ইভটিজিং

ইভটিজিং
(ছোট গল্প)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

তখন সারাদেশে যেন ইভ টিজিং মহামারীর আকার ধারন করেছিল । একদিন খবরের কাগজে সংবাদ বের হলো যে কোন একটি জেলায় কয়েকজন বখাটে স্কুলগামী এক মেয়েকে উত্যক্ত করেছিল। এর প্রতিবাদে মেয়েটির মা স্কুল কর্তৃপক্ষের নিকট বিচার দিয়েছিলেন। এর প্রতিশোধ নিতে তিন বখাটে মেয়েটির মাকে হত্যা করে। মেয়েটিকে সাথে নিয়ে স্কুলে যাবার পথে মায়ের উপর দিয়ে মটর সাইকেল চালিয়ে দিয়ে হত্যা করে। এরপর থেকেই খবরের কাগজে এই রকম বখাটের দ্বারা মেয়েদের উত্যক্তের সংবাদ বেড়েই চললো। এই উত্যক্ত করাকে খবরের কাগজে ইভটিজিং লিখা হতো। দেশে যেন আর কোন সমস্যা নেই। মনে হলো যেন সাংবাদিকদের তেমন কাজ নেই । পেপার জুড়ে ইভটিজিং-এর খবর । ডাক্তারের চেম্বারে মেয়ে রুগী ঢুকে বের হয়ে ইভটিজিং-এর অভিযোগ। পরে তদন্ত করে দেখা গেলো যে অভিযোগ ভিত্তিহীন। পরীক্ষা হলে শিক্ষক নাকি ছাত্রীর দিকে কেমন করে তাকিয়েছিল। পেপারে উঠেছিল ইভটিজিং-এর অভিযোগ। পরে তদন্ত করে দেখা গেলো যে আসলে শিক্ষকটির চোখ জন্ম থেকেই টেড়া। অতিরিক্ত ইভটিজিং-এর সংবাদ শুনতে শুনতে অনেকের মনে ইভটিজিং ঢুকে পড়েছিল।

ডাঃ নাছির সাহেব নামকরা শিশু বিশেষজ্ঞ ছিলেন। শহরের রাস্তার মোড়েই তার বাড়ি ছিল। দোতলায় তিনি থাকতেন। দোতলায় সিড়ির সাথেই তার চেম্বার ছিল। তার পিছনের জানালা দিয়ে পুরা রাস্তা দেখা যেতো। দখিণের জানালা। বাতাস খাওয়ার জন্য তিনি জানালা খোলা রাখতেন। মাঝে মাঝে রুগী না থাকলে তিনি জানালা দিয়ে দুরের বাগান দেখতেন। তিনিও মোটামুটি কয়েকদিনের ইভটিজিং-এর সংবাদ দেখে দেখে বিরক্ত।

তিনি সেদিন প্রাইভেট চেম্বারে রুগী দেখছিলেন। এক কম বয়সের দম্পতি তাদের বাচ্চাকে দেখালেন। বাচ্চার কয়েকদিন ধরে জ্বর কমছিল না। সর্দি কাশিও ছিল না। প্রশ্রাব একটু ঘন ও দুর্গগন্ধ ছিল। ডাক্তার সাব বাচ্চাটাকে দেখে প্যাথলজি ল্যাব থেকে প্রশ্রাব পরীক্ষা করিয়ে রিপোর্ট দেখাতে বললেন।

বিকেলে বাচ্চাটাকে বাসায় রেখে প্রস্রাবের রিপোর্ট নিয়ে তারা ডাক্তারের চেম্বারে এলেন। রিপোর্ট ডাক্তারের হাতে দিয়ে বাচ্চার মা ডাক্তারের পিছনে এসে পিঠ ঘেসে দাঁড়ালেন । বাচ্চার বাবা ডাক্তারের সামনে বসলেন। মেয়েটি জানালা বন্ধ করে দাড়ানোয় ডাক্তার সাব তাকে সামনে এসে বসার অনুরোধ করলেন। মেয়েটি না বসে একটু সাইডে দাড়ালেন। ডাক্তার সাহেব মনোযোগ দিয়ে রিপোর্ট দেখছিলেন। মেয়েটি প্রশ্ন করলেন
– রিপোর্ট কেমন ?
– ইনফেকশন হয়েছে ।
মেয়েটি উচ্চ স্বরে হাউ মাউ করে কান্না শুরু করল ।
– কি হল ?
মেয়েটি আরও উচ্চ স্বরে হাউ মাউ করে কান্না করতে লাগলো ।
রাস্তা থেকে দলে দলে পথচারী এসে সিড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে চেম্বার ভরে গেলো । তারা মেয়েটিকে প্রশ্ন করলো
– কাঁদছেন কেন ?
মহিলা আরও উচ্চ স্বরে হাউ মাউ করে কান্না করতে লাগলো ।
– বলুন, ডাক্তার আপনাকে কি করেছে?
শুনে ডাক্তার সাহেবের পা কাপা শুরু হল । তার কাছে মনে হলো ইভটিজিং-এর কেসে পড়ে গেছেন ।
– ডাক্তার সাব, আপনি মেয়েটাকে কি করেছেন?
– আমি তো তাকে কিছু করিনি ।
– তাহলে ইনি এভাবে কাঁদছেন কেন?
– আপনারা তার স্বামীকেই প্রশ্ন করুন ।
– তার স্বামী কে?
– এইতো, সামনেই বসা ।
স্বামী প্রশ্ন করলেন
– এই, কাঁদছ কেন?
– রিপোর্ট দেখে?
ডাক্তার বললেন
– রিপোর্ট তো খারাপ না ।
– কেন, আপনিই তো বললেন ইনফেকশন হয়েছে । প্রস্রাবে ইনফেকশন মানে তো কিডনিতে ইনফেকশন । কিডনি ইনফেকশন মানে তো কিডনি ড্যামেজ । কিডনি ড্যামেজ মানে তো আমার বাবু নাই । হু হু হু।
– এন্টিবায়োটিক দিলেই ইনফেকশন ভাল হয়ে যাবে ।
– তাই ?
পথচারীরা “বেআক্কেল মহিলা” বলে চলে গেল।
ডাক্তার সাহেব ইভটিজিং-এর বিপদ থেকে বেঁচে গেলেন ।
ভাগ্যিস মেয়েটির স্বামী সাথে ছিল!
১০/৮/২০১৮ ইং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *