ভেনিটি ব্যাগ

ভেনিটি ব্যাগ

(নিজ চোখে দেখা)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ঢাকা থেকে নাইট কোচে যাচ্ছিলাম খুলনা। ফেরি পার হবার সময় কোচ থেকে নেমে হাটাহাটি করছিলাম। ফেরির টয়লেটের সামনে দাড়ালাম। ইচ্ছে হলো একটু টয়লেটে যাই। দেখা গেল এক মহিলা টয়লেটে প্রবেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমি থেমে দাড়ালাম মহিলাকে আগে চাঞ্চ দিতে। মহিলার সাথে একজন পুরুষ লোক ছিলো। স্বামী হয়, না কি হয় বুঝতে পারলাম না। মহিলা তার ভেনিটি ব্যাগটা পুরুষ লোকটার হাতে দিয়ে টয়লেটে প্রবেশ করলেন।

 

লোকটা ভালো করে দেখে নিশ্চিত হলেন মহিলা টয়লেটে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করেছেন কিনা। তারপর ধীরস্থির ভাবে ভেনিটি ব্যাগের চেইনটা খুললেন। পকেট হাতিয়ে পার্সটা বের করে টাকাগুলো গুণে দেখলেন। অল্পকিছু টাকা ওখান থেকে সরিয়ে তার মানিব্যাগে ঢুকিয়ে মানিব্যাগটা পেন্টের পেছনের পকেটে ঢুকিয়ে আরামে দাড়ালেন। আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম। কিছুও বললাম না। মহিলা বেরিয়ে এলেন। মহিলার হাতে ব্যাগটা তুলে দিলেন। আমি টয়লেটে প্রবেশ করলাম। আমার বলার কিছু ছিল না। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম।

১৪/৯/২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ
কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


এক্স-রে পরীক্ষা

এক্স-রে পরীক্ষা

(স্বাস্থ্য কথা)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

এক্স-রে পরীক্ষা হলো সর্বাধিক প্রচলিত রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষা। আমরা যখন এমবিবিএস ছাত্র ছিলাম তখন শুধু রেডিওলজি বিভাগে এক্স-রে করা হতো। এরপর আসে আলট্রাসনোগ্রাফি, সিটি স্ক্যান ও এমআরআই পরীক্ষা এবং ডিপার্টমেন্টের নাম হয় রেডিওলজি এন্ড ইমেজিং। ছোট বেলায় দেখেছি টাঙ্গাইল শহরে গিয়ে আমাদের সখিপুরের এলাকার মানুষ এক্স-রে করিয়ে চিকিৎসা করাতো। যে কোন রোগই থাকুক না কেনো এক্স-রে না করা হলে রোগী তৃপ্তি পেতো না। প্রয়োজন না হলেও কেউ কেউ রোগীর সন্তুষ্টির জন্য নাকি এক্স-রে করাতো। কোন কোন রোগী এভাবে বলতো “টাঙ্গাইল গিয়া এক্সো করমু।” মানে “টাঙ্গাইল গিয়ে ডাক্তার দেখাবো।” মনে করা হতো এক্স-রে দিয়ে শরীরের ভেতরের সব দেখা যায়। কোন কোন মহিলারা বলতো আয়না পরীক্ষা। ডাক্তার সাব ভিউ বক্সে এক্স-রে ফিল্ম লাগিয়ে চেয়ে থাকতেন বুঝার জন্য। যেন তিনি আয়না দেখছেন। এই জন্যই বলতো আয়না পরীক্ষা। দেশে এক্স-রে পরীক্ষার প্রচলন হলে চিকিৎসা ব্যাবস্থার অনেক উন্নতি হয়। বিশেষ করে ফুসফুসের টিউবারকুলোসিস বা যক্ষা রোগ নির্ণয়ে। তখন ফুসফুসের ক্যান্সার নির্ণয় করার প্যাথলজিস্টের সংখ্যাও অপ্রতুল ছিল। তাই, শুধু বুকের এক্স-রে দেখে ফুসফুসের রোগ নির্ণয় করা হতো। তাতে বেশ কিছু ক্যান্সার রোগীকে হয়তো যক্ষা মনে করে ভুল চিকিৎসা করা হয়েছে। কাশির সাথে রক্ত পড়লে মনে করা হতো যক্ষা। ক্যান্সার রোগেও কাশির সাথে রক্ত পড়ে। দেবদাসের কাশির সাথে রক্ত পড়তো। সবাই জানে তার যক্ষা হয়েছিল। ক্যান্সারও তো হতে পারে।

এক্স-রের সবচেয়ে সুবিধাজনক দিক হলো এর মাধ্যমে শরীরের ভেতরে থাকা রোগাক্রান্ত স্থান, হাড়, মাংস ও নাড়িভুঁড়ির ছবি উঠানো যায়। কিন্তু থ্রিডি আলট্রাসাউন্ড ও এম আর আই-এর মতো অবয়ব পাওয়া যায় না। ১৮৯৫ সনে জার্মান বিজ্ঞানী রঞ্জন একটা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক আলোক রশ্নি আবিস্কার করেন যা মানুষের হাড়-মাংস ভেদ করে চলে যেতে পারে। এই রশ্মিকে শরীর ভেদ করে ফটোফিল্মের উপর ফেলা হয়। ফিল্মে কেমিক্যাল লাগানো থাকে। রশ্মি ফিল্মে পড়ে এক ধরনের বিক্রিয়া করে ফিল্মের উপর। ফিল্ম ডেভেলপ করে ফটো পাওয়া যায় সাদা কালো। শরীরের অংশ যত বেশি সলিড বা ঘন হবে এক্স-রে রশ্মি তত বাধাগ্রস্ত হবে। তাই ফিল্মের পড়ার সময় কেমিক্যাল রিয়েকশনের কমবেশি হয়। রশ্মি সলিড জিনিস ভেদ করে আসলে ফিল্মের এরিয়ায় সাদা হয়। বাতাস বা খালি যায়গা ভেদ করে আসলে ফিল্মের এরিয়ায় কালো হয়। সলিড যত বেশি হবে সাদা তত ঘাড় হবে। মাংস কম সাদা হয়। ফুসফুসে বাতাস থাকে তাই ফুসফুস কালো দেখা যায় এক্স-রে ফিল্মে। এইভাবে ডাক্তার সাব শরীরের ভেতর কোথায় কি সমস্যা হয়েছে ছবি দেখে বুঝার চেষ্টা করেন।

এক্স-রে পরীক্ষার সবচেয়ে কার্যকরী দিক হলো হাড়ভাংগা দেখা। হাড় ফেটে গেলেও এক্স-রে ফিল্ম-এ ফাটা দেখা যায়। হাড়ে টিউমার / ক্যান্সার হলেও দেখা যায়। পিত্তথলি, কিডনি, ইউরেটার, মুত্রথলি ইত্যাদিতে পাথর হলেও দেখা যায় এই পরীক্ষায়। সবধরনের পাথর কিন্তু এক্স-রেতে ধরা পরে না। কারন, সবধরনের পাথর একই জিনিস দিয়ে তৈরি হয় না। যে পাথর এক্স-রে ফিল্মে সাদা হয় তাকে রেডিও ওপেক স্টোন, না হলে রেডিও লুসেন্ট স্টোন। কাজেই রিপোর্টে পাথর নাই লেখা মানেই পাথর নাই বলা যাবে না।

সাধারণ ভাবে এক্স-রে করলে নাড়িভুঁড়ির ভেতরের দিক দেখা যায় না। মেরিয়ামের সরবত সাদা। এই সরবত পান করে এক্স-রে করলে নাড়িভুঁড়ির ভেতরের বেরিয়াম সরবত সাদা দেখা যায়। নাড়িভুড়ির ভেতরের আস্তর যেমন থাকবে বেরিয়াম সরবতের বাইরের আস্তরনও তেমন হবে। যেহেতু সরবতের নিজের কোন আকার নাই। যে পাত্রে রাখা যাবে সেই পাত্রের রং ধারন করবে। সেহেতু বেরিয়াম সরবত নাড়িভুঁড়ির ভেতরের আকৃতি ধারণ করবে। পাকস্থলী অথবা অন্ত্রে ক্ষত বা ঘা থাকলে সেখানে বেরিয়াম সরবত ঢুকে পড়বে। আর ক্যান্সার হয়ে উচু হয়ে উঠলে সেই অংশে বেরিয়াম সরবত দখল করতে পারবেনা। বেরিয়াম সোয়ালো, বেরিয়াম মীল ও বেরিয়াম এনেমা এক্স-রে পরীক্ষা করে পরিপাক তন্ত্রের আলসার ও ক্যান্সার নির্ণয় করতে সহায়তা হয়। সাইনাস ও ফিস্টুলা বা নালী ঘার দৈর্ঘ্য ও আকৃতি দেখতেও বেরিয়াম সরবত প্রবেস করিয়ে এক্স-রে পরীক্ষা করা যেতে পারে। বাচ্চারা কয়েন গিলে ফেললে এক্স-রে করে কয়েনের অবস্থান দেখা যায়। গর্ভবতী মায়ের সন্তানের সাইজ ও অবস্থান দেখতে আগের দিনে এক্স-রে করা হতো। আগের দিনে কিছু কিছু ক্ষেত্রে রোগী নিজের ইচ্ছায় মাথা ধরার কারনে মাথার এক্স-রে করাতো। রোগীর সন্তুষ্টির জন্য অনেক সময় মাথা ধরার কারনে মাথার এক্স-রে করাতো। নাকের আশেপাশে হাড়ের ভেতর বাতাসের কুঠুরি আছে। এগুলিকে বলা হয় সাইনাস। এদের আবরনে ইনফেকশন হলে বলা হয় সাইনুসাইটিস। সাইনুসাইটিস হলেও মাথা ব্যাথা করে। এক্স-রে প্যারানেজাল সাইনাস করালে সাইনাসগুলো হ্যাজি বা ঘোলা দেখা যায়। বুকের এক্স-রে করালে হার্ট ও লাংসের অবস্থা জানা যায়। লাংস বা ফুসফুসের ছবি কালো হয় বাতাস থাকার কারনে। কিছু হয়ে যদি কিছু অংশ সলিড হয়ে যায় তখন বলা হয় কনসালিডেশন। ইনফেকশন ও ক্যান্সার হলে কনসোলিডেন পাওয়া যায়। অর্থাৎ উক্ত অংশ সাদা হয়। কনসোলিডেশনের প্রধান কারন হলো টিউবারকুলোসিস (যক্ষা)। ভাড়ী বোঝা উঠানোর সময় অনেকের মেরুদন্ডের হাড়ের ডিস্ক (চাকতি) সরে যায়। এটাকে বলা হয় প্রলাপ্স ইন্ট্রাভার্ট্রিব্রাল ডিস্ক (পিএলআইডি)। মেরুদন্ডের এক্স-রে করে দেখা যায় মেরুদন্ডের হাড় বসে গেছে। হাড় ক্ষয় গেলেও বুঝা যায়, বৃদ্ধি পেলেও বুজা যায়।

উপরের আলোচনায় দেখা গেলো এক্স-রে পরীক্ষার বহুবিধ ব্যবহার আছে। মোটামুটি সস্তা এবং বহুল প্রচলিত পুরাতন একটা পরীক্ষা।

কিন্তু এক্স-রে পরীক্ষার কিছু খারাপ দিক আছে। এক্স-রে পরীক্ষার সময়ও অল্প কিছু আয়োনাইজিং রেডিয়েশন পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। রেডিয়েশনের কারনে মানুষের শরীরের কোষের ক্ষতি হতে পারে। অল্প কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সারও হতে পারে। ছেলেদের অন্ডকোষের এবং মেয়েদের ডিম্বাধারের জার্ম সেল নষ্ট হয়ে যেতে পারে এক্স-রের কারনে। এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী সন্তান হবার সম্ভাবনা হারিয়ে ফেলে। তাই, সন্তান হবার আগে এক্স-রে পরীক্ষা যতদূর সম্ভব পরিহার করতে হবে।

এক্স-রে পরীক্ষা যতদূর সম্ভব পরিহার করাই ভালো। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ এক্স-রে করবেন না। এক্স-রে পরীক্ষার ব্যাপারে সিদ্ধান্তটা ডাক্তারকেই নিতে দিন। তিনিই বিবেচনা করে দেখবেন রিস্ক জানা থাকতেও এক্স-রে করাটা কতটুকু জরুরি।

৮/৯/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

 

ভিডিআরএল টেস্ট

ভিডিআরএল টেস্ট
(স্বাস্থ্য কথা)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
ভিডিআরএল টেস্ট হলো একটা স্ক্রিনিং টেস্ট যা সিফিলিস রোগ স্ক্রিনিং করার জন্য করা হয়। অনেকে শুধু ভিডিআরএল বলে থাকেন। এটা ঠিক না। ভিডিআরএল-এর পর টেস্ট কথাটা বলতে হয়। কারন, ভিডিআরএল-এর পূর্ণ শব্দগুলো হলো ভেনেরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ ল্যাবরেটরি। এই ল্যাবরেটরি থেকে এই পরীক্ষাটা উদ্ভাবন করা হয়েছে বলে এর নাম দেয়া হয়েছে ভিডিআরএল টেস্ট। ভেনেরিয়াল ডিজিজের বাংলা হলো যৌন রোগ। যৌন মিলনের সময় একজন থেকে আরেকজনের শরীরে যেসব রোগ সংক্রমিত হয় সেগুলোকে যৌন রোগ বলে। ইংরেজিতে এদেরকে সেক্সুয়ালি ট্রাসমিটেড ডিজিজ (এসটিডি) অথবা সেক্সুয়ালি ট্রানসমিটেড ইনফেকশন (এসটিআই)-ও বলা হয়। সিফিলিস, গনোরিয়া, ক্লাইডিয়া, এইচপিভি, এইচআইভি, পিউবিক লাইচ (উঁকুন), হারপিস ভাইরাস ইনফেকশন সচরাচর যৌনরোগ। এছাড়াও কিছু যৌনরোগ আছে যেগুলো কম হয় যেমন সেংক্রয়েড, লিম্ফোগ্রেনোলোমা ভেনেরাম, গ্রেনোলোমা ইংগুইনালি, মলাস্কাম কন্টাজিওসা, স্কেবিস ইত্যাদি।

যৌন রোগগুলোর মধ্যে খুব বেশি হয় সিফিলিস। এর জটিলতাও অনেক। অনেক ক্ষেত্রেই পরীক্ষা করে জানতে চাওয়া হয় সিফিলিস রোগের উপস্থিতি আছে কি না। যেমন, কেউ যদি অবৈধ যৌন মিলনের হিস্ট্রি দেয়, বিদেশ গমন করতে চায় শ্রমিক হিসাবে, প্রেগন্যান্ট হয় তবে সাধারণত ভিডিআরএল টেস্ট করা হয় সিফিলিসের স্ক্রিনিং টেস্ট হিসাবে। যদি, টেস্ট রিএক্টিভ হয় তবে নিশ্চিত হতে আরো ভালো টেস্ট করতে হয়। ভিডিআরএল টেস্ট খুবই সেনসিটিভ টেস্ট কিন্ত ততটা স্পেসিফিক না। অর্থাৎ এই টেস্টে সহজেই পজিটিভ ধরা পরে কিন্তু ফলস পজিটিভ হয় বেশি। টিপিএইচএ পরীক্ষা বেশি স্পেসিফিক। তাই, টিপিএইচএ পরীক্ষা করে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায়। সিফিলিস রোগ হয় ট্রেপোনেমা পেলিডাম রোগ জীবাণু দিয়ে। এই জীবাণু দিয়ে সংক্রমণ না হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভিডিআরএল টেস্ট রিএক্টিভ হতে পারে, যাকে বলা যায় ফলস রিএক্টিভ। যেমন, ইনফেকশাস মনোনিউক্লিওসিস, লুপাস রোগ, এনটিফসফোলিপিড এন্টিবডি সিন্ড্রোম, হেপাটাইটিস-এ, লেপ্রোসি, ম্যালেরিয়া, এমনকি খুব কম ক্ষেত্রে প্রেগন্যান্সিতে। এজন্য এই টেস্টটা হলো নন-স্পেসিফিক টেস্ট। তাহলে দেখুন, কি অবস্থা। জানতে চাওয়া হলো সিফিলিস আছে কি না। তবে, অবৈদ যৌন মিলনের হিস্ট্রি থাকলে এবং ভিডিআরএল টেস্ট রিএক্টিভ হলে তখন আর ফলস মনে করা হয় না। টিপিএইচএ টেস্ট করে কনফার্ম হয়ে সিফিলিস-এর চিকিৎসা দেয়া হয়। রোগী বিবাহিত হলে স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই সিফিলিসের চিকিৎসা দেয়া হয়। এনিয়ে স্বামী-স্ত্রীতে অনেক সময় ঝগড়া বেঁধে যায়। বলে “অসুখ বানাইছ তুমি। আমি কেন ইনজেকশন নিতে যাবো?” তর্ক করে একজন আরেকজনকে দোষারোপ করতে পারে “তোমার কারনেই আমার মধ্যে সিফিলিস প্রবেশ করেছে।”

প্রেগন্যান্সির সময় গাইনির ডাক্তার অনেকসময় স্ক্রিনিং টেস্ট হিসাবে মায়ের ভিডিআরএল টেস্ট করিয়ে থাকেন। কারন, মায়ের সিফিলিস থাকলে গর্ভের সন্তানের মধ্যে তা সংক্রমিত হতে পারে। কোন কোন সময় আক্রান্ত শিশু মায়ের গর্ভ থেকে একটা দাঁত নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। এই দাঁতকে বলা হয় হাচিসন্স টুথ। আমি এর আগে উল্লেখ করেছি প্রেগন্যান্সিতে ভিডিআরএল টেস্ট ফলস রিএক্টিভ হতে পারে। নতুন বউয়ের বেলায় এমন হলে তো ঝামেলা বেঁধে যেতে পারে। কাজেই রেজাল্ট সম্পর্কে স্বামী- স্ত্রী দু’জন ভালোভাবে কাউন্সিলিং করে দিতে হয়।

একবার, আমি যখন নতুন ল্যাবরেটরি শুরু করি তখন, শহরের বিত্তশালী বাড়ির এক যুবক আমার কাছে আসে কিছু টাকা ধার নিতে। আমি বেশি কথা খরচ না করে অল্প কিছু টাকা ধার দেই। কয়েকদিন পর আবারও সে টাকা ধার চায়। এবার বুঝলাম যুবকটি আসলে চাঁদাবাজ। এরপর থেকে আর তাকে ধার দেইনি। সে আর আসেনি। কিছুদিন পর আমি লক্ষ্য করলাম ভিডিআরএল পরীক্ষা দেয়া রোগীদের সাথে সে ল্যাবে আসে প্রায়ই। এমনকি সে টেস্ট রিএক্টিভ হলে রিপোর্ট আমাকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে “রিপোর্টটা কি ঠিক আছে, স্যার?” আমি তার আনাগোনার অর্থ বুঝতে না পেরে আমার সহকারীকে এর রহস্য কি জানতে চাই। সে আমাকে বলে “লোকটা যৌন রোগ বিশেষজ্ঞের চেম্বারের সামনে দাড়িয়ে থাকে। কোন রোগীকে ভিডিআরএল পরীক্ষা দিলে তার সাথে সে খাতির জমায় এবং ভালো প্যাথলজিস্ট দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে দেবে বলে আমাদের এখানে নিয়ে আসে। রিপোর্ট রিএক্টিভ হলে সে রোগীকে ভয়ভীতি দেখায়ে বলে “তুমি খারাপ কাজ করেছো, না হলে তোমার সিফিলিস হলো কেমনে। আমি তোমার বাবাকে বলে দেবো।” এমন ভয় দেখায়ে তার থেকে কিছু টাকা পয়সা খসিয়ে নেয়। আমি আমার সহকারীকে বলে দিলাম “তুমি লোকটাকে মানা করবে যেনো রোগীর সাথে আমাদের ল্যাবে না আসে।”

