লেপ তোষকের কারিগর

লেপ তোষকের কারিগর
(সামাজিক ছোট গল্প)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

শীত এসে গেলো। নতুন করে লেপ বানাতে দিলাম। লাল সালু কাপড় ও খাটি কার্পাস তুলা পছন্দ করে দিলাম। যেদিন লেপ সরবরাহ করার কথা ছিল সেদিন লেপের দোকানে গেলাম। দেখলাম লেপ বানানো হয় নাই। তুলা ধুনানো হচ্ছে। তুলা ধুনা উড়ে উড়ে নাক দিয়ে ঢুকছিল। আমি একটু সরে দাঁড়ালাম। ধুনানো শেষ হলে লাল সালুর খোলে ভরা শুরু করলেন লেপের কারিগর । দোকান মালিক কাউন্টারেই ছিলেন। কর্মচারীকে বললেন আমাকে একটা চেয়ার দিতে। আমি তুলা ভরা দেখছিলাম চেয়ারে বসে। বললাম
– তুলা নিয়ে কাজ করেন। একটু সাবধানে থাকবেন।
লোকটি তুলাভরা শেষ হলে আমার দিকে তাকিয়ে রাগান্বিত হয়ে বললেন
– তুলা নিয়া কাম করি তাই কি মনে করেন? নিজেরা চোর আর সবারে চোর মনে করেন। সেই কখন থেকে ধরার জন্য চেষ্টা করতাছেন যে আমি খারাপ তুলা মিশাতাছি কি না। আপনে দেখলেও যা দিতাম, না দেখলেও তা দিতাম। তুলাওয়ালাদেরকে আপনারা চোর মনে করেন। আপনেগো মতো শিক্ষিত মানুষই বেশী চোর। আমরা টেলিভিশনে দেখতাছিনা, কেরা কত টেহা চুরি করতাছে কলমের পেচ মাইরা। একটা বালিশ কিন্না কত টেহা খরচ দেহায় দেহি নাই। একটা লেপের দাম কত দেহাইছে দেহি নাই? বালিশ তোষক কেনাকাটা কইরা কোটি কোটি টেহা মাইরা দেয় নাই? আপনে আইছেন তুলা চোর ধরতে। এহানে চোর ধরনের দরকার নাই। যান সাব বড় বড় চোর ধরেনগা। সবগুলায় চুরি করে আর সন্দেহ করে খালি তুলাওয়ালারে।
– আপনি এসব কি বলছেন?
– কি কইছি মানে? আপনি আমারে সন্দেহ করবেন আর আমি চুপ কইরা থাকমু। গরীব অইতে পারি। চোর না।
– আরে, আমি কি বললাম, আর আপনি কি মনে করলেন।
– আর আমারে বুঝাতে অইব না।
– আমার কথাটা শুনুন।
– কইন, আপনে কি কইবার চাইন।
– আমি একজন ডাক্তার। আমি লক্ষ করছি আপনি তুলা ধুনাচ্ছেন নাক মুখ খোলা রেখে। তুলার কণা আপনার নাকমুখ দিয়ে চলে যাচ্ছে ফুসফুসে। ফুসফুসে গিয়ে আটকে যাচ্ছে।
– আমি ১২ বছর ধইরা এই কাম করতাছি। আমার ফুসফুসে তো তুলা আটকে নাই।
– ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তুলাকণা দীর্ঘদিন পর্যন্ত জমা হতে হতে লাংগস-এ নিউমোকনিওসিস নামে একটা গ্রেনুলোমাটাস ইনফ্লামেটরি ডিজিজ হয়। তাতে লাংগসের কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়। অল্পতেই হয়রান লাগে। খুসখুসি কাশি হয়। শরীর শুকিয়ে যায়। অনেকে যক্ষা মনে করে। তখন আর লেপ বানানোর শক্তি পাবেন না।
– কি রোগের কথা কইলেন?
– নিউমোকনিওসিস।
– ইংরাজিতে না কইয়া বাংলায় কন।
– নিউমোকনিওসিস-এর বাংলা নাম কি হবে তা আমার জানা নেই। তবে বুঝলেই হলো।
– বুঝলাম না তো।
– ঔ যে বললাম, গ্রেনুলোমাটাস ইনফ্লামেশন।
– আবারও তো ইংরাজি কইলেন।
– ও, মানে, ফুসফুসে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোটা গোটা দানা বেঁধে অক্সিজেন ধরার ক্ষমতা কমে যায়।
– বুঝলাম। তয় কি করতে অইব?
– নাকেমুখে মাস্ক বেঁধে কাজ করতে হবে। ঔষধের ফার্মেসীতে ও ফুটপাতের দোকানেও আজকাল মাস্ক পাওয়া যায়। দাম মাত্র পাঁচ দশ টাকা।
– ও, আজকালকার পোলাপানরা দেখি মুখের মধ্যে কাপড়ের ঠোনা পরে। কতক পোলাপান কি যে পরে, কালা কাপড়ের মাঝখানে লাল জিহবার মত কাপড় লাগায়। কেমন বিশ্রি দেয়া যায়।
– ওরা আসলে ধুলাবালি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মাস্ক পরে। অল্প বয়সের পোলাপান তো। সব কিছুতেই ফ্যাসান খুঁজে। মাস্কেও একটু ফ্যাসান করে। আপনি সাদা কাপরের মাস্ক কিনে নিয়েন। টিস্যু কাপরেরও সুন্দর সুন্দর মাস্ক পাওয়া যায়। বেশী দিন বেঁচে থাকতে কার মন না চায়? মাস্ক পরে কাজ করুন। বেশী দিন বেঁচে থাকবেন। আর কতক্ষণ লাগবে সেলাই শেষ করতে?
– ডাক্তার সাব, কিছু মনে করুন না যে। না বুইঝা কইছি। আপনেরে কই নাই। টেলিভিশনের অফিসারগুলারে কইছি। আপনের জন্য একটা চা আনাই। দুধ চা, না রঙ চা?
– চা খাব না। আর কয় মিনিট লাগবে?
– আর পাঁচ দশ মিনিট লাগবে। আপনি চা খাইতে খাইতেই অইয়া যাবে।
– রঙ চা দিতে বলেন। আর, মনে রাখবেন, শিক্ষিত লোকের মধ্যে মাত্র গুটি কয়েক চোর আছে। সবাই না।
– এই, স্যারেরে একটা রঙ চা দেও।
২/১০/২০১৯ খ্রি.