সনাক্তকরণ চিহ্ন

সনাক্তকরণ চিহ্ন
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ছোট বেলা থেকেই আমি রেডিওর পোকা ছিলাম। খুব রেডিও শোনতাম। আমার বয়সী পোলাপানরা কেউ রেডিও শোনত না। কেউ কেউ শুনলেও পল্লীগীতি শুনতো। আমি পল্লীগীতি, নাটক, খবর ও খেয়াল শোনতাম। রেডিওতে খেয়াল শুরু হলে সবাই বন্ধ করে দিতো। আমি বন্ধ না করে শোনতাম মনোযোগ দিয়ে। দাদী বলতেন “এই, বন্ধ কর। তুই খেয়ালের কি বুঝস? খালি ভ্যা ভ্যা করে!” আমি বললতাম “খেয়াল বোঝার দরকার নাই। ভালো লাগে, তাই শুনি।” পাখির গান আমরা বুঝি না। কিন্তু পাখির গান ভালো লাগে। তাই শুনি। খেয়াল বুঝি না। কিন্তু খেয়ালের সুর ভালো লাগে। কোন খেয়ালটি কোন সুরে গাওয়া হচ্ছে ছোট বেলা থেকেই আমি বুঝতে পারতাম। কারন, রেডিওতে ঘোষণা হতো “এখন শুনবেন খেয়াল। রাগ ভৈরবী। বা এখন শুনবেন খেয়াল। রাগ মালকোশ।” ভৈরবী ও মালকোশ রাগ আমার ভালো লাগে এখনো। খবরের পর মাঝে মাঝে এমন ঘোষনা দিতো “নিখোঁজ সংবাদ। মিন্টু নামে ৬ বছরের একটি ছেলে ঢাকার গুলিস্তান এলাকা থেকে হারিয়ে গেছে। তার গায়ের রং শ্যামলা, হেংলা পাতলা গড়ন। সে বাংলায় কথা বলে। তার নিচের ঠোটে কাটা দাগ আছে।” নিচের ঠোটের কাটা দাগটিই হল সনাক্তকরণ চিহ্ন। ইংরেজীতে বলা হয় আডেন্টিফিকেশন মার্ক। আগে আইডি কার্ড তেমন ছিল না। কাজেই সনাক্তকরণ চিহ্নের খুব গুরুত্ব ছিল। কোন কিছুতে যেন ভুয়া কেউ ঢুকতে না পারে সে জন্য শরীরের সনাক্তকরণ চিহ্ন ভালো ভাবে লিখা হতো, দেখা হতো। শরীরের এমন একটা চিহ্নকে সনাক্তকরণ চিহ্ন হিসাবে গণ্য করতে হবে যেটা সারাজীবন শরীরে বিদ্যমান থাকবে এবং সহজে বের করা যায়। জন্মগত কালো তিল বা তিলক এবং কাটা দাগ হলো সনাক্তকরণ চিহ্নের জন্য উপযোগী। মুখমণ্ডলে এমন চিহ্ন হলে ভালো হয়। না থাকলে অন্য কোথাও হলেও চলবে। তবে সহজে যেন বের করা যায়। অনেকে না বুঝে লিখে থাকে নানা রকম চিহ্ন। যেমন, পিঠের মাঝখানে একটি তিল আছে/ উরার সামনে একটা সাদা দাগ আছে, ইত্যাদি। এই চিহ্ন বের করতে চেককারীর জন্য মুস্কিল, যাকে চেক করা হয় তার জন্যও মুস্কিল।

আমি নিজের সনাক্তকরণ চিহ্ন লিখি এমবি বিএস ভর্তির ফর্ম ফিলাপের সময়। লিখি “নিচের ঠোটে একটা কাটা দাগ আছে। আমাদের ভর্তি পরীক্ষা ও ভাইভা দিতে হয় নি। এসএসসি ও এইসএসসি পরীক্ষার প্রাপ্ত মোট মার্ক এর উপর মেধা তালিকা করে জাতীয় মেধা ও জেলাকোটার ভিত্তিতে আবেদনকারীদের থেকে মেডিকেলে ভর্তির জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল। এসএসসি ও এইচএসসি-তে ১০০০ মার্কের পরীক্ষায় প্রতিটিতে আমি যথাক্রমে ৭০৭ ও ৭১২ মার্ক পেয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে চাঞ্চ পাই। এটা ছিল আমার জন্য আল্লাহ্‌র এক অশেষ নিয়ামত। কিন্তু আমার ভয় একটা ছিল। সেটা হলো “যদি শারীরিক পরীক্ষায় আমাকে বাদ দিয়ে দেয়!” সারাক্ষণ টেনশন হতো। আমার শরীর রোগা রোগা ছিল। তাই, এমন চিন্তা ছিল।

আমার নিচের ঠোটে কাটা দাগ হলো কেমনে সেটা একটু বলে নেই। ক্লাস ফোরে যখন পড়তাম স্কুল থেকে এসেই বিকেলে খেলতে যেতাম। আমাদের বাড়ির উত্তরে ঘোনার টানের খেতটা সমতল ও নরম ছিল। গাছি (জালা) তোলার পর ওটাতে দাগ দিয়ে আমরা টক টক (হাডুডু) খেলতাম। বিকেলে টকটক খেলছিলাম হাফপ্যান্ট পরে। মজি ভাই (মজিবর রহমান তালুকদার) দম দিচ্ছিলেন। আমার মাথা ছুতে আসতেই তার পা ধরে ফেলি। মজি ভাই খুব জোরে একটা পা ঝাকি মারেন। আমার মুখে লেগে উপরের দাঁত নিচের ঠোট ছিদ্র করে ফেলে। ছিলছিলিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। ঠোট চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি গিয়ে মাকে বলি। মা বলেন “খুব ভালো করেছে। আরেকটা লাথি মারলে ভালো হতো। গেছস ক্যা? কইছি না, টক টক খেলবি না?” তার পর পানি দিয়ে পরিস্কার করে মা ইন্ডিয়ান বাম (ব্যাথানাশক মলম) লাগিয়ে দেন। অন্য কোন চিকিৎসা নেয়া হয় নাই। এমনি এমনি ভালো হয়ে গেছে। সেই ঘা শুকিয়ে একটা দাগ হয়েছে। সেইটাই আমার সনাক্তকরণ চিহ্ন।

আগেকার দিনের পোলাপানরা যেমন একসাথে খেলা করতো আবার মাঝে মাঝে ঝগড়া ও মারামারিও করতো। কেউ যদি মার খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে আসতো মায় আরও দুই চারটা থাপ্পড় দিয়ে বলতো “গেছস ক্যা? তুই কি করলি? ভাত খাস না?তর হাত ছিল না? কানতে কানতে আইছস!”

১৯৭৯ সনের ১৭ ডিসেম্বর আমরা ভর্তির উদ্যেশ্যে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে গেলাম। জানতে পেলাম আমাদের প্রথম মেডিকেল চেক আপ হবে। আবার ভয় ঢুকে গেলো। কোন কিছু তো ধরা পরবে না? পরিচিত ক্যান্ডিটের মধ্যে নজরুল ছাড়া আর কেউ ছিল না। বাকীরা যেমন যেমন করছে তেমন তেমন করতে লাগলাম। দোতলায় প্যাথলজি বিভাগে গেলাম। সেখান থেকে হাতে একটা টেস্টটিউব ধরিয়ে দিয়ে বললো বাথ রুমে গিয়ে প্রস্রাব নিয়ে আসুন। বাথ রুমে গিয়ে ভাবলাম প্রস্রাবে কি না কি ধরা পরে, প্রস্রাব না নিয়ে টেপ থেকে পানি নিয়ে যাই। আবার ভাবলাম, যদি ধরা পড়ে পানি এনে দিয়েছি তাইলে খবর আছে। তাই প্রস্রাব নিয়েই গেলাম। আগের দিন বাড়ি থেকে ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার হেটে এসেছিলাম। তাই প্রস্রাব একটু ঘাড় হয়েছিল। এনিয়েও টেনশন করলাম। সবাই বাম হাতে প্রস্রাবের টেস্টটিউব হাতে নিয়ে ল্যাবরেটরির সামনে দাঁড়ালাম। টেকনোলজিস্ট একটা একটা করে পরীক্ষা করে কাগজে লিখে দিচ্ছিলেন। আমরা আম জনতার মতো উদ্বিগ্ন হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখছিলাম। একটা টেস্টটিউবে নিল রংগের রিএজেন্ট নিয়ে টেকনোলজিস্ট স্পিরিট ক্যাম্পে জাল করে কয়েক ফোটা করে প্রস্রাব মিশিয়ে আবার জাল করছিলেন। এখন বুঝি ওটার নাম বেনিডিক্ট টেস্ট। একজনেরটা পরীক্ষা করার পর সে জিজ্ঞেস করলো “কি, ডায়াবেটিস আছে?” আমি বুঝলাম এটা ডায়াবেটিসের পরীক্ষা। সুগার আছে কিনা দেখা হয়। টেকনোলজিস্ট কোন কথা বলছিলেন না। শুধু লিখে দিচ্ছিলেন।

আমরা রিপোর্ট নিয়ে চলে গেলাম তৃতীয় তলায় মেডিকেল বোর্ডে। একজন একজন করে ডাকলেন বোর্ডে। আমার ঠোট দেখে সনাক্ত করা কনফার্ম হল। চোখ ও জিহ্বা দেখলেন। বুকে স্টেথোস্কোপ ধরে শুনলেন আমার হার্ট সাউন্ড। বাহুতে স্ফিগমোমেনোমিটার পেঁচিয়ে ব্লাড প্রেসার মাপলেন। তারপর পাশের গোপন রুমে ঢুকতে বললেন। আমার আগে যে প্রবেশ করেছিল সে লাজুক একটা হাসি দিয়ে ঠোটে ঠোট চেপে কি যেন এক ইংগিত দিয়ে বেরিয়ে গেলো। আমি প্রবেশ করলাম। একজন স্যার আমার হার্নিয়া ও হাইড্রোসিল আছে কিনা দেখলেন। কিছু নেই। যাও বলে বিদায় দিলেন। আমিও লাজুক একটা হাসি দিয়ে ঠোটে ঠোট চেপে পরের জনকে লজ্জার ব্যাপার ইংগিত দিয়ে বাইরে গিয়ে বন্ধুর সাথে চিপা চিপা কিছুক্ষণ হাসলাম। হয়ে গেলো আমাদের মেডিকেল চেক আপ। উত্তীর্ণ হলাম। বাইরে এসে আরও দুই একজনের সাথে হার্নিয়া হাইড্রোসিল দেখা নিয়ে হাসাহাসি করলাম। একজন বললো “এখানে তেমন কিছু দেখেন নাই। আর্মির কমিশন র‍্যাংকে মেডিকেল করার সময় পাইলস আছে কিনা তাও দেখা হয়।” ১৯ বা ২০ তারিখে ভর্তি হলাম এমবিবিএস প্রথম বর্ষে।

তারপর অনেকদিন কেটে গেছে। ডাক্তার হয়ে উপজেলায় মেডিকেল অফিসারের চাকরি করে লেকচারারশিপ পরীক্ষা দিয়ে পাস করে ১৯৯২ সনের জানুয়ারি মাসের ১৪ তারিখে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগে প্রভাষক পদে ফিরে এলাম। এই কলেজেই আমাদের সময়ের শিক্ষকদের মধ্য থেকে কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকা পেলাম। তারাও প্রভাষক ছিলেন। মেডিকেলে ভর্তির জন্য নতুন ছাত্রদের মেডিকেল চেক আপ করার দায়িত্ব পেলাম আমরা দুজন লেকচারার। আমি এবং আমার টিচার একজন ম্যাডাম। ছেলেদের শারীরিক পরীক্ষা আমি করতাম এবং মেয়েদের শারীরিক পরীক্ষা ম্যাডাম করতেন। কাগজপত্র আমি চেক করছিলাম। একজন একজন করে ছাত্র বা ছাত্রী সিরিয়াল অনুযায়ী প্রবেশ করছিল। কাগজপত্র দেখার পর পিছনের কক্ষে নিয়ে শারীরিক পরীক্ষা করা হচ্ছিল। একবার একই সাথে দুইজন ক্যান্ডিডেট প্রবেশ করলো। ম্যাডাম বললেন
– এই, একজন একজন করে আসো। তুমি বাইরে যাও। ও আসুক।
– আমি ক্যান্ডিডেট না।
– তাহলে?
– আমি ওর মা।
– ও তাই নাকি। আমি তো মনে করেছি ক্যান্ডিডেট। বসেন এখানে।

মেডিকেল চেক আপ হয়ে চলে গেলে আমি ম্যাডামকে বললাম
– মহিলা তো মাইন্ড করবেন না? আপনি তাকে এত ছোট মেয়ে মনে করলেন? ক্যান্ডিডেটদের বয়স এখন এই ১৮ কি ১৯ হবে। মহিলা মেয়ের মা। ৪০ তো হয়েছেই।
– দেখে তো সমান বয়সেরই মনে হলো। মাইন্ড করবেন না। বরং খুশিই হবেন।

এরপর একজন ক্যান্ডিডেট এলো আপাদমস্তক ঢাকা। চক্ষু ঢাকা। হাত পাও মোজা দিয়ে ঢাকা। আমি তার পেপার চেক করলাম। দেখলাম, সনাক্তকরণ চিহ্ন-এর ঘরে লিখা “কোন চিহ্ন নেই।” মেয়েটিকে আমি জিজ্ঞেস করলাম
– তুমি সনাক্তকরণ ঘরে কোন চিহ্ন নাই লিখেছ কেন?
– স্যার, আমার শরীরে কোন চিহ্ন নাই।
– নাই মানে? কোন না কোন স্থানে কোন না কোন চিহ্ন অবশ্যই আছে।
– নাই, স্যার।
– তুমি এভাবে পর্দা করে থাকো কোন ক্লাস থেকে?
– স্যার, ক্লাস এইট থেকে। তোমাকে পর্দা করার পরামর্শ কে দিয়েছিল?
– আমার আন্টি।
– আমরা খালা, চাচী ও ফুফুকে আন্টি বলি। তিনি তোমার কেমন আন্টি?
– আমার আপন ফুফু।
– তুমি ছোট বেলা থেকে নামাজ পড়?
– স্যার, আমি নামাজ পড়ি না।
– পর্দা কর, কিন্তু নামাজ পড় না?
– ফুফুর কথায় পর্দা করি।
– আচ্ছা, ঠিক আছে। ম্যাডাম, ওর শরীর পরীক্ষা করার সময় দেখবেন সনাক্তকরণ চিহ্ন কি।

ম্যাডাম তাকে নিয়ে পিছনের কক্ষে গেলেন। অনেক্ষন পর ফিরে এলেন। বললেন “আসলের ওর গায়ে কোন সনাক্তকরণ চিহ্ন নেই। ঠিক আছে ও যাক। হয়েছে।” মেয়েটি চলে গেলো।” আমি ম্যাডামকে বললাম
– আসলেই চিহ্ন নাই?
– সাদেক, কি আর বলব। আমি ওকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এমন সুন্দরি মেয়ে আমি আগে দেখি নি। অপুর্ব সুন্দর। আমি অনেক্ষন মুগ্ধ হয়ে দেখলাম। গায়ে কোন দাগ নেই, তিল নেই। ওর ফুফু ঠিক উপদেশ দিয়েছে। পর্দা ছাড়া এই মেয়ে চলাফেরা করা রিস্ক আছে।

আমি আর কথা বাড়ালাম না। সেই মেয়ে যেহেতু আমাদের মেডিকেলেই পড়েছে সেহেতু এখান থেকেই ডাক্তার হয়ে বের হয়েছে। কিন্তু কেউ দেখেনি মেয়েটিকে । শুধু দেখেছেন আমাদের একজন ম্যাডাম। সেই মেয়েটির শরীরে কোন সনাক্তকরণ চিহ্ন ছিল না।
৩/৮/২০১৯ ইং