ডাইলের পানি

ডাইলের পানি
(মনে পড়ে)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

হোস্টেলের ডাইনিং-এ ডাল একটা কমন মেনু। খাবার শেষ করতে হবে মসূরের ডাল দিয়ে। আমরা ছাত্র জীবনে ডালকে ডাইল বলতাম। বাংলাদেশে যখন ব্যাপক আকারে ফেন্সিডিল নেশার প্রসার লাভ করে তখন নেশাখোররা ফেন্সিডিলকে ডাইল নামে চালিয়ে দেয়। অনেককে বলতে দেখা যায় “ছেলেটি ডাইলখোর।” অর্থাৎ ছেলিটি ফেন্সিডিল পান করে নেশা করে।

যাহোক, হোস্টেলে আমরা মসূরের ডালকে ডাইল বলতাম। ১৯৭৭ সনে আউলিয়াবাদের আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজে ভর্তি হয়ে হোস্টেলে ওঠলাম। এইচএসসি প্রথম বর্ষ। আমাদের ব্যাচের সবাই নতুন। সবার সাথে পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়ে ওঠে নাই। তবে বুলবুলের সাথে আমার প্রথম রাতেই বন্ধুত্ব হয়ে যায়। তখনো ক্লাস শুরু হয় নাই। খুব গরম পড়েছিল। উপজেলা লেভেল পর্যন্ত বিদ্যুৎ পৌছেনি। আর আমাদের কলেজ ছিল উপজেলা থেকে ৪/৫ কিলোমিটার ভিতরে। বিদ্যুতের চিন্তাও করা যায় না। প্রচন্ড গরমে মাঠে গিয়ে বসলাম একটা গরুরগাড়ির মাচানে। বুলবুলও এলো। পরিচয় হলো। কথা হলো নানা রকম। মনের মিল খুঁজে পেলাম। বুলবুল বললো
– গান গাইতে পারো?
– পারি কিছু কিছু।
– নজরুলগীতি পার? নজরুলগীতি আমার প্রিয়।
– আমারো।
– গাও না একটা।
আমি কৌশল করে যে গানে তার নাম আছে সেই গানটা ধরলাম।
নয়ন ভরা জল গো তোমার
আঁচল ভরা ফুল।
ফুল নেব না অশ্রু নেব
ভেবে হই আকুল।।
এইভাবে গাইতে গাইতে “চঞ্চল বুলবুল” পর্যন্ত গেলে সে বলল “এক জনের কথা মনে করিয়ে দিলা। সে এই পর্যন্ত গাওয়ার পর আমার চোখের দিকে তাকাতো।” এনিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত কথা হল। গান হলো অনেক। মাচায় শুয়ে শুয়ে আমিও গাইলাম সেও গাইল। উপরে আকাশে সাদামেঘে পুর্ণিমা চাঁদের লুকুচুরি দেখছিলাম। বুলবুলের নাম কাজী সাফিউল্লাহ। সে এখন বাংলাদেশ বিমানের ইঞ্জিনিয়ার।
বেলায়েত বুলবুলের স্কুল জীবনের বন্ধু ছিল। তার সাথেও আমার বন্ধুত্ব হয়। ডাঃ বেলায়েত হোসেন এখন সখিপুর উজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কর্মকর্তা।

বেলায়েতের একটা ঘটনা মনে পড়লো। আমরা ডাইনিং-এ বসে খাচ্ছিলাম। আবুল হোসেন স্যার দেখতে এলেন। তিনি ছিলেন হোষ্টেল সুপার। তিনি আমাদের কুশলাদি জানলেন। বেলায়েত চেয়ারের উপর পা তুলে দাঁড়ালো। বো হয়ে দুই হাতের দুই আংগুল ডাইলের পানিতে চুবালো। তার দুই কানে দুই আংগুল ঢুকালো। স্যার বললেন
– এই ছেলে কি করছো।
– স্যার, পানিতে ডুব দেব। ডুব দেয়ার আগে আমরা কান ভিজিয়ে নেই।
– এখানে পানি পেলে কই?
– এইতো স্যার পানি।
– এটাতো ডাইল। ছেলেটার মাথায় ছিট আছে নাকি?
– তাই স্যার? আমি তো মনে করেছি পানি।

স্যার হেসে দেয়াতে পরিবেশ হাল্কা হলো। স্যার বেলায়েতকে জড়িয়ে ধরে আদর করলেন। আমরা হাসাহাসি করলাম। স্যার আমাদেরকে হোস্টেল জীবনের খাওয়াদাওয়ার অসুবিধার কথাগুলির ব্যাখ্যা দিয়ে আশ্বস্ত করলেন। তিনি বললেন “সব হোস্টেলের ডাল এই রকমই হয়।” বেলায়েত আমাদের লিডার হিসাবে স্বীকৃতী পেল। কোন কিছুর অভিযোগ দিতে হলে বেলায়েতের মাধ্যমে দেয়া হতো। আমরা সাথে থাকতাম।
১৯৮০ সনে যখন আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে ওঠলাম ওখানেও একই রকম ডাইল। ডাইল নয় যেন ডাইলের পানি। সদর সেই ডাইল দিয়ে একদম খেতে পারতো না। শুধু ডাইলের পানির দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকতো। জিভে পানি আনার জন্য পাতে লেবু চিপতো। লেবুর রস শেষ হয়ে গেলে লেবুর খোসা ডাইলের পানিতে চুবিয়ে আবার চিপতো। তারপর তার জিভে সামান্য পানি এলে জোড় করে মুখে দিতো। অনেকক্ষণ গালে ধরে রেখে তারপর গিলতো। আমি ও নজরুল আর চোখে দেখতাম। মিটি মিটি হাসতাম। দেখলে সদর মাইন্ড করতো। ডাঃ সদর উদ্দিন এখন টাঙাইল সদর হাসপাতালের সহকারী পরিচালক। ডাঃ নজরুল ঐ হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞ কন্সাল্টেন্ট।

বাই রোটেশনে ছাত্ররাই এক মাসের জন্য মেসের ম্যানেজার হতো। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমি যখন ম্যানেজার হব তখন ডাইলের ঘনত্ব বাড়াবো। তাই যখন মেসের ম্যানেজার হলাম বাজেটে ডাইলের পরিমাণ বাড়ালাম। এবার ডাইল ঘন হলো। স্বাদও বেড়ে গেলো। অনেকেই প্রশংসা করলো। এবার ডাইল উন্নত হয়েছে। ম্যানেজারকে ধন্যবাদ।

কয়েকদিন পর বাবুর্চি আমাকে বলল
– স্যার, আপনি এক মাস চালাতে পারবেন না।
– কেন?
– ডাইল ঘন ও স্বাদ হওয়াতে বোর্ডাররা বেশী বেশী ভাত খাচ্ছে। তাতে চাউল বেশী খরচ হচ্ছে। মনে হচ্ছে বিশ দিনেই বাজেটের টাকা শেষ হয়ে যাবে। শুনেছি এনাটমির নাছির স্যার ছাত্রজীবনে ম্যানেজার হয়ে বেশী বেশী খাওয়ায়ে পনরদিনেই টাকা শেষ করে পুকুরের মাঝখান দিয়ে সাতরিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। আপনার দশাও তাই হবে।
– হায়, হায়। তুমি যেভাবে পারো আমার এক মাস চালিয়ে দাও। আমি আর কোন দিন ম্যানেজার হব না।

আপনারা হয়তো ভাবছেন আমি ছিলাম ছাত্র। কর্মচারীরা স্যার ডাকে কেন? তখন কর্মচারীরা ছাত্রদেরকে স্যার ডাকতো। আমি যখন শিক্ষক হয়ে ১৯৯২ সনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এলাম তখন দেখি কর্মচারীরা ছাত্রদেরকে মামা ডাকে। প্রফেসর মীর্জা হামিদুল হক স্যার একবার এক ছাত্রীকে বললেন
– এটা তোমাকে কে বলেছে?
– স্যার, মামা বলেছে।
– তোমার কোন মামা?
– স্যার, টেকনিশিয়ান মামা?
– টেকনিশিয়ান তোমার কেমন মামা?
– স্যার।
– টেকনিশিয়ান তোমার কেমন মামা?
আমি বললাম
– স্যার, ওরা কর্মচারীদেরকে কমন মামা ডাকে।
– কেন, আমরা তো ভাই ডাকতাম। তারা আমাদেরকে স্যার ডাকতো। মামা ডাকবে কেনো।
– তারাও ওদেরকে মামা ডাকে ওরাও তাদেরকে মামা ডাকে। মামা ডেকেই বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
– এই মেয়ে, ওদেরকে মামা না ডেকে বরং চাচা ডাকবে। মামার চেয়ে চাচা ভালো। কারন, মামারা মায়ের সম্পত্তি মেরে দেয়। কিন্তু চাচারা বাবার সম্পত্তি সমানভাবে ভাগ করে দেয়।
স্যার একটু মুস্কি হাসলেন।
আমি মেয়েটিকে বললাম। স্যার ঠাট্টা করছেন। তোমরা তাদেরকে মামাই ডাকবে। তোমাদের হোস্টেলে কি এখনো মামারা ডাইলের পানি রান্না করে?
১২/৮/২০১৮ ইং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *