স্বপ্না হাত থেকে ছুটে গেলো

স্বপ্না হাত থেকে ছুটে গেলো
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

স্বপ্নাকে সাথে নিয়ে হজ্জ করছিলাম ২০০৫ সনের জানুয়ারি মাসে। স্বপ্না আমার স্ত্রী। মোজদালিফায় পৌছলাম। সেখানে নিয়ম হলো খোলা মাঠে আকাশের নিচে ঘুমাতে হয়। খুবই ইন্টারেস্টিং ইভেন্ট। চাদর বিছিয়ে পাশাপাশি শুলাম আমরা। একদিকে Continue reading “স্বপ্না হাত থেকে ছুটে গেলো”

হা, হা, হা

হা, হা, হা
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

একদিন আমার এক প্রাতঃভ্রমণের বন্ধু রেল ওয়ের পরিচালক নুরুল ইসলাম ভাইকে নিয়ে এলেন আমার চেম্বারে। তিনি পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন “আপনার ডায়াবেটিস চেক করার জন্য এই ল্যাবরেটরিতে রক্ত দেবেন। সঠিক রেজাল্ট পাবেন।” Continue reading “হা, হা, হা”

গ্রামের সেইসব ফেরিওয়ালা

গ্রামের সেইসব ফেরিওয়ালা
(স্মৃতিচারণ)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ফেরিওয়ালা কথার অর্থটা বুঝেছি ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় প্রাইমারি স্কুল বৃত্তি পরীক্ষা দেয়ার পর কালিহাতি থেকে টাংগাইল শহরে গিয়ে আমার প্রথম দেখা সিনেমা ‘মানুষের মন’ দেখার পর থেকে। এটা ছিল ১৯৭২ সনের প্রথম দিকে। সেই সিনেমায় নায়ক রাজ রাজ্জাক সাইকেলের চার চাকার ঠেলা গাড়ি নিয়ে খেলনা বিক্রি করছিলেন শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে গেয়ে। গানটি ছিল এমন:
এই শহরে আমি যে এক নতুন ফেরিওয়ালা।।
হরেক রকম সওদা নিয়ে ঘুরি সারা বেলা।
ফেরিওয়ালা।


চার চাকাতে ভাগ্য বে^ধে বুঝে নিলাম ভাই,
সব জিনিসের মূল্য আছে,
মানুষের দাম নাই।।


এরা ত হলেন শহরের ফেরিওয়ালা। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রেতার কাছে নিয়ে আসে বিক্রি করার জন্য। হাটে গিয়ে আমরা জিনিসপত্র কিনতাম দোকান থেকে। মেয়েরা ও শিশুরা তো হাটে যেতে পারতো না। তাদের জন্য ছিল গ্রামের ফেরিওয়ালা। কিন্তু তাদেরকে কেউ ফেরিওয়ালা বলে জানতো না। তাদেরকে জানতো বাইন্যা, কুমার, নইটানাওয়ালা, গজাওয়ালা, হান্দার (সান্দার), বাইদা (বেদে), গুড়ওয়ালা, বেপারী /কুলু ইত্যাদি নামে।

 

আমি যে সময়ের কথাগুলি বলছি সেগুলি স্বাধীনতা যুদ্ধের আগের কথা। আমার শিশুকাল ও প্রাইমারি স্কুল জীবনের সময়ের কথা। আমাদের গ্রামের বাড়ি ঢনডনিয়া থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূর কালিহাতির কাছের ঝকগরমান গ্রাম থেকে দুইজন কুমার আসতেন বছরে দুইবার। একবার আসতেন শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে আরেকবার আসতেন মাঘ-ফাল্গুন মাসে। আউশ ও আমন ধান কাটা শেষ হলে। বর্ষাকালে তারা বল্লা ও কালিহাতির কুমারদের হাতে বানানো মাটির পাক পাতিল নৌকাভর্তি করে এনে ছোট চওনার ঘাটে এনে নামাতেন। সেখান থেকে ঝাকাভর্তি করে এনে জিতেশ্বরির একটা বাড়িতে রাখতেন। তারা দুইজনই হিন্দু ছিলেন। প্রতিদিন সকালবেলা দুইজন ঝাকাভর্তি করে মাথায় নিয়ে গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে পাক-পাতিল বিক্রি করতেন। পরনে থাকতো শুধু একটি মাত্র ধুতি। লিক লিকে শরীর ছিল তাদের। লম্বা গড়ন। ঝাকা মাথায় পিঠ সোজা করে হাটতেন। উচ্চ স্বরে ডাক দিতেন “রাখবেন পাক পাতিল।”

 

সেই সময় আমাদের এলাকায় এলুমিনিয়ামের ক্রোকারিজ খুব কম পাওয়া যেতো। বেশীভাগই মাটির তৈরি হারি পাতিল ছিল। প্রায় সব কাজেই এই সব মাটির জিনিসপত্র ব্যবহার করা হতো। ব্যবহার করা স্বাস্থ্য সম্মতও ছিল। মাটির হারি-কলসিতে পানি রাখলে পানি বেশীক্ষণ ঠান্ডা থাকত। এলুমিনিয়াম বা কাশার হারি-কলসিতে পানি গরম হয়ে যেতো। তাই বাড়িতে কাশার কলসি থাকা সত্যেও মাটির কলসিতে পানি সংরক্ষণ করা হতো। কাশার কলসিকে আমরা কলসি বলতাম কিন্তু মাটির কলসিকে বলতাম কলস।ীভাবে বলতাম “ভরা কলস নড়ে না।” মাটির তৈরি সবচেয়ে বড় যে পাত্রটি ছিল তার নাম ছিল জালা। জালায় ধান রাখা হতো। এর রঙ ছিল কালো। এর চেয়ে একটু ছোট ছিল কোলা বা রাইং। কোলা লালচে রঙের ছিল। কোলায় রাখা হতো চাউল। ভাত রান্না করা হত যেটিতে তার নাম ছিল বুরকা। বুরকার ঢাকনার নাম ছিল খোরা। তরকারি বা সালুন রান্না করা হতো পাতিলে বা পাইল্লায়। পাইল্লার ঢাকনির নাম ছিল চাপনি বা পাইল চাপনি। ভাত রাখা হতো গামলায়। সালুন বাড়া হতো বাটিতে। খাওয়া হতো হানকিতে (সানকিতে)। এখন পহেলা বৈসাখে আমরা সানকিতে পান্তাভাত খাই আমাদের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য। পানি পানের ক্ষেত্রে কিন্তু কেউ মাটির গ্লাস ব্যবহার করতো না। এলুমিনিয়াম, কাঁচ অথবা কাশার গ্লাস ব্যবহার করা হত। উপহার হিসাবে সাধারণত কাশার ক্রোকারিজ দেয়া হত। নতুন জামাইদেরকে করইর থালায় খাবার দিতো। চিনামাটি বা পোরসেলিনের প্লেটকে বলা হতো করইর থালা বা থালি। করইর থালি সহজে ভেংগে যেতো। তাই এই গুলিকে সাধারণত শিকেয় তুলে রাখা হতো। মাটির সানকিও সহজে ভেংগে যেতো। তাই সাধারণত টিনের থালা ব্যবহার হতো। গরুর খাবার দেয়া হতো চারীতে।

 

যাহোক, সেই ঝগরমানের কুমারগণ ঝাকাভর্তি পাক পাতিল নিয়ে বাইরবাড়ি এসে দাড়াতেন। মাথা থেকে ঝাকা নামানোর জন্য গ্রামের একজনকে সহযোগিতা করতে হতো। ছেলেরা হারি পাতিল নিয়ে বাড়ির ভিতর যেতো মেয়েদেরকে দেখানোর জন্য। মেয়েরা পছন্দের পাতিলে বাম হাত দিয়ে ধরে ডান হাতে থাপ্পর দিয়ে শব্দ শুনতেন। ভাংগা থাকলে বুঝা যেতো। শিশুদের জন্যও মাটির খেলনা আনতেন সেই ঝাকার মধ্যে। আমি মাটির ঘোড়া কিনতাম। সোমেলা কিনতো মাটির খুটি মুচি বা খেলনা পাক পাতিল। কেনার পর দাম পরিশোধ করা হত চিটাধান দিয়ে। চিটাধান হলো ধান প্রসেস করার সময় চেপটা চিটার সাথে কিছু নিম্নমানের মিশ্রিত ধান। মেয়েরা কষ্ট করে চিটা বাছাই না করে চিটাধান এইসব কেনার কাজে ব্যবহার করতেন। মৌসুমের সময় ফেরিওয়ালাগণ জিনিস বিক্রি করে চিটাধান সংগ্রহ করে মৌসুমের শেষে চিটা থেকে ধান আলাদা করতেন। এই ধানে তাদের সংসার ছয়মাস চলতো। ছয়মাস পর আমন ধানের মৌসুম আসতো। সেই ধানে তাদের বাকী ছয়মাস চলে যেতো। পাহাড়ি আউশধান প্রধানত ভাতুরি ধান ছিল। ভাতুরি ধানের সাথে কালো রঙের ঘাসের বিচি মিশে যেতো। ভাতুরি ধানের চাউলের ভাতের সাথে ঘাসের বিচির মিশ্রন একটা বিরক্তিকর ছিল। চিটাধানের সাথে অনেক ঘাসের বিচি চলে যেতো।

 

বাইন্যারা ছিলেন এলাকারই। বাইন্যাদের নাম পরিচয় আমার এই লেখায় দেয়া ঠিক হবে না। তাই তাদের পরিচয় লিখলাম না। আমাদের পাশের গ্রামের একজন বাইন্যা ছিলেন। দূর সম্পর্কের চাচা ছিলেন। তাই তিনি আমাদের বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেন। তিনি বাঁশের বাইকে (ভার) ঝাকা ঝুলিয়ে কাঁধে নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে কদুর তেল, হিমকবরি তেল, স্নো, পাউডার, সজ মশল্লা বিক্রি করতেন। মা ঝাকা থেকে এইসব বের করে পছন্দমত জিনিস কিনতেন। বাবার হাট থেকে আনা জিরার চেয়ে বাইন্যার কাছ থেকে মার পছন্দ করা জিরার রান্না বেশী স্বাদের হতো।মা যখন বসে বসে ঝাকা থেকে স্নো পাউডার বের করতেন আমি তখন মার পিঠ ঘেষে দাঁড়িয়ে সেসব দেখতাম। সেখানে হুইশাল বাঁশীও থাকতো। মা আমাকে হুইশাল বাঁশী কিনে দিতেন। সেই বাঁশীর ভিতর একটা ছোট্ট গোল বল থাকতো। ফু দিলে বল ঘুরতে থাকতো আর শব্দ হতো। মার কানের কাছে গিয়ে হুইশাল বাজাতাম। মা কান চেপে ধরে সরে যেতে বলতেন দূরে। মসলা বিক্রি করতে করতে সেই বাইন্যা চাচার শরীরও মসলার বাস্না (ঘ্রাণ) করতো। আমি নাক দিয়ে সেই ঘ্রাণ নিতাম। জিরার ঘ্রাণ আমার ভালো লাগতো। তাই আমি এখনো দোকান থেকে জিরাপানির বোতল কিনে খাই।

 

সান্দার নামে এক প্রকার ফেরিওয়ালা আসতেন আমাদের বাড়িতে। তাদের বাড়ি সাভার এলাকায় ছিল। মৌসুমের সময় আমাদের এলাকায় এসে ধনী বাড়িদের বাংলাঘরে বা বারান্দায় অস্থায়ি ভাবে থাকতেন। মেয়ে সান্দাররা বাড়িতে প্রবেশ করে চুরি বিক্রি করতেন। মার পছন্দ করা চুরি মার হাতে পরিয়ে দিতেন। মা বেশ ফর্সা ছিলেন। আঙুলগুলি জড়সড় করে জোর করে সান্দার মার হাতে চুরি তুলে দিতেন। মা আংগুলের গিরায় ব্যথা পেয়ে উ আ করে মুখ লাল করে ফেলতেন। আমি কষ্টের সাথে মার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। হাতে চুরি উঠে গেলে মা উৎফুল্ল হতেন। আমিও উৎফুল্ল হতাম। সান্দারের ঝাকায় কাঁচের মার্বেল গুটির খেলনা ছিল। মা আমাকে মার্বেল গুটি কিনে দিতেন। আমি মজি ভাই, জিন্না ভাই, শাহজাহান ও মুকুলের সাথে মার্বেল গুটি খেলতাম। দূর থেকে আওয়াজ আসতো “নই টানা, মাখন টানা, বাদাম টানা, গোলগোলি ভাজা, ভাজা বুট।” আমরা খেলাধুলা বাদ দিয়ে দৌড়ে বাড়ি থেকে ঝার্না (কুলা) ও কাঠায় করে চিটা ধান নিয়ে বের হতাম। কিনে রাখতাম এই সব মিষ্টি জাতীয় জিনিস গ্রাম্য সেই ফেরিওয়ালার কাছ থেকে। এই ফেরিওয়ালার বাড়ি ছিল বল্লা।এলাকায় থেকে বাচ্চাদের মিঠা জিনিস বিক্রি করতেন। তিনিও হিন্দু ছিলেন। পরতেন ধুতি। খেতাম মজা করে চোটকিয়ে চোটকিয়ে। খেলার সাথীদের দেখিয়ে দেখিয়ে।

 

কত আর লিখব। আরও কত রকম ফেরিওয়ালা ছিল! তেল নিয়ে আসতেন কুলু। মা তেল রাখতেন। খাটি, ঘানিতে ভাংগানো সরিষার তেল। কি বাস্না! মাথা পেতে দিতাম তেল দিয়ে দিতে। কাচা মরিচ, পিয়াজ কেটে মা মুড়ি বানিয়ে দিতেন সেই তেল দিয়ে। কি যে স্বাদ ছিল সেই মুড়ির!

 

সেই নইটানা বাদাম টানা খেতাম আমরা ছোটরা। কিন্তু মা বাবা খেতেন না। মাকে খেতে বলতাম। খেতেন না। মনে করতাম বড় মানুষ তো এখন ছোটদের খাবার খেতে লজ্জা পান। তাই হয়ত খান না। আমি এখন বড় হয়েছি। নিজের সন্তানকে বড় হতে দেখেছি। নাতীকেও বড় হতে দেখছি। সন্তান যখন ছোট ছিল তারাও আমাকে তাদের পছন্দের জিনিস খেতে অফার করতো। নাতীও তার পছন্দের খাবার খেতে আমাকে অফার করে। আমি মুখে দেই। কিন্তু আমি আমাদের সেই গ্রামের ফেরিওয়ালাদের নই টানা, মাখন টানা,বাদাম টানা, গোলগোলি ভাজা, কাঠগজা, রস গজা, জিলাপি, ভাজা বুটের মতো স্বাদ পাই না। কারন, সেগুলি ছিল আমাদের ফেরিওয়ালার। এখনো কি তারা গ্রামে এসে ডাকে “এই মাখন টানা, ভাজা বুট?”

১৭/৬/২০১৯ খ্রি.

ময়মনসিংহ -কিশোরগঞ্জ -ময়মনসিংহ জার্নি

 

 

 

মীর্জা স্যার হজ্জ করলেন

মীর্জা স্যার হজ্জ করলেন
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

২০০৫ সনের জানুয়ারি মাসে হজ্জ করে দেশে ফিরলাম। এই ৪০ দিনে অনেক কাবু হয়ে পড়েছিলাম। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলাম। আগের মতো কর্মস্পৃহা পেলাম না। মীর্জা হামিদুল হক স্যার ছিলেন Continue reading “মীর্জা স্যার হজ্জ করলেন”

যেভাবে দাড়ি রাখলাম

যেভাবে দাড়ি রাখলাম
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমরা হজ্জ করার উদ্যেশ্যে বাংলাদেশ বিমানে করে ঢাকা থেকে জেদ্দা বিমান বন্দরে গিয়ে নামলাম। সাথে আমার স্ত্রী স্বপ্নাও ছিল। এটা ২০০৪ সনের শেষের দিকে। আমাদের ৪৫ জনের কাফেলাটি একটা বাসে করে মদিনায় চলে গেলাম। মদিনায় গিয়ে অনেকগুলি উদ্যেশ্যের মধ্যে একটা উদ্যেশ্য ছিল ৮ দিন অবস্থান করে এক নাগারে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ পড়া। আমরা ভাড়া করা Continue reading “যেভাবে দাড়ি রাখলাম”

হজ্জ করলাম

হজ্জ করলাম
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

একসময় এলাকার মেধাবী ছাত্রছাত্রীদেরকে প্রতিবছর পুরস্কৃত করতাম। আমার বাড়ি সখিপুরের ঢ্নডনিয়ায়। আমার বাড়ি থেকে সবচেয়ে কাছের ১৪ টি স্কুলের ২৮ জন মেধাবী ছাত্রছাত্রীকে অনুষ্ঠান করে সম্বর্ধনা দিতাম। সব স্কুলের শিক্ষক Continue reading “হজ্জ করলাম”

মিয়া কাক্কুর মাতাব্বরি

মিয়া কাক্কুর মাতাব্বরি
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বাবার চাচা মেছের উদ্দিন তালুকদারের ছিল ৫ ছেলে। সবার ছোট ছেলে সালাম তালুকদারকে আমরা ডাকতাম ছোট কাক্কু। ছোট কাক্কু তার প্রথম ভাই সোলায়মান তালুকদারকে ডাকতেন বড় ভাই, ২য় ভাই শাসসুদ্দিন তালুকদারকে ডাকতেন মেঝো ভাই, ৩য় ভাই হাছেন আলী তালুকদারকে ডাকতেন সাজ ভাই, ৪র্থ ভাই কাশেম তালুকদারকে ডাকতেন মিয়া ভাই। আমরা তাদের ভাতিজা হিসাবে ডাকতাম যথাক্রমে বড় কাক্কু, ডাক্তার কাক্কু, মাজ কাক্কু ও মিয়া কাক্কু। মিয়া কাক্কু এলাকায় মাতাব্বরি বা মাদবরি করতেন ।

একদিন কথাপ্রসঙ্গে তিনি একটা মাদবরির কথা আমাকে বলেছিলেন। আন্দি না বেরীখোলা গ্রাম এখন আমার মনে আসছে না। সেই গ্রামে জমি নিয়ে একটা কয়চান (ঝগড়া) ছিল শরীকদের মধ্যে। সেই কয়চান মিটানোরর জন্য সাত গ্রামের মানুষ জড়ো হয়েছিল একটা সালিশে। সেই সালিশে সাত গ্রামের বড় বড় মাদবর উপস্থিত ছিলেন। বাসার চালার কায়েম উদ্দিন সরকারও উপস্থিত ছিলেন। একে একে সব বড় বড় মাদবরগণ বিচার করে বিফল হলেন। তাদের বিচার কোন পক্ষই মেনে নিলো না। হট্টগোল শুরু হয়ে গেলো। মারমুখী ভাব উভয় পক্ষে। মিয়া কাক্কু চুপ চাপ বসেছিলেন। কাক্কুর স্বভাবই ছিল কম কথা বলা। যা বলতেন কাজের কথা বলতেন। শেষে নিরুপায় হয়ে একে একে সবাই বিচারের ভার দিলেন মিয়া কাক্কুর কাছে। সবাই একযোগে অনুরোধ করলেন “তালুকদার সাব বিচারটা করেন। ” মিয়া কাক্কু বিচারের ভার নিতে অস্বীকৃতি জানালেন। সবাই বেশী করে অনুরোধ করলে মিয়া কাক্কু বললেন “আপনারা তো আমার উপর বিচারের ভার দিচ্ছেন। আমি বিচার করে রায় দিলে উভয় পক্ষ মেনে নিবেন কিনা তা জেনেছেন?” উভয়পক্ষ হাত উঠিয়ে সম্মতি প্রকাশ করল। উপস্থিত জনগণও হাত উঠিয়ে সম্মতি জানালো। কাক্কু বললেন ” আমি যা বিচার করব তা আপনারা সবাই যদি মেনে নেন, তাহলে আমি বিচার করব, না হলে করব না। ” সবাই এক যোগে “হ্যা”বললেন। কাক্কু জমির দলিল পত্র উভয় পক্ষ থেকে নিয়ে নিলেন। পড়ে দেখলেন। দলিল মুড়িয়ে চোঙা বানিয়ে ফিতা দিয়ে বাঁধলেন। মাঠের এক কোণায় রেখে দিয়ে বললেন “আমি যদি বিচার করি তাহলে আপনারা কেউ এই দলিল দেখতে পারবেন না। এই যে আমি দলিল বেধে রেখে দিলাম। যতদিন আমার রায় অনুসারে দেয়া জমি আপনারা ভোগ করবেন ততদিন কেউ এই দলিল খুলে দেখতে পারবেন না। রাজী আছেন?” সবাই রাজী হলে কাক্কু জমি দেখিয়ে বললেন “এই জমিটুকু তোমার আর এই জমিটুকু ওনার।” কেউ আর এর দ্বিমত করতে পারলো না। কারন, সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে বিচার যাই হোক মেনে নিতে হবে।
আমি বললাম “কাক্কু, আপনি দলিল বেধে রাখলেন কেন?” কাক্কু বললেন “ঐ দলিল গুলিই হল ঝগড়ার মুল কারন। দলিল দিয়ে বিচার করলে কোনদিন বিচার শেষ হবে না। তারপর তাদের মধ্যে আর জমি নিয়ে ঝগড়া হয় নাই। ”

কাক্কু ইন্দ্রজানী হাটে একটা মজার কাইন্ড ঘটিয়েছিলেন। আগের দিনে হাটে গরু ছাগল জবাই করে মাংস বিক্রেতারা কলারপাতা অথবা বাঁশের বেতীর ধাড়ি বিছায়ে ৫ টাকা, ১০ টাকার ভাগা দিয়ে মাংস বিক্রি করতো। পাহাড় অঞ্চলে ঘাসের খুব অভাব ছিল। বেশীভাগ গরু ছাগল অপুষ্ট বা খোয়ার ছিল। মাংসে তেল থাকতো না। তেলছাড়া মাংস স্বাদ লাগতো না। তাই সবাই তেলওয়ালা মাংস পছন্দ করতো। বিক্রেতারা মাংস ভাগা দেয়ার সময় হাড্ডি নিচে রেখে মাংস দিয়ে ঢেকে দিতো। মাংস লাল করার জন্য রক্ত মেখে দিতো। তেল তেল দেখানোর জন্য পেটের নাড়িভুঁড়ির তেল নিয়ে মাংসের ভাগার উপর দিয়ে ছড়িয়ে দিতো। এখন এর চেয়েও মানুষ বেশী চালাক হয়েছে। একি সাথে তাজা গরু ও প্রায় মরা গরু জবাই করে কৌশল করে মিক্সার করে করে বিক্রি করে। মাংস লাল করার জন্য কেমিকেল রঙ ব্যবহার করে। আরো কত কি যে করে। সব জানা কি আমাদের সম্ভব? ইন্দ্রজানীর হাটের সেই মাংস বিক্রেতার ভাগাগুলির উপর তেলের পর্দা দিয়ে ঢাকা ছিল। মিয়া কাক্কু ভিতরের মাংসের অবস্থা দেখার জন্য আংগুল দিয়ে পর্দা সরাতেই মাংস বিক্রেতা থাবা দিয়ে কাক্কুর হাত সরিয়ে দিয়ে পর্দা দিয়ে আবার মাংস ডেকে দেয়। তাতে কাক্কু অপমানিত বোধ করেন। কিন্তু কিছু না বলে তিনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন অনেক্ষণ। আরেকজন ক্রেতা কাক্কুর মতো করে যেই মাংসে আংগুল দিয়েছেন অমনি তার হাত থাবা মেরে সরিয়ে বিক্রেতা বলে “এই মিয়া ভাগা নষ্ট কর কেন?” শুরু হয়ে গেলো দুই জনের মধ্যে ঝগড়া। জনগণ কাক্কুর কাছে বিচার দিলে কাক্কু বললেন “আমি এখানে দাড়িয়েই ছিলাম। এই ব্যাটা তার হাতে থাবা মারছে। ব্যাটা মরা গরুর মাংস তেল দিয়ে ঢেকে বিক্রি করছে, আর আংগুল দিয়ে দেখলে থাবা মারে। ওর সব মাংস পাগাড়ে নিয়ে ফেলে দে।” বিক্রেতা বিপদে পড়ে কাক্কুর কাছে মাপ চাইল।

হাট থেকে ফেরার সময় জিজ্ঞেস করলাম “কাক্কু, আপনাকেও তো থাবা মেরেছিল। তখন কিছু বললেন না কেন?” “কাশেম তালুকদারকে কশাইয়ে থাবা মারছে মানুষ জানলে ইজ্জৎ যাবে। তাই তখন ঝামেলা না করে অপেক্ষা করছিলাম অনুরূপ আরেকজনের সাথে করুক। তখন বুঝা যাবে। ”
এমনই ছিল মিয়া কাক্কুর মাতাব্বরি।

১০/৬/২০১৯ ইং
ময়মনসিংহ

Continue reading “মিয়া কাক্কুর মাতাব্বরি”

জিরের দিন শেষ

জিরের দিন শেষ
(স্মৃতিরর পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

জিরের নাম মানুষ ভুলতে শুরু করেছে। বড় কৃমি বা ক্যাচোকৃমিকে বলা হত জির। আগের দিনে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ বিশেষ করে শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগত। ভাত যদিও কিছু যোগার হত কিন্তু প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাবার তারা পেতো না। আমিষের অভাবে তাদের কোয়াসিঅর্কর নামে একটা রোগ হতো। এই রোগে পেটটা মোটা, পাছা চিকন ও মুখ গোলাকার বা ফোলা Continue reading “জিরের দিন শেষ”

মাসুমের পায়ের ফোঁড়া

মাসুমের পায়ের ফোঁড়া
(রোগের গল্প)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

মাসুম ক্লাস ফোরে পড়ে। তার শরীরের ভিতরে কে কে বাস করে, আর কি কি চলাচল করে তা এখনো সে জানে না। তার হৃদপিন্ড রক্ত পাম্প করে। সারা শরীরের দুষিত রক্ত শিরার মাধ্যমে পাম্প করে এনে পালমোনারী ধমনির মাধ্যমে ফুসুফুসে Continue reading “মাসুমের পায়ের ফোঁড়া”

রক্তের কি পরীক্ষা করলে কিডনির অবস্থা জানা যায়?

রক্তের কি পরীক্ষা করলে কিডনির অবস্থা জানা যায়?
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আজকাল অনেকেই কিডনি নিয়ে চিন্তিত। বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে কিডনি খারাপ হয়ে মরে যাওয়ার সংবাদ শুনেই এমনটি হচ্ছে। অনেকে কোমড়ে ব্যাথা অনুভব হওয়াতেই মনে Continue reading “রক্তের কি পরীক্ষা করলে কিডনির অবস্থা জানা যায়?”