গেন্দুর বউ এলো

গেন্দুর বউ এলো

(হাসির হাস্তর)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

[আমাদের সখিপুরের গ্রাম এলাকায় ছোটবেলা লোক মুখে কিছু গল্প শুনতাম। সেগুলোকে বলা হতো হাস্তর। আমি সেসব হাস্তর বন্ধুদের সহযোগিতায় সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি আমার মতো করে। হাস্তরের ভেতর দিয়ে আগের দিনের গ্রামবাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশ পাবে বলে আমি মনে করি। এই লেখাটি তারই একটি অংশ]

 

গেন্দু বিয়ে করার সময় শশুর বাড়ি যেতে হয়নি। বউকে তুইল্যা এনে বিয়ে পড়ানো হয়েছিলো। গ্রামে দুই রকম বিয়ে পড়ানোর নিয়ম আছে। একটা হলো চইল্যা যাওয়া আরেকটা হলো তুইল্যা আনা। বর যখন বিয়ে পড়ানোর উদ্যেশ্যে শশুর বাড়িতে গিয়ে বিয়ে পড়ায় সেটাকে বলা হয় চইল্যা যাওয়া। বর কনের বাড়ি না গিয়ে যদি কনেকে বরের বাড়িতে এনে বিয়ে পড়ানো হয় সেটাকে বলা হয় তুইল্যা আনা। গেন্দুর বউ জয়গনকে তুইল্যা এনে বিয়ে পড়ানো হয়েছিলো। দু’টি প্রথাই সখিপুর এলাকায় চালু আছে। ডুলিতে চড়ে জয়গন প্রথমদিন শশুরবাড়ি এসেছিলো। ডুলিতে এক জনের বেশী বসা যেতো না। পালকি ছিলো অনেক বড়। পালকিতে এক সাথে বর, কনে ও কনের সাথে আসা নানী, বা দাদী বা ছোট বোনও বসতে পারতো। যারা কনের সাথে প্রথম বরের বাড়ি যেতো তাদেরকে বলা হতো ডুলি ধরা। জয়গনের সাথে জয়গনের ছোট বোন আর নানী ডুলি ধরা হিসাবে এসেছিলো। কনেরা প্রথমবার এসে যে কয়দিন শশুরবাড়ি থাকতো সেকয়দিন ডুলিধরাও সেখানে থাকতো। ফিরে যাওয়ার সময় উপহার পেতো। যেটাকে বলা হতো মাইন পাওয়া। ডুলিধরাদের বিয়ে বাড়িতে থাকা খাওয়া কষ্টকর ছিলো। তবু মাইন পাওয়ার আসায় তারা এই কষ্ট ভুলে থাকতো।

 

জয়গন বাপেরবাড়িতে আসার সময় খুব কেঁদেছিল। মায়ের বুকে মুখ রেখে অনেক্ষণ ফুঁফিয়ে কেঁদেছিলো। মায় আঁচল দিয়ে চোখ মুখ মুছে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন “মা জয়গন, কাইন্দ না। সব মেয়া মাইনসেরই হশুরবাড়ি থাকন নাগে। এইডাই খোদার নিয়ম। হশুর হউরির খেজমত করবা। দামান্দের কথা হোনবা। হউরি বাইরা না দিলে পাইল্যা থিকা কিছু নিয়া খাবা না। দামান্দে খাবার আগে তুমি খাবা না। এইযে তোমার আঁচলে একটা খিলি পান বাইন্দা দিলাম। এইডা তোমার হউরিরে দিয়া কবা আংগ মাইয়া দিছে আননেরে খাইতে।” অদুরে দাঁড়িয়ে জয়গনের বাপে গামছা দিয়ে চোখ মুছছিলেন। জয়গনে মা পাপের দিকে নিয়ে গিয়ে বললেন “তোমার বাপের কাছে কইয়া যাও।” বাপের বুকে মুখ রেখে জয়গন চিকইর দিয়ে কেঁদে ফেললো। জয়গনের কান্না শুনে বাড়ির নাইয়রিরাও গুপ ছেড়ে কেঁদে দিলো। এক হৃদয়বিধারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। পাড়ার মুরুব্বিরা জয়গনকে ধরে ধরে হাটিয়ে ডুলি পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। ডুলির ফেতর আসন বিড়ায়ে বসলে জয়গনকে নিয়ে শশুর বাড়ির দিকে চললো বেয়ারা। ডুলিধরারা চললো গরুর গাড়িতে।

 

এদিকে গেন্দুকে হলুদ দিয়ে গোসল করিয়ে বিয়ের সাজন সাজিয়ে রাখা হলো। সন্ধারাতে ডুলি এসে পৌঁছলো গেন্দুদের বাইরবাড়ি। নুতুন বউয়ের আগমনে পোলাপানরা “নয়া বউ আইছে, নয়া বউ আইছে” বলে চিতকার করতে করতে পালানের ক্ষেতে গিয়ে গাইঠা (পটকা) ফুটাতে থাকলো। হাওয়াই বাজি ফুটালো। বাড়ির বউরা, মেয়েরা ও নাইয়রিরা সবাই বউ বরণ করতে বাইরবাড়ি চলে গেলো। বড় ঘরের মেঝেতে সব রান্নাকরা খাবার সাজিয়ে রাখাছিলো ডিস ভর্তি। ঘরে ছিলো শুধু গেন্দুর মা ও পালা বিড়ালটি। বিড়ালটি খাবার ডিসের পাশে বসে বসে মিয়াও মিয়াও করছিলো। গেন্দুর মায় চিন্তা করলেন “এই ওলা বিলাইডা যদি ঘরে রাইখ্যা বউ আনতে যাই তাইলে সব খাবার চাইটা নষ্ট কইরা ফালাইবো। খালি ঘরে বিলাই রাইখ্যা যান যাবো না।” কাউরে ডেকেও কোন সাড়াশব্দ পেলেন না।

 

এদিকে জয়গনকে ডুলি থেকে নামিয়ে আনতে হবে শাশুড়ির অর্থাৎ গেন্দুর মায়ের। সবাই উদবিঘ্ন ছিলো গেন্দুর মা আসে না কেনো। উপায়ান্তর না পেয়ে গেন্দুর মায়ের মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। হাতের কাছেই একটা বেতের ঢাকি ছিলো। চট করে ঢাকি দিয়ে বিড়ালটিকে ঢেকে ফেললো। বিড়াল আটকা পড়লো ঢাকির নিচে। তারপর গেন্দুর মা চলে গেলেন বউ বরণ করতে। গেন্দুর মা জয়গনকে ডুলি থেকে নামিয়ে আনলেন। জয়গন শাশুড়িকে কদম্বুছি করে আঁচল থেকে গিট্টু খুলে পানটি দিলো। বললো “আম্মা, আংগ মাইয়া আপনেরে পান খাইতে দিছে, নেইন।” গেন্দুর মা পান নিয়ে মুখে দিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন “নও মা, বাড়ির ভিতর।” উঠান পর্যন্ত নিয়ে জয়গনকে পাটার উপর দাড় করানো হলো। এক গ্লাস মিষ্টি সরবত খাইয়ে দেয়া হলো জয়গনকে। তারপর দেয়া হলো একটি চমচম। তারপর একগ্লাস পানি। আশে পাশের ননদেরা জয়গনকে না না রকম কেরাই করে কথা বলছিল। তারা পাটার নিচে পাতিল ভাংগা চেড়া দিয়ে রেখেছিল। তাই পাটা গুট গুটি নড়া চড়া করছিল। তাই দেখে ননদেরা কেরাই করছিলো “ভাবী, অবা থুকুর বুকুর নাচতাছুন ক্যা?” জয়গন খুব বিরক্ত হচ্ছিলো এসব আচার অনুষ্ঠান দেখে। সামনে আরও কত কি যে আছে? বিয়ের অনুষ্ঠানের এত নিয়ম কানুন ও প্রথা কে যে আবিস্কার করছিলো? অনেকক্ষণ পর জয়গনকে বড় ঘরে নেয়া হলো। জয়গনের খালা-শাশুড়ি বললেন “বিসমিল্লাহ বিল্ল্যা ঘরে পাড়া দেওগ বউ।” ঘরে ঢুকেই জয়গন দেখে মেঝেতে অনে খাবার দাবার পাটির উপর সাজিয়ে রাখা আছে। উপুর করা একটা ঢাকির নিচে কি যেন ছটর ফটর করছে। জয়গনের শাশুড়ির হটাৎ মনে পড়লো বিড়াল চাপ দিয়ে ঢেকে রাখার কথা। এতক্ষণে হয়তো বাতাস না পেয়ে আধা মরা হয়ে গেছে। তারাতাড়ি করে ঢাকি উচু করে দিলেন। হুলো বিড়ালটি লাফ দিয়ে বেড়িয়ে উগার তলে গিয়ে পালালো। জয়গন বিড়াল দেখে চমকে উঠলো। মনে মনে ভাবলো “বিয়ের অনুষ্ঠান কত নিষ্ঠুর। বউ ঘরে প্রবেশ করা পর্যন্ত বিড়াল ঢাইক্যা রাহন নাগে। আমি যেদিন পোলার বউ বাড়ি আনমু, হেদিন একটা না, তিনটা বিড়াল ছাইড়া দিমু পোলার বউয়ের সামনে।”

৩০/১২/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/




গেন্দু মিয়ার গাইয়ের দুধ

গেন্দু মিয়ার গাইয়ের দুধ
(হাসির হাস্তর)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
[আমাদের সখিপুরের গ্রাম এলাকায় ছোটবেলা লোক মুখে কিছু গল্প শুনতাম। সেগুলোকে বলা হতো হাস্তর। আমি সেসব হাস্তর বন্ধুদের সহযোগিতায় সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি আমার মতো করে। হাস্তরের ভেতর দিয়ে আগের দিনের গ্রামবাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশ পাবে বলে আমি মনে করি। এই লেখাটি তারই একটি অংশ]
গেন্দু যেদিন শশুর বাড়ি নিতা খেতে গিয়েছিল সেই রাতেই তাদের গাভিন গাইটি বিয়ায়। একটি নাদুসনুদুস ষাড় বাছুর হয়। ২৮ দিন পর্যন্ত গাইয়ের দুধ তারা কেউ খায় না। শুধু বাছুরে খায়। এই সময়টায় গাইকে বলায় হয় কাচিলা গাই। কাচিলা গাইয়ের দুধ মিঠা মিঠা লাগে। এই সময়ের দুধ কেউ বাজারেও বিক্রি করে না। গেন্দুরে বিয়া করানোর পরই গাই বিয়াইলে সবাই বলে “গেন্দুর বউডা কপাইল্যা আছে। বাড়িতে আবার পরই গাই বিয়াইছে।” গাই বিয়ানোর কয়দিন পরই গাইয়ের খুব পেট খারাপ হয়েছিলো। গেন্দুরা মনে করেছিল আউশ ধান কাটার পর নাড়া ক্ষেতে গাই হাচার দেয়া হয়েছিলো। ঘাসের সাথে গাই ময়না খেয়েছিলো। তাই পেট খারাপ হয়েছিলো। ময়না এক প্রকার বিষাক্ত ঘাস। গরু খেলে পাতলা পায়খানা হয়। যাহোক, গাই এখন ভালো আছে।
গাই বিয়ানোর ২৮ দিন পরও গেন্দুরা গাইয়ের দুধ খেলো না। এ বাড়ির সবাই খুব কৃপণ। দুধ যা হয় পানাইয়া সব বিক্রি করে দেয় বাজারে। দৈনিক ১০টার সময় বর্গা বাজারে নিয়ে দুধ বিক্রি করতো গেন্দু মিয়া। গেন্দুর শশুর বাড়ির লোকেরা কৃপাণ না। তারা গাই পানাইয়া নিজেরা খাওয়ার জন্য যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু রেখে দিয়ে বাকীটুকু বাজারে নিয়ে বিক্রি করতো। কাজেই, বাপের বাড়িতে থাকাকালীন গেন্দুর বউ জয়গন প্রায় দৈনিক দুধভাত খেতে পারতো। শশুর বাড়িতে এসে দুধের গাইয়ের যত্ন নিচ্ছে জয়গন, শাশুড়ি গাই পানানোর সময় বাছুর ধরে দাড়িয়ে থাকে জয়গন, অথচ সেই দুধের এক ফোটাও খেতে পারেনা জয়গন।
একদিন জয়দগনের খুব দুধ খেতে ইচ্ছে হলো। বিক্রির জন্য রেখে দেয়া দুধের ঘট থেকে কিছু দুধ গ্লাসে ঢেলে জয়গন যুত করে খেয়ে ফেললো। যেটুকু কম পরলো সেটুকু কলসির পানি দিয়ে পুড়া করে রাখলো। সেই পানি মেশানো দুধ নিয়ে গেন্দু বাজারে গেলো। সরকারি স্বাস্থ্য কর্মীরা দুধের বাজারে সেদিন এলো দুধ পরখ করতে। লেকটোমিটার দুধে ডুবিয়ে ডুবিয়ে দুধ পরীক্ষা করা হচ্ছিল। যাদের দুধে পানি পাওয়া গেলো তাদের কানে ধরে ১০০ বার উঠ বইস করা হলো এবং পানি মেশানো দুধ তার মাথায় ঢেলে দেয়া হচ্ছিলো। কি কারনে পানি মেশানো হয়েছে তার কৈফিয়ত দিতেও বলা হচ্ছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে গেন্দুর দুধে পানি ধরা পড়লো। ঘটের দুধ সম্পুর্ণ ঢেলে দেয়া হলো গেন্দুর মাথায়। চুল, নাক, মুখ ও শার্ট দুধে চুবা চুবা হয়ে গেলো। গেন্দুর দুধে পানি থাকতে পারে এটা গেন্দু কল্পনাও করতে পারেনি। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা যখন গেন্দুকে পানি মেশানোর কারন জিজ্ঞেস করলো তখন গেন্দু উত্তর দিলো “আমরা দুধে পানি মিশাই নাই। আমার মনে অয় আমগ গাইয়ের মাঞ্জায় পানি আছে, যেডা দুধের নগে মিশা আহে।” বাড়িতে এলে জয়গন জানতে চাইলো “আইচকা দুধের বাজার কিবা? আপনের শরীরে দুধের গোন্দো পাইতাছি ক্যা? মাথা এব্যা আডা আডা ক্যা?” গেন্দু বিস্তারিত বলার পর জয়গন বললো “আসলেই মনে অয় গাইয়ের মাঞ্জায় পানি আছে।” জয়গনের মনে খুব কষ্ট লাগছিলো। তারজন্যই তার স্বামীকে অপমান করা হয়েছে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো আর দুধ খাবেও না, দুধে পানিও দিবে না। এরপরও গেন্দু নিয়মিত দুধ নিয়ে বাজারে যেতো। আরেকদিন এভাবে দুধ পরখ করা হলো। কিন্তু দুধে পানি ধরা পড়লো না। তাহলে আগের ঘটনার দিন পানি কোথা থেকে এলো? এই প্রশ্ন গেন্দুর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো।
তশর মুন্সির বাড়ির কাছ দিয়ে গেন্দু বাজারে যেতো। রাস্তায় মুন্সির সাথে গেন্দুর দেখা হলে মুন্সি জিজ্ঞেস করলেন
– গেন্দু ভাই, গাইয়ে কয় শের কইরা দুধ দেয়?
– দিনপত্তি ১ শের কইরা দুধ দেয়।
– বেচ কতটুকু।
– ব্যাকখানি বেইচা ফালাই।
– ক্যা, নিজেরা গাই পানাও। এক ফোটা দুধও খাওনা। অথচ তোমগো অবস্থা আমগো থিগা অনেক ভালা। আমগো জমি জিরাতও নাই, গাইও নাই। তাও আল্লায় দিলে ভালাই চলে। খোদার তিরিশ দিনই মুন্সি খাবার পারি। কারো অসুখ বিসুখ অইলে মোলুদ পড়াই, কোন নতুন গাছের ফল পাকলে মুন্সি খাই, নতুন ঘরে উঠতে গেলেও মুন্সি খাই। আমার কোন কোন দিন দুই বেলাও মুন্সি খাইতে অয়। সবাই আমার জন্য কুরকা (মুরগি) জবাই করে। দুধ দেয় পাতে। আল্লাহয় দিলে ভালাই খাইতাছি। দোয়া করার পরপর আতে যা দেয় তা দিয়া আমার সোংসার ভালাই চইল্যা যায়। তোমারে বলি কী, তুমি মইদ্যে মইদ্যে দুধ না বেইচা মাও, বাপ ও নয়া বউ নিয়া দুধ দিয়া ভাত খাও।
– দুধ বেইচ্যা যে আমগো হদাই করন নাগে।
– আইজকার দুধটা আমিই কিনলাম। এই নেও টেহা। এই টেহা দিয়া হদাই করোগা। আর দুধটুকু আমি তোমারে দিয়া দিলাম। তোমরাই খাবা।
গেন্দু বাজারে গিয়ে সদাই করে দুধ নিয়ে বাড়ি ফিরলো। দুধ বেচা টাকা দিয়ে বউয়ের জন্য আলতা, স্নো, পাউডার ও কদুর তেল কিনেছিলো। বাড়ি এসে বউয়ের হাতে এগুলো তুলে দিয়ে তশর মুন্সির কাইন্ডটি বর্ণনা করলো। আলতা-স্নো-পাউডার পেয়ে জয়গন খুশী হলো। আরো খুশী হলো এই ভেবে যে আজ সে দুধ খেতে পারবে। গেন্দুর ছোট বোন দেখে বললো “ভাই যে খালি ভাবীর জন্য স্নো পাউডার আনলাইন। আমার জন্য আনলাইন না? আগেত আনতাইন। অহন আমার কতা মনে থাকপ না।” গেন্দু বললো “আনমুনি, এরপর দুধ বেইচ্চা। একদিনের টেহায় ত সব কিনা যায় না।” কিছুক্ষণ পর জয়গন দেখলো দুধের ঘট নিয়ে গেন্দু ঘরের পেছনের দিকে যাচ্ছে। জয়গন ব্যাপারটা লক্ষ করছিলো। দেখলো গেন্দু ঘটের সম্পুর্ণ দুধ আসতে করে পাগারের পানিতে ঢেলে দিলো। ঘাটের পানি দুধে সাদা হয়ে গেলো। জয়গন জিগাইলো “মাইনসে এবা করলো ক্যা বুঝবার পাইলাম না। দুধ নিয়া পানিত ঢাইল্যা দিলো ক্যা?” গেন্দু উত্তরে বললো “আইজকা যুদি আমি দুধ খাই তাইলে আবার খাবার ইচ্ছা অব। দুধ খাবার অভ্যাস না অওয়াডাই ভালা। তাই মুন্সির দেয়া দুধ ফালাই দিলাম।”
২৪/১২/২০২০ খ্রি.
ময়মনসিংহ
গল্প সংগ্রহে সহযোগিতায় বন্ধু আবু বকর সিদ্দিক, সাড়াসিয়া।

Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/




হক স্যার টুপি ঘুরাতেন

হক স্যার টুপি ঘুরাতেন

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

[প্রফেসর ডা. আব্দুল হক স্যার ছিলেন একজন সৎ ও আদর্শবান মানুষ। তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন। তিনি উক্ত কলেজের প্রিন্সিপাল এবং ময়মনসিংহ বিএমএ-র প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। আমি উক্ত বিভাগে দুইবার বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছি। ভয়ে ভয়ে স্যারের চেয়ারটিতে বসেছি। স্যারকে নিয়ে আমার অল্প কিছু স্মৃতি কথা আছে। তারই কিছু ধারাবাহিকভাবে লিখে যেতে চেষ্টা করছি]

 

প্রথম দেখাতেই প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যার আমার হাত থেকে নতুন বইগুলো ছুড়ে মারাতে আমি মনক্ষুন্ন হই। নজরুল দেখে ফেলাতে আমি অপমান বোধ করি। মনে মনে ভাবী ইনি কেমন মানুষ? আমাকে তো সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতে পারতেন। যদি এমন করে বলতেন “বাবা, তুমি তো বেস থার্ড ইয়ারে উঠেই নতুন বই কিনে ফেলেছো। খুব ভালো করেছো। তবে এই সব লাল নীল দেশী লেখকদের বই পড়ে ভালো ডাক্তার হওয়া যাবে না। তুমি বরং বিদেশী লেখকদের বই কিন। এসব বই পড়ে পাস করা যাবে না।” তা না করে তিনি আমার সাথে কিছুই না বলে বই ছুড়ে মেরে তার রুমে প্রবেশ করলেন। এই ক্ষোভ আমার ভেতরে অনেকদিন পর্যন্ত ছিলো, যতদিন না আমি স্যারের খুব কাছে আসতে পেরেছি।

 

তখন থার্ড ইয়ার থেকেই প্যাথলজি ক্লাস শুরু হতো। প্রফেসর ডাঃ আব্দুল মান্নান সিকদার স্যার অল্প বয়সের শিক্ষক ছিলেন। তিনি সুটেড-বুটেড হয়ে ক্লাসে আসতেন। তিনি তখন প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। প্রফেসর হক স্যার ছিলেন সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। এটা কিন্তু ১৯৮৩ সনের কথা বলছি। সিকদার স্যার সব কথা ইংরেজিতে বলতেন। আমি গ্রামের ছেলে। ইংরেজি খুব কম বুঝতাম। যদিও আমি ইন্টারমেডিটে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছি। বইয়ের ইংলিশ মিডিয়াম বাংলা মিডিয়ামের চেয়ে সহজ ছিলো। কিন্তু ইংলিশ মিডিয়ামের লেকচার শোনা আমার জন্য কঠিন ছিলো। সিকদার স্যার গ্যালারির ভেতরে ছাত্রদের কাছে এসে পড়া ধরতেন। তাও আবার ইংরেজিতে কথোপকথন করে। আমি সবসময় ভীতসন্ত্রস্ত থাকতাম এবং স্যারের মুখের দিকে চেয়ে থাকতাম। স্যার আমার এই দুর্বলতা বুঝে ফেলে আমাকে পেয়ে বসেন। আমার এই অবস্থার কথা ক্লাসের সবাইকে বলতে থাকেন। আমি লজ্জিত হয়ে পড়ি। আমি যখন প্যাথলজির সহকারী অধ্যাপক হয়ে সেই একই গ্যালারিতে ক্লাস নিতাম মান্নান সিকদার স্যারের কথা মনে পড়তো। তাই, আমি ক্লাসে ইংরেজি বলার পাশাপাশি সরল বাংলায় ছাত্রদের বুঝিয়ে দিতাম। মান্নান স্যার ছাত্রদের মাঝে এসে পড়াতে ছাত্ররা অন্য মনস্ক হতে পারতো না। আমিও মাঝে মাঝে তাই করি। সিকদার স্যার পরের বছর বদলি হয়ে যান অন্য কোন মেডিকেল কলেজে। দীর্ঘদিন পর আমি যখন এম ফিল পড়ি তখন স্যারের দেখা পাই প্যাথলজি সোসাইটির এক সম্মেলনে। শুনলাম তিনি চট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। তারপর থেকে স্যারের স্যাথে আমার অনেক দেখা সাক্ষাত হয়। মোবাইলে অনেক কথা বলেন। অনেক স্নেহ করেন আমাকে। তিনি আমার সাহিত্যের বইয়ের একজন ভালো রিভিউয়ার।

প্রফেসর ডাঃ আব্দুল মজিদ সিদ্দিকী স্যার ও রজব আলী স্যার আমাদের জুরিস্প্রুডেন্স পড়াতেন। ফরেনসিক মেডিসিনকে তখন জুরিস্প্রুডেন্স বলা হতো। আমি ছিলাম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ১৭তম ব্যাচের ছাত্র। তার মানে কলেজের বয়স ছিল ১৭ বছর। এমন বয়সে কলেজে শিক্ষক সংকট থাকে। মজিদ সিদ্দিকী স্যার রেডিওলজি (এক্স-রে) বিভাগের ডাক্তার হয়ে জুরিস্প্রুডেন্স লেকচার ক্লাস নিতেন। এমন সমস্যা দিনাজপুর মেডিকেল কলেজেও ছিলো। এই কলেজের বর্তমান নাম এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ। আমার মেয়ে ডা. মার্জিয়া ইসলাম দীনা এই কলেজের ১৭ ব্যাচের ছাত্রী ছিলো। তখন আমিও এই মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলাম। দীনাদের বায়োকেমিস্ট্রির প্রফেসর লেভেলের শিক্ষক না থাকাতে প্রথম দিকে আমিই অনেকগুলো বায়োকেমিস্ট্রি লেকচার ক্লাস নিয়েছি। মজিদ সিদ্দিকী স্যারের বাড়ি আমাদের পাশের উপজেলা ঘাটাইলে হওয়াতে তার কথাবার্তা আমার কাছে খুব পরিস্কার লাগতো। চিকন মানুষ, টনটনে কথা ছিলো মজিদ স্যারের। রজব আলী স্যার পরিপাটি ও দেখতে সুন্দর ছিলেন। ফরেনসিক মেডিসিনের পড়ায় বেশ কিছু লজ্জার কথা আছে। সেইগুলি বলার সময় রজব আলী স্যার স্মীত হাসতেন এবং তার গালে টোল পড়তো। এখনো স্যারের সেই টোল পরা গাল আর মোটা সুন্দর দাঁতের মিষ্টি হাঁসি আমার মনে আছে। ফিজিওলজির প্রফেসর এম এ জলিল স্যার আমাকে খুব ভালোবাসতেন। টাঙ্গাইলের মানুষ হওয়াতে তার কাছে খুব যেতাম। তিনি পড়াতেন খুব ভালো। খুব জ্ঞানী ছিলেন। কিন্তু তিনি যখন ব্লাকবোর্ডের কাছে গিয়ে কিছু লিখতেন তখন নিচু স্বরে কথা বলতেন যেগুলো আমি ফলো করতে পারতাম না। আমি যতদিন শিক্ষকতা করেছি সেই কথাটি মনে রেখেছি। তবে সব ক্লাস তারাতারি ডিজিটাল হয়ে যাওয়াতে আমাকে ব্লাকবোর্ডের দিকে ঘুরতে হয় নি। আমি ক্লাস নেই সামনে ক্যাপটপ রেখে। স্ক্রিনের দিকে তাকাই না বেশী। যেহেতু দৃষ্টি থাকে সামনের দিকে সেহেতু ছাত্ররা গন্ডগোল করতে পারে না। এনাটমির প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হাই ফকির স্যার সবসময় সুট টাই পরে থাকতেন। খুব পরিস্কার করে কথা বলতেন। শোনতে খুব ভালো লাগতো। তিনি বোর্ডে তেমন কিছু লিখতেন না। ইপিডায়াস্কোপে বইয়ের পাতা প্রজেক্ট করে স্ক্রিনে ফেলতেন। আমার কাছে স্যারের পড়ানোর স্টাইল ভালো লাগতো। এনাটমিতে হারুন স্যার নামে আরেকজন স্যার ছিলেন। তিনি কবিতা লিখতেন। পড়ানোর সময় মুখে হাসি লেগেই থাকতো। তিনি এপ্রোন পড়ে ক্লাসে আসতেন। ফার্মাকোলজির প্রফেসর ডাঃ জগদীশ চন্দ্র স্যার প্রথম দিন পরিচিতি মূলক ক্লাসে খাটি নেত্রকোনার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিলেন মনে আছে। তিনি বলছিলেন এই কলেজটা যেইহানে অইছে সেইহানে পাট কেত আছিল। সহজ করে সুন্দর পড়াতেন। সার্জারীর প্রফেসর ডাঃ এনায়েত কবীর স্যার ক্লাসে খুব রাগারাগি করতেন। কেন করতেন তা বুঝতে পারতাম না। রাগারাগির এক পর্যায়ে পকেট থেকে ট্যাবলেট বের করে খেতেন। তারপর শান্ত হয়ে আবার পড়াতেন। বেস ভারী শরীর ছিলো স্যারের। জ্যাকেট গায়ে দিয়ে থাকতেন। দুই হাত প্রসারিত করে কথা বলতেন। একদিন সহকারীকে বললেন মাইকের মাউথ পিচটা সুতা দিয়ে গলায় ঝুলিয়ে দিতে। তারপর তিনি দুই হাত ছোড়াছুড়ি করে পড়ালেন। তিনি ছাত্রদেরকে তুই করে বলতেন। একদিন হঠাৎ তিনি ক্লাসে অনেককেই প্রশ্ন করা শুরু করলেন কে কোন কলেজ থেকে পাশ করে এসেছে। আমাকে যখন প্রশ্ন করলেন “তুই কোন কলেজ থেকে পাস করেছিছ?” আমি দাঁড়িয়ে গর্বের সাথে বললাম “আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে, স্যার?” তিনি সাথে সাথে তাচ্ছিল্যের সাথে বলে ফেললেন “বাহ, আলাউদ্দিনের মিষ্টি, অপুর্ব সৃষ্টি।” তিনিও হাসলেন, ছাত্ররাও হাসলো। কারন, কেউ তো জানতো না যে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কার দাদার নাম। সার্জারীর প্রফেসর ডাঃ আব্দুস শাকুর স্যার ছিলেন মাটির মানুষ। ধীরে ধীরে পড়াতেন। আমাকে বেশ স্নেহ করতেন। কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডাঃ মোফাখখারুল ইসলাম স্যারকে রাগ করতে দেখিনি। তিনি ইংরেজ স্টাইলে থাকতেন। হাসি হাসি মুখ ছিল সব সময়। তিনি কিছুক্ষণ লেকচার দিয়েই বিলাতের কথা বলতেন। কথায় কথায় কমিউনিটি বেইজড মেডিকেল এডুকেশন, আলমা আটা, জেনেভা ডিক্লারেশন শব্দগুলো উচ্চারণ করতেন। শুনতে ভালোই লাগতো। মেডিসিনের অধ্যাপক শামসুল ইসলাম স্যার ছিলেন একটু ভার বুদ্ধিসম্পন্ন। তিনি ক্লাসে এসে কিছুক্ষণ সিগারেট টেনে শক্তি সঞ্চয় করে কেশে পড়ানো শুরু করতেন। তখন সিগারেট খাওয়াটা এখনকার মতো অতো দোষের ছিলো না। তিনি ক্লাসে পড়া ধরতেন না। তিনি সাধারণত সাদা হাফ শার্ট পরতেন। কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সাদেক স্যার ছিলেন খুবই মাটির মানুষ। খুব বিনয়ের সাথে পড়াতেন। হাটার সময় তিনি এদিক সেদিক তাকাতেন না। চুক্ষু বিভাগের প্রফেসর মুক্তাদির স্যার ছাত্রদের সাথে বেশ মিশুক ছিলেন। তিনি দেখতে সুন্দর ছিলেন। সাফারি পরতেন সাধারণত। বিভাগীয় প্রধান ছিলেন প্রফেসর ডাঃ শামসুদ্দিন স্যার। তিনি জোক করে পরাতেন। একবার ক্লাসে আমি একটু অন্যমনস্ক ছিলাম। হঠাৎ তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন “এই, তিন মাসের বাচ্চার ভিটামিন কম পড়লে কি করবে।” আমি বলে দিলাম “সবুজ শাক সবজি খেতে দেব।” স্যার মুখের এক অদ্ভুত ভঙ্গি করে বললেন “হ্যা, তিন মাসের বাচ্চা ত শাক খেতে পারবেনা। নাকইর দিয়া ঠেলে ঠেলে পাছা দিয়ে শাক ঠুকাতে হবে।” আমি ত লজ্জা পেয়ে ঝিম মেরে গেলাম। স্যারের সামনে ত হাসা যায় না। বন্ধুদের কারো কারো শরীর ঝাকুনি দিতে দেখলাম চিপা হাসিতে। শামসুদ্দিন স্যার কোট-টাই পরতেন। হাটতেন দৈত্যে মতো। প্রফেসর ডাঃ জোবায়েদ হোসেন স্যার ছিলেন খুব জাদরেল এক শিক্ষক। সবাই তাকে ভয় পেতো। তিনি গাইনি বিভাগের প্রধান ছিলেন। প্রথম দিকে আর্মি অফিসার ছিলেন। হাটতেনও আর্মি স্টাইলে। লম্বা ছিলো স্যারের শরীর। টাই পরতেন। সার্জারীর প্রফেসর গাফফার তালুকদার স্যার বাংলা উচ্চারণ করতেন বিলাত প্রবাসী মানুষের মতো। তিনি শার্টের উপর জ্যাকেট পরতেন। সার্জারির আরেকজন শিক্ষক ছিলেন প্রফেসর ডাঃ সেলিম ভুইয়া স্যার। খুব নরম মানুষ ছিলেন। স্যারের আন্ডারে আমি ৬ মাস সার্জারিতে বিশেষ ট্রেইনিং নিয়েছিলাম। তিনি কথায় কথায় ইংল্যান্ডের ব্যবস্থার কথা বলতেন। আমি আমার কয়েকজন শিক্ষকের কথা এখানে উল্লেখ করলাম যারা আমাদের লেকচার ক্লাস নিতেন। আরও অনেক শিক্ষক ছিলেন, তারাও লেকচার ক্লাস নিতেন। সবার কথা লেখলে আপনি অধৈর্য্য হতে পারেন। হক স্যারকে নিয়ে লেখতে গিয়ে কয়েকজন শিক্ষকের নাম এসে গেলো। আমাদের সব শিক্ষকই অত্যধিক বিজ্ঞ ছিলেন। সবাই ভালো পড়িয়েছেন। একেকজন শিক্ষক একেক ভাবে স্মৃতিতে রয়ে গেছেন। আজ লিখবো হক স্যারকে নিয়ে। তার আগে একটু প্রফেসর আবু আহমেদ স্যারকে নিয়ে বলে নেই। স্যার ছিলেন প্যাথলজি বিভাগের সেকেন্ড স্যার। পড়াতেন মাইক্রোবায়োলজি। স্যারের লেখচার আমার খুব পছন্দ হতো। গল্প করে করে মজা করে পড়াতেন। যেদিন তিনি ফিতাকৃমি পড়ালেন সেদিন ক্লাস শুরুতেই একটি গল্প শুনালেন।

বললেন, একবার এক রাজকন্যার পেট থেকে ১৮ ফুট লম্বা একটা মাছ বের হলো পায়খানার সাথে। আমি শুনে তাজ্জব বনে নড়েচড়ে বসলাম। শোনার জন্য ব্যাকুল হলাম। আসলে এই গল্প থেকে স্যার চলে গেলেন ফিতা কৃমি পড়াতে। পদ্ধতিটা আমার খুব ভালো লেগেছিল। স্যার পড়ানোর সময় একটা কিছু বলে সামান্য হা করে জিহবার আগা নাড়াতেন এবং গাল ও ঠোঁটে হাসির ঢেউ খেলে যেতো। খুব ভালো লাগতো। থেমে থেমে পড়াতে বুঝতেও সুবিধা হতো। স্যারের দেখাদেখি আমিও ক্লাসে প্রসংগের সাথে মিল রেখে ছোট একটি গল্প বা ঘটনা শুনিয়ে দেই। ছাত্ররা যাতে গল্পটা মনে রাখতে গিয়ে পড়াটাও মনে রাখে এটাই আমার উদ্দেশ্য। একবার লন্ডন থেকে এক মেয়ে আমাকে মোবাইল করলো। সালাম দিয়ে কেমন আছি তা জানতে চাইল। কুশল বিনিময়ের পর জানতে চাইলাম

– কী মনে করে ফোন করেছ।

– স্যার, গভীর রাত এখানে। ঘুম আসছিলো না। দেশের কথা মনে হলো। শেষে আপনার ক্লাসের কথা মনে পড়লো। আপনি একদিন ভুত দেখেছিলেন। সেই কথা মনে হবার পর আপনাকে ফোন করেছি।

– আমার ভুতের গল্প ত মনে আছে। কেনো বলেছিলাম তা কি মনে আছে?

– জি স্যার, ট্রমাটিক ফ্যাট নেক্রোসিস হলে ফ্যাট সেল মরে গিয়ে তার শুধু আবসা আবসা আউট লাইন দেখা যায়। মানে মৃত কোসের ছায়ার মতো দেখা যায়, যেটাকে বলা হয় ঘোস্ট সেল। আপনার গল্পগুলো মনে হলে প্যাথলজির পড়াও মনে এসে যায়।

ভুতের গল্প প্রায় সবাই ভালোবাসে। সেদিন ফেইসবুকে একটা পড়েছি এমন। গোরস্থানে পাসের বাড়িতে সাধারণত কেউ থাকিতে চায় না। এমন একটি বাড়ি ছিলো গোরস্থানের পাশে। আসেপাশে আর বাড়ি ছিলো না। সস্তা পেয়ে এই বিল্ডিংয়ের দোতলা ভাড়া নিলেন এক শিক্ষিত ভদ্রলোক। এক রাতে এক একা ভালো লাগছিলো না তার। সিদ্ধান্ত নিলেন তৃতীয় তলার ভদ্রলোকের সাথে কিছুক্ষণ আলাপ করে আসা যাক। তাই, টিপ টিপ করে সিড়ি বেয়ে তৃতীয় তলায় উঠে বেল টিপ দিলেন। শীর্ণকায় লম্বা এক ভদ্রলোক দরজা খুলে দিয়ে বসতে দিলেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর লক্ষ্য কিরলেন ভদ্রলোকের হাতের আঙুলগুলো অত্যধিক লম্বা এবং গলাও বেশ লম্বা। তাকে ভুত বলে সন্দেহ হলো। জিজ্ঞেস করলেন “আচ্ছা ভাই, আপনি কি ভুত আছে বলে বিশ্বাস করেন?” উপর তলার সেই লোকটি জবাব দিলেন “মরার আগে বিশ্বাস করতাম না। এখন করি।” শুনে নিচ তলার লোকটির ভয়ে শরীম হীম হয়ে এলো। তারাতাড়ি কথা সেরে চলে এলেন।

 

আমি ক্লাসে গল্পের সাথে পড়া মিলিয়ে ছাত্রদেরকে শেখাতে চেষ্টা করি। ফলো করেছিলাম আবু আহমেদ স্যারকে।

আপনি বিরক্ত হচ্ছেন, হক স্যারের কথা লিখতে গিয়ে এসব কী লিখছি। আসছি এখন হক স্যারের কথায়। আজ হয়তো হক স্যারের কথা আপনার কাছে ভালো লাগবে না। আসলে হক স্যারের আমি প্রথম দিকে শুধু বাইরেরটাই দেখছিলাম। তাই প্রথম দিকে তিনি আমার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কেউ ছিলেন না। অনেক বছর পর যখন আমি হক স্যারের ভেতরের জিনিস আবিস্কার করলাম তখন থেকে আমি জানি স্যার একজন অসাধারণ মানুষ। সেই সময় টুপিওয়ালা স্যার মাত্র দু’জনই ছিলেন। দু’জন আবার দূরকম। একজন হলেন ফিজিওলজির দাদু স্যার আরেকজন হলেন প্যাথলজির হক স্যার।দাদু স্যারের নাম খুব সম্ভব ডাঃ আমিনুল ইসলাম ছিলো। দাদু স্যারের গালে লম্বা সাদা চাপ দাড়ি ছিলো। লম্বা জুব্বা পরতেন। বয়স্ক দাদাদের মতো করে কথা বলতেন। তাই, ছাত্ররা দাদু স্যার বলত। দাদু স্যার বলতে বলতে স্যারের আসল নামটি ভুলে গেছি হয়তো । হক স্যার টুপি মাথায় দিতেন, কিন্তু শার্ট পরতেন। হক স্যারের টুপির ধরনটি অনেকটা ডাঃ জাকির নায়েকের টুপির মতো গোল। স্যার মাথার চুল সবসময় চেঁছে রাখতেন। তাতে মাথার সাথে টুপি লেপটিয়ে থাকতো। চুল না থাকায় টুপিটি সহজেই মাথার উপর ঘুরানো যেতো। আমি যতদিন ছাত্র ছিলাম ততদিন স্যারের দাড়ি ছিলো না। দাড়ি রেখেছেন পরে। স্যারের চোখের উপর ভ্রু কম ছিলো। স্যার একটি বিশেষ ধরনের শার্ট গায় দিতেন। সাভাবিকের চেয়ে একটু লম্বা শার্ট। শার্টের কলারও ছিলো সাভাবিকের চেয়ে বেশ লম্বা। শার্টের রঙ ছিলো সাদাটে। আমরা অফ হোয়াইট বলতে পারি। মোটা কাপড়ের শার্ট ছিলো। ছেড়ার কথা না সহজে। আমি এক যুগ ধরে একই অথবা একই রকম শার্ট দেখেছি। একই রকম শার্ট কয়েকটি ছিলো কি না আমি জানি না। আমার কাছে মনে হতো একই। পাজামা, না ফুল প্যান্ট পরতেন তা বুঝা যেতোনা। মোটা অফ হোয়াইট কাপরের এক ধরনের ফুল প্যান্ট পরতেন শার্টের নিচ দিয়ে টাকনুর উপর পর্যন্ত। ফিতাবিহীন শু পরতেন পায়। হাটতেন সামনের ৪-৫ ফুট মাটির দিকে তাকিয়ে । স্যারকে প্রাইভেট কারে চড়তে দেখিনি। স্যারের স্ত্রী ডাঃ বীণা হক ম্যাডাম ছিলেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ। তাকে আমি সবসময় প্রাইভেট কারে চলাফেরা করতে দেখেছি। স্যারকে রিক্সায় উঠতেও দেখিনি। চরপাড়ায় রাস্তা দিয়ে দু’হাতে ভারী ভারী বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাসার দিকে হেটে যেতে দেখেছি। আমি একদিন একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম হক স্যার নিজের জন্য গাড়ি কেনেন না কেনো। উত্তরে জানতে পেলাম তিনি গাড়িতে চলা পছন্দ করেন না। আমেরিকা প্রবাসী তার বুয়েট থেকে পাস করা ইঞ্জিনিয়ার ছেলে দেশে এসে স্যারের জন্য একটি কার কিনে দিয়ে যান। স্যার সেটা ব্যবহার না করে জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসায় দান করে দেন। জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার মাঠে একটি টীন সেডে প্রাইভেট কার দেখেছি। খুব সম্ভব ওটাই হবে।

 

দোতলায় প্যাথলজি ডিপার্টমেন্ট। সিড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে এসে ক্লাসের মঞ্চে এসে নিঃশ্বাস ছাড়তেন। খুব সিরিয়াস হয়ে পড়ানো শুরু করতেন। যা বলতেন সবই যেনো গুরুত্বপূর্ণ। মানে প্যাথলজির কোন কিছুই বাদ দেয়া যাবে না। সবাই নিরব হয়ে স্যারের লেকচার শুনতাম। স্যারের টেবিলের সামনে বিদেশি বিরাট টেক্সট বই খোলা রাখতেন। কিছুক্ষণ পর পর বইয়ের দিকে চোখ দিতেন। ডান হাতে চক আর বাম হাতে ডাস্টার ধরা থাকতো। কথা বলার সময় ডান হাত ঘুরাতেন। চট করে ব্লাকবোর্ডে গিয়ে কিছু লিখতেন। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতেন কাউকে নির্দিষ্ট না করে। কেউ উত্তর দিয়ে দিলে গুড বলে আবার শুরু করতেন। কেউ উত্তর না দিলে বলতেন “এই লিসান জামিল কই? লিসান বলো।” অথবা “দীপক কুমার ধর বলো।” দীপক আমাদের মধ্যে সবসময় ফার্স্ট হতো । লিসান জামিল সেকেন্ড হয়েছিল। তারপরই ছিল মিজানুর রহমান স্বপন। শেষের দিকে স্বপন সেকেন্ড হতো। আমি ওদের মতো না হলেও ৮ম, ৯ম অথবা ১০ম অবস্থানেই সাধারণত থাকতাম। বেশী ভালো ভালো না। সেই ভালো ছাত্ররা মাতৃভূমি ছেড়ে চলে গেছেন সুখের দেশে। এদেশ তাদের চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। হক স্যারও বিদেশে গিয়েছিলেন উচ্চ শিক্ষা অর্জন করতে। ফিরে এসে দেশের সেবাই করেছেন। কিন্তু স্যার তার ইঞ্জিনিয়ার ছেলেকে দেশে রাখতে পারেননি। যাহোক, যখন স্যার যা পড়াতেন তাকেই বলতেন ভেরি ভেরি ইমপোর্টেন্ট। তিন বার করে বলতেন ভেরি ভেরি ইমপোর্টেন্ট। বলার সময় প্রত্যেকবার মাথার টুপি ঘুরাতেন। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে তিনি লোবার নিউমোনিয়া চারটি স্টেজ বলার সময় চার বার টুপি ঘুরিয়েছিলেন। বলছিলেন, লোবার নিউমোনিয়ার চারটি স্টেজ আছে – স্টেজ অব কঞ্জেশন, স্টেজ অব রেড হেপাটাইজেশন, স্টেজ অব গ্রে হেপাটসিজেশন অ্যান্ড স্টেজ অব রেজুলুশন। হক স্যার বাংলা ও ইংরেজি সংমিশ্রণ করে পড়াতেন। তাই ভালো বুঝতে পারতাম। আমি স্যারের এই বৈশিষ্ট্যটা অনুসরণ করে ক্লাস নেই। আমি আরেকটা ব্যাপারে স্যারকে অনুসরণ করি। সেটা হলো আমি ঠিক সময়ে ক্লাসে উপস্থিত হই। স্যার কোনদিন ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতেন না। আমিও কোনদিন ক্লাসে অনপস্থিত থাকি না, একান্ত জরুরি অবস্থা ব্যাতিরেকে। ছাত্রাবস্থায় স্যারের ভেতরের মহত্ব আবিস্কার করার মত জ্ঞান আমার ছিলো না। ছাত্রাবস্থায় স্যার আমার সাথে কয়কবার দুরব্যাবহার করেছিলেন বলে মন থেকে স্যারকে কম পছন্দ করতাম। পছন্দ করা শুরু করলাম সেদিন থেকে যেদিন থেকে স্যারের ভেতরের জিনিসটা আবিস্কার করতে পারলাম। সে কথা পরে লিখবো।

১৬/১২/২০২০

ময়মনসিংহ
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/





 

শৈশবের একাত্তর

বইয়ের নামঃ শৈশব একাত্তর

লেখকঃ ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্রকাশকঃ বাংলানামা

পৃষ্ঠাঃ ৩৮

কভারঃ হার্ড

মূল্যঃ ১৫০ টাকা

বিবরণঃ

শৈশব একাত্তর একটি স্মৃতিকথার কথা সাহিত্যের বই। লেখক ১৯৭১ সনের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ৫ম শ্রেণীতে পড়তেন। সেই সময়ের স্মৃতিকথা লিখেছেন এই বইয়ে । মুক্তিযুদ্ধের সময়ের বাস্তব কথা কার না শুনতে ইচ্ছে হয়?

পাওয়ার উপায়ঃ

১। নিকটস্থ লাইব্রেরি।

২। অনলাইন শপ (লেখকের নিয়ন্ত্রণে): www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

৩। অনলাইন শপ (প্রকাশকের নিয়ন্ত্রণে):  www.rokomari.com

৪। কুরিয়ার সার্ভিসেঃ মোবাইল নম্বর 01711683046 তে অর্ডার করে।

৫। সরাসরি লেখকের চেম্বারের সহকারীর কাছ থেকে।

সোনালি শৈশব

বইয়ের নামঃ সোনালি শৈশব

লেখকঃ ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্রকাশকঃ ছায়াবীথি

পৃষ্ঠাঃ ১৪৪

কভারঃ হার্ড

মূল্যঃ ২৫০ টাকা

বিবরণঃ

সোনালি শৈশব  একটি স্মৃতিকথার কথা সাহিত্যের বই। লেখক অতীতের গ্রাম বাংলার প্রকৃতি, পরিবেশ, মানুষ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ইত্যাদি  মজার  মজার মজার কথা দিয়ে এই বইয়ে তুলে ধরেছেন।

পাওয়ার উপায়ঃ

১। নিকটস্থ লাইব্রেরি।

২। অনলাইন শপ (লেখকের নিয়ন্ত্রণে): www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

৩। অনলাইন শপ (প্রকাশকের নিয়ন্ত্রণে):  www.rokomari.com

৪। কুরিয়ার সার্ভিসেঃ মোবাইল নম্বর 01711683046 তে অর্ডার করে।

৫। সরাসরি লেখকের চেম্বারের সহকারীর কাছ থেকে।