। অবশেষে আমার থিসিস প্রেজেন্ট করা হল ১৯৯৫ সনের জুলাই ফাইনাল পরীক্ষায়। আমার পরীক্ষায় এক্সটারনাল এক্সামিনার হিসাবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক কে এম নজরুল ইসলাম স্যার ও অধ্যাপক সৈয়দ মোকাররম আলী স্যার। আমাকে থিসিস পার্টে ৭৫% নাম্বার দিয়েছিলেন।

এম ফিল পাস করার পর আমি থিসিসের রেজাল্ট সংক্ষেপে লিখে গবেষণা নিবন্ধ আকারে বাংলাদেশ জার্নাল অব প্যাথলজিতে জমা দেই। যা পরবর্তী সংখ্যায় প্রকাশ পায় [Association of Helicobacter Pylori (H. pylori) with Gastric Cancer and Other Gastroduodenal Lesions.
MSI Talukder, BR Khan, B Islam, M KamaI, AR Barua,. K Hassan, and M Hassan.
Bangladesh J Pathol. 1996; 11:13-17]।

পাস করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে প্রভাষক পদে দ্বিতীয় বার যোগদান করলাম। পরেরবার পাঠ্য বইয়ে দেখতে পেলাম পেপ্টিক আলসার ও গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারের সাথে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি জীবাণুর সম্পর্ক আছে। সেই থেকে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি নিয়ে বইয়ে বিস্তর লিখা হচ্ছে। এখন প্রায় সব ডাক্তারই জানেন যে এই জীবাণু দিয়ে স্টোমাক ও ডিওডেনাম-এর রোগ হচ্ছে। এবং পেপ্টিক আলসার রোগে এন্টিবায়োটিক দেয়া হচ্ছে।

ছোট বেলায় আমরা জানতাম বেশী বেশী ঝাল খেলে গ্যাস্ট্রিক রোগ হয়। এখন জানি জীবাণু দিয়ে এই রোগ হয়। আমার মা ইন্তেকাল করেছেন আমি মেডিকেলে ভর্তি হয়ার আগের বছর। আমি দেখেছি তিনি পেটের ব্যাথায় খুব কষ্ট পেয়েছেন। তিনি বেশী বেশী ঝাল খেতেন। তাই সবাই মনে করতেন ঝাল খাওয়ার জন্যই পেটে প্যাথা হচ্ছে। ঝাল তো অনেকেই খেতেন। সবাইকে পেটের ব্যাথা হতে দেখি নি। গ্রামের যারা গরীব অথবা কৃপ্টা ধনী মানুষ ছিলেন শুনেছি তারা পান্তাভাত পাতে নিয়ে শুক্না মরিচে একটা কামড় দিয়ে হা হু করে প্লেটের সব ভাত খেয়ে ফেলতেন। মাছ মাংস খোজার চেস্টাও করতেন না। তাদের আমি গ্যাস্ট্রিক হতে শুনি নি। তাই, মার্শালের থিউরি এখানেও খাটে। মার ব্যাথাটা ছিল নাভীর ঠিক উপরে। মা বলতেন কলিজার গোড়ে। আমি ডাক্তার হয়ে বুঝেছি জায়গাটা ছিল ডিউডেনাল পয়েন্ট। মার খুব সম্ভব ডিউডেনাল আলসার হয়েছিল। মাকে হাট থেকে গ্যাস্ট্রিকের বোতল এনে দেয়া হতো। ব্যাথা কিছুটা কমতো। কিন্তু ভালো হতো না। ভালো হতো যদি এন্টিবায়োটিক দেয়া হতো। কারন, মার আলসার হয়েছিল হ্যালিকোব্যাক্টার পাইলোরি জীবাণু দিয়ে। মা হয়তো এই জীবাণু পানির সাথে পান করেছিলেন। আর এই জীবাণু মার্শাল পান করেছিলেন সরবত বানিয়ে।

ইদানীং বারী জেমস মার্শাল সম্পর্কে আরো জানতে ইন্টার্নেটে সার্চ দিয়েছিলাম। জানতে পারলাম, তিনি ১৯৫১ সনে, আমার জন্মের ১০ বছর আগে, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। লেখাপড়া করেন পার্থ শহরে। চাকরি ও বসবাস তিনি পার্থেই করেছেন। তিনি ১৯৭৪ সনে এমবিবিএস পাস করেন। মেডিকেল মাইক্রোবায়োলজি বিষয়ে তিনি বিশেষজ্ঞ হন। ১৯৮২ সনে তিনি প্রাণীর স্টোমাক থেকে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি ল্যাবরেটরিতে কালচার করেন। ১৯৮৪ সনে তিনি থিউরি দেন যে মানুষের স্টোমাকে পেপ্টিক আলসার হওয়ার জন্য এই জীবাণু দায়ী। কিন্তু প্রাণীর উপর এক্সপেরিমেন্ট করে তিনি এটা প্রমান করতে ব্যর্থ হন। মানুষের উপর এটার এক্সপেরিমেন্ট করতে লিগাল অনুমতি না পেয়ে নিজের উপরই এক্সপেরিমেন্ট চালান। এবং নিজের পেটে আলসার বানাতে সক্ষম হন। এন্টিবায়োটিক খেয়ে আলসার ভালো করতেও সক্ষম হন। তার থিউরি প্রমাণিত হয়। সারা বিশ্বে এই নিউজ ছড়িয়ে পড়লে গবেষণায় লেগে যায় বিজ্ঞানীরা। শ্বতসিদ্ধ হয় যে পেপ্টিক আলসার ডিজিজ ও গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারের জন্য এই জীবাণুর অন্যতম ভুমিকা আছে। তাই তিনি অনেক পুরস্কার পান। ২০০৫ সনে তিনি মেডিসিনে নোবেল প্রাইজ পেয়ে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিতি লাভ করেন। যিনি বিজ্ঞানকে প্রমানের জন্য একগ্লাস রোগজীবাণুর সরবত পান করেছিলেন। স্মরণীয় বিজ্ঞানী বারী জেমস মার্শাল। যাকে অনুসরণ করে আমি এক সময় তারই শিখানো গবেষণা আমার দেশে করেছিলাম।


তারিখ : ১/৪/২০১৯ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ- কিশোরগঞ্জ – ময়মনসিংহ জার্নি