আমার দেখা হাড়ভাংগা চিকিৎসা

 

আমার দেখা হাড়ভাংগা চিকিৎসা
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

হাড় ভাংগা আর গাছ ভাংগা জোড়া লাগা একই রকম। গাছ ভেংগে পড়ে। মানুষ ভেংগেও পড়ে আবার পড়েও ভাংগে। মটকা গাছ সহজে ভেংগে পড়ে। রোগাক্রান্ত হাড় ও ক্ষয়প্রাপ্ত হাড়ও সহজে ভেংগে যায়। বৃদ্ধ মানুষের পায়ের উপরের অংশ একটু সরু থাকে যাকে নেক অব ফিমার বলা হয়। এইখানেই সাধারণত বৃদ্ধদের ভেংগে যায়। ভালো মানুষ খাড়া অবস্থায় বা হাটা অবস্থায় অথবা একটু চোট খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়। সবাই বলে আছার পড়ে ভেংগে গেছে। আসলে বলতে হবে ভেংগে পড়ে গেছে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পড়েই ভাংগে। কোন কোন সময় আঘাত লেগে হাড় ভেংগে খন্ড হয়ে যায়, বা ফেটে যায়। কোন কোন সময় একটু সরে যায় বা চোট লাগে। তখন বলি মস্কে গেছে। ভাংগুক আর মস্কুক প্রধান চিকিৎসা হলো হাড়টা যথাস্থানে বসিয়ে যে কোন পদ্ধতিতে নড়াচড়া বন্ধ রাখা। গাছ ভেংগে গেলে আমরা যদি জায়গামত বসিয়ে বেঁধে দেই দেখা যাবে গাছ জোড়া লেগে গেছে। তদ্রুপ হাড় ভেংগে গেলে সোজা করে ঠিক জায়গায় বসিয়ে প্লাস্টার কাস্ট দিয়ে আমরা নির্দিষ্টকাল রেখে দেই। তাতে জোড়া লেগে যