তিন চাচী ও কিছু আপনজনের স্মরণে

তিন চাচী ও কিছু আপনজনের স্মরণে

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমার সবচেয়ে কাছের চাচী এবার মারা গেলেন। তাও আবার করোনাকালে। জানাজায় যেতে পারলাম না। এক বছরের মধ্যে তিন চাচী মারা গেলেন। এবার আরও অনেকজন আত্নীয় ও প্রিয়জন মারা গেছেন। তবে আজ আমি বিশেষ করে আমার মার ঘনিষ্ঠ বন্ধবী যে চাচী ছিলেন তাকে নিয়ে কিছু কথা লিখবো। তিনি হাছেন কাক্কুর স্ত্রী, হবির মা, মামুনের দাদী।

 

এবার করোনায় আমার খুব কাছের বড় ভাই, ৫ বছরের সিনিয়র, এম-১২ নং ব্যাচের প্রফেসর আনিসুর রহমান ভাই মারা যান করোনা হয়ে করোনার প্রথম দিকেই। তারপর মারা যান আমার ৪ বছরের সিনিয়র রাজু ভাই। একই হোস্টেলে থাকতাম। টাঙ্গাইলের রাজু ভাই। তিতাসের এম ডি না কি যেনো ছিলেন। করোনা হয়ে মারা গেলেন। আমারই ক্লাস মেট এম-১৭ ব্যাচের বন্ধু জহিরও মারা গেলো করোনা হয়ে। এক বছরের সিনিয়র, কচুয়ার আব্দুল্লাহ স্যারের ছেলে সাইফুল ভাইও এবার মারা গেলেন করোনা হয়ে। কতো যে ভালো বাসতেন আমাকে! আমাদের মুকুল যে হার্ট এটাক হয়ে মারা গেলো তারও কিন্তু প্রথম করোনা হয়েছিলো। করোনা নেগেটিভ হওয়ার কিছুদিন পর তার হার্ট এটাক করে। করোনায় এমন অনেক আপন জন মারা গেছে। মকুল মারা যাবার মাত্র ৪ দিন আগে আমার আরেক প্রিয় চাচাতো ভাই সাইফুলও মারা গেলো রক্তশুন্যতা হয়ে। এক বছর ধরে বার বার মৃত্যু সংবাদ শুনতে হয়েছে আমাকে।

 

তালুকদার বাড়ির সবার বড় বোন নূরজাহান বুবুর স্বামী, আমাদের প্রথম দুলাভাই ছোট চওনার মজিবুর রহমান, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আমাদের কাকরাজান ইউনিয়ন পরিষদ, মারা গেলেন এই বছরের প্রথম দিকেই। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। নুরজাহান বুবুর ছোট বোন হলো নাজমা। তার স্বামী হাতেম খাও মারা গেলো গত ঈদুল ফিতরের পর। আমার সাথে তার বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিলো। আমার আপন চাচা ভিয়াইল থাকতেন। তার মেয়ে, আমার চাচাতো বোন শেফালী অল্প বয়সেই বিয়ে হয়েছিল আমি যখন ক্লাস সিক্স বা সেভেনে পড়তাম। সে আমার থেকে অল্পদিনের ছোট ছিলো। দূরে থাকার জন্য তাকে আর বেশী দেখিনি। এবার ময়মনসিংহ আসে অসুস্থ হয়ে। চিকিৎসায় ভালো হয়ে যায়। অল্প কিছুদিন পরই আবার আসে স্ট্রোক করে অজ্ঞান হয়ে। এসে মারাই গেলো আমার চোখের সামনে।

 

এই এক বছরের মধ্যে তিন চাচী মারা গেলেন। আমরা চাচাকে কাক্কু ও চাচীকে কাক্কি ডাকি। আবুল কাশেম তালুকদার যাকে আমরা মিয়া কাক্কু ডাকতাম তার স্ত্রী, মানে কাদেরের মা এই এক বছরের মধ্যেই মারা গেছেন স্ট্রোক করে। খুব হাসি খুশি ছিলেন সেই কাক্কি। আমরা ডাকতাম নয়া কাক্কি বলে। কাক্কির বড় বোন ছিলেন কুলসুম বুবুর মা। কুলসুম বুবুর জন্মের পরই সেই কাক্কি মারা গেলে সেই কাক্কির ছোট বোনকে মিয়া কাক্কু বিয়ে করেন। তাই নয়া কাক্কি ডাকা হতো। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমাদের কাছে নয়া কাক্কিই ছিলেন। কাক্কি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। আমি কাক্কিকে কারো সাথে রাগারাগি করতে দেখিনি। নয়া কাক্কির বড় ছেলে শাজাহানের বয়স ছিল আমার থেকে সামান্য বেশী। আমার নিত্যদিনের খেলার সাথী ছিল সে। সেও ট্রাক্টর এক্সিডেন্টে মারা গেছে আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়তাম, সেই ১৯৭৩ সনে। খেলার সাথীর মা হওয়াতে কাক্কিও আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। কাক্কির বাবার বাড়ি ছিলো মাইজবাড়ি। কাক্কির বাবার নাম ছিলো ঠান্ডু। আমরা কাক্কিকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতাম “আইজকা খুব ঠন্ডা নাগতাছে ।” কাক্কি মনে করতেন কাক্কির বাপের নামকে ব্যাঙ্গ করা হচ্ছে । কাক্কি “এই জাউরা” বলে হেসে হেসে ঢলে পড়তেন। কাক্কির এই হাসিটা দেখার জন্য ঠান্ডা কথাটা উচ্চারণ করতাম। কাক্কির হাসি যদি কেউ দেখতো অনেক্ষণ পর্যন্ত মন ভালো থাকতো তার। কাক্কির উদরের বড় ছেলে শাজাহানের খেলার সাথী ছিলাম বলেও কাক্কির বেশী বেশী আদর পেয়েছি। মারা যাওয়ার প্রায় এক বছর আগে কাক্কির সাথে একটা ছবি তুলেছিলাম। কাক্কিদের ঘরের সামনের সিড়ির সাথে কংক্রিটের বেঞ্চিতে মাঝখানে আমি বসেছিলাম। আমার দু’পাশে দুই কাক্কি হবির মা কাক্কি আর নয়া কাক্কি বসেছিলেন। দু’জনেই খুশী খুশী ছিলেন ছবি তোলার সময়। এমন একটা ভালো কাক্কি এক বছরের মধ্যেই চলে গিয়েছেন পরপারে।

 

আমাদের তালুকদার বাড়ির সবচেয়ে বড় চাচী, সোলায়মান তালুকদার মাস্টারের স্ত্রী, রাজ্জাকের মা মারা গেছেন সম্ভবত এ বছর জানুয়ারির দিকেই। এই কাক্কির বাপের বাড়ি ছিল গোহাইল বাড়ি। নানার নাম ছিল খুব সম্ভব চান মামুদ। আমরা কাক্কিকে কোন কোন সময় ঠাট্টা করে চান্দের মেয়া বলতাম। কাক্কির উদরের বড় ছেলে রাজ্জাক আমার থেকে বয়সে সামান্য ছোট। একসাথে খেলতাম, একসাথে বেড়াতাম, একসাথে স্কুলে যেতাম। প্রথম দিকে খেলার সাথী ছিল মজি ভাই, শাজাহান ও রাজ্জাক। তারপর মুকুল তারাতারি বড় হয়ে গেলে সেও খেলার সাথী হয়ে যায়। রাজ্জাককে যখন কাক্কি খাওয়াতেন তখন আমি রান্নাঘরের ঢেকির উপর বসে অপেক্ষা করতাম। খাওয়া শেষ হলেই খেলতে চলে যেতাম। রাজ্জাকের খেলার সাথী হিসাবে কাক্কি আমাকেও খুব স্নেহ করতেন। আদর করে গেঁদা ডাকতেন আমাকে। কাক্কির সারা শরীরে লাল লাল চাক্কা দাউদ ছিলো। সারাক্ষণ চুলকাতেন। গরমের দিনে বেশী হতো। হাতের নোখেও ছিলো। কাক্কির এই সমস্যার জন্য আমার কাক্কির জন্য কষ্ট হতো। এটাতে কাক্কি টোটকা মলম টলম লাগাতেন। কিন্তু নিচুইটা ভালো হতো না। আমি ডাক্তার হয়ে প্রথম চিকিৎসা করেছি কাক্কির এই দাউদ। আমি একটানা দেড় মাস কাক্কিকে ঔষধ খাইয়েছি। দাউদ ভালো হয়ে যায়। চান্দের মেয়ে চান্দের মতোই চেহারা ছিলো। দাউদ পরিস্কার হয়ে চান্দের মতোই হয়ে যায়। কাক্কি খুব খুশী হন। আমি চিকিৎসা করে খুব তৃপ্তি পাই। কাক্কি হজ্জ করেছিলেন। হজ্জের অভিজ্ঞতা অনেক শেয়ার করেছেন আমাদের কাছে। কাক্কির সন্তানরা সবাই শহরে সেটলড হয়েছেন। তাই বাড়িও নেই গ্রামে। এসে যখন এবাড়ি ওবাড়ি বেড়াতেন আমার খুব খারাপ লাগতো। এই চাচী এই তালুকদার বাড়ির বড় বউ ছিলেন। সেই চাচীও এবার স্ট্রোক করে মার গেলেন ।

হাছেন কাক্কুর শশুর বাড়ি বড় চওনা চৌধুরী বাড়ি। কাক্কির বাবার ডাক নাম ছিলো সোনাউল্লাহ চৌধুরী। কাক্কির প্রথম মেয়ের নাম ছিলো হাজেরা। আমি হাজেরা বুবুকে দেখেনি। আমাদের লাইলি বুবুর সমান বয়স ছিলো। এখনো বুবু বলেন হাজরাগ বাড়ি গেলাম। হাজরা বুবুর পর ভানু বুবু। তারপর মজি ভাই। তারপর মনো। আমি মজিভাইর ছোট ও মনোর বড়। আমরা দল বেঁধে মজি ভাইগ ঘরে পলান পলান খেলতাম। তখন পাঁচ কাক্কু একই বাড়িতে থাকতেন। মাঝখানে ছিলো বিরাট উঠান। কাক্কুরা যার যার ঘরের সামনে বসে ফজরের নামাজ পড়ে উচ্চস্বরে কোরআন পরতেন। কাক্কিগ উগারের মাঝখানে একটা গোল প্রবেশ পথ ছিল। এখানে পলায়ে টুক্কু দিতাম। ডোলের ভেতর পালিয়েও টুক্কু দিতাম। কাক্কির রাইংগভর্তি পাকা কলা ছিল। একদিন আমরা পলান পলান খেলার সময় ডোলের ভেতর বসে সব কলা খেয়ে ফেলেছিলাম। জেনেও কাক্কি বেজার হননি। কাক্কির চেহারা আর আমগ মার চেহারা খুবই সুন্দর ছিলো। দু’জনের মধ্যে খুবই খাতির ছিলো। মা সময় পেলে কাক্কির রান্নাঘরে বসে আলাপ করতেন। কাক্কির সময় হলে মার সাথে আমাদের রান্নাঘরে বসে বসে আলাপ করতেন। হাছেন কাক্কু বাবার থেকে সামান্য বয়সে বড়। তাই, কাক্কিকে মা বুঝি ডাকতেন। কাক্কি মাকে ডাকতেন নাইলির মাও বলে। বাবাকে ডাকতেন নাইলির বাপ বলে।

 

আমার যেবছর মুসলমানী হয় সে বছর আমার নিজের নানী মারা যান মুসলমানীর দু’এক দিন পরই। মা আমাকে রেখে রৌহা নানীগ বাড়ি চলে যান। বাড়িতে ছিলাম আমি আর বাবা। বাবার রান্না করার কোন অভিজ্ঞতা ছিলো না। ভর্তাভাত রান্না করতে পারতেন। আমি আবার ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে পারতাম না। তাই বাবা ক্ষেত থেকে বেগুন তুলে লম্বা করে কেটে লবন পানি দিয়ে সেদ্ধ করেছিলেন ছালুন হিসাবে। কারন, ছালুন হলে সামান্য চারটে ভাত খেতে পারতাম। এমন সময় কাক্কি এলেন আমাদের রান্না ঘরে। চুলার পারে গিয়ে “দেখি, নাইলির বাপে কি রানছে” বলে পাইলচাপনি উচু করে ছালুন দেখে মুসকি হাসলেন। বললেন “এইডা ছালুন অইছে? মনে অইতাছে বেগুন সিদ্ধ।” বাবা বললেন “সাদেক ছালুন ছাড়া খেতে পারে না, তাই বেগুনের ঝোল রানছি।” কাক্কি ওর মধ্যে কিছু মসলা মিশিয়ে ছালুন রেঁধে দিলেন। এরপর বুবু এলেন তার শশুরবাড়ি আমজানি থেকে। বুবুই রান্না করে দিলেন ছালুন। মুসলমানী করার সাত দিনের দিন গোসল করানো হয় বিয়ের গায়ে হলুদের মতো আনন্দ করে। বুবু ও কাক্কি আমাকে কাপড় কাঁচার ফিড়াতে (পিড়ি) দাঁড় করিয়ে গোসল করালেন। অন্যান্য বাড়িতে মুসলমানীর ৭ দিনের দিন খুব আনন্দ ফুর্তি হতো। গ্রামোফোন রেকর্ডের গান মাইকে বাজানো হতো। কিন্তু তালুকদার বাড়িতে এসব নিষেদ ছিল। মুসলমানির উৎসবে অন্যরা বিভিন্ন রকম উপহার সামগ্রি দিতো। আমাদের বাড়িতে উৎসব না হলেও বুবু আমাকে গোসল করায়ে একটি কাশার গ্লাস উপহার দেন। সেই কাশার গ্লাসটি অনেক বছর আমাদের বাড়িতে ছিলো। আমি কাশার গ্লাসে পানি খেতাম না। আমি পানি খেতাম ফটিকের গ্লাসে। কাঁচের গ্লাসকে আমরা ফটিকের গ্লাস বলতাম। খুব সম্ভব স্ফটিক থেকে ফটিক হয়েছে। যখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিলো না তখন ইসতিরির ভেতর কয়লা জালিয়ে ইসতিরি গরম করা হতো। আমি জলন্ত কয়লা আমার সেই কাশার গ্লাসে ভরে গরম করে তার মসৃন তলা দিয়ে ঘসে আমার শার্ট ইসতিরি করতাম।

 

একবার মজি ভাই নাড়াই করে আমাকে চেরা দিয়্র ডেইল দিয়ে কপাল কেটে ফেলেছিলেন। গভীর রাতে কাক্কু হাটে থেকে এলে কাক্কুকে নিয়ে কাক্কি বদনা বাতি জালিয়ে আমাকে দেখতে আসেন। আমাকে শান্তনা দেন “মজির বাপে আট থাইকা আইয়া হুইনা মজিরে মাইর দিছে। ইন্ডিয়ান বাম লাগাইলেই ভালো অইয়া যাবোগা।”

আমি এইচএসসি পরীক্ষা দেয়ার সময় ১৯৭৯ এ আমার মা ইন্তেকাল করেন। আমি আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে এসে রাতেই মাকে দাফন করে ভোরে ফিরে গিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। ফিরে যাবার সময় কাক্কি মনে করিয়ে দেন “সাদেকে মনে হয় বছরকারি ফল আম খায় নাই। কবে না কবে আবার আবো। হেসুম আম থাকপো না। ওরে আম ছিলাইয়া দেও।” বুবু আমাকে আম ছিলিয়ে দিলেন দুধের সাথে। আমি খেলাম।

 

কাক্কু মারা যাবার পর থেকে মুলত কাক্কির স্বভাব স্তিমিত হতে থাকে। আমি এক বছর বা ছয়মাস পর পর বাড়ি যাই। বাড়ি এসেছি শুনেই কাক্কি আমাদের বাড়িতে আসতেন। হাসি হাসি মুখে বলতেন “সাদেক কুনসুম আইলা। মুনার মায় আইছে?” কাক্কির কোলে ও সাথে বেশ কয়েকজন করে নাতি নাত্নি থাকতো। আমি জিজ্ঞেস করতাম কোনটা কার ছেলে/মেয়ে? কাক্কি বলতেন “এইডা আমগো আলমগিরের, এইডা আমগো ছাদ্দাকাছের পোলা, এইডা হবির পোলা” ইত্যাদি। আমি এগুলো মনে রাখতে পারতাম না। আমি কাক্কির হাতে মজার প্যাকেট দিলে সব নাতী নাত্নিদের বিলিয়ে দিতেন। কাক্কির ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠতো। কাক্কি এসে আমার কাছে বসতেন। বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজ খবর নিতেন।

বয়স বাড়তে থাকে কাক্কি ক্রমশ দুর্বল হতে থাকেন। তখন তিনি আমাদের বাড়িতে তেমন আসতে পারতেন না। বাড়িতে কিছু খাবার জিনিস নিয়ে গেলে আমি কাক্কির জন্য নিয়ে গিয়ে দেখা করে আসতাম। শেষের দিকে কাক্কির শরীর শুকিয়ে কংকালসার হয়ে যায়। গাল কপাল ও চোখের কোনায় চামড়ার ভাঁজ পড়ে যায়। এই ভাঁজ পড়ার চামড়ার হাসিও আমার কাছে ভালো লাগে। কাক্কির কমন সমস্যার কথা বলতেন এভাবে “বাজান, কিচ্ছু ভালা নাগে না গো, কিচ্ছু ক্ষাপ্পাই না।” আমি ভাবতাম আমার মা যদি বেঁচে থাকতেন তা হলে এমনি ভাবেই হয়তো বলতেন “কিচ্ছুই খাপ্পাই না গো সাদেগালী বাজান।” তাও আমার ভালো লাগতো। আল্লাহ আমার মা ও এই চাচীকে মাফ করে দিয়ে বেহেস্তের ঘরে বসে আলাপ করার সুযোগ করে দিন। সাথে আমাদেরও।

 

গত ফেব্রুয়ারিতেই কাক্কির সাথে আমার শেষ দেখা। আমি ফেরার সময় কাক্কির হাতে অল্প কিছু টাকা দিয়ে আসতাম কিছু কিনে খাওয়ার জন্য। আমার স্ত্রী স্বপ্নাও কাক্কির জন্য বেশ টাকা পয়সা দিয়ে দিতেন আমার কাছে। আমার মেয়েরাও আমার হাতে দিয়ে দিতো এই বলে “দাদুর হাতে এই টাকাটা দিয়ে বলবে কিছু কিনে খেতে।” এবার কাক্কিকে খুব দুর্বল দেখেছিলাম। আরেকবার এসে পাবো কিনা সন্দেহ হলো। ঠিক তাই হলো। এবার ঈদুল আজহা হয়েছিল পহেলা আগষ্ট। করোনা মহামারির প্রকোপ খুব বেশী ছিলো। আমি বাড়ি যাইনি। মুকুল ও কদ্দুস রিস্ক নিয়ে বাড়ি গিয়েছিলো। আমি বাড়িতে কোরবানি দিয়েছিলাম। ভাতিজারা ম্যানেজ করেছিলো। ঈদ হয়েছিলো শনিবার। রবিবার দিন গত রাতে অর্থাৎ আগষ্টের ৩ তারিখে সোমবার কাক্কি ইন্তেকাল করেন। আমি জানাযায় শরীক হতে পারিনি।

 

তারপর মুকুলের জানাজায় শরীক হতে ১১ অক্টোবর বাড়ি গিয়েছিলাম। কাক্কির কথা খুব মনে পড়লো। মুকুলও কাক্কিকে খুব খোঁজ নিতো। সেও চলে গেলো। ৪ দিন আগে চলে গেছে আরেক প্রিয় চাচাতো ভাই সাইফুল। গত বছর চলে গেছে খসরু কাক্কু। তারপর কায়সার। সব নতুন কবর। কেমন জানি মনে হলো এরপরই আমার ডাক আসবে। আমি কি প্রস্তুত?

ফেরার সময় আগের মতোই কাক্কিদের বাড়িতে প্রবেশ করলাম। এবার আগের মতো ডাক দিলাম না “কাক্কি কোন ঘরে” বলে। দেখলাম বাড়িতে কেউ নেই। কাক্কি যে ঘরে থাকতেন সেই ঘরের দরজায় তালা লাগানো। আমি ডাক দিলাম বাড়িতে কেউ নাই নাকি। কার বউ যেন এসে বললো “বসুন।” আমি বললাম “কাক্কি এই ঘরে থাকতেন।” সে বললো “না পরে এই ঘরে থাকতেন। এই ঘরে মারা গেছেন। আমার বুক ফেটে কান্না এলো। চলে এলাম চোখ ভর্তি অশ্রু নিয়ে।

৩০/১০/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


সাইফুল ইসলাম স্মরণে

সাইফুল ইসলাম স্মরণে

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

সাইফুল ইসলাম তালুকদার আমার চাচাতো ভাই ছিলো। বাবার চাচাতো ভাই রিয়াজ উদ্দিন তালুকদার ওরফে রেজু কাক্কুর ছেলে। রেজু কাক্কুর ছেলেমেয়েদের নাম হুমায়ুন, জামাল, জিন্নাহ, সাহেরা, আয়েশা, সাইফুল, রানী ও মিন্টু। হুমায়ুন ভাইকে আমি দেখিনি। আগেই মারা গেছে। রেজু কাক্কুর বাড়ি আমাদের বাড়ির সাথেই পূর্ব পাশে। আমার বড় আকবর ভাই যখন জামাল ভাইর সাথে খেলতে যেতেন তখন বলতেন হুমায়ুন ভাইগ বাড়ি যাই। এবার মারা গেলো সাইফুল। গত ৬ অক্টোবর ২০২০ খ্রি.। আরেক চাচাতো ভাই মুকুল মারা গেলো সাইফুল মারা যাওয়ার মাত্র চারদিন পরে। এমন দুজন খুব কাছের ভাই মৃত্যুবরণ করাতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। গতকাল রাত দেড়টার সময় তাদের মনে করে দীর্ঘক্ষণ আমাকে বিছানায় ছটফট করতে হয়েছে। সাইফুল মারা যাবার পরদিন মুকুলের সাথে আমার মোবাইলে কথা হয়েছিলো। মুকুল হার্ট এটাক করে ঢাকায় হাসপাতালে কেবিনে ভর্তি ছিলো। সাইফুল মুকুলের খুব প্রিয় ছিলো। তাই তার মৃত্যু সংবাদটা মুকুলকে দিতে ইচ্ছে হলো। দিলাম না। শুনে যদি আবার হার্ট এটাক করে মারা যায় ! আমার দুইজন প্রিয় মানুষ মাত্র ৪-৫ দিনের ব্যবধানে মৃত্যুবরণ করে। তারাও একে অপরের কাছে প্রিয় ছিলো। তারা জানতে পারলো না তার প্রিয় মানুষ মারা গেছে বা যাবে। আল্লাহ এই দুইজনকে তুমি তোমার বিশেষ ক্ষমায় ক্ষমা করে দিয়ে ওপারে সাক্ষাৎ করার ব্যবস্থা করে দাও।

 

জন্মগত ভাবেই সাইফুল বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ছিল বা কম বুদ্ধি সম্পন্ন ছিল। ডাক্তারি জ্ঞানে আমি মনে করি ডাউন সিন্ড্রোম ছিলো সাইফুলের। বয়স্ক মায়েদের ডাউন সিন্ড্রোম নিয়ে বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবণা বেশী থাকে। ওর জন্ম হওয়ার সময় কাক্কির বয়স একটু বেশীই ছিলো। ছোট বেলায়ই লক্ষ্য করা গেছে ওর কথা স্পষ্ট হয় না। অযথা হাসে। সামান্য অসাভাবিক আচরন করে। বয়স বাড়ছে। সে তুলনায় বুদ্ধি বাড়ছে না। তাই তাকে অনেকে তাচ্ছিল্য করে ডাকতো – সাইফুল পাগলা, সাইকুল, সাইকল। অনেকে তাকে ব্যবহার করে দুষ্টামি করাতো। কারন, পাগলের দুষ্টামি মাফ। তাকে কানে কানে বলা হতো “সাইফুল, অমুকের পিছনে গিয়ে লুঙ্গি উচা করে ধরগা।” সাইফুল তাই করতো। অন্যকেউ এমন কাজ করলে থাপ্পড় খেতো। সাইফুল পাগলা বলে তার গায় কেউ হাত তোলেনি। তালুকদার বাড়ির সবাই সাইফুলকে আদর করতো। বেশী সময় সে শান্ত হয়ে বসে থাকতো। সবাই যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। আমি কাজ করতাম না। বই নিয়ে বসে থাকতাম। আমার পড়ার স্টাইল ছিল অন্য রকম। ঘরের ভেতর বসে না পড়ে বারান্দায় জলচৌকিতে বসে, উঠানে পাটি বিছিয়ে, গাছের নিচে ঘোড়া কাঠে, গাছের শিকরে বসে বা শুয়ে, গাছের ডালে বসে বা শুয়ে, অথবা বাছ্রা ক্ষেতে শুয়ে শুয়ে পড়তাম। সাইফুল আমার পাশেই নিটালে বসে থাকতো। কোন কোন সময় বইয়ের পাতা উল্টিয়ে ছবি দেখতো। আমার সাথে কোনো আকাম করতো না। ধরতে গেলে সাইফুল আমার নিত্য দিনের সঙ্গী ছিলো। আমি আমার সমস্ত দরদ ঢেলে দিয়ে সাইফুলকে আদর করতাম।

 

ছোট ছোট পোলাপান, যারা মোটামুটি হাটতে শিখেছে তাদেরকে বাড়ির সবাই কোলে কাকে নিতো। মোতালেব ভাই, বাশার ভাই আমার ৮-১০ বছরের বড়। তারা পোলাপান নিয়ে মজা করতেন। কাধে নিয়ে ঘ্যাগ ঘ্যাগ করতেন। হাতের তালুতে দাড় করিয়ে মাথার উপর ধরে বলতেন “থির থির (স্থির স্থির)।” মাথার দুপাশে দু’হাতে চেপে ধরে উচু করে পোলাপানের নানির বাড়ির দিকে ঘুরে বলতেন “ঐ যে দেখো তোমার নানির বাড়ি।” সাইফুলের নানির বাড়ি বইলারপুর। আমাদের বাড়ি থেকে পশ্চিম দিকে। সাইফুল তখন হাটে। আমি বাইরবাড়ির কাঁঠাল গাছ তলার ঘোড়া কাঠে বসে পড়ছিলাম। সাইফুল হাটতে হাটতে আমার কাছে এলো আমি তাকে ঘোড়া কাঠের উপর দাড় করালাম। খুশিতে হেসে দিলো। আমি ঘোড়া কাঠের উপর দাড়ালাম। সাইফুলের মাথার দু’পাশে দু’হাতে চেপে ধরে উচু করে পশ্চিম দিকে মুখ করে বললাম “ঐ যে দেহ তোমার নানি বাড়ি।” কিছুক্ষণ ধরে নানিবাড়ি দেখানোর পর মাটিতে দাড় করিয়ে দিলাম। সাইফুল মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ চুপ থেকে উঠে পড়লো। হেসে দিলো। আমি বেঁচে গেলাম। তারপর থেকে কেউ কাউকে নানিবাড়ি দেখাতে দেখলে আমি খুব রাগ করি। এবং এর ক্ষতিকর দিক বুঝিয়ে বলি।

সাইফুল ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। কাজ কর্ম তেমন করতে পারেনা। নিজে বুদ্ধি করে কিছু করতে পারে না। বড়রা কেউ ফরমায়েশ দিলে কোন সময় করে, কোন সময় করে না। যদি কাক্কু বলেন “সাইফুল বাজান, গরুগুলারে হাচার দেও ছে।” তাইলে সে হাচার দেবে। যদি বলেন “সাইফুল, গরুর জন্য চারডা ঘাস কাটোছে।” তাইলে সে ঘাস কাটবে। সাইফুল শরীরের যত্ন তেমন নিতো না। দাঁত মাঁজতো না। জামা গায় বেশী দিতো না। দিলেও উচু নিচু করে বোতাম লাগাতো। অল্প বয়সেই বিড়ি খাওয়ার নেশা হয় তার। বড়দের বিড়ির পুটকি তুলে খেয়ে তার বিড়ির নেশায় ধরে। পড়ে কাক্কু তাকে বিড়ি কিনে দিতে বাধ্য হন। সবার যত্নে সে বড় হতে হতে যৌবনপ্রাপ্ত হয়। কাক্কু তার জন্য একটা বউ এনে দেন। অল্পদিন পরই সেই বউ তাকে ছেড়ে চলে যায়। এমন বোকা স্বামীর সাথে কে সংসার করবে? কাক্কু সাইফুলের জন্য গরীব ঘর থেকে আরেকটি বউ এনে দেন। আমি শুনেছি কেউ কেউ এই বউয়ের সমালোচনা করতে। আমি তাদের বুঝিয়েছি “দেখ, বউয়ের বাপ নিশ্চয়ই অভাবী। তা না হলে এমন বোকা সোকা পোলার কাছে কেউ মেয়ে বিয়ে দেয়? সাবধান, সাইফুল ছেলে মানুষ। ওর একটা বউ লাগবেই। এক বউ চলে গেছে। এই বউ যাতে চলে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বউ খুব অসহায় মেয়ে। ছোট খাটো দোষ থাকলেও তা না ধরে তাকে পাগলার সাথে সংসার করতে দাও। আলহামদুলিল্লাহ, সেই বউ টিকেছে। তিনজন বাচ্চা উপহার দিয়েছে। সাইফুলের ছোট ভাই মিন্টু বিদেশে চাকরি করে বেশ টাকা কামিয়েছে। মিয়া কাক্কু মাদবরি করে মিন্টুকে দিয়ে সাইফুলের জন্য চার ভিটায় চারটি টিনের ঘর বানিয়ে পৃথক বাড়ি করে দিয়েছে। বউটা ভালোই সংসার করছে। তার প্রথম ছেলে হয়। নাম রাখে ইব্রাহিম। আমি ইব্রাহিমকে আদর করতাম। বাড়িতে গেলে ইব্রাহিমের জন্য আলাদা করে কিছু নিয়ে যেতাম। দেখতে সুন্দর ছিল। ভাবতাম এই ছেলের উছিলায় বউটা টিকে যাবে। একটু বড় হলেই সংসারের হাল ধরতে পারবে। মায়ের সুখ হবে। আল্লাহর কি ইচ্ছে হলো, ইব্রাহিমকে নিয়ে নিলো। নানার সাথে মাছ ধরতে গিয়ে পুকুরের পানিতে পড়ে মাত্র তিন-চার বছর বয়সে মারা গেলো। সেই ছেলেকে মুকুলও খুব স্নেহ করতো। মৃত্যু সংবাদ শুনা মাত্র মুকুল আমাকে ফোন দেয়। ছুটে আসে ঢাকা থেকে ইব্রাহিমকে দাফন করতে। সবাই মিলে চান্দা তুলে তার জন্য খরচ করে দেয়। আমি খুব সম্ভব দিবাজপুর ছিলাম। আসতে পারিনি। ইব্রাহিমের জন্য মুকুলকে অনেকদিন আফসোস করতে শুনেছি। ইব্রাহিম মারা যাবার পর সাইফুলের স্বাস্থ্য ভেংগে পড়ে। তাকে আমাদের কাঠাল গাছের গোড়ায় হেলান দিয়ে আকাশের দিকে হা করে বিমর্ষ হয়ে অনেকদিন বসে থাকতে দেখেছি। আমি বুঝতে পারতাম পাগলা তার ছেলে ইব্রাহিমকে মিস করছে। বেঁচে থাকলে আজ সাইফুলের কাধের উপর দিয়ে শরীর ঘষাঘষি করতো। আমার দুই কারনে কষ্ট হতো। এক ইব্রাহিমকে মিস করতাম বলে। দুই, ইব্রাহিমকে হারিয়ে সাইফুল যে কষ্ট পাচ্ছে তার জন্যে। এখন রইলো শুধু তার মেয়ে সাদিয়া। সাদিয়া দেখতে সুন্দর হয়েছে। কিছুদিন পর সাইফুলের আরেক ছেলে হয়। আল্লাহ যেনো ইব্রাহিমের পরিবর্তে আরেক ছেলে দিলেন। এই ছেলেও বেস চটপটে হয়েছে। আল্লাহ যদি মানুষ করে এই ছেলের উছিলায় সাইফুলের বউ সুখ পাবে। এই ছেলেটাও এখন বেশ বড় হয়েছে, ৮-৯ বছর বয়স তো হবেই। কাক্কু বেঁচে থাকতেই একবার দুই চোখে ছানি পড়ে অন্ধ হয়ে গেছিলো সাইফুল। ডাউন সিন্ড্রোম রোগীদের অল্প বয়সেই চোখে ছানি পড়তে পারে। কাক্কু সাইফুলকে মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে ভর্তি করে অপারেশন করিয়ে আনেন। সবাই চিন্তা করতো কাক্কু মারা গেলে সাইফুলকে কে দেখবে? কাক্কু মরে গেলে সাইফুলের সমস্যা হয়নি। মিয়া কাক্কু মাদবরি করে সাইফুলের পাওনা অংশ জমি ভাগ করে দিয়েছেন। সাইফুলের বউ সেই জমিতে শস্য আবাদ করে খাওয়া খরচ চালিয়ে নিচ্ছে চার জনের সংসারের। মাটি কুপিয়ে হলুদ-কচু আবাদ করে। জমি বর্গা দেয়। টাকা জমিয়ে ব্যাবসায় খাটিয়েছে। একজনের কাছে তিন লাখ খাটিয়েছে। সংসারে খাবারের অভাব নেই। অভাব ছিলো শুধু সাইফুলের। ও, আরেকটা কথা। কাক্কু মারা যাওয়ার পর সাইফুল খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। তীব্র রক্তশুন্যতা হয়ে শরীর ফ্যাকাসে হয়ে যায়। আমি মনে করেছিলাম ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে। কারন, ডাউন সিন্ড্রোম রোগীদের ব্লাড ক্যান্সার হবারও সম্ভাবনা আছে। জামাল ভাই সাইফুলকে নিয়ে ময়মনসিংহ আসেন। পরীক্ষা করে দেখা গেলো পেপটিক আলসার হয়েছে। সেখান থেকে রক্তক্ষরণ হয়ে রক্ত শুণ্যতা হয়েছে। সেই থেকে সাইফুল পুরাপুরি অসুস্থ ছিলো। নিয়ম মতো খেতে পারতো না। নিয়ম মতো ঔষধ খেতে পারতো না। কামাই করতে না পারায় পরিবারেও হয়তো অবহেলিত ছিলো। আমরা যারা দূরে থাকি তারা দুচারদিন থেকেই চলে আসি। সাইফুলের জন্য তেমন কিছু করতে পারিনি। বাড়ি গেলে সাইফুলই প্রথম এগিয়ে আসতো। হা করে হাসি মুখে বলতো “ভাই, কিবা আছুন? কবে যাবাইনগা।” আমার স্ত্রী স্বপনা সাথে না নিয়ে গেলে বলতো “ভাবীরে নিয়া আইলান না?” সাথে তার বাচ্চারাও আসতো। আমি বাড়ির জন্য খাবার জিনিসের প্যাকেট নিয়ে যাই পোলাপানদের জন্য। পোলাপানরা এগুলোকে বলে মজা। বড়রা বলে আবিজাবি। আমি গুণে গুণে সব পোলাপানের জন্য আবিজাবি নিয়ে যাই। সাইফুলকেও পোলাপানের মধেই হিসাব করতাম। সাইফুলের হাতে এক প্যাকেট দিলে সে তার পোলাপানের নাম ধরে ধরে প্যাকেট নিতো অথবা পোলাপানের হাতে দিতো। যাবার সময় আরেক প্যাকেট চেয়ে নিতো তার বউয়ের জন্য। আমিও হিসাব করে কিনতাম তার বউয়ের জন্যও। জানতাম পাগলা তার বউয়ের জন্যও এক প্যাকেট নিবে। সাইফুল আমার আশপাশ দিয়েই ঘুরাঘুরি করতো যতদিন আমি বাড়ি থাকতাম। আমি বারান্দায় বসে পাড়ায় থেকে আগত রোগী দেখতাম। সাইফুল কাছেই বসে থাকতো কাঠাল গাছটার শিকরে। আকাশের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতো। মাঝে মাঝে ডাক দিয়ে উঠতো ছেলে মেয়েদের নাম ধরে। কখনো ডাক দিতো ইব্রাহিম বলে, কখনো সাদিয়া বলে আবার কখনো বা সুফল বলে ডাক দেয়। কখনো বা শুধু গেদা বা গেদি বলে ডাক দেয়। ইব্রাহিম মারা যাবার পর সাইফুলের স্বাস্থ্য একদম ভেংগে পরেছিলো। তখন তাকে বেশী আনমনা দেখেছি। মাঝে মাঝে বলে উঠতো “ভাই, আমগো ইব্রাহিমের জন্য নামাজ পইড়া দোয়া করবাইন।” আমি বুঝতে পারতাম ইব্রাহিমকে সে খুব মিস করে। মাঝে মাঝে দু’হাতে তার পেটের নাভির কাছে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করতে দেখেছি। আমি বুঝতে পারতাম তার পেটে পেপটিক আলসারের তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। আমি মান্নানকে দিয়ে ঔষধ আনিয়ে সাইফুলকে দিতাম। বউ বলতো পেটের ব্যাথায় সারারাত ছটফট করে। আপনের ঔষধ যতদিন খায় ততদিন চারডা চারডা খাবার পারে। পেটের ব্যথাও থাকে। যতবার বাড়ি যেতাম ততবারই কয়েক মাসের জন্য ঔষধ কিনে দেয়ার চেষ্টা করতাম।

 

 

বেশ কয়েকবছর আগে থেকে সাইফুলের আচরণে নতুন একটি সিম্পটম দেখা দেয়। সাইফুল এদিকসেদিক তাকিয়ে কেউ যেন দেখতে না পায় এমন পরিবেশে ফিসফিস করে অথবা ইশারায় এক আঙ্গুল খারা করে বুঝায় “ভাই, একশ টাকা দেইন।”

– কি করবে?

– ঔষধ কিনমু?

– ঔষধ আমি কিন্না দিমু।

– মজা খামু।

– তোমার বউয়ে দেয় না?

– না, দেয় না।

 

 

আমি গোপনে সাইফুলকে টাকা দিতাম। দেখলাম টাকা নিতে তার আত্বসম্মানে লাগছে। তাই এভাবে টাকা চাচ্ছে। বেশ কিছু দিন আমি এভাবে টাকা দিতাম। আমি ভাবতাম মজা খেতে ইচ্ছে করে খাক। সবাই চৌরাস্তার মোড়ে বসে চা খায়, পাউরুটি খায়, গজা খায়, খোরমা খায়। সবার ছেলেপেলেরা বিদেশে চাকরি করে। বাবার জন্য টাকা পাঠায়। সেই টাকায় মজা খায়, চা খায়, গল্প করে। সাইফুলেরও মন চায় মজা খেতে, চা খেতে। তাই দেই। আমি একদিন লক্ষ্য করলাম সাইফুল মুকুলের সাথেও সেইভাবে ইশারায় কথা বলছে। আমার সন্দেহ হলো মুকুলও সাইফুলকে গোপনে টাকা দেয়। আমি মুকুলকে জিজ্ঞেস করলাম “সাইফুল কি তোমার কাছে টাকা চায়?”

– না, ভাই। কেন?

– আমার সন্দেহ হয়।

– কেন?

– কেমন যেনো ইশারায় কথা বলে।

– কেন, আপনের কাছে চায় নাকি?

– এই জন্যই তো আমার সন্দেহ হয়।

– ঠিকই ধরছুন, ভাই।

 

এবার দুজনই খোলাসা করে বললাম। জানা গেলো আমার চেয়ে মুকুলই বেশী দেয়। কারন মুকুল ঘন ঘন বাড়ি আসে। আমি আরও লক্ষ্য করলাম সাইফুল আমার স্ত্রী স্বপ্নার সাথে কিছুটা ইশারায় কথা বলে। আমি জিজ্ঞেস করলাম “সাইফুল কি তোমার কাছে টাকা চায়।” স্বপ্না কখনো মিথ্যা কথা বলে না। ইতস্তত করলো। আমি বললাম “আমি বুজতে পারছি সে তোমার কাছে টাকা চায়।” স্বপ্না বললো “তুমি আবার ওকে কিছু বলতে যেও না। পাগল হলেও ওর আত্বসম্মান আছে। ওর হয়তো হাবিজাবি খেতে ইচ্ছে করে। তাই ভাবীর কাছে চেয়ে নিয়েছে। তাকে কিছু বলো না।” এবার সব ফাস হয়ে গেলো। তিন চোরায়ই চুপি চুপি সাইফুলকে টাকা দিয়ে যাচ্ছি মজা খাওয়ার জন্য। যতই তিন যেতে লাগলো সাইফুলের টাকা চাওয়ার মাত্রা ও পরিমাণ বাড়তে লাগলো এই তিন জনের কাছেই। তিন জনই সাইফুলকে খুব ভালোবাসি। প্রথম দিকে বাড়িতে যেদিন যেতাম সেদিন টাকা চাইতো। তার পরের দিকে প্রথম দিন ও শেষের দিন। তারপরের দিকে অন্তত তিন চার বার। না দিলে পিছ ছাড়তো না। নুরুল আমিন বলে “মামু, আপনেরা মনে হয় পাগলারে টাকা দেইন। সেই টাকা যতক্ষণ শেষ না হয়, ততক্ষণ বিড়ি আর মজা খায় দোকানে বসে বসে।” আমি দেড়িতে বাড়ি যেতাম বলে ভাতিজা বউ হালিমার কাছে টাকা দিয়ে আসতাম কিস্তিতে সাইফুলকে টাকা দেওয়ার জন্য যাতে সে ঔষধ কিনে খেতে পারে। কিন্তু সে হালিমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে ঔষধ না কিনে মজা ও বিড়ি খেয়ে শেষ করতো। সাইফুল তার সব টাকা লুঙ্গির কোছে রাখতো। কোছে টাকা না থাকলে তার মাথা গরম হয়ে যেতো। একবার স্বপনা দিলো ১০০০ টাকার নোট। আমি দিলাম ৫০০ টাকার নোট। তার আগেরদিন দিয়েছিলাম ২০০ টাকা। সবাই বলতো সাইফুল একদিনেই সব টাকা খেয়ে ফেলে। সেটা টেস্ট করার জন্য দু’দিন পর আমি সাইফুলকে বললাম “তোমার কাছে একহাজার ও পাচশত টাকার নোট আছে। দোকানে মজা কেনার সময় অনেকে দেখে ফেলতে পারে। নোটগুলো দেও ভাংতি টাকা দেই।” সাইফুল কোছ থেকে নোট বের করার সময় দেখলাম আমাদের দেয়া নোটগুলো রয়ে গেছে। সাথে আরও অনেক টাকা আছে। আমি বললাম “এত টাকা কোছে রাখো?” সাইফুল বললো “জাউরাডায় নিয়া জায়গা।” আমি সুফলের হাতেও কিছু নগদ টাকা দিতাম নিজের পছন্দের কিছু খাওয়ার জন্য। সেই টাকাও সাইফুল কেরে নেয়ার চেষ্টা করতো। আমার মনে হয় মুকুল আমার চেয়েও বেশী দিতো। আমি গত ফেব্রুয়ারিতে বাড়ি গিয়েছিলাম এম পি জোয়ারের ভাইর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। সেবারই সাইফুলের সাথে আমার শেষ দেখা। সেবার খুব শুকিয়ে গিয়েছিল সাইফুলের শরীর। আমার আশংকা হয়েছিল সাইফুল হয়তো আর বাঁচবে না। তাকে খুব দুর্বল দেখেছি। দেখে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। আরেকবার এসে তাকে পাবো কিনা সন্দেহ হলো। এবার দুইদিনে সে তিনবার টাকা চেয়েছিলো। আমি তিনবারই একটু বেশী করে দিয়েছি। কে যেনো বলল “পাগলা তালুকদার বংশের ইজ্জত মাইরা ফালাইছে। প্যান্ট শার্ট পরা কোন আত্বীয় আসলে তার কাছে টাকা চেয়ে বসে।” শুনে আমি কোন মন্তব্য করিনি। বুকের ভেতর কষ্ট পেয়েছি। করোনাকালীন সময়ে বাড়ি যাইনি। সেই ফেব্রুয়ারিতে বাড়ি গিয়েছিলাম। মুকুল ঈদুল আজহায় গিয়েছিল। আমার যাওয়াও হয়নি। সাইফুলকে টাকা দেওয়াও হয়নি। গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬ টায় সাইফুল ইন্তেকাল করে। ১৭ মিনিট পরেই আমাকে ফোনে জানায়। আমি ফেইসবুকে তার মৃত্যু সংবাদ প্রচার করি। মুকুলকে জানালাম না। কারন, তার হার্ট এটাক করেছে। ঢাকায় হাসপাতালে ভর্তি। সেও ৪ দিন পর ইন্তেকাল করেছে। মৃত্যুর আগে সেও জেনে যেতে পারেনি যে তার প্রিয় সাইফুল ইসলাম তালুকদার ইন্তেকাল করেছে। আমি সাথে সাথে স্বপ্নাকে জানিয়েছিলাম। ৭ তারিখ সকালে সাইফুলকে দাফন করা হয়। সেদিন সকাল থেকে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল। কবরে পানি উঠে পরেছিলো। জানাজায় কম লোক হয়েছিলো। বৃষ্টির দিনে আমাদের গ্রামের আঠালো কর্দমাক্ত রাস্তায় চলাচল করা যায় না। এই ভয়ে আমি বাড়ি যাইনি। এটা আমার জন্য কত যে কষ্টের! তবে মুকুল সুস্থ থাকলে মৃত্যু সংবাদ শুনে ঠিকই ছুটে আসতো। আমার প্রিয় এই দুই ভাই চার দিনের ব্যাবধানে আমাদের ছেড়ে চলে গেলো। আল্লাহ ওদেরকে আবার একাত্র করে দিন।

 

সাইফুলের চাহনিটা ছিল বিশেষ রকম। সে হা করে হাসিমুখে আমার চোখের দিকে চেয়ে থাকতো। বাড়িতে প্রবেশ ককরার সাথে সে এসে হাজির হতো। বিদায়ের দময়ও সে হাজির থাকতো। আবার কবে আসবো তাও জানতে চাইতো।

 

মুকুলকে দাফন করতে গিয়ে আমি সাইফুলের করব জিয়ারত করি। তার মৃত্যু নিয়ে আমি কিছু তথ্য জানতে পাই নিম্নরূপ। সাইফুল এবার খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে সব বোনের বাড়ি যায় কষ্ট করে। শেষে যায় ছোট বোন গাঙ্গাইরের রানীদের বাড়ি। রানী তাকে বলে “আপনে এত অসুস্থ শরীর নিয়া আইলান কিবায়?” সাইফুল বলে “আমি আইছি তগ বাইত্তে আসের মাংস দিয়া চারডা ভাত খাইতে।” রানী তাকে রান্না করা গরুর মাংস দিয়ে পেট ভরে ভাত খাওয়ায়ে দেয়। আর হাসটি সাইফুল নিয়ে আসে বাড়িতে। বউয়ে রান্না করে দেয় সেই হাস। ৬ তারিখ বিকেলে হঠাৎ সাইফুলের বউ কান্নাকাটি করে বলে “দুধ নিয়া আহগো, সাদিয়ার বাপে কিবা জানি করতাছে। হালিমা চিন্তা করে গাই পানাইতে গেলে দেরী হয়ে যাবে। তাই, আফরাদকে পাঠায় ঐ বাড়ি থেকে পানাইন্না দুধ নিয়ে আসতে। হালিমা দৌড়ে সাইফুলের কাছে গিয়ে দেখে সাইফুল মরে যাচ্ছে। বড় বড় করে তাকাচ্ছে। সাইফুলকে কালেমা বলায়। তারপর সুরা হাসর পড়ে হালিমা। আফরাদ দুধ নিয়ে আসে। কয়েক ঢোক দুধ গিলে সাইফুল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। সাইফুল পাগলা হলেও সারাজীবন নামাজ পড়তো মসজিদে গিয়ে। কালেমা পড়ে আমাদের আদরের ভাইটির মৃত্যু হয়েছে।

এবারের বাড়ি যাওয়াটা আমার অন্য রকম হয়েছে। মুকুলের মৃত্যু উপলক্ষে বাড়ি যাওয়াতে পোলাপানের জন্য হাবিজাবি কিনতে ভুলে গেছি। বাড়ির উঠানে পাড়া দিতে যে সাইফুল হা করে হেসে এগিয়ে আসতো সেই সাইফুল নেই। সুফলও কাছে আসেনি। সাইফুলের বাড়ি গিয়ে সাদিয়াকে পেলাম। দেখলাম সেও বড় হয়ে গেছে। লজ্জা পাচ্ছে আমাকে দেখে। জিজ্ঞেস করলাম ” সাদিয়া, কোন ক্লাসে পড়ো।” অনেক্ষণ চুপ করে থেকে বলে “পড়া বাদ দিছি।” কেনো বাদ দিছে আর জিজ্ঞেস করবার সাহস পেলাম না। বয়স প্রায় ১৪ বছর। মায়ের সাথে হলুদ, মরিচ, বেগুন, কচু ক্ষেতে কাজ করে। মায় সুকধান আবাদ করে টাকা জমাইয়া ৩ লাখ টাকা শেয়ারে ব্যবসায় খাটায়েছে শুনলাম। ইনশা আল্লাহ চালিয়ে নিবে আল্লাহয়। সুফল এখন ৯ বছরের ডানপিঠে ছেলে। দেখলাম চিল্লাচিল্লি করে খেলা করছে। আল্লাহ এই ছেলের মাধ্যমে সাইফুলের সংসারে অভাব দূর করে সুখে রাখুন।

 

বিদায়ের সময় সাইফুলকে মিস করলাম। রাস্তায় বউকে পেলাম। বললাম “হালিমার কাছে কিছু টাকা দিয়ে গেছি সাদিয়া ও সুফলকে কিছু কিনে দিও। ধৈর্য ধরবে। আল্লাহ ভালো করবেন।” সাইফুলের বউ দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে কেদে ফেললো।

২৫/১০/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


মুকুলের স্মরণে

মুকুলের স্মরণে

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আপনারা যাকে আসাদুজ্জামান তালুকদার নামে চেনেন তার ডাক নাম মুকুল। আমি কোনদিন আসাদ বলে ডাকিনি। আমি সবসময় মুকুল বলেই ডাকতাম। চাচাতো ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে কাছের ছিলো মুকুল। সে বয়সে আমার ছোট হলেও আমার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো। সে আমাদের ছেড়ে পরপারে চলে গেছে গত ১১ অক্টোবর ২০২০ আজ থেকে ১১ দিন আগে। সে নিপোর্ট শাখার ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার ভিজিটর ট্রেইনিং সেন্টারের প্রিন্সিপাল ছিলো। আমাদের বংশের দেখার মতো একটা চেহারা ছিলো তার। স্বভাব চরিত্র ছিলো অমায়িক।

মুকুল ছিলো বাবার চাচাতো ভাই আব্দুস সালাম তালুকদারের বড় ছেলে। সালাম কাক্কু ৫ ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন। তাই আমরা ছোট কাক্কু ডাকতাম। ছোট কাক্কুর বিয়ের আগের কথাও আমার মনে আছে। তখন তিনি ধলাপাড়া হাই স্কুলে মেট্রিকে (১০ম শ্রেণীতে) পড়তেন। তিনিও বেশ চেহারাবান ছিলেন। লম্বা চুল রাখতেন। আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে তিনি ধলাপাড়ার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। মা তার ভাবী হিসেবে ঠাট্টা করে বললেন “ছুট মিয়ার এহন বিয়া করার বয়স অইছে।” শুনে কাক্কু যে হাসি দিয়েছিলেন সেটা আমার দিব্যি মনে আছে। আমি তখন একদম ল্যাংটা পোলাপান ছিলাম। সেই বছরই কাক্কু মেট্রিক পাস করেন। বিয়েও করেন দাইমা গ্রামের হযরত গোলদাইরার মেয়েকে। সকালে মা আমাকে বললেন “নও, নয়া বউ দেইখা আহি।”

– নয়া বউ কেরা?

– তোমার নয়া কাক্কি।

– নয়া কাক্কিরে তো দেখছিই।

– এইডা আরেকটা নয়া কাক্কি। তোমার ছোট কাক্কুর বউ আনছে। নও দেইখা আহি।

ছোট কাক্কুর বড় ছিলেন মিয়া কাক্কু। মানে আবুল কাশেম তালুকদার। মিয়া কাক্কুর শশুর ছিলেন মাইজবাড়ির ঠান্ডু মিয়া। মিয়া কাক্কুর বড় মেয়ে কুলসুম আপা জন্মের পর কাক্কি মারা যান। পরে কাক্কির ছোট বোনকে বিয়ে করেন। তাই তিনি আমাদের নয়া কাক্কি। নয়া কাক্কি বৃদ্ধকাল পর্যন্ত আমাদের কাছে নয়াই ছিলেন। তিনি কয়েক মাস আগে মারা গেছেন। ছোট কাক্কুর স্ত্রী নয়া হয়েও নয়া খেতাব পাননি। তিনি হলেন আমাদের ছোট কাক্কি। আমি মার সাথে ছোট কাক্কিকে দেখতে গিয়েছিলাম। কাক্কি নতুন বউ হিসাবে লম্বা ঘুমটা টেনে লজ্জাবনত হয়ে মেঝের পাটিতে বসেছিলেন। পাড়ার মহিলারা এসে এসে ঘুমটা সরিয়ে সরিয়ে মুখ দেখছিলেন। সুন্দর কাক্কুর জন্য সুন্দরী কাক্কিই পছন্দ করে এনেছিলেন দাদু। মা আমাকে কাক্কির ঘুমটা সরিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বললেন “এই দেখো তোমার নয়া কাক্কি।” আমি কাক্কিকে দেখলাম। বিয়ের বছরান্তেই ছোট কাক্কির ঘরে তালুকদার বংশের সবচেয়ে সুন্দর ছেলেটি জন্মগ্রহণ করে। তার নাম মুকুল। কাক্কু নাম রাখলেন আসাদুজ্জামান তালুকদার মুকুল। কাক্কু মেট্রিক পাস করে কালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ অফিসের কেরানির চাকরি নিয়েছিলেন। তিনি সালাম কেরানি নামে পরিচিত হলেন। তারপর প্রমোশন পেয়ে সেক্রেটারি হন। তার পর থেকে সালাম সেক্রেটারি নামে পরিচিত হন। সারাসিয়ার মাইন ভাইর ছোট ভাইকে ছোটবেলা সালাম কেরানির মতো সুন্দর দেখা যেতো। তাই তাকে কেরানি বলে ডাকতো। ছোট কাক্কু সরকারি চাকরি করার পাশাপাশি ঔষধের ব্যবসা করতেন। ফার্মেসির নাম দিয়েছিলেন মুকুল ফার্মেসি। মুকুলের দাদীকে দাদী না ডেকে সব নাতিরা বাব্বু ডাকতো। কেনো বাব্বু ডাকতো তার কোন ভালো ব্যাখ্যা আমি পাইনি। আমাদের সবার বড় নুরজাহান আপা নাকি প্রথম দাদীকে বাব্বু ডেকে প্রচলন করেন। মুকুল মারা গেলে নুরজাহান আপা এসেছিলেন। শমে কাক্কুর নাতিরাও সেই ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য তাদের দাদীকে বাব্বু ডাকে। আগের দিনে অনেক মায়ের ৫-৬ জন করে সন্তান থাকতো। প্রায় সব মায়েরা ছোট ছেলেকে বেশি স্নেহ করতো। সেই হিসাবে বাব্বু ছোট কাক্কুকে বেশি স্নেহ করতেন। ছোট কাক্কুর প্রথম ছেলে হিসাবে মুকুলকে বাব্বু বেশী স্নেহ করতেন। ফুটফুটে চেহারার হওয়াতে, বাব্বুর অতি প্রিয় হওয়াতে এবং ছোট কাক্কুর প্রথম সন্তান হওয়াতে তালুকদার বাড়ির মুকুলকে সবাই আদর করতো। মাটিতে নামতেই দিতো না। দেখলেই তাকে কোলে নিয়ে নিতো। মুকুল যখন ৭-৮ মাসের তখন বসে বসে নিজ হাতে ফিডার ধরে দুধ খেতো। ভোলা ভোলা স্বাস্থ্য ছিল। পেটটা ডোবলা ছিলো। নাভিটা ফিডারের বোটার মতো বড় ছিলো। আসলে ওটা ছিল আমবিলিকাল হার্নিয়া। বড় হলে ওটা পেটের সাথে মিশে যায়। আমার এখনো মনে আছে মুকুল পিঠের বেতের পাটিতে ভুড়ি ভাসিয়ে বসে দুইহাতে বোতল ধরে ফিডার খেতো। এই বয়সে শিশুরা যখন তখন যেখানে সেখানে পায়খানা করে দিতে পারে। মুকুলও তাই করেছিলো। আকবর ভাই মুকুলকে পেলেই কাঁধে নিয়ে ঘোড়ায় চরার মতো করে বসিয়ে নাচানাচি করতেন। একদিন এইভাবে তিনি মুকুলকে কাঁধে নিয়ে নাচানাচি করছিলেন। মুকুলের পাছায় যে পায়খানা লেগেছিল সেটা তিনি জানতেন না। আকবর ভাইর কাঁধে পায়খানা লেগে চেরাবেরা হয়ে গেছিলো। ছোট কাক্কি দেখে বলেন “এল্লা, জাউরাডায় আঘাগারিডারে কান্দে নিছে কে।” ছালে আপা দেখে বলেন “এ খোদে! আইঘ্যা চেরাবেরা কইরা ফালাইছে আকবরের কান্দে।” সেই মুকুল দ্রুত বড় হয়ে যায় সবার যত্নে। আমি কৈশোরে থাকতে থাকতেই সে উচ্চতায় আমার কাছাকাছি হয়ে যায়। তার স্বভাব চরিত্র ও বুদ্ধিমত্বা ভালো হওয়ায় অল্প বয়সেই আমার বন্ধুর মতো হয়ে যায়। ওকে নিয়ে বাড়িময় এবং পাড়াময় ঘুরে বেড়াতাম। গলায় গলায় ধরে হাটতাম। পানি পাড়াতাম। পানিতে ঝাপ পাড়তাম, নল খেলতাম। বাব্বু সবসময় তাকে চোখে চোখে রাখতেন। পানিতে নামলে উঠে আসার জন্য তাগিদ দিতেন। তাতে মুকুল বাব্বুর প্রতি খুব বিরক্ত হতেন। আমি বলতাম “বাব্বুর আসলে পানির পাড়ে আসতে ভালো লাগে, তাই মুকুলকে ডাকার নাম করে পানির পাড়ে আসেন।” মুকুল মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে আমার “সোনালি শৈশব” নামের স্মৃতি কথার বইটি প্রকাশিত হয়। এর প্রচ্ছদ পরিকল্পনা আমি করেছি। প্রচ্ছদ অংকন করে দিয়েছে বাসার চালার ধলা মিয়া। প্রচ্ছদে দেখা যাচ্ছে দুইজন ছেলে গলাগলি ধরে পাহাড়ি পানি পাড়িয়ে হেটে যাচ্ছে। আসলে আমার কল্পনায় একজন আমি এবং আরেকজন মুকুল। আমি যখন আমার ছোট বোন শাহীনুরকে বইটি উপহার দিলাম, সে হাতে নিয়ে প্রচ্ছদের স্ক্যাচ দেখে মন্তব্য করলো “এরা কি মুকুল ভাই আর আপনে?” আমার মনে হলো প্রচ্ছদ পরিকল্পনা সার্থক হয়েছে। মুকুলের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমরা শৈশবেই ছিলাম। আমাদের মধ্যে কথা হতো শৈশবের আঞ্চলিক ভাষায়। তারাতাড়ির আঞ্চলিক শব্দ হলো ধাতুবাত। কিছুদিন আগেও মুকুল আমাকে বললো “ধাতুবাত করুন।”

ক্লাস নাইনে উঠে আমি চলে যাই ভালুকার বাটাজোর বি এম হাই স্কুলে। তারপর থেকেই মূলত মুকুল থেকে দূরে দূরে থাকতে হয়েছে। ১৯৭৭ সনের মার্চ মাসে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করে আমি প্রায় তিন মাস বড়িতে অবস্থান করি। আমি অংকে বেশ ভালো ছিলাম। সাধারণ গনিতে ৯৫ এবং নৈর্বাচনিক গনিতে ৯৮ পেয়েছিলাম ১০০-তে। ছোট কাক্কু আমার মেধার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন “বাজান, রেজাল্টের আগ পর্যন্ত তো তোমার কাজ নাই। এই কমাস আমগ মুকুলেরে দৈনিক একঘন্টা করে অংক করা শিখাবে। আমি তাই করি। মুকুল তখন এইটে পড়ে।” কাক্কু আমাকে বেশ কিছু টাকা দিয়েছিলেন। সেই টাকা আমি ইচ্ছেমতো খরচ করেছি। মুকুলের ছোট ভাই-বোনরা আমাকে সহোদর বড় ভাইয়ের মতো দেখতো। আমিও ওদেরকে সহোদর ছোট ভাই-বোনদের মতো দেখতাম। ওদের মুখের ভাই ডাক আপন বোনের ডাকের মতো লাগে আমার কাছে। নকলা উপজেলায় চাকরিকালীন একজন বাচ্চা রোগী চিকিৎসা করেছিলাম। সেই বাচ্চার মা আমাকে এমন ভাবে ভাই ডাকতো, শুনে মনে হতো মেয়েটা আসলেই আমার ছোট বোন। আমি আউলিয়াদের আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ১৯৮০ সনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ক্লাস শুরু করি। ছোট কাক্কুও তাই মুকুলকে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজে ভর্তি করে দেন। আমার বিয়ের সময় যখন মুকুল আমার শশুরবাড়ি যায় তখন আমি পরিচয় করিয়ে দেই আমার ছোট ভাই বলে। চাচাতো ছোট ভাই না বলে শুধু ছোট ভাই বলি। চাচীশাশুরী, খালাশাশুরী, মামীশাশুড়ীরা একে অপরকে বলেন “ঐটা জামাইর ছোট ভাই।” কি কারনে যেন তারা মুকুলকে দেখে সবাই খুব খুশী ছিলেন। তাদের সবারই মেয়ে ছিলো। এইজন্য কিনা জানিনা। এমন সুন্দর ছেলে দেখলে অনেক মেয়ের মাই খুশী হয়। এটা আমি মনে করতাম। মুকুল এইসএসসি পাস করে করটিয়ার সাদত কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়। তার সময় ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন বর্তমান সখিপুর -বাসাইলের এম পি জননেতা এডভোকেট জোয়াহের ভাই। মুকুলের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা ছিলো। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে এম পি মহোদয় মুকুল ও আমাকে কথা দিয়েছেন আমাদের গ্রামের সিরিরচালা প্রাইমারি স্কুল থেকে বাসারচালা প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত বেহাল দসার রাস্তাটি পাকা করে দেবেন। এটা এলাকার জনগণের প্রাণের দাবী। ফেরুয়ারির সমবর্ধ সভায় আমি ও মুকুল বিশেষ অতীথি ছিলাম। আমরা দুজনই আমাদের বক্তৃতায় এই রাস্তাটি পাকা করে দেয়ার দাবী জানিয়েছিলাম। এমপি মহোদয় তার বকৃতায় কথা দেন “ডাক্তার সাহেব যে রাস্তাটির দাবী করেছেন সে রাস্তাটি হবে আগামী বাজেটে, ইনশাআল্লাহ।” আমি মনে করলাম মুকুলের প্রতি মোহব্বতের কারনেই তিনি রাস্তাটা পাকা করার ওয়াদা করেছেন। সেই রাস্তাটি হবে হয়তো। কিন্তু মুকুল দেখে যেতে পারলো না। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেনো আমি দেখে যেতে পারি। মুকুলের জন্য মসজিদের কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। আমরা চাই মসজিদ এক তলা বিশিষ্ট হবে। মুকুল চায় মসজিদ দোতলা বিশিষ্ট হবে। তার ইচ্ছা ছিল দোতলায় হুজুর পাড়ার পোলাপানদের আরবি পড়াবেন। আমরা বলি কি দরকার পাড়ায় ত একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসা আছেই। যাহোক, শেষে এক তলার মসজিদ নির্মাণই শুরু হয়। সে গত শীতের মজদিদের ওয়াজ মাহফিলে মসজিদ নির্মাণের জন্য বেশ বড় অংকের টাকার ওয়াদাও করেছিল। নির্মাণের কাজ ভালোভাবেই শুরু হয়। কিন্তু করোনার লকডাউন ও বর্ষার কারনে নির্মাণ কাজ বন্ধ আছে। যারা জানাজা পড়তে এসেছিলেন তারা রাস্তার অবস্থা ও মসজিদের অবস্থা দেখে অনেকেই ক্ষুব্ধ হন। মুকুল মসজিদ দেখে যেতে পারলো না। আল্লাহ যেনো আমাকে মসজিদ দেখিয়ে নেন।

ছোট কাক্কি তালুকদার বাড়ি এসে প্রতি দেড় বছর অন্তর একজন করে সন্তান উপহার দিতে থাকেন। মুকুলের পর একে একে জন্ম নেয় ছফুরা, শিরি, কায়সার, মাজে, আকতার, সাজে ও জোবে। এদের আসল নাম যথাক্রমে ছফুরা খাতুন, শিরিনা খাতুন, আনোয়ার হোসেন, মাজেদা খাতুন, আকতার হোসেন, সাজেদা খাতুন ও জোবেদা খাতুন। জোবেদা ফেইসবুক খুলেছে তালুকদারের ছোট কন্যা নাম দিয়ে। ছফুরাকে দুল্লাকালেই ছোট কাক্কু বিয়ে দিয়ে দেন পাড়ায়ই সবচেয়ে ধনি বাড়িতে আলী মাহমুদের সাথে। ছফুরা খুব হাশি খুশি বোন ছিলো আমাদের। অল্প কিছুতেই হেসে গলে পড়তো। অল্প বয়সেই সন্তান সম্ভাবনা হয়। শশুর বাড়িতেই সন্তান ডেলিভারি করানো হয়। জমজ দুই বাচ্চা হয়ে মারা যায়। ছফুরাও অধিক রক্তক্ষরণ হয়ে মারা যায়। একজন তাজা স্বতঃস্ফূর্ত মেয়ে এমন ছোট বয়সে মরে গেলো! ছোট কাক্কু ও কাক্কি মহা শোক পেলেন। মুকুলও পিঠাপিঠি বোনকে হাড়িয়ে ভেংগে পড়ে। সে আমাকে তার এ বিষয়ে খোভের কথা আমার কাছে ব্যক্ত করে। কাক্কু অনেক মাস পর্যন্ত ছফুরার কবরের কাছে বসে কেঁধে কেঁধে দোয়া কালাম পাঠ করতেন। একবার কাক্কুর টাঙ্গাইল যাওয়ার কারন জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম তিনি কয়েক হাজার টাকার ইসলামি বই কিনে বিভিন্ন মাদ্রাসা ও মসজিদে দান করে এসেছেন। কাক্কু আমাকে বুঝালেন যে ছফুরা বেঁচে থাকলে বাপের সম্পত্তি পেতেন, তার পেছনে অনেক খরচ হতো। সেই পরিমান টাকা মানুষকে না খাওয়ায়ে সদকায়ে জাড়িয়া করে দিলেন। এর সওয়াব ছফুরা বহুকাল পর্যন্ত পেতে থাকবে। চল্লিশ বছর বয়সে কাক্কুর কিডনি রোগ ধরা পড়ে। প্রথম দিকে আমি ময়মনসিংহে ডাক্তার দেখাই। সেই চিকিৎসায় তৃপ্তি না পেয়ে কাক্কু হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের পাল্লায় ঘুরপাক খান অনেক বছর। রোগ বেড়েই চলে। কাক্কু তার বাল্য বন্ধু সার্জারীর প্রফেসরকে দেখান ময়মনসিংহ। হোমিওপ্যাথি ঔষধ সেবনের হিস্ট্রি শুনে প্রফেসর ছোট কাক্কুকে আমার সামনেই পাহাইড়া বলে টিটকারি দেন। তাতে তারপ্রতি মনক্ষুন্ন হয়ে ঢাকায় চলে যান। আমজানির ডাক্তার শাহ আলম তালুকদার দাদার মামতো ভাইয়ের ছেলে। সেই হিসাবে তিনি কাক্কুর ভাই সম্পর্কে। কাক্কু শাহ আলম কাকার পরামর্শ নিয়ে ঢাকায় নেফ্রোলজিস্ট দিয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসা করান। মুকুলই কাক্কুকে সাথে নিয়ে যেতেন।

এদিকে মুকুল করটিয়া থেকে অনার্স এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স পাস করে বেকার হয়ে পড়ে অনেকদিন পর্যন্ত। কাক্কুর আটজন সন্তান, অল্প বেতনের চাকরি, ব্যয়বহুল চিকিৎসা, মুকুলের বেকারত্ব, সব মিলিয়ে একটা কেমন অবস্থার যেনো সৃষ্টি হয়। কাক্কু এক সময় সরকারি চাকরি রিজাইন দিয়ে চেয়ারম্যান পদে ইলেকশন করে তিন পাখি জমি বিক্রি করে দেন। ইলেকশনে ভরাডুবি খেয়ে সরকারি চাকরি হাড়িয়ে তিনি জিতাশ্বরি রশিদিয়া দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক হন। কায়সার খুব দুষ্ট ছিলো। বড় বড় মাছের টুকরা তাকে দিতে হতো। ভালো মানুষ বানানোর জন্য তাকে মাদ্রাসায় হোস্টেলে রাখা হয়। হোস্টেলে গিয়েও সে দুষ্টামি করে বলে পড়া ক্ষান্ত দিয়ে বাড়িতে এসে পড়ে। ভিলেজ পলিটিক্সে জড়িয়ে পড়ে। তাকে নিয়ে কাক্কু অশান্তিতে পড়ে। পাঠিয়ে দেয়া হয় মিডল ইস্টে চাকরি নিয়ে। ভালো কাটে সেখানে তার।

আকতার পড়তো হাফেজি। হাফেজ হয়েছিলো। মুকুল মাস্টার্স পাস করে ঢাকার খিলগাওয়ে মেসে থেকে একটি কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করতে থাকে। আকতারকেও মেসে রাখে। সে আরবি লাইনে পড়তে থাকে। আমি বিসিএস ও পোস্ট গ্রাজুয়েট এডমিশন টেষ্ট দিতে গিয়ে মুকুলের মেসেই থাকতাম। তার তখন বিয়ে করার উপযুক্ত বয়স। এই বেকারত্বর সময় কেই রাজি হয়? মুকুল একজন এম পির কাছে যেতো ঘন ঘন। এমপি নাকি তাকে খুব পছন্দ করতেন । মুকুলের ধারনা ছিল এম পি সাবের সাথে ঘুরাফেরা করলে একটা চাকরি হবে। আমি বুঝালাম এমপির সাথে থাকলেই চাকরি দেবেন এটা আমি মনে করিনা। মুকুলের চাকরি হলে মুকুল আর এমপির কাছে যাবে না। কাজেই মুকুল যতদিন বেকার থাকবে ততদিন এম পি তাকে কাজে লাগাবে। তারপর থেকে সে এমপির কাছে যাওয়া কমিয়ে দেয়।

১৯৯৫ সনে আমি শাহবাগ পিজি হোস্টেলে ছিলাম এমফিল থিসিস পার্টে ছিলাম। একদিন মুকুল তার সরকারি চাকরির এপয়েন্ট লেটার নিয়ে এলো আমার হোস্টেল কক্ষে। খুব খুশী হলাম। মনে মনে ভাবলাম মুকুলের বিয়ের বাঁধা দূর হয়ে গেলো। ওর ছোট ভাই একাই সিদ্ধান্ত নিয়ে আগেই বিয়ে করে ফেলেছিলো। ভালোই করেছিলো আমার মতে। বিয়ের বয়স হয়েছে বিয়েতো করবেই। চাকরি পাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে মুকুল আবার এলো আমার হোস্টেলে এই বলে যে তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে শাহ আলম কাকার ইডেন কলেজে অনার্স পড়ুয়া শ্যালিকার সাথে। ছোট কাক্কু ও শাহ আলম কাকার ইচ্ছায় এই বিয়ে হচ্ছে। আমি আলহামদুলিল্লাহ, ভালো হবে বলে আকদের অনুষ্ঠানে গেলাম। পরে একদিন অনুষ্ঠান করে বউ নিয়ে এলাম বাড়িতে। মুকুলের ভাগ্যে সরকারি ভালো চাকরি ও বিয়ে দুইটাই জুটে গেলো। প্রথমে প্রভাষক পদে যোগদান করেছিলো। পরে নিপসম থেকে ডিপিএইচ ডিগ্রি করে প্রিন্সিপালের পোস্ট পায়। বিয়ের প্রথম কয়েকদিনের মধ্যেই মুকুল তার বউকে নিয়ে কি বিষয়ে যেনো হালকা একটি মন্তব্য করে। আমি সাথে সাথে রিয়েক্ট করি। বলি “সাবধান, নিজের বউকে নিয়ে কারো কাছে মন্তব্য করবে না।” মুকুল ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। সে বুঝতে পারে আমি তার শুধু বন্ধুই না, একজন শিক্ষক এবং বড় ভাইও। এইবার যে শিক্ষাটা আমার কাছে পেয়েছিলো সেই কথাটা সে কৃতজ্ঞতার সাথে আমার কাছে বেশ কয়েকবার বলেছে। সম্মানজনক চাকরি, ভালো ফ্যামিলিতে বিয়ে এবং ভালো একজন বউ পাওয়ার সবাই খুশী হয়। মুকুল তার ছোট দুই বোনকে ঢাকায় বাসায় রেখে ভালো স্কুল ও কলেজে পড়ায়।

আকতারকেও ঢাকায় মেসে রেখে পড়ায়। মুকুলের বউ ওদেরকে ছোট ভাই বোনের মতো স্নেহ করে। মুকুল কায়সার ও আকতারকে অনেক টাকা খরচ করে বিদেশ পাঠিয়ে দেয় চাকরি করতে। কাক্কুর ব্যহবহুল চিকিৎসা চালিয়ে যেতে থাকে। একসময় কাক্কু চলে যান পরপারে। কাক্কু জীবিত থাকতে মুকুলের সব বোনকে এনে একাত্র করে ঈদ ও বিভিন্ন রকমের আয়োজন করতেন। সেই দায়িত্ব কাধে নেয় মুকুল। কাক্কু যাযা করতেন মুকুলও তাই তাই করতো।

দীর্ঘদিন হয়ে গেলো মুকুলের কোন সন্তান হলো না। দেশে বিদেশে অনেক চেষ্টা তদবির করে কোন ফল হলো না। নিজের ঔরস দিয়ে দুইবার টেষ্ট টিউব বেবি নিয়েও ব্যর্থ হয়ে পাগল প্রায় হয়ে গেলো দুজনে। কায়সারের ঘরে এক কন্যা সন্তান হলে তাকে তারা মেয়ের মতো করে যত্ন করতে থাকে। সেই মেয়ে বড় হয়ে ময়মনসিংহ এক কলেজে ভর্তি হয়। সেখানে ম্যাল ভালো পায় না। কি কারনে যেন সে আত্বহত্যা করে মারা যায়। মুকুল মহা শোক পায়। শাহ আলম কাকার ফুটফুটে মেয়েকেও মুকুলের বউ নিজের সন্তানের মতো করে যত্ন নিতো। সেই মেয়ে আমেরিকা গিয়ে কলেজে ভর্তি হয়। সেও একদিন অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরন করে। সেই মৃত্যুতেও তারা শোকে ভেংগে পড়ে।

বিয়ের প্রায় যুগ পেরিয়ে যাবার পর আল্লাহ মুকুলকে একটা ছেলে সন্তান দেয়। সেই সন্তানকে পেয়ে মুকুল ও তার বউ মনে করে সোনার টুকরো। তার কোন কিছুর অভাব হয় না। যা চায় তাই খায়। এমন বড় সড় হয়ে গেছে বেটা বেটা দেখা যায়। অথচ বয়স এখন মাত্র ১২ কি ১৩ বছর। ইংলিশ মিডিয়ামে ঢাকার নামীদামি স্কুলে পড়ে। মাত্র ক্লাস ফাইভে পড়ে। এবার সিক্সে উঠবে। ছেলে বাপ ছাড়া কিছু বুঝে না। অথচ এই ছেলেটা ছেড়ে আল্লাহর ডাকে চলে যেতে হলো আজীবন সংসার সংগ্রামী মুকুলকে। আল্লাহ তার সন্তান ও স্ত্রীকে শোক সইবার এবং ধৈর্য ধারণ করবার তৌফিক দান করুন।

গত ছয় সাত বছর আগে ওরা যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়ে সেটল হতে চেয়েছিল। ভিসাও হয়েছিলো। বউ বাচ্চা নিয়ে দুইবার গিয়েছিলো। মুকুল সেসময় তার ছেলের কথা আমাকে বারবার বলতো। ওরা স্কাইপিতে কিকি বলতো তা আমাকে মোবাইল করে জানাতো। তাতে আমি বুঝতে পারতাম মুকুল ছেলেকে খুব মিস করে। মুকুল চাকরি ছেড়ে ছেলের কাছে চলে যেতে চায়। এনিয়ে আমার সাথে কথা বলে মোবাইলে অনেক্ষণ। এক দিকে অনেকগুলি ভাইবোন ও মায়ের টান, আরেকদিকে ছেলে ও বউয়ের টান। মানষিক দ্বিধাদন্দে কাটতে থাকে তার রাতদিন। আমাকে সিন্ধান্ত দিতে বলে কি করবে সে। আমি বললাম “তোমার ভালো-মন্দ তুমি দেখবে। তোমার যেখানে সুখ সেখানে তুমি থাকবে। আমেরিকা যারা গিয়েছে তারা বাংলাদেশে আসার তেমন সময় পায় না। আমার পরিচিত জনদের দেখে আমার এই ধারণা হয়েছে। তুমি কেমন করবে আমি জানি না। তবে তুমি চলে গেলে কাক্কি অসহায় হয়ে পড়বে, তুমি আছো বলে বোনগুলা আসে একসাথে। তুমি প্রতিবছর ঈদ করো বাড়িতে সবাইকে নিয়ে। আমি বাড়ি গেলে তুমিও বাড়ি আসো। সেই সুখগুলো বিলীন হয়ে যাবে। তবে তোমার ছেলে হয়তো ওদেশে এদেশের থেকে ভালো থাকবে। তুমিই সিদ্ধান্ত নাও কি করবে। কয়েকদিনের মধ্যে সে চীন সফর করে এসে আমাকে ফোন দিলো “ভাই, আমি আমেরিকা যাবো না।” মুকুল আর আমেরিকা গেলো না।

আমি যখনই বাড়ি যেতাম যাবার আগেরদিন মুকুলকে জানাতাম । মুকুলও বাড়ি এসে পড়তো । কত রকম না বলা কথাই যে বলতো । সব জমানো কথা আমার কাছে শেয়ার করতাম । আমিও আমার না বলা জমানো কথা মুকুলের কাছে শেয়ার করতাম ।

ওদিকে কায়সারও বিদেশে কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন অসুস্থতার ভেতর দিয়ে অতিবাহিত করতে লাগলো। কায়সার আমার খুব ভক্ত ছিলো। আমার সামনে কোনদিন তাকে বেয়াদবি করতে দেখি নি। বাড়িতে গেলে সে সব সময় আমার সাথে সাথেই থাকতো। বিদেশ থেকে সে আমাকেই বেশী ফোন দিতো। অসুস্থ হওয়াতে আরও বেশী ফোন দিতো। তার কষ্টের কথা আমাকে জানাতো। তার ডাক্তার ছিল আমার সিনিয়র ডা. আনোয়ার ভাই। অনেকে আনোয়ার -আসাদ জুটি হিসাবে চেনেন। কায়সার ভাইগো বলে ডাক দিয়ে ফোন করতো। আমি আনোয়ার ভাইর সাথে কিডনির কন্ডিশন নিয়ে কথা বলতাম। আনোয়ার ভাইর কথায় বুঝা গেলো কায়সারের আয়ু আর বেশী দিন নেই। তার কষ্টের কথা শুনে আমার বুক হু হু করে কেধে উঠতো। আমি বললাম

– কায়সার, ভাই তুমি চাকরি বাদ দিয়ে দেশে আইয়া পড়।

– এত সুন্দর চাকরি ছাইড়া আইয়া পড়মু? কোন পরিশ্রমের কাজ নাই। খালি কর্মচারী সুপারভাইস করতে হয়। দেশে আইয়া করমু কি?

– তুমি বিদেশে একা রইছো। তোমার কষ্ট দেখার কেউ নাই। তুমি দেশে এসে কষ্ট কর। আমরা তোমার কষ্ট দেখমু।

– ভাই, আমি মনে হয় আর বাচমু না। আমার কিডনি ডায়ালাইসিস করতে অইব।

– যদি মরতেই হয়, আমাদের কাছে এসে মরো। তোমার কষ্ট দেখার কেউ নাই, এটা ভেবে আমার খুব কষ্ট হয়। আইয়া পড়।

কায়সার এসে পড়লো। ময়মনসিংহে ডায়ালাইসিস শুরু করলো। প্রতি সপ্তাহে খরচ হতো ১০ হাজার টাকা করে। টাকার উপর আল্লাহয় বাচিয়ে রাখলেন তিন বছর। তার কামাই করা গচ্ছিত টাকা সব শেষ হয়ে গেলো। শেষে মুকুল তার জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করলো। অবশেষে সেই আমাদের ছেড়ে পরপারে চেলে গেলো দুবছর আগে। চলে যাওয়ার আগে তার এক কন্যা সন্তান হলো। বড় ছেলে নিলয় ইন্টারে পড়তো। তার চাকরির জন্য আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম। আলহামদুলিল্লাহ সে আর্মিতে প্রবেশ করেছে।

ছোট কাক্কি একে একে হারালেন ছফুরাকে, কাক্কুকে, কায়সারের মেয়ে বিন্তিকে, কায়সারকে শেষে মুকুলকে। কি করে কাক্কি এই শোক সইবেন? আল্লাহ কাক্কিকে সব শোক সইবার ধৈর্য দিন। দাফরাইয়া দাফরাইয়া কাদেন। আমরা বারন করে বলি দোয়া পড়ুন। কতক্ষণ আর দোয়া পড়ে চুপ থাকা যায়। বাবা করে চিতকার দিয়ে উঠেন। মুকুলের বোনগুলায় আক্ষেপ করে বলে উঠে আমার ভাইগুলারেই আল্লাহ্য় নিয়া যায় কেন? আমি ওদেরকে বুঝ দিতে পারি। আমি বুঝ দেবার ভাষা গুছিয়ে বলতে পারি না।

মুকুলের কাছে ফোন করলে ঠিকমতো কথা বলতে পারতো না। পাশ থেকে ছেলে ডিস্টার্ব করতো। সেই ছেলে এখন বাপছাড়া হয়ে কেমন করবে। আল্লাহ এই ছেলের যেমন মঙ্গল আমাদের মুকুল চেয়েছিলেন তার চেয়েও বেশী মঙ্গল করুন।

করোনাকালীন সময়ে মুকুলের সাথে আমার দেখা হয়নি। মোবাইলে করোনা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। রিস্ক নিয়ে এবার কুরবানির ঈদ বাড়িতেই করেছে। আমি ছিলাম ময়মনসিংহ। ঈদের আগে পাছের ঘটনা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। করোনাকালিন সময়ে মুকুল ফ্যামিলি নিয়ে ঢাকার নিজস্ব ফ্লাইট ছেড়ে কর্মস্থল ঘাটাইল থাকতো। মোবাইল করে বুঝা গেছে মুকুল অসুস্থ্য। কিন্তু আমাকে কিছু বলে নি। তার কিডনি খারাপ হয়েছিলো। তেমন চিকিৎসা করেনি সম্ভবতঃ। যে ছোট ভাইয়ের চিকিতসার জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করলো তার নিজের জন্য কেন করলো না? নাকি করোনার ভয়ে ডাক্তারের কাছে যায় নি। যেদিন খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে সেদিন দেখা গেলো কিডনির অবস্থা এতো খারাপ যে ডায়ালাইসিস করতে হবে, রক্তশুন্যতা এতো যে কমপক্ষে ৪-৫ ব্যাগ রক্ত ভরতে হবে। হাসপাতালে ভর্তির সময় পরীক্ষা করে ধরা পড়লো করোনা পজিটিভ। কয়েকদিনেই করোনা নেগেটিভ হলো। কিন্তু তার হার্ট এটাক করলো। করোনার কষ্ট নিয়েই এক রাতে মোবাইলে তার সাথে কথা হয়। বলে “ভাই, গলায় খুব কষ্ট। বুকে খুব কষ্ট। আমি আসার সময় আপনেরে জানাইতে পারি নাই।” আমি বললাম “অসুবিধা নাই। আমি জানি। আমরা সবাই দোয়া করতাছি। আল্লাহ আল্লাহ করো।” আমি ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে মেডিসিন কলসালন্স খুজে বের করে মুকুলকে বিশেষভাবে যত্ন নিতে বলি। তারা বিশেষভাবে যত্ন নেয় এবং আমাকে দৈনিক আপডেট দেয়। তাদের একজন আমার প্রাক্তন প্রিয় ছাত্র মাহবুব। ভাগ্য খারাপ করোনা ভালো হয়ে গেলেও আমার ভাইয়ের হার্ট এটাক করলো। নেয়া হলো ইউনাইটেড কার্ডিয়াক হাসপাতালে। আই সি ইউতে ভর্তি রইলো। মোটামুটি সুস্থ্য হলে কেবিনে আনা হলো। অনেকের সাথে অল্প অল্প কথা বলেছে মোবাইলে। তার ক্লাসমেট বন্ধু, আমার চাচাতো শ্যালক কাম মামাতো ভায়েরা রফিক তার কেবিনে গিয়ে ফেইসবুক মেসেঞ্জারে ভিডিও কল দেয়। তাতে আমি অসুস্থ মুকুলকে দেখতে পাই গালভর্তি সাদা দাড়ি। এযেনো অন্য রকম মুকুল। সে শুধু বলে ভাই, ভাই, কদ্দুছ? আমি মোবাইল কদ্দুসকে দেই। কদ্দুছের সাথে বেশ কিছু কথা বলেছে কিন্তু কদ্দুস বুঝতে পারেনি। তারপর আমি আমার শ্যালক সুমুনের কাছে দেই। মুকুল সুমনের সাথেও কথা বলেছে। পরদিন নাকি সারাদিন চেষ্টা করেছে সিদ্দিক ভাইকে কিছু বলার জন্য। কিন্তু সিদ্দিক ভাইর মোবাইল সেদিন নষ্ট ছিল। খুব সম্ভব মসজিদের ব্যাপারে কিছু বলতো। তার কাছে কে কত টাকা পায় তার একটা লিস্ট করায় সেদিন। তারপর আবার হার্ট এটাক করে তীব্রভাবে। প্রথমে আই সিইউ পরে লাইফ সাপোর্টে। একদিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর ১১ অক্টোবর ২০২০ শনিবার সকাল ৭-৩০ টায় তাকে মৃত ঘোষণা করে। শাহ আলম কাকা আমাকে জানান ৭-৩৭ টায়। ফেইসবুকে নিউজ দিয়ে চলে যাই বাড়িতে।

বিকেল ৫ টার পর জানাজা পড়ে মুকুলকে সমাহিত করা হলো তালুকদার বাড়ির গোরস্থানে ছোট কাক্কুর কাছাকাছি। আমি সকালে কবর জিয়ারত করতে গিয়েছিলাম, সভাবত আগের মতই বাড়ি গিয়ে পরেরদিন সকালে যা করি। হাটতে হাটতে চলে গেলাম বাবা-মার কবরের কাছে। কল্পনা করলাম আমাকেও এখানে মাটির নিচে শোয়ায়ে রাখা হবে। রাস্তায় দাড়িয়ে পশ্চিম দিকে মুখ করে দাড়িয়ে কবরবাসীর জন্য দোয়া করলাম। এবার দোয়া করার সময় আমার পাশে মুকুলকে পেলাম না। মুকুলের কবরটা সামনে পড়লো। কি নির্মম! ছয় ফুট লম্বা মুকুল আজ আমার সামনে মাটির নিচে শুইয়ে আছে। না জানি ফেরেস্তাদের কি কি প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে? আল্লাহ মুকুলকে মাফ করে দিন। আমাকেও মাফ করে দিন। বিনিময়ে বেহেশত দান করুন যেন আমরা আবার একসাথে বেড়াতে পাড়ি আপনার প্রতিশ্রুত উদ্যানে। চলে এসেছি ময়মনসিংহে। আবার কাজে যোগ দিয়েছি। আপনারা আমাকে ব্যস্ত রেখেছেন। চারটি জার্নাল সম্পাদনা করছি। আপনারা আপনাদের সার্থে আমাকে চাপে রেখেছেন আপনাদের কাজটা আগে করে দেয়ার জন্য। বিকেলে চেম্বারে আমাকে চাপে রেখেছেন আপনাদের পরীক্ষার রিপোর্ট আগে দেয়ার জন্য। মুকুলের জন্য আমাকে কাদবারও সময় দেন না। আমার কান্না বাইরে থেকে দেখা যায় না। আমার মন খুব শক্ত। আমি মাকে রাতে কবর দিয়ে সকালে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি বোর্ডের। শত শোকেও আমি থেমে থাকার লোক না। যতদিন বেচে আছি আমি পৃথিবীর বুকে কিছু করে রেখে যেতে চাই আমার কর্মকে, আমার মনের কথাকে। তাই, শত শোকের মধ্যেও আমি কাজ করে যাই। বৃষ্টি কমে গেলে রাস্তার কাদা শুকালে আমি আবার বাড়ি যেতে চাই। মসজিদের কাজ শেষ করতে চাই। কবরের বাউন্ডারি ওয়াল করতে চাই। কাদা রাস্তায় কাউচি ফেলতে চাই। আল্লাহ যেন আমাকে মসজিদ ও পাকা রাস্তা দেখিয়ে দুনিয়া থেকে তুলে নেন।

বাড়ি গিয়ে পাড়াময় ঘুরে বেড়াবো আমার পিছে আর মুকুলকে পাবো না। নাপিতের চালায় গিয়ে দাড়াবো। মুকুলকে কাছে দেখবো না। বাব্বুর চালায় গিয়ে দাড়াবো মৌচাকটার কাছে। মুকুল ছোট বেলায় মনোভাইগ খুইংগা চাকের কামর খাওয়ার আলাপ আর করবে না। মসজিদে গিয়ে সুন্নত নামাজ পড়ে বসে থাকবো। হুজুর মুকেলে আসার পর কুদবা শুরু করবেন বলে অপেক্ষা করবেন। মুকুল আর আসবে না। মোটকথা প্রতিটি মুহুর্তে মুকুলকে মিস করতে হবে আমাকে।

২৩/১০/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


Interviews

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদারের সাথে সাক্ষাৎকারসমুহঃ

মেডিভয়েসের সাথে সাক্ষাৎকার: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ খ্রি.
Click Here

এনামুল হাসানের সাথে সাক্ষাৎকার ৯ অক্টোবর ২০২০ খ্রি.

Click Here

 

 

আমাদের অনেকেই বনসাই

আমাদের অনেকেই বনসাই

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বনসাই হলো এক ধরনের হটিকালচার শিল্প। শুরু হয়েছিল জাপান থেকে। এই পদ্ধতিতে বড় বড় জাতের গাছকে ছোট একটি টবে লাগিয়ে ডাল পালা ছেটে ছেটে টবের মধ্যে বেটে অথচ মোটা আকারে জীবিত রাখা হয়। গাছের কাণ্ডে তার পেঁচিয়ে বা বেঁধে এর বিভিন্ন আকৃতি দেয়া হয় সৌন্দর্যের জন্য। মোট কথা গাছটির সাভাবিক বৃদ্ধিকে সুকৌশলে নিয়ন্ত্রণ করে অল্প জায়গাতে ছোট একটি পাত্রে ছোট আকারে বেঁচে থাকতে দেয়া হয়। গাছেরও জীবন আছে। তাই বনসাই পদ্ধতিতে এই জীবের প্রতি অন্যায় করা হয়। যে গাছ পর্যাপ্ত পুষ্টি পেলে, কোন রকম বাঁধা না পেলে জমিনের উপর ৫০-৬০ ফুট উচু ও ২০-৩০ ফুট বিস্তৃত হতো সেই গাছকে বনসাই করে মানুষ মাত্র ২-৩ ফুট উচু ও ১-২ ফুট বিস্তৃত হতে দেয়। এই অবস্থায় গাছ ফুল ও ফলও দেয়।

 

আমার বাড়ির ২,৪০০ বর্গফুট ছাদের উপর একটি বাগান করেছি সখ করে। সেখানে ফুল, ফল ও সবজি আবাদ করি। দেখতেও ভালো লাগে, খেতেও ভালো লাগে। এটা একটি নির্মল আনন্দের খোরাক আমার। এর এক ত্রিতীয়াংশ ছাদ খালি রেখেছি। ১৬০০ বর্গফুট জায়গায় ১০০ টি ফল গাছ লাগিয়েছি, ১৫-১৬ টি ফুল গাছ লাগিয়েছি। সবজি বেডে অনেক রকম সবজি লাগাই। প্রায় ৪৯ রকমের সবজি চাষ করে খেয়েছি। প্রায় ৩২ রকমের ফল খেয়েছি এই বাগানের। নানা জাতের ফুল ফুটিয়েছি তাতে। গাছ লাগিয়েছি টবে। সভাবতই ছাদের উপর ওজন কম রাখতে এবং গাছের সীমিত খাবার বা পুষ্টি ঠিক রাখতে আমাকে গাছগুলোর ডাল পালা ছেটে ছোট রাখতে হয়। যে আম গাছ জমির উপর লাগালে ৫ হাজার আম ধরে সেই জাতের গাছই ছাদে মাত্র ৪০-৫০ টি আম দেয়। তাতেও খুশি আমরা। লক্ষ্য করে দেখুন, মনের অজান্তেই আমি আমার ছাদের গাছগুলোকে বনসাই করে রেখেছি। কি নিষ্ঠুর কাজ করছি আমি!

এতক্ষণ আমি গাছের বনসাইয়ের কথা বললাম। মানুষও বনসাই হয়। কি কারনে যেন আমার এক জুনিয়র কলিগ আমার জন্য দঃখ করে বললেন “স্যার, আপনি তো আমাদের কাছে একটি বট বৃক্ষ। আপনাকে বনসাই করে রাখা হয়েছে।” এই কথা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। আমি কি বট বৃক্ষের মতো বড় হতে পারতাম? আসলেই কি আমার ডালপালাগুলো ছেটে ফেলা হয়েছে? এখন এমন অনেক বনসাই মানুষ আমার চোখে পড়ে। এরা অল্প অল্প কিছু ফল দিয়ে যাচ্ছে। বড় হতে দিলে কত যে ফল দিতো! কিন্তু যারা ডালপালা ছেটে দেয় তারা বনসাই পেয়েই খুশি।

২১/১০/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/