একটি সন্তানের জন্য

একটি সন্তানের জন্য
(রোগের গল্প)
ডা: মো: সাদেকুল ইসলাম তাকুকদার

জর্দা ফ্যাক্টরিটা মানিক মিয়ার বাবা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মানিক মিয়ার বাবা আগে বই পুস্তকের দোকান করতেন। তিনি লক্ষ করে দেখলেন যে তার বন্ধু বিড়ির দোকান করে বেশী লাভ করেন। তাই তিনি বইয়ের দোকান বাদ দিয়ে বিড়ির দোকান করা শুরু করেন। বিড়ির ব্যবসায় বেশী বেশী লাভ হওয়ায় তিনি বিড়ির ফ্যাক্টরি দিয়ে ফেললেন। তারপর তামাক ফ্যাক্টরি। সেখান থেকে জর্দা ফ্যাক্টরি। যে বছর মানিক মিয়ার জন্ম হয় সেই বছরই জর্দা ফ্যাক্টরি উদ্বোধন করা হয়। আর নাম দেয়া হয় মানিক জর্দা ফ্যাক্টরি। জর্দার নাম দেয়া হয় মানিক জর্দা। এই জর্দা এখন জর্দা সেবনকারীদের প্রিয় জর্দা।

মানিক মিয়া জর্দা ফ্যাক্টরি থেকে লাখ লাখ টাকা আয় করেন। দান খয়রাতও করেন প্রচুর। প্রতি রমজান মাসে ঈদের আগে শহরে মাইকিং করে ফ্যাক্টরির ফটক থেকে যাকাতের শাড়ী, লুঙ্গী ও Continue reading “একটি সন্তানের জন্য”

হার্টের ভিতর ছিদ্র

 

শওকত সাহেব চাকরি থেকে অবসরে যাবার পর পেনশনের টাকা দিয়ে ময়মনসিংহ শহরে এক টুকরা জমি কিনেছিলেন। সেই জমিতে পাঁচতলা ফাউন্ডেশন করে নিচ তলা পার্কিং রেখে তিন তলা পর্যন্ত উঠায়ে আপাতত ক্ষান্ত দিয়েছেন। এক ইউনিটে তিনি থাকেন। বাকীগুলি ভাড়া দিয়েছেন। বাড়ির কাজ উদ্ভোদন করার সময় তিনি মিলাদ দেন নি। এমনকি বাড়িতে উঠার সময়ও তিনি মিলাদ দেন নি। মিলাদ দেয়াকে তিনি ইসলামের বিধান মনে করেন Continue reading “হার্টের ভিতর ছিদ্র”

টেরাটোমা

(গল্পে গল্পে রোগের কথা)
মর্জিনার বয়স আর কত হবে। এই ধরেন তের কি চৌদ্দ বছর। প্রথম যখন মাসিক হয়েছিল খুব ভয় পেয়েছিল। গোপন কথাটা মাকে জানায়। মাইই তাকে বুঝিয়ে বলেন
: মেয়েদের এটা একটা সাভাবিক ঘটনা। প্রতি চার সপ্তাহ পর পর দুই তিন দিন অল্প অল্প রক্তশ্রাব হবে। এটা মেয়েদের সাবালক হবার লক্ষণ। এই সময় পর থেকেই মেয়েরা বিয়ে করলে সন্তান হবার সম্ভাবনা থাকে। তবে ১৮ Continue reading “টেরাটোমা”

তামাক থেকে ক্যান্সার

 

৬৫ বছর হবে কায়েমুদ্দিনের বয়স। সারাজীবন খুব পরিশ্রম করতে হয়েছে কায়েমুদ্দিন মিয়াকে। জমিজমা তেমন ছিল না। যা ছিল তার প্রায় সবটাই বিক্রি করে একমাত্র ছেলে রশিদ মিয়াকে দুবাই পাঠিয়েছিল। রশিদ মিয়া দুবাই চাকরি করছে। বিয়ে করার ছয় মাস পরেই সে দুবাই গিয়েছিল ম্যানপাওয়ারের এজেন্ট ধরে। পাচ বছর পর রশিদ মিয়া দেশে এসেছিল দুই মাসের ছুটিতে। ঐবারই তার প্রথম সন্তান রোমেছার জন্ম হয়। রোমেছার বয়স যখন পাচ Continue reading “তামাক থেকে ক্যান্সার”

প্রোস্টেটিক হাইপারপ্লাসিয়া

 

পয়তাল্লিশ বছর বয়স থেকেই কাশেম সাহেবের চুল পাকা শুরু করে। প্রথম প্রথম একটা দুইটা চুল পাকত। তার স্ত্রী রোকেয়ার কাশেম সাহেবের পাকা চুল তুলতে ভাল লাগত। কোন কোন চুল আধাপাকা ছিল। আধাপাকা চুল ধরে টান দিলে কাশেম সাহেব “উহ” করে মাথা ঝেংটা মেরে সরিয়ে ফেলতেন। আর তুলতে দিতেন না। রোকেয়া স্বামীর মিঠে কিল মেরে প্রতিবাদ করতেন। কিল খেতে ভালই লাগত কাশেম সাহেবের। সু্যোগ পেলে আবার তুলতেন। Continue reading “প্রোস্টেটিক হাইপারপ্লাসিয়া”

হেপাটাইটিস বি ইনফেকশন

জুয়েল রানা গ্রামের ছেলে। দুই বছর পূর্বে এস এস সি পাস করেছে। এবার এইচ এস সি দেবার কথা। কিন্তু বাবার আর্থিক অবস্থা ভাল না। তাছাড়া লেখাপড়া করতে রানার ভাল লাগে না। গ্রামের অনেক ছেলেই বিদেশে গিয়ে কামাই করে সংসারের অবস্থার উন্নতি করেছে। যারা বিদেশে গিয়েছে তাদের পরিবার ভাল খেতে পারে। ভাল উপভোগ করতে পারে। রানারও ইচ্ছা হল বিদেশ যাবে। ম্যান পাওয়ারের এজেন্ট ধরেছে। গ্রামের লোকে বলে আদম বেপারী বা দালাল। তিন লাখ টাকা নিয়ে দালাল মেডিকেল করাবে। পাসপোর্ট-ভিসা করায়ে মিডল ঈষ্ট পাঠাবে। রানার বাবা ফজলু মিয়া ভাবে “যদি মেডিকেল টেস্টে আনফিট ধরা পরে তবে দালালের কাছ থেকে টাকা ফেরৎ নেয়া কষ্টকর হবে। আগেভাগেই সখিপুর গিয়ে প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে রক্ত পরীক্ষা, এক্সরে ও ইসিজি করে দেখলে মন্দ হয় না। কিছু টাকা যায় যাক। তবু তো জানা যাবে ফিট কিনা।

ফজলু মিয়া রানাকে নিয়ে সখিপুর গেলেন। একটা ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে গিয়ে সামনে বসা রিসেপ্সনিস্টকে বললেন
: ভাই, আমার ছেলেটাকে বিদেশ পাঠাতে চাই। তার আগে একটু দেখে নিতে চাই পরীক্ষা নিরীক্ষায় ফিট কিনা। কি কি পরীক্ষা করা যায়?
: পরীক্ষা তো অনেক লাগে। তবে খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা পরীক্ষা, যেমন: বুকের এক্সরে, ইসিজি, রক্তের আরবিএস, এসজিপিট, ক্রিয়েটনিন, এইচবিএসএজি, এইচসিভি ও ভিডিআরএল টেস্ট ইত্যাদি ।
: এই পরীক্ষায় কি কি রোগ ধরা পরে?
: বুকের এক্সরে থেকে টিউবারকুলোসিস বা যক্ষা, হাপানী ও হার্টের রোগ আছে কিনা জানা যায়। ইসিজি দেখে হার্টের রোগ জানা যায়। রক্তের আরবিএস হল রক্তের সুগার পরীক্ষা। তা থেকে ডায়াবেটিস আছে কিনা জানা যায়। এসজিপিটি থেকে লিভারের অবস্থা বুঝা যায়,ক্রিয়েটিনিন দেখে কিডনি ভাল আছে কিনা জানা যায়, এইচবিএসএজি হল হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ইনফেকশন আছে কিনা জানার সাধারণ পরীক্ষা। এইচসিভি হলো হেপাটাইটিস সি ভাইরাস-এর পরীক্ষা। বি ও সি দিয়ে হয় হেপাটাইটিস ভাইরাস ইনফেকশন। সিফিলিস রোগের জন্য করা হয় ভিডিআরএল টেস্ট অথবা টিপিএইচএ পরীক্ষা।
: তাহলে এই পরীক্ষাগুলি করে দিন।
পরীক্ষাগুলি করা হলো। দুই ঘন্টা পর পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া গেলো।
টেকনোলোজিস্ট বললেন
: সব পরীক্ষার রিপোর্ট ভাল আছে। শুধু এইচবিএসএজি পরীক্ষাটি পজিটিভ হয়েছে।
: পজিটিভ ভালো, না নেগেটিভ ভালো?
: নেগেটিভ ভালো।
: পজিটিভ হলে সমস্যা কি?
: বিদেশ যেতে ভিসা পাবে না।
: তা তো বুঝলাম। আমার ছেলের কি সমস্যা হবে?
: এই ভাইরাস থাকলে জন্ডিস হয়।
: আমার ছেলের তো জন্ডিস হয় নাই। আমরা জানি জন্ডিস হইলে চোখ মুখ প্রস্রাব হলুদ হয়।
: এখন নাই। পরে হবে। এই ব্যাপারে স্যারে ভাল বলতে পারবেন।
: কোন স্যারে?
: আপনি ময়মনসিংহ গিয়ে আমাদের প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ ডাঃ সাকীব স্যারকে দিয়ে এই পরীক্ষা করায়ে তার সাথে কথা বলুন।

