লেকবেকা মানুষ

লেক বেকা মানুষ
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আপনারা যারা গ্রামে থেকেছেন হয়ত লক্ষ্য করেছেন একই পরিবারে অনেকগুলি লোকের চেহারা কেমন যেন লেকবেকে। কেউ কেউ বেশী লেকবেকে কেউ কেউ হাল্কা লেকবেকে। কেউ কেউ সামান্য। আবার কেউ কেউ সম্পুর্ন স্বাভাবিক। এইগুলি বংশগত শারীরিক সমস্যা। এই সমস্যাটির নাম মারফ্যান সিন্ড্রোম। ৫০০০ থেকে ১০০০০ লোকের মধ্যে একজন লোক এই রকম থাকতে পারে। এরা সাধারণত লিকলিকে লম্বা হয়। এদের হাত, পা ও আঙুল লম্বা লম্বা হয়। চাপাভাংগা থাকে। মেরুদণ্ড একদিকে বেকে যায়। হাটার সময় দুই হাটু লেগে যায়। মাথার খুলিও আকাবাকা। বুকের কড়া বের হয়ে থাকে। পাখনার হার উঠানো থাকে। জয়েন্ট বিশেষকরে কবজি নরম থাকে। কবজি অনেকে উলটা দিকে বেকিয়ে ফেলতে পারে। এরা সহজে অংগ প্রত্যঙ্গ নাড়াতে পারে। তাই ভালো নাচতেও পারে। অনেককে দেখতে আমেরিকান প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের মতো মনে হয়। এদের বুদ্ধি সুদ্ধি ভালোই থাকে। বেচে থাকার জন্য এদের সমস্যা নেই। তবে এই ধরনের মানুষের হার্টের ভালবের সমস্যা থাকতে পারে। তাই অনেকে মায়ের গর্ভেই মারা যায় অথবা জন্ম হবার কিছুক্ষণ পরেই মারা যায়।

ছেলে বা মেয়ে উভয়েরই এই সমস্যা হতে পারে। মানুষ যখন মাতৃগর্ভে তৈরি হয় তখন প্রথম কোষের অর্ধেক আসে বাবা থেকে আর অর্ধেক আসে মা থেকে। শরীরের প্রতিটা কোষের প্রাণকেন্দ্রে থাকে ২৩ জোড়া অতিক্ষুদ্র সুতার মত ক্রোমোজোম। এই ক্রোমজোমে থাকে জিন নামে অতিক্ষুদ্র অংশ। এই জিন শরীরের প্রটিন তৈরি নিয়ন্ত্রণ করে। একেক জিন একেক রকম প্রটিন তৈরি করতে সাহায্য করে। এই প্রটিন দিয়েই শরীরের গঠন তৈরি হয়েছে।

ইলাস্টিক ফাইবার শরীরের আকার আকৃতি ঠিক রাখে। ইলাস্টিক ফাইবারে থাকে ফিব্রিলিন নামে প্রটিন। বংশগতভাবে কারো ফিব্রিলিন জিন ডিফেক্টিভ থাকলে তার কমবেশি এই সিম্পটম দেখা দেয়। প্রতিটি জিন জোড়ায় জোড়ায় থাকে। জোড়ার একটি জিনকে আরেকটি জিনের এলিলি বলে। একটি এলিলি আসে বাবা থেকে আরেকটি আসে মা থেকে। যে কোন এলিলি নস্ট থাকলে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই এই সমস্যাকে ডমিনেন্ট সমস্যা বলা হয়। বংশগত সমস্যা যেখানে সমস্যা হওয়ার জন্য দুইটি এলিলিই নস্ট থাকতে হয় সেই গুলিকে রিসেসিভ সমস্যা বলা হয়। ক্রমোজম দুই প্রকার আছে – অটোজোম ও সেক্স ক্রমোজোম। ফিব্রিলিন জিন অটোজোমে থাকে। তাই মারফ্যান সিন্ড্রোমকে অটোজোমাল ডমিনেন্ট ডিফেক্ট বলা হয়। যেহেতু অটোজোম ছেলে বা মেয়ে উভয়েরই আছে সেহেতু উভয়েরই এই সমস্যা হতে পারে।
হিসাব করে দেখা গেছে সাধারণত একটি দম্পতির ৪ জন সন্তান হলে ২ জন আক্রান্ত হতে পারে। একজন বেশী আক্রান্ত একজন কম আক্রান্ত। এই ধরনের সমস্যাযুক্ত দুইটি পরিবারের সদস্যের সাথে বিয়ে হলে ডিফেক্টিভ জিনের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যায়। তাই সন্তানরা বেশী বেশী আক্রান্ত হতে পারে। যেহেতু এটা একটা বংশগত সমস্যা সেহেতু এটার তেমন চিকিৎসা নেই। তবে পরিবারের সদস্যদের বিয়ের বেপারে সতর্ক হলে সমাজে এই ধরনের সমস্যা কমিয়ে আনা যেতে পারে। সদস্যদের মধ্যে হৃদরোগ আছে কিনা তা পরীক্ষা করে নিতে হবে। যদি থেকে থাকে তার চিকিৎসা করাতে হবে।
৫/৯/২০১৮ ইং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *