আমার বড় ফুফু

আমার বড় ফুফু
(স্মৃতিচারণ)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমি বুঝমান হয়ে দুইজন ফুফু পেয়েছিলাম। আমার আরও দুইজন ফুফু ছিলেন। চাচা পেয়েছিলাম একজন। আরও নাকি একজন চাচা ছিলেন। তারা বিয়ের বয়সে উপনিত হবার পর ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে একই বছর মারা গেছেন। বাবারও একই সময় জ্বর হয়েছিল। ম্যালেরিয়ায় বাবাকে মারতে পারে নাই। তাই আমরা বাবাকে পেয়েছি। তারপর থেকেই বাবা রোগা রোগা হয়ে বেচেছিলেন। কম বয়সেই আমার দাদী অন্ধ হয়েছিলেন। তাই বড় ফুফুর উপর আমার বাবা চাচা ও ফুফুদের অনেক দায়ীত্ব পড়ে। বড় ফুফুর নাম ছিল মেহারন (মেহেরুন্নেসা) আর ছোট ফুফুর নাম ছিল তাহারন (তাহেরুননেসা)। বড় ফুফুর শশুরবাড়ি নিজ গ্রাম ভিয়াইলের উত্তর পাড়া তালুকদার বাড়ি। বাবার বাড়ি ভিয়াইলের দক্ষিণ পাড়ার তালুকদার বাড়ি। ছোট বেলায় আমার একটা প্রশ্ন ছিল আমার দাদা মোকসেদ আলী তালুকদার তার এই সুন্দরি মেয়েটাকে একটি কালো ছেলের কাছে বিয়ে দিয়েছিলেন কেন? ফুফার নাম ছিল মফিজ উদ্দিন তালুকদার। ফুফার বড় ভাই ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন তালুকদার কালিহাতি সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের  মেডিকেল অফিসার ছিলেন। তার ছেলে সফিকুল ইসলাম তালুকদার বাচ্চু ভাই, রফিকুল ইসলাম তালুকদার দুদু ভাই, আতিকুল ইসলাম তালুকদার নার্গিস ভাই ও তারিকুল ইসলাম তালুকদারকে আপনারা অনেকেই চেনেন। ফুফা ও ফুফার জমজ ছোট ভাই আন্তাজ আলী তালুকদার (আন্তা তালুকদার) গ্রামের বাড়িতেই থাকতেন। তার ছেলে চুন্নু ভাই, সেন্টু ভাই ও মিল্টনকে আপনারা অনেকেঞ্চেনেন। ফুফু  ১২-১৩ জন সন্তান জন্ম দেন । তারমধ্যে ৯ জন টিকে থাকে। প্রথম ৬ জন ছেলে আর শেষের ৩ জন মেয়ে। এরা হলেন গিয়াস উদ্দিন তালুকদার বিএ, আঃ বাসেত তালুকদার সুর্য বি এ, আঃ মোত্তালেব তালুকদার মতি বি এস সি, সামসুল হক তালুকদার ইঞ্জিনিয়ার, আবুল হোসেন তালুকদার বাবলু বিএ, আসাদুজ্জামান তালুকদার জিয়াউল এমএ। আমার ফুফাতো বোনদের সবারই এসএসসি পাস করার পর বিয়ে হয়ে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। তারা হলো সুফিয়া, জাহানারা ও সেলিনা। ফুফুর সন্তান অনেকগুলি হলেও তার সন্তানদের সন্তান মাত্র দুই একজন করে। ফুফুর নাতী নাত্নীরা প্রায় সবাই উচ্চ শিক্ষিত, গ্রাজুয়েট অথবা পোস্টগ্রাজুয়েট। ফুফা গ্রামের মানুষ হলেও তার ৯ জন সন্তানের সবাইকে এক যোগে লেখাপড়া করিয়েছেন তখনকার যুগে। মার কাছে শুনেছি ফুফারা ছিলেন ৪ আনার তালুকদার। আর আমরা ছিলাম ২ আনার তালুকদার। সমাজে ফুফাদের বংশ মর্যাদা বেশী ছিল। ফুফার চেহারা ফুফুর সাথে ম্যাচ না করলেও দাদা মেয়ে বিয়ে দিতে রাজী হন। তাছাড়া ফুফার বাবা ফুফুকে অনেক টাকা পণ দেন এবং ১৭ রকমের দামী দামী স্বর্নের গহনা দেন।
Continue reading “আমার বড় ফুফু”

ইন্দ্রজানী

ইন্দ্রজানী
ইন্দ্রজানীকে আমরা ইন্দাজানী বলতাম। ইন্দাজানীতে তেমন কিছুই ছিল না। ইন্দাজানীর হাট ছাড়া এটার তেমন গুরুত্ব ছিল না। ছিল না কোন হাই স্কুল, ছিল না কোন গোলাঘর (দোকানঘর)। এখানে বর্ষাকালে অস্থায়ী হাট বসতো প্রতি মঙ্গলবারে। এটা বসতো পাহাড় ও ভরের সংযোগস্থলে। পাহাড়ের পর নিচু সমতলভুমিকে আমরা ভর অঞ্চল বলতাম। ভরের বড় বড় মহাজন Continue reading “ইন্দ্রজানী”

কচুয়া স্কুলের পথে

কচুয়া স্কুলের পথে
(স্মৃতিচারণ)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্রায় ৩ কিলোমিটার পথ হেটে বাড়ী থেকে কচুয়া পাবলিক হাই স্কুলে যেতাম। আমাদের বাড়ীটা পড়েছে সখিপুর উপজেলার ঢনডনিয়া গ্রামের বড়বাইদ পাড়ার তালুকদার বাড়ী । স্কুলে যাওয়া আসার তিনটি পথ ছিল। একেক সিজনে একেক পথে যেতাম। বর্ষাকালে বাড়ী থেকে কালিয়া পর্যন্ত যেতাম সরু পায়ের পথে। কালিয়া থেকে কচুয়া স্কুল পর্যন্ত হালট ছিল গরুর গাড়ী যাতায়াতের জন্য। শুকনোর সিজনে বাড়ী থেকে চটানের বাইদের মাঝ বরাবর গরুর গাড়ীর পথে কালিয়ার ভন্ডেশ্বর পাড়ার ভিতর দিয়ে ঢুকে হালটে গিয়ে পৌছতাম। হাল্কা শুকনো সিজনে যেতাম সাড়াসিয়া হয়ে রামখার পাশ দিয়ে সোজা কচুয়ায়। কালিয়া-কচুয়ার হালটটি পাকা হয়েছে নব্বইর দশকে। আমি কচুয়া হাই স্কুলে পড়েছি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সনের মার্চ মাস পর্যন্ত।
Continue reading “কচুয়া স্কুলের পথে”

আমাদের রানার

আমাদের রানার

(স্মৃতিচারণ)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমাদের পোস্ট অফিস ছিল বড় চওনা। কিন্তু চিঠিপত্র পাঠানোর জন্য কচুয়ার পোস্ট অফিস বেশী ব্যবহার করতাম। কচুয়া পোস্ট অফিসের পোস্ট মাস্টার ছিলেন মরহুম আব্দুল লতিফ স্যার। তিনি একই সময় ঘোনার চালা ফ্রি প্রাইমারী স্কুলে আমার শিক্ষকও ছিলেন। আমরা স্যারকে পোস্টো স্যার বলে উল্লেখ করতাম। কচুয়ার ডাকপিয়ন ছিলেন মরহুম নওশের আলী চাচা। তিনি কচুয়া বাজারে চায়ের স্টলেও চা বিক্রি করতেন। তাকে অনেকে নওশের পিয়ন বলে উল্লেখ করতো। আরেকজন ছিলেন রানার। রানানের নাম আমার জানা নেই। গ্রামের লোকজন কাগজে চিঠি লিখে খামে ভরে ডাকবাক্সে ফেলে আসতো। খরচ কম বলে কেউ কেউ পোস্ট কার্ডেও চিঠি লিখতো। জামা কাপড়, বই পুস্তক অনেকে ডাক মার্ফৎ পার্শেল করে পাঠাতো। টাকা পয়সা পাঠাতো মানি অর্ডার করে। কোন কোন চিঠি রেজিস্ট্রি করে পাঠানো হতো। পোস্ট মাস্টার লেখালেখির কাজ ও হিসাবপত্র করতেন। চিঠি, পার্শেল ও মানি অর্ডারের টাকা বস্তায় ভরে সীল গালা করে দিতেন। রানার সেই বস্তা কাঁধে নিয়ে কচুয়া পোস্ট অফিস থেকে বড় চওনা পোস্ট অফিসে দিয়ে যেতেন । ফিরে আসতেন বড়  ফিরতি ডাকের বস্তা নিয়ে। পিওন চিঠি বিলি করতেন। বাড়িতে গিয়ে চিঠিপত্র দিয়ে আসার নিয়ম থাকলেও তারা তা করতেন না সাধারণত। হাটের দিন পরিচিত জনের কাছে চিঠিপত্র দিয়ে দিতেন প্রাপকের হাতে পৌঁছে দেয়ার জন্য। বাহক রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় চিঠি খুলে পড়ে সংগীদেরকে শুনাতে শুনাতে বাড়ি ফিরতেন। সেই চিঠির পড়া শুনে কেউ কেউ চিঠি দাতার প্রশংসা করতেন আবার কেউ কেউ চিরস্কার করতেন। আমার যখন ১৯৮৮ সনে বরিশালে মেডিকেল অফিসার হিসাবে প্রথম পোস্টিং হয় তখন মাসিক বেতন ছিল ১৮৫০ টাকা। দায়িত্ব মনে করে এই টাকা থেকে কিছু টাকা বাবাকে মানি অর্ডার করে পাঠাতাম। কিছুদিন পর পর বাবাকে কুশলাদি জানিয়ে চিঠি লিখতাম। এও লিখতাম “গত সপ্তাহে মানি অর্ডার করে এত টাকা পাঠিয়েছি। আশা করি পেয়েছেন।” একসময় বাবা বললেন “তুমি চিঠিতে যা লিখ তা গ্রামের লোকেরা জেনে যায়। কারন, পিওন যার কাছে চিঠি দিয়ে দেয় সে চিঠি খুলে সাথের সবাইকে শুনায়। টাকার কথাটা না লিখাই ভালো।” Continue reading “আমাদের রানার”