হাত দেখা

হাত দেখা
(মনে পড়ে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
১৯৮৮ সনে আমার মেডিকেল অফিসার হিসাবে প্রথম পোস্টিং হয় বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জের চরামদ্দি ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে। আউটডোর রুগী দেখতাম। লাইনে শত শত রুগী দাড়াতো। নাম, বয়স ও কষ্ট কি জিজ্ঞাসা করেই ঔষধ লিখতে হতো। রুগী পরীক্ষা করে চিকিৎসা দিতে গেলে সারাদিনেও শেষ করা যেতো না। কোন কোন মহিলা রুগী অনুরোধ করতেন “ডাক্তার সাব, আমার হাতটা একটু দেখবেন?” আমি বলতাম “আমি কি গণক যে আপনার হাত দেখবো? ”

ছোট বেলায় আমাদের গ্রামে ঝোলা কাঁধে নিয়ে গণক আসতো। তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে গ্রামবাসীর ভাগ্য গণনা করতো। বাইর বাড়িতে এসে হাক ছেড়ে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তো। আমরা তাদের কাছে ভির করতাম। আমরা হাত বাড়িয়ে দিতাম। তারা আমাদের হাতের রেখা পর্যবেক্ষণ করে আমাদের ভাগ্য গণনা করে দিতো। বাশার ভাই একটু চঞ্চল প্রকৃতির ছিলেন। বাশার ভাইর হাত দেখে এক গণক বললেন “এই ছেলে একটু দুষ্ট টাইপের। সে একদিন সাপের গর্তে প্রশ্রাব করেছে। সাপের খুব কষ্ট হয়েছে। সেই থেকে সাপটি মাথায় তিন তোলা বিষ নিয়ে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ঘুরাফিরা করছে। সুযোগ পেলেই ছোবল দিয়ে দিবে। অত্যন্ত বিষাক্ত সাপ। এই সাপ থেকে রক্ষা পেতে তাকে এই তাবিজটি নিতে হবে। যতদিন তাবিজটি ডেনায় বাধা থাকবে ততদিন সে ছোবল দিতে পারবে না। তাবিজটির দাম এত টাকা। ” বাশার ভাই ভয়ে তাবিজটি নিয়ে ডেনায় বাধলেন। আমার মনে হলো আমারও এমন তাবিজ দরকার। আমি চঞ্চল না হলেও অমন কাজ অনেকবার করেছি। কিন্তু লোকলজ্জায় তাবিজ নেই নি। তাই রাতে বেড় হতাম না। কারন, আমার ডেনায় তো তাবিজ ছিল না।

যাহোক, বরিশালের কথায় আসি। এক রুগী বললেন “ডাক্তার সাব, হাত দেখতে বললে আপনি রাগ করেন কা, আপনের আগের ডাক্তার হাত দেখে ঔষধ লিখতেন। ” আমি রাগ করে বললাম “তিনি হয়ত গণক ছিলেন। আমি গণক না। ”

একদিন আমি আমার আগের মেডিকেল অফিসারের বাসায় দেখা করতে গেলাম। তিনি চাকরি থেকে অবসরে গেছেন। তিনি আমাকে অনেক খাওয়ালেন। খুব ভাল ব্যবহার করলেন। একপর্যায়ে বললেন “আপনি নাকি আমাকে গণক বলেছেন? ” শুনে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আমি বললাম “না, মানে এক রুগী আমাকে বলছিল হাত দেখতে। তাই আমি বলেছি হাত দেখে গণকে। আপনাকে আমি গণক বলি নি। ” তিনি বললেন “এখানে হাত দেখা মানে রুগীর হাতের পালস বা নাড়ী দেখা। হস্ত রেখা নয়। আপনি মনে হয় তাদের কথা বুঝতে পারেন নি। তারা আপনাকে তার নাড়ী দেখে ঔষধ দিতে বলেছে।” আমি সব বুঝতে পেলাম। তার মানে এতদিন রুগীদের সাথে শুধু শুধু রাগ করেছি। আমি নাড়ী দেখে ঔষধ লিখলে তারা সন্তুষ্ট হতো। বললাম “সরি, আমি এখন বুঝতে পেরেছি। ”

ভাবলাম “আমি না হয় গণক বলেছি। কিন্তু ইনি শুনলেন কেমনে?”
৩১/৮/২০১৮ ইং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *