বাসা থেকে জেলখানা পর্যন্ত

বাসা থেকে জেলখানা পর্যন্ত
(ছোট গল্প)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আর্মি শাসিত তত্বাবধায়ক সরকারের অধীন দেশ চলছিল। রাস্তার ধারের স্থাপনার অবৈধ অংশগুলি অনবরত হাতুরি দিয়ে পিটিয়ে ভাংগা হচ্ছিল। সেই হাতুরির আঘাত অনেকের মাথায় লাগছিল। তাদের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। বড় বড় নেতাদেরকে ধরে ধরে জেলখানায় ঢুকাচ্ছিল। সবার চোখ খবরের কাগজে জানতে আজকে কাকে ধরলো। কারো কোন প্রতিবাদ করার ক্ষমতা নেই। এই সময় একদিন দুপুরের পর এক ঝাক আর্মি এসে শহরের একাংশের ৫০/৬০ টি ডায়াগনোস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক ঘিরে ফেললো। একজন ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে অভিযান শুরু হলো। এক্সপার্ট প্রতিনিধি হিসাবে সিভিল সার্জনের স্থলে একজন মেডিকেল অফিসার উপস্থিত থাকলেন। নানা অনিয়মের অজুহাতে ডাক্তার, টেকনোলজিস্ট, ম্যানেজার গ্রেপ্তার করে করে আর্মি ভ্যানে উঠানো শুরু হল। আর্মি পার্সনগণ আসামী ধরে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের নিকট নিয়ে আসেন। ম্যাজিস্ট্রেট গ্রেপ্তারের পরওয়ানা দিয়ে ভ্যানে থানায় নেয়ার নির্দেশ দেন।

ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে অনেক কর্মচারী কর্মক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। এক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ম্যানেজার দুপুরের আহার করার জন্য বাসায় গিয়েছিলেন। প্রশ্রাবের বেগ ছিল তলা পেটে। কিন্তু বেগ নিয়েই তিনি খেতে বসলেন। কারন, তার প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছিল। তিনি ভেবেচিলেন খাওয়া দাওয়া শেষ করে বাথরুমের কাজটা করবেন। খাওয়া শেষ করার সাথে সাথে টেলিফোন পেলেন তাড়াতাড়ি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চলে যাওয়ার জন্য, কারন সেখানে আর্মি ঢুকে লাইসেন্স চাচ্ছে। প্রশ্রাব না করেই তিনি রিক্সা নিয়ে চলে এলেন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। ঢুকেই দেখেন ইয়া বড় বড় আর্মির লোক রক্ত চক্ষু করে তাকিয়ে আছে।
– আপনি কে?
– আমি এই সেন্টারের ম্যানেজার।
– লাইসেন্স আছে?
– আছে।
– লাইসেন্স দেখান।

ম্যানেজার ভয়ে সব কিছু ভুলে গেলেন। লাইসেন্স কোন সেল্ফে কোন ফাইলে রেখেছিলেন তা মনে করতে পারলেন না। না পাওয়াতে তাকে গ্রেফতার করা হল।
– আমি একটু টয়লেটে যাব।
– রাখেন টয়লেট। পরে যাবেন। আগে ভ্যানে উঠে বসেন।
ম্যানেজার দেখলেন তার অনেক বন্ধুও সারিবদ্ধভাবে বসে আছে ভ্যানে থানায় যাবার অপেক্ষায়। একে অপরের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। মাগরিবের নামাজের আজানের পর সবাইকে নিয়ে আর্মির ভ্যান রওয়ানা হল থানার দিকে। ম্যানেজার বললেন
– আমি একটু টয়লেটে যাব। প্রশ্রাব করব।
– রাখেন আপনার প্রশ্রাব। প্রশ্রাব থানায় গিয়ে করবেন।
থানায় নিয়ে সব আসামী একটি কক্ষে গাদাগাদি করে রাখা হলো। প্রায় ৫৩ জনের মত হবে। এদিকে সন্ধায় একজন মন্ত্রী মহোদয়কেও রাজনৈতিক আসামী হিসাবে থানায় আনা হয়েছে। থানার পুলিশগণ তাকে নিয়েই ব্যস্ত। কেউ এই ৫৩ জনের খোজ নিলেন না। রাত ১২ টার দিকে একজন সেন্ট্রি এসে “কে কে প্রশ্রাব করবেন এই দিকে আসেন” বলে রুমের পিছনের দরজা খুলে দিলেন। ম্যাজেজার প্রশ্রাব করার জন্য দরজা দিয়ে প্রবেশ করে দেখলেন একটি রুম। তার মেজে পিছনের দিকে ঢালু। ৬/৭ জন আসামী, তারই পরিচিত, একজন পরিচিত ডাক্তারও আছেন, এক যোগে দাঁড়িয়ে প্রশ্রাব করছেন, কেউ কাউকে না দেখে, উপরের দিকে চোখ তুলে, অথবা চোখ বন্ধ করে অথবা মাথা নিচু করে বিনয়ের সাথে। এই দৃশ্য দেখে ম্যানেজার লজ্জায় প্রশ্রাব না করেই ফিরে আসলেন।

সারারাত তাদের দাড়িয়েই কাটাতে হলো। সকাল দশটায় তাদেরকে কোর্টে উঠানোর জন্য কোর্ট চত্তরে আনা হলো। সেখানেও একটি রুমে সবাইকে রাখা হল। ম্যানেজার সেন্ট্রিকে বললেন
– আমি একটু টয়লেটে যাব।
– এখন না। একটু পরে আপনাদেরকে জেল খানায় নেয়া হবে। ওখানে গিয়ে করতে পারবেন।

দুপুর দুইটার দিকে কোর্টের পেশকার এসে সবার সই নিলেন।
– এখানে কি লিখা আছে?
– লিখা আছে “আমি আমার অপরাধ স্বীকার করিলাম।”

সন্ধার দিকে সবাইকে নিয়ে পুলিশের ভ্যান জেলখানার দিকে রওয়ানা হলো। ম্যানেজারের মনে আশা জাগলো এবার জেলখানায় গিয়ে টয়লেট করা যাবে। রাস্তা ভাংগা ভাংগা ছিল। ভ্যানের ঝাকুনিতে মানেজারের প্রাশ্রাবের বেগে বাধ ভেংগে যেতে চায়। অসহ্য যন্ত্রণা অনুভূত হয়।

অবশেষে সবাই জেলখানায় পৌছলেন। সেখানে গিয়ে ম্যানেজার সেখানকার পুলিশকে গিয়ে বললেন
– আমি একটু প্রশ্রাব করব।
– এসেই প্রশ্রাব? এখন না। আগে রুমে ঢুকুন। তারপর।

৫৩ জন আসামীর সবারই ১৫ দিনের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে। জেলখানার ফর্মালিটি শেষ করতে অনেক সময় লাগলো। রাত ১১টার দিকে ম্যানেজারের ডাক পরলো। সই স্বাক্ষর করে কয়েদীর পোষাক পরে ম্যানেজার কয়েদখানায় প্রবেশ করলেন। রাত ১২ টার দিকে তিনি টয়লেটে প্রবেশ করলেন। প্রশ্রাব করবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু হায়! প্রশ্রাব হল না। অনেক্ষন প্রশ্রাবের বেগ ধরে রাখতে রাখতে প্রশাব বেড় করার সিস্টেম পারালাইসিস হয়ে গেছে।
৯/৮/২০১৮ ইং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *