স্বপ্না আরাফার ময়দানে হারিয়েছিল

স্বপ্না আরাফার ময়দানে হারিয়েছিল
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

স্বপ্নাকে সাথে নিয়ে হজ্জ করছিলাম ২০০৫ সনের জানুয়ারি মাসে। স্বপ্না আমার স্ত্রী। মোজদালিফায় পৌছলাম। সেখানে নিয়ম হলো খোলা মাঠে আকাশের নিচে ঘুমাতে হয়। খুবই ইন্টারেস্টিং ইভেন্ট। কাফেলার সবাই চাদর বিছিয়ে পাশাপাশি শুলাম আমরা। একদিকে ছেলেরা, একদিকে মেয়েরা। ছেলেদের পরনে ছিল দুই টুকরা সাদা কাপড়। একটুকরা শরীরের উপরের অংশে, আরেক টুকরা শরীরে নিচের অংশে। মনে হচ্ছিল যেন আমার পৃথিবীতে আর কিছু নেই। নি:শ্ব এক ফকির। আকাশের দিকে চেয়ে তারা দেখছিলাম। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি রহস্য নিয়ে ভাবছিলাম। ঘুম আসছিল না। গভীর রাত্রি। একসময় পায়ের দিকে আড়া আড়ি চেয়ে দেখি স্বপ্না আমার দিকে টেল টেলি চেয়ে আছে। দেখে খুব মায়া হলো। ইশারা ইংগিতে জিজ্ঞেস করলাম “ঘুম আসছে না?” সেও ইশারায় বুঝালো যে তার ঘুম আসছে না।

Continue reading “স্বপ্না আরাফার ময়দানে হারিয়েছিল”

নুরুল আমিন ভাইর হাসি

নুরুল আমিন ভাইর হাসি
(স্মৃতিচারণ)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

একদিন আমার এক প্রাতঃভ্রমণের বন্ধু রেল ওয়ের পরিচালক নুরুল আমিন ভাইকে নিয়ে এলেন আমার চেম্বারে। তিনি পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন “আপনার ডায়াবেটিস চেক করার জন্য এই ল্যাবরেটরিতে রক্ত দেবেন। সঠিক রেজাল্ট পাবেন।” শুনে পরিচালক একটা অট্টহাসি দিলেন “হা, হা, হা।” আমি চমকে উঠলাম। শুনে পাশের রুম থেকে আমার সহকারী এসে পড়ল কি হয়েছে মনে করে। হাসি কি বিকট হাসি। আমি বললাম “ভাই, কি হয়েছে? এমন হাসলেন কেন?” তিনি আরো জোড়ে হাসলেন “হা, হা, হা।” আমরা আবারো চমকে উঠলাম। আবার জানতে চাইলাম “হাসলেন কেন, এভাবে?” এবার তিনি তার সামনের রুপালী দুইটি দাত বের করে মিষ্টি করে বললেন “আমাকে একজন শিখিয়ে দিয়েছেন “বেশী বেশী হাসবেন। হাসলে সুস্থ থাকবেন। তাই খুশীর সংবাদেও হাসি, দুঃখের সংবাদেও হাসি।” Continue reading “নুরুল আমিন ভাইর হাসি”

গ্রামের সেইসব ফেরিওয়ালা

গ্রামের সেইসব ফেরিওয়ালা
(স্মৃতিচারণ)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ফেরিওয়ালা কথার অর্থটা বুঝেছি ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় প্রাইমারি স্কুল বৃত্তি পরীক্ষা দেয়ার পর কালিহাতি থেকে টাংগাইল শহরে গিয়ে আমার প্রথম দেখা সিনেমা ‘মানুষের মন’ দেখার পর থেকে। এটা ছিল ১৯৭২ সনের প্রথম দিকে। সেই সিনেমায় নায়ক রাজ রাজ্জাক সাইকেলের চার চাকার ঠেলা গাড়ি নিয়ে খেলনা বিক্রি করছিলেন শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে গেয়ে। গানটি ছিল এমন:
এই শহরে আমি যে এক নতুন ফেরিওয়ালা।।
হরেক রকম সওদা নিয়ে ঘুরি সারা বেলা।
ফেরিওয়ালা।


চার চাকাতে ভাগ্য বে^ধে বুঝে নিলাম ভাই,
সব জিনিসের মূল্য আছে,
মানুষের দাম নাই।।


এরা ত হলেন শহরের ফেরিওয়ালা। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রেতার কাছে নিয়ে আসে বিক্রি করার জন্য। হাটে গিয়ে আমরা জিনিসপত্র কিনতাম দোকান থেকে। মেয়েরা ও শিশুরা তো হাটে যেতে পারতো না। তাদের জন্য ছিল গ্রামের ফেরিওয়ালা। কিন্তু তাদেরকে কেউ ফেরিওয়ালা বলে জানতো না। তাদেরকে জানতো বাইন্যা, কুমার, নইটানাওয়ালা, গজাওয়ালা, হান্দার (সান্দার), বাইদা (বেদে), গুড়ওয়ালা, বেপারী /কুলু ইত্যাদি নামে।

 

আমি যে সময়ের কথাগুলি বলছি সেগুলি স্বাধীনতা যুদ্ধের আগের কথা। আমার শিশুকাল ও প্রাইমারি স্কুল জীবনের সময়ের কথা। আমাদের গ্রামের বাড়ি ঢনডনিয়া থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূর কালিহাতির কাছের ঝকগরমান গ্রাম থেকে দুইজন কুমার আসতেন বছরে দুইবার। একবার আসতেন শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে আরেকবার আসতেন মাঘ-ফাল্গুন মাসে। আউশ ও আমন ধান কাটা শেষ হলে। বর্ষাকালে তারা বল্লা ও কালিহাতির কুমারদের হাতে বানানো মাটির পাক পাতিল নৌকাভর্তি করে এনে ছোট চওনার ঘাটে এনে নামাতেন। সেখান থেকে ঝাকাভর্তি করে এনে জিতেশ্বরির একটা বাড়িতে রাখতেন। তারা দুইজনই হিন্দু ছিলেন। প্রতিদিন সকালবেলা দুইজন ঝাকাভর্তি করে মাথায় নিয়ে গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে পাক-পাতিল বিক্রি করতেন। পরনে থাকতো শুধু একটি মাত্র ধুতি। লিক লিকে শরীর ছিল তাদের। লম্বা গড়ন। ঝাকা মাথায় পিঠ সোজা করে হাটতেন। উচ্চ স্বরে ডাক দিতেন “রাখবেন পাক পাতিল।”

 

সেই সময় আমাদের এলাকায় এলুমিনিয়ামের ক্রোকারিজ খুব কম পাওয়া যেতো। বেশীভাগই মাটির তৈরি হারি পাতিল ছিল। প্রায় সব কাজেই এই সব মাটির জিনিসপত্র ব্যবহার করা হতো। ব্যবহার করা স্বাস্থ্য সম্মতও ছিল। মাটির হারি-কলসিতে পানি রাখলে পানি বেশীক্ষণ ঠান্ডা থাকত। এলুমিনিয়াম বা কাশার হারি-কলসিতে পানি গরম হয়ে যেতো। তাই বাড়িতে কাশার কলসি থাকা সত্যেও মাটির কলসিতে পানি সংরক্ষণ করা হতো। কাশার কলসিকে আমরা কলসি বলতাম কিন্তু মাটির কলসিকে বলতাম কলস।ীভাবে বলতাম “ভরা কলস নড়ে না।” মাটির তৈরি সবচেয়ে বড় যে পাত্রটি ছিল তার নাম ছিল জালা। জালায় ধান রাখা হতো। এর রঙ ছিল কালো। এর চেয়ে একটু ছোট ছিল কোলা বা রাইং। কোলা লালচে রঙের ছিল। কোলায় রাখা হতো চাউল। ভাত রান্না করা হত যেটিতে তার নাম ছিল বুরকা। বুরকার ঢাকনার নাম ছিল খোরা। তরকারি বা সালুন রান্না করা হতো পাতিলে বা পাইল্লায়। পাইল্লার ঢাকনির নাম ছিল চাপনি বা পাইল চাপনি। ভাত রাখা হতো গামলায়। সালুন বাড়া হতো বাটিতে। খাওয়া হতো হানকিতে (সানকিতে)। এখন পহেলা বৈসাখে আমরা সানকিতে পান্তাভাত খাই আমাদের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য। পানি পানের ক্ষেত্রে কিন্তু কেউ মাটির গ্লাস ব্যবহার করতো না। এলুমিনিয়াম, কাঁচ অথবা কাশার গ্লাস ব্যবহার করা হত। উপহার হিসাবে সাধারণত কাশার ক্রোকারিজ দেয়া হত। নতুন জামাইদেরকে করইর থালায় খাবার দিতো। চিনামাটি বা পোরসেলিনের প্লেটকে বলা হতো করইর থালা বা থালি। করইর থালি সহজে ভেংগে যেতো। তাই এই গুলিকে সাধারণত শিকেয় তুলে রাখা হতো। মাটির সানকিও সহজে ভেংগে যেতো। তাই সাধারণত টিনের থালা ব্যবহার হতো। গরুর খাবার দেয়া হতো চারীতে।

 

যাহোক, সেই ঝগরমানের কুমারগণ ঝাকাভর্তি পাক পাতিল নিয়ে বাইরবাড়ি এসে দাড়াতেন। মাথা থেকে ঝাকা নামানোর জন্য গ্রামের একজনকে সহযোগিতা করতে হতো। ছেলেরা হারি পাতিল নিয়ে বাড়ির ভিতর যেতো মেয়েদেরকে দেখানোর জন্য। মেয়েরা পছন্দের পাতিলে বাম হাত দিয়ে ধরে ডান হাতে থাপ্পর দিয়ে শব্দ শুনতেন। ভাংগা থাকলে বুঝা যেতো। শিশুদের জন্যও মাটির খেলনা আনতেন সেই ঝাকার মধ্যে। আমি মাটির ঘোড়া কিনতাম। সোমেলা কিনতো মাটির খুটি মুচি বা খেলনা পাক পাতিল। কেনার পর দাম পরিশোধ করা হত চিটাধান দিয়ে। চিটাধান হলো ধান প্রসেস করার সময় চেপটা চিটার সাথে কিছু নিম্নমানের মিশ্রিত ধান। মেয়েরা কষ্ট করে চিটা বাছাই না করে চিটাধান এইসব কেনার কাজে ব্যবহার করতেন। মৌসুমের সময় ফেরিওয়ালাগণ জিনিস বিক্রি করে চিটাধান সংগ্রহ করে মৌসুমের শেষে চিটা থেকে ধান আলাদা করতেন। এই ধানে তাদের সংসার ছয়মাস চলতো। ছয়মাস পর আমন ধানের মৌসুম আসতো। সেই ধানে তাদের বাকী ছয়মাস চলে যেতো। পাহাড়ি আউশধান প্রধানত ভাতুরি ধান ছিল। ভাতুরি ধানের সাথে কালো রঙের ঘাসের বিচি মিশে যেতো। ভাতুরি ধানের চাউলের ভাতের সাথে ঘাসের বিচির মিশ্রন একটা বিরক্তিকর ছিল। চিটাধানের সাথে অনেক ঘাসের বিচি চলে যেতো।

 

বাইন্যারা ছিলেন এলাকারই। বাইন্যাদের নাম পরিচয় আমার এই লেখায় দেয়া ঠিক হবে না। তাই তাদের পরিচয় লিখলাম না। আমাদের পাশের গ্রামের একজন বাইন্যা ছিলেন। দূর সম্পর্কের চাচা ছিলেন। তাই তিনি আমাদের বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেন। তিনি বাঁশের বাইকে (ভার) ঝাকা ঝুলিয়ে কাঁধে নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে কদুর তেল, হিমকবরি তেল, স্নো, পাউডার, সজ মশল্লা বিক্রি করতেন। মা ঝাকা থেকে এইসব বের করে পছন্দমত জিনিস কিনতেন। বাবার হাট থেকে আনা জিরার চেয়ে বাইন্যার কাছ থেকে মার পছন্দ করা জিরার রান্না বেশী স্বাদের হতো।মা যখন বসে বসে ঝাকা থেকে স্নো পাউডার বের করতেন আমি তখন মার পিঠ ঘেষে দাঁড়িয়ে সেসব দেখতাম। সেখানে হুইশাল বাঁশীও থাকতো। মা আমাকে হুইশাল বাঁশী কিনে দিতেন। সেই বাঁশীর ভিতর একটা ছোট্ট গোল বল থাকতো। ফু দিলে বল ঘুরতে থাকতো আর শব্দ হতো। মার কানের কাছে গিয়ে হুইশাল বাজাতাম। মা কান চেপে ধরে সরে যেতে বলতেন দূরে। মসলা বিক্রি করতে করতে সেই বাইন্যা চাচার শরীরও মসলার বাস্না (ঘ্রাণ) করতো। আমি নাক দিয়ে সেই ঘ্রাণ নিতাম। জিরার ঘ্রাণ আমার ভালো লাগতো। তাই আমি এখনো দোকান থেকে জিরাপানির বোতল কিনে খাই।

 

সান্দার নামে এক প্রকার ফেরিওয়ালা আসতেন আমাদের বাড়িতে। তাদের বাড়ি সাভার এলাকায় ছিল। মৌসুমের সময় আমাদের এলাকায় এসে ধনী বাড়িদের বাংলাঘরে বা বারান্দায় অস্থায়ি ভাবে থাকতেন। মেয়ে সান্দাররা বাড়িতে প্রবেশ করে চুরি বিক্রি করতেন। মার পছন্দ করা চুরি মার হাতে পরিয়ে দিতেন। মা বেশ ফর্সা ছিলেন। আঙুলগুলি জড়সড় করে জোর করে সান্দার মার হাতে চুরি তুলে দিতেন। মা আংগুলের গিরায় ব্যথা পেয়ে উ আ করে মুখ লাল করে ফেলতেন। আমি কষ্টের সাথে মার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। হাতে চুরি উঠে গেলে মা উৎফুল্ল হতেন। আমিও উৎফুল্ল হতাম। সান্দারের ঝাকায় কাঁচের মার্বেল গুটির খেলনা ছিল। মা আমাকে মার্বেল গুটি কিনে দিতেন। আমি মজি ভাই, জিন্না ভাই, শাহজাহান ও মুকুলের সাথে মার্বেল গুটি খেলতাম। দূর থেকে আওয়াজ আসতো “নই টানা, মাখন টানা, বাদাম টানা, গোলগোলি ভাজা, ভাজা বুট।” আমরা খেলাধুলা বাদ দিয়ে দৌড়ে বাড়ি থেকে ঝার্না (কুলা) ও কাঠায় করে চিটা ধান নিয়ে বের হতাম। কিনে রাখতাম এই সব মিষ্টি জাতীয় জিনিস গ্রাম্য সেই ফেরিওয়ালার কাছ থেকে। এই ফেরিওয়ালার বাড়ি ছিল বল্লা।এলাকায় থেকে বাচ্চাদের মিঠা জিনিস বিক্রি করতেন। তিনিও হিন্দু ছিলেন। পরতেন ধুতি। খেতাম মজা করে চোটকিয়ে চোটকিয়ে। খেলার সাথীদের দেখিয়ে দেখিয়ে।

 

কত আর লিখব। আরও কত রকম ফেরিওয়ালা ছিল! তেল নিয়ে আসতেন কুলু। মা তেল রাখতেন। খাটি, ঘানিতে ভাংগানো সরিষার তেল। কি বাস্না! মাথা পেতে দিতাম তেল দিয়ে দিতে। কাচা মরিচ, পিয়াজ কেটে মা মুড়ি বানিয়ে দিতেন সেই তেল দিয়ে। কি যে স্বাদ ছিল সেই মুড়ির!

 

সেই নইটানা বাদাম টানা খেতাম আমরা ছোটরা। কিন্তু মা বাবা খেতেন না। মাকে খেতে বলতাম। খেতেন না। মনে করতাম বড় মানুষ তো এখন ছোটদের খাবার খেতে লজ্জা পান। তাই হয়ত খান না। আমি এখন বড় হয়েছি। নিজের সন্তানকে বড় হতে দেখেছি। নাতীকেও বড় হতে দেখছি। সন্তান যখন ছোট ছিল তারাও আমাকে তাদের পছন্দের জিনিস খেতে অফার করতো। নাতীও তার পছন্দের খাবার খেতে আমাকে অফার করে। আমি মুখে দেই। কিন্তু আমি আমাদের সেই গ্রামের ফেরিওয়ালাদের নই টানা, মাখন টানা,বাদাম টানা, গোলগোলি ভাজা, কাঠগজা, রস গজা, জিলাপি, ভাজা বুটের মতো স্বাদ পাই না। কারন, সেগুলি ছিল আমাদের ফেরিওয়ালার। এখনো কি তারা গ্রামে এসে ডাকে “এই মাখন টানা, ভাজা বুট?”

১৭/৬/২০১৯ খ্রি.

ময়মনসিংহ -কিশোরগঞ্জ -ময়মনসিংহ জার্নি

 

 

 

মীর্জা স্যারকেও হজ্জ করালাম

মীর্জা স্যারকেও হজ্জ করালাম
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

২০০৫ সনের জানুয়ারি মাসে হজ্জ করে দেশে ফিরলাম। এই ৪০ দিনে অনেক কাবু হয়ে পড়েছিলাম। নিজেকে বেশ শুদ্ধ মানুষ ভাবতাম। যাকে পেতাম তাকেই বিভিন্ন বিষয়ে হেদায়েত করার চেষ্টা করতাম । হজ্জ করার গুরত্ব তুলে ধরতাম । যুবক বয়সেই হজ্জ করতে হয় তা যুবক শ্রেণীর লোকদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করতাম । অনেকেই এমন বলতেন “আমি আর কয়েকটা বছর পর হজ্জ করে দাড়ি রাখবো।” তারা মনে করতেন হজ্জ করলে দাড়ি রাখতে হয় । হয়তো দাড়ি রাখার ভয়েই হজ্জ করছেন না । আমি সেই ভয় ভাঙ্গিয়ে বলতাম “হজ্জের সাথে দাড়ি রাখার সম্পর্ক নেই।” আমি দাড়ি রেখে টুপি মাথায় দিয়ে রাখতাম । বিজ্ঞজনের মতো কথা বলতাম । তখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলাম। হজ্জ থেকে ফিরে আগের মতো কর্মস্পৃহা পেলাম না। মীর্জা হামিদুল হক স্যার ছিলেন বিভাগীয় প্রধান। স্যার খুব ভ্রমণ পিপাসু ছিলেন। বিশ্বের সব গুরুত্বপুর্ণ পর্যটন স্থান তার দেখা প্রায় শেষ। দেশেরও সব কিছু তার দেখা শেষ। যেসব দুর্দম জায়গায় কেউ যেতে পারেনা সেইসব জায়গায়ও তিনি ছদ্মবেশ ধরে যেতেন। সেইসব কাহিনী শোনার একমাত্র একাগ্র শ্রোতা ছিলাম আমি। হজ্জ থেকে এসে আমার খুব ইচ্ছা হতো হজ্জের দিনগুলির কথা অন্যের কাছে বলতে। মীর্জা স্যারের কাছেও বলতে ইচ্ছা হতো। শুরু করতাম বলতে। কিন্তু তিনি শুনতে তেমন আগ্রহ দেখাতেন না । উল্টো আমার কথা কেরে নিয়ে ইসলামের বিধানে যেগুলি নেই অথচ সেগুলি ইসলামের মধ্যে ঢুকে গেছে এমন সব নেতিবাচক কথাগুলি বলে আমাকে থামিয়ে দিতেন। স্যার ছিলেন আমার শ্রদ্ধার পাত্র। তাই স্যারের কথাই শুনতাম বসে বসে। স্যার নামাজ রোজা কম করতেন।

Continue reading “মীর্জা স্যারকেও হজ্জ করালাম”

যেভাবে দাড়ি রাখলাম

যেভাবে দাড়ি রাখলাম
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

আমরা হজ্জ করার উদ্যেশ্যে বাংলাদেশ বিমানে করে ঢাকা থেকে জেদ্দা বিমান বন্দরে গিয়ে নামলাম। সাথে আমার স্ত্রী স্বপ্নাও ছিল। এটা ২০০৪ সনের শেষের দিকে। আমাদের ৪৫ জনের কাফেলাটি একটা বাসে করে মদিনায় চলে গেলাম। মদিনায় গিয়ে অনেকগুলি উদ্যেশ্যের মধ্যে একটা উদ্যেশ্য ছিল ৮ দিন অবস্থান করে মসজিদে নববীতে  এক নাগারে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ পড়া। আমরা ভাড়া করা বাসায় পৌঁছার পরপরই যোহরের নামাজের আজান পড়ে গেলো। দ্রুত জামাত ধরার জন্য চলে গেলাম মসজিদে নববীর দিকে। দেখলাম নামাজ শুরু হয়ে গেছে। একটা জায়গা ফাকা পেয়ে জায়নামাজ বিছিয়ে তকবিরে তাহরিমা দিয়ে হাত বেঁধে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলাম। হঠাৎ এক পুলিশ আমার ডান বাহু ধরে টান মেরে জায়নামাজ থেকে সরিয়ে দিয়ে আরেক হাতে আমার জায়নামাজ নিয়ে বললেন “ইয়া হাজ্জ, তরিক, তরিক!” আমি কিছুই বুজলাম না । পুলিশ আমার জায়নাজটা ছুড়ে মারলেন অনেক দূরে । তিনি আরবী ভাষায় কি যেনো বলছিলেন এবং যেভাবে হাত ঘুরালেন তাতে আমি বুঝে নিলাম “এটা রাস্তা। রাস্তায় নামাজ পড়া নিষেধ।”

Continue reading “যেভাবে দাড়ি রাখলাম”

হজ্জের নিয়ত করলাম যেভাবে

হজ্জের নিয়ত করলাম যেভাবে
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

একসময় এলাকার মেধাবী ছাত্রছাত্রীদেরকে প্রতিবছর পুরস্কৃত করতাম। আমার বাড়ি সখিপুরের ঢনডনিয়ায়। আমার বাড়ি থেকে সবচেয়ে কাছের ১৪ টি স্কুলের ২৮ জন মেধাবী ছাত্রছাত্রীকে অনুষ্ঠান করে সম্বর্ধনা দিতাম। সব স্কুলের শিক্ষক প্রতিনিধিগণ অন্যান্য ছাত্রছাত্রী নিয়ে সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেন। ইন্দ্রজানী হাই স্কুলের আব্দুল হামিদ স্যার প্রতিবছর সেই অনুষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপস্থিত থাকতেন। ২০০৪ সনের অনুষ্ঠানটি হয়েছিল কচুয়া পাবলিক হাই স্কুলে। হামিদ স্যার তার বক্তব্য পেশ করার সময় আমাকে উদ্যেশ্য করে বললেন “সাদেক যা যা করছে নিঃসন্দেহে সেগুলি ভালো কাজ। আমি জানি, তার এখন টাকা পয়সা হয়েছে। শহরে জমি জমাও কিনেছে। বিদেশ ভ্রমণ করছে। যেসব দেশ সে ভ্রমণ করেছে সেই সব দেশ ভ্রমণ করতে যে টাকা খরচ হয়েছে সেই টাকায় হজ্জ করা সম্ভব হতো। অর্থাৎ তার হজ্জ করা ফরজ হয়েছে। হজ্জের বিধান হলো কারো যদি হজ্জ করার সামর্থ্য হয় তার জন্য হজ্জ করা ফরজ। আমি তাকে অনুরোধ করব যেন এই কাজটি করে ফেলেন।” শুনে আমার অন্তরে বুঝ এলো। আমি যদি গচ্ছিত টাকা বিভিন্ন খাতে খরচ করে ফেলি তাহলে আমার হজ্জ করা সম্ভব হবে না। তাই মনস্থির (নিয়ত) করে ফেললাম এইবারই হজ্জ করব। সর্বশেষ ববক্তৃতায় আমি স্যারের কথার প্রসঙ্গ টেনে বললাম “স্যার আমাকে দোয়া করুন। আমি এবারই হজ্জ করব, ইনশাআল্লাহ।” স্যার সবাইকে দোয়া করতে বললেন। Continue reading “হজ্জের নিয়ত করলাম যেভাবে”

মিয়া কাক্কু

মিয়া কাক্কু
(স্মৃতিচারণ)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বাবার চাচা মেছের উদ্দিন তালুকদারের ছিল ৫ ছেলে। সবার ছোট ছেলে সালাম তালুকদারকে আমরা ডাকতাম ছোট কাক্কু। ছোট কাক্কু তার প্রথম ভাই সোলায়মান তালুকদারকে ডাকতেন বড় ভাই, ২য় ভাই শাসসুদ্দিন তালুকদারকে ডাকতেন মেঝো ভাই, ৩য় ভাই হাছেন আলী তালুকদারকে ডাকতেন সাজ ভাই, ৪র্থ ভাই কাশেম তালুকদারকে ডাকতেন মিয়া ভাই। আমরা তাদের ভাতিজা হিসাবে ডাকতাম যথাক্রমে বড় কাক্কু, ডাক্তার কাক্কু, মাজ কাক্কু ও মিয়া কাক্কু। মিয়া কাক্কু এলাকায় মাতাব্বরি বা মাদবরি করতেন ।

মিয়া কাক্কু আমাদের খুব খোঁজ খবর নিতেন । আমাকে খুব স্নেহ করতেন । একদিন কথাপ্রসঙ্গে তিনি একটা মাদবরির কথা আমাকে বলেছিলেন। আন্দি না বেরীখোলা গ্রাম এখন আমার মনে আসছে না। সেই গ্রামে জমি নিয়ে একটা কয়চান (ঝগড়া) ছিল শরীকদের মধ্যে। সেই কয়চান মিটানোরর জন্য সাত গ্রামের মানুষ জড়ো হয়েছিল একটা সালিশে। সেই সালিশে সাত গ্রামের বড় বড় মাদবর উপস্থিত ছিলেন। বাসার চালার কায়েম উদ্দিন সরকারও উপস্থিত ছিলেন। একে একে সব বড় বড় মাদবরগণ বিচার করে বিফল হলেন। তাদের বিচার কোন পক্ষই মেনে নিলো না। হট্টগোল শুরু হয়ে গেলো। মারমুখী ভাব উভয় পক্ষে। মিয়া কাক্কু চুপ চাপ বসেছিলেন। কাক্কুর স্বভাবই ছিল কম কথা বলা। যা বলতেন কাজের কথা বলতেন। শেষে নিরুপায় হয়ে একে একে সবাই বিচারের ভার দিলেন মিয়া কাক্কুর কাছে। সবাই একযোগে অনুরোধ করলেন “তালুকদার সাব বিচারটা করেন।” মিয়া কাক্কু বিচারের ভার নিতে অস্বীকৃতি জানালেন। সবাই বেশী করে অনুরোধ করলে মিয়া কাক্কু বললেন “আপনারা তো আমার উপর বিচারের ভার দিচ্ছেন। আমি বিচার করে রায় দিলে উভয় পক্ষ মেনে নিবেন কিনা তা জেনেছেন?” উভয়পক্ষ হাত উঠিয়ে সম্মতি প্রকাশ করল। উপস্থিত জনগণও হাত উঠিয়ে সম্মতি জানালো। কাক্কু বললেন “আমি যা বিচার করব তা আপনারা সবাই যদি মেনে নেন, তাহলে আমি বিচার করব, না হলে করব না।” সবাই এক যোগে “হ্যা” বললেন। কাক্কু জমির দলিল পত্র উভয় পক্ষ থেকে নিয়ে নিলেন। পড়ে দেখলেন। দলিল মুড়িয়ে চোঙা বানিয়ে ফিতা দিয়ে বাঁধলেন। মাঠের এক কোণায় রেখে দিয়ে বললেন “আমি যদি বিচার করি তাহলে আপনারা কেউ এই দলিল দেখতে পারবেন না। এই যে আমি দলিল বেঁধে রেখে দিলাম। যতদিন আমার রায় অনুসারে দেয়া জমি আপনারা ভোগ করবেন ততদিন কেউ এই দলিল খুলে দেখতে পারবেন না। রাজী আছেন?” সবাই রাজী হলে কাক্কু জমি দেখিয়ে বললেন “এই জমিটুকু তোমার আর এই জমিটুকু ওনার।” কেউ আর এর দ্বিমত করতে পারলো না। কারন, সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে বিচার যাই হোক মেনে নিতে হবে।

আমি বললাম “কাক্কু, আপনি দলিল বেঁধে রাখলেন কেন?” কাক্কু বললেন “ঐ দলিল গুলোই হল ঝগড়ার মুল কারন। দলিল দিয়ে বিচার করলে কোনদিন বিচার শেষ হবে না। তারপর তাদের মধ্যে আর জমি নিয়ে ঝগড়া হয় নি।”

কাক্কু ইন্দ্রজানী হাটে একটা মজার কান্ড ঘটিয়েছিলেন। আগের দিনে হাটে গরু ছাগল জবাই করে মাংস বিক্রেতারা কলারপাতা অথবা বাঁশের বেতীর ধাড়ি বিছায়ে ৫ টাকা, ১০ টাকার ভাগা দিয়ে মাংস বিক্রি করতো। পাহাড় অঞ্চলে ঘাসের খুব অভাব ছিল। বেশীভাগ গরু ছাগল অপুষ্ট বা খোয়ার ছিল। মাংসে তেল থাকতো না। তেলছাড়া মাংস স্বাদ লাগতো না। তাই সবাই তেলওয়ালা মাংস পছন্দ করতো। বিক্রেতারা মাংস ভাগা দেয়ার সময় হাড্ডি নিচে রেখে মাংস দিয়ে ঢেকে দিতো। মাংস লাল করার জন্য রক্ত মেখে দিতো। তেল তেল দেখানোর জন্য পেটের নাড়িভুঁড়ির তেল নিয়ে মাংসের ভাগার উপর দিয়ে ছড়িয়ে দিতো। এখন এর চেয়েও মানুষ বেশী চালাক হয়েছে। একি সাথে তাজা গরু ও প্রায় মরা গরু জবাই করে কৌশল করে মিক্সার করে করে বিক্রি করে। মাংস লাল করার জন্য কেমিকেল রঙ ব্যবহার করে। আরো কত কি যে করে। সব জানা কি আমাদের সম্ভব? ইন্দ্রজানীর হাটের সেই মাংস বিক্রেতার ভাগাগুলোর  উপর তেলের পর্দা দিয়ে ঢাকা ছিল। মিয়া কাক্কু ভিতরের মাংসের অবস্থা দেখার জন্য আংগুল দিয়ে পর্দা সরাতেই মাংস বিক্রেতা থাবা দিয়ে কাক্কুর হাত সরিয়ে দিয়ে পর্দা দিয়ে আবার মাংস ডেকে দেয়। তাতে কাক্কু অপমান বোধ করেন। কিন্তু কিছু না বলে তিনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন অনেক্ষণ। আরেকজন ক্রেতা কাক্কুর মতো করে যেই মাংসে আংগুল দিয়েছেন অমনি তার হাত থাবা মেরে সরিয়ে বিক্রেতা বলে “এই মিয়া ভাগা নষ্ট কর কেন?” শুরু হয়ে গেলো দুই জনের মধ্যে ঝগড়া। জনগণ কাক্কুর কাছে বিচার দিলে কাক্কু বললেন “আমি এখানে দাড়িয়েই ছিলাম। এই ব্যাটা তার হাতে থাবা মারছে। ব্যাটা মরা গরুর মাংস তেল দিয়ে ঢেকে বিক্রি করছে, আর আংগুল দিয়ে দেখলে থাবা মারে। ওর সব মাংস পাগাড়ে নিয়ে ফেলে দে।” বিক্রেতা বিপদে পড়ে কাক্কুর কাছে মাপ চাইল।

 

হাট থেকে ফেরার সময় জিজ্ঞেস করলাম “কাক্কু, আপনাকেও তো থাবা মেরেছিল। তখন কিছু বললেন না কেন?” “কাশেম তালুকদারকে কশাইয়ে থাবা মারছে মানুষ জানলে ইজ্জৎ যাবে। তাই তখন ঝামেলা না করে অপেক্ষা করছিলাম অনুরূপ আরেকজনের সাথে করুক। তখন বুঝা যাবে।”

 

মিয়া কাক্কুর আরেকটা ঘটনা মনে পড়লো । ছোট কাক্কু একবার ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান পদে ইলেকশনে দাঁড়িয়েছিলেন । । ভালোই নির্বাচনি প্রচারনা চলছিল । শেষের দিকে একটা ফেকড়া  লেগে গেলো । খুব কাছের পাড়ার একদল ভোটার দূরের একজন প্রার্থীর জন্য প্রচার শুরু করলো একজনের নেতৃত্যে । সেই গ্রাম্য নেতার নাম এখানে উল্লেখ করা ঠিক হবে না । তার ছদ্ম নাম দিলাম ‘ময়ছর’ । ছোট কাক্কু মিয়া কাক্কুকে বললেন “মিয়া ভাই, ‘ময়ছর’ পাড়ার সবাইকে নিয়ে অন্য ক্যান্ডিডেটের পক্ষে ভোট চাইছে । এতো কাছের মানুষ বিদ্রোহী হলে চলবে না । খুব সম্ভব অন্য ক্যান্ডিডেট থেকে টাকা খেয়েছে ।” আপনি ময়ছরকে ডেকে এনে ব্যপারটা মিমাংসা করে ফেলুন । ময়ছর ও তার দল্কে দাওয়াত দেয়া হলো । আচ্ছা করে খাওয়ানো হলো কাছারি ঘরে বসিয়ে । খাওয়া শেষে আলোচনা শুরূ হলো । মিয়া কাক্কু ধীরে ধীরে ভুমিকা দিয়ে কথা বলছিলেন। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম । তিনি একটা কথা শুরু করার সাথে সাথে ময়ছর ভাই রেগে গেলেন। ময়ছর ভাইরা কোন সময় তালুকদারদের মুখের দিকে তাকিয়ে উচ্চ বাচ্য করতেন না । এবার করে বসলেন । আমরা হতভম্ভ হয়ে গেলাম ময়ছর ভাইর সাহস দেখে । মিয়া কাক্কু বলা শুরু করছিলেন “তোমার মতোন ময়ছর –।” এতটুকু বলার পরই ময়ছর ভাই লাফ দিয়ে ঊঠে বললেন “এই আপনেগো মতোনের মধ্যেই দোষ । আপনেরা আমাগো গোণেনই না । আমরা আপনাদের কাছেই থাকি । আমাদের খোঁজও নেন না । দুরের ক্যান্ডিডেট আমাগো দাম দেন। আর আপনেরা আমাগো দাম দেন না। আমার মোতন আবার কি?” কিছুক্ষণ পর ময়ছর শান্ত হলে মিয়া কাক্কু ঠান্ডা মাথায় বললেন “শোন ময়ছর। আমি কি কইতে চাইছিলাম তা না শুনেই তুমি রেগে গেলা। কথাটা আগে তুমি শোন। তারপর রাগ দেখাও।” ময়ছর ভাই বললেন “কইন কি কবার চাইছুন।” মিয়া কাক্কু বললেন “আমি কইতে চাইছিলাম, তোমার মতো ময়ছর আর আমার মতো কাশেম এখন যদি একযোগে কাজ করে যাই তাহলে ইলেকশনে জেতা খুবই সহজ। আসো আমরা পাড়ার সবাই মিলে সালামের জন্য ভোট চাই । সালাম চেয়ারম্যান হলে আমাদের এলাকার উন্নয়ন হবে । অন্য এলাকা থেকে চেয়ারম্যান হলে আমাদের এলাকার কি কিছু হবে। দুই এক প্যাকেট বিড়ি খেয়ে আমাদের কি লাভ? তোমরা আমাদের থেকে বিড়ি নিয়ে যাও। আগামীকাল থেকে মাঠে নেমে পড়ো সবাই। আমি এই কথাটাই কইতে চাইছিলাম।” সবাই শান্ত হলেন । বিড়ি নিয়ে ময়ছর ভাইর দল চলে গেলেন । আমি মিয়া কাক্কুকে পরে জিজ্ঞেস করি “কাক্কু, আপনি আসলে ময়ছর ভাইকে কী বলতে চেয়েছিলেন ।” কাক্কু হেসে  বললেন “আমি বলতে চেয়েছিলাম ‘তোমার মতো ময়ছর যদি এলাকার মানুষ নিয়ে অন্য ক্যান্ডিডেটের ক্যানভাস করে তাহলে আমাদের কিছুই হবে না । ইলেকশনের পড়ে এর পরিণতি বুঝতে পাবা।’ কিন্তু ময়ছর এমন ভাবে রেগে যায় যে আমি কথাটা ঘুরিয়ে বলেছি। সালামের ইলেকশনটা হয়ে যাক। তারপর দেখা যাবে ময়ছরকে কিভাবে শায়েস্তা করা যায় ।”

এমনই ছিল মিয়া কাক্কুর মাতাব্বরি।

 

প্রথম লিখন ১০/০৬/২০১৯ খ্রি.

পূণ লিখন ২৭/০৪/২০২০ খ্রি.

 

Continue reading “মিয়া কাক্কু”

জিরের দিনে

জিরের দিনে
(স্মৃতিচারণ)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

জিরের নাম মানুষ ভুলতে শুরু করেছে। বড় কৃমি বা ক্যাচোকৃমিকে বলা হত জির। আগের দিনে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ, বিশেষ কর, শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগত। ভাত যদিও কিছু যোগার হত কিন্তু প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাবার তারা পেতো না। আমিষের অভাবে তাদের কোয়াসিঅর্কর নামে একটা রোগ হতো। এই রোগে পেটটা মোটা, পাছা চিকন ও মুখ গোলাকার বা ফোলা ফোলা হত। পাকা পায়খানার ঘরের প্রচলন কম থাকায় এবং যেখানে সেখানে খোলা যায়গায় পায়খানা করাতে মল বাহিত রোগ খুব বেশী হতো। পোলাপানরা আলানে পালানে, মুলাক্ষেতে, পাট ক্ষেতে পায়খানা করতো। এমনো দেখা যেতো মুলা ক্ষেতে বসে পায়খানা করছে এবং বসে বসে মুলা তুলে খাচ্ছে। তাতে কি হচ্ছে? তার আগে যে শিশুটি মুলা ক্ষেতে পায়খানা করেছিল সেই পায়খানায় হয়ত আমাশয়, টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড, হেপাটাইটিস এ, ইত্যাদি রোগ জীবানু ও কৃমির ডিম মিশ্রিত ছিল। সেইগুলি মুলার গোড়ায় মিশেছিল। মুলার সাথে জীবাণু খেয়ে এই ছেলেটিও আক্রান্ত হল। পলিও রোগের ভাইরাসও পায়খানার সাথে মিশে বের হয়। সেই মল বাহিত পানি বা মিশ্রিত খাবার খেলেও পলিও জীবাণু পেটে যায়। ডাক্তারগণ পলিও টিকা খাওয়ান বাচ্চাদেরকে। এটা আসলে পলিও জীবাণু। কিন্তু এরা শরীরে গিয়ে বিস্তার লাভ করতে পারে না। কিন্তু দেহে পলিওর প্রতিশেধক তৈরি হয় অর্থাৎ ইমুনাইজেশন হয়। একজন পলিও ভেক্সিন খাওয়া শিশুর মলের সাথে পলিও জীবাণু বের হয় । সেই মল মিশ্রিত খাবার যদি অন্য শিশু খায় তবে  টিকা না নিয়েও তার দেহে  পলিও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ঊঠে । এটাকে বলা হয় হার্ড ইমুউনিটি। Continue reading “জিরের দিনে”

মাসুমের পায়ের ফোঁড়া

মাসুমের পায়ের ফোঁড়া
(রোগের গল্প)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

মাসুম ক্লাস ফোরে পড়ে। তার শরীরের ভিতরে কে কে বাস করে, আর কি কি চলাচল করে তা এখনো সে জানে না। তার হৃদপিন্ড রক্ত পাম্প করে। সারা শরীরের দুষিত রক্ত শিরার মাধ্যমে পাম্প করে এনে পালমোনারী ধমনির মাধ্যমে ফুসুফুসে Continue reading “মাসুমের পায়ের ফোঁড়া”

রক্তের কি পরীক্ষা করলে কিডনির অবস্থা জানা যায়?

রক্তের কি পরীক্ষা করলে কিডনির অবস্থা জানা যায়?
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আজকাল অনেকেই কিডনি নিয়ে চিন্তিত। বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে কিডনি খারাপ হয়ে মরে যাওয়ার সংবাদ শুনেই এমনটি হচ্ছে। অনেকে কোমড়ে ব্যাথা অনুভব হওয়াতেই মনে Continue reading “রক্তের কি পরীক্ষা করলে কিডনির অবস্থা জানা যায়?”