হোটেলের অপরিত দুই মেহমান

হোটেলের অপরিত দুই মেহমান
(সামাজিক ছোট গল্প)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

জুম্মার নামাজ শেষ করে মসজিদের পাশের হোটেলে গিয়ে বসলাম। গরম লেগেছিল বেশ। ফ্যান ছাড়তে বললাম। ফ্যানের বাতাসে লাকরির চুলার ধুয়া এসে লাগছিল। বিরক্ত হয়ে ফ্যান বন্ধ করে দিতে বললাম। আট বছর আমি দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে চাকরি করেছি। এই সময় আমি শুক্রবারেও প্রাক্টিস করতাম। ঢাকার বাইরের ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলিতে শুক্রবারে বেশী রোগী আসে। কারন, শুক্রবারে ছুটির দিন থাকাতে ডাক্তারগণ বেশী সময় প্রাক্টিস করতে পারে। যতদিন ফ্যামিলি নিয়ে থেকেছি ততদিন আমি শুক্রবারে প্রাক্টিস করি নাই। দিনাজপুর ফ্যামিলি না যাওয়াতে শুক্রবারেও প্রাক্টিস করতাম। দুপুরের খাবার হোটেলেই খেয়ে নিতাম। রোস্তমের হোটেলের গরুর গোস্ত সবার কাছেই ভালো লাগতো। তাই, যে একবার এই হোটেলের গরুর গোস্ত খেতো সে বারবার যেতো গোস্তো খেতে। ইন্টারনিক চিকিৎসক ও ঔষধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভরা ছিল এই হোটেলের প্রধান কাস্টমার। মাঝে মাঝে আমি অনেকের কাছে এই হোটেলের গরুর গোস্তের স্বাদের প্রশংসা করেছি। তাতে আমার উছিলায় এই হোটেল বেশী বেশী কাস্টমার পেতো।

আমি একাগ্রচিত্তে খাচ্ছিলাম। একজন যুবক এসে দাঁড়ালো হোটেল মালিকের সামনে কাউন্টারে। শিক্ষিত যুবক মনে হলো দেখে। শার্ট প্যান্ট দেখে মনে হলো বহু বছর যাবৎ এই কাপড় সে পরছে। শরীরের গঠন বেশ সুঠাম কিন্তু পুষ্টি কম আছে তাতে। পর্যাপ্ত খাবার হয়ত খেতে পাননা অভাবে। তিনি দাঁড়িয়ে এদিক সেদিক তাকিয়ে একটু দেখে নিলেন। তারপর অতি সতর্কতার সাথে হোটেল মালিকে বললেন
– আমাদের বস আমার খাবার ব্যাপারে কিছু বলেছেন?
– আপনার বস কে?
– হাসান সাব।
– হাসান সাব কে?
– পলাশ ফার্মার এরিয়া ম্যানেজার। ঐজে গত রাতে খেয়ে গেলেন। আমিও তার সাথে খেলাম। ওনি আমার এখানে খাওয়ার ব্যাপারে কিছু বলেছেন?
– না, কিছু বলেন নাই তো?
– আমার গতকাল এই কোম্পানিতে চাকরি হয়েছে। তিনি বলেছেন আমাকে এই হোটেলে খেতে। টাকা তিনি দিয়ে দেবেন।
– এমন আলাপ তিনি আমাদের সাথে করেন নাই।
– আমাকে তো তাই বলে গেছেন যে আমি খেয়ে বাকী খাতায় সই করবো, তিনি পরে টাকা পরিশোধ করে দিবেন।
– এখানে খেলে নগদ টাকায় খেতে হবে। এই যে দেখেন বড় বড় করে লিখা আছে বাকী চাহিয়া লজ্জা দিবেন না।
লোকটি ইতস্তত এদিক সেদিক কিছুক্ষণ তাকালেন। কিছুক্ষণ অন্যের খাবারের দিকেও তাকিয়ে রইলেন। তারপর চলে যেতে উদ্ধত হলো। আমি ডাকলাম
– হ্যালো, এই যে, হ্যালো।
– কিছু বলবেন?
– এখানে বসেন।
– কেন, কি হয়েছে?
– না, বসেন।
– বলেন।
– বসেন।
লোকটি আমার খাবার টেবিলের সামনে বসলেন।
– আপনি আমার মেহমান। খাবেন।
– আপনি কে?
– আমি কে পরে বলবো। আগে খান। এই এখানে ভাত দাও।
– না। আমি খাব না।
– আপনি তো খেতেই এসেছিলেন। খাবেন না কেনো?
– আমি পরে খাবো।
– না, এখনই খাবেন। আমি খাওয়াচ্ছি।
– আপনি খাওয়াবেন কেনো।
– এমনি খাওয়াব। আপনি আমার মেহমান।

হোটেল বয় টেবিলে ভাত দিয়ে দাঁড়ালো।

– মাছ না মাংস?
– মাছ মাংস খাব না।
– কেনো, মাছ মাংস খান না?
– খাই, এখন খাব না।
– কোন সমস্যা নাই, আমি খাওয়াব।
– না, শুধু ভাজি দেন।
– শুধু ভাজি দেবে কেমনে? মাছ বা মাংস কিছু একটা নেন।

লোকটি এক প্লেট ভাত ও ভাজি ছাড়া আর কিছু নিলেন না। বিল আমি দিয়ে দিলাম। লোকটি আমার ঠিকানা চেয়ে বললেন যে তিনি এই টাকা পরিশোধ করবেন। আমি বললাম আপনি আমার মেহমান। খেলেন মাত্র ২০ টাকার ভাত আর ১০ টাকার ভাজি। তা আবার ফেরৎ দিতে চাচ্ছেন? আপনি যদি না খেয়ে চলে যেতেন তাতে আমি অনেকদিন কষ্ট পেতাম। আমি আমার কষ্ট থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যই আমি আপনাকে খাওয়াছি। আমার সার্থেই আমি আপনাকে খাইয়েছি। লোকটি চোখ টলমলো চোখে আমার দিকে চাকিয়ে রইল। চলে গেলাম চেম্বারে।

কয়েকদিন আগে চরপড়ার ব্যাংক বুথ থেকে টাকা উঠাতে গিয়েছিলাম। বুথে প্রবেশের আগে পেটে ক্ষুধার উদ্রেক হলো। একটা হোটেলে প্রবেশ করলাম। কি খাব ভেবে ওয়ালে টাংগানো খাবারের মেনুটা দেখছিলাম। অনেক খাবারের মাঝে চায়ের মুল্যের তালিকার প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো। লিখা ছিল
রঙ চা ৫ টাকা
দুধ চা ১০ টাকা
রোজ চা ১৫ টাকা

রঙ চা ও দুধ চা বুঝলাম। কিন্তু রোজ চা বুঝলাম না। হোটেল বয়কে জিজ্ঞেস করলাম
– এই রোজ চা আবার কি?
– রোজ চা চিনেন না? মেশিনে বানায়।
– মেশিনে বানায় রোজ চা?
– জি।
– আমাকে একটা সিংগারা দাও। তারপর একটা রঙ চা দিও।

সিংগারার সাথে একটা কাচা মরিচ ও কিছু পিয়াজ কুচি দেয়া হলো। সিংগারা গরম তেলে সেকা খেয়ে হয়ত জীবাণুমমুক্ত হয়েছে। কিন্তু পিয়াজকুচি তো কাচা। জীবাণু থাকার সম্ভাবনা আছে যেনেও খেলাম। কি আছে জীবনে, একটু মজা করেই যদি খেতে না পারি। খেতে খেতে ভাবলাম, বেচে থাকলে কত কিছুই খাওয়া যায়। রোজ চার নামই শুনি নি কখনো। আজ শুনেও খেলাম না। খাওয়া উচিৎ ছিল। অভিজ্ঞতা হত। গত বছর বেল চা খেয়েছিলাম। বেল গুড়া করে যে চায়ের মত দানা করে চা বানিয়ে খায় এটা তো জান্তামই না। বেল চাও খাওয়া হয়েছে। কিন্তু রোজ চা খাওয়া হয় নাই। নিশ্চই রোজ চা বানায় গোলাপের পাপড়ি দিয়ে। অনেকে তুলসি পাতা দিয়েও নাকি চা বানিয়ে খায়। তবে আমি চায়ের সাথে পুদিনাপাতা মিশিয়ে জাল দিয়ে খাই। তাতে শরীর বেশীক্ষণ চাংগা থাকে। টিপা ফলের নামই আমি জানতাম না। কিছুদিন আগে টিপাফল খাওয়া হয়েছে। বেঁচে থাকলে আরও নতুন নতুন খাবার খাওয়া যাবে। এমন ভাবনা ভাবছিলাম। এমন সময় এক অতি বৃদ্ধলোক এসে আমার সামনে বসলেন। টুপি মাথায় লম্বা দবদবে সাদা দাড়ি। মাড়িতে একটা দাঁতও নেই। টেবিলটা একটু ছোট সাইজের। একটু অসস্তি বোধ করছিলাম। আমার কাছে ভিক্ষুক মনে হচ্ছিল। আবার মনে হলো ভিক্ষুক নাও হতে পারে। গ্রাম থেকে হয়ত শহরে কোন আত্বীয় বাড়ি এসেছে। পাঞ্জাবী বেশ পরীস্কার। লোকটি হোটেল বয়কে ইশারায় ডেকে কাছে এনে দাঁতের মুথুল্লা বের করে একটু লাজুক হাসি দিয়ে ফিসফিস করে যেন কি বললেন। বয় হাফ বাটি সবজি এনে দিলো। পাঞ্জাবীর সাইড পকেট থেকে দুইটি রুটি বের করে রোল করে ছিড়ে ছিড়ে মুখে দিলেন ভাজি লাগিয়ে লাগিয়ে। দাঁতের মুথুল্লা দিয়ে সেই রুটি সজোরে চিবাচ্ছিলেন আর পানি দিয়ে গিলছিলেন। যেন কত দিনের ক্ষুধার্ত ছিল লোকটি। আমি লোকটি নিয়ে ভাবা শুরু করলাম না না কিছু। ভাবতে ভাবতে লোকটি সব খেয়ে বাটি চেটে খাওয়া শুরু করল। আমি বললাম
– বাড়ি থেকে রুটি এনেছিলেন?
– লোকটে লজ্জার হাসি হেসে বললেন “না, ঐ হোটেল থেকে দুইটা রুটি দিছে, কিন্তু হুদা রুটি খাবার পাই না। তাই একটু ভাজি নিলাম।
– এখানে কয় টাকার ভাজি দিয়েছিলো?

মুস্কি হাসি দিয়ে বুঝেলেন যে “ফ্রি”।

– আমি আপনাকে খাওয়াই?
– খাইছিই তো।
– এখন দুপুর। ভাত খান।

মুস্কি হেসে রাজি হলেন।

আমি হোটেল বয়কে বললাম
– এখানে ভাত দাও।
– বিল কি আপনে দিবেন?
– হ্যা, আমি দেব।

ভাত দেয়ার পর লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম
– ভাতের সাথে কি নিবেন।
-( মৃদু স্বরে বললেন) গোস্ত।
– এই, এখানে গোস্ত দাও।

লোকটি গোস্ত আঙুল দিয়ে ছিড়ে ছিড়ে ভাতের সাথে মুখে দিচ্ছিলেন আর থুরা থুরা করে কিছুক্ষণ চিবিয়ে গোস্তের রস চুষে গিলে ফেলছিলেন। মনে হলো কতদিন যেন তিনি গোস্তের স্বাদ গ্রহন করেন নাই। এক প্লেট ভাত শেষ করলে আরেক প্লেট দিতে বললাম। দুই প্লেটে শেষ হলে আরও দিতে চাইলে তিনি হাত ইশারায় মানা করলেন। খাওয়ার সময় তাকে অন্য কিছুর দিকে তাকাতে দেখি নাই। খাওয়া শেষ করে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে একটা তৃপ্তির হাসি হাসলেন। সেই হাসি যে দেখে নাই তাকে আমি বলে বুঝাতে পারব না।
আমি কাউন্টারে বিল দিতে গেলাম। হাত মুছতে মুছতে কেশ কাউন্টারের বাম পাশে রাখা মেশিনের দিকে চোখ পড়লো। মেশিনের গায়ে লেখা দেখলাম “রোজ ক্যাফে” যেমনটি লেখা থাকে “নেস ক্যাফে।” আমি নেস ক্যাফে চিনতাম আগে থেকে। রোজ ক্যাফে দেখলাম আজই। আমি কাউন্টারে জিজ্ঞেস করলাম
– রোজ ক্যাফের দাম কত?
– রোজ কফি ২০ টাকা আর রোজ চা ১৫ টাকা।
– আমার বিল কত হয়েছে?
– আপনি খেয়েছেন ১০ টাকা আর উনি খেয়েছেন ২০০ টাকা। মোট ২১০ টাকা।

কম পড়ে কিনা এই ভেবে সঙ্কিত হয়ে আমি পকেটে হাত দিলাম ।

৯/১০/২০১৯ খ্রি.