এবার হয়তো আপনি বুঝতে পেরেছেন কেনো আমি ভিডিআরএল টেস্ট নিয়ে এত কথা বলছি।
৫/৯/২০২০ খ্রি.
ময়মনসিংহ

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


পজিটিভ – নেগেটিভ রিপোর্ট

পজিটিভ – নেগেটিভ রিপোর্ট

(স্বাস্থ্য কথা)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

কিছু কিছু প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার রিপোর্ট আছে যেগুলির রেজাল্ট পজিটিভ বা নেগেটিভ শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা হয়। ডাক্তার সাব যা জানতে চান তা যদি রোগীর সেম্পল বা নমুনায় উপস্থিত থাকে তাহলে রিপোর্ট পজিটিভ, না থাকলে নেগেটিভ। প্রশ্ন হলো তাহলে কি কি জিনিস ডাক্তার সাব আছে কি না জানতে চান?

অনেক রোগ আছে যেগুলো শরীরে রোগ জীবাণু প্রবেশ করে রোগ তৈরি করে। জীবাণুর গায়ের অতিক্ষুদ্র প্রোটিনের অংশকে আমাদের শরীরের রক্তের শ্বেতকণিকা চিনে ফেলে। এই প্রোটিন কণিকাকে এন্টিজেন বলা হয়। এই এন্টিজেনকে নষ্ট করে দেয়ার জন্য শ্বেত কণিকা এন্টিবডি নামে আরেকটা প্রোটিন তৈরি করে যেটা শুধু ঐ এন্টিজেনকেই নিস্ক্রিয় করে বা ধ্বংস করে ফেলে যাতে রোগ তৈরি করতে না পারে। এই প্রোটিনকে ইমিনোগ্লোবিনও বলা হয়। রোগীর শরীরের অথবা শরীর থেকে বের হওয়া নমুনায় যদি এনটিজেনের উপস্থিতি পাওয়া যায় তাহলে টেস্ট পজিটিভ। এটা হলো ডাইরেক্ট বা প্রত্যক্ষভাবে পজিটিভ। জীবাণু থেকেই এন্টিজেন এসেছে। কাজেই এটা সরাসরি পজিটিভ। নমুনায় যদি ঐ জীবাণুর এন্টিজেনের বিরোদ্ধের এন্টিবডি পাওয়া যায় তাহলেও পজিটিভ। তবে প্রত্যক্ষ না, পরোক্ষভাবে পজিটিভ। কারন হলো, এন্টিজেনের বিরোদ্ধে এন্টিবডি তৈরি হয়ে অনেকদিন পর্যন্ত রক্তের সাথে ঘুরে বেরায় এন্টিবডি। ততদিনে হয়তো এন্টিজেন শরীর থেকে শেষ হয়ে গেছে এবং রোগ ভালো হয়ে গেছে। শুধু এন্টিজেনই না, জীবাণুর ডিএনএ / আরএনএ-র উপস্থিতি দেখেও পজিটিভ – নেগেটিভ টেস্ট করা হয়। এমনকি মাইক্রোস্কোপ দিয়ে নমুনাতে জীবাণু দেখেও পজিটিভ -নেগেটিভ রিপোর্ট দেয়া হয়। শুধু জীবাণুর বেলা-ই না নমুনাতে ক্যান্সার কোষ আছে কিনা তা মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখে পজিটিভ -নেগেটিভ রিপোর্ট দেয়া হয়। নমুনায় হরমোনের উপস্তিতি আছে কি না এটা দেখেও পজিটিভ – নেগেটিভ রিপোর্ট দেওয়া হয়।

জীবাণুর এন্টিজেন অথবা এন্টিবডি ডিটেক্ট করার জন্য সবচেয়ে সহজ ও সস্তা পরীক্ষা হলো স্লাইড এগ্লূটিনেশন ও প্রিসিপিটেশন মেথড। এই মেথডে কাঁচের স্লাইডের উপর এক ফোটা নমুনা দিয়ে তার সাথে এক ফোটা রিয়েজেন্ট মিশিয়ে ঘুটা দেয়া হয়। রিএজেন্টে থাকে নির্দিষ্ট জীবাণু বা প্রোটিনের এন্টিজেন অথবা এন্টিবডি যেটা বড় বড় পার্টিকল বা দানার সাথে লাগানো থাকে। এন্টিজেনের সাথে এন্টিবডি বিক্রিয়া করে দলা পাকিয়ে যায়, যা বড় দানার সাথে খালি চোখেই দেখা যায়। এমন হলে পজিটিভ, না হলে নেগেটিভ।

এরচেয়ে একটু ভালো এবং একটু বেশী মূল্যের পরীক্ষা পদ্ধতি হলো আইসিটি মেথড। এগুলো ডিভাইস দিয়ে করা হয়। এই ডিভাইসে একটা ব্লটিং পেপারের স্ট্রিপ থাকে যার মধ্যে নির্দিষ্ট এন্টিজেন অথবা এন্টিবডি লাগিয়ে দেয়া থাকে একটা দাগ বরাবর। ঐ স্ট্রিপের এক মাথায় নমুনার সলুশন দেয়া হয় ফোটা ফোটায়। দাগের ভিতর দিয়ে নমুনা যাওয়ার সময় এন্টিবডি এন্টিজেনের সাথে সাক্ষাৎ পেয়ে রিএকশন করে। স্ট্রিপের এন্টিজেন অথবা এন্টিবডির সাথে এমন একটা জিনিস দেয়া থাকে যেটা রিএকশন করার পর রঙিন হয় দাগ বরারার এবং সেটা খালি চোখেই দেখা যায়। দাগ হলে পজিটিভ, না হলে নেগেটিভ। সাথে এমন একটা দাগ দেয়া থাকে যেটা জানা এন্টিজেন অথবা এন্টিবডি যার সাথে নমুনার দাগটা তুলনা করা হয়। যেটাকে বলা হয় পজিটিভ কন্ট্রোল।

এরচেয়েও দামী এবং কার্যকরী পরীক্ষা পদ্ধতি হলো এলাইজা মেথড। এটা বড় দামী মেশিন দিয়ে করতে হয়। এই সুক্ষ্ণ মেথডে এন্টিজেন, এন্টিবডি, হরমোন, প্রোটিন ইত্যাদির পরিমাণসহ বের করা যায়।

সবচেয়ে দামী মেথড হলো পিসিআর মেথড। এই মেথডে শুধু জীবাণুর ডিএনএ / আরএনএ বের করা যায়। করোনা ভাইরাসের উপস্তিতি নির্ণয়ের জন্য রোগীর নাক থেকে সেম্পল নিয়ে পিসিআর পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেয়া হয় কোভিড-১৯ এর। পজিটিভ হলে মনে করতে হবে করোনা ভাইরাস দিয়ে সংক্রমণ হয়েছে।

ডিভাইস মেথডে কোভিড-১৯ এর এন্টিবডির উপস্থিতি বুঝা যায়। পজিটিভ হলে মনে করতে হবে করোনা ভাইরাস দিয়ে সংক্রমণ হয়েছে বা হয়েছিলো।

সব মেথডেই কিছু না কিছু ফলস পজিটিভ অথবা ফলস নেগেটিভ হবার সম্ভাবনা আছে। একটা কথা আছে “সস্তার তিন অবস্থা / কানা পয়সা যার গেঘা বেগুন তার।” যত সস্তায় পরীক্ষা করাবেন ফলস রিপোর্ট তত বেশী পাবেন।

জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে বসে থাকে না। বংশ বৃদ্ধি করতে থাকে অথবা মারা যেতে থাকে এন্টিবডি দিয়ে অথবা ঔষধ খেয়ে। তাই, নমুনায় প্রোটিন পার্টিকল পরিমাণও কম বেশি হতে থাকে। প্রোটিন থাকলেই যে পজিটিভ হবে তা না। পজিটিভ হবার জন্য নূন্যতম একটা পরিমাণ বা লেভেল লাগবে। ওটার উপরে উঠেলেই পজিটিভ দেখাবে। এই লেভেলটাকে বলা হয় কাট আপ ভেলু। একেক পরীক্ষার জন্য একেকটা কাট আপ ভেলু দেয়া থাকে। রিএজেন্ট তৈরির ফ্যাক্টরি তা রিএজেন্ট কিটের লিটারেচারে লিখে দেন। মনে করুন, কোন একটা পরীক্ষার কিটে লেখা আছে কাট আপ ভেলু ৮ ইউনিট/এমএল। রোগীর সেম্পলে আছে ৭ ইউনিট/এমএল। টেস্ট রেজাল্ট হবে নেগেটিভ। আসলে কিন্তু রোগীর শরীরে জীবাণু বা নির্দিষ্ট প্রোটিন বা হরমোন আছে। এই পরীক্ষায় তা ধরা পরলো না। কিন্তু এক ঘন্টা পর পরীক্ষা করে পজিটিভ ধরা পরলো। এর মানে হলো এই এক ঘন্টার মধ্যে প্রোটিন বেরে গিয়ে কাট আপ ভেলু অতিক্রম করেছে। দুইটি সেম্পল দুই ল্যাবে পরীক্ষা করে একটিতে পজিটিভ, আরেকটিতে নেগেটিভ রিপোর্ট পেয়ে মিডিয়াতে খবর যাবে। তখন কে শুনবে কার কথা। কাজেই পজিটিভ থেকে নেগেটিভ হতে যেমন মুহুর্তের ব্যাপার তেমনি নেগেটিভ থেকে পজিটিভ হওয়াও মুহুর্তের ব্যাপার। মেথড ডিফারেন্ট হবার কারনেও দু’রকম রিপোর্ট হতে পারে। কোন একটা মেথডে, ধরুন, কাট আপ ভেলু ধরা হয়েছে ৮ ইউনিট/ এমএল। অন্য মেথডে হয়তো ধরা হয়েছে ৬ ইউনিট/এমএল। এ ক্ষেত্রেও দুই জায়গায় দু’রকম রিপোর্ট হবে।

মেশিনের কারনেও দু’রকম রিপোর্ট হতে পারে। মেশিনের মধ্যেও ভালো ও কম ভালো মেশিন আছে। টেকনোলজিস্টও দক্ষ ও কম দক্ষ আছেন। তাদের কারনেও দু’রকম রিপোর্ট হতে পারে। রিএজেন্টের কারনেও দু’রকম রিপোর্ট হতে পারে। ভালো ও কম ভালো দু’রকম রিএজেন্ট কোম্পানিও আছে। ক্যান্সার সেল দেখে চিনতে হয়। এটা দেখেন বিশেষজ্ঞ প্যাথলজিস্ট যিনি ক্যান্সার সেল চিনেন। এব্যাপারে সবাই সমান দক্ষ না। কাজেই একই সেম্পলে দু’জনের কাছ থেকে দু’রকম রিপোর্ট আসতে পারে। একজনের দৃষ্টিতে ক্যান্সার কোষ আরেকজনের দৃষ্টিতে ক্যান্সার কোষ নয়। এই দু’জনের মধ্যে একজনের রিপোর্ট ভুল। কিন্তু তিনি ইচ্ছে করে ভুল করেননি। তার নিজের বিচারে এটা ক্যান্সার বা ক্যান্সার না।

কাজেই নেগেটিভ রিপোর্ট পেলেই রোগ নেই নিশ্চিত না। এর সাথে আনুসংগিক আরো পরীক্ষার রিপোর্ট মিলিয়ে এবং রোগীর রোগের হিস্ট্রির সাথে মিলিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে ডাক্তার রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা দিয়ে থাকবেন।

৪/৯/২০২০ খ্রি

ময়মনসিংহ
কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/