শাব্দুলের অস্ট্রেলিয়া গমন

শাব্দুলের অস্ট্রেলিয়া গমন
(গ্রামের কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

গ্রামের বাড়ি গেলেই শাব্দুলদের বাড়ি গিয়ে খোজ খবর নেই। শাব্দুলরা অনেকগুলি ভাই বোন। আমি তাদের হিসাব মনে রাখতে পারি না। বাবার যে জমি জমা ছিল তা ভাগ করতে করতে একেকজনের ভাগে সামান্য পরিমাণ করে পরেছে। সেই টুকু বিক্রি করে করে একজন বাদে সবাই বিদেশে শ্রমিকের চাকরি নিয়ে পারি জমিয়েছে। যে ভাই দেশেই ছিল তার নাম কাবুল। সে ভ্যান চালিয়ে ও চা বিক্রি করে কোন মতে সংসার চালিয়ে দুই ছেলেকে লেখাপড়া করিয়েছে। তার এক মেধাবী ছেলে পড়ার ফাকে ফাকে টিউশনি করে ছোট দুই বোনকে পড়ার খরচ জোগিয়েছে। ছোট ছেলেটিও স্কুলে যায়।

গত চার মাস আগে আমি শাব্দুলদের বাড়ি গিয়ে শাব্দুলের মায়ের কাছে প্রশংসা করলাম
– শাব্দুলের যে ভাই দেশেই ছিলো সেই তো ভালো করলো। তার সব ছেলে মেয়েকেই লেখাপড়া করিয়েছে।
– কাবুলের ছেলে অনার্স-এ পড়ে। টিউশনি করে দুই বোনকে প্রাইভেট নার্সিং পড়াইছে। অনেক টাকা খরচা লাগে। ছোট দুই জনও স্কুলে যায়। তাদের খরচ কাবুল দেয়। বউটাও অসুস্থ। অদের অনেক কষ্ট।
-এই ঘরটা কার?
– এটা আমাদের শাব্দুলের।
-শাব্দুল কোথায় থাকে?
– আল্লাহ্‌য় দিলে শাব্দুলের ভালো চাকরি হয়েছে। আগে তো সৌদিআরব ছিল ১৫/১৬ বছর। প্রায় ১০/১২ লাখ টাকা জমিয়েছিল। সেই টাকা দিয়ে অস্ট্রেলিয়া গেছে। সেখানে গিয়ে ভালো চাকরি পেয়েছে। মালিক বাংলাদেশেরই। অস্ট্রেলিয়ায় তাদের বড় বড় মার্কেট আছে। সেই মার্কেটে সেলস ম্যানের চাকরি নিয়েছে। খুব আরামেই আছে। দুই মাসেই ভালো টাকা পাঠিয়েছে। কিছুদিন পর নাকি গ্রীণকার্ড পাবে। বউ বাচ্চা নিয়ে থাকতে পারবে।
(শাব্দুলের বউয়ের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো)
– শাব্দুল অস্ট্রেলিয়া গেলো কেমনে?
– তার সুমন্ধির এক বন্ধুর পরিচিত এক লোক অস্ট্রেলিয়া থাকে। বিরাট বড়লোক। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে লোক নেয় তার মার্কেটে চাকরি দেয়ার জন্য। অর সাথে আরো চার জন গেছে এবার। ভিডিও কলে আমরা মোবাইলে দেখেছি। কি সুন্দর সুন্দর দোকান!
– কোন পথে অস্ট্রেলিয়া গেছে?
– অনেক পেচ গোছ। অস্ট্রেলিয়া যেতে হলে আরো তিন দেশের ভিসা থাকতে হয়। আগে সৌদি ভিসা ছিল। এবার প্রথম গেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। এই ভাবে আরেক দেশে গেছে। তারপর গেছে অস্ট্রেলিয়া। দুই মাসেই প্রায় এক লাখ টাকা করে পাঠাইছে। আল্লাহ্‌য় দিলে আমাগো শাব্দুলেরই ভালো হলো। পাচ জনেই এমন টাকা পাঠিয়েছে। তার নাকি আরো লোক লাগবে প্রায় ১০০ জন।
– অস্ট্রেলিয়া যেতে কত খরচ হয়েছে?
– বেশী লাগে নাই। ১২ লাখ টাকা হাতে ছিল। তাই লাগছে। এক লাখ টাকা তো হাতেই এসে গেছে।
– দেখুন, অনেকে অভাবের ভয়ে দুই জনের বেশী সন্তান নেয় নি। আপনার অনেক সন্তান। সবাই চাকরি করছে। একজন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক হয়ে যাচ্ছে। আপনিই তো বেশী সুখী।
(শাব্দুলের মার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটলো)

এর দুই মাস পর গ্রামে গেলাম। শাব্দুলের মা আমাদের বাড়ি এলেন। বললেন
– তোমাকে আমাদের বাড়িতে যেতে হবে।
– কারো অসুখ?
– শাব্দুলের বউ মনে হয় বাঁচবে না। অনেকদিন হয় কিচ্ছু খায় না। বিছানায় পড়ে গেছে। শরীরে শক্তি নাই। চোখ মেলে তাকায় না। একটু একটু নুটানি জাল গিয়ে চামচ দিয়ে মুখে দেই। তাও গিলে না।
– কিভাবে কি হলো?
– ঐযে গত তারিখে তোমার কাছে বললাম না যে শাব্দুল অস্ট্রেলিয়া গেছে। আসলে সব ভুয়া। দালালরা মিথ্যা কথা বলে ৫ জনের প্রত্যেকের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা করে নিয়ে কোথায় যেন নিয়ে আটকিয়ে রাখে। তাদেরকে জিম্মি করে মিথ্যা কথা বলায়। তারা চাপ দেয় এই বলে যে তোরা যদি আরও ১০০ জন জোগার করতে পারিস তবে তোদের ছেড়ে দেয়া হবে। না হলে তোদেরকে গুম করে ফেলা হবে। সেই অনুযায়ী তারা দেশের আপনজনদের সাথে ভিডিও কলে কথা বলে। বিশ্বাস ধরানোর জন্য বেশী টাকা পাঠায়। সেই অনুযায়ী আরও ১০৪ জন গোপনে ১২ লাখ টাকা করে দিয়ে অস্ট্রেলিয়া রওনা দেয়। প্রথমে নৌকা যোগে এক দেশে যায়। সেখান থেকে আরেক দেশে যাবার জন্য ১০৪ জন একটি জাহাজে উঠে। কিন্তু সেই জাহাজে দালালরা কেউ না উঠাতে তারা জাহাজে উঠতে রাজি হয় না। তাদের সন্দেহ হয়। গোলমাল করে কয়েকজন যাত্রী জাহাজ থেকে নেমে দৌড়িয়ে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে দেখে দালালরা চম্পট দিয়েছে। জাহাজ তল্লাশি করে সবগুলিকে বেধে নিয়ে সেই দেশের জেলখানাতে রেখেছে। পুলিশ বলেছে “জাহাজে এমনভাবে তেলে ভরেছিল যে সমুদ্রের মাঝপথে গেলেই তেল শেষ হয়ে তারা মারা পরতো ১০৪ জন।”
– এই কথা কে বলেছে?
– যাত্রীদের এক জনে কিভাবে জানি ফেইস বুকে লিখেছে। এখন শাব্দুলদের কোন খোজ পাত্তা নাই। ১০৪ জনের পরিবারের লোকজনের এখন সন্দেহ আগের ৫ জন দালালদের সাথে যোগ সাজসে এই কাজ করেছে। শুনে শাব্দুলের বউ এখন মরে যাচ্ছে। নও, একটু দেখে আসো।
– তার মানে শাব্দুল অস্ট্রেলিয়ায় যায় নাই?
– আল্লাহ্‌য় জানে আমার বাবার ভাগ্যে কি হয়েছে।

২০/৩/২০১৯ ইং

বি:দ্র: নামগুলি কাল্পনিক।