সরকারী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেবা পাওয়ার সহজ উপায়

(সাধারণ স্বাস্থ্য জ্ঞান)
সরকারী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলি মেডিকেলের ছাত্র ও নার্সদের জন্য একটি হাতে কলমে শিক্ষা ও গবেষণা করার প্রতিষ্ঠান। এই সুযোগে
জনগন চিকিৎসা সেবা পেয়ে থাকে। চিকিৎসার ব্যয় সরকার বহন করে। অবস্থাপন্ন রুগীদের থেকে কিছু টাকা নেয়া হয় সরকারী খাতে একটু বেশী সুবিধা পাওয়ার জন্য। যেমন ভাল সীট বা উন্নত পরীক্ষা। এই টাকা স্বাস্থ্য খাতেই খরচ করা হয়। তাতে হাসপাতালে সেবার মান বৃদ্ধি পায়। এই টাকাকে বলা হয় ইউজার ফি।

আমরা অনেকেই এই হাসপাতালের সেবা পাওয়ার পদ্ধতি জানি না বিধায় হয়রানীর শিকার হই। হাসপাতালের মুলত তিনটি অংশ আছে – আউটডোর, ইনডোর ও ইমার্জেন্সী। বাংলায় বলে -বহিঃ বিভাগ, অন্তঃ বিভাগ ও জরুরী বিভাগ।

এতবড় একটি হাসপাতাল পরিচালনা করেন একজন পরিচালক। তিনি হাসপাতালের সকল ডাক্তার, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ন্ত্রণ করেন। তাকে সহায়তা করেন উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালকগন। পরিচালকগন চিকিৎসা সেবা দেন না। তারা প্রশাসনিক কাজ করেন। প্রফেসর, এসোসিয়েট প্রফেসর ও এসিস্টেন্ট প্রফেসরগন ছাত্রদের শিক্ষাদান করেন ও রুগীর চিকিৎসা দেন। তারা সরাসরি মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপালের নিয়ন্ত্রনে থাকেন। তবে তাদের গতিবিধি পরিচালককে অবহিত করতে হয়। প্রফেসরদের কাজে সহায়তা করেন রেজিস্ট্রার ও সহকারী রেজিস্ট্রার। রেজিস্ট্রারগন ছাত্রও পড়ান।

কিছু কিছু সমস্যা আছে যেগুলিকে আমরা ইমার্জেন্সী সমস্যা বলে থাকি। যেমন, হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়া, হঠাৎ তীব্র বমি হওয়া, বিষ পান করা, মারাত্মক এক্সিডেন্ট হওয়া, বুকে তীব্র ব্যাথা হওয়া, পেটে তীব্র ব্যাথা হওয়া, রক্ত বমি হওয়া, রক্ত পায়খানা হওয়া, হঠাৎ শরীর অবশ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। এইসকল সমস্যা দেখা দিলে রুগী হাসপাতালের ইমার্জেন্সী বা জরুরী বিভাগে যাবে। এই বিভাগ চব্বিশ ঘন্টাই খোলা থাকে। সাধারণ সমস্যা নিয়ে উপস্থিত হয়ে জরুরী বিভাগের ডাক্তারকে বিরক্তি করা ঠিক না। এখানে একজন মেডিকেল অফিসার জরুরী চিকিৎসা দিয়ে বিদায় করবেন অথবা আরো চিকিৎসা নেয়ার জন্য ইনডোরে ভর্তি করে দিবেন।

সাধারণ সমস্যার জন্য রুগী অফিস টাইমে (সাধারণত সকাল ৯টা থেকে বিকাল ১ টা) হাসপাতালের আউটডোরে যাবেন। টিকিট কাউন্টারে গিয়ে নামমাত্র টাকা দিয়ে একটি টিকিট নিবেন। কাউন্টার মাস্টার কি সমস্যা জিজ্ঞেস করবেন। সমস্যা শুনে তিনি নির্দিষ্ট বিভাগের আউটডোর মেডিকেল অফিসারের রুমের নাম্বার দিয়ে বলবেন “এত নাম্বার রুমে যান।” মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, চক্ষু, চর্ম, নাককান এইভাবে বিভিন্ন বিভাগ আছে। সেই অনুযায়ী রুগীকে লাইনে দাড়াতে হবে। মেডিকেল অফিসার রুগীর সমস্যাগুলি শুনে শরীর পরীক্ষা করে ঔষধ লিখে দিবেন। অথবা আরো বুঝার জন্য প্যাথলজিকাল ও অন্যান্য পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট রুমে পাঠাবেন। এই সবকাজে মেডিকেল অফিসারকে সয়ায়তা করবেন একজন মেডিকেল এসিস্টেন্ট। তিনি রেজিস্টার খাতায় রুগীর তথ্য এন্ট্রি দিবেন ও কিছু কিছু রুগী দেখার কাজ করবেন মেডিকেল অফিসারের নির্দেশনা অনুযায়ী। একটু জটিল মনে হলে মেডিকেল অফিসার রুগী রেফার্ড করবেন আবাসিক ফিজিসিয়ান (আর পি) অথবা আবাসিক সার্জন (আর এস)-এর নিকট। আর পি, আর এসগন সাধারণত উচ্চতর পোস্টগ্রাজুয়েট ডিগ্রীধারী হন। তারা মনে করলে রুগী ইনডোরে ভর্তি দিয়ে দেন। ছোট খাট অপারেশন আউটডোরে করার ব্যাবস্থা আছে। ঔষধের জন্য যেতে হয় আউটডোর ডিস্পেন্সারিতে। এখানে মেডিকেল অফিসারের স্লিপ অনুযায়ী বিনামুল্যে ঔষধ দেয়া হয়।

ইনডোরে রুগী ভর্তি দিলে ওয়ার্ডে গিয়ে সিস্টারের (নার্স) নিকট টিকিট জমা দিতে হবে। সিস্টার রেজিস্টারে এন্ট্রি দিয়ে কর্তব্যরত ডাক্তারকে জানাবেন। কর্তব্যরত ডাক্তার সাধারণত এক জন বা দুইজন ইন্টার্নি থাকেন। ইন্টার্নিগন পাস করা ডাক্তার। তবে নবীন। তারা মিডলেভেল ডাক্তারের সুপারভিশনে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। তাদের শরীরে ছাত্রের গন্ধ এখনো যায় নি। তাই অনেকে এদেরকে ডাক্তার মনে না করে ভুল করে। মাঝে মাঝে রুগীর লোকের সাথে এদের তাই বাক বিতন্ডা বেধে যায়। কর্তব্যরত ডাক্তার প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ওয়ার্ড ইন চার্জ এসিস্টেন্ট রেজিস্ট্রারকে জানান। চিকিৎসার সার্বিক দায়িত্বে থাকেন এসিস্টেন্ট রেজিস্ট্রার। তাকে এক্সপার্ট অপিনিয়ন বা স্কিল দিয়ে সাহায্য করেন রেজিস্ট্রার। এসিস্টেন্ট রেজিস্ট্রারের সহায়ক থাকেন কয়েকজন ইনডোর মেডিকেল অফিসার (আইএমও)। কয়েকটি ওয়ার্ড নিয়ে একেকটি ইউনিট হয়। প্রতিটি ইউনিটের দায়িত্বে থাকেন একজন প্রফেসর /এসোসিয়েট প্রফেসর / এসিস্টেন্ট প্রফেসর। তারা প্রতিদিন সকাল ১১ টার দিকে রাউন্ড দিয়ে রুগী দেখেন। এসিস্টেন্ট রেজিস্ট্রার যেসব রুগী দেখতে বলেন সেইগুলি সাধারনত তারা দেখেন বা অপারেশন করেন। বাকী সময় তারা লেকচার ক্লাস প্রস্তুত করেন, ক্লাস নেন, সেমিনার করেন ও গবেষণা করেন। অনেক সময় এসিস্টেন্ট রেজিস্ট্রার কোন রুগীর বিস্তারিত তথ্য জানানোর পর তিনি মুখে চিকিৎসার নির্দেশনা দেন। সেই অনুযায়ী এসিস্টেন্ট রেজিস্ট্রার ফাইলে চিকিৎসা লিখেন। সে ক্ষেত্রে অনেকে মনে করেন বড় ডাক্তার একবারো দেখলেন না। কোন কোন সময় নবীন ডাক্তারদেরকে ব্রাদারের মত মনে হয়। সেই ক্ষেত্রে অনেকে বলেন “এ পর্যন্ত একটি ডাক্তারো দেখলাম না।” প্রকৃতপক্ষে সব সময় ওয়ার্ডে কম পক্ষে একজন ডাক্তার থাকেন। রুগীর নতুন কোন সমস্যা হলে সিস্টারকে জানাতে হয়। সিস্টার ডাক্তারকে বলে ব্যাবস্থা নিবেন। চিকিৎসা ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে সিস্টারকে জানাতে হয়। ঔষধ ও পথ্য সেবনের নিয়ম সিস্টার বলে দেন। কেবিনে অবস্থানকারী রুগী সাধারণত ওয়ার্ডে থাকা রুগীর মত সরাসরি ডাক্তারের সুপারভিশনে থাকেন না। পারতপক্ষে বেশী খারাপ রুগী কেবিনে না থাকাই ভাল। কিছু কিছু রুগী যেমন মুক্তিযোদ্ধা ও সরকারী কর্মচারী আর্থিক সুবিধা পান। সেক্ষেত্রে বৈধ কাগজপত্র সাথে রাখতে হয়।

হাসপাতালে সেবাদানকারী ও সেবাগ্রহনকারী তাদের নিজ নিজ বিষয়ে সম্যক ধারনা থাকলে সেবার মান আরো ভাল হয় ও অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে রেহাই পাওয়া যায়।
===
ডাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
২৩/১২/২০১৭
====
মচিম ১৭ ব্যাচ
এম বি বি এস ১৯৮৫
এম ফিল (প্যাথলজি) আইপিজিএমআর ১৯৯৫
বিভাগীয় প্রধান, প্যাথলজি
শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, কিশোরগঞ্জ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *