একদিন হারিয়ে যেতে চেয়েছিলাম

 

একদিন হারিয়ে যেতে চেয়েছিলাম
(মনে পড়ে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
সেদিন শেষরাতে ও সকালে খুব বৃষ্টি হয়েছিল। তখন আমার বয়স আর কত হবে, ছয় কি সাত বছর। আমাদের চালার ক্ষেতের পানিগুলা নেমে বাঁশ আড়ার সাথের পাগার ভরে গিয়েছিল। নওপাড়াদের ঘুনির পানি এসে আমাদের ঘোনার ক্ষেতগুলি ভরে গিয়েছিল। পানি পেয়ে ভাইয়া ব্যাংগুলো লাফা লাফি করছিল আর ঘে গো করে ডাকছিল। ঘোনার পানি কল কলিয়ে কুয়ার পাড়ের ক্ষেতে নামছিল। বাইস্যা মাস কেবল শুরু হয়েছে। বছরের মাসগুলি দুই রকম ছিল। বাইস্যা মাসগুলিতে বৃষ্টি হতো। উনা মাসগুলিতে বৃষ্টি হতো না। উনা মাসে কোন ফসল হতো না। বাইস্যা মাসে প্রথম দিকে আউশ ও শেষের দিকে আমন ফসল ফলতো। চালার জমিতে ভাতুরি ধান, ফারাম পাট ও মাস কলাই ফলতো। ঘোনার জমিতে তোসা পাট ও আমন ধান ফলতো। বাইদের জমিতে সাধারণত আমন ধান ফলতো। যেদিন বৃষ্টি হলো সেদিন ক্ষেতে কোন ফসল ছিল না। বৃষ্টির পানি পারাতে খুব মজা পেতাম। বৃষ্টির পানিতে ভিজে মাঠের পেকের উপর খেলা করতাম। খের দড়ি দিয়ে পেচিয়ে গোল করে ফুটবল বানাতাম। খেরের ফুটবল দিয়ে পেকে খেলে কাদায় শরীর লেটাপেটা করতাম। পা ভিজা থাকতে থাকতে আংগুলের চিপায় সাদা ঘা হতো। আমরা বলতাম ব্যাঙের গড় লাগছে। ঘায়ে কলমের কালি লাগিয়ে কালো করে রাখতাম। ব্যাথা হতো। হেঁসেলের আগুনে সেক দিতাম। ডাক্তার হয়ে শিখেছি সেগুলি ছিল ক্যান্ডিডা এলবিকান্স নামের ফাংগাল ইনফেকশন।

দুপুরের আগে আমি, শাজাহান ও রাজ্জাক পানি পারাতে বেরিয়ে পড়লাম। ঘোনার ক্ষেত পাড়ায়ে কুয়ার পারের ক্ষেতে গেলাম। তারপর গেলাম চটানের ক্ষেতে। উজান দিক থেকে কল কল করে পানি আসছিল। উজান দিকেই চলতে থাকলাম। বুইদ্দা চালার পানিতে বড়বাইদ ভরে গিয়েছিল। বড় বাইদ পাড় হয়ে কলিম উদ্দিন তাঐদের বাড়ি ছেড়ে গেলাম। উজান বাইদে পৌছলাম। আরো উত্তর দিকে বিন্না খাইরা পাড়ার বাইদে পৌছলাম। পানি পারাতে বেশ মজাই লাগছিল। এক সময় শাজাহান বললো “এই আমরা হারিয়ে যাব না তো?” রাজ্জাক বললো “না বেশী দূর আসি নি। ” আমি সবাইকে দাড়াতে বললাম। মাথায় একটা আইডিয়া এলো। আমি বললাম “এসো আজ আমরা পানিতে উত্তর দিকে হাটতে হাটতে হারিয়ে যাই। ” সবার ইচ্ছা একই। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম হারিয়ে যেতে। উত্তর দিকে যেতেই থাকলাম। খুব সম্ভব পাইন্না বাইদ পর্যন্ত গেলাম। আমি বললাম “অনেক দূর তো এলাম। হারিয়ে তো গেলাম না। তোদের কি মনে হয়, হারিয়ে গেছি? তারা বলল “না, হারাই নি। যেখান দিয়ে এসেছি সেখান দিয়েই ফিরে যেতে পারব। হারিয়ে যেতে হলে আরো উজানে যেতে হবে। ” আমরা আরো গেলাম। কিন্তু হারালাম না। শাজাহান বললো “আমার ক্ষিদে পেয়েছে। ” রাজ্জাক বললো “আমারও। ” আমি বললাম “ক্ষিদে পেয়ে আমার পেটে চোঁ চোঁ করছে। চল তাড়াতাড়ি ফিরে যাই। সারাদিন উজানে গেলেও হারিয়ে যাবো না। চল বাড়ি গিয়ে ভাত খাই। হারিয়ে যাবার দরকার নাই। ”

যে পথে উজানে গিয়েছিলাম সেই পথে বাড়ি ফিরে এসে পেট ভরে লাঞ্চ করলাম। আমরা ছাড়া কেউ জানে না যে আমরা হারিয়ে যেতে চেয়েছিলাম।
২০/৯/২০১৮ ইং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *