সেই বুড়ি আর নেই

সেই বুড়ি আর নেই
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ফজরের নামাজ পড়ে দুই পৃষ্ঠা বাংলা অর্থসহ কোরআন শরীফ পড়ে বেড়িয়ে পড়ি প্রাতঃভ্রমণে। স্ত্রী স্বপ্নাও তাই করে। আমরা দুজন একসাথে হাটি প্রায় ৪৫ মিনিট প্রতিদিন। কাজেই এইসময় দুজনে অনেক কথা বলার সুযোগ পাই। ইদানীং লক্ষ করেছি স্বপ্না আমার মতোই স্মৃতিচারণ করছে। আমিও তার সাথে যোগ দিচ্ছি তার স্মৃতিচারণে। গত এক বছর যাবৎ আমি ফেইসবুকে প্রায় ১৫০ টির মতো স্মৃতিচারণমূলক গল্প লিখেছি। সেগুলি সে পড়েছে। সেগুলি নিয়েও সকালে তার সাথে কথা হয়। দুইএকটিতে সে ত্রুটি ধরেছে। আমি বলেছি যে অনেকদিন পর লিখেছি। তাই দুইএকটি পয়েন্ট ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। কোন কোন সময় গল্পের ধারাবাহিকতা ঠিক রাখার জন্যও ঘটনার সামান্য পরিবর্তন করতে হয়। আমার লেখা পড়ে হয়তো তার মনেও জেগেছে আমার সাথে তার স্মৃতিচারণ শেয়ার করতে।

প্রথম চাকরির কর্মস্থল ছিল আমার বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়ন সাবসেন্টারে। ওখানে স্বপ্না আমার সাথে কিছুদিন ছিলো। এক রুগীকে আমার মায়ের মতো দেখা গিয়েছিল। আমার মা ছিলো না। সেই মাকে স্বপ্না শাশুড়ির মতো শ্রদ্ধা যত্ন করতো। সেই শাশুড়ির স্মৃতিচারণ করতে শুনেছি স্বপ্নাকে অনেকবার। বারবার আমাকে মনে করিয়ে দেয় তার খোজ নিতে। কিন্তু আমি খোজ নেই না। কেন নেইনা তার ব্যাখ্যা তাকে আমি দেই না। জানতে চাইলে এড়িয়ে যাই।

মাঝে মাঝে চরামদ্দির এক বুড়ি ভিক্ষুকের কথা সে মনে করে। বলে “বুড়িটা খুব ভালো ছিলো। আমরা ঢেকি শাক পছন্দ করতাম বলে সে আমাদের জন্য ঢেঁকিশাক নিয়ে আসতো। একদিন আমার দুইবার বমি হয়েছিল।এক রুগী জেনে গিয়েছিল। বুড়ি আমাদের বাসা থেকে সাহায্য নিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার চলে গিয়ে সেই রুগীর থেকে জানতে পারে যে আমি অসুস্থ। সে আমাকে দেখার জন্য আবার ঘুরে আসে।” এই কথাটা স্বপ্না কয়েকবার আমাকে বলেছে।

চরামদ্দি থেকে বদলী হয়ে আসি শেরপুর জেলার নকলা উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে। সেখানে হাসপাতাল কোয়ার্টারে দোতালার একটা ফ্লাটে থাকতাম। পাশের ফ্লাটে থাকতেন ডাঃ রফিক ভাই। ডাঃ রফিকুল আলম ভাই ছিলেন নকলাবাসী। তিনি ছাত্রজীবনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ও জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। সর্বশেষে তিনি ময়মনসিংহ বি এম এর সভাপতি ছিলেন। আমার নিচতলায় থাকতেন ডাঃ হাবীব ভাই। রফিক ভাইর নিচতলায় কয়েকজন অবিবাহিত ডাক্তার থাকতেন। বিবাহিত কিন্তু স্ত্রী নিয়ে আসেন নি এমন ডাক্তারও অবিবাহিতদের সাথে থাকতেন। বর্তমান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডাইরেক্টর (হাসপাতাল) প্রফেসর ডাঃ মোহাম্মদ আলী খানও তাদের সাথে থাকতেন। সে আমার সহপাঠী ছিলো এম বি বি এস-এ। আরেক ডাইরেক্টর ডাঃ আমিনুল ইসলামও সেখানে ছিলেন। সেখানে থাকতে থাকতেই তিনি বিয়ে করে ফেলেন। এইভাবে ডাঃ সন্তোষ দা ও ডাঃ সম্পদ দা বিয়ে করে ফেলেন। ডাঃ সামাদ ভাই ও ফ্যামিলি প্লানিং অফিসার লুৎফুল কিবরিয়া সোয়েব ভাই আমি চলে আসার পর বিয়ে করেন। আমার সহপাঠী ডাঃ নজরুল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলী হয়ে আসার পর বিয়ে করে। ডাঃ বিধান রায়ও চিটাগাং চলে যাওয়ার পর বিয়ে করে। ধরতে গেলে এই অবিবাহিতদের আমি ছিলাম ভাই আর আমার স্ত্রী ছিলো তাদের ভাবী। তারা প্রায়ই দল বেধে আমার বাসায় আসতেন। চা খেতে খেতে টেলিভিশন দেখতে দেখতে নানা গল্প করতেন। আমাদের প্রশংসা করতেন। খুশী করার জন্য না আসলেই তা তারাই জানতেন। বলতেন আমরা নাকি খুব সুখী দম্পতি।

নকলায় এক প্রায় শতবর্ষী বুড়ি ভিক্ষুক ছিল। এত বয়স হলেও তিনি চোখে ভালো দেখতেন। পরিষ্কার কাপড় পরতেন। শরীরও ছিল তেলতেলা পরিষ্কার। বৃদ্ধ হয়ে শরীরের চামড়া ঝুলে পড়েছিল। গালে ও চোখের কোনায় অনেক ভাজ ছিলো। দাত ছিল না একটিও। আমার বাসার দরজার সামনে পা মেলে বসে থাকতে দেখা যেতো প্রায়ই। আমি নিজ হাতে তাকে ভিক্ষা দিয়েছি কিনা মনে নেই। তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতেন দরজার সামনে। তিনি কখনো ভিক্ষা চাইতেন না। সবার বাড়িও যেতেন না। তিনি নাকি সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে ছিলেন। ভাগ্যের পরিহাসে তিনি ভিক্ষুক হয়েছিলেন। এসব আমি স্বপ্নার কাছ থেকে শুনেছি সকালে হাটতে হাটতে গল্প করার সময়। স্বপ্না সেই বুড়িকে খাবার দিতো। খেয়ে নিচে গিয়ে টিউবওয়েলে প্লেট পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখতেন। মাঝে মাঝে দেখতাম আমার ছোট্ট মেয়েটি বুড়ির গলা, গাল ও বাহুর ঝুলে পড়া চামড়া তার নরম হাত দিয়ে টিপে দিচ্ছে। চামড়া ধরে টেনে লম্বা করতেও দেখেছি তাকে। আমি দুপুরে হাসপাতাল থেকে বাসায় খেতে আসতাম। কলিং বেল টিপে দরজার সামনে দাঁড়াতাম। সামনে বসা বুড়ির দিকে তাকাতাম। বুড়ি আমার মুখের দিকে নিচ থেকে তাকিয়ে তার দাতের মুথুল্লা বের করে গাল, কপাল ও চোখের কোনার চামড়ার ভাজ কুঁচকিয়ে একটা তৃপ্তির হাসি দিতেন। সেই হাসির সৌন্দর্য আমি লিখে আপনাকে বুঝাতে পারবো না। যে দেখেছে সেই বুঝেছে। একদিন ডাঃ আমিনুল সাহেবরা বারান্দায় বসে গল্প করছিলেন। সেই বুড়ি সামনের গাছের ছায়ায় যেনো কি কুড়াতেছিলেন। আমিনুল সাবরাও জানতেন যে বুড়িকে আমার স্ত্রী যথেষ্ট সাহায্য করে। আচলভর্তি যে চাউল ও পিয়াজ মরিচ দিয়ে দেয় তাতে বুড়ির কয়েকদিন চলে যায়। বুড়ি নিজের রান্না নিজেই করে খেতেন। বুড়িকে দেখে আমিনুল সাবরাও মজা পেতেন। বলতেন “ভাবীর প্রিয় বুড়ি।” আমিনুল সাব ঠাট্টা করে বুড়িকে ইংলিশে প্রশ্ন করলেন “হাই, হাউ ডো ইউ ডো?” বুড়ি সেই রকম হাসি দিয়ে বললেন “পাতা কুড়াই।” কথাটা আমি নিজ কানে শুনি নি, হাসিটা আমি নিজ চোখে দেকি নি। আমিনুল সাব আমাকে বলেছেন হাসতে হাসতে। কিন্তু আমি যেনো শুনেছি। আমি যেনো দেখেছি।

আমি ১৯৯২ সনে জানুয়ারিতে নকলা থেকে চলে আসি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে। বুড়ি জানতেন না। চলে আসার পর স্বপ্না কয়েকবার আমাকে বলেছে “আসার সময় বুড়িটাকে দেখে আসতে পারলাম না।” আমি তাকে আশ্বস্ত করেছিলাম যে আমরা কিছুদিন পর নকলা গিয়ে সবার সাথে আমার দেখা করে আসবো। সেই কথামতো আমরা কয়েকমাস পর নকলা গেলাম। রফিক ভাইর স্ত্রী, আমাদের ভাবী বললেন ” আপনারা চলে যাবার পর অনেকদিন আপনাদের তালালাগানো বাসার সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা সেই বুড়ি বসে থাকতেন। আমি একদিন বলেছি যে এই বাসার লোকজন ময়মনসিংহ চলে গেছে বদলী হয়ে। শুনে বুড়ি বসে বসে অনেকক্ষণ কেঁদেছেন। এর পরও অনেকদিন এসে দরজার সামনে বসে বসে কেঁদেছেন। কিছুদিন হয় আমরা তাকে আসতে দেখি না।” স্বপ্না আমাকে বললো “চলো, আমরা বুড়িটার খোজ নিয়ে আসি।” হাসপাতাল কোয়ার্টার থেকে প্রায় ৩০০ মিটার পূর্বে বুড়িদের বাড়ি গেলাম। স্বপ্না বুড়ির সাথে কথা বললো। কিন্তু বুড়ি কিছু বুঝলেন না। বুড়ি চোখেও দেখতে পেলেন না। বুঝতে পারলাম তার পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার সময় হয়ে গেছে। স্বপ্না বুড়ির জন্য কিছু সাহায্য দিলো। মন খারাপ করে ফিরে এলাম। এর কয়েকমাস পর আবার নকলায় গিয়েছিলাম। খোজ নিয়ে জানতে পারলাম সেই বুড়ি আর নেই।


তারিখ : ১৭/৩/২০১৯ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ- কিশোরগঞ্জ – ময়মনসিংহ জার্নি