পাশে এক রুগীর মা বসা ছিলেন। তিনি পান খাচ্ছিলিলেন। মুখভর্তি পানের পিক। তিন আঙুল দিয়ে কিছু জর্দা উপর দিকে হা করে মুখে দিয়ে বললেন
: আমার পোলার জন্ডিস অইছাল। দানেশ কবিরাজ দিয়া ঝাইরা জন্ডিস ভালা করাইছি। তার অইছাল মাইট্টা জন্ডিস। আপনের পোলারও মাইট্টা জন্ডিস অইছে।
: মাইট্টা জন্ডিস মানে?
: মাইট্টা জন্ডিস অউল মাটির মত। আরেকটা জন্ডিস অইল অইলদা জন্ডিস।
: মানে যে জন্ডিসে হলুদ হয় না সেটা মাইট্টা আর যেটাতে হ্লুদ হয় সেটা অইলদা। এটা কে বলেছে আপনাকে?
: দানেশ কবিরাজ কইছে। কবিরাজ জন্ডিস ঝাইরা টেহা নেয় না। শিন্নি করার জন্য যে যা দেয় নেয়। আপনের পোলারে নিয়া যাইন দানেশ কবিরাজের কাছে।
ফজলু মিয়া সাকীব সাহেবের ঠিকানা নিলেন। টেকনিশিয়ান ফজলু মিয়াকে সতর্ক করে বললেন “ময়মনসিংহ শহরে অনেক দালাল, চিটার আছে। তারা আপনাকে মিথ্যা কথা বলে ভুয়া ল্যাবে নিয়ে যাবে। সাবধান থাকবেন। ” ফজলু মিয়া ঠিকানা নিয়ে বাড়িতে চলে এলেন। খবরটা কাউকে জানালেন না। রানা, রানার মা-বাবা সবাই উদ্বিগ্ন। রাতে ফজলু মিয়া সিদ্ধান্ত নিলেন পরের দিন রানাকে নিয়ে ময়মনসিংহ ডাঃ সাকিব সাহেবের নিকট যাবেন এইচ বি এস এজি পরীক্ষাটি কনফার্ম করার জন্য। সকালে তারা তিনজনই ময়মনসিংহ রওনা দিলেন। দুপুরে গিয়ে পৌছলেন সাকীব প্যাথলজি ল্যাবে। ফজলু মিয়া ল্যাবের রিসেপসনিস্টকে বললেন
: প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ ডাঃ সাকীব সাব আছেন?
: স্যার তো আসেন বিকেল ৪টায়।
: এখন কোথায়?
: স্যার মেডিকেল কলেজের টিচার। এখন ক্লাস নিচ্ছেন। কলেজ থেকে ফিরে বাসায় লাঞ্চ করে একটু বিশ্রাম নিয়ে বিকেল ৪টার দিকে আসবেন। আপনাদের কোন পরীক্ষা আছে?
: ইয়ে মানে, বিদেশ যাওয়ার উদ্দেশ্যে সখিপুর থেকে কয়েকটা পরীক্ষা করায়েছিলাম। তার মধ্যে এইচবিএসএজি পরীক্ষাটি পজিটিভ ধরা পরেছে। কনফার্ম হওয়ার জন্য এসেছি।
: দেখি আপনার সখিপুরের পরীক্ষার রিপোর্ট। এরা যে মেথডে পরীক্ষা করেছে আমাদের এখানে এর চেয়েও ভাল মেথড আছে। আপনি সেই মেথডে পরীক্ষা করালে কনফার্ম হতে পারবেন। আগেরটার চেয়ে পরীক্ষার ফি একটু বেশী লাগবে।
: ডাক্তার সাব আসবেন ৪টার পর। এতক্ষণ আমরা কি করব?
: আপনারা রক্তের সেম্পল দিয়ে বাইরের কাজ করে আসুন। ডাক্তার সাব আসার আগে আমাদের টেকনোলোজিষ্ট আপনার রক্তের নমুনা প্রসেস করবেন। তাতে অল্প সময়ের মধ্যেই আপনি রিপোর্ট পাবেন।
: আমি কি পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে ডাক্তার সাবের সাথে কথা বলতে পারব?
: পারবেন। আমি ব্যবস্থা করে দেব। রক্তের নমুনা দিন।
: রক্ত দেয়ার পর আমরা লাঞ্চ করব। এখানে ভাল রেস্টুরেন্ট কোনটি?
: কয়েকটা রেস্টুরেন্ট ভাল আছে। আপনি সাততারা রেস্টুরেন্টে খেতে পারেন। সামনে দালাল আছে। তারা আপনাকে ভুলিয়ে নিম্ন মানের রেস্টুরেন্টে নিয়ে যেতে পারে। সাবধান! মসজিদের সামনে পকেটমার হয়। সাবধান! জামায় ময়লা লাগিয়ে দিয়ে বলবে “আপনার জামায় ময়লা। বাথরুমে গিয়ে জামা ধুয়ে নিন।” ময়লা ধোয়ার পর আপনি যখন অজু করবেন জামা তাদের হাতে দিয়ে তখন তারা আপনার পকেট থেকে টাকা নিয়ে নেবে। কাজেই সাবধান! বিকেল ৫টার দিকে রিপোর্ট পাওয়া গেল। অনুমতি নিয়ে ফজলু মিয়া, রানার মা ও রানা ডাঃ সাকীবের চেম্বারে প্রবেশ করলেন। ডাক্তার সবাইকে সাদরে বসতে দিলেন। বললেন
: বলুন, আমি কি করতে পারি, আপনাদের জন্য?
: ইয়ে মানে, আমাদের এই ছেলের হেপাটাইটিস ভাইরাস পজিটিভ ধরা পরেছে। এ ব্যপারে আমি বিস্তারিত জানতে চাই। কার কাছে যাব? আপনি তো পরীক্ষা নিরীক্ষার ডাক্তার। এমন একজন ডাক্তারের ঠিকানা দেন যেন তিনি এই রোগ কেন হয়, কিভাবে শরীরে প্রবেশ করে, শরীরে প্রবেশ করে কি কি ক্ষতি করে, কি কি শারীরিক সমস্যা হয়, এর ভবিষ্যৎ পরিণতি কি তার বিস্তারিত আমাদেরকে বলেন।
: আমিই সব বলতে পারব।
: আমরা তো জানি আপনি রক্ত, প্রস্রাব ও পায়খানা পরীক্ষা করার ডাক্তার।
: আমি প্রথমত একজন এমবিবিএস গ্রাজুয়েট ডাক্তার। তাই আমি সাধারণ সব রোগের কথা বিস্তারিত জানি ও চিকিৎসা দিতে পারি। দ্বিতীয়ত, আমি একজন এম ফিল ডিগ্রিধারী পোষ্টগ্রাজুয়েট প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ। আমি ছাত্রদের পড়াই রোগ কি দিয়ে হয়, কিভাবে শরীরে প্রবেশ করে, শরীরের ভিতর কি কি পরিবর্তন হয়, তাতে কি কি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। শুধু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মত চিকিৎসা দিতে পারি না। এর বাস্তব প্রয়োগ হিসাবে আমি ল্যাবরেটরিতে বিভিন্ন পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করে দেই। আপনি যে সব পরীক্ষার কথা বললেন এগুলিছাড়াও আমি ক্যান্সার রোগ নির্ণয় করে থাকি।
: খুব ভালো হল। তাহলে একটু বলবেন “আমার ছেলের শরীরে কি জীবানু প্রবেশ করেছে?”
: আপনার ছেলের শরীরে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস নামে এক জাতীয় রোগ জীবানু প্রবেশ করছে। রক্তের ননুনায় জীবানুর গায়ের অংশ পাওয়া গেছে।
: এটা ঢোকল কিভাবে?
: এই ভাইরাস বসবাস করে লিভার বা যকৃৎ (কলিজা) -এর ভিতর। রক্ত ও শরীরের রসের মধ্যেও কিছু কিছু থাকে। কাজেই, যে কোন ভাবেই এক জনের রক্ত বা শরীরের রস আরেকজনের শরীরে একটু আধটু মিশে গেলে জীবাণু সংক্রমিত হয়। একজনের রক্ত আরেকজনের রক্তে প্রবেশ করালে, একই সুই ব্যবহার করলে, অথবা আক্রান্ত রুগীর সাথে যৌন মেলা মেশা করলে এই জীবানু প্রবেশ করতে পারে। এমনকি সেলুনের খুর থেকেও এই জীবানু আসতে পারে।

রানার মা বললেন : ভালা কথা, ডাক্তার সাব, মায়ের শরীর থেকে কি সন্তানের শরীরে এই ভাইরাস যেতে পারে?
: পারে। সন্তান প্রসবের সময় কিছুটা কাটা ছেড়া হয়ে সন্তানের শরীরে মায়ের রক্ত বা রস সন্তানের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
: আমার শরীরেও মনে হয় ভাইরাস আছে। ছোট বেলা দেখছি আমাদের গ্রামের ডাক্তার একই সিরিঞ্জ দিয়ে কয়েকজনকে ইনজেকশন দিতেন। না জানি কত মানুষের শরীরে ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছেন এই ডাক্তার। আমার রক্তটাও টেষ্ট করে দেখব।
: ঠিক আছে। করে দেব।
: জীবাণু প্রবেশ করার কয়দিন পর এই রোগ দেখা দেয়?
: ৩০ থেকে ১৮০ দিন লাগে এই রোগ দেখা দিতে। এই গড়ে ধরেন ৭৫ দিন।
: জীবানু ঢোকলেই কি রক্ত পরীক্ষায় ধরা পরে?
: না। সাধারণত ৩০ থেকে ৬০ দিন পর ধরা পরে।
: এই জীবাণু কি কি ক্ষতি করে?
: জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত লোকদের শতকরা প্রায় ৯৫ জনই আপনা আপনি জীবাণুমুক্ত হয়ে যায়। শতকরা ৫ জনের হেপাটাইটিস হয়। তখন লিভার নষ্ট হয় কিছুটা। শরীর দুর্বল, শরীর হলুদ হওয়া ও উপরের পেটে হাল্কা ব্যাথা হয়, বমি বমি ভাব হয় ও বমি হয়।এসবই লিভার আক্রান্ত হওয়ার কারনে হয়। এই অবস্থায় বলা হয় ক্রনিক হেপাটাইটিস।
: এখন বুঝলাম, কি কারনে কবিরাজে কয় মাইট্টা জন্ডিস আর হ্লুদ জন্ডিস। যাদের ক্রনিক হেপাটাইটিস হয় তাদের কি পরিণতি?
: এদের শতকরা ৯৫ জনই আপনা আপনি ভাল হয়ে যায়। মাত্র শতকরা ৫ জনের জটিল রোগ ছিরোসিস হয়। এদের লিভার নষ্ট হয়ে গোটা গোটা হয়ে যায়।
: আমি ছাগল -গরুর কলিজায় এমন শক্ত গোটা গোটা দেখেছি। এইরম কলিজা আমরা ফেলে দেই, খাই না।

রানার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এক ফোটা তার সাদা শার্টে পড়ে মিশে গেল।

রানার বাবা বললেন
: ডাক্তার সাব, ঐযে বললেন, শতকরা ৫ জনের ছিরোসিস হয়। তাদের চেনার উপায় কি?
: তাদের সাধারণত পেটে পানি জমে। শরীর দুর্বল থাকে। মাংশ শুকিয়ে যায়।
: আমরা শুনেছি কিডনি রোগে শরীরে পানি ধরে।
: ঠিকই শুনেছেন। হার্টের রোগেও পানি ধরে। শরীরে প্রোটিন কমে গেলেও পানি ধরে। আরো অনেক কারনে পানি ধরে।
: কোন কারনে পানি ধরল আপনারা বুঝেন কেমনে?
: সাধারণত, হার্টের কারনে পায়ে, কিডনির কারনে মুখে ও লিভারের কারনে পেটে পানি ধরে। প্রোটিন কম পরলে সারাশরীরেই পানি ধরে। তাছাড়া এগুলির জন্য বিভিন্ন রকম পরীক্ষা নিরীক্ষাও আছে।

রানার চোখ বেয়ে আরেক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

রানার মা বললেন
: যাদের ছিরোসিস হয় তারা কি ভাল হয় না?
: না। ছিরোসিস ভাল হয় না। এর জন্য করতে হয় লিভার ট্রান্সপ্লান্ট। মানে, একজন সুস্থ মানুষের লিভারের কিছু অংশ নিয়ে রুগীর লিভারে লাগিয়ে দেয়া হয়। তাতে রুগী কিছুটা সুস্থভাবে বেচে থাকতে পারে। লিভার সংযোজন না করলে বেশী ভাগ রুগীই ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

রানার বুক দুরু দুরু করছে। সারা শরীর ঘামছে। রানা বলল
: মা, আমার অস্থির লাগছে। শরীর ঘামছে।
: তাইতো, বাবায় ঘেমে গেছে। ডাক্তার সাব, এই গরমেও ফ্যান ছাড়েন নাই কেন? ফ্যানটা একটু ছাড়তে বলেন।
: রুমে তো এসি চলছে। আমার তো শীত করছে। রুম ঠান্ডাই আছে। ঠিক আছে ফ্যান ছাড়লাম। যা বলছিলাম। যাদের ছিরোসিস হয় তাদের শত করা দুই এক জনের লিভারে ক্যান্সার হয়। যেটাকে বলা হয় হেপাটোসেলুলার কার্সিনোমা।

রানা হাউ মাউ করে কেঁদে ফেললো। ডাঃ সাকীব শান্তনা দিয়ে বুঝিয়ে বললেন
: তোমার এসব কিছুই হবে না। আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করি। ক্যান্সার হয় নগন্ন কয়েক জনের মাত্র।
রানা আশ্বস্ত হল। রানার বাবা বললেন
: ডাক্তার সাব, ক্রনিক হেপাটাইটিস, ছিরোসিস ও ক্যান্সার আছে কি না কিভাবে বুঝেন?
: আমরা নিডল বা সুই দিয়ে লিভার থেকে সামান্য রস অথবা টিস্যু নিয়ে সাইটোপ্যাথলজি অথবা হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা করেই বলে দেই এই রোগ লিভারে আছে কিনা। এই পরীক্ষাকে বলা হয় এফএনএসি ও বায়োপ্সি।
: এই রোগের চিকিৎসা করেন কোন ডাক্তার?
: হেপাটোলজি বিশেষজ্ঞগণ চিকিৎসা দেন। ক্যান্সার হলে চিকিৎসা করেন হেপাটোলজি বিশেষজ্ঞগণ।
: আমরা এখন কার কাছে যাবো?
: আপনারা একজন হেপাটোলজি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

: এই সময় কি ভাবে চিকিৎসা করবেন? ওর তো শারীরিক সমস্যা নাই।
: হেপাটোলজিস্ট আরো কিছু পরীক্ষা করাবেন চিকিৎসা দেয়ার আগে।
: ভাইরাস তো পরীক্ষায় ধরা পড়েছেই। আবার কেন?
: এখন যেটা করা হয়েছে এটা হল ভাইরাসের সার্ফেস এন্টিজেন। মানে, ভাইরাসের গায়ের খোসা আর কি। ভাইরাস গুলি জীবিত না মৃত তা এখান থেকে বুঝা যাবে না। আরো বিভিন্ন পরীক্ষা আছে যেগুলি দিয়ে জীবিত ভাইরাস বা বিস্তাররত ভাইরাস আছে কিনা জানা যাবে। সেগুলি আরো ব্যয়বহুল পরীক্ষা।
: তাইলে এই পরীক্ষা করে লাভ হল কি?
: মনে করেন, আপনার বাড়ির পেছনে একটা সাপের শরীরের খোসা পাওয়া গেল। সাপ আপনি দেখেন নি। আপনি তখন কি মনে করবেন?
: আমরা বলি সাপের সলং। সাপের সলং পেলে আমরা ধরেই নেই বাড়ির আশে পাশে সাপ আছে।
: সলং থাকলেই সাপ আছে সঠিক করে বলা যাবে না। এমনো হতে পারে সলং ফেলার পর সাপকে ঈগল পাখি খেয়ে ফেলেছে বা অন্য কোনভাবে মারা গিয়েছে।
: হতে পারে।
: কাজেই আপনার ছেলের লিভারে ভাইরাস জীবিত কিনা, লিভার ফাংশন ঠিক আছে কিনা দেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিবেন।
: ভাইরাস মারার ঔষধ আছে?
: ক্রনিক হেপাটাইটিস অবস্থায় রুগীকে ভাইরাসের ট্যাবলেট খাওয়ানো হয় দীর্ঘদিন। তাতে জীবাণু মারা না গেলেও বিস্তারলাভ করতে পারে না। ফলে ছিরোসিস ও ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা কমে যায়।
: শুনছি গাছান্ত ঔষধ ও পানি পড়া খেলেও ভাইরাস নেগেটিভ হয়।
: যেহেতে প্রায় ক্ষেত্রেই এমনি এমনি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য ভাইরাস নষ্ট হয়ে যায় সেহেতু অনেকে মনে করে পানি পড়াতেই ভাইরাস নেগেটিভ হয়।
: তারপরও কথা আছে। আল্লাহ্‌র কালামের দাম আছে না?
: দাম তো অবশ্যই আছে। সেটা হল মানুষের হেদায়তের জন্য। পানি পড়া দিয়ে চিকিৎসা করার জন্য না। ক্ষুধার জন্য যেমন খেতে হয়, রোগের জন্য তেমন চিকিৎসা করাতে হয়। ক্ষুধা লাগলে কেউ পানি পড়া খায় না। আল্লাহ্‌র কাছে রেজেকের জন্য চাইতে হবে, রোগ থেকে আরোগ্যের জন্য প্রার্থনা করতে হবে। কিন্তু চিকিৎসা বাদ দিয়ে নয়।

: ডাক্তার সাব, আমার তো আরেকটা সন্দেহ লাগতাছে। আমার আরেকটা ছেলে আছে। ও এইটে পড়ে। খুব ভাল ছাত্র। ওর ভাইরাসটাও টেস্ট করাতে হবে।
: শুধু ওরটা না। আপনার ফ্যামিলিরর সবাইকে এইচবিএসিএজি টেস্ট করাতে হবে। যাদের নেগাটিভ পাওয়া যাবে তাদেরকে এই ভাইরাসের টীকা দিতে হবে।
: যাদের পজিটিভ হবে তাদের টীকা লাগবে না?
: টীকা দেয়া হয় যাতে ভাইরাস দ্বারা সংক্রমন না হয়। যাদের পজিটিভ তারা তো অলরেডি সংক্রমিত হয়েছে। তাদের দিয়ে লাভ নেই।
: টীকা দিলেই আমরা নিশ্চিত থাকব যে ভাইরাস আক্রান্ত হব না।
: এই টীকা সাধারণত শতকরা ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ লোকের জন্য কার্যকরী। আমরা আশা করছি এর চেয়েও আরো উন্নত টীকা আবিষ্কৃত হবে।
: ডাক্তার সাব, খাওয়া দাওয়ায় কোন বাছ কিছ আছে?
: না, তেমন না।
: তাইলে, আপনার কার্ডে একজন লিভার বিশেষজ্ঞের নাম লিখে দিন। আপনার পছন্দের ডাক্তার দেখাব। আপবার সাথে কথা বলে খুব ভাল লাগল। কত সহজ করে বুঝালেন। আল্লাহ্‌ আপনার ভাল করুন। আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন যেন আর কিছু না হয়। আমার ছোট ছেলেটা লেখাপড়ায় ভাল। দোয়া করবেন তারে আপনার মত ডাক্তার বানাব, ইনশাআল্লাহ। আপনার অনেক সময় নিয়েছি। কিছু মনে নিয়েন যে।
: ঠিক আছে। আসুন। ফি আমানিল্লাহ।

ফজলু মিয়া ছেলে ও ছেলের মাকে নিয়ে ল্যাব থেকে বের হলেন। ডাঃ সাকীব গেইট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। রাস্তায় এল ই ডি লাইট জলে ওঠেছে। সবাই অপেক্ষমান সি এন জি অটোরিকশা ওঠে বসল। ফজলু মিয়ার মোবাইলে ফোন আসল বিদেশ নেয়ার দালালের ফোন থেকে। তিব্রঘতিতে ভেরভের শব্দ করে অটোরিকশা ছুটে চলল। শব্দে মোবাইলের কথা শুনা গেল না।
===

[৮/৪/২০১৮]