একই টিউমার ভিন্ন ভিন্ন ল্যাবে পরীক্ষা

একই টিউমার ভিন্ন ভিন্ন ল্যাবে পরীক্ষা

(স্বাস্থ্য কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

রোগীর শরীর থেকে টিউমার অপারেশন করে সার্জনগণ ফেলে দেন না । অলবডি সার্জন নামে কিছু অল্প বিদ্যার ডাক্তার অথবা অডাক্তার আছে তারা অপারেশন করে টিউমার কাটতে পারে। শোনা যায় তারা অপারেশন করে টিউমার ডাস্টবিনে ফেলে দেয় । কোনভাবেই টিউমার কেটে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া যাবে না। টিউমারটা হিস্টোপ্যাথলজিকেল পরীক্ষা করে দেখতে হবে এটা কোন ধরনের টিউমার। জানার বিষয় হলো এটা ক্যান্সার কি না । ক্যান্সার কি না জানতে হলে হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা করাতে হবে প্যাথলজি ল্যাব থেকে । এই পরীক্ষাকে সাধারনত বায়োপ্সি পরীক্ষা বলে অনেকে । পরীক্ষা করে যদি ক্যান্সার পাওয়া যায় তবে শরীরে আরও কোথাও ক্যান্সারের ছিটাফোটা আছে কিনা তাও পরীক্ষা করে বের করতে হবে । তারপর ক্যান্সারের চিকিৎসা দিতে হবে । অপারেশন করে যে জিনিসটা বের করা হয় তার সম্পূর্ণ পরীক্ষার জন্য ল্যাবে জমা দিতে হবে । প্যাথলজির ডাক্তার তিনি এ বিষয়ে দক্ষ । তিনিই বেছে বেছে এখান থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করবেন । অনেকে পরীক্ষার ফি কমানোর জন্য টিউমার থেকে সামান্য একটু অংশ কেটে ল্যাবে জমা দেন । এটা বিরাট ভুল কাজ । কারন, এমন হতে পারে, যে অংশটুকু কেটে নিয়েছেন তা হয়ত টিউমারের উপরের আবরন পর্দা নয়ত নষ্ট হওয়া অংশ । কাজেই এই অংশ পরীক্ষা করলে ক্যান্সার নাই আসতে পারে।  আবার কেউ কেউ আছেন কোন একটা ল্যাবের পরীক্ষায় আত্ববিশ্বাস না থাকলে টিউমারকে খন্ড খন্ড করে ভিন্ন ভিন্ন ল্যাব থেকে পরীক্ষা করান । এটাও একটা ভুল কাজ । টিউমারের একেক অংশে একেক রকম মাইক্রোস্কোপিক ফিচার থাকতে পারে । তাই, একেক ল্যাব একেকভাবে রিপোর্ট দিবে । বুদ্ধিমানের কাজ হবে, যে ল্যাব বেশী নির্ভরযোগ্য মনে হয় সেল্যাবে সম্পূর্ণ টিস্যু জমা দেয়া । সেল্যাবের প্যাথলজিস্ট সব অংশের নমুনা পরীক্ষা করে দেখে একটা ফাইনাল ডায়াগনোসিস লেখে দেবেন । কোন সার্জন যদি রিপোর্টের প্রতি দ্বিমত পোষন করেন তবে তিনি পরীক্ষায় ব্যবহৃত কাঁচের স্লাইড, মোমের ব্লক ও অবশিষ্ট টিস্যু ফেরত চেয়ে প্যাথলজিস্টকে চিঠি লিখতে পারেন অন্য আরো বেশী অভিজ্ঞ প্যাথলজিস্টকে দিয়ে রিপোর্ট রিভিও করানোর জন্য । মানুষের জ্ঞান সবার সমান না । প্যাথলজিষ্টও মানুষ । তাই প্যাথলজিস্টদের সবার জ্ঞান সমান না । তাই, যে কেউ ডায়াগনোসিস ভুল করতে পারেন । ভালো মানুষ ইচ্ছে করে ভুল করেন না ।

 

 

একটা উদাহরন দেয়া যেতে পারে । স্ত্রীরোগ সার্জন ওভারীর টিউমার কেটে বের করে রোগীর স্বামীর হাতে দিয়ে বললেন “বায়োপ্সি পরীক্ষা করে নিয়ে আসুন অমুক ল্যাব থ্যেকে।“ রাস্তায় দেখা হলো এক টাউট লোকের সাথে। সে কুবুদ্ধি দিল “একটা ল্যাবে পরীক্ষা করতে না দিয়ে কয়েকটা ল্যাবে টিউমার ভাগ করে দেন । দেখুন কোন ল্যাব কেমন রিপোর্ট দেয়।“ কথা মতো টিউমারটাকে ৪ টুকরা করে ৪ টা  নাম করা ল্যাবে জমা দেয়া হল। প্রথম ল্যাব রিপোর্ট দিল ‘এডেনোমা।‘ দ্বিতীয় ল্যাব রিপোর্ট দিল ‘ফাইব্রোমা।‘ তৃতীয় ল্যাব রিপোর্ট দিল ‘লাইপোমা।‘  চতুর্থ ল্যাব রিপোর্ট দিল ‘স্কিন টিস্যু।‘ রোগীর স্বামী সবগুলো রিপোর্ট সংগ্রহ করে প্রথম ল্যাবের প্যাথলজিস্ট-এর কাছে গিয়ে অভিযোগ করলেন “আপনারা একই টিউমারের রিপোর্ট একেক জন একেকটা দিলেন। আপনারা সবাই ভুয়া রিপোর্ট দেন।“

– আপনি একটা টিউমারকে ৪ ভাগ করেছেন। চারটা ভাগে চার রকম জিনিস ছিল। একই টিউমারে বিভিন্ন রকম টিস্যু থাকলে তাকে বলা হয় ‘টেরাটোমা।‘  আপনার রোগীর টেরাটোমা হয়েছে । সম্পুর্ন টিউমার এক ল্যাবে দিলে সব অংশ মিলিয়ে রিপোর্ট দেয়া হত টেরাটোমা।
– তাহলে একটা ল্যাবে পরীক্ষা করালে আমার খরচ হতো ্‌০০০ টাকা। আর আমি ৪ ল্যাবে খরচ করেছি ৪,০০০ টাকা। এতগুলো টাকা খরচ করে সঠিক রেজাল্ট পেলাম না।
(বোকারা তাই করে)

 

৩০/৫/২০১৭ খ্রি।

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (4 votes, average: 4.50 out of 5)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ দেখার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

 

রক্তের সুগার

রক্তের সুগার

(স্বাস্থ্য কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

চিনি ও চিনিজাতীয় পদার্থকে সাধারণত সুগার বলা হয় । আমরা খাবারের সাথে শর্করা (Carbohydrate), আমিষ (Protein) ও চর্বি (Fat) জাতীয় যেসব খাদ্য গ্রহন করি তা শরীরে গিয়ে আত্বিকরন (Metabolism) হয়ে গ্লুকোজ, এমাইনো এসিড ও ফ্যাটি এসিডে রূপান্তরিত হয়ে বিভিন্ন ক্রিয়া কর্মে অংশগ্রহন করে । এগূলো রক্তের সাথে মিশে শরীরের বিভিন্ন অংগে প্রবাহিত হয় নির্দিষ্ট কাজ করার জন্য । এদের মধ্যে গ্লুকোজ হল চিনি জাতীয় মিষ্টি বায়োকেমিকেল বস্তু । এই গ্লুকোজকে সাধারনত সুগার বলে । ডায়াবেটিস মেলাইটাস ও কিছু রোগে রক্তের এই সুগার লেভেল বেড়ে যায় । কোন কোন কারনে সুগার লেভেল কমেও যায় । তাই, অনেক ক্ষেত্রেই রক্তের সুগার লেভেল পরীক্ষা করা হয় । সুগার পরীক্ষা করার নিয়ম আছে । একেকটা সময়য়ের পরীক্ষার একেক রকম গুরত্ব আছে । কোন সময় খালি পেটে থেকে সকালে নাস্তা করার আগে রক্তের সেম্পল নিতে হয় । বলা হয় ফাস্টিং ব্লাড সুগার/গ্লুকোজ (FBS)। কোন কোন সময় নাস্তা করার ২ ঘন্টা পর । বলা হয় টু আওয়ার্স আফটার ব্রেকফাস্ট (2HABF) । কোন কোন সময় খাবার ২ ঘন্টা পর। বলা হয় টু আওয়ার্স আফটার মীল (2HAM)। আবার সময় না পেলে করা হয় আর বি এস (RBS) । এর ফুল নেইম হলো র‍্যান্ডম ব্লাড সুগার । অর্থাৎ যখন সময় পান তখন,খাবারের সাথে সম্পর্ক নাই । দূর দুরান্ত থেকে রোগী এলে আপাতত আরবিএস করা হয় । যাদের ডায়াবেটিস রোগ জানা আছে তাদের বেলায় আরবিএস না।

 

একদিন একজন নাদুশ নুদুশ চেহারার লোক  তিনটা রিপোর্ট দেখিয়ে বললেন

– আমার রক্তের আরবিএস পরীক্ষা একই দিন ৩ টা ল্যাবে করালাম, ৩ রকম রেজাল্ট এলো। আপনারা সবাই ভুল রিপোর্ট দেন।
– একই রক্ত ৩ ল্যাবে দিয়েছিলেন?
– না। ৩ ঘন্টা পর পর ৩ টা ল্যাবে দিয়েছি।

– রক্তের সুগার আপনার খাবারের পরিমাণ, প্রকার ও সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় । দিনের বেলার একেক সময় একেক লেভেলে আপনার সুগার থাকবে । কোন ডাক্তার এভাবে রক্ত পরীক্ষা করাতে বলেন না । আপনি নিজের বুদ্ধিতেই মনে হয় এভাবে করেছেন। কেনো করেছেন?

– অনেকেই বলে, ল্যাব্রেটরীর রিপোর্ট নাকি ভুল হয়। তাই একটু টালি করলাম ।

-রিপোর্ট টালি করার লোক আছে। তারা সরকারী লোক। আপনারা না ।

– তাইলে শুধু শুধু টাকাগুলো নস্ট করলাম!

-তাই তো।
(মুর্খরা তাই করে)

২৮/৫/২০১৭ খ্রি.

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ দেখার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

 

 

সেকা মামু

সেকা মামু

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

সেকা মামুর আসল নাম ছিল সেকান্দর আলী। মা বলতেন সেকা ভাই। তাই আমরাও বলতাম সেকা মামু। তবে ডাকার সময় শুধু মামু বলে ডাকতাম। সেকা মামু কেমন মামু হয় আমাদের এই প্রশ্ন অনেকবার করেছি ছোট বেলায় মার কাছে। মা সব বলেছেন তার পুর্বপুরুষের নাম উল্লেখ করে সেগুলো কিছুই বুঝতাম না। ধরে নিয়েছিলাম তিনি আমাদের আপন মামু না। আমাদের আপন মামুরা আমাদের বাড়িতে আসার সময় জিলাপা (জিলাপি), গজা, কদমা, খাজা, বাতাসা, এগুলো নিয়ে আসতেন আমাদের জন্য। মেঝো মামা সিবা উদ্দিন ছিলেন মার পিঠাপিঠি বড় ভাই। তিনি আমাদের বাড়ি বেশী আসতেন। বড় মামা হোসেন আলী মোলভী ইমামতি ও মাদ্রাসা পড়ানো নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। বোন ভাগ্নে ভাগ্নীদের খোজ খবর কম রাখতেন। ছোট মামা রিয়াজ উদ্দিন মোটামুটি খোজ খবর নিতেন। এই রহস্যময় সেকা মামুকে নিয়ে আমি আজ কিছু লিখব। সেকা মামু কোন দিন আমাদের জন্য কিছু নিয়ে আসেননি। সিবা মামু এসে আমাকে কোলে নিতেন। কিন্তু সেকা মামু কোন দিন আমাকে কোলে নিতে আগ্রহ দেখাননি। সেকা মামু প্রতি বর্ষায় একবার বা দুইবার আমাদের বাড়ি আসতেন। তিনি আসতেন ছাগল দেখতে। মামুদের বাড়ি কালিহাতীর ভর এলাকায় রৌহা। কিন্তু সেকা মামু থাকতেন বংশী নদীর পারে পারখী গ্রামে। তখন প্রতিবছর অনেক বন্যা হতো। বাড়িঘরে পানি উঠতো ভর এলাকায়। মামুরা বন্যার সময় গরু ছাগল তিন মাসের জন্য পাহাড়ে পালবার দিতেন। পাহাড়ি গরু পালনকারীরা গরু পালন করে দেয়ার বিনিময়ে গরু দিয়ে হাল চাষ করতো। ছাগল নেয়া হতো বাগি (ভাগী)। যারা ছাগল পালন করে দিতো তারা ছাগলের বাচ্চা হলে অর্ধেক বাচ্চা নিয়ে নিতো। একটা হলে দাম ধরে অর্ধেক দামে একজনে কিনে নিতো। সেকা মামু বাগি দেয়া ছাগল দেখতে আসতেন। এসে মার সাথে দেখা করে যেতেন। মাঝে মাঝে রাত্রি যাপনও করতেন। মা আপন ভাইয়ের চেয়েও বেশী যত্ন করে রান্না করে খাওয়াতেন সেকা মামুকে। আমাদের জন্য কিছু আনতেন না। মার জন্যও কোনদিন একটা শাড়ী নিয়ে আসতেন না। মাকে কোনদিন নাইয়র নিতেন না। আবার আপন ভাইও না। তাই আমি বারবার জানতে চাইতাম মার কাছে “সেকা মামু আমগো কিবা মামু?” মা কী কী যেন বলতেন। তার কিছু কিছু মনে আছে। সেগুলো কিছুটা এমন। ভিয়াইল গ্রামে মধ্যপাড়ার তালুকদাররা আগে ছিলো মন্ডল। আমাদের ফুফার দাদা তালুক কিনে তালুকদার হয়। তার ভাই আনু মন্ডল সিকদার হয়ে রৌহা এক ছেলে পাঠায়। সেই বংশে জন্মে আমার নানা আমীর উদ্দিন। সেকা মামুর দাদা আর মার দাদা হয়তো চাচাতো জেঠাতো ভাই ছিল। ছিল একই বাড়িভিটায়। এখন বড় মামুর ঘর যেখানে ওটাই ছিল সেকা মামুর অংশ। তার জমিজমা সব বেচার পর বাড়িভিটাটুকুও নানার কাছে বিক্রি করে বাস্তুহীন হয়ে পড়েন। পারখীর এক মহিলার বালি নামে একটামাত্র মেয়ে ছিল। ছেলে ছিল না। এমন মেয়ে হলে আগের দিনে মেয়ে বিয়ে দিয়ে মেয়ের জামাইকে ঘরজামাই বানিয়ে রাখতো। ঘরজামাইরা ছেলের মতো জীবন যাপন করতো শশুর বাড়িতে। সেকা মামু ভুমিহীন হয়ে পড়াতে নানা বালির সাথে সেকা মামুর বিয়ে দিয়ে দেন। সেকা মামু হয়ে পড়েন ঘরজামাই। তাই তিনি আজীবন পারখী গ্রামে থাকতেন। আমার মনে প্রশ্ন ছিলো মা সেকা মামুকে শুধু শুধু যত্ন করেন কেনো? সেকা মামু এসে আমাদের উঠানে দাড়িয়ে থাকতেন চুপচাপ। আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট মৃদু স্পন্দন করে হাসি প্রকাশ করতেন। চেহারা খুবই বিকৃত ছিলো। সারা শরীরে সুঁই বসানোর জায়গা ছিলো না যেখানে গুটি বসন্তের দাগ নেই। শরীর ভর্তি ছিলো গুটি বসন্তের দাগ। চোখেও ছিল বসন্তের দাগ। কিন্তু তিনি অন্ধ ছিলেন না। বসন্ত কালে এই ভাইরাস রোগ হতো বলে এটাকে বসন্ত রোগ বলা হয়। শরীরে বড় বড় গুটি হয়ে ফোস্কা পড়তো। তাই বলা হতো গুটি বসন্ত। গুটি বসন্তে লাখ লাখ লোক মারা যেতো। খুবই সংক্রামক ছিল এই রোগ। করোনাভাইরাসের মতো। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন সাড়াসিয়া পাড়া দিয়ে এই রোগ দেখা দিয়েছিলো। অনেকেই এটাকে আল্লাহর গজব মনে করতো। তাই, মানুষ এ গজব থেকে পানা চাইত দোয়া কালাম পড়ে। পাশের বাড়ির রেজু কাক্কু সারারাত দোয়ায়ে গঞ্জেল আরশ পড়তেন। কিছুই বুজতাম না আরবি সেই দোয়ার। তিনি স্পষ্ট করে পড়তেন না। কারন এক লাখবার পড়তে হবে এই দোয়া। তাই দ্রুত পড়তেন। দ্রুত পড়তে গিয়ে অস্পষ্ট হতো দোয়ার কথাগুলো। শুধু শুনতে পেতাম “ইয়া হাবিবী, ইয়া হাবিবী, কামতানামু।” মনে করে নিয়েছিলাম দোয়া গঞ্জেল আরশ পড়ার কারনেই আমাদের পাড়ায় লোহাগাড়া বসন্ত আসেনি। আমরা গুটি বসন্তকে লোহাদাড়া বসন্ত বলতাম। যেখানে বসন্ত হতো সেখানে লোহাগাড়ার মত ক্ষত হতো, তাই। আমাদের দেশে গুটি বসন্তের টিকা দেয়া হয় সবাইকে সেই সময়। হাতের বাহুতে দুটি করে টিকা দিয়ে গেছে স্বাস্থ্য সহকারীরা যাকে বলা হতো টিকাদার। আমার দাদা একসময় টিকাদার ছিলেন। আমি নিজে টিকা নেবার পর টিকাদারকে আমাদের পাড়ার সব বাড়িতে নিয়ে গিয়েছি। বাড়ির চাচীদেরকে বুঝিয়ে বলেছি “টিকাদার আইছে বসন্তের টিকা দিতে। এই টিকা দিলে বসন্ত রোগ হবে না।” সবাই টিকা দিলেন। কিন্তু ইয়াকুব কাক্কুর বউ তার ছেলে শামসুলকে টিকা দিতে দিলেন না। তিনি বললেন ” আমার একটা মাত্র মইল্লা পোলা। তারে টিকা দিলে জ্বর আইয়া মইরা যায় যদি? আমি তারে টিকা দিতে দিমু না।” আমরা সবাই টিকা নিয়েছি। শামসুল কিন্তু টিকা নেয় নি। শামসুলের বয়স আমার বয়সের কাছাকাছি। ওর বাহু লক্ষ করে দেখুন টিকার দাগ নেই। সেবার টিকা দেয়ার পর থেকে দেশে আর লোহাগাড়া বসন্ত হয়নি। দেশ থেকে গুটি বসন্ত নির্মুল হয়েছে। এখন কেউ দোয়া গঞ্জেল আরশ পড়ে না। এখন করোনা ভাইরাস সংক্রমণ হয়ে লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। কত রকম সামাজিক আচার আচরণ ও নিয়ম কানুন করছে। হাত দুচ্ছে সাবান দিয়ে। লক ডাউন করছে। কাজ তেমন হচ্ছে না। যারা চিকিৎসা করবে সেই ডাক্তাররাই ঝাকে ঝাকে মারা যাচ্ছে। আমার আশংকা হচ্ছে এবার গোটা মানবজাতিই কি ধ্বংশ হয়ে যায় কি না। এমন অবস্থায় রেজু কাক্কু বেচে থাকলে হয়তো দোয়ায়ে গঞ্জেল আরশ পড়তেন। জনগণকে বলা হয়েছে জরুরি প্রোয়োজনে বাইরে যেতে হলে মুখে মাস্ক পরে বের হওয়ার জন্য। কিন্তু জনগণ মাস্কের মাহাত্ম্য বুঝতে পারছে না। তারা দলে দলে বিনা প্রয়োজনে বাইরে গিয়ে খোসগল্প করছে থোতায় মাস্ক বেঁধে। মাথায় মুখের মাস্ক কানে ফিতা লাগিয়ে মাথায় চশমা রাখার মতো করে রাখতেও দেখা গেছে একজনকে। চোখে যাদের সমস্যা আছে তারা চোখে চশমা পরে। মাথায় যাদের সমস্যা আছে তারা মাথায় চশমা পরে শুনেছি। মুখে মাস্ক না পরে মাথায় লাগিয়ে রাখলে তাদের কি মাথায় সমস্যা আছে বলা যাবে না? কাজেই আমি হতাস। অনেকেই ফেইসবুকে প্রোফাইল পিকচারে মাস্ক পরে আছেন। এতে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধ হবে কিনা আমি তিন মাসেও কিছু বুঝতে পারছি না। কিভাবে দেশ থেকে করোনা বিতারিত করা যাবে? আমি আশাবাদী এই ভেবে যে কেউ না কেউ মানবজাতিকে করোনার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য হয়তো টিকা আবিস্কার করবে। যেবন আবিষ্কার করেছিল লোহাগাড়া বসন্তের টিকা। দোয়া গঞ্জেল আরশও আমরা পড়বো, টিকাও নিব।

 

রাতে শুয়ে শুয়ে মার কাছে হাস্তর শুনতাম। সেকা মামুর শরীরে এত দাগ হলো কেমনে মাকে বলতে বলতাম। সে গল্প আমি মার কাছে অনেকবার শুনেছি। মা বলতেন “সেকা ভাইগ বাড়ি আছিল আমগ ভিটায়ই। চানুগ বাড়ির যায়গায়। সেকা ভাইর দাদা ধনী মানুষ আছিল। সেকা ভাইর ফুফুরা খপ সুরুতের আছিল। সবাইরই ধনী ধনী বাড়িতে বিয়া অইছিল। সেকা ভাইর বাপদাদারে কি কারনে কেরা জানি হারানী (অভিশাপ) দিছিল এই বইলা যে অগ ছোবের বংশ জানি নির্বংশ অইয়া যায়।

– ছোবের বংশ নির্বংশ কি?

– আমগ বাঁশ আড়ায় বাঁশ ছোব দেখছ না, একটা রুইলে এর থাইকা অনেক বাঁশ জালাইয়া ছোব অয়। এইজন্য কই বাঁশ ছোব। ছোবের বাঁশ সব কাইটা ফালাইলে আর বাঁশ অইব না। মানে বাঁশের ছোবের সব বাঁশ কাইটা ফালাইলে বাঁশ নির্বংশ অইয়া গেলো। যেসুম একটা বংশের সব মানুষ মইরা যায় হেসুম কয় ছোবের বংশ নির্বংশ অইয়া গেছে। আংগ বাড়ির উত্তর মুরা বাড়ির একটা বংশের সব মানুষ গুটি উইটা (বসন্ত) মইরা গিয়া ছোবের বংশ নির্বংশ অইছে। ওডারও কারন আছে।

– ওডার কি কারন?

– একবার আমগ আয়নুদ্দি কাক্কুর ঘরের উগার তলে সিন্ধুক আইছিল। চাচী স্বপ্নে দেখেন জিনে কইতাছে “তোমগো উগারের নিচে সিন্ধুক ভর্তি সোনার টাকা দিয়ে গেলাম। মাটি খুইদা সিন্ধুক বাইর করবা। কাউরে কবা না। চাচী সকালে ঘুম থাইকা উইঠা হাচাই দেখেন উগারের নিচে মাটি ফাইটা উঠছে। চাচী সবাইর কাছে কইয়া দেয়। পরের রাইতে চাচী স্বপ্নে দেহেন জিন কইতাছে তরে কইছিলাম কারো কাছে না কইতে। তুই আমার কথা হোনস নাই। তাই আমি সিন্ধুক হরাই ফালাইলাম।

– চাচী পরের দিন উইঠা দেহেন উগার থিগা শুরু কইরা মাইজালের মইদ দিয়া, উঠারের মইদ দিয়া পুস্কুনি পার পর্যন্ত মাটি ফাইটা রইছে। যেনু গিয়া শেষ অইছে হেনু একটা গাছ আছিল পুস্কুনির পাড়ে। হেই গাছে একটা জট বাইরইয়া পানিতে ঠেইকা রইছে। সবাই তামসা দেখতে আইল। সবাই মনে করলো এই ফাটা যায়গা দিয়া সিন্ধুকটা নিয়ে গেছে জিনে।

– আপ্নে জিন দেখছুইন?

– না। জিন দেহা যায় না। যারা জিন ভার করতে পারে তারা দেখছে। পাড়ার সবাই আজব জট দেখতে আহে। উত্তর বাড়ির দাদাও আহে। হে জিন বিশ্বাস করতো না। সবার সামনেই জটটা টান মাইরা ছিড়া ফালাইয়া কয় কি তামসা বাইর করছে একটা। যা কাম করগা সবাই। রাতে জিন তাকে স্বপ্ন দেখায় তুই আমার জট ছিড়া ফালাইছস। তর ছোবের বংশ নির্বংশ অইব। হাচা কথাই। এর পরের বছর তার বংশের সবার গুটি অইয়া মইরা গিয়া ছোবের বংশ নির্বংশ অইয়া যায়।

– যারে হারানী দিছিল হেই বংশের কি অইল।

– হেই বংশের সবাই মারা যায় ঠাসঠাসি। খালি বাইচা আছে সেকা ভাই আর তার একটা বোন। সেকা ভাইর ফুফুগুনা একেকজন অল্প কয়দিনের ভিতরে নানান রোগে মারা যায়। মেয়েগুনা মইরা যাবার পর সেকাভাইর দাদাও মইরা যায় ঠাস কইরা। সেকা ভাইর বোনগুনাও গুটি অইয়া মইরা যায়। বাইচা আছিল সেকা ভাই আর তার একটা বোন । সেকা ভাই আমার হোমাইজা। কয়েক মাসের বড় অইব। আরেকবার একসাথে অউয়ার (রৌহা গ্রামের) অনেক মানুষের গুটি উঠে। অনেক মানুষ মইরা যায়। আমগ দাদাও মইরা যায় হেসুম। আংগ বাজানেরও গুটি উঠছাল। অত বেশী না। সেকা ভাই গুটি উইঠা মইরাই গেছিল। আংগ বাজান কইল কাশার থালি বাইরাইয়া দেখছে বাইচা উঠে কিনা। সেকা ভাইর কানের কাছে অনেকক্ষণ থালি বাজাইলে পড়ে একটু নড়াচড়া কইরা উঠে। বাজান সারারাত সেকা ভাইকে পাহারা দেয়ার ব্যবস্থা করে যাতে হিয়ালে (শিয়ালে) না নিয়া যায়।

 

এমন সময় আমাদের বাড়ির উত্তর পাশের জংগল থেকে একটা শিয়াল ডেকে উঠতো “হুয়া, হুয়া।” আমাদের রান্নাঘরের সামনে রাতে একটা কুকুর শুয়ে ঘুমাতো। আমরা বলতাম কুত্তা। এই কুত্তাটা সারাদিন তালুকদার বাড়ির সবকটি বাড়ি ঘুরে ঘুরে খাবার খেতো। কেউ খেতে বসলে তার সামনে বসে কুতকুতি চেয়ে থাকতো। একটুকরা হাড্ডি ছুড়ে মারলে চিবাতে চিবাতে চলে যেতো। থাকতো আমাদের রান্নাঘরের সামনে উঠানে। শিয়ালে হুয়া বললে কুত্তাটা “হো?” বলে ডাক দিতো। শিয়াল বলে উঠতো “কাক্কা হুয়া, কাক্কা হুয়া।” শুনে চনপড়া, নওপাড়া, বুইদ্দাচালা, হয়দর ভাইগ চালা ও আরও দুর দুরান্তের সব শিয়াল এক যোগে চিল্লাচিল্লি করে ডেকে উঠতো “কাক্কা হুয়া, কাক্কা হুয়া।” আমি ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে মার বুকে লুকাতাম। কাঁথা দিয়ে মুখ চোখ ঢেকে ফেলতাম। মা বলতেন “ঘুমাইয়া পড়। হিয়াল হুয়া হুয়া করে পোলাপানদেরকে হুইয়া পড়তে কইতাছে।”

 

ছোট বেলা দেখেছি উঠানে ধান শুকা দিলে মুরগির বাচ্চা, কাক ও শালিক এসে ধানে ঠোকর দিতো। কোটা দিয়ে বারি দিয়ে এগুলো তারাতাম। হঠাৎ কোন মুরগির বাচ্চার মাথায় আঘাত লাগলে বাচ্চা অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তো। আমরা মুরগির বাচ্চার কানের কাছে কাশার থালি (প্লেট) নিয়ে নাকইর দিয়ে থালির উপর বেল বাজানোর মত করে বাজাতাম আর বলতাম “জিয়ো জিয়ো।” বেল বাজানো শুনে মুরগির বাচ্চার জ্ঞান ফিরত। তেমন ভাবে সেকা মামুকে কাশার থালি বাজিয়ে মৃত অবস্থা থেকে জিইয়ে তুলেছিলেন আমার নানা। সেকা মামু ছিলো তার বংশের বাতি। সেকা মামু বেচে গেলেও কাজ কর্ম তেমন করতে পারতেন না। জমিজমা যা ছিলো তা বেচে শেষ করে দেন। বিয়ের সময় বাড়িভিটাটাও ছিল না।

 

মার কাছে শুনেছি সেকা মামুর শাশুড়ি খুব করা মহিলা। সেকা মামুর সাথে চাকরের মতো ব্যবহার করেন। সেকা মামু কাজ করতে না পারলেও জোড় করে তাকে দিয়ে কাজ করান। সেকা মামু লগি দিয়ে ভালো করে নাও বাইতে পারতেন। বর্ষাকালে তিনি নাও বাওয়ার কামলা দিতেন। টাকা পয়সা তুলে দিতেন তার শাশুড়ির কাছে। বালি মামিও নাকি সেকা মামুর তেমন যত্ন নিতেন না। মা বলতেন “তার আপন বলতে কেউ নাই। আমরাই তার আপন। তাই আমাগ এনু আহে। বালিরা তারে ঠিক মতো খাবার দেয় কি না? তাই আমি চাইরটা খাবার দেই। তার আতে টেহা পয়সা থাকে না। তাই তোমাগ নিগা কিছু আনতে পারে না। অতটা বুদ্ধিও তার নাই। তার ঘরে কোন পোলাপানও অয় নাই। আটকুরাই অইব নাকি? গুটি অইয়া অনেকেই আটকুরা অইয়া যায়।” এসব কথা শুনে আমার সেকা মামুর প্রতি অনেক মায়া ধরে যায়। চোখের দিকে তাকাতাম। চোখের মণির কাছেও বসন্তের দাগ ছিল। আর একটু হলে চোখের মণি নষ্ট হয়ে অন্ধ হয়ে যেতো। তখন হজে কানার মতো ভিক্ষা করে খেতে হতো। ছোট চওনার হজে কানাদের তিন ভাইয়ের এক সাথে বসন্ত হয়ে চোখ নষ্ট হয়ে যায়। আসলে কানা আর অন্ধর মধ্যে পার্থক্য আছে। যার এক চোখ নষ্ট তাকে বলে কানা। যার দুই চোখই নষ্ট তাকে বলে অন্ধ। কিন্তু আমাদের গ্রামে অন্ধকেই কানা বলে। হজে কানা ভিক্ষা চাইতে এসে সুর করে গজল গাইত “দীনের নবী রাস্তা দিয়া হাইটা যায়, হরিণ একটা বান্ধা ছিলো গাছেরই তলায় গ..।” সুরে সুরে তার পরিচয়ও দিতেন এভাবে “আমার নাম হযরত আলী বাড়ি চোট চওনা, থানা আমার কালিহাতী দুইও চোখ কানা।”

 

আমি তখন বুঝতে না পাড়লেও ডাক্তার হয়ে বুঝতে পেরেছি সেকা মামুর কেনো সন্তান হয়নি। বসন্ত রোগে ঘা হয়ে খুব সম্ভব তার শুক্রাণুবাহী নালী বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার দ্বারা আর বংশ রক্ষা করা সম্ভব হলো না।

 

এক রাতে তিনি আমাদের বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন। তাকে বারান্দার চৌকিতে কাথা বিছিয়ে শুতে দেয়া হয়েছিল। রাতে ভালো খাবারও দিয়েছিলেন মা। সকালে দেখি সেকা মামু বিছানায় নেই। কাঁথা ভিজা। চৌকির নিচেও মাটি ভিজা। কাছে গিয়ে দেখি প্রশ্রাবের দুর্ঘন্ধ। মাকে ডেকে বললাম “মা, মামু মনে অয় বিছানায় প্রশ্রাব কইরা পলাইয়া গেছে।” মা কাউকে বলতে নিষেধ করলেন। বললেন “মানুষ স্বপ্নে বিছনায় পেছাব করতে পারে। ঘুমের ভিতর পেছাব করলে মানুষের করার কিছুই নাই। লজ্জায় হয়তো চইলা গেছে। আমি ধুইয়া দিমুনি। তুমিও ত ঘুমের মইদ্যে বিছনায় পেছাব করো।” আমি বললাম “আমি কি ইচ্ছা কইরা বিছনায় পেছাব করি?” স্বপ্নে দেহি আমি নায়ে বইয়া পানি আতাইতাছি। পানি আতাইলে পেছাব ধরে। নায়ের গুড়ায় বইয়া পানিতে পেছাব কইরা দেই। কোন কোন সুম গাছের ডাইলে বইয়া পেছাব কইরা দেই। চেতন পাইয়া দেহি নিছনায় পেছাব কইরা দিছি। আমার কি দোষ।” তোমার যদি দোষ না অয় তাইলে সেকা ভাইরও দোষ নাই। সেকা ভাইও হয়ত স্বপ্নে পেছাব কইরা দিছে। আরেকদিন আইলে আবার কিছু কইও না।’

 

আমার বিছায় পেছাব করার কথা শুনে আপনারা হাসছেন নাকি? এটা আমার শিশু কালের কথা। বিছানায় পেছাব করা ফেরানোর একটা বুদ্ধি করেছিলাম নিজে নিজেই। আমি শোবার সময় লুঙ্গি পরে শুতাম। লুঙ্গি দিয়ে টাইট করে মাল কোসা দিতাম যাকে বলতাম কাছার দেয়া। টাইট করে কাছার দিয়ে শুইলে পেছাবের নালি দিয়ে পেছাব আসার সময় চাপ খেয়ে ঘুম ভেঙ্গে যেতো। বাইরে গিয়ে পেছাব করে আবার শুতাম। কথায় আছে না “মা, আমি ঘুমালাম, আমার হাগু ধরলে ঘুম থেকে ডাক দিও।” “হাগু ধরলে আমাকে আর ডাক দিতে হবে না, হাগুয়েই তোমাকে ডাক দিবে।” আস্তে আস্তে বড় হই আর বিছানায় পেছাব করার রোগটা ভালো হয়ে যায়।

 

অনেকদিন গ্যাপ দিয়ে সেকা মামু আমাদের বাড়ি আসেন। আগের মতই প্রতি বছর আসতেন। এরপর রাত্রিযাপন করেছিলেন কিনা আমার মনে নেই। মা ভালো ভালো রান্না করে সেকা মামুকে খাওয়াতেন। ১৯৭৯ সনে মা ইন্তেকাল করেন। আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হই ঐ বছরেই। ছমাস পরপর বাড়ি যেতাম। বাড়ির সংসারের হাল ধরেছেন আমার ভাবী। তিনি একজন খুবই দায়িত্ববান আমাদের পরিবারের জন্য। মার মৃত্যুর পর মৃত মায়ের জন্য আমাদের কি কি করনীয় তা আমি ধর্মীয় পুস্তক থেকে শিখতে চেষ্টা করি। করনীয়ের মধ্যে একটা জিনিস জানতে পাই যে মা-বাবা জীবিত থাকতে যাদের সাথে তাদের বন্ধুত্ব ছিল তাদের সাথে যোগাযোগ রাখা। তাদের খোজখবর নেয়া। আমি ভাবীর কাছে জানতে চাই “সেকা মামু কি আমাদের বাড়িতে আসেন?”

– আম্মা মারা যাবার পর এক দিন আইছাল। আমি খাবার দিছিলাম। থাকবার কইলাম। থাকলো না। আর ত আইতে দেহি না।

– যদি আহে তাইলে মা যেভাবে যত্ন করতেন সেই ভাবে যত্ন করবেন।

– তা ত করমুই।

 

আসলেই সেকা মামু আর কোন দিন আমাদের বাড়ি আসেননি। মার মৃত্যুর পর একবারই এসেছিলেন। সেদিনই তিনি মার মৃত্যু সংবাদ শুনে গেছেন। এরপরও তিনি হয়তো ছাগল দেখতে আসতেন। যেহেতু তার বোনটি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। কেনইবা তিনি আসবেন।

 

চারিদিকে করোনা সংক্রমণের সংবাদ পাচ্ছি ফেইসবুক পড়ে পড়ে। তিন মাস যাবত সরকারি চাকরি থেকে অবসরে গেছি। পৃথিবী জুড়ে করোনার মহামারি চলছে। লাখো লাখো মানুষ অসহায় ভাবে মৃত্যুবরণ করছে। তাদের সাথে সমাজ, পরিবার ও আপনজনেরা নিষ্ঠুরভাবে আচরণ করছে। পরিবারের জন্য সারাজীবন কষ্ট করে অর্জিত টাকায় দালান দিছে। করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় তাকে এক কক্ষে বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে রেখেছিল তার পরিবার, নিজের স্ত্রী। দম বন্ধ হয়ে ছটফট করে মৃত্যু হয়েছে তার নির্মম ভাবে। কোটি কোটি টাকার দম্পদ থাকতেও একজন নামকরা ডাক্তারের ছেলে ও ভাই বেরাদার তার লাশ নিতে আসেনি। লাশ দাফনকারীরা এক মৃত ব্যাক্তির গোসলের জন্য তাওয়েল চাইলে একটা ছেড়া গামছা যোগার করে দেয় তার ছোবের বংশের লোকেরা। কোন কোন পরিবারের ছোবের বংশের সবাই আক্রান্ত নিষ্ঠুর ভাবে আইসোলেটেড হয়ে পড়ছে। আমি বেঁচে থাকতে চাই এই সুন্দর পৃথিবীতে আরও অনেকদিন। তাই অবসর কালে কোন কাজ ধরিনি করোনার ভয়ে। ভাগ্যে আমাদের কি আছে জানিনা। আল্লাহর কাছে পানা চাচ্ছি এই মহামারি থেকে তার বান্দাদেরকে রক্ষা করতে। মন আমার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তার মাঝেও আনন্দ পেতে চাচ্ছি বেঁচে থাকার জন্য। এবার অনেকেরই ছোবের বংশ নির্বংশ না হলেও যার বংশের অন্তত একজনও চলে গেছে সেই জানে তার কি ক্ষতি হয়েছে, তার কী কষ্ট।

 

তাই সেকা মামুর কথা আজ বারবার মনে হলো। তার খবর নেয়ার জন্য আজ রৌহার কাশেম মামা, পারখীর জাহাঙ্গীর ভাই ও মাওলানা হাবীবুল্লাহ ভাইকে মোবাইল করি। তাদের কথা শুনে যা বুঝা গেলো তা হলো সেকা মামু আজ থেকে ২৫/৩০ বছর আগে মারা গেছেন। তার কোন সন্তান হয়নি। তিনি মারা যাবার পর বালি মামী একটা ছেলেকে পালবার আনেন। সে ছেলে বড় হয়ে পাহাড়ে গিয়ে বিয়ে করে ঘরজামাই হয়ে বালি মামীকে ফেলে চলে যায়। এদিকে সেকা মামুর শাশুড়িও মৃত্যুবরন করেন। বালি মামী মৃত্যুর আগে বাড়ি ভিটা বিক্রি করে বাজার সদাই করে খেতে থাকেন। তিনিও এক সময় পরলোক গমন করেন।

২৭/৬/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ দেখার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

অন্যের সংবাদ প্রচারে সতর্কতা

অন্যের সংবাদ প্রচারে সতর্কতা

(টিপস)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

মানুষ সাধারণত নিজের বা পরিবারের দুর্বল দিকগুলো সমাজে প্রকাশ করতে চায় না। শুধু খুশীর সংবাদগুলো প্রকাশ করতে চায়। এখনকার মানুষ মাস্তব সামাজিকতা কম করে। ফেইসবুক বা এমন নকল সামাজিকতা বেশী বেশী করে এখন। এখানেও তারা নিজেদের দুর্বল দিকগুলো প্রকাশ করতে চায় না। আগের দিনে অসুস্থ হলে মানুষ আত্বীয় স্বজনকে খবর দিতো। আত্বীয় স্বজন রোগীর বাড়িতে সাহায্য করে দেয়ার জন্য এগিয়ে আসতো। সংগে নিয়ে আসতো নানারকম ফল ফলাদি।

এখন সাধারণত দেখা যায় আত্বীয় সজন অসুস্থ হলে আত্বীয়ের সাহায্যে এগিয়ে না গিয়ে ফেইসবুকে একটা স্টেটাস দিয়ে দেয় “আমার আত্বীয় অমুক অমুক রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তারজন্য আমরা দোয়া চাই।” এই কাজটা খুবই সহজ এবং সস্তা।

আমার কথা হলো, রোগী কি আপনাকে বলে দিয়েছে দোয়া চাওয়ার জন্য?

অনেক রোগীই চান তিনি যে অসুস্থ তা অন্য কেউ না জানুক।

কাজেই আমরা কেউ কারো অসুস্থতার কথা আগ বাড়িয়ে ফেইসবুকে প্রচার করবো না তার অনুমতি না নিয়ে।

তবে কেউ মৃত্যু বরন করলে সেই সংবাদটি প্রচার করা উত্তম কাজ।

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ দেখার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

প্রাইভেসি অপশন

প্রাইভেসি অপশন
(টিপস)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
আমরা ফেইসবুকে পোস্ট লিখে শেয়ার করার আগে প্রাইভেসি সেট করে রাখি এইজন্য যে, আমার পোস্ট কে কে পড়তে বা দেখতে পারবে। কয়েকটা অপশন আছে। প্রাইভেসি অপশনটা আমাদের ফেইসবুক নামের নিচে সময়ের ডানপাশে আইকন আকারে শো করে। এখানে টোকা দিলে এই অপশন গুলো বের হয়। আমি এগুলোর সংক্ষেপে গুরুত্ব বলছি।
Only me: মানে রেখে দিলাম। আমি ছাড়া আর কেউ দেখতে পারবে না।
Friends: আমার সব ফ্রেন্ড দেখতে পারবে।
Specific friends: ফ্রেন্ড লিস্ট থেকে যাকে যাকে সিলেক্ট করবো তারাই শুধু দেখতে পারবে।
Friends except : সব ফ্রেন্ড দেখতে পারবে কিন্তু যাকে সিলেক্ট করে রাখব তিনি ছাড়া। যেমন, একজন মুরুব্বিকে।
Public: সব ফ্রেন্ড এবং যারা ফ্রেন্ড না তারাও দেখতে পারবে। কিন্তু যাকে ব্লক করে রেখেছেন সে দেখতে পারবে না। এই পোস্টের নিচে Share করার অপশন আসবে। এখানে ক্লিক করে যে কেউ তাদের টাইম লাইনে পাবলিক পোস্ট হিসাবে আপনার নামসহ পোস্টটা শেয়ার করতে পারবে।
কেউ কেউ শেয়ার করার অপশন না পেয়ে কপি পেস্ট করে নিজের টাইম লাইনে শেয়ার করে থাকেন। এটা সঠিক না। অনেকে অন্যের পোস্ট পেস্ট করে তার নিচে পোস্টকারীর নাম লিখে দেন “অমুকের টাইম লাইন থেকে।” তাও ঠিক না।
কেন না?
যিনি পোস্ট লেখেন, তিনি এটা কিছুক্ষণ পর সংশোধন করতে পারেন। কিন্তু যিনি পেস্ট করে নিয়েছেন সেখানে সংশোধন হবে না। অথবা তিনি ডিলিটও করতে পারেন। শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করলে লেখক পরিবর্তন করলে যেখানে শেয়ার হয়েছে সেখানেও পরিবর্তন হবে অটোমেটিক। তাছাড়া কপি পেস্ট করা কপিরাইট আইন লঙ্ঘন হয়।

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ দেখার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

 

দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাস

দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাস

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

শুক্রবার ছুটির দিন হলেও দুপুরের পর থেকে আমি প্রাক্টিস করতাম। সপ্তাহের অন্যান্য দিনগুলোর সারাদিনই কাজে ব্যস্ত থাকতে হতো। সকাল সাড়ে আটটা থেকে বিকেল আড়াইটা পর্যন্ত থাকতে হতো মেডিকেল কলেজে। হিস্টোপ্যাথলজি রিপোর্ট করা ও এমবিবিএস ক্লাসের ছাত্রদের লেকচার ক্লাস নেয়া ছিলো আমার মূল সরকারি কাজ। থাকতাম কলেজ বিল্ডিংয়ের চার তলার ডরমিটরিতে। প্রথম দিকে লিন্টুর রান্না খেতাম। শেষের দিকে মইনুলের রান্না খেয়েছি। এভাবে মোট ৮ বছর কেটেছে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে যার বর্তমান নাম এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ। ময়মনসিংহে থাকতে আমি শুক্রবার প্রাক্টিস করতাম না। সপ্তাহের একটা দিন ছুটি পেতাম। পুরাসময় দিতাম পরিবারকে। যেহেতু দিনাজপুর একা ছিলাম সেহেতু শুক্রবারটাও বসে না থেকে বিকেল ও সন্ধ্যাটা প্রাক্টিস করে কাটিয়ে দিতাম।

 

দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের ক্যাম্পাসটা বেশ বড়। এখানে নাকি বড় একটা বিল ছিল। সেই বিল একোয়ার করে সরকার মেডিকেল কলেজের ক্যাম্পাস বানিয়েছে। বিল ভরাট করা হয়েছে বালু দিয়ে। এজন্য ক্যাম্পাসের মাটি কিন্তু বালু বালু। যেখানে যেখানে লিচু গাছ লাগানো হয়েছে সেখানে গর্ত করে সাভাবিক মাটি দিয়ে ভরাট করে গাছ লাগানো হয়েছে। দিনাজপুরের সাভাবিক মাটিতে খুব লিচু হয়। অনেক লিচু গাছ আছে ক্যাম্পাসে। খুবই ভালো মিষ্টি জাতের সেই লিচু। আছে অনেক পাম ট্রি গাছ। সেসব পাম গাছে প্রচুর পাম ধরে। পাম প্রসেস করার ব্যবস্থা থাকলে অনেক পামতেল উৎপন্ন করা যেতো। প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ মাসে কোন একদিন ফল উৎসব হয় কলেজ ক্যাম্পাসে। সেদিন লিচু পারা হয় গাছ থেকে। সব ছাত্র, শিক্ষক কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা একসাথে সেদিন লিচু খায়। ক্যাম্পাসে প্রচুর আমগাছও আছে। তাতে প্রচুর মিষ্টি আম ধরে। উৎসবের দিন আম পারা হয়। সবাই আনন্দ করে আম ও লিচু খায়। ছোট ছোট ঝাউ গাছের ঝোপ আছে। সেগুলোর ছায়ায় বসে ছাত্রছাত্রীরা অবসর সময় কাটায় গল্প করে। কলেজের শহীদ মিনারের কাছে বিরাট একটা কাঠ বাদাম গাছ আছে। এটায় অনেক জায়গা জুড়ে ছায়া দেয়। কলেজ ও ছাত্র হোস্টেলের মাঝখানে বিরাট এক খেলার মাঠ আছে। এই মাঠে বিকেলে ছাত্ররা খেলাধুলা করে। খারাপ খারাপ রোগী ঢাকায় নিয়ে যেতে প্রায়ই এয়ার এম্বুলেন্স এসে নামে এই কলেজ মাঠে। শুক্রবার সকালেও ছেলেরা খেলাধুলা করে এই মাঠে। সারি সারি দেব দারু গাছ আছে রাস্তার পাশ দিয়ে।

 

আমি মাঝে মাঝে শুক্রবার দিন মাঠের কিনারায় কদম গাছের তলায় টাইলস করা বেঞ্চের উপর বসতাম। ছেলেপেলেদের খেলাধুলা ও হৈ-হুল্লোড় উপভোগ করতাম। পাড়ার স্কুল পড়ুয়া ছেলেপেলেরাও খেলতে আসতো এই মাঠে। তাদের খেলাধুলা দেখে আমি ফিরে যেতাম আমার সোনালী শৈশবে। ওরা খেলতো ক্রিকেট। আমি স্মরণ করতাম বাড়ির বাইর বাড়িতে অথবা বাছ্রা ক্ষেতে টুনকি বারি খেলার কথা। মনে পড়তো মজি ভাই, জিন্না ভাই, শাজাহান ভাই, রাজ্জাক, মুকুল ও পাড়ার কতো কতো খেলার সাথীদের কথা। মজি ভাই বেঁচে নেই। নাম ছিল মজিবুর রহমান তালুকদার। রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছেন। শাজাহানও বেঁচে নেই। সেও একক্সিডেন্টলি ট্রাক্টারের নিচে পড়ে মারা গেছে। খোলা মাঠের পাশে গাছের নিচে বসে থাকতে ভালো লাগতো। মৃদুমন্দ বাতাস এসে শরীর জুড়িয়ে যেতো। মাঠের চারিপাশেই সারিবদ্ধ গাছ আছে। গাছের নিচে আছে বেঞ্চ। ছেলেমেয়েরা বসে গল্প করতো। আমি যেপাশে বসতাম সেপাশে তারা বসতো না। আমাকে দেখে তারা ভয় অথবা লজ্জা পেতো। তাদের দেখে আমার কোন পুরোনো স্মৃতি মনে পড়তো না। কারন, আমার জীবনে এমন কোন স্মৃতি নেই। ওদের একটা ঘটনা আমার মনে খুব দাগ কেটেছে। ফাইনাল ইয়ারের খুব চালু একটা ছেলে আর একটা মেয়ে গাছের ছায়ার নিচে অনেক্ষণ কি নিয়ে যেনো তর্কাতর্কি করছিলো। ছেলেটা আমার খুব প্রিয় ছিল। আমি চেম্বারে রিক্সা দিয়ে যাওয়ার সময় তাকেও রিক্সায় উঠিয়ে নিয়েছিলাম। আমার হাতে দুটি ফল ছিলো। আমি একটা ফল তাকে দিয়েছিলাম। সেকথাটা আরেকদিন সে গর্ব করে স্মরণ করছিলো। স্যারের দেয়া ফল খেয়ে নাকি সে খুব খুশী হয়েছিলো। সেই ছেলে করছে ঝগড়া একটা মেয়ের সাথে। কি বলছিল তারা তা আমি শুনতে পাচ্ছিলাম না। ছেলের হাতের মোবাইল ফোনটা কেড়ে নেয়ার জন্য মেয়েটি খুব চেষ্টা করছিলো, এটা বুঝা যাচ্ছিলো দুর থেকে। কমপক্ষে আমি প্রায় আধা ঘণ্টা তাদের মধ্যে এমন মোবাইল টানাটানি দেখেছি। তারপর চলে এসেছি। মাঠের পাড়ের বড় বড় কদম গাছে বড় বড় কদম ফুল ফুটতো। আমাদের বাড়ির দক্ষিণ পাশে যে কদম গাছটা ছিল ওটা অনেক লম্বা ছিল। ওটার ফুল ছিল ছোট ছোট। কিন্তু এটার ফুল বেশ বড়। মনে হয় এটা হাইব্রিড জাতের কদম ফুল গাছ। দুটার ফুলেরই ঘ্রান আছে। আমাদের গাছটাকে বলতাম ফুটি কদম গাছ। গাছটাকে আমি খুব ভালো বাসতাম। গাছটা আমার যখন ৬/৭ বছর বয়স তখন ছোট ফুফা ঘরের রুয়া-হারক (ফ্রেম) বানানোর জন্য কেটে নিয়ে যায়। তার শশুরের গাছ তিনি কেটে নিয়ে গেছেন তাতে আমাদের করার কিছুই ছিলো না। কিন্তু গাছটা কাটায় আমি কেঁদেছিলাম। সেই কষ্ট এখনো আমার বুকে বাঁজে। মেডিসিন বিভাগের ডাঃ তিমির দা কদম ফুল ফোটার খুব খোঁজ রাখতেন। তিনি চিরকুমার। তিনি কেন চিরকুমার তা আমি জানি। সেজন্য আমার খুব কষ্ট হয়। তিনি জ্যৈষ্ঠ মাসেই ক্যাম্পাসের গাছের এক ঝোকা কদম ফুল এনে আমার হাতে দিতেন। তিনি জানতেন সাদেক নামে যে মানুষটা আছে তিনি তিমির বরন বসাকের অনেক সুপ্ত প্রতিভার কথা জানেন। তিনি চেম্বারে বসে রোগী দেখার ফাঁকে ঔষধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্ন্টেটিভদের রেখে যাওয়া সব ভিজিটিং কার্ডের পেছনে সাদা জায়গায় শীস কলম দিয়ে স্ক্যাচ ড্র করে রবিঠাকুর, নজরুল ও বড় বড় মনিষীর ছবি এবং নারীর সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে চমৎকার চমৎকার ছবি আঁকতেন। সেগুলোর একমাত্র দর্শক ছিলাম আমি। আমি উৎসাহ দিয়ে এবং প্রযুক্তি জ্ঞান শিখিয়ে দাদার সেসব ছবি স্ক্যান করে কম্পিউটারে ধারন করেছি। এমনকি দাদার নামে ওয়েবসাইট খুলে সেগুলো নেটে পাবলিস করেছি। তার খাতায় তার রচিত অনেক কবিতা ছিল। সেগুলোর একমাত্র পাঠক ছিলাম আমি। আমিই দাদাকে অনুরোধ করি বই আকারে প্রকাশ করার জন্য। দাদা প্রকাশকের সাথে যোগাযোগ করে সেগুলো প্রকাশ করেছেন। দাদার ভালোবাসা অকৃত্রিম। এই কদম ফুল তিনি আমাকে ভালো বেসেই দিয়েছেন। যারা এই কদম গাছ লাগিয়েছিলেন তারা একে অপরকে ভালোবেসে কদম ফুল দেয়ার জন্যই লাগিয়েছিলেন। আজকালকার ছেলেরা কবে কদম ফুল ফোটে তার খবর রাখে না। মোবাইল নিয়ে টানাটানি করে যাকে ভালোবাসে তাকে। দৃশ্য দেখে মনে কষ্ট পেয়েছিলাম। পরেরদিন ছেলেটা আমার সামনে পড়লে জিজ্ঞেস করেছিলাম “গতকাল মেয়েটার মোবাইল নিয়ে টানাটানি করলে কেনো?” ছেলেটা বললো

– স্যার, গত চার বছর ধরে তার সাথে আমার সম্পর্ক। এখন আমাদের কোর্স শেষ হবে। ও এখন আমার সাথে বেইমানি করছে। ও এখন এখানকার একজন সহকারী রেজিস্ট্রারকে বিয়ে করছে তার বাবা মার কথা মতো।

– মেয়েটা বিয়েতে রাজি?

– রাজি, মানে এখন সে ঐ ডাক্তারের সাথেই সম্পর্ক করছে। এখন সে আমাকে এড়িয়ে চলে। গতকাল তাকে ওখানে ডেকে এনে চার্জ করেছি। সে কিছুতেই ফিরবে না বলে জানিয়েছে। আমি মোবাইলে আমাদের মধুর সম্পর্কের ছবিগুলো দেখালে সে ভয়ে মোবাইল নিয়ে টানাটানি করে। আমি তাকে ছাড়বো না। ঐ ডাক্তারকে সব ছবি দেখাব।

– তুমি, বেঁচে গেছো। আগেই ধরা পড়ে গেছে মেয়েটা। বিয়ের পড়েও এমন করতে পারতো সে। কাজেই, খুব ভালো হয়েছে। এই মেয়েকে ভুলে যাও। সে রেডিমেড ডাক্তার স্বামী পেয়ে তোমাকে অস্বীকার করছে। মেয়েটা তোমার জন্য সুবিধার না। তুমি ওকে ভুলে গিয়ে মনযোগ দিয়ে পড়ে ডাক্তার হয়। ওর চেয়ে সুন্দরী ও ভালো দেখে আরো তিনটা বিয়ে করিয়ে দেবো তোমাকে।

ছেলেটা হেসে দিলো। তাদের পরে কি হয়েছে জানিনা। আরেকদিন আমি কদমতলায় বসে পাড়ার অল্প বয়সের ছেলেদের দেখছিলাম কঁচি পাম ফল খেতে। ক্যাম্পাসের পামগাছগুলোকে সবাই সৌন্দর্যের গাছ হিসাবেই জানতো। এগুলোতে যে পাম ফল হচ্ছে তার খবর কেউ রাখত না। মালয়েশিয়া দেশে হলে এই পাম থেকে তারা প্রসেস করে পাম তেল তৈরি করতো। এই ছেলেগুলো এর স্বাদ পেয়েছে। গাছগুলো বেশী উঁচু ছিল না। ছেলেগুলো ছিল এই ৮/৯ বছর বয়সের। একজনের কাঁদে উঠে আরেকজন পাম ফলের কাঁধি থেকে পাম ফল পারতো। ছিলিয়ে ছিলিয়ে মুখে দিতো। পাম গাছের ডালের চিপায় চিকন চিকন সাপ থাকে। এজন্য প্রায়ই ক্যাম্পাসে সাপ দেখা যেতো। ওরা এভাবে কঁচি লিচুও খেতো। কারন পাকার পর তাদের ভাগ্যে জোটতো না পাকা লিচু। লিচু পাকার পর কর্তৃপক্ষ পাহারা দেওয়াতো। ওরা কাঠ বাদাম গাছে উঠে কাঠ বাদাম পেরে ইটের উপর রেখে আরেক ইট দিয়ে আঘাত করে বাদাম বের করে খেতো। মেডিকেলের ছাত্ররা জানতই না যে এটা কাঠ বাদাম গাছ। তাদের দরকার ছিল ছায়ার। কাঠ বাদাম গাছের ডাল স্তরে স্তরে সাজানো থাকে। পাতাও বড় বড়। নিঃছিদ্র ছায়া পড়ে বাদাম গাছ তলায়। সেখানে পহেলা বৈশাখের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো।

 

পাড়ার পোলাপানদের পাম ফল খাওয়া, কঁচি লিচু খাওয়া ও কাঠ বাদাম খাওয়া দেখে আমি চলে যেতাম আমার সোনালী শৈশবে। আমাদের বাড়ির উত্তর পাশের বুইদ্দা চালার বনে একটা বিরাট জয়না গোটা গাছ ছিলো। আমরা গাছে উঠে বসে বসে জয়না গোটা খেতাম। জয়না গোটা নটকা গোটার (লটকন) মতো। কিন্তু ছোট এবং বেশী টক। প্রথম দিকে চুটকিয়ে চুটকিয়ে বিচি ছাড়িয়ে খেতাম। তাতে জিহবার ছাল উঠে যেতো। শেষের দিকে বিচিসহই ক্যাত ক্যাতি গিলে ফেলতাম। অনেকে ভয় দেখাতো যে পেটে বিচি থেকে গ্যাজ (গাছের চারা) জালাবো। পরেরদিন পায়খানার সাথে সেই বিচি পড়ে যেতো। গরীব পোলাপান সেই বিচি কুড়িয়ে নিয়ে সিদ্ধ করে তেল বানাতো। জ্বালানি তেল। একবার জিন্না ভাই, মজি ভাই আর আমি বুদ্ধাচালার বনের মওলানার জয়নাগাছে উঠে জয়না খাচ্ছিলাম। হঠাৎ মজি ভাই চিতকার দিয়ে বলে উঠলেন “এই, সাদেগালী, সাপ আইতাছে।” চেয়ে দেখি একটা বিরাট অজগর সাপ আমার দিকে ধেয়ে আসছে ডাল বেয়ে। আমি সোজা ডাল ছেড়ে দিয়ে নিচে পড়ে গেলাম। পা মস্কে গেলো। মা ঝাড়া ফু দিয়েছিলেন। ৪/৫ দিনেই ভালো হয়ে যায়।

 

আমরা পাহাড়ি বনের আরো অনেক রকম ফল খেতাম গাছে উঠে। একটা ফল ছিল, নাম তার বেহুল গোটা। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোটা গোটা সবুজ বন্য ফল। টক টক লাগতো। আরেকটার নাম ছিল করাইচ (করমচা)। এটাও ছিলো বন্য ফল। খেতে লাগতো টক টক। বনে কাটাযুক্ত গাছ ছিল আনাই গোটা। আনাই গোটা ছিল খুব স্বাদের। তিতি জাম গাছও ছিল বন্য জাতের। তিতি জাম গাছে উঠে প্রচুর তিতিজাম খেয়েছি। দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে আমলকি গাছও ছিল। তবে ওটা খেলার মাঠের সাথে না। ওটা ছিল মাঠের দক্ষিণ পাশের অল্প জায়গা জুড়ে একটা ছোট বনায়ন করা হয়েছে সেখানে। এই বনে কোন ছাত্র, ছাত্রী বা অন্য কাউকে বিচরণ করতে দেখিনি। তবে, আমি কয়েকবার বিচরণ করেছি। বিচরণের সময় আমাদের গ্রামের কথা মনে হতো। আমাদের বনে যেমন আমলকি, বহেরা, হরতকি, কড়ই, ছেছড়া, সোনালু, সিদা ইত্যাদি গাছ ছিলো এখানেও এসব গাছ রয়েছে। তাই, এখানে ঘুরতে খুব ভালো লাগতো আমার। এগুলোর ফল বেশীর ভাগই ওষধি। কিন্তু কেউ এদের খোঁজ নেয় না। যারা গাছ লাগিয়েছিলেন তাদের একটা উদ্দেশ্য ছিলো।

 

কয়েকজন ছেলে মেয়ে লাকরি কুড়াচ্ছিল। গাছে উঠে উঠে মরা ডাল ভেংগে মাটিতে ফেলছিল তারা। সেগুলো কুড়িয়ে আটি বেঁধে নিয়ে যাচ্ছিল । দেখে আমার সোনালী শৈশবের কথা মনে পড়লো। মা চাচীরা লাকরি দিয়ে মাটির চুলায় রান্না করতেন। আমরা এদের মতোই দল বেঁধে বন থেকে মরা ডাল ভেংগে লাকরির বোঝা নিয়ে আসতাম বাড়িতে। মা খুশী হতেন। আমি পোলাপানদেরকে কদমগাছের নিচে ডাকলাম। প্রশ্ন করলাম “তোমরা কোথায় থাকো?” ওরা জানালো যে কলেজের ক্যম্পাসের কাছেই আনন্দ সাগর এলাকায় থাকে। আনন্দ সাগর হলো কলেজের কাছেই একটু উত্তর -পূর্ব পাশে বিরাট এক পুকুর। দিনাজপুরের রাজারাই একসময় খনন করেছিলেন প্রজাদের পানির ব্যবস্থার জন্য। তারা সাগর থেকে অনেক দুরে থাকতেন। তাই, হয়তো বড় বড় পুকুরকে তারা সাগর বলে ডাকতেন। এমন সাগর নামে আরও পুকুর আছে দিনাজপুর। যেমন, রাম সাগর। নীল সাগরটা পড়েছে দিনাজপুরের পরের জেলা নীল ফামারীতে। “তোমাদের বাবা কি করেন?” এমন প্রশ্নের জবাবে তারা জানালো কারো বাবা রিক্সা চালায়, কারো বাবা হোটেলে কাজ করে, কারো বাবা দিন মজুর, ইত্যাদি। “তোমরা স্কুলে যাও না?” প্রশ্ন করায় জানতে পারলাম সবাই সরকারি প্রাইমারি স্কুলে যায়। ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস ফাইফ সব ক্লাসেরই ছাত্র পেলাম এদের মধ্যে। তাদের প্রশ্ন করে কবিতা, গল্প, ছড়া, গান সবই শোনা হলো। ওরা বেশ মেধাবীও বটে। আমার ধারনা ছিলো ওরা পড়ে না। আমি তাদের প্রশ্নোত্তরে মুগ্ধ হলাম। মনে মনে ভাবলাম, এরাই মেধাবী। এদের থেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রশাসক বানাতে পারলে দেশ অনেক এগিয়ে যাবে। পরক্ষণেই হতাস হলাম এই ভেবে যে, এরা তো বড় হয়ে কোচিং সেন্টারে যেতে পারবে না। কি করে আমার আশা পূরণ হবে? আমি আমার পকেট থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড ওদের মধ্যে ক্লাস ফাইভে পড়ুয়া মেয়েটার হাতে দিয়ে বললাম “তোমাদের পড়া শুনে আমি মুগ্ধ হয়েছি। এই ঠিকানাটা রেখে দিবে। তোমাদের বাবা, মা, ভাই, বোন বা তোমরা কেউ অসুস্থ হলে আমার চেম্বারে আসবে। আমি বিনা ফি-তে চিকিৎসা দেব।” তারা খুশী হয়ে বললো “আচ্ছা।” তারপর আমি পকেট থেকে মানিব্যাগ হাতে নিয়ে বললাম “তোমাদেরকে আমি মিষ্টি খাওয়াবো। কি মিষ্টি খেতে চাও?” শুনে ছোটরা বড় মেয়েটার দিকে তাকালে মেয়েটা সবাইকে বিপদের সংকেত দিয়ে এক দৌড়ে লাকরি ফেলে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গেলো। বুঝলাম তারা আমাকে ছেলেধরা মনে করেছে। বিটিভির জনসচেতনতামূলক নাটকে এগুলোই শেখানো হয়। আমরা যখন এমন ছোট ছিলাম তখনও ছেলেধরা ছিলো। রাতে ছালা নিয়ে ঘুরতো। একা একা কোন পোলাপান ঘরের বাইরে গেলে খপ করে ধরে ছেলেধরারা ছালায় ভরে নিয়ে যেতো। এজন্য আমরা বলতাম ছালাধরা। বেশ কিছুদিন পর সন্ধায় চেম্বারে এসিস্ট্যান্ট বললো যে একজন মহিলা একটা বাচ্চা মেয়ে নিয়ে এসেছে আপনার সাথে দেখা করতে। কেনো এসেছে তা বলছে না। আমি অনুমতি দিলাম। দেখি সেই দৌড়ে পালানো মেয়েটা। কি ব্যাপার জানতে চাইলে মহিলা বললেন “আমি ওর দাদী। ও এবার প্রাইমারি পাশ কইরা হাই স্কুলে উঠছে। সরকার থাইকা কিছু বই দিছে। আরও কিছু বই খাতা কিনন দরকার। ওর বাপের টাকা নাই। অর মন খারাপ। আইজ এই কাগজটা বাইর কইরা কইল আমারে এনার কাছে নিয়া যাও, দাদী, আমার মনে অয় বই কিনার জন্য কিছু দিবেন। তাই আইছি আপনের কাছে।” আমি বললাম “এই ঠিকানাটা দিয়ে বলেছিলাম কারো কোন অসুখ হলে আসার জন্য। বই কেনার জন্য তো আসতে বলিনি।” আমি মেয়েটার দিকে তাকালে চোখ নিচু করলো। যাহোক, আমি কয়েকশ টাকা দিয়ে ভালো করে পড়াশোনা করার উপদেশ দিয়ে বিদায় দিলাম।

 

কলেজের সামনের উত্তর পাশে মুল বাগান ছিল। ফুলের বাগান। বড়ই সৌন্দর্যের বাগান। ডিজাইন করে ফুল গাছ লাগানো হয়েছে। মাঝখানে গোল চক্কর। হাটার জন্য সুন্দর রাস্তা। বসার জন্য সুন্দর টাইলস করা প্লাটফর্ম। আমি অনেকসময় এখানে বসে থাকতাম। বাগানসহ কলেজ বিল্ডিংয়ের একটা ছবি তুলেছিলাম। সুন্দর ছিলো সে ছবিটা। এই মেডিকেল কলেজের ওয়েবসাইট এডিট করার দায়িত্ব ছিল আমার উপর। আমি সেই ছবিটা ওয়েবসাইটের ফ্রন্ট পেইজে দিয়েছিলাম। একমাস পরে এক বড় ভাই আমাকে জানালেন “কলেজের বদনাম হয় এমন ছবি ওয়েবসাইটে দেয়া ঠিক হয়নি।” আমি বললাম “এমন কিছু কি দেখা গেছে নাকি?” এই বলে আমি ওয়েবসাইট দেখলাম। তিনি দেখালেন যে কলেজের দোতলায় নির্জনে এক জোড়া ছেলে মেয়ে বসে আছে। আমি বললাম “ভাই, সরি, এটা আমার চোখে পড়েনি।” তখনই ওটা ডিলিট করে দিলাম। মনে পড়লো, এক লোক চড়াক্ষেতে নির্জনে প্রাকৃতিক কার্জ্য সমাধা করার সময় গুগুল আর্থের ওয়েবসাইটে ধরা পড়ে। তাতে লোকটা গুগুলের বিরোধ্যে মানহানীর মামলা করে ক্ষতিপূরণ দাবী করে। প্রায়ই এমন অবস্থায় পড়ে গিয়েছিলাম ।

 

আমার বসার অফিস কক্ষটা ছিল কলেজের উত্তর পাশে। উত্তর পাশের পর্দা আমি লাগাইনি বাগান দেখার জন্য। প্রচুর আলো আসতো কাঁচের প্রসস্থ জানালা দিয়ে। কাজের ফাঁকে আমি বাগানের দিকে চেয়ে থাকতাম। বিল্ডিংয়ের চিপায় অনেক চাম বাঁদুর (চামচিকা) ও আবাবিল পাখির মত পাখি থাকতো। তারা সারাক্ষণ বাগানের উপর দিয়ে উড়াউড়ি করতো। খুব ভালো লাগতো দেখে। আমি কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরে দেখতে পেতাম। কিন্তু বাইরের কেউ আমাকে দেখতে পেতো না। একবার দেখলাম এক ছাত্রী কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুছতে মুছতে আমার রুমের পেছন দিয়ে ছাত্রী হোস্টেলের দিকে যাচ্ছে। আমার মেয়ে ডাঃ মার্জিয়া ইসলাম দীনা তখন এই কলেজেরই ছাত্রী ছিল। এজন্য সব ছাত্রীদেরকে আমি আমার মেয়ের মতই দেখতাম। নিজের মেয়ে পরীক্ষার্থী থাকলে পরীক্ষক হবার নিয়ম নাই। তাই, আমার মেয়ের ব্যাচের আমি পরীক্ষা নিতে পারিনি। মেয়ের ক্লাসমেটরা ঠাট্টা করে মেয়েকে দোষারোপ করেছে “তোর জন্যই স্যারের কাছে ভাইভা পরীক্ষা দিতে পারলাম না।” মেয়েটির কান্না আমাকে ব্যথিত করলো। আমি জানালা খুলে ডাকলাম “এই মা, তুমি এদিকে আসো। মেয়েটা চোখ মুছতে মুছতে জানালার কাছে এলো।

– কাঁদছো কেন?

– স্যার, আমি এবার পরীক্ষা দেব না।

– কেনো, কি হয়েছে?

– আমার সীট কেটে পড়েছে।

– মানে?

– আমার বান্ধবীর পরই আমার রোল নাম্বার। সীট প্লানে আমার রোল অন্য সারিতে গিয়ে পড়েছে। পরীক্ষা খারাপ হবে। আমি পরীক্ষা দিতে পারবো না।

– পাগল, ভোর পাগল কোথাকার। তুমি একজন ভালো ছাত্রী আমার জানামতে। আমি এবার তোমার ভাইভা নেবো। তোমার রেজাল্ট ভালো হবে। আর তুমি বলছো পরীক্ষা দেবে না। এদিকে মাথা আনো। তোমার মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করে দেই। তুমি পাশ করবে, ইনশআল্লাহ।

 

আমি তার মাথায় হাতের আঙ্গুলের হালকা ছোয়া দিয়ে দোয়া করলাম। মেয়েটি কান্না থামিয়ে পরীক্ষা দেবে বলে হোস্টেলের দিকে চলে গেলো। সেই মেয়েটি কে আমি এখন স্মরণ করতে পারছি না। আরেকবার সন্ধায় ছাত্রী হোস্টেলের এক মেয়ে নিজ কক্ষে ফ্যানে ঝুলে আত্বহত্যার চেষ্টা করেছিলো। বান্ধবীরা উদ্ধার করে প্রিন্সিপাল স্যারকে জানালে প্রিন্সিপাল স্যার আমাকে এবং ফেরদৌস স্যারকে পাঠান হোস্টেলে। মেয়েটার কথা শুনে এবং বান্ধবীদের কথা শুনে বুঝা গেলো “মেয়েটির রুমমেট তার সাথে রিডিং পার্টনারশিপ বাদ দিয়ে আরেক মেয়ের সাথে পার্টনারশিপ করেছে।” এটাই অভিমানের মুখ্য কারন। আমি মেয়েটাকে বুঝালাম “আমাদের সব স্যারের কাছে ভালো ছাত্রী হিসাবে তুমি পরিচিত। তোমাকে আমরা এবার ভালো নাম্বার দিয়ে পাস করাবো। আগামী বছর তুমি ডাক্তার হবে। তোমার মা বাবা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে তুমি ডাক্তার হয়ে ফিরে যাবে। ভালো ছেলে দেখে তারা তোমাকে বিয়ে দেবে। ভালো চাকরি পাবে। বাবা মাকে খুশী করবে। এদিকে তুমি তুচ্ছ কারনে ফাঁসি দিতে গেছো। ” এভাবে বুঝিয়ে মেয়েটাকে আত্বহত্যা থেকে ফিরিয়ে এনেছিলাম। মেয়েটার নাম আমার মনে নেই। রেগুলার পাস করে বাড়িতে চলে গেছে।

 

এমন হাজারো স্মৃতি আছে দিনাজপুর প্যাম্পাসের। আমি এসে পড়েছি প্রায় সাড়ে চার বছর হলো। আসার এক বছর পরই পরীক্ষা নিতে গিয়ে সবার সাথে দেখা করে এসেছি। দেখে এসেছি স্মৃতিমাখা ক্যাম্পাস। দেখলাম প্রিন্সিপাল কামরুল আহসান স্যার বাগানের এক পাশে একটা জলাধার কেটেছেন। নতুন নতুন নানা জাতের ফুল গাছ লাগিয়ে বাগানের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলেছেন আরও চমৎকার করে। আমি পুরনো স্টাফদের থেকে খোঁজ নিয়েছি এই ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বর্ধনে কোন কোন অধ্যক্ষের অবদান আছে। তাতে বুঝা গেলো প্রথম প্রিন্সিপাল ছিলেন বারী স্যার। তিনি স্টাফদের কাছে ব্রিটিশ বারী স্যার নামে পরিচিত ছিলেন। তারসময় কলেজ ক্যাম্পাস ছিল শহরের পুরনো হামানা বিল্ডিংয়ে। তিনি খুব কষ্ট করে গেছেন নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্য। প্রিন্সিপাল মতলুবুর রহমান স্যারের সময় নতুন ক্যাম্পাসের কাজ হয়। প্রিন্সিপাল সাইফুল বারী স্যার ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বর্ধনের ধারাবাহিকতা চালিয়ে যান। সে সময় সালেহর পোস্টিং হয় দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে। সে মন্তব্য করেছিল “দোস্ত, আমরা রাতে মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে পৌছে এর সৌন্দর্য দেখে অভিভুত হয়ে পড়ি। ছোট ছোট ঝাউ গাছের ফাঁকে ফাঁকে গোল গোল সাদা লাইট। অপরূপ লাগছিলো। ” সাইফুল বারী স্যারের পর আসেন প্রিন্সিপাল নজরুল ইসলাম স্যার। তার সময়ই আমি দিনাজপুর বদলী হই। তিনিও ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বর্ধনে অনেক কিছু করেন। সুন্দর একটা মসজিদ সংযোজন করান। তিনি মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে রাতে ৯টা /১০ টার সময় ক্যাম্পাস দিয়ে রাউন্ড দিতেন। ছেলে মেয়েরা পাশাপাশি বসলে ধমকিয়ে উঠিয়ে হোস্টেলে পাঠিয়ে দিতেন। তিনি চলে যাবার পর ক্যাম্পাসের লাইটগুলো নাই হতে থাকে। বুঝতে পারতাম দুষ্ট ছেলেরা রাতের অন্ধকারে ঝাউ গাছের পাশে বসার লাইট ইটের টুকরা দিয়ে ঢিল মেরে নষ্ট করে ফেলতো। আমি রাতে চেম্বার থেকে ফেরার সময় অন্ধকারে ভুতদের চলাফেরা অনুমান করতাম। এরপর এলেন প্রিন্সিপাল হামিদুল হক খন্দকার স্যার। তিনি যোগদান করার দুই তিন্ দিন পরই স্যারকে ক্যাম্পাসের অবস্থা অবহিত করে ভালো লাইটিং-এর ব্যবস্থা করার অনুরোধ করলাম। তিনি সাথে অনেক মজবুত এবং শক্তিশালী ফ্লাডলাইট দিয়ে সারা ক্যাম্পাস দিনের মতো আলোকিত করে দিলেন। এরপর এলেন প্রিন্সিপাল কামরুল আহসান স্যার। তিনি তো আরও সৌন্দর্য প্রিয় মানুষ। তিনি তার মনের মতো সাজানো শুরু করলেন। এ অবস্থায় আমি চলে এসেছি। নিশ্চয়ই আরো সৌন্দর্য পেয়েছে আমার স্মৃতি মাখা মধুর ক্যাম্পাস। যেতে চাই আবার দিনাজপুর বেড়াতে। নানান অজুহাতে যাওয়া হয় না।

ইতিমধ্যে কলেজের নাম পরিবর্তন করে “এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ” করা হয়েছে। বর্তমান অধ্যক্ষ ডাঃ শিবেস সরকার স্যার। তিনি আমার সময় রেডিওলজি বিভাগের হেড ছিলেন। আল্ট্রাসনোগাইডেড এফএনএসি করার সুবাদে স্যারের স্যাথে আমার প্রায় প্রতিদিন দেখা হতো। এখনো আমি এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ জার্নালটা অনলাইনে সম্পাদনা করি। কাজেই, মনে হয় এখনো আমি আছি তাদের সাথে। বৃষ্টি হলে আমার মন উদাস হয়। বারান্দায় গিয়ে দাড়াই। গাছে বৃষ্টির ফোটা পড়ার দৃশ্য দেখি। এখন আষাঢ় মাস। বৃষ্টি পড়ছে পাতায় পাতায়। একটা কাক আমার বাড়ির পেছনে গাফফার তালুকদার স্যারের হাতে লাগানো গাছে বসে চুপটি করে ভিজছে। আমার মন ছুটে গেছে দিনাজপুর ক্যাম্পাসে। আমি যেনো দাড়িয়ে আছি ডরমিটরির বারান্দায় মাঠের সেই কদম গাছটার দিকে চেয়ে। তিমির দা তার রুমে বসে হারমোনিয়াম বাজিয়ে বর্ষার রবিন্দ্রসংগীত গাইছেন। কদম ফুলের ডালে বসে একটা কাক চুপটি করে ভিজছে। ডালে ডালে ফুটন্ত কদম ফুল। এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ তথা আমার স্মৃতিমাখা দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে।

২৫/৬/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ থেকে বই কেনার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

পায়খানা পরীক্ষা

পায়খানা পরীক্ষা

(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

পায়খানার সাথে কৃমির ডিম, ডাইরিয়ার ও আমাশয়ের জীবাণু যায় কিনা এবং পরিপাক তন্ত্রে ইনফেকশন হয়ে পাস সেল যায় কি না এগুলো জানাই পায়খানা পরীক্ষার মুল উদ্দেশ্য । খাবার হজম হবার পর খাদ্যের অপ্রয়োজনীয় বস্তুগুলো পরিপাকতন্ত্রের শেষ অংশ রেক্টামে জমা থাকে বেশ কয়েকঘন্টা । এই জমা থাকা খাদ্যের অপ্রয়োজনীয় বস্তুগুলোকে বলা হয় মল। ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় স্টুল । রেক্টাম মলে ভরে গেলে পায়খানার বেগ হয় । রেক্টামের পরের অংশকে বলা হয় এনাল ক্যানাল । এর মুখকে বলা হয় এনাস । সুবিধামত সময় ও জায়গা না পাওয়া পর্যন্ত আমরা পায়খানার বেগ হলেও ধরে রাখি । এটা সম্ভব হয় এনাল স্ফিংটার থাকার জন্য । এটা মাংসপেশি দিয়ে তৈরি । এটা যত শক্তিশালী হবে পায়খানা ধরে রাখার ক্ষমতাও তত বেশী হবে । যাদের কোন কারনে এই মাংসপেশী দুর্বল হয়ে যায় তারা পায়খানা ধরে রাখতে পারে না । প্যারালাইসিস তার অন্যতম কারন । পায়খানা নরম বা পিছলা হলেও এনাল স্ফিংটার তা ধরে রাখতে পারে না । ডায়রিয়া ও ডিসেন্ট্রি (আমাশয়) হয়ে এমন হয় । পায়ুপথ (এনাল ওরিফিস বা এনাস), যৌনাংগ ও স্তনকে মানুষ লজ্জা স্থান হিসাবে গণ্য করে । তাই, বিশেষ করে কমপক্ষে এতটুকু জায়গা মানুষ ঢেকে রাখে । এসব লজ্জাস্থানের নাম মানুষ মুখে আনতেও লজ্জাবোধ করে । ডাক্তারের কাছে গিয়ে কোলাশা করে না বললে ডাক্তারও ঠিক মতো বুঝতে পারে না । ডাক্তার ঠিক মতো না বুঝলে চিকিৎসাও ঠিক মতো হয় না । বলতে লজ্জা বোধ করার কারনে এসব অংগের বিভিন্ন নাম দিয়েছে মানুষ । আমাদের গ্রামের কিছু কিছু মুরুব্বিরা পায়ু পথের নাম দিয়েছে মারগ । বলে “রাতে আমার মারগ দিয়ে গুড়া কৃমি বাইরয় ।“ এটাকে পায়খানার রাস্তাও বলে অনেকে । যেমন বলে “আমার পায়খানার রাস্তায় জ্বালাপোড়া করে।” যেঘরে মল ত্যাগ করা হয় তাকে বলা হয় পায়খানা ঘর (লেট্রিন)। কিন্তু মানুষ এটাকে সংক্ষিপ্ত করে বলে পায়খানা । যেমন বলে “আমাদের পায়খানাটা বাড়ির উত্তর পাশে।” আবার মলকেও পায়খানা বলে। যেমন বলে “আমার পায়খানা একদম কষা।” অথবা “আমার পায়খানা পরীক্ষা করাতে হবে।” ডাক্তাররা বুঝে নিতে পারেন রোগী কী বলতে চাচ্ছে । কিন্তু রোগী অনেক সময় বুঝতে পারে না ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মী কি বলতে চাচ্ছে । আমি আমার দুটি বাস্তব ঘটনা দিয়ে ব্যাপারটা বুঝাতে চাচ্ছি ।

 

আমি এমফিল ভর্তি হবার পুর্বে জানুয়ারি ১৯৯২ থেকে জুন ১৯৯৩ পর্যন্ত এই দেড় বছর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রভাষক ছিলাম। তখন নিজের ল্যাবরেটরি ছিল না। একজন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার মালিকানায় চরপাড়ায় একটা প্রাইভেট প্যাথলজি ল্যাবরেটরিতে আমি রিপোর্ট করতাম। পাশের চেম্বারে মেডিসিন বিভাগীয় প্রধান প্রাক্টিস করতেন। তার রেফার্ড করা অধিকাংশ পরীক্ষাই আমি করতাম। তিনি অনেক রোগীর স্টুল (মল) পরীক্ষা করাতেন। আমি বলতাম
– আপনি এত স্টুল পরীক্ষা করান কেন, স্যার?
– তাতে আপনার কি সমস্যা? আপনার ইনকাম তো তাতে বেশী হয়।
– না, মানে, অনেক রোগীর দেখা যাচ্ছে পায়খানা অত্যন্ত কষা। অথচ আপনি তাকে এডভাইস করেছেন পরীক্ষা করার জন্য। তাতে অনেকে এখানে পায়খানা করতে না পেরে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে চলে যায়। মনে করে যে পায়খানাই পরীক্ষা করাতে পারলাম না, চিকিৎসা দিবেন কিভাবে।
– আপনাকে দিয়ে পায়খানা পরীক্ষা করা আমার উদ্দেশ্য না। রোগী কমপ্লেইন করে তার পায়খানা হয় না । আমার উদ্দেশ্য হলো রোগীর পায়খানা হয় কি না তা পরীক্ষা করা। সন্ধ্যার সময় আপনার ল্যাবে এসে পায়খানা হলে তো রোগী ভালো। তার পায়খানা হয়।

 

ল্যাবের মালিক খুব সচেতন ছিলেন। একটা  রোগীও যাতে পরীক্ষা না করে চলে না যায় সেজন্য সহকারীদেরকে সতর্ক করে দিতেন । সহকারীরা জানতো যে রোগী পায়খানা পরীক্ষা না করে চলে গেলে খবর আছে। সহকারীরাও চালাক কম ছিল না। পায়খানা কষা রোগীদের ব্যাবস্থা দেন পায়ুপথে গ্লিসারিন সাপোজিটরী। পায়খানা করতেই হবে। তাতে আমার কি? আমি কাজ পেলেই হল।

একদিন সন্ধায় এক রুগী বললেন
– লেট্রিনের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
– কেন?
– লেট্রিনের সামনে লাইন পরে গেছে।

 

আমি গিয়ে দেখি লেট্রিনের দরজায় সামনে লেট্রিনের দিকে ঘুরে এক গ্রাম্য মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। আমি বললাম
-দড়জায় দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ভিতরে ঢুকুন।
– পায়খানা তো ধরতাছে না।
– আপনার পায়খানা কেমন?
– আমরা গ্রামে থাকি, গরীব মানুষ। কেমন আর অইব, তিন মুরা হোলার বেড়া, সামনে চটের দরজা।
– তার মানে তিন দিকে শোলার বেড়া, সামনে চট। আমি সেই পায়খানার কথা বলিনি আপনার পেটের পায়খানা কি কষা না নরম?
– এবা, আমার পায়খানা কষা, লোয়ার মত শক্ত।
– আপনি পরে আসুন।
– তাইলে ঐডা কি করাম?

দেখলাম লেট্রিনের দরজার মাঝখানে একটা গ্লিসারিন সাপোজিটরি রাখা আছে।
– এটা কে রাখল?
– আমি রাখছি।
– কেন?
-আপনেগ লোকে কইল “এইডা পায়খানার দরজায় দিয়া কিছুক্ষণ দাড়াইয়া থাকলে পায়খানা ধরব। সেই কখন থাইকা খাড়াই আছি, পায়খানা ধরতাছে না। আমি কি করাম।
– এইটা পায়খানার রাস্তা দিয়া দিতে হবে।
– হেই রাস্তা কোন দিকে?

 

তারপরের ঘটনা ভাল মনে নেই। তাই আর বলতে পারলাম না।

 

যে কোন সেম্পলে অসাভাবিক কিছু থাকলে সহকারীদেরকে আমার নির্দেশ দেয়া ছিল যেন আমাকে দেখানো হয়। সহকারী একদিন একটা স্টুল সেম্পল দেখাল। দেখলাম ওতে কোন স্টুল নেই। আছে শুধু টাটকা রক্ত। আমি রোগীকে ডেকে জিগালাম
-আপনার পায়খানার সাথে সব সময় রক্ত আসে?
– না, কখনো আসে না।
– এতো দেখছি টাটকা রক্ত।
– রক্ত আসবে না মানে, আপনাদের দেয়া কাঠি মশৃন না। ওটা পায়খানার রাস্তায় ঢুকাতে আমার অনেক কস্ট হয়েছে।
– আপনি কি করেন?
– কলেজে পড়ি।
-কাঠি পায়খনার রাস্তায় ঢুকায়েছেন কেন?
-আপনার লোক বলল “এই কাঠি দিয়ে একটু পায়খানা নিয়ে এই পটে নিয়ে আসুন”। অনেক গুঁতাগুঁতি করেও পায়খানা আনতে পারি নি, এসেছে শুধুই রক্ত।

-আপনাকে বলা হয়েছিল প্যানে পায়খানা করার পর সেখান থেকে এই কাঠির আগা দিয়ে এক দানা পরিমাণ সেম্পল নিতে । আপনি পায়ু পথে খোচাখুছি করলে কি পায়খানা আসবে?

-অ বুঝছি ।
১৮/৬/২০১৭ খ্রি.

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (14 votes, average: 4.50 out of 5)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ থেকে বই কেনার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

রোগাক্রান্ত হলে করনীয়

রোগাক্রান্ত হলে করনীয়

(স্বাস্থ্য কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমরা রোগে আক্রান্ত হলে আমাদের শরীরে নানা রকম সমস্যা ও কস্ট দেখা দেয়। এইগুলোকে বলা হয় উপসর্গ। একেক রোগের একেক রকম উপসর্গ। রোগ হলে শরীরের ভিতর ক্ষতি হতে থাকে। এসব ক্ষতির কারনে আমাদের শরীরে জ্বর, ব্যাথা, কাশি ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। কষ্ট হয় বলে আমরা রোগের চিকিৎসা করি। কষ্ট না হলে আমরা চিকিৎসা করতাম না। তার দরূন রোগে আমাদের শরীরের সমুহ ক্ষতি করে ফেলত। তাই উপসর্গগুলো  আমাদের জন্য উপকারী। যেমন শরীরে আগুন লাগলে গরম লাগে। তাই আমরা আগুন থেকে সরে যাই। গরম না লাগলে আমরা পুড়ে যেতাম কিন্তু জানতে পারতাম না। রোগের চিকিৎসা করার দায়িত্ব ডাক্তারের। তাই রোগ হলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।

রোগ হয়ার সাথে সাথে সব লক্ষণ এক সাথে দেখা দেয় না। তাই সাথে সাথেই ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিলম্ব করা যাবে না। যেমন, বুকের বাম পাশে ব্যাথা, তলাপেটের ডান পাশে ব্যাথা, তীব্র মাথা ব্যাথা ইত্যাদি।

প্রথমেই আপনাকে যেতে হবে আপনার নিকটস্থ রেজিস্টার্ড ডাক্তারের নিকট। তিনি আপনার সমস্যার কথাগুলো শুনে শারীরিক পরীক্ষা করে প্রাথমিক ভাবে একটা রোগ নির্ধারণ করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিবেন। প্যাথলজিক্যাল ও রেডিওলজিক্যাল কিছু পরীক্ষা করাবেন সুক্ষ্মভাবে রোগ নির্ণয় করার জন্য। প্রয়োজনে তিনি ঐ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে পাঠাবেন। তবে, আপনি যদি কোন কারনে সরাসরি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে চান তবে আপনাকে সঠিক বিশেষজ্ঞ নির্বাচন করতে হবে। না হলে টাকা ও সময় দুইটিরই অপচয় হবে।

সেক্ষেত্রে আমার পরামর্শ হল রোগী যদি ১৫ বছর বয়সের কম হয় তবে শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ দেখাবেন। তাদের ডিগ্রি থাকবে ডিসিএইচ, এফসিপিএস(শিশু) বা এমডি(শিশু)। অপারেশন এর ক্ষেত্রে এফসিপিএস(শিশু সার্জারি) বা এমএস (শিশু সার্জারি)।

বড়দের ক্ষেত্রে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগনের ডিগ্রি দেখবেন এমসিপিএস (মেডিসিন), এফসিপিএস(মেডিসিন) অথবা এমডি(মেডিসিন)।

স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞগনের ডিগ্রি হবে ডিজিও, এফসিপিএস (গাইনি অবস), এমএস(গাইনি অবস)। এখন মেডিসিন ও সার্জারির ব্রাঞ্চ গুলোতেও অনুরূপ ডিগ্রী আছে। বুঝে শুনে এসব বিভাগের ডাক্তারও দেখাতে পারেন।

সঠিক সময়ে, সঠিক ডিগ্রিধারী ডাক্তার দেখাতে পারলে এবং সঠিক প্যাথলজি ও রেডিওলোজী বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করাতে পারলে আপনার সময় ও খরচ কম লাগবে। কষ্টও কম লাগবে।

৫/৬/২০১৭ খ্রি.

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 3.00 out of 5)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ থেকে বই কেনার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

 

পছন্দের প্যাথলজি ল্যাবরেটরি

পছন্দের প্যাথলজি ল্যাবরেটরি

(স্বাস্থ্য কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

মনে করুন,  আপনি একজন আপনার পছন্দের ডাক্তার দেখালেন । ডাক্তার আপনার রোগের লক্ষণ শুনে শরীর পরীক্ষা করলেন । তারপর একটা প্যাথলজিকেল পরীক্ষার রিকুইজিশন ফরম ধরিয়ে দিলেন যেখানে রেফার্ড করা আছে একটা নির্দিষ্ট ল্যাবরেটরির নাম। আপনি আমাকে প্রশ্ন করতে পারেন

– কেন আমার ডাক্তার একটা  নির্দিষ্ট প্যাথলজি ল্যাবে আমার পরীক্ষাগুলো করাতে দিলেন?
উত্তর দেয়ার আগে আমি আপনাকে প্রশ্ন করি

– কেন আপনি এত ডাক্তার থাকতে একজন নির্দিষ্ট ডাক্তার পছন্দ করলেন?
ডাক্তারের জ্ঞানের পরিমাণ, ডিগ্রীর মান ও সংখ্যা, অভিজ্ঞতা, ভিজিটের পরিমান ইত্যাদি বিবেচনা করে আপনি ডাক্তার নির্বাচন করেছেন।
তদ্রুপ, আপনার ডাক্তারও প্যাথলজি ল্যাবের প্যাথলজি বিশেষজ্ঞের জ্ঞানের পরিমান, ডিগ্রীর মান ও সংখ্যা, অভিজ্ঞতা, চার্জের পরিমান ইত্যাদি বিবেচনা করে ল্যাব নির্বাচন করে পরীক্ষার জন্য রেফার্ড করেছেন । কেউ কেউ এর মধ্যে কমিশনের গন্ধ খোঁজেন।

আপনার অধিকার আছে আপনার পছন্দের ল্যাব থেকে পরীক্ষাগুলো করিয়ে আনতে। মনে রাখবেন, ডাক্তার দেখিয়েছেন বিশেষজ্ঞ দেখে অথচ প্যাথলজি পরীক্ষাগুলো করিয়েছেন সাধারন ল্যাবে। সেক্ষেত্রে আপনার চিকিৎসার কম্বিনেশন ভাল হলো না। চিকিৎসাও বিশেষজ্ঞ মানের হবে না। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখালে বিশেষজ্ঞ প্যাথলজিস্ট দিয়েই পরীক্ষা করাতে হয় ।

যেমন, পান্তাভাত মরিচ পিয়াজ দিয়ে খেতে হয় । পোলাও খেলে মুর্গির রোষ্ট নিতে হয় ।

৩০/৫/২০১৭ খ্রি.

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ থেকে বই কেনার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/