বউ শাশুড়ি

বউ শাশুড়ি

(ছোট গল্প)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

আজকেও বাসায় ফেরার সাথে সাথে ডাঃ হুমায়ুনের কাছে তার মা তার বইয়ের বিরুদ্ধে নালিশ দিয়ে বসলো। এটা তার একটা বদভ্যাস। ছেলের বউয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা করে রাখবেন। হুমায়ুন বাসায় ফেরার সাথে সাথে অভিযোগগুলো ক্রমাগত উপস্থাপন করতে থাকবেন। ডাঃ হুমায়ুনের স্ত্রীও তাই করেন। শাশুড়ির বিরুদ্ধে যত অভিযোগ জমা করে রাখেন। মায়ের অভিযোগ পেশ করা শেষ হবার সাথে সাথে তার জমা করা অভিযোগগুলো একে একে পেশ করতে থাকেন। ডাঃ হুমায়ূন শিশু সার্জারীতে বিশেষজ্ঞ সার্জন। এম এস (শিশু সার্জারি) পাস করেছেন। বর্তমানে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চাকরিরত আছেন। দুপুরের খাবার ক্যানটিনেই সেড়ে নেন। আড়াইটা পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে কাজ করে সরাসরি চলে যান প্রাইভেট ক্লিনিকে অপারেশন করতে। তারপর বসেন প্রাইভেট চেম্বারে। রাত অবদি রোগী দেখে আবার চলে যান প্রাইভেট ক্লিনিকে অপারেশন করতে। রাত ৯ টা বা ১০ টার দিকে বাসায় ফেরেন। শরীর ক্লান্ত হয়ে থাকে সারাদিন পরিশ্রম করার পর। মনে চায় বাসায় প্রবেশ করে বিশ্রাম নেবেন। বাসার সবাই তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবে। বউ বাসায় গেলেই তার যত্ন নেবে। কিন্তু ডাঃ হুমায়ুনের সেই সুখ নেই। প্রত্যেক দিন কিছু না কিছু মা ও স্ত্রী একে অপরের বিরোধ্যে অভিযোগ দেবেনই। মা অভিযোগ করেন

– তুই ত সারাদিন বাইরে বাইরে থাকস। দুপুরেও বাসায় আসস না। তোর বউ সারাক্ষণ জানি কার সাথে মোবাইলে কথা কয়। মোবাইলে কথা কইতে টাকা খরচ হয় না? দিনের বেলায়ও লাইট নিভায় না। সারাক্ষণ লাইট জ্বলতে থাকে। এই জন্যই মাসের শেষে কারেন্ট বিল বেশী আসে। খালি বাপের বাড়ির দিকে টাইনা কথা কয়। কিছু কইলেই তালুকদার বাড়ির মেয়া বলে টেউ দেখায়। আমিও খোনকার বাড়ির মেয়া। তালুকদার বাড়ির মেয়ার তাবে থাকি না। নাতী ছেড়াডারে স্কুলে নিয়া গিয়া বাইরে থেকে কি জানি ছাই খাইয়া আইছে। পঁচা ঢেঁকুর পারতাছে। ঢেঁকুরের দুর্গন্ধে রান্নাঘরে যাওয়া যায় না। আমি কইছি বউয়ের গ্যাস্টিক হইছে। বউ কই কী, গ্যাস্টিক নামে কোন রোগ নাই। আমার মুখের উপর কথা? তুই নাকি কইছস গ্যাস্টিক নামে কোন রোগ নাই? বউ কইল।

– আসলে আমাদের চিকিৎসা বিদ্যায় গ্যাস্টিক বলতে কোন রোগ নেই।

– ক্যারা কইছে গ্যাস্টিক নামে কোন রোগ নাই? সারাদেশের মানুষ গ্যাস্টিকে ভোগতাছে। আর তুই ডাক্তার অইয়া কইতাছস গ্যাস্টিক নামে কোন রোগ নাই। তোর বউ কয় কি, গ্যাসটিক না, গ্যাট্রাইটিস।

বউ পেছন থেকে বলে উঠলেন “তুমিই ত বলেছ, গ্যাস্ট্রিক বলতে কোন রোগ নেই। গ্যাস্ট্রাইটিস, গ্যাস্ট্রিক আলসার এগুলোকে লোকে গ্যাস্ট্রিক বলে।

শাশুড়ি বললেন “তোমরা আমার চেয়ে বেশী বুঝ? পেটের নাইয়ের গোড়ায় ব্যাথা হ’লে বলে পেটের আলসার। আর পেটে গ্যাস হ’লে বলে গ্যাস্টিক।

ডাঃ হুমায়ুন শুধু নিরপেক্ষ একটা শব্দ উচ্চারণ করলেন “অইত্ত।” তিনি কখনো মা ও বউয়ের সাথে তর্কে যান না। কারো পক্ষ নিয়েও কথা বলেন না। ইতিপূর্বে বলে দেখেছেন তাতে বাসায় অশান্তি বেড়ে যায়। এই বয়সে মা ও স্ত্রীকে জ্ঞান দেয়া যায় না। বাসায় এসে শান্ত থাকলেই শান্তি। হুমায়ুন ওয়াস রুমে চলে গেলেন। শাশুড়ি বউকে বললেন

– সারাদিন পরিশ্রম করে পোলাডা বাড়ি আইলো, তারে শান্তি দিলা না। আসার সাথে সাথে এটা সেটা বলা শুরু করলা। যাও টেবিলে খাওন দেও গা।

– আপনেই ত আগে আগে গিয়ে আমার বিরুদ্ধে নালিশ করলেন।

– যাও। আমার মুখে মুখে তর্ক করবা না। আমি খোনকার বাড়ির মেয়া।

– আমিও তালুকদার বাড়ির মেয়ে। এত অবহেলা করা যাবে না।

– হইছে। খাবার বারো গা।

বউ-শাশুড়ি মিলে-মিশেই রান্না বান্না করেন। ডাঃ হুমায়ুনের পছন্দের খাবার সাধারণত রান্না করেন। ওয়াসরুমের কাজ শেষ করে হুমায়ুন আনিকা ও অনিককে ডেকে নিয়ে টেবিলে খেতে বসলেন। আনিকা হুমায়ুনের মেয়ে। বয়স ৯ বছর। অনিক হুমায়ুনের ছেলে। ওর বয়স ৭ বছর। বাসার সবাই মিলে একসাথে খেলেন।

হুমায়ুন মাকে বললেন “মা, তোমরা বসে টিভি দেখো আমি আনিকা-অনিকের সাথে গল্প করি।” অনেক বাবাই বাসায় ফিরে সন্তানদের কাছে যান পড়া লেখা যতদুর করেছে তার ফিরিস্তি নিতে। হুমায়ুন তা করেন না। পড়ালেখার ভার তার স্ত্রী ও টিউটরদের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। ছেলে মেয়েরা দুষ্টুমি করা শুরু করলে অথবা কোন কিছু নিয়ে বাহানা করলে অথবা টিভি দেখাতে ডিস্টার্ব করলে অনেক মা-ই সন্তানদেরকে শাস্তি হিসাবে পড়তে বসতে বলেন। হুমায়ুন তার স্ত্রীকে বলে দিয়েছেন এমন না করতে। তার যুক্তি হলো “পড়তে বসাকে শাস্তি হিসাবে গণ্য করা যাবে না। সন্তানরা যেনো বুঝে না নেয় যে পড়তে বসা একটা শাস্তি। তার মতে পড়তে বসা হলো একটা আনন্দের ব্যাপার। হুমায়ুন সন্তান্দেরকে বেশীক্ষণ সময় দিতে পারেন না। তাই অল্প সময় যা পান তা যেনো সন্তানরা উপভোগ করতে পারে। তাই তাদের নিয়ে গল্প করেন, মজা করেন। শাশন ও আদরের ভার তিনি স্ত্রীর উপর ছেড়ে দিয়েছেন। সন্তানদের জন্য তিনি স্কুল শিক্ষক টিউটর হিসাবে রাখেননি। অনার্স পড়ুয়া মেধাবী ছাত্রদেরকে আর্থিক সুবিধা দেয়ার চিন্তা করেই সন্তানদের জন্য চার বিষয়ে চারজন ছাত্রকে টিউটর হিসাবে রেখেছেন। তারা বাসায় এসে পড়িয়ে যায়। তাদেরকে ভালো চা নাস্তার ব্যবস্থা করাতেও পরামর্শ দিয়েছেন স্ত্রীকে। বাংলা, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের টিউটর সবার খামেই মাস শেষে চার হাজার করে টাকা দেন নিজ হাতে টিউটরদেরকে। খাম হাতে দিয়ে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানান। ক্লাশে আরবী ও কোর আন শিক্ষার বিষয়ও আছে। স্ত্রী একদিন হুমায়ুনকে বললেন ” একজন আরবি পড়ানোর টিউটর পাওয়া গেছে আরবিতে অনার্স পড়ুয়া। বেতন বেশী দিতে হবে না। মাসে দু’হাজার টাকা। অনিকের বন্ধুকেও পড়ায় সেই চছেলেটা। খুব ভদ্র ছেলে, দরীদ্র।” তাকেও টিউটির হিসাবে রাখা হলো। হমায়ুন ভাবলেন “অন্যসব টিউটর অনার্স পড়ুয়া, দেয়া হয় চারহাজার টাকা করে। আরবির টিউটরও অনার্স পড়ুয়া। তাকে মাত্র দু’হাজার টাকা দিয়ে ঠকাব কেন?” দেয়ার সময় তার খামেও চারহাজার টাকা ভরে দিলেন। আরবির টিউটর হোস্টেলে ফিরে খাম খুলে দেখে চারহাজার টাকা। পরদিন ডাক্তার সাবকে অতিরিক্ত দুইহাজার টাকা ফেরত দিয়ে বলে “স্যার, ভুল করে আপনি খামে দু’হাজার স্থলে চারহাজার দিয়েছেন।” ডাক্তার হুমায়ুন বলেন “ভুল করে নয়। এটাই তোমার প্রাপ্য।” এরপর থেকে রেগুলার চারহাজার টাকা করেই পেতে থাকেন আরবির টিউটর। একবার মাসের প্রথম সপ্তাহে ডাঃ হুমায়ুন এক্সটার্নাল এক্সামিনার হিসাবে খুলনা মেডিকেল কলেজে পরীক্ষা নিতে যান সাত দিনের জন্য। আরবির টিউটর অনিকের মাকে বলল

– ম্যাডাম, কী বলবো, বলতে লজ্জা পাচ্ছি, ডাইনিংএর বিল বকেয়া পড়েছে। স্যারও নাই। আমার গত মাসের খামটা দেয়া হয়নি।

– ও সরি, ওকে, নো প্রোবলেম। এখনি দিয়ে দিচ্ছি। একটু বসো।

অনিকের মা একটা খামে দুইহাজার টাকা ভরে আরবির টিউটরের হাতে দিলেন। হোস্টেলে গিয়ে খুলে দেখেন মাত্র দুইহাজার টাকা। পরের দিন আবার পড়াতে এসে আরবির টিউটর বলে

– ম্যাডাম, কী বলবো, আপনি মনে হয় ভুল করে চারহাজার স্থলে দুইহাজার টাকা ভরেছিলেন খামে।

– কেনো, ভুল করবো কেনো? তোমাকে তো দুইহাজার টাকা দেয়ারই কথা। আমার সাথেই ত কথা হয়েছিলো তোমার।

– তা হয়েছিলো। তবে স্যার আমাকে প্রথম থেকেই চারহাজার করে দিয়ে যাচ্ছেন তো, তাই।

– আসলে আমি তা জানতাম না। ওকে, নো প্রোবলেম। আমি এখনই দিয়ে দিচ্ছি আরও দুই হাজার।

এমন দয়ার মন ডাক্তার হমায়ুনের। চাইল্ড বেডরুমে গিয়ে বাচ্চাদের সাথে নিয়ে শুয়ে শুয়ে গল্প করার জন্য প্রবেশ করলেন হুমায়ুন। আনিকা ও অনিক হুমায়ুনের দুপাশে শু’লো। আনিকা বলল

– বাবা, তুমি হাসপাতালে কী করো?

– আমি শিশুদের অপারেশন করি।

– কী অপারেশন করো?

– অনেক ধরনের অপারেশন করি। কোন কোন শিশু মায়ের গর্ভ থেকেই পায়খানার রাস্তা বন্ধ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। পায়খানা করতে না পেরে তিন চার দিন পরই শিশুটি মারা যেতে পারে। আমি অপারেশন করে পায়খানার রাস্তা বানিয়ে দেই। বাচ্চা বেঁচে যায়। বাচ্চার বাবা মা খুশী হয়। আরও অনেক ধরনের সমস্যা বাচ্চাদের হয়। সেগুলোর অপারেশন করে আমি বাচ্চা বেঁচে যাওয়ার ব্যবস্থা আমি করে দেই আল্লাহর রহমতে। প্রতিদিন এমন অনেক বাবা মা দাদা দাদীকে খুশী করে ক্লান্ত হয়ে আমি বাসায় ফিরি।

– বাবা, তোমার জন্য আমার খুব কষ্ট হয়। তুমি সারাদিন কষ্ট করে ক্লান্ত হয়ে রাতে বাসায় ফেরো। আর দাদী ও আম্মু তোমার কাছে হাজারো নালিশ দিতে থাকে। ওনারা এমনটা না করলেও তো পারতেন। শুধু শুধু হালকা ব্যাপার নিয়ে তোমাকে বিরক্ত করে। আচ্ছা বাবা, যে সব বৃদ্ধ মহিলা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায় তারা বাসায় ঝামেলা করতো?

– তোমার মা ও দাদী দু’জনই ভালো মানুষ। তারা একে অপরকে ভালো বাসে। কিন্তু ওনাদের একটু পার্সনালিটি ডিসর্ডার আছে।

– সেটা কেমন?

– পৃথিবীতে যত মানুষ আছে একজন মানুষের চেহারাও আরেকজন মানুষের মতো না। এটা আল্লাহর একটা বিরাট মহিমা। তেমনই একজনের মনের অবস্থা আরেকজনের মনের অবস্থার মতো না। কারো ধৈর্য বেশী, কারো দৈর্য কম। আমি সারাদিন বাসায় থাকি না। তোমার আম্মু ও দাদী বাসায় থাকে। পেটে অনেক কথা জমা থাকে। আমি এলেই ছেড়ে দেয়। কথা ধরে রাখার দৈর্যগুণ তোমার আম্মুরও নেই, আমার মারও নেই। কিন্তু ওনাদের আর সব ঠিক আছে। আমি এটা বুঝতে পারি তাই দৈর্য ধরে থাকি। মা যত বিরক্তই করুক ‘উ’ শব্দটি উচ্চারণ করা যাবে না। মা আমাদের জন্য কত কষ্ট করেছেন! পিচ্ছিকালে কত অসহায় ছিলাম! একটা মশা তাড়ানোর জ্ঞানও ছিলো না। মায়ের কোলেই পেছাব পায়খানা করতাম। মা পরিস্কার না করে দিলে পঁচেগলে মরে যেতাম। মায়ের কষ্টের কথা বলে কি শেষ করা যাবে? এমন দরদী মা যত কষ্টই দিক না, একটুও বিরক্ত হবো না। যত ঝামেলাই করুক না মাকে আমি বৃদ্ধাশ্রমে দেব না।

– আমার স্কুলের এক বান্ধবির দাদী বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন। বাসায় থাকলে নাকি তাদের বাসায় খুব ঝামেলা হয়। আমাদের কী মজা! আমাদের বাসায় দাদী আছে। দাদী আমাদের কত আদর করে! দাদীর কাছে বসে থাকলে আমার মাথায় চুলের ভেতর দিয়ে আঙ্গুল চালায়। বলে নিক আইনা দেই। বলি নিক কী? নিক নাকি উকুনের ডিম। উকুন পাবো কই? আমি ত নিয়মিত শেম্পু দিয়ে গোসল করি।

– আসলে তোমার দাদী মাথায় নিক খোঁজে না। তোমার মাথায় হাত বুলাতে তার ভালো লাগে, তাই। দাদী আমার মাথায় হাত বুলালে আমারও ভালো লাগে। অনিক দাদীকে মাথায় হাত বুলাতে দেয় না। ওর কার্টুন দেখতে অসুবিধা হয়, তাই।

অনিক বলে

– আমি কার্টুন দেখি না।

হুমায়ুন বলেন

– ঠিক আছে, অনিক কার্টুন দেখে না। আনিকা, তোমরা কি মনে করো তোমার দাদী আর তোমার আম্মুর মধ্যে সম্পর্ক ভালো না? তারা কি বাসায় সারাক্ষণ ঝগড়া করে?

– না, যা কিছু বলে তুমি বাসায় এলেই বলে। সারাদিন মিলে মিশেই কাজ করেন। এক সাথে রান্না করেন। এক সাথে টিভি দেখেন।

– তোমার আম্মু আর দাদীর মধ্যে আসলে সম্পর্ক খুবই ভালো। তারা যত খারাপ কথাই বলুক না কেন তোমরা তা কানে নিবে না। এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে কথা বের করে দেবে। অনিক, তোমার সাথে আমি আগামীদিন গল্প করবো।

– তুমি না একদিন তোমার আব্বা কিভাবে মারা গেলেন বলতে চেয়েছিলে? আজকেই বলো।

– আমি যখন অনিকের বয়সের ছিলাম তখন আমার বাবা মারা যান। তোমার কাশেম চাচ্চু ছিলেন তখন আনিকার বয়সের। আমাদের বড় করতে এবং পড়ালেখা করাতে তোমার দাদীকে অনেক সংগ্রামী জীবন যাপন করতে হয়েছে। বাবা ছিলেন মস্তবড় আলেম। ইসলামী ওয়াজ মাহফিলে মস্তবড় বক্তা ছিলেন। অনেক দূর দূরান্ত থেকে দাওয়াত করে নিয়ে যেতো ওয়াজ করার জন্য। একবার সেই দক্ষিণের সাগরপাড়ের জেলা পটুয়াখালি গিয়েছিলেন ওয়াজ করতে। সেই সময় সাগরে বিরাট জলোচ্ছাস হয়ে হাজার হাজার মানুষ সাগরে ভেসে যায়। রটনা উঠেছিলো তোমার দাদাও সেই পানিতে সাগরে ভেসে গিয়ে লাশ হারিয়ে গেছে। তিনি আমাদের এলাকার বড় মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ছিলেন। মাদ্রাসার মাঠে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ বিরাট এক গায়েবানা জানাজার আয়োজন করে। গ্রামের মানুষও ঈদগাহ মাঠে বিরাট এক গায়েবানা জানাজা পড়ে। আরেকটা জায়গায় আরেকটা গায়েবানা জানাজা হয়েছিল। তার অসংখ্য ভক্ত ছিলো। তাই এতবার জানাজা হয়েছে। খোদার কি কাম, পরের দিন ভোরে বাবা বাড়ি এসে হাজির। খবর শুনে অনেক মানুষ বাবাকে দেখতে এলেন। তারা বলাবলি করছিলেন, মাওলানা সাব, আপনি না মারা গেছেন? আমরা তিনবার আপনার জানাজা পড়েছি। হাজার হাজার মানুষ জানাজায় আপনার জন্য বেহেস্ত বাসীর জন্য দোয়া করা হয়েছে। এসব কথা শুনে বাবার মন ভেঙ্গে পড়ে। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অল্পদিন পারেই ইন্তেকাল করেন। আরও অনেক ঘটনা, সেসব আরেকদিন বলবো। এখন ঘুমিয়ে পড়। আমি তোমার আম্মুকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমি মার কাছে যাই।

হুমায়ুনের স্ত্রী বাচ্চাদের ঘুম আনিয়ে নিজ ঘরে চলে আসেন শাশুড়িকে ঘুমিয়ে পড়তে বলে। শুয়ে শুয়ে হুমায়ুনের সাথে কথা বলেন আর কিছুক্ষণ পরপর বাথরুমে যান। হুমায়ুন জিগেস করেন

– তুমি এত ঘন ঘন বাথরুমে যাচ্ছ কেন?

– পঁচা ঢেঁকুর উঠতাছে। ঢেকুরের গ্যাস খুবই দুর্গন্ধ। রুমে ঢেকুর দিলে থাকতে পারবা না।

– কী খেয়েছিলে দুপুরে?

– কী জানি নিয়ে এনেছিলেন হ্যাপি ভাবি। সবাইকে দিলেন। আমি খেলাম। মনে হয় বদ হজম হচ্ছে। বমি করতে পারলে বাঁচি।

– দুটো এন্টাসিড ট্যাবলেট চিবিয়ে খেয়ে ফেলো।

এভাবে কিছুক্ষণ জেগে জেগে কথা বলার পর উভয়েই ঘুমিয়ে পড়েন। ডাঃ হুমায়ুন পরের দিন যথারীতি হাসাপাতাল ও চেম্বার করে রাতে বাসায় ফিরে দেখেন অবাক কান্ড। আজ আর কারও অভিযোগ নেই। দড়জা খুলে দিয়েছে আজ আনিকা। “মা কোথায়” জিজ্ঞেস করাতে আনিকা তার মায়ের ঘরে নিয়ে গেলেন। অনিকও এলো। তিন জন দড়জায় দাড়িয়ে যা দেখলেন তা হলো হুমায়ুনের বউ পেট খারাপ হয়ে পানির মতো পাতলা পায়খানা হচ্ছে। দুর্বল হয়ে তিনি বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না। পাতলা পায়খানা বিছানার চাদর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে। সেই পায়খানা হুমায়ুনের মা পুরান কাপড় দিয়ে মুছতেছেন। এই দৃশ্য দেখে হুমায়ুন আনিকা ও অনিককে একটু সরিয়ে নিয়ে নিচু স্বরে বললেন “এই দৃশ্য দেখার পর কি বুঝতে পেরেছ যে তোমার দাদী তোমার মাকে কত ভালো বাসেন? অবশ্যই আমার মা তোমার মাকে নিজের মেয়ের মতো করে স্নেহ ও যত্ন করেন।”

১২/৩/২০২১

ময়মনসিংহ
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 4.00 out of 5)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/





 

মা বউ সন্তান

মা বউ সন্তান

(ছোট গল্প)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

দোতলায় উঠে দরজার সামনে এসে মানিক মাস্কটার বাম ফিতা কান থেকে খুলে ফেললেন। তাতে ওটা ডান কানে ঝুলতে লাগলো। মানিক হাত ঘড়িতে লক্ষ্য করলেন রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে। কলিং বেল টিপ দিলে মানিকের বউ মণিকা দরজা খুলে দিলেন। মণিকা মানিকের চোখের দিকে তাকিয়ে মুসকি হাসলেন। দেখলেন চোখের নিচে মাস্কের চাপ খেয়ে কেমন দাগ পড়ে গেছে। সেই সকাল থেকে মাস্ক পরে আছে ডাঃ মানিক। তিনি শিশু রোগ বিদ্যায় এম ডি পাস করে শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হয়েছেন। সরকারি হাসপাতালে চাকরি করেন। আবার বিকেলে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বসে প্রাইভেট প্রাক্টিস করেন। এম বি বি এস পাস করার পর থেকে এম ডি পাস করার আগ পর্যন্ত তিনি প্রাক্টিস করেননি। এরই মইধ্যে ফ্যামিলি কম্পলিট হয়ে গেছে। দুই ছেলের বাবা হয়েছেন। বড় ছেলের বয়স ৫ বছর, নাম রেখেছেন সৌরভ। ছোট ছেলের বয়স ৩ বছর, নাম রেখেছেন গৌরব। মানিকের কাছে মনে হয় ছেলেদের মুখের আকৃতি হয়েছে ট্রাম্পের মুখের আকৃতির মতো। মানিকের মা বলেন মানিকের মুখও ছোট বেলায় সৌরভ গৌরবের মতোই ছিলো। আসলে ট্রাম্পের মুখের আকৃতিটাই হলো শিশুদের মুখের আকৃতির মতো। তাই সৌরভ গৌরব ও মানিকের বেলাও এমন হয়েছে।

করোনা রোগের কোভিড-১৯ টিকার এক ডোজ নেয়ার পর থেকে ডাঃ মানিকের সাহস একটু বেরে গেছে। এখন তিনি নিয়মিত হাসপাতালে যান এবং প্রাইভেট প্রাক্টিস করেন। ডাঃ মানিক মাস্ক পরলেও তার রোগীরা অধিকাংশ মাস্ক পরে না। তাই মানিকের যত ভয়। ডান কান থেকে অপর ফিতাটি খুলে মাস্কটি ডাস্টবিনে ফেলে দিলেন। সোজা ঢুকে পরলেন ওয়াসরুমে। মণিকা লিভিং রুমে বসে গেলেন স্টার জলসার প্রোগ্রামের বাকী টুকু দেখে নিতে। মানিক ফ্রেস হয়ে প্রবেশ করলেন মায়ের রুমে। মা ঈশার নামাজ শেষ করে কিছুক্ষণ তাসবী জপছিলেন। এখন খাটে উচু বালিশে মাথা রেখে বই পড়ছেন। প্রবেশ করে মানিক বললেন

– মা, কী বই পড়ছ?

– বইয়ের নাম শৈশবের একাত্তর।

– একাত্তর আবার শৈশবের হয় কেমনে?

– লেখক একাত্তুরের স্মৃতি কথা লিখেছেন। তিনি তখন ক্লাস ফাইভে পড়তেন। তাই নাম দিয়েছেন শৈশবের একাত্তর।

– সত্য কথা লিখেছেন তো?

– সরলভাবে সত্য কথাই লিখেছেন। যা দেখেছেন, তাই লিখেছেন। ভালোই লাগে পড়তে। তুমি পড়ে দেখতে পারো।

– আমার কি সাহিত্যের বই পড়ার সময় আছে? মেডিকেলের বই পড়তে পড়তেই জান শেষ।

এভাবে আলাপ করে কেটে গেলো প্রায় বিশ পঁচিশ মিনিট।

ওদিকে মণিকা ডাইনিং টেবিলে খাবার রেডি করে ডাক দিলেন “মা, খেতে আসুন।” মা বললেন “চল্ , মানিক, খেয়ে নেই।” মানিক নাম মা-ই রেখেছিলেন। মানিক হলো খুবই দামী পাথর। মণি পাথর থেকেও দামী। মণি পাথর তৈরি হয় সাপের মাথায়। আর মানিক পাথর তৈরি হয় বেঙের মাথায়। মানিক ডাইনিং টেবিলে বসার আগে প্রবেশ করলেন চাইল্ড বেড রুমে। সৌরভ-গৌরভ মশারির নিচে ঘুমিয়ে পড়েছে পাশাপাশি বালিশে। গৌরবের ডান পা-টা সৌরভের হাটুর উপর রেখে ঘুমিয়েছে। সৌরভের চুলগুলো মোটা মোটা খারা খারা। মানিকের মতোই। গৌরবের চুলগুলো পাতলা লেপ্টানো। ঘুমন্ত সন্তানদের মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন মানিক। তিনি সকালেও সন্তানদেরকে এভাবে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখেই হাসপাতালে গিয়েছিলেন। আগামীকাল হাসপাতালে যাওয়ার সময়ও হয়তো এভাবেই ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে যেতে হবে। শুক্রবার ডাঃ মানিক হাসপাতালে যান না। চেম্বারও করেন না। সকালে কিছুক্ষণ বাজার করার জন্য বাইরে যান। তাছাড়া সারাক্ষণই পরিবারের সাথে সময় কাটান। সৌরভ-গৌরবের সাথে ছোট মানুষের মতো হয়ে খেলা করেন। দু’জনের মাথা দু’বাহুতে রেখে শুয়ে শুয়ে গল্প করেন। মোবাইলে কার্টুন দেখান। কোন কোন সময় গল্প শুনতে শুনতে গৌরব মানিকের নরম পেটের উপর ঘুমিয়ে পড়ে। অনেকেই শুক্রবার প্রাক্টিস করতে মফস্বল শহরে চলে যান। মানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি তা করবেন না। তিনি সপ্তাহে একটা দিন পুরাপুরি পরিবারের সাথে কাটাবেন। গফরগাঁও থেকে একটা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন ডাঃ মানিক যেন তাদের সেন্টারে শুক্রবার বসেন। তাদের গাড়ি দিয়েই ময়মনসিংহ থেকে গফরগাঁও আনা নেয়া করবেন এবং পারিশ্রমিকটাও পুশিয়ে দিবেন। পরিবারের কথা চিন্তা করে মানিক সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন।

মানিক খাবারের টেবিলে বসলেন। মা বললেন

– বাবা, মানিক, বিকেলের প্রাক্টিসটা বাদ দিতে পারনা? নাতি ছেড়াগুলার সাথে তো তোমার কথাই হয় না শুক্রবার ছাড়া।

– মা, তোমাদের দোয়ায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হয়েছি। প্রাক্টিস বাদ দিলে চলবে। চেম্বারে ৪০-৫০ জন করে রোগী আসে মা-বাবার সাথে। তারা সবাই আমাদের সৌরভ-গৌরবের মতো শিশু। তারা অসুস্থ হলে তো তোমার মানিকের কাছেই আসবে। তাদেরকে সুস্থ না করে আমি কি ঘরে বসে থাকতে পারি? সৌরভ-গৌরব অসুস্থ হলে আমার যেমন কষ্ট হয় অন্যের বাচ্চা অসুস্থ হয়ে আমার চেম্বারে এলেও আমার কষ্ট হয়। চিকিৎসায় যখন তারা সুস্থ হয়ে উঠে তখন আমারও আনন্দ লাগে।

– তুই ডাক্তার হলে কী হবে, আমার বাতের চিকিৎসাই ত করতে পারস্ না।

– মা, তুমি তো আমাদের বড় শিশু। আমি বড় শিশুর ডাক্তার না। তোমার বাতের চিকিৎসা ত ডাঃ আজিজ ভাই-ই করছে। আবার আজিজ ভাইর বাচ্চার চিকিৎসা করছি আমি। তোমার চিকিৎসা হলেই হলো।

রাতের খাবার শেষ করে মানিক তার বেড রুমে গেলেন। মাও তার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। মণিকা শোবার আগে সৌরভ-গৌরবের মুখদু’টি কিছুক্ষণ চেয়ে চেয়ে দেখে তার রুমে শুতে এলেন।

মানিক মণিকাকে বললেন

-আমি রাতে বাসায় এসে প্রথমেই মা-র রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ সময় দেই। তোমার রুমে আসি সবার পরে। এতে তোমার কোন অভিযোগ নেই?

– অভিযোগ থাকবে কেনো? আমার বাবাকেও আমি তাই করতে দেখেছি। মায়ের অধিকার সবার আগে। আমি আমার সৌরভ -গৌরবের জন্য কত কী করি। মাও তোমার জন্য কত কী করেছেন। কাজেই তুমি এসে প্রথমেই মায়ের কাছে যাবে, এটাই সাভাবিক। হিসাব করে দেখো, মা আজ তোমাকে পেলেন মাত্র ৩০-৪০ মিনিট। আমি পাব বাকী সারারাত। সকাল পর্যন্ত তুমি আমার কাছে থাকবে। কে বেশী সময় তোমাকে পেলো?

কিছুক্ষণ এমন মধুর মধুর কথা বলতে বলতে উভয়েই ফেইসবুকে চলে গেলেন। বন্ধুদের পোস্ট করা স্টেটাসে লাইক কমেন্ট করে একসময় ঘুমিয়ে পড়লেন।

আবার সকাল হলো। হাসপাতালে যাবার সময় হলো। রেডি হয়ে সৌরভ-গৌরভের রুমে গিয়ে দেখলেন তারা ঘুমিয়েই আছে। করোনা মহামারির কারনে স্কুল সব ছুটি। স্কুল খোলা থাকলে হয়তো আগেই ঘুম ভাঙিয়ে এদেরকে রেডি করতে হতো। স্কুল খুললেই গাড়ির প্রয়োজন পড়বে। গাড়ি কেনার জন্য মণিকাও মাঝে মাঝে তাকিদ দেন। মণিকাও চান নানিক প্রেক্টিসে বেশী সময় দিক, যাতে গাড়ি বাড়ি তারারারি হয়ে যায়। প্রাক্টিস জমেছে ভালো। প্রায় ত্রিশ লাখ টাকা জমিয়েছেন প্রাইভেট কার কেনার জন্য। প্রিমিও সিরিজের কিনবেন, না এলিওন কিনবেন এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। তার আগ পর্যন্ত রিক্সাই ভরসা। সৌরভের মুখটা উপর হয়ে আছে বালিশের উপর। ল্যাব্রা পড়ে বালিশ আঠা আঠা হয়েছে। সৌরভের এডেনয়েড টনসিল বড় হয়ে গেছে। তাই, হা করে ঘুমায়। তাতে বালিশে ল্যাব্রা পড়ে। নাক কান গলা রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ বিনয়কে দেখানো হয়েছে। অপারেশন করতে হবে এডেনয়েড টনসিল। মানিক ঘড়ি দেখলেন। সময় নেই। মার কাছ থেকে বিদায় নিলেন। মণিকা দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। মোবাইল, চশমা, মানিব্যাগ, কলম, চাবি, মাস্ক, ব্যাগ নিয়েছেন কিবা চেক করলেন। ছিটকিনি বন্ধ করে বেড রুমের বারান্দায় গিয়ে দাড়ালেন। মাও তার রুমের বারান্দায় গিয়ে দাড়িয়েছেন। দু’টি বারান্দাই পূর্ব দিকে। উভয়েই দেখলেন ডাঃ মানিক গেইট দিয়ে বের হয়ে পূর্ব দিকের রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছেন। হাটার সময় মানিকের ডান পায়ের স্টেপটা বাম পায়ের স্টেপ থেকে একটু লম্বা হয়। এমনো হতে পারে বাম পা সামান্য খাটো। তাতে অসুবিধা নেই। এভাবে হাটাতেই মানিককে আরো বেশী ভালো লাগে। রাস্তাটা ডান দিকে বাঁকা। বাঁকা অংশে প্রবেশ করতেই ডাঃ মানিক দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলেন।

৫/৩/২০২১ খ্রি.

ময়মনসিংহ

 
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 2.00 out of 5)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/