আবেগ, বেগ ও জীবনের প্রতিষ্ঠা

আবেগ, বেগ ও জীবনের প্রতিষ্ঠা
(প্রবন্ধ )
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমার এই লেখাটি মুলত স্কুল কলেজে পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য। সবাই স্কুল কলেজে যাচ্ছে পড়াশুনা করার জন্য। প্রতি বছর Continue reading “আবেগ, বেগ ও জীবনের প্রতিষ্ঠা”

কেরোসিনের বাতি

কেরোসিনের বাতি
(স্মৃতিচারণ)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ছোট বেলায় দেখেছি গ্রামের প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগ বাড়িতে সন্ধ্যা বেলায় কুপি বাতি জ্বালানো হতো। বেলা ডোবার সাথে সাথে ঘরে আলো জ্বালাতে হতো। অনেকে প্রদীপ জ্বালাতো। তাই বলা হতো সন্ধ্যাপ্রদীপ বা সন্ধাবাতি। কুপি বাতি জ্বালানোর জন্য জ্বালানী হিসাবে কেরোসিন তেল ব্যবহার করা হতো। কেরোসিন ছিল দুই রকম – সাদা ও লাল। সাদা কেরোসিনের দাম লাল কেরোসিনের চেয়ে একটু বেশী ছিল। সাদা কেরোসিনের ধুয়া কম হত কিন্তু তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যেতো। এইজন্য লাল কেরোসিন বেশী ব্যবহার হতো। গ্রামে কেরোসিনকে কেরাসিন তেল বলা হতো। সরিষার তেলকে বলা হতো খাছ (খাস) তেল। গ্রামের মানুষ সিকায় করে একটি খাস তেল এবং একটি কেরাসিন তেলের বোতল নিয়ে যেতো হাটে তেল আনতে। কুলুরা (বেপারীরা) হাটের মুখে তেল নিয়ে বসতেন। গ্রাহকদের কাছ থেকে খালি বোতল নিয়ে সাজিয়ে রাখতেন। গ্রাহকরা হাটকরে ফেরার সময় বোতলে ভরে তেল নিয়ে যেতেন। এক ছটাক, দুই ছটাক, এক পা (পোয়া), দুই পা, আধ (আধা) সের করে তেলের মাপ ছিল। সামর্থ্যানুযায়ী তেল কিনে নিতেন গ্রামের মানুষরা। সরিষার তেল গ্রামেই তৈরি করতেন ঘানি টেনে কলু সম্প্রদায়ের বেপারীরা। কিন্তু কেরাসিন তেল সরকারকে আমদানি করতে হতো। লবন ও কেরাসিন তেলের জন্য সরকারের উপর নির্ভর করতে হতো গ্রামের মানুষের। তাই সরকারের ভালো মন্দ কিছুটা নির্ভর করতো এই কেরাসিন ও লবনের দামের উপর।
কেরাসিন ছাড়াও অন্যভাবে মানুষ বাতি জ্বালিয়েছে। বাটিতে সরিষার তেল নিয়ে একটা সলতে বা পলতে ভিজিয়ে প্রদীপ জ্বালানো হতো। এটাকে বলা হতো চাটী। আমাদের এলাকায় চাটী ছিলো না। বড় বুবুর (আপা) প্রথম সন্তান সহিদা জন্ম হওয়ার কালে ছটী ঘরে চাটী লাগান হতো। এটা করেছিলেন বুবুর শাশুড়ি। সহিদার জন্ম হয়েছিল আমাদের বাড়িতে। সেই সুবাদে চাটী দেখেছি। ছটি ঘরে সারারাত বাতি জ্বালিয়ে রাখতে হতো। ধারনা করা হতো, অন্ধকার ঘরে শয়তান প্রবেশ করে নবজাকের ক্ষতি করে। নানা রকম অসুখ বিসুখ হত। চাটীর আগুনে ধুয়া কম হত। সম্ভ্রান্ত পরিবার কেরাসিনের কুপির পরিবর্তে প্রদীপ জ্বলাতো সরিষার তেল বা আরও কোন দামী দেল দিয়ে। কেরোসিনের অভাবে আমাদের এলাকার মানুষ জয়না বিচির (বীজ) তেল দিয়েও চাটী জ্বালাত। ভর এলাকার মানুষ চাটী জ্বালাত পিতরাজ বিচির তেল দিয়ে। জয়না গোটা ছিল পাহাড়ি অঞ্চলের বনের গাছ। এগুলি দেখতে লটকন বা ভুবি ফলের মতো। খেতেও তাই। আমরা গাছে উঠে জয়না ঘোটা খেয়েছি অনেক। পিতরাজ গাছ ভর (নিচু) এলাকার জংলা গাছ। পিতরাজ গোটা খাওয়া যায় না। পিতরাজ বা জয়না বীজ শুকিয়ে ঢেকিতে পার দিয়ে হাতে চিপে তেল বের করা হত। জয়না তেল দিয়ে ভাজি খাওয়া যেতো। বাজনা বীজের তেল দিয়ে অনেকে ভর্তা খেতো। এই তেল দিয়ে চাটীও জ্বালানো যেতো
বিভিন্ন রকমের দোয়াত দিয়ে কুপি বাতি বানানো হত। সবচেয়ে কম দামের ছিল মাটির তৈরি দোয়াত। মধ্যম দামের ছিল টিনের তৈরি দোয়াত। একটু বেশী দামী ছিল কাঁচের তৈরি। সব চেয়ে বেশী দামের ছিল পিতলের তৈরি দোয়াত। আমাদের বাড়ীতে কাঁচের, টিনের ও পিতলের দোতাত ছিল। গেঞ্জি অথবা সুতি কাপড়ের তেনা (নেকড়া) ছিড়ে দড়ি পাকিয়ে পলতে বানিয়ে ঢুকানো হতো দোয়াত বা কুপি বাতিতে। খরচ কমানোর জন্য গ্রামের মানুষ সন্ধ্যা রাতেই খাবার দাবার শেষ করে দোয়াত নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। দোয়াত রাখার স্ট্যান্ড-এর নাম ছিল গাছা। গাছা মাটি, কাঠ, কাঁচ ও পিতলের তৈরি ছিল। এইগুলিও আবার নানা রকম নকশা করে বানিয়ে দামী করা হতো। ময়মনসিংহের এক স্থানের নাম আছে মুক্তা গাছা। ওখান থেকে রোগী এলে গাছা চিনেন কিনা জিজ্ঞেস করলে অনেকেই বলেন চিনেন না। অনেকে চিনলেও বলতে পারেন না মুক্তা গাছা শব্দের মানে কি। আমি আন্দাজ করে বলে দেই “মুক্তা দিয়ে অলংকৃত গাছা” মুক্তা গাছার জমিদারেরা ছাড়া আর কেই বা ছিল মুক্তাগাছা ব্যবহার করবে!
দোয়াত ধরার জন্য চায়ের কাপের মত একটা রিং ছিল। দোয়াতের একটা সুবিধা ছিল। বড় বড় মশা যখন কানের কাছ দিয়ে ভন ভন করে মাটির দেয়ালে বসত আসতে করে দোয়াতের আগুন কাছে নিলে তাপ পেয়ে উড়ার সময় আগুনে পুড়ে টাস করে শব্দ হতো। মশা মারার মধ্যে একটা আনন্দ আছে।
কেরোসিন জ্বালিয়ে হাট বাজার ও রাস্তাঘাটে বদনাবাতি ও চুংগাবাতি ব্যবহার করত। একটা টিনের কৌটার এক পাশে বদনার নালের মত একটা নাল (নল) লাগিয়ে নালের ভিতর দিয়ে পলতে লাগিয়ে বদনাবাতি বানানো হত। বদনাবাতির সুবিদা ছিল এটাতে অনেক বেশী তেল ভরা যেতো। বহন করার জন্য বালতির মত রিং ছিল। চুংগাবাতি (মশাল) বাঁশের চুংগা (চোংগা) দিয়ে বানানো হত। এটার পলতে বানানো হতো পাট দিয়ে। সুবিধা ছিল এটার আলো অনেক বেশী ছিল। বাঁশের লাঠির মতো হয়ায় এটা হাত দিয়ে মাথার উপর ধরে রাস্তায় চললে পিছে দশ বারোজন সেই আলোয় হাটত পারত। আগের দিনে কোন কিছুর বিরোধ্যে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে হলে রাতে মশাল মিছিল করা হত।
হাছেন কাক্কুর কাছে একটা গল্প শুনেছি। হারিকেন নামে উন্নত প্রযুক্তির বাতি যখন আমাদের তালুকদার বাড়িতে কিনে আনা হলো তখন গ্রাম থেকে অনেক লোক কৌতূহল নিয়ে দেখতে আসতো। বলাবলি করত “তালুকদার বাড়িতে এমন একটা দামী বাতি এনেছে যেটার আলো বাড়ানো যায় আবার কমানোও যায়।” কেরোসিনের বাতি হিসাবে হারিকেন খুব উপযুক্ত বাতি ছিল। ছাত্রদের পড়ার জন্য সর্বাধিক ব্যবহার হয়েছে হারিকেন। বায়েজিদ ব্রান্ডের হারিকেন খুব ভালো ছিল। হারিকেনের এক পাশে তেল ভরার জন্য ছিপিযুক্ত একটা ছিদ্র ছিল। হারিকেনে সাদা কেরোসিন ব্যবহার করতে হতো। কালো ধুয়া হত না। হালকা কিছু ধুয়া হলেও উপরের চিমনি থাকার জন্য আটকে যেতো। চিমনির নিচ দিয়ে অক্সিজেন যুক্ত বাতাস প্রবেশ করার জন্য ফাকা ছিল। চিমনি থাকার জন্য বৃষ্টির পানিতে বাতি নিভত না। বাতির চতুর্দিকে কাচের বেষ্টনী ছিল। তাতে বাতাসে হারিকেন নিভত না। মাঝে মাঝে হারিকেনের কাচ খুলে গেঞ্জির তেনা (নেকড়া) দিয়ে মুছতে হত। কালি নরম করার জন্য এক দিকে হাতের তালু দিয়ে বন্ধ করে আরেক দিক দিয়ে স্বাস (ফু) দেয়া হত। খুব বেশী কালি পড়লে সাবানের পানি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করা হত। হারিকেনের পলতে দোকান থেকে কিনতে হত। আমাদের বাড়িতে পলতেকে সইলতা (সলতে) বলা হত। স্কুলের হোস্টেলে দেখলাম আছির (সাইফুল্লাহ মাস্টার) বলছে পইলতা (পলতে)। পলতে হবে না সলতে হবে এনিয়ে আমাদের মধ্যে দ্বিধা হলে ফজলু (ইঞ্জিনিয়ার ফজলুল হক) বললো “জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম একদিন অন্ধকার গলি দিয়ে হাটার সময় পাশের বাড়ীর এক তরুণীকে বাতি হাতে দেখতে পেয়ে ছড়াকেটে বাতি চেয়েছিলেন এইভাবে ‘ওগো ললিতে, অন্ধকার গলিতে পারিনা চলিতে, দাও একটা পলিতে।’ কাজেই সলতে হবে না, পলতে হবে। আছির ঠিক আছে।”
শহরেও হারিকেনের প্রয়োজন পড়তো। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চলে গেলে হারিকেনের আলো বারিয়ে দেয়া হত। বিদ্যুৎ চলে এলে হারিকেন ডিম করে রাখা হত। চার্জার লাইট ও আইপিএস আসার পর হারিকেনের প্রয়োজন পড়ে না। কোন কোন বাড়িতে খাটের নিচে বা সিলিং-এর উপরে পরিত্যক্ত অবস্থায় হারিকেন পাওয়া যাবে।
এরপর আরো উন্নত ধরনের কেরোসিনের বাতি আসে হ্যাজাক বাতি নামে। এই বাতির আলো অনেক বেশী ছিল। উঠানে ঝুলিয়ে রাখলে সারা বাড়ী আলোকিত হত সাদা আলোয়। হারিকেনের চেয়ে একটু বড় ছিল। উপরে দিকে একটা সাদা মেনটল ছিল। সাদা কেরোসিন ভরে পাম্প করলে সুক্ষ্ম জেট দিয়ে শো শো করে কেরোসিন বের হয়ে মেনটল ফুলে উঠত বৈদ্যুতিক এলইডি বালবের মতো। আলোও দিত এলইডি লাইটের মতো। রাতে বিয়ের অনুষ্ঠান, নাটক- থিয়েটার, সার্কাস, ধর্মসভা ইত্যাদিতে হ্যাজাক বাতি জ্বালানো হত। ছোট ছোট জেনারেটর আসাতে হ্যাজাকের ব্যবহার উঠে গেছে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই দেশে বিদ্যুতের উন্নয়নের দিকে সরকার নজর দিতে থাকে। সব শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার পর এখন প্রায় সব গ্রামে বিদ্যুৎ চলে গেছে। রিচার্জেবল লাইট খুব সস্তা হয়ে যাওয়াতে হারিকেন ও কুপি বাতির ব্যবহার নাই বললেই চলে। এখনো অনেক হারিকেন পাওয়া যেতে পারে যেগুলি দেখা যাবে অবহেলায় বাড়ির আনাচেকানাচে পড়ে আছে। শহরে যারা আজ অনেকে উচ্চ শিক্ষিত হয়ে অঢেল টাকা পয়সার মালিক হয়েছেন অথবা বিদেশ পাড়ি দিয়ে আরামে আয়াসে কাটাচ্ছেন তাদের অনেকেই এক সময় এই কেরোসিনের বাতিতে লেখাপড়া করেছেন।
তারিখ : ২১/৫/২০১৯ খ্রি.
স্থান: ময়মনসিংহ

রুগীর দালাল ও ঠকবাজ

রুগীর দালাল ও ঠকবাজ
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

দালাল ও চিটারের (ঠকবাজ) মধ্যে পার্থক্য আছে। গ্রাম থেকে রুগী আসেন শহরে ডাক্তার দেখাতে বা হাসপাতালের সেবা নিতে। তারা শহরের
Continue reading “রুগীর দালাল ও ঠকবাজ”

মুরগীর পাখনা খাওয়ার পরামর্শ

মুরগীর পাখনা খাওয়ার পরামর্শ
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৯৮ সনের কথা। আমি শুক্রবার ছুটির দিনে সকালে এক ডাক্তার ভাইয়ের বাসায় গিয়েছিলাম কোন এক দরকারে। গিয়ে Continue reading “মুরগীর পাখনা খাওয়ার পরামর্শ”

খয়ের খান

খয়ের খান
(লোক মুখে শোনা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

পান একটা মজাদার রেসিপি আমাদের এই উপমহাদেশে, বিশেষ করে এই বাংলাদেশে। একটা পান পাতার মাঝখানে কিছু Continue reading “খয়ের খান”

সারাজীবন বসে খাওয়া

সারাজীবন বসে খাওয়া
(লোক মুখে শোনা)
আগের দিনে হাটে বাজারে ক্যানভাসারেরা বনাজী ও কবিরাজি ঔষধ এবং বিশেষ বিশেষ আকর্ষণীয় জিনিষ ক্যানভাস করে Continue reading “সারাজীবন বসে খাওয়া”

জামান সাহেবের ক্যান্সার

জামান সাহেবের ক্যান্সার
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমার রুমের দরজাটা খোলা ছিল। একজন ভদ্রলোক দরজায় এসে দাঁড়ালেন। আমি মাইক্রোস্কোপ থেকে চোখ তুলে তার Continue reading “জামান সাহেবের ক্যান্সার”