অল্প বয়সের ডাইরেক্টর

অল্প বয়সের ডাইরেক্টর

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

টাঙ্গাইলে প্রথম প্রাইভেট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা হয় শহরের আকুর টাকুর পাড়ায় পুকুর পাড়ে। শহরতলীর কাইয়া মারা নিবাসী বীমা কোম্পানির ম্যানেজার মোয়াজ্জেম হোসেন ফারুক ভাই তার নিজস্ব ভবনে স্ত্রীর নাম দিয়ে “নাহার নার্সিং হোম” নামে হাসপাতালটি শুরু করেন। পরিচালক নিয়োগ দেন তার ছোট ভাইকে এবং ম্যানেজার নিয়োগ দেন তার শ্যালককে। মেডিকেল অফিসার নিয়োগ দেন ডাঃ নুর মোহাম্মদ ভাই ও ডাঃ সালেহা আপাকে। নিজ গ্রামের গরীব প্রতিবেশীদের ছোট খাটো পদে কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করেন তার হাসপাতালে।

১৯৮৬ সনে আমি ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং শেষ করে বেকার হয়ে পড়ি। অলস বসে না থেকে প্রাইভেট প্রাক্টিশ করতে থাকি। ছয় মাস এভাবে চলার পর আমি নাহার নার্সিং হোমে চাকরি নেই মাসিক ১৮০০ টাকা বেতনে। তখন সরকারি মেডিকেল অফিসারদের বেতনও এমন ছিলো। বারতি সুবিধার মধ্যে ছিলো ফ্রি থাকার হাসপাতাল সংলগ্ন একটি বাসা। আমি আসার আগে এই বাসায় ডাঃ নূর মোহাম্মদ ভাই থাকতেন। তিনি চাকরিটা ছেড়ে দেয়ায় আমি পাই। সালেহা আপা মেটার্নিটি লিভে গেলে আমাকেই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়।

হাসপাতালে কালেকশন ভালোই ছিলো, কিন্তু প্রতি মাসেই কিছু কিছু ভর্তুকী দিতে হতো মালিককে। আয়ের বেশী অংশই কনসালটেন্ট স্যারগণ নিয়ে নিতেন। মেডিকেল অফিসাররা ঠিক সময়েই বেতন পেতেন। গরীব কর্মচারীদের বেতন দিতে একটু সমস্যা হতো। এনিয়ে ফারুক ভাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকতেন। ম্যানেজার মনখুন্য হয়ে চলে যান। পরিচালকের প্রতিও ফারুক ভাই তেমন সন্তুষ্ট না থাকলে তিনিও চলে যান। এমতাবস্থায় আমিও চাকরিটা ছেড়ে দিতে চাইলে ফারুক ভাই আমাকে অনুরোধ করলেন হাসপাতালটা টিকিয়ে রাখতে। তিনি আমাকে মেডিকেল ডাইরেক্টর হিসাবে পদন্নোতি দিলেন। আমি রয়ে গেলাম। অল্প বয়স ছিল আমার, ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং শেষ করেছি মাত্র এক বছর। ছাত্রের গন্ধও যায়নি। এই বয়সেই ডাইরেক্টর! শুনতে ভালোই লাগে!

আমি ফারুক ভাইর সাথে পরামর্শ করে জাতীয় পত্রিকায় ম্যানেজার ও রিসেপশনিস্ট নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিলাম। উপযুক্ত প্রার্থীদের যথা সময়ে সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য ডাকা হবে। ডাক যোগে অনেক দরখাস্ত জমা পড়লো। একদিন মজিদ নামে এলেঙ্গার এক ছেলে এলো রোগী দেখাতে। আলাপ সালাপে জানতে পারলাম ঢাকার সাফেনা নার্সিং হোমের একাউন্টেন্ট। ম্যানেজার নিয়োগ করা হবে শুনে সে আগ্রহ প্রকাশ করলো। সে একজন ডাক্তারের ভাতিজা। তার অমায়িক কথাবার্তায় আমার পছন্দ হলো। ঠিকানা রেখে দিলাম। ফারুক ভাই এলেন। প্রার্থীদের দরখাস্তের ফাইল চেক করা হলো। একেকজন প্রার্থী এমন বেশী যোগ্য যে আমাকে বেঁচে দিতে পারবেন। কেউ কেউ সিভিল সার্জন, সচিব, এম পি এমন প্রভাবশালী লোকের সুপারিশও জমা দিয়েছেন। দেখে ফারুক ভাই বললেন “এদেরকে দিয়ে আপনি কাজ করাতে পারবেন না। এরা বেশী যোগ্যাতাসম্পন্ন। দেখি কি করা যায়।” আমি বললাম “বিজ্ঞপ্তি দিলাম যে! ইন্টারভিউ নিতে হবে না?” তিনি হেসে বললেন “ইন্টারভিউ নেব যোগ্য প্রার্থিদের। না ডাকলে মনে করে নিবে যোগ্য নয়, তাই ডাকব না। তাছাড়া বিজ্ঞপ্তি দেয়াতে লজ যায়নি। হাসপাতালের এডভার্টাইজ হয়েছে পত্রিকায়।”

ফারুক ভাই আমাকে নিয়ে তার এক খারখানায় যাচ্ছিলেন কারখানার ম্যানেজারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে যেন টাকা পয়সা কম পড়লে সেখান থেকে নেয়া হয়। পথে একটা ছেলের সাথে দেখা। সে ফারুক ভাইকে পা ছুয়ে সালাম করে মাথা নিচু করে দাড়ালো। ফারুক ভাইর কোন আত্মীয়ের ছেলে হবে হয়তো। ফারুক ভাই জিজ্ঞেস করলেন

– তুই এখন কি করস?

– আমি বি এ পাস করে টিউশনি করছি।

– তুই আমার সাথে দেখা করিস।

আমি লক্ষ্য করলাম ছেলেটির চেহারা বেশ সুন্দর। ভদ্র নম্র প্রকৃতির। সুন্দর একটা ফুল হাতা শার্ট পরেছে, সুন্দর প্যান্ট পরেছে, সুন্দর জুতা পরেছে। সুন্দর করে চুল আচ্রিয়েছে। আমার খুব পছন্দ হলো। যেতে যেতে ফারুক ভাইকে বললাম

– ভাই, এই ছেলে তো বেকার। দেখে আমার খুব পছন্দ হলো। একে রিসেপশনিস্ট হিসাবে নেয়া যায় না?

– ঠিক বলেছেন। একেই নিয়ে নিন।

– মজিদ নামে এক ছেলে এসেছিলো। খুব ভালো মনে হলো। সাফেনা নার্সিং হোমে একাউন্টটেন্ট হিসাবে আছে। তাকে ম্যানেজার হিসাবে নিলে মনে হয় ভালোই হবে।

ফারুক ভাই বিস্তারিত শুনে তাকেও নিয়ে নেয়ার অনুমতি দিলেন। একজন সিকুরিরিটি গার্ড বদলিয়ে আমি আমার পছন্দের আরেকজন নিয়ে নিলাম। চালাতে লাগলাম হাসপাতাল। কথা কম বলি। ভারী গলায় কথা বলি ভাব নিয়ে। সবাই মানে। রাতে টেলিফোনে ফারুক ভাইর সাথে যোগাযোগ রাখি। ফারুখ ভাই পৌরসভার চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমার সাহস বেড়ে গেলো। পুরুদমে নিজের ইচ্ছামত হাসপাতাল চালাতে লাগলাম। লাভ হওয়া শুরু হলো। লাভের টাকা ফারুক ভাইর হাতে তুলে দেয়াতে অবাক হলেন। তিনি সেই টাকা থেকে আমাকে কিছু গিফট দিলেন। বাকী টাকা আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন “এই টাকা দিয়ে হাসপাতালের রিপেয়ারিং এর কাজ করবেন। আমার লাভ নিতে হবে না ।”

আমি নিয়মিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করতাম। সবাই সতস্ফুর্ত ভাবে কাজ করতো। কনসালটেন্টগণ রোগী দেখে অপারেশন করার পরামর্শ দিলে রোগীর লোকজন জানতে চাইতেন কোথায় অপারেশন করালে ভালো হয়। কনসালটেন্টগণ সরকারি হাসপাতাল ও প্রাইভেট ক্লিনিক দুটোরই অপশন দিতেন এবং ভালো মন্দ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতেন। প্রাইভেট ক্লিনিক পছন্দ করলে একটা স্লিপ ধরিয়ে দিয়ে বলতেন “এই স্লিপটা নাহার নার্সিং হোমের ডাইরেক্টরকে দিয়ে পছন্দমতো কেবিন নিয়ে ভর্তি হন। পার্টি ক্লিনিকে এসে রিসেপশনিস্টকে জিজ্ঞেস করতেন ” ডাইরেক্টর সাব আছেন?” রিসেপশনিস্ট আমার কক্ষ দেখিয়ে দিতেন। আমি রুমে বসে বসে বিসিএস পরীক্ষার গাইড বই পড়তাম। রোগীর লোক প্রবেশ করার আগেই বই ড্রয়ারে রেখে দিয়ে ভাব নিয়ে বসে থাকতাম। স্লিপ হাতে নিয়ে গম্ভীর স্বরে বলতাম

– কেবিন নিবেন, না ওয়ার্ডে ভর্তি হবেন?

-কেবিন নেব।

– সাধারণ কেবিন, না ভি আই পি কেবিন?

– কোনটার ভাড়া কেমন?

আমি ভাড়া ও সুবিধার ব্যাখ্যা দিলে বেশীভাগই ভি আই পি কেবিন পছন্দ করতেন। আসলে ভি আই পি কেবিন বানানো হয়েছিল ভি আই পি দের জন্যই। কিন্তু সাধারণ মানুষই বেশী থাকতেন ভি আই পি কেবিনে। আমরাও ভাড়া বেশী পেতাম সেই কারনে। ডাইরেক্টর হিসাবে ৬ মাসের বেশী আর থাকা হয়নি। মেডিকেল অফিসার হিসেবে সরকারি চাকরি হয়ে যাওয়ায় ডাইরেক্টরের চাকরিটি ছেড়ে দিতে হয় ১৯৮৮ সনের জুন মাসে। অল্প বয়সের ডাইরেক্টর হয়ে গেলাম মেডিকেল অফিসার ১৯৮৮ সনের ৩ জুলাই।

১৬/৪/২০২২

ময়মনসিংহ

আরো এমন গল্প পড়তে নিচের হ্যাস ট্যাগ এর উপর ক্লিক করুন।

#সাদেকেরস্মৃতিকথা

 

শ্বাস, শ্বাস, শ্বাস

শ্বাস, শ্বাস, শ্বাস
(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
আমরা এমবিবিএস পাস করার পর ১৯৮৬ সনে ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং করেছি এক বছর। এখন ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং না বলে ইন্টার্ন বলা হয়। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে বিভিন্ন মেয়াদে ট্রেইনিং করা হতো। একেকটা বিভাগের অধীন কয়েকটা করে ইউনিট থাকতো। প্রতি ইউনিটের প্রধান থাকতেন একজন প্রফেসর অথবা এসোসিয়েট প্রফেসর অথবা এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। প্রতি ইউনিটে একজন রেজিস্ট্রার থাকতেন। প্রতি ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকতেন একজন এসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার। এসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রারের নেতৃত্বে আমরা ১৫-২০ জন করে ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং করতাম। ওয়ার্ডের রোগীদের ফলো আপ দেয়ার জন্য আমাদের বেড নির্ধারণ করা ছিলো। আমরা প্রতিদিন সকালে এসে রোগীর সমস্যা, পালস, ব্লাড প্রেসার, স্বাস প্রশ্বাসের রেট, ইত্যাদি দেখে রোগীর ফাইলে লিখে রাখতাম। ইমপোর্টেন্ট ফাইন্ডিংগুলো নিয়ে সহকারী রেজিস্ট্রারের সাথে আলোচনা করতাম। সহকারী রেজিস্ট্রার রেজিস্ট্রারের সাথে আলোচনা কতেন। যাদের ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং শেষ হয়ে গেছে অথচ উপজেলা লেভেলের হাসপাতালে পোস্টিং হয়নি তারা সুপেরিয়র ডিউটি ডক্টর হিসেবে ওয়ার্ডে ডিউটি করতেন। সুযোগ পেলে আমাদের পড়াতেন। রেজিস্ট্রারগণ নিয়মিত ওয়ার্ডে ছাত্রদেরকে সকালে ও রাতে পড়াতেন। সার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রারগণ প্রফেসরের সাথে অথবা স্বাধীনভাবে সহকারী রেজিস্ট্রার নিয়ে অপারেশন করতেন।
প্রফেসরগণ সকালে এসে গ্যালারিতে বড় বড় লেকচার ক্লাস নিতেন। ক্লাস না থাকলে লাইব্রেরিতে বসে বই ও জার্নাল পড়তেন। সকাল ১০ টায় দলবল নিয়ে ওয়ার্ডে রাউন্ড দিতেন। এপ্রোন গায় দিয়ে গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে হেলেদুলে হেটে হেটে রোগীর বেডের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেন “চাচা আজ কেমন আছেন?” কথা বলতে বলতে রোগীর হাতের পালস গুনতেন। স্টেথোস্কোপ দিয়ে হার্টের সাউন্ড ও স্বাস প্রশ্বাসের সাউন্ড শুনতেন। প্রফেসর সব রোগী দেখতেন না। এসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার যেগুলি দেখার জন্য ইঙ্গিত করতেন সাধারণত সেগুলো দেখতেন।
রোগী দেখে কি কি পরীক্ষা করতে হবে, কি কি ঔষধ লিখতে হবে তা প্রফেসর বলতেন। আমরা হাতে থাকা প্যাডে শর্টহ্যান্ডে তা লিখে ফেলতাম। রাউন্ড শেষে ডক্টরস রুমে বসে সেগুলো ফ্রেস করে লিখে নার্সকে দিতাম। প্রেস্ক্রিপশন অনুযায়ী নার্স পরীক্ষা করানোর জন্য রোগী এক্সরে অথবা প্যাথলজি ল্যাবরেটরিতে পাঠাতেন এবং নিজ হাতে রোগীকে ঔষধ খাইয়ে দিতেন। পরীক্ষা তেমন কিছু ছিলো না। তখন আমরা আল্ট্রাসনোগ্রাফি দেখিইনি। শুনেছিলাম জাপান দেশে এটা আছে। প্রশ্রাব, পায়খানা ও দুয়েকটা রক্তের পরীক্ষা করানো হতো। রোগীর সমস্যা শুনে, রোগীর শরীরে হাত দিয়ে পরীক্ষা করে, দুয়েকটা প্যাথলজি পরীক্ষা করে অথবা এক্সরে করেই রোগ ধরা হয়ে যেতো। হয়তো ভুলও হতো। হয়তো, লাংসের ক্যান্সারকে টিবি রোগ মনে করে টিবির চিকিতসা দেয়া হয়েছে।
একদিন শিশু ওয়ার্ডে রাউন্ড দেয়ার সময় প্রফেসর ডাঃ হামিদ্ শেখ স্যার বললেন “এই রোগীকে কৃমির ঔষধ লিখে দাও।” আমি ফাইলে কৃমির ঔষধ লিখে দিলে নার্স তাকে এক ডোজ কৃমির ঔষধ খাইয়ে দেন। পরেরদিন রোগীর পায়খানার সাথে ৮-১০’টা বড় কৃমি পড়ে। রোগীর বয়স ছিল ৬-৭ বছর। সাথে তার নানি থাকতেন। হামিদ শেখ স্যার পরেরদিন রাউন্ডে এসে জিজ্ঞেস করলেন “এই রোগীকে কৃমির ঔষধ খাওয়াছিলেন?” রোগীর নানি বললেন “কৃমির ঔষধ খাওয়ায় নাই, ডাক্তার সাব কৃমির ঔষধ লেখছিলেন। তাতেই এতুগুনা কৃমি পড়ছে।” শুনে হামিদ শেখ স্যার মুসকি হেসে বললেন “দেখছেন আমাদের এই ডাক্তার কেমন, ওষুধ লেখছেন, তাতেই কৃমি পড়ে গেছে।”
প্রফেসর রোগীর গায়ে হাত না দিলে রোগীরা সাধারণত সন্তুষ্ট হতেন না। তাই আমাদের একজন প্রফেসর সব রোগীর সাথেই অল্প কিছু কথা বলতেন এবং বুকের উপর, পেটের উপর একটু একটু করে স্টেথোস্কোপ টাচ করে বলতেন “শ্বাস, শ্বাস, শ্বাস।” আসলে যাকে ভালো করে দেখার দরকার তাকে ভালো করেই দেখতেন। যাকে দেখার দরকার নেই তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য শুধু স্টেথোস্কোপ টাচ করে বলতেন “শ্বাস শ্বাস শ্বাস।”
আমি শুনেছি, একদিন এই স্যার এমনভাবে একদিক থেকে শুরু করে ৪-৫ জন রোগী দেখে ফেলেছেন এবং প্রত্যেককেই বলেছেন “স্বাস, শ্বাস, শ্বাস।” পরের রোগীর কাছে গেলেই রোগী হেসে বলে উঠলেন “ডাক্তার সাব, স্টেথোস্কোপ দিয়ে কিভাবে শুনছেন, আপনি তো স্টেথোস্কোপ গলায় লাগিয়ে রেখেছেন, কানে লাগান।”
স্যার বললেন “ও তাই তো।” স্টেথোস্কোপ কানে লাগিয়ে বুকের উপর ধরে বললেন “শ্বাস, শ্বাস, শ্বাস।”
১৩/৬/২০২২
আরও স্মৃতি কথা পড়তে নিচের হ্যাস ট্যাগ এর উপর ক্লিক করুন।

আমার দেখা বুলেট প্রবেশের চিহ্ন

আমার দেখা বুলেট প্রবেশের চিহ্ন
(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
আমাদের বড়বাইদপাড়ার পশ্চিম পাশে ঢনডনিয়া পাড়া। এটা পড়েছে সখিপুর উপজেলার কাকরাজান ইউনিয়নে। এই ঢনডনিয়া পাড়ায় বেশিভাগ মানুষই ছিল বংশী সম্প্রদায়ের। তাদের অনেকেই বন্য আলু, বন্য খরগোশ ও বন্য শুকর খেতেন। আমি স্বাধীনতার যুদ্ধের আগের কথা বলছি। আমাদের গ্রামের বনে এক প্রকার লতানো গাছ ছিলো । গোড়ায় লম্বা লম্বা বন্য আলু ধরতো। খোন্তা দিয়ে গর্ত করে আলু তুলে খালই ভরে নিয়ে যেতেন তারা। সিদ্ধ করে খেতেন। এই আলুকে আমরা জোংগুইলা আলু বলতাম। আমরা জোংগুইলা আলু খেতাম না। আমি চুপি চুপি এই আলু অনেক খেয়েছি। তারা জংগল থেকে বন্য খরগোশ ও শুকর শিকার করে খেতেন। খরগোশকে আমরা ফৈটা এবং শুকরকে জুংলি বলতাম। দিনের বেলা বিশ পঁচিশজনের একটা দল বনের এক দিক থেকে ঝোপ ঝার লাঠি দিয়ে পিটাতে পিটাতে আরেক দিকে যেতেন। খরগোশরা ভয় পেয়ে মুক্ত দিকে দৌড়ে গিয়ে জালের মধ্যে আটকা পড়তো। সন্ধার সময় বনের ধারে খরগোশ ঘাস খেতে আসতো। সেখানেও জাল পেতে রেখে তারা খরগোশ শিকার করতেন।
আমাদের বাড়ির আশে পাশের বনে জোংগুইলা আলু, খরগোশ ও শুকর ছিলো । খরগোশ রাতে মাঠে ঘাস খেতো। শুকর রাতে কচু, ঘেচু ও আলু তুলে খেতো। শুকরগুলো রাতে দল বেঁধে চলাফেরা করত। ঘোতর ঘোতর শব্দ করতো নাক দিয়ে। কোন মানুষ যদি রাগের চোটে ঘোতর ঘোতর করত তাইলে আমরা বলতাম “অবা জুংলির নাগাল ঘোতর ঘোতর করস ক্যা?”
পিটিয়ে শুকর মারা খুব কঠিন কাজ ছিলো। এইজন্য তারা বন্দুক দিয়ে গুলি করে শুকর শিকার করতেন। যারা বন্দুক দিয়ে গুলি করে শুকর মেরে দিতেন তাদেরকে পলান বলা হতো। খুব সম্ভব পালোয়ান থেকে পলান হয়েছে। যে বাড়িতে পলান থাকতো সেই বাড়িকে পলান বাড়ি বলতো। কালিয়া পাড়ার রিয়াজ উদ্দিন চাচা পালোয়ান ছিলেন। তিনি এক সময় গ্রাম সরকার নির্বাচিত হয়ে রিয়াজ সরকার নামে পরিচিত হন। রিয়াজ চাচাকে আমি একবার শুকুর গুলি করে মারতে দেখেছি। বিড়াট শুকর ছিল, ছোট খাটো ষাড়ের সমান। রিয়াজ চাচা সুঠাম দেহী জোয়ান ছিলেন।
একদিন আমি বড়বাইদে কুয়ারপাড়ের ক্ষেত থেকে কেহইর তুলে খাচ্ছিলাম। আমন ধান কাটা শেষ হলে নাড়া ক্ষতে এক প্রকার লম্বা ঘাসের গোড়ায় ছোট ছোট এক ধরনের গোটা হতো। ওগুলো ছেনি দিয়ে খুচিয়ে তুলে ছিলিয়ে কচকচিয়ে চিবিয়ে খেতাম। কেহইরের স্বাদ বিলের পানি ফল বা শিংগারা ফলের মতো। কুয়ার পাড়ের ক্ষেত থেকে বড়বাইদের উজানের ক্ষেত নাটু নানাদের বাড়ি পর্যন্ত দেখা যেতো। নওপাড়াদের ঘোনা, মনো ভাইদের ঘোনা ও নাটু নানাদের ঘোনাও দেখা যেতো। আমাদের জংগল ও বুইদ্দাচালার মাঝখানের ঘোনাকে নওপাড়াদের ঘোনা বলতাম। বুইদ্দাচালা ও জোয়াদালী কাক্কুদের চালার মাঝখানের ঘোনাকে জোয়াদালী কাক্কুদের ঘোনা বলতাম। বংশীগণ আমাদের জংগল পিটানো শুরু করলে ঐ বড় শুকরটা দৌড়ে ঘোনা পাড় হয়ে বুইদ্দাচালার জংগলে প্রবেশ করার সময় আমি দেখেছি। এই সময় দেখলাম পলান চাচা বন্দুক হাতে দৌড়ে বড় বাইদ দিয়ে উজানের দিকে যাচ্ছেন। বংশীগণ বুইদ্দাচালার জংগল পিটাতে থাকলে শুকরটি যেই দৌড়ে জোয়াদালী কাক্কুদের জংলে পালানোর জন্য মনো ভাইদের ঘোনা পাড়ি দিচ্ছিল এমন সময় ডান দিক থেকে একটা গুলি ছোড়লেন পলান চাচা। শব্দ শুনে দৌড়ে গেলাম সেখানে। গিয়ে দেখি বিশাল আকার শুকরটা মরে কাত হয়ে শুয়ে আছে। ডান বুকে গুলি প্রবেশ করেছে, আমি লক্ষ্য করলাম। এটাই আমার দেখা প্রথম এবং শেষ দেয়া বুলেট প্রবেশের চিহ্ন। রিয়াজ উদ্দিন পালোয়ান চাচা আনন্দে উৎফুল্ল ছিলেন। বংশীগণও আনন্দিত ছিলেন। তারা শুকুরের সামনের ও পিছনের পা জোড়া রশি দিয়ে বেঁধে দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে বাঁশ প্রবেশ করিয়ে সামনে দুইজন ও পেছনে দুইজন কাঁধে নিয়ে হাটা দিলেন ঢনঢনিয়ার দিকে। শুকুরের মাথাটি নিচের দিকে দোল খাচ্ছিলো। চার জন বংশী পালকি কাঁধে নিয়ে হাটার মতো করে হাটতে হাটতে পশ্চিম দিয়ে চলে গেলেন।
১০/৬/২০২২
#সাদেকেরস্মৃতিকথা