রুহিনী দা

রুহিনী দা

(স্মৃতি কথা)

ড. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

রুহিনী দাকে আমি প্রথম দেখি ১৯৯৩ সনে। নাম জানতাম না। পিজিতে এমফিল এডমিশন টেস্টের ভাইবা দিচ্ছিলাম একই দিনে। এখনকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন আইপিজিএমআর নামে একটা পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিকেল ইনস্টিটিউট ছিল। সংক্ষেপে বলা হতো পিজি। পিজিতে পড়া ও শিক্ষকতা করা খুবই সম্মানের ব্যাপার ছিলো। বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর বি আর খান স্যারের অফিস কক্ষে মৌখিক পরীক্ষা হচ্ছিল। একজন একজন করে ক্যান্ডিডেট প্রবেশ করছিলেন। আমরা সবাই ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করছিলাম। ১০/১৫ মিনিট পর ফিরে এসে একেকজন একেক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছিলেন। কী কী প্রশ্ন করলেন এটাই ছিলো অপেক্ষমান ক্যান্ডিডেটদের কমন প্রশ্ন। বর্ণনাকারীরা ভয়ংকরভাবে তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। সবাই কোলাহল করে সেই সব প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করছিলেন। আমি সাধারণত নতুন কারো সাথে খোলামেলা আলাপ করতে পারি না। তাই, আমাকে অনেকেই বোকা ছেলেই মনে করে থাকেন। সেদিন আমি বোকার মতো এক দিকে বসে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলাম। ছোট বেলা হুজুর ছমির মাওলানা আমাকে দোয়া শিখিয়েছিলেন পরীক্ষার আগে পড়ার জন্য। সেই দোয়াটা বার বার পড়ছিলাম আর দেখছিলাম অন্যরা কিভাবে কি ভঙ্গিতে কথা বলেন। কিভাবে শরীর নাড়াচাড়া করেন। কত স্মার্ট তারা। আমি মানুষের কথা বলার ভঙ্গি খুব নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করে থাকি। দোয়াটা আমার ছাত্রদেরকেও শেখাই পরীক্ষার আগে পড়ার জন্য। দোয়াটা এমন “রাব্বি, জেদনি, এলমা।” অর্থাৎ “হে আমার রব, আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দিন।” একজন ক্যান্ডিডেট ভাইভা দিয়ে ফিরে এসে তার অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। তার চেহাড়া দেখে বেশী স্মার্ট মনে হলো না। তিনি দু’হাতের দুই তর্জনী আঙ্গুল খারা করে কপালের দুপাশে ঠেকিয়ে বলছিলেন “সবই পারলাম। কিন্তু স্যার বলছিলেন ‘এরপর কি?’ আমি আর বলতে পারছিলাম না।” অন্য এক ক্যান্ডিডেট বলে দিলেন “এরপর হলো ফ্রি র‍্যাডিকেল সেল ইঞ্জুরি।” তিনি “ইয়েস, ইয়েস” বলে জিহব্বায় কামড় দিলেন। বললেন “আমার এবার হবে না।” অন্য এক ক্যান্ডিডেট বললেন “আপনার হবেই। আপনি গত দেড় বছর যাবত চিটাগং মেডিকেল কলেজে প্যাথলজির লেকচারার হিসাবে আছেন। আপনি অভিজ্ঞ।” দেখলাম সবাই সবাইকে চেনেন। আমি কাউকে চিনছি না। আমাকেও কেউ চিনছেন না। আমিও যে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের লেকচার তা কেউ জানেন না। এতক্ষণ যার কথা বললাম তিনিই রুহিনী দা। এই দাদা ১৯৯৯ সনে বিএসএমএমইউ-তে প্রথম এমডি কোর্স চালু হলে চাঞ্চ পেয়ে প্যাথলজিতে এমডি কোর্সে ভর্তি হন। আমি সে ১৯৯৩ সনের জুলাই সেসনেই এম ফিল চাঞ্চ পাই। ১৯৯৫ সনের জুলাই ফাইনাল পরীক্ষায় পাস করে ১৯৯৬ সনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ফিরে আসি। ১৯৯৮ সনে সহকারী অধ্যাপক হই। আমাদের ডিপার্টমেন্টে আমার ব্যাচমেট ডাঃ এএফএম সালেহ (ইকবাল) তখন প্রভাষক ছিল। সে আমার সাথে পরামর্শ করে ১৯৯৯ সনে এমডি কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে চাঞ্চ পেয়ে গেলো। সালেহ পিজি থেকে মাঝে মাঝে আমার সাথে দেখা করে আমাকে দোষারোপ করতো। বলত “সাদেক, দোস্ত, তুমি আমারে কি এক সমুদ্রে ফেলে দিলা, আমি এর কূলকিনারা পাচ্ছি না।” আমি সাহস দিতাম এই বলে “দেখতে দেখতে ৫ বছর শেষ হয়ে যাবে। চিন্তা করবা না।” সালেহ রুহিনী দার খুব প্রশংসা করতো। বলত “সাদেক, আমি আমার এক রিডিং পার্টনার পেয়েছি, রুহিনী দা। দাদার মতো এত ভালো মানুষ হয় না।” সালেহ ২০০৩ সনে এমডি পাস করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে আবার প্রভাষক হিসাবে ফিরে আসে। প্যাথলজি বিষয়ে প্রথম এমডি পাস করা হিসাবে সবার কাছে একটু বেশী প্রশংসা পেতে থাকে। আমি যেমন এমফিল পাস করে ময়মনসিংহ এসে ১৯৯৭ সনেই তালুকদার প্যাথলজি নামে নিজের মতো করে স্বাধীনভাবে প্রাক্টিস করতে থাকি সালেহও তেমনি নোভা প্যাথলজি নাম দিয়ে ময়মনসিংহে একটা প্যাথলজি ল্যাব দিয়ে প্র‍্যাক্টিস শুরু করে। সালেহ সারাক্ষণ রুহিনী দার প্রশংসা করতো। রুহিনী দা এমডি পাস করে চিটাগং মেডিকেল কলেজে ফিরে গিয়ে প্র‍্যাক্টিস শুরু করেন। এদিকে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে সালেহর বদলীর প্রস্তাব হয়। সালেহ এই বদলী ঠেকাতে না পেরে রুহিনী দাকেও রাজি করান দিনাজপুর নিয়ে যেতে। কর্তৃপক্ষকে রিকুয়েষ্ট করে সালেহ রুহিনীদাকে সহ একই অর্ডারে বদলীর অর্ডার করায়। অর্থাৎ দুজনই সহকারী অধ্যাপক হিসাবে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে যোগদান করেন। সালেহ প্যাথলজি বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব নেন। মাইক্রবায়োলজির পোস্ট গ্রাজুয়েট করা টিচার না থাকাতে রুহিনী দা মাইক্রোবায়োলজির প্রধানে দায়িত্ব নেন। এভাবে চলে ৩ বছর। দাদা ও সালেহ একসাথে পার্টনারশিপে নোভা প্যাথলজি নামে দিনাজপুর শহরে একটা ল্যাবরেটরি দেন। দিনাজপুরে এর আগে কেউ হিস্টোপ্যাথলজি (বায়োপসি) পরীক্ষা করতো না। এই দু’জন মিলে প্রথম দিনাজপুরে হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা শুরু করেন। দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, সৈয়দপুর অঞ্চলের সব বায়োপসি ও সাইটোপ্যাথলজি পরীক্ষা এই দু’জন বিশেজ্ঞের দ্বারা করা হতো।

Continue reading “রুহিনী দা”

ক্যান্সার দেখে চেনা যায়

ক্যান্সার দেখে চেনা যায়

(স্বাস্থ্য কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্যাথলজি বিশেষজ্ঞগণ খালি চোখে ও মাইক্রোস্কোপ -এর ম্যাধ্যমে দেখে ক্যান্সার রোগ নির্ণয় করেন।
সার্জন ক্যান্সার কেটে হিস্টোপ্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ-এর নিকট পাঠান। আমাদের দেশে প্যাথলজি বিষয়ে এমফিল, এমডি অথবা এফসিপিএস পাস করা ডাক্তারগণ প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ । সাধারণ জনগণ পরীক্ষাটাকে মাংস পরীক্ষা বলে। মাংস ১০% ফরমালিনে ডুবিয়ে পাঠাতে হয় যাতে পঁচে না যায়।

মাংস কিছু কিছু অংশ পচা থাকলে বা রক্তক্ষরণ যুক্ত থাকলে বা এব্রোথেব্রো থাকলে ক্যান্সার সন্দেহ করা হয়।

ক্যান্সার হলে কোষ বিন্যাসে পরিবর্তন হয়। হাজারো রকম ক্যান্সারে হাজারো রকম কোষ বিন্যাস আছে। মাংস অতি পাতলা করে কেটে কাঁচের স্লাইডে নিয়ে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে কোষ বিন্যাস দেখে প্যাথলজিস্টগণ ক্যান্সার রোগ চিনে থাকেন।

আমরা গাছের ডালপালা ও পাতার বিন্যাস দেখে যেমন বিভিন্ন রকম গাছ চিনতে পারি তেমনি কোষ বিন্যাস দেখে প্যাথলজিস্টগণ বিভিন্ন রকম ক্যান্সার চিনতে পারেন। কোন কোন গাছ যেমন সহজেই চেনা যায় তেমনি কোন কোন ক্যান্সারও সহজে চেনা যায়। কোন কোন গাছ আছে দেখতে প্রায় একরকম হলেও ভিন্ন জাতের । তেমনি কোন কোন ক্যান্সার আছে দেখতে প্রায় এক রকম। এইগুলো নির্নিয় নিয়ে প্যাথলজিস্টগনের সমস্যা হয়। তখন কয়েকজন মিলে মতামত দিয়ে একটা রোগ নির্ধারণ করেন। অথবা আরও উন্নত প্রযুক্তিগত পরীক্ষা করে সঠিক রোগ নির্ণয় করেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চোখ দিয়ে দেখে  চেনা যায়।

১/৬/২০১৭খ্রি.

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (5 votes, average: 4.20 out of 5)
Loading...

 

ক্যাথেটার দিয়ে প্রশ্রাব করানো

ক্যাথেটার দিয়ে প্রশ্রাব করানো

(স্বাস্থ্য কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

উপজেলা হেলথ কম্পলেক্সে জরুরী বিভাগে রাত ১১ টায় একজন রোগী এলেন। সমস্যা হল রোগীর দুই দিন ধরে প্রশ্রাব হচ্ছে না। এর পুর্বে তার খুব বেশী পাতলা পায়খানা হয়েছিল। কর্তব্যরত ডাক্তার রোগীর শারিরীক পরীক্ষা করা শুরু করলেন নিয়ম মাফিক। তলাপেটে পারকাশন করে বুঝা গেল প্রশ্রাবের থলিতে প্রশ্রাব নেই। তার মানে মারাত্বক পাতলা পায়খানায় মারাত্বক পানিশুন্যতা হয়ে কিডনি বিকল হয়ে প্রশ্রাব তৈরি হচ্ছে না। পারকাশন হল শরীরে আঙ্গুলের মাথা দিয়ে টোকা দিয়ে ভিতরের গ্যাস ও পানি আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা। রোগীর সাথে আসা সামনে বসা এক টাউট লোক বলে বসলো
– রোগীর পেটে টোকাটুকি না করে তাড়াতাড়ি ক্যাথেটার গিয়ে প্রশ্রাব বের করেন।
(ক্যাথেটার হল একটা রাবারের নল যা প্রশ্রাবের নালী দিইয়ে ঢুকিয়ে প্রশ্রাব বের করা হয়)
– রোগীর পেটে তো প্রশ্রাব নেই ।
– নেই মানে? গত দুই-দিন তাকে প্রুচুর সেলাইন ও ডাব খাওয়ালাম সেই পানি গেল কই? পল্লী চিকিৎসক বলেছে প্রশ্রাব আটকা পড়েছে। ক্যাথেটার দিয়ে বের করতে হবে। তাই এখানে নিয়ে এসেছি। আর আপনি কিনা বলছেন প্রশ্রাব নেই। আর অযথা টোকাটুকি করছেন।
– এভাবেই আমরা জানতে পারি প্রশ্রাব আছে কিনা।
– রাখেন আপনার টোকাটুকি। লাগান ক্যাথেটার।
জানালার ওপাশ থেকে একসাথে কয়েকজনের স্বর শোনা যাচ্ছে লাগা মাইর, ভাং হাসপাতাল। ডাক্তার সাহেব দেখলেন তাকে একা রেখে নার্স-অয়ার্ডবয় সবাই চলে গেছে । তিনি অসহায়, নিরুপায়। তাই তিনি রোগীর প্রশ্রাবের রাস্তায় ক্যাথেটার ঢুকিয়ে দিলেন। কিন্তু প্রশ্রাব এলো না। Continue reading “ক্যাথেটার দিয়ে প্রশ্রাব করানো”