একই টিউমার ভিন্ন ভিন্ন ল্যাবে পরীক্ষা

একই টিউমার ভিন্ন ভিন্ন ল্যাবে পরীক্ষা

(স্বাস্থ্য কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

রোগীর শরীর থেকে টিউমার অপারেশন করে সার্জনগণ ফেলে দেন না । অলবডি সার্জন নামে কিছু অল্প বিদ্যার ডাক্তার অথবা অডাক্তার আছে তারা অপারেশন করে টিউমার কাটতে পারে। শোনা যায় তারা অপারেশন করে টিউমার ডাস্টবিনে ফেলে দেয় । কোনভাবেই টিউমার কেটে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া যাবে না। টিউমারটা হিস্টোপ্যাথলজিকেল পরীক্ষা করে দেখতে হবে এটা কোন ধরনের টিউমার। জানার বিষয় হলো এটা ক্যান্সার কি না । ক্যান্সার কি না জানতে হলে হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা করাতে হবে প্যাথলজি ল্যাব থেকে । এই পরীক্ষাকে সাধারনত বায়োপ্সি পরীক্ষা বলে অনেকে । পরীক্ষা করে যদি ক্যান্সার পাওয়া যায় তবে শরীরে আরও কোথাও ক্যান্সারের ছিটাফোটা আছে কিনা তাও পরীক্ষা করে বের করতে হবে । তারপর ক্যান্সারের চিকিৎসা দিতে হবে । অপারেশন করে যে জিনিসটা বের করা হয় তার সম্পূর্ণ পরীক্ষার জন্য ল্যাবে জমা দিতে হবে । প্যাথলজির ডাক্তার তিনি এ বিষয়ে দক্ষ । তিনিই বেছে বেছে এখান থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করবেন । অনেকে পরীক্ষার ফি কমানোর জন্য টিউমার থেকে সামান্য একটু অংশ কেটে ল্যাবে জমা দেন । এটা বিরাট ভুল কাজ । কারন, এমন হতে পারে, যে অংশটুকু কেটে নিয়েছেন তা হয়ত টিউমারের উপরের আবরন পর্দা নয়ত নষ্ট হওয়া অংশ । কাজেই এই অংশ পরীক্ষা করলে ক্যান্সার নাই আসতে পারে।  আবার কেউ কেউ আছেন কোন একটা ল্যাবের পরীক্ষায় আত্ববিশ্বাস না থাকলে টিউমারকে খন্ড খন্ড করে ভিন্ন ভিন্ন ল্যাব থেকে পরীক্ষা করান । এটাও একটা ভুল কাজ । টিউমারের একেক অংশে একেক রকম মাইক্রোস্কোপিক ফিচার থাকতে পারে । তাই, একেক ল্যাব একেকভাবে রিপোর্ট দিবে । বুদ্ধিমানের কাজ হবে, যে ল্যাব বেশী নির্ভরযোগ্য মনে হয় সেল্যাবে সম্পূর্ণ টিস্যু জমা দেয়া । সেল্যাবের প্যাথলজিস্ট সব অংশের নমুনা পরীক্ষা করে দেখে একটা ফাইনাল ডায়াগনোসিস লেখে দেবেন । কোন সার্জন যদি রিপোর্টের প্রতি দ্বিমত পোষন করেন তবে তিনি পরীক্ষায় ব্যবহৃত কাঁচের স্লাইড, মোমের ব্লক ও অবশিষ্ট টিস্যু ফেরত চেয়ে প্যাথলজিস্টকে চিঠি লিখতে পারেন অন্য আরো বেশী অভিজ্ঞ প্যাথলজিস্টকে দিয়ে রিপোর্ট রিভিও করানোর জন্য । মানুষের জ্ঞান সবার সমান না । প্যাথলজিষ্টও মানুষ । তাই প্যাথলজিস্টদের সবার জ্ঞান সমান না । তাই, যে কেউ ডায়াগনোসিস ভুল করতে পারেন । ভালো মানুষ ইচ্ছে করে ভুল করেন না ।

 

 

একটা উদাহরন দেয়া যেতে পারে । স্ত্রীরোগ সার্জন ওভারীর টিউমার কেটে বের করে রোগীর স্বামীর হাতে দিয়ে বললেন “বায়োপ্সি পরীক্ষা করে নিয়ে আসুন অমুক ল্যাব থ্যেকে।“ রাস্তায় দেখা হলো এক টাউট লোকের সাথে। সে কুবুদ্ধি দিল “একটা ল্যাবে পরীক্ষা করতে না দিয়ে কয়েকটা ল্যাবে টিউমার ভাগ করে দেন । দেখুন কোন ল্যাব কেমন রিপোর্ট দেয়।“ কথা মতো টিউমারটাকে ৪ টুকরা করে ৪ টা  নাম করা ল্যাবে জমা দেয়া হল। প্রথম ল্যাব রিপোর্ট দিল ‘এডেনোমা।‘ দ্বিতীয় ল্যাব রিপোর্ট দিল ‘ফাইব্রোমা।‘ তৃতীয় ল্যাব রিপোর্ট দিল ‘লাইপোমা।‘  চতুর্থ ল্যাব রিপোর্ট দিল ‘স্কিন টিস্যু।‘ রোগীর স্বামী সবগুলো রিপোর্ট সংগ্রহ করে প্রথম ল্যাবের প্যাথলজিস্ট-এর কাছে গিয়ে অভিযোগ করলেন “আপনারা একই টিউমারের রিপোর্ট একেক জন একেকটা দিলেন। আপনারা সবাই ভুয়া রিপোর্ট দেন।“

– আপনি একটা টিউমারকে ৪ ভাগ করেছেন। চারটা ভাগে চার রকম জিনিস ছিল। একই টিউমারে বিভিন্ন রকম টিস্যু থাকলে তাকে বলা হয় ‘টেরাটোমা।‘  আপনার রোগীর টেরাটোমা হয়েছে । সম্পুর্ন টিউমার এক ল্যাবে দিলে সব অংশ মিলিয়ে রিপোর্ট দেয়া হত টেরাটোমা।
– তাহলে একটা ল্যাবে পরীক্ষা করালে আমার খরচ হতো ্‌০০০ টাকা। আর আমি ৪ ল্যাবে খরচ করেছি ৪,০০০ টাকা। এতগুলো টাকা খরচ করে সঠিক রেজাল্ট পেলাম না।
(বোকারা তাই করে)

 

৩০/৫/২০১৭ খ্রি।

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (4 votes, average: 4.50 out of 5)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ দেখার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

 

রক্তের সুগার

রক্তের সুগার

(স্বাস্থ্য কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

চিনি ও চিনিজাতীয় পদার্থকে সাধারণত সুগার বলা হয় । আমরা খাবারের সাথে শর্করা (Carbohydrate), আমিষ (Protein) ও চর্বি (Fat) জাতীয় যেসব খাদ্য গ্রহন করি তা শরীরে গিয়ে আত্বিকরন (Metabolism) হয়ে গ্লুকোজ, এমাইনো এসিড ও ফ্যাটি এসিডে রূপান্তরিত হয়ে বিভিন্ন ক্রিয়া কর্মে অংশগ্রহন করে । এগূলো রক্তের সাথে মিশে শরীরের বিভিন্ন অংগে প্রবাহিত হয় নির্দিষ্ট কাজ করার জন্য । এদের মধ্যে গ্লুকোজ হল চিনি জাতীয় মিষ্টি বায়োকেমিকেল বস্তু । এই গ্লুকোজকে সাধারনত সুগার বলে । ডায়াবেটিস মেলাইটাস ও কিছু রোগে রক্তের এই সুগার লেভেল বেড়ে যায় । কোন কোন কারনে সুগার লেভেল কমেও যায় । তাই, অনেক ক্ষেত্রেই রক্তের সুগার লেভেল পরীক্ষা করা হয় । সুগার পরীক্ষা করার নিয়ম আছে । একেকটা সময়য়ের পরীক্ষার একেক রকম গুরত্ব আছে । কোন সময় খালি পেটে থেকে সকালে নাস্তা করার আগে রক্তের সেম্পল নিতে হয় । বলা হয় ফাস্টিং ব্লাড সুগার/গ্লুকোজ (FBS)। কোন কোন সময় নাস্তা করার ২ ঘন্টা পর । বলা হয় টু আওয়ার্স আফটার ব্রেকফাস্ট (2HABF) । কোন কোন সময় খাবার ২ ঘন্টা পর। বলা হয় টু আওয়ার্স আফটার মীল (2HAM)। আবার সময় না পেলে করা হয় আর বি এস (RBS) । এর ফুল নেইম হলো র‍্যান্ডম ব্লাড সুগার । অর্থাৎ যখন সময় পান তখন,খাবারের সাথে সম্পর্ক নাই । দূর দুরান্ত থেকে রোগী এলে আপাতত আরবিএস করা হয় । যাদের ডায়াবেটিস রোগ জানা আছে তাদের বেলায় আরবিএস না।

 

একদিন একজন নাদুশ নুদুশ চেহারার লোক  তিনটা রিপোর্ট দেখিয়ে বললেন

– আমার রক্তের আরবিএস পরীক্ষা একই দিন ৩ টা ল্যাবে করালাম, ৩ রকম রেজাল্ট এলো। আপনারা সবাই ভুল রিপোর্ট দেন।
– একই রক্ত ৩ ল্যাবে দিয়েছিলেন?
– না। ৩ ঘন্টা পর পর ৩ টা ল্যাবে দিয়েছি।

– রক্তের সুগার আপনার খাবারের পরিমাণ, প্রকার ও সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় । দিনের বেলার একেক সময় একেক লেভেলে আপনার সুগার থাকবে । কোন ডাক্তার এভাবে রক্ত পরীক্ষা করাতে বলেন না । আপনি নিজের বুদ্ধিতেই মনে হয় এভাবে করেছেন। কেনো করেছেন?

– অনেকেই বলে, ল্যাব্রেটরীর রিপোর্ট নাকি ভুল হয়। তাই একটু টালি করলাম ।

-রিপোর্ট টালি করার লোক আছে। তারা সরকারী লোক। আপনারা না ।

– তাইলে শুধু শুধু টাকাগুলো নস্ট করলাম!

-তাই তো।
(মুর্খরা তাই করে)

২৮/৫/২০১৭ খ্রি.

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ দেখার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

 

 

সেকা মামু

সেকা মামু

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

সেকা মামুর আসল নাম ছিল সেকান্দর আলী। মা বলতেন সেকা ভাই। তাই আমরাও বলতাম সেকা মামু। তবে ডাকার সময় শুধু মামু বলে ডাকতাম। সেকা মামু কেমন মামু হয় আমাদের এই প্রশ্ন অনেকবার করেছি ছোট বেলায় মার কাছে। মা সব বলেছেন তার পুর্বপুরুষের নাম উল্লেখ করে সেগুলো কিছুই বুঝতাম না। ধরে নিয়েছিলাম তিনি আমাদের আপন মামু না। আমাদের আপন মামুরা আমাদের বাড়িতে আসার সময় জিলাপা (জিলাপি), গজা, কদমা, খাজা, বাতাসা, এগুলো নিয়ে আসতেন আমাদের জন্য। মেঝো মামা সিবা উদ্দিন ছিলেন মার পিঠাপিঠি বড় ভাই। তিনি আমাদের বাড়ি বেশী আসতেন। বড় মামা হোসেন আলী মোলভী ইমামতি ও মাদ্রাসা পড়ানো নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। বোন ভাগ্নে ভাগ্নীদের খোজ খবর কম রাখতেন। ছোট মামা রিয়াজ উদ্দিন মোটামুটি খোজ খবর নিতেন। এই রহস্যময় সেকা মামুকে নিয়ে আমি আজ কিছু লিখব। সেকা মামু কোন দিন আমাদের জন্য কিছু নিয়ে আসেননি। সিবা মামু এসে আমাকে কোলে নিতেন। কিন্তু সেকা মামু কোন দিন আমাকে কোলে নিতে আগ্রহ দেখাননি। সেকা মামু প্রতি বর্ষায় একবার বা দুইবার আমাদের বাড়ি আসতেন। তিনি আসতেন ছাগল দেখতে। মামুদের বাড়ি কালিহাতীর ভর এলাকায় রৌহা। কিন্তু সেকা মামু থাকতেন বংশী নদীর পারে পারখী গ্রামে। তখন প্রতিবছর অনেক বন্যা হতো। বাড়িঘরে পানি উঠতো ভর এলাকায়। মামুরা বন্যার সময় গরু ছাগল তিন মাসের জন্য পাহাড়ে পালবার দিতেন। পাহাড়ি গরু পালনকারীরা গরু পালন করে দেয়ার বিনিময়ে গরু দিয়ে হাল চাষ করতো। ছাগল নেয়া হতো বাগি (ভাগী)। যারা ছাগল পালন করে দিতো তারা ছাগলের বাচ্চা হলে অর্ধেক বাচ্চা নিয়ে নিতো। একটা হলে দাম ধরে অর্ধেক দামে একজনে কিনে নিতো। সেকা মামু বাগি দেয়া ছাগল দেখতে আসতেন। এসে মার সাথে দেখা করে যেতেন। মাঝে মাঝে রাত্রি যাপনও করতেন। মা আপন ভাইয়ের চেয়েও বেশী যত্ন করে রান্না করে খাওয়াতেন সেকা মামুকে। আমাদের জন্য কিছু আনতেন না। মার জন্যও কোনদিন একটা শাড়ী নিয়ে আসতেন না। মাকে কোনদিন নাইয়র নিতেন না। আবার আপন ভাইও না। তাই আমি বারবার জানতে চাইতাম মার কাছে “সেকা মামু আমগো কিবা মামু?” মা কী কী যেন বলতেন। তার কিছু কিছু মনে আছে। সেগুলো কিছুটা এমন। ভিয়াইল গ্রামে মধ্যপাড়ার তালুকদাররা আগে ছিলো মন্ডল। আমাদের ফুফার দাদা তালুক কিনে তালুকদার হয়। তার ভাই আনু মন্ডল সিকদার হয়ে রৌহা এক ছেলে পাঠায়। সেই বংশে জন্মে আমার নানা আমীর উদ্দিন। সেকা মামুর দাদা আর মার দাদা হয়তো চাচাতো জেঠাতো ভাই ছিল। ছিল একই বাড়িভিটায়। এখন বড় মামুর ঘর যেখানে ওটাই ছিল সেকা মামুর অংশ। তার জমিজমা সব বেচার পর বাড়িভিটাটুকুও নানার কাছে বিক্রি করে বাস্তুহীন হয়ে পড়েন। পারখীর এক মহিলার বালি নামে একটামাত্র মেয়ে ছিল। ছেলে ছিল না। এমন মেয়ে হলে আগের দিনে মেয়ে বিয়ে দিয়ে মেয়ের জামাইকে ঘরজামাই বানিয়ে রাখতো। ঘরজামাইরা ছেলের মতো জীবন যাপন করতো শশুর বাড়িতে। সেকা মামু ভুমিহীন হয়ে পড়াতে নানা বালির সাথে সেকা মামুর বিয়ে দিয়ে দেন। সেকা মামু হয়ে পড়েন ঘরজামাই। তাই তিনি আজীবন পারখী গ্রামে থাকতেন। আমার মনে প্রশ্ন ছিলো মা সেকা মামুকে শুধু শুধু যত্ন করেন কেনো? সেকা মামু এসে আমাদের উঠানে দাড়িয়ে থাকতেন চুপচাপ। আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট মৃদু স্পন্দন করে হাসি প্রকাশ করতেন। চেহারা খুবই বিকৃত ছিলো। সারা শরীরে সুঁই বসানোর জায়গা ছিলো না যেখানে গুটি বসন্তের দাগ নেই। শরীর ভর্তি ছিলো গুটি বসন্তের দাগ। চোখেও ছিল বসন্তের দাগ। কিন্তু তিনি অন্ধ ছিলেন না। বসন্ত কালে এই ভাইরাস রোগ হতো বলে এটাকে বসন্ত রোগ বলা হয়। শরীরে বড় বড় গুটি হয়ে ফোস্কা পড়তো। তাই বলা হতো গুটি বসন্ত। গুটি বসন্তে লাখ লাখ লোক মারা যেতো। খুবই সংক্রামক ছিল এই রোগ। করোনাভাইরাসের মতো। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন সাড়াসিয়া পাড়া দিয়ে এই রোগ দেখা দিয়েছিলো। অনেকেই এটাকে আল্লাহর গজব মনে করতো। তাই, মানুষ এ গজব থেকে পানা চাইত দোয়া কালাম পড়ে। পাশের বাড়ির রেজু কাক্কু সারারাত দোয়ায়ে গঞ্জেল আরশ পড়তেন। কিছুই বুজতাম না আরবি সেই দোয়ার। তিনি স্পষ্ট করে পড়তেন না। কারন এক লাখবার পড়তে হবে এই দোয়া। তাই দ্রুত পড়তেন। দ্রুত পড়তে গিয়ে অস্পষ্ট হতো দোয়ার কথাগুলো। শুধু শুনতে পেতাম “ইয়া হাবিবী, ইয়া হাবিবী, কামতানামু।” মনে করে নিয়েছিলাম দোয়া গঞ্জেল আরশ পড়ার কারনেই আমাদের পাড়ায় লোহাগাড়া বসন্ত আসেনি। আমরা গুটি বসন্তকে লোহাদাড়া বসন্ত বলতাম। যেখানে বসন্ত হতো সেখানে লোহাগাড়ার মত ক্ষত হতো, তাই। আমাদের দেশে গুটি বসন্তের টিকা দেয়া হয় সবাইকে সেই সময়। হাতের বাহুতে দুটি করে টিকা দিয়ে গেছে স্বাস্থ্য সহকারীরা যাকে বলা হতো টিকাদার। আমার দাদা একসময় টিকাদার ছিলেন। আমি নিজে টিকা নেবার পর টিকাদারকে আমাদের পাড়ার সব বাড়িতে নিয়ে গিয়েছি। বাড়ির চাচীদেরকে বুঝিয়ে বলেছি “টিকাদার আইছে বসন্তের টিকা দিতে। এই টিকা দিলে বসন্ত রোগ হবে না।” সবাই টিকা দিলেন। কিন্তু ইয়াকুব কাক্কুর বউ তার ছেলে শামসুলকে টিকা দিতে দিলেন না। তিনি বললেন ” আমার একটা মাত্র মইল্লা পোলা। তারে টিকা দিলে জ্বর আইয়া মইরা যায় যদি? আমি তারে টিকা দিতে দিমু না।” আমরা সবাই টিকা নিয়েছি। শামসুল কিন্তু টিকা নেয় নি। শামসুলের বয়স আমার বয়সের কাছাকাছি। ওর বাহু লক্ষ করে দেখুন টিকার দাগ নেই। সেবার টিকা দেয়ার পর থেকে দেশে আর লোহাগাড়া বসন্ত হয়নি। দেশ থেকে গুটি বসন্ত নির্মুল হয়েছে। এখন কেউ দোয়া গঞ্জেল আরশ পড়ে না। এখন করোনা ভাইরাস সংক্রমণ হয়ে লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। কত রকম সামাজিক আচার আচরণ ও নিয়ম কানুন করছে। হাত দুচ্ছে সাবান দিয়ে। লক ডাউন করছে। কাজ তেমন হচ্ছে না। যারা চিকিৎসা করবে সেই ডাক্তাররাই ঝাকে ঝাকে মারা যাচ্ছে। আমার আশংকা হচ্ছে এবার গোটা মানবজাতিই কি ধ্বংশ হয়ে যায় কি না। এমন অবস্থায় রেজু কাক্কু বেচে থাকলে হয়তো দোয়ায়ে গঞ্জেল আরশ পড়তেন। জনগণকে বলা হয়েছে জরুরি প্রোয়োজনে বাইরে যেতে হলে মুখে মাস্ক পরে বের হওয়ার জন্য। কিন্তু জনগণ মাস্কের মাহাত্ম্য বুঝতে পারছে না। তারা দলে দলে বিনা প্রয়োজনে বাইরে গিয়ে খোসগল্প করছে থোতায় মাস্ক বেঁধে। মাথায় মুখের মাস্ক কানে ফিতা লাগিয়ে মাথায় চশমা রাখার মতো করে রাখতেও দেখা গেছে একজনকে। চোখে যাদের সমস্যা আছে তারা চোখে চশমা পরে। মাথায় যাদের সমস্যা আছে তারা মাথায় চশমা পরে শুনেছি। মুখে মাস্ক না পরে মাথায় লাগিয়ে রাখলে তাদের কি মাথায় সমস্যা আছে বলা যাবে না? কাজেই আমি হতাস। অনেকেই ফেইসবুকে প্রোফাইল পিকচারে মাস্ক পরে আছেন। এতে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধ হবে কিনা আমি তিন মাসেও কিছু বুঝতে পারছি না। কিভাবে দেশ থেকে করোনা বিতারিত করা যাবে? আমি আশাবাদী এই ভেবে যে কেউ না কেউ মানবজাতিকে করোনার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য হয়তো টিকা আবিস্কার করবে। যেবন আবিষ্কার করেছিল লোহাগাড়া বসন্তের টিকা। দোয়া গঞ্জেল আরশও আমরা পড়বো, টিকাও নিব।

 

রাতে শুয়ে শুয়ে মার কাছে হাস্তর শুনতাম। সেকা মামুর শরীরে এত দাগ হলো কেমনে মাকে বলতে বলতাম। সে গল্প আমি মার কাছে অনেকবার শুনেছি। মা বলতেন “সেকা ভাইগ বাড়ি আছিল আমগ ভিটায়ই। চানুগ বাড়ির যায়গায়। সেকা ভাইর দাদা ধনী মানুষ আছিল। সেকা ভাইর ফুফুরা খপ সুরুতের আছিল। সবাইরই ধনী ধনী বাড়িতে বিয়া অইছিল। সেকা ভাইর বাপদাদারে কি কারনে কেরা জানি হারানী (অভিশাপ) দিছিল এই বইলা যে অগ ছোবের বংশ জানি নির্বংশ অইয়া যায়।

– ছোবের বংশ নির্বংশ কি?

– আমগ বাঁশ আড়ায় বাঁশ ছোব দেখছ না, একটা রুইলে এর থাইকা অনেক বাঁশ জালাইয়া ছোব অয়। এইজন্য কই বাঁশ ছোব। ছোবের বাঁশ সব কাইটা ফালাইলে আর বাঁশ অইব না। মানে বাঁশের ছোবের সব বাঁশ কাইটা ফালাইলে বাঁশ নির্বংশ অইয়া গেলো। যেসুম একটা বংশের সব মানুষ মইরা যায় হেসুম কয় ছোবের বংশ নির্বংশ অইয়া গেছে। আংগ বাড়ির উত্তর মুরা বাড়ির একটা বংশের সব মানুষ গুটি উইটা (বসন্ত) মইরা গিয়া ছোবের বংশ নির্বংশ অইছে। ওডারও কারন আছে।

– ওডার কি কারন?

– একবার আমগ আয়নুদ্দি কাক্কুর ঘরের উগার তলে সিন্ধুক আইছিল। চাচী স্বপ্নে দেখেন জিনে কইতাছে “তোমগো উগারের নিচে সিন্ধুক ভর্তি সোনার টাকা দিয়ে গেলাম। মাটি খুইদা সিন্ধুক বাইর করবা। কাউরে কবা না। চাচী সকালে ঘুম থাইকা উইঠা হাচাই দেখেন উগারের নিচে মাটি ফাইটা উঠছে। চাচী সবাইর কাছে কইয়া দেয়। পরের রাইতে চাচী স্বপ্নে দেহেন জিন কইতাছে তরে কইছিলাম কারো কাছে না কইতে। তুই আমার কথা হোনস নাই। তাই আমি সিন্ধুক হরাই ফালাইলাম।

– চাচী পরের দিন উইঠা দেহেন উগার থিগা শুরু কইরা মাইজালের মইদ দিয়া, উঠারের মইদ দিয়া পুস্কুনি পার পর্যন্ত মাটি ফাইটা রইছে। যেনু গিয়া শেষ অইছে হেনু একটা গাছ আছিল পুস্কুনির পাড়ে। হেই গাছে একটা জট বাইরইয়া পানিতে ঠেইকা রইছে। সবাই তামসা দেখতে আইল। সবাই মনে করলো এই ফাটা যায়গা দিয়া সিন্ধুকটা নিয়ে গেছে জিনে।

– আপ্নে জিন দেখছুইন?

– না। জিন দেহা যায় না। যারা জিন ভার করতে পারে তারা দেখছে। পাড়ার সবাই আজব জট দেখতে আহে। উত্তর বাড়ির দাদাও আহে। হে জিন বিশ্বাস করতো না। সবার সামনেই জটটা টান মাইরা ছিড়া ফালাইয়া কয় কি তামসা বাইর করছে একটা। যা কাম করগা সবাই। রাতে জিন তাকে স্বপ্ন দেখায় তুই আমার জট ছিড়া ফালাইছস। তর ছোবের বংশ নির্বংশ অইব। হাচা কথাই। এর পরের বছর তার বংশের সবার গুটি অইয়া মইরা গিয়া ছোবের বংশ নির্বংশ অইয়া যায়।

– যারে হারানী দিছিল হেই বংশের কি অইল।

– হেই বংশের সবাই মারা যায় ঠাসঠাসি। খালি বাইচা আছে সেকা ভাই আর তার একটা বোন। সেকা ভাইর ফুফুগুনা একেকজন অল্প কয়দিনের ভিতরে নানান রোগে মারা যায়। মেয়েগুনা মইরা যাবার পর সেকাভাইর দাদাও মইরা যায় ঠাস কইরা। সেকা ভাইর বোনগুনাও গুটি অইয়া মইরা যায়। বাইচা আছিল সেকা ভাই আর তার একটা বোন । সেকা ভাই আমার হোমাইজা। কয়েক মাসের বড় অইব। আরেকবার একসাথে অউয়ার (রৌহা গ্রামের) অনেক মানুষের গুটি উঠে। অনেক মানুষ মইরা যায়। আমগ দাদাও মইরা যায় হেসুম। আংগ বাজানেরও গুটি উঠছাল। অত বেশী না। সেকা ভাই গুটি উইঠা মইরাই গেছিল। আংগ বাজান কইল কাশার থালি বাইরাইয়া দেখছে বাইচা উঠে কিনা। সেকা ভাইর কানের কাছে অনেকক্ষণ থালি বাজাইলে পড়ে একটু নড়াচড়া কইরা উঠে। বাজান সারারাত সেকা ভাইকে পাহারা দেয়ার ব্যবস্থা করে যাতে হিয়ালে (শিয়ালে) না নিয়া যায়।

 

এমন সময় আমাদের বাড়ির উত্তর পাশের জংগল থেকে একটা শিয়াল ডেকে উঠতো “হুয়া, হুয়া।” আমাদের রান্নাঘরের সামনে রাতে একটা কুকুর শুয়ে ঘুমাতো। আমরা বলতাম কুত্তা। এই কুত্তাটা সারাদিন তালুকদার বাড়ির সবকটি বাড়ি ঘুরে ঘুরে খাবার খেতো। কেউ খেতে বসলে তার সামনে বসে কুতকুতি চেয়ে থাকতো। একটুকরা হাড্ডি ছুড়ে মারলে চিবাতে চিবাতে চলে যেতো। থাকতো আমাদের রান্নাঘরের সামনে উঠানে। শিয়ালে হুয়া বললে কুত্তাটা “হো?” বলে ডাক দিতো। শিয়াল বলে উঠতো “কাক্কা হুয়া, কাক্কা হুয়া।” শুনে চনপড়া, নওপাড়া, বুইদ্দাচালা, হয়দর ভাইগ চালা ও আরও দুর দুরান্তের সব শিয়াল এক যোগে চিল্লাচিল্লি করে ডেকে উঠতো “কাক্কা হুয়া, কাক্কা হুয়া।” আমি ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে মার বুকে লুকাতাম। কাঁথা দিয়ে মুখ চোখ ঢেকে ফেলতাম। মা বলতেন “ঘুমাইয়া পড়। হিয়াল হুয়া হুয়া করে পোলাপানদেরকে হুইয়া পড়তে কইতাছে।”

 

ছোট বেলা দেখেছি উঠানে ধান শুকা দিলে মুরগির বাচ্চা, কাক ও শালিক এসে ধানে ঠোকর দিতো। কোটা দিয়ে বারি দিয়ে এগুলো তারাতাম। হঠাৎ কোন মুরগির বাচ্চার মাথায় আঘাত লাগলে বাচ্চা অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তো। আমরা মুরগির বাচ্চার কানের কাছে কাশার থালি (প্লেট) নিয়ে নাকইর দিয়ে থালির উপর বেল বাজানোর মত করে বাজাতাম আর বলতাম “জিয়ো জিয়ো।” বেল বাজানো শুনে মুরগির বাচ্চার জ্ঞান ফিরত। তেমন ভাবে সেকা মামুকে কাশার থালি বাজিয়ে মৃত অবস্থা থেকে জিইয়ে তুলেছিলেন আমার নানা। সেকা মামু ছিলো তার বংশের বাতি। সেকা মামু বেচে গেলেও কাজ কর্ম তেমন করতে পারতেন না। জমিজমা যা ছিলো তা বেচে শেষ করে দেন। বিয়ের সময় বাড়িভিটাটাও ছিল না।

 

মার কাছে শুনেছি সেকা মামুর শাশুড়ি খুব করা মহিলা। সেকা মামুর সাথে চাকরের মতো ব্যবহার করেন। সেকা মামু কাজ করতে না পারলেও জোড় করে তাকে দিয়ে কাজ করান। সেকা মামু লগি দিয়ে ভালো করে নাও বাইতে পারতেন। বর্ষাকালে তিনি নাও বাওয়ার কামলা দিতেন। টাকা পয়সা তুলে দিতেন তার শাশুড়ির কাছে। বালি মামিও নাকি সেকা মামুর তেমন যত্ন নিতেন না। মা বলতেন “তার আপন বলতে কেউ নাই। আমরাই তার আপন। তাই আমাগ এনু আহে। বালিরা তারে ঠিক মতো খাবার দেয় কি না? তাই আমি চাইরটা খাবার দেই। তার আতে টেহা পয়সা থাকে না। তাই তোমাগ নিগা কিছু আনতে পারে না। অতটা বুদ্ধিও তার নাই। তার ঘরে কোন পোলাপানও অয় নাই। আটকুরাই অইব নাকি? গুটি অইয়া অনেকেই আটকুরা অইয়া যায়।” এসব কথা শুনে আমার সেকা মামুর প্রতি অনেক মায়া ধরে যায়। চোখের দিকে তাকাতাম। চোখের মণির কাছেও বসন্তের দাগ ছিল। আর একটু হলে চোখের মণি নষ্ট হয়ে অন্ধ হয়ে যেতো। তখন হজে কানার মতো ভিক্ষা করে খেতে হতো। ছোট চওনার হজে কানাদের তিন ভাইয়ের এক সাথে বসন্ত হয়ে চোখ নষ্ট হয়ে যায়। আসলে কানা আর অন্ধর মধ্যে পার্থক্য আছে। যার এক চোখ নষ্ট তাকে বলে কানা। যার দুই চোখই নষ্ট তাকে বলে অন্ধ। কিন্তু আমাদের গ্রামে অন্ধকেই কানা বলে। হজে কানা ভিক্ষা চাইতে এসে সুর করে গজল গাইত “দীনের নবী রাস্তা দিয়া হাইটা যায়, হরিণ একটা বান্ধা ছিলো গাছেরই তলায় গ..।” সুরে সুরে তার পরিচয়ও দিতেন এভাবে “আমার নাম হযরত আলী বাড়ি চোট চওনা, থানা আমার কালিহাতী দুইও চোখ কানা।”

 

আমি তখন বুঝতে না পাড়লেও ডাক্তার হয়ে বুঝতে পেরেছি সেকা মামুর কেনো সন্তান হয়নি। বসন্ত রোগে ঘা হয়ে খুব সম্ভব তার শুক্রাণুবাহী নালী বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার দ্বারা আর বংশ রক্ষা করা সম্ভব হলো না।

 

এক রাতে তিনি আমাদের বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন। তাকে বারান্দার চৌকিতে কাথা বিছিয়ে শুতে দেয়া হয়েছিল। রাতে ভালো খাবারও দিয়েছিলেন মা। সকালে দেখি সেকা মামু বিছানায় নেই। কাঁথা ভিজা। চৌকির নিচেও মাটি ভিজা। কাছে গিয়ে দেখি প্রশ্রাবের দুর্ঘন্ধ। মাকে ডেকে বললাম “মা, মামু মনে অয় বিছানায় প্রশ্রাব কইরা পলাইয়া গেছে।” মা কাউকে বলতে নিষেধ করলেন। বললেন “মানুষ স্বপ্নে বিছনায় পেছাব করতে পারে। ঘুমের ভিতর পেছাব করলে মানুষের করার কিছুই নাই। লজ্জায় হয়তো চইলা গেছে। আমি ধুইয়া দিমুনি। তুমিও ত ঘুমের মইদ্যে বিছনায় পেছাব করো।” আমি বললাম “আমি কি ইচ্ছা কইরা বিছনায় পেছাব করি?” স্বপ্নে দেহি আমি নায়ে বইয়া পানি আতাইতাছি। পানি আতাইলে পেছাব ধরে। নায়ের গুড়ায় বইয়া পানিতে পেছাব কইরা দেই। কোন কোন সুম গাছের ডাইলে বইয়া পেছাব কইরা দেই। চেতন পাইয়া দেহি নিছনায় পেছাব কইরা দিছি। আমার কি দোষ।” তোমার যদি দোষ না অয় তাইলে সেকা ভাইরও দোষ নাই। সেকা ভাইও হয়ত স্বপ্নে পেছাব কইরা দিছে। আরেকদিন আইলে আবার কিছু কইও না।’

 

আমার বিছায় পেছাব করার কথা শুনে আপনারা হাসছেন নাকি? এটা আমার শিশু কালের কথা। বিছানায় পেছাব করা ফেরানোর একটা বুদ্ধি করেছিলাম নিজে নিজেই। আমি শোবার সময় লুঙ্গি পরে শুতাম। লুঙ্গি দিয়ে টাইট করে মাল কোসা দিতাম যাকে বলতাম কাছার দেয়া। টাইট করে কাছার দিয়ে শুইলে পেছাবের নালি দিয়ে পেছাব আসার সময় চাপ খেয়ে ঘুম ভেঙ্গে যেতো। বাইরে গিয়ে পেছাব করে আবার শুতাম। কথায় আছে না “মা, আমি ঘুমালাম, আমার হাগু ধরলে ঘুম থেকে ডাক দিও।” “হাগু ধরলে আমাকে আর ডাক দিতে হবে না, হাগুয়েই তোমাকে ডাক দিবে।” আস্তে আস্তে বড় হই আর বিছানায় পেছাব করার রোগটা ভালো হয়ে যায়।

 

অনেকদিন গ্যাপ দিয়ে সেকা মামু আমাদের বাড়ি আসেন। আগের মতই প্রতি বছর আসতেন। এরপর রাত্রিযাপন করেছিলেন কিনা আমার মনে নেই। মা ভালো ভালো রান্না করে সেকা মামুকে খাওয়াতেন। ১৯৭৯ সনে মা ইন্তেকাল করেন। আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হই ঐ বছরেই। ছমাস পরপর বাড়ি যেতাম। বাড়ির সংসারের হাল ধরেছেন আমার ভাবী। তিনি একজন খুবই দায়িত্ববান আমাদের পরিবারের জন্য। মার মৃত্যুর পর মৃত মায়ের জন্য আমাদের কি কি করনীয় তা আমি ধর্মীয় পুস্তক থেকে শিখতে চেষ্টা করি। করনীয়ের মধ্যে একটা জিনিস জানতে পাই যে মা-বাবা জীবিত থাকতে যাদের সাথে তাদের বন্ধুত্ব ছিল তাদের সাথে যোগাযোগ রাখা। তাদের খোজখবর নেয়া। আমি ভাবীর কাছে জানতে চাই “সেকা মামু কি আমাদের বাড়িতে আসেন?”

– আম্মা মারা যাবার পর এক দিন আইছাল। আমি খাবার দিছিলাম। থাকবার কইলাম। থাকলো না। আর ত আইতে দেহি না।

– যদি আহে তাইলে মা যেভাবে যত্ন করতেন সেই ভাবে যত্ন করবেন।

– তা ত করমুই।

 

আসলেই সেকা মামু আর কোন দিন আমাদের বাড়ি আসেননি। মার মৃত্যুর পর একবারই এসেছিলেন। সেদিনই তিনি মার মৃত্যু সংবাদ শুনে গেছেন। এরপরও তিনি হয়তো ছাগল দেখতে আসতেন। যেহেতু তার বোনটি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। কেনইবা তিনি আসবেন।

 

চারিদিকে করোনা সংক্রমণের সংবাদ পাচ্ছি ফেইসবুক পড়ে পড়ে। তিন মাস যাবত সরকারি চাকরি থেকে অবসরে গেছি। পৃথিবী জুড়ে করোনার মহামারি চলছে। লাখো লাখো মানুষ অসহায় ভাবে মৃত্যুবরণ করছে। তাদের সাথে সমাজ, পরিবার ও আপনজনেরা নিষ্ঠুরভাবে আচরণ করছে। পরিবারের জন্য সারাজীবন কষ্ট করে অর্জিত টাকায় দালান দিছে। করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় তাকে এক কক্ষে বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে রেখেছিল তার পরিবার, নিজের স্ত্রী। দম বন্ধ হয়ে ছটফট করে মৃত্যু হয়েছে তার নির্মম ভাবে। কোটি কোটি টাকার দম্পদ থাকতেও একজন নামকরা ডাক্তারের ছেলে ও ভাই বেরাদার তার লাশ নিতে আসেনি। লাশ দাফনকারীরা এক মৃত ব্যাক্তির গোসলের জন্য তাওয়েল চাইলে একটা ছেড়া গামছা যোগার করে দেয় তার ছোবের বংশের লোকেরা। কোন কোন পরিবারের ছোবের বংশের সবাই আক্রান্ত নিষ্ঠুর ভাবে আইসোলেটেড হয়ে পড়ছে। আমি বেঁচে থাকতে চাই এই সুন্দর পৃথিবীতে আরও অনেকদিন। তাই অবসর কালে কোন কাজ ধরিনি করোনার ভয়ে। ভাগ্যে আমাদের কি আছে জানিনা। আল্লাহর কাছে পানা চাচ্ছি এই মহামারি থেকে তার বান্দাদেরকে রক্ষা করতে। মন আমার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তার মাঝেও আনন্দ পেতে চাচ্ছি বেঁচে থাকার জন্য। এবার অনেকেরই ছোবের বংশ নির্বংশ না হলেও যার বংশের অন্তত একজনও চলে গেছে সেই জানে তার কি ক্ষতি হয়েছে, তার কী কষ্ট।

 

তাই সেকা মামুর কথা আজ বারবার মনে হলো। তার খবর নেয়ার জন্য আজ রৌহার কাশেম মামা, পারখীর জাহাঙ্গীর ভাই ও মাওলানা হাবীবুল্লাহ ভাইকে মোবাইল করি। তাদের কথা শুনে যা বুঝা গেলো তা হলো সেকা মামু আজ থেকে ২৫/৩০ বছর আগে মারা গেছেন। তার কোন সন্তান হয়নি। তিনি মারা যাবার পর বালি মামী একটা ছেলেকে পালবার আনেন। সে ছেলে বড় হয়ে পাহাড়ে গিয়ে বিয়ে করে ঘরজামাই হয়ে বালি মামীকে ফেলে চলে যায়। এদিকে সেকা মামুর শাশুড়িও মৃত্যুবরন করেন। বালি মামী মৃত্যুর আগে বাড়ি ভিটা বিক্রি করে বাজার সদাই করে খেতে থাকেন। তিনিও এক সময় পরলোক গমন করেন।

২৭/৬/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ দেখার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

অন্যের সংবাদ প্রচারে সতর্কতা

অন্যের সংবাদ প্রচারে সতর্কতা

(টিপস)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

মানুষ সাধারণত নিজের বা পরিবারের দুর্বল দিকগুলো সমাজে প্রকাশ করতে চায় না। শুধু খুশীর সংবাদগুলো প্রকাশ করতে চায়। এখনকার মানুষ মাস্তব সামাজিকতা কম করে। ফেইসবুক বা এমন নকল সামাজিকতা বেশী বেশী করে এখন। এখানেও তারা নিজেদের দুর্বল দিকগুলো প্রকাশ করতে চায় না। আগের দিনে অসুস্থ হলে মানুষ আত্বীয় স্বজনকে খবর দিতো। আত্বীয় স্বজন রোগীর বাড়িতে সাহায্য করে দেয়ার জন্য এগিয়ে আসতো। সংগে নিয়ে আসতো নানারকম ফল ফলাদি।

এখন সাধারণত দেখা যায় আত্বীয় সজন অসুস্থ হলে আত্বীয়ের সাহায্যে এগিয়ে না গিয়ে ফেইসবুকে একটা স্টেটাস দিয়ে দেয় “আমার আত্বীয় অমুক অমুক রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তারজন্য আমরা দোয়া চাই।” এই কাজটা খুবই সহজ এবং সস্তা।

আমার কথা হলো, রোগী কি আপনাকে বলে দিয়েছে দোয়া চাওয়ার জন্য?

অনেক রোগীই চান তিনি যে অসুস্থ তা অন্য কেউ না জানুক।

কাজেই আমরা কেউ কারো অসুস্থতার কথা আগ বাড়িয়ে ফেইসবুকে প্রচার করবো না তার অনুমতি না নিয়ে।

তবে কেউ মৃত্যু বরন করলে সেই সংবাদটি প্রচার করা উত্তম কাজ।

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ দেখার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

প্রাইভেসি অপশন

প্রাইভেসি অপশন
(টিপস)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
আমরা ফেইসবুকে পোস্ট লিখে শেয়ার করার আগে প্রাইভেসি সেট করে রাখি এইজন্য যে, আমার পোস্ট কে কে পড়তে বা দেখতে পারবে। কয়েকটা অপশন আছে। প্রাইভেসি অপশনটা আমাদের ফেইসবুক নামের নিচে সময়ের ডানপাশে আইকন আকারে শো করে। এখানে টোকা দিলে এই অপশন গুলো বের হয়। আমি এগুলোর সংক্ষেপে গুরুত্ব বলছি।
Only me: মানে রেখে দিলাম। আমি ছাড়া আর কেউ দেখতে পারবে না।
Friends: আমার সব ফ্রেন্ড দেখতে পারবে।
Specific friends: ফ্রেন্ড লিস্ট থেকে যাকে যাকে সিলেক্ট করবো তারাই শুধু দেখতে পারবে।
Friends except : সব ফ্রেন্ড দেখতে পারবে কিন্তু যাকে সিলেক্ট করে রাখব তিনি ছাড়া। যেমন, একজন মুরুব্বিকে।
Public: সব ফ্রেন্ড এবং যারা ফ্রেন্ড না তারাও দেখতে পারবে। কিন্তু যাকে ব্লক করে রেখেছেন সে দেখতে পারবে না। এই পোস্টের নিচে Share করার অপশন আসবে। এখানে ক্লিক করে যে কেউ তাদের টাইম লাইনে পাবলিক পোস্ট হিসাবে আপনার নামসহ পোস্টটা শেয়ার করতে পারবে।
কেউ কেউ শেয়ার করার অপশন না পেয়ে কপি পেস্ট করে নিজের টাইম লাইনে শেয়ার করে থাকেন। এটা সঠিক না। অনেকে অন্যের পোস্ট পেস্ট করে তার নিচে পোস্টকারীর নাম লিখে দেন “অমুকের টাইম লাইন থেকে।” তাও ঠিক না।
কেন না?
যিনি পোস্ট লেখেন, তিনি এটা কিছুক্ষণ পর সংশোধন করতে পারেন। কিন্তু যিনি পেস্ট করে নিয়েছেন সেখানে সংশোধন হবে না। অথবা তিনি ডিলিটও করতে পারেন। শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করলে লেখক পরিবর্তন করলে যেখানে শেয়ার হয়েছে সেখানেও পরিবর্তন হবে অটোমেটিক। তাছাড়া কপি পেস্ট করা কপিরাইট আইন লঙ্ঘন হয়।

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ দেখার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/