সরল বিশ্বাসে সার্টিফিকেট

সরল বিশ্বাসে সার্টিফিকেট
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্রায় ৩১ বছর আগের কথা। সবেমাত্র আমার সরকারি চাকরি হয়েছে গ্রামে। উপজেলা থানা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। পুলিশি নিরাপত্তা ছিল কল্পনার বাইরে। নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজের কাছেই ছিল। এলাকার জনগনের সাথে খাতির দিয়ে মোটামুটি নিরাপদেই ছিলাম। একা থাকতাম একটা পরিত্যক্ত টিনসেড বাড়িতে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে। তাও ভয় পেতাম না। উঠানে চেয়ারে বসে গভীর রাত পর্যন্ত মেঘের ভিতর চাঁদের লুকোচুরি উপভোগ করতাম। অল্পদিনের এই জীবন ছিল জীবনের অন্যরকম এক অধ্যায়।

একদিন বিকেলে একজন যুবক এসে বললেন
– ডাক্তার সাব, আমার চাচার খুব পাতলা পায়খানা। দয়াকরে একটু দেখতে যেতে হবে।
– রুগী নিয়ে আসুন, দেখে দেই।
– রুগী আনার মতো না। আপনাকে কষ্ট করে আমার সাথে যেতে হবে।
– আপনার এলাকার স্বাস্থ্য সহকারীকে দেখান।
– এটা স্বাস্থ্য সহকারীর কেইস না। আপনাকে যেতে হবে।

আমি আর কথা না বাড়িয়ে যুবকের সাথে গেলাম। নিয়ম ছিল যিনি আমাকে কলে নিয়ে যাবেন তিনি আমার ব্যাগ বহন করে নিয়ে যাবেন এবং দিয়ে যাবেন। ভিজিট দেয়ার দায়িত্বও তার। রুগীরর বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে লোকটি বললেন
– ডাক্তার সাব, আমি বাড়ি যাব না। আপনি যান। রুগী দেখে আসুন। আমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকবো। আপনার ভিজিট আমি দেব। আমি আপনাকে পৌছিয়েও দেব।
– কেন, আমনি বাড়ি যাবেন না?
– সেই কথা আমি ফেরার সময় খুলে বলব। আপনি দেখে আসুন।
– যদি জিজ্ঞেস করেন আমাকে কে পাঠিয়েছে?
– বলবেন যে একজন এই বাড়ি দেখিয়ে বললেন যে এই বাড়িতে একজন ডাইরিয়ার রুগী আছে। তাই দেখে যাচ্ছি।
– এর রহস্য কি?
– রহস্য পড়ে বলবো।

আমি রুগী দেখে ফিরে এলাম। ফেরার সময় তার রহস্যের কথা জানতে চাইলাম। তিনি বললেন
– রুগী আমার চাচা। বাবার সহোদর ভাই। কিন্তু এত পাজি বেটা! সারাজীবন আমাদেরকে জ্বালিয়ে মারছে। আমাকে সহ্য করতে পাড়ে না। আমি ঐ বাড়ি যাই না। আমার বাবা নেই। হাজার সত্রু হলেও সে আমার চাচা। শুনছি চাচার যাওয়াদশা অসুখ। তার ছেলে নাই। এই সময় ভাতিজা হিসাবে আমি যদি ডাক্তার না ডাকি তাহলে কথা থাকে। আমি যদি আপনাকে নিয়ে বাড়ি যাই তাহলে সে আপনার চিকিৎসা নিবে না। আমি আপনার প্রেস্ক্রিপশন দেখে ঔষধ নিয়ে চাচীর হাতে দিব। চাচীকেও বলতে মানা করে দিব যে আমি এই কাজ করেছি।

এর কয়েকমাস পর সেই যুবক এক বিকেলে এলেন। আমি একা ছিলাম। তিনি বললেন
– ডাক্তার সাব, আমাকে চিনতে পেড়েছেন? আমি একদিন আপনাকে নিয়ে গিয়েছিলাম আমার চাচাকে দেখাতে।
– হে, চিনতে পেরেছি।
– ঐ যে, যে চাচাকে দেখলেন, সে কিন্তু আমার আপন চাচা। এত খারাপ লোক খুব কমই হয়। খারাপ লোক আমি সহ্য করতে পারিনা। ওর ডান চোখটা উপরে ফেলেছি। দেখেন নাই, ওর ডান চোখটা নাই। কেমন শয়তানের মতো দেখা যায়। এরপর বাম চোখটাও তুলে ফেলতে চেয়েছিলাম। তুলি নাই। কারন, এই অন্ধটাকে আবার কে টেনে নিবে। আমার চাচীটা কিন্তু ভালো মানুষ। আমি চোখ তুলতে খুব এক্সপার্ট।

(আমার গা রিম রিম করতে লাগলো ভয়ে)
– তা, বলেন। আজ কার অসুখের জন্য এসেছেন?
– অসুখ মানে হলো আমারই।
– কি সমস্যা?
– সমস্যা হলো, আমাশয় হয়েছে।
– পায়খানার সাথে বিজল পরে?
– পড়ে।
– রক্ত পড়ে?
– পড়ে।
– দৈনিক কয়বার পায়খানা হয়?
– কয়বার হয় তা গুণে দেখি নি। তয় ঘন্টায় ঘন্টায় পায়খানা হচ্ছে। মাঝে মাঝে কাপড় নষ্ট করে ফেলছি।
– শুনে মনে হচ্ছে ব্যাসিলারি ডিসেন্ট্রি।
– হতে পারে। আপনারা যা বলেন।
– জ্বর আছে?
– নাই।
– ব্যাসিলারি ডিসেন্ট্রিতে জ্বর হয়। আপনার তো দেখছি জ্বর নেই।
– সব সময় সব কেইসে সব কিছু পাওয়া যায় না। আপনি যা মনে করেন তার জন্য ঔষধ লিখে দিন।

আমি প্রেস্ক্রিপশন লিখে তার হাতে দিলাম। তিনি আমাকে ২০ টাকা ভিজিট দিলেন। তখন চেম্বারে এম বি বি এস ডাক্তারের ভিজিট ২০ টাকাই ছিল। এরপর তিনি বললেন
– ডাক্তার সাব, আগামীকাল উপজেলা কোর্টে আমার একটা হাজিরা আছে। এই অবস্থায় তো হাজিরা দিতে যেতে পাড়ি না। তাই আমাকে একটা সিকনেস (অসুস্থতার) সার্টিফিকেট দিন।

কিসের মামলার হাজিরা দিতে যাবেন তা জিজ্ঞেস করার সাহস আমার হলো না। মনে হলো যেন কিছু একটা উলটা পালটা জিজ্ঞেস করলে আমার ডান চোখটাই তিনি খুলে ফেলবেন। আমি আর কথা না বাড়িয়ে সরল বিশ্বাসে সিকনেস সার্টিফিকেট দিয়ে দিলাম। যুবক চলে গেলেন সালাম দিয়ে।

এর কয়েকদিন পর পাড়ার এক যুবক এসেছিলেন যেন কি কাজে। তিনি বললেন “স্যার, আপনি কিছুদিন আগে একজনকে একটা সিকনেস সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। সেই লোক সিক অবস্থায় কোর্টের এজলাসে প্রবেশ না করে বাইরে জানালার গ্রিল ধরে উকি দিয়ে দেখছিলেন আর শুনছিলেন যে কোন কোন স্বাক্ষী তার বিরোদ্ধে কি কি স্বাক্ষ দিচ্ছে। বিপক্ষের উকিল ম্যাজিস্ট্রেটকে সম্ভোধন করে বলেন ‘ইউর অনার, যে আসামীর জন্য ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার সিকনেস সার্টিফিকেট দিয়েছেন যে তিনি ব্যাসিলারি ডিসেন্ট্রি রোগে আক্রান্ত হয়ে তার চিকিৎসাধীন পুর্ণ বিশ্রামে আছেন তিনি ঐ জানালা দিয়ে উকি মেরে সবার স্বাক্ষ শুনছেন।’ ম্যাজিস্ট্রেট তৎক্ষণাৎ হুকুম দেন ‘এরেস্ট হিম।’ সাথে সাথে চারজন পুলিশ দৌড়াতে থাকে তাকে ধরতে। লোকটি মাঠের ভিতর দিয়ে দৌড়িয়ে বাজারে ঢুকে পড়ে। বিভিন্ন দোকানের চিপাচিপি দিয়ে লুকোচুরি করতে করতে এক সেলুনে ঢুকে চুল কাটাতে বসে যায়। পুলিশ খুজতে খুজতে সেই সেলুনে গিয়েই তাকে খপ করে ধরে ফেলে। অর্ধকাটা চুল নিয়েই লোকটিকে পুলিশ এজলাসে নিয়ে আসে। ম্যাজিস্ট্রেট হুকুম দেন তাকে হাজতে পুড়ে রাখতে।” আমি বললাম “লোকটি বলল তার রক্ত আমাশয় হয়েছে। তাই তাকে সরল বিশ্বাসে সার্টিফিকেট দিয়েছিলাম। সে যে শয়তানী করবে তা তো আমি ভাবি নাই। ”

পরের বৃহস্পতিবার আমি উপজেলা শহরে গিয়ে রাত্রিযাপন করলাম। মাঝে মাঝে ছুটির দিনে উপজেলায় গিয়ে রাত্রিযাপন করতাম। উপজেলার মেডিকেল অফিসারদের সাথে সময় কাটাতাম গল্প করে। সন্ধায় অফিসারস ক্লাবে যেতাম। সেখানে উপজেলার সব ধরনের অফিসারদের সাথে দেখা হতো, কথা হতো, বন্ধুত্ব হতো। আমি চা খেতে খেতে ম্যাজিস্ট্রেট-এর কাছে গিয়ে বসলাম। সেই যুবকের ঘটনাটা উল্লেখ করে বললাম
– ভাই, থানা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত গ্রামে একা এক পরিত্যক্ত বাড়িতে থাকি অনেক রিস্ক নিয়ে। এলাকার অধিকাংশ লোক ভালো। তারা আমাকে ভালোবাসে। যথাসাধ্য আমি তাদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকি। দুই চারজন খারাপ লোক আছে। তারা খুব ডেঞ্জারাস। তারা যদি কোন অসুস্থতার কথা বলে সিকনেস সার্টিফিকেট চায় আমাকে সরল বিশ্বাসে তা দিতে হয়। আমার সার্টিফিকেটের উপর বিশ্বাস করে বিচারকাজ না করাই ভালো।
– আমি বুজতে পেরেছি। আপনি কার কথা বলছেন। বেটাকে সাথে সাথে এরেস্ট করেছিলাম। ঠিক আছে, কোন সার্টিফিকেট সরল বিশ্বাসে দেন সেটি আমরা বুজতে পাড়ি। ওকে, আপনি স্টেশনে টেক্টফুলি থাকবেন। বাকীটা আমরা দেখবো।

সরল বিশ্বাসে সেই সার্টিফিকেট দেয়ার কথা আর সেলুন থেকে অর্ধচুলকাটা যুবককে ধরে আনার কথা মনে হলে আমার আজও হাসি পায়।
২০/৭/২০১৯ ইং