ভুতের ভয়

 

ভুতের ভয়
(মনে পড়ে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

খুব সম্ভব ১৯৮২ সনের কথা। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে থার্ড ইয়ারে পড়ি। এল হারুন স্যার আর পি ছিলেন। জাহাঙ্গীর স্যার মেডিসিন বিভাগের রেজিস্ট্রার ছিলেন। দুইজন স্যারই খুব যত্ন সহকারে আন্তরিকতার সাথে আমাদেরকে পড়াতেন। দুইজনকেই আমার কাছে খুব ভাল মানুষ বলে মনে হতো। রুগীর শরীর পরীক্ষা থার্ড ইয়ার থেকেই শুরু হয়। আমার এখনো মনে আছে এই দুই স্যার সকাল বিকাল ওয়ার্ডে এসে আমাদেরকে কাছে ডেকে রুগীর বেডের পাশে দাঁড়িয়ে কত দক্ষতার সাথে রুগীর হিস্ট্রি নিয়ে বিভিন্ন অংগ প্রত্যঙ্গ পরীক্ষা করে শিখাতেন । জাহাঙ্গীর স্যার বলতেন “রুগী হলো জীবন্ত বই। তোমরা রুগীর বেডের কাছে টুল নিয়ে বসে বসে পড়বে। বইয়ের বিবরণের সাথে রুগীর রোগের বিবরণ মিলিয়ে মিলিয়ে পড়বে। দেখবে তোমার দক্ষতা পাকাপাকি হবে। ” আমি সন্ধ্যা থেকে রাত ১০ টা ১১ টা নাগাদ মেডিসিন ওয়ার্ডে রুগীর বেডের পাশে বসে পড়তাম। রুগীর সাথে নানান রকম গল্প করতাম। গল্পের ছলে তার রোগ শুরু হওয়া থেকে শেষ পর্যন্ত সব কিছু জেনে নিতাম। রুগীরাও আমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকতো। ওয়ার্ডে সুপি ডিউটি করারত সিনিয়র ডাক্তার ভাইয়ারা আমাকে বিবিধ জিনিস শিখাতেন। শিখাতে গিয়ে তারাও তাদের জানাটা পাকাপোক্ত করতেন। এখন তারাই দেশের বড় বড় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হয়েছেন।

এমনি এক রাতে ওয়ার্ডে পড়তে পড়তে এগারোটা বাজিয়ে দিলাম। রাতে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হয়েছিল। আমি যখন বেরুলাম তখন বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল। বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল। অমাবশ্যা রাত ছিল। ঘুটঘুটে অন্ধকার। চরপাড়ার হাসপাতাল থেকে বাঘমারার হোস্টেলে যেতে হবে।

ঐসময় হোস্টেলে যাওয়ার পথে মাঘমারায় তেমন বিল্ডিং ছিল না। বেশ কিছু টিনের ঘর ও হাফ বিল্ডিং ছিল। সকালবেলায় যখন কলেজে যেতাম তখন দেখা যেতো ছোট ছোট পোলাপান রাস্তার ধারে খোলা ড্রেইনে পায়খানা করছে। রাস্তার মোরে ছিল লাল মিয়ার নাস্তার হোটেল। ঐগুলি দেখে এসে অনেকেরই লাল মিয়ার হোটেলে নাস্তা করতে হতো। এরপর ছিল গোরস্থান ও হাসপাতাল কোয়ার্টারের মাঝখানের রাস্তা। এই রাস্তায় খরখরা হিটের খোয়া বিছানো ছিল। ছিল খানা খন্দক। রাস্তার দুই পাশে বাড়িঘর ছিল না। ছিল ঝোপঝাড়। সাপ, শিয়াল ও বেজির অভয়ারণ্য ছিল। তখন নিউক্লিয়ার মেডিসিন সেন্টারো ছিল না।

যাহোক, আমাকে রাত এগারোটায়ই হোস্টেলে ফিরতে হবে। সবাই হয়তো খেয়ে নিয়েছে। শুধু আমার জন্য নুরু বসে বসে খাবার পাহারা দিচ্ছে। আমি সাহস করে অন্ধকারেই কবর খানার রাস্তায় প্রবেশ করলাম। সাঁই করে একটা ভুত আমার সামনে দিয়ে কোয়ার্টারের দিক থেকে এসে কবর খানায় ঢুকে পড়লো। আমার গা কাটা দিয়ে উঠলো। আমি থমকে দাড়ালাম। শুনেছি কিছু কিছু মানুষ মরার পর ভুত হয়ে থাকে। কবরখানার আশে পাশে ঝোপঝাড়ে তাদের বিচরণ করতে দেখা যায়। মনে পড়লো এনাটমি পড়ার সময় গত দুই বছর যে কংকালটি আমি ব্যবহার করেছি সেই কংকালটি যদি কোন এক চোর এই কবরখানা থেকে চুরি করে কংকাল বিক্রেতার কাছে বিক্রি করে থাকে এবং সেই কংকালটি যদি আমি নিয়ে থাকি সেই কংকালের আত্বা যদি ভুত হয়ে থাকে এবং আজ এখন আমার সামনে এসে হাজির হয় তখন কি হবে আমার! গা ছমছম করছিল। রাস্তার দুই পাশে ভাংগা ইটের দেয়াল ছিল। মনে হলো কেমন যেনো দেখছি আবছা আবছা। দুই দেয়ালে দুই পা রেখে ত্রিশ চল্লিশ ফুট উচু কালোমতো কি যেন দাঁড়িয়ে আছে। আরো উপরের দিকে তাকাতে পারলাম না। যদি দেখি একফুট লম্বা লম্বা দব দবে সাদা দাঁত বের করে ভুত আমার দিকে তাকিয়ে হি হি করে হাসছে তখন তো আমার অবস্থা কেরাসিন হয়ে যাবে। তাই উপরের দিকে তাকালাম না। একবার মনে হলো আমি না বিজ্ঞানের ছাত্র। এসব বিশ্বাস করা আমার সাজে না। হয়তো ভয়ে এমন দেখছি। যাহোক, সাহস করে নিচু দিকে মাথা দিয়ে কাল্পনিক দুই পায়ের মাঝ দিয়ে বেরিয়ে এলাম। ডান দিকের কবর খানা থেকে শিয়াল ডেকে উঠলো “হো, কা হুয়া, হোক কাহুয়া, হো। ” শুনে আশে পাশের অনেক শিয়াল এক যোগে ডেকে উঠলো “হোক কা হুয়া হো।” বুঝতে দেরী হলো না যে একটু আগে যে ভুতটি আমার সামনে দিয়ে গেলো সেইটি আসলে শিয়াল পণ্ডিত ছিল। তিনিই মনের সুখে ডেকে উঠেছেন। আর তার সাথে সগোত্রীয়রা জাহইর মারছে। হঠাৎ দেখি বিদ্যুৎ এসে গেছে। ফক ফকা আলো। ভুত টুত কিছু নাই।
১৫/৯/২০১৮ ইং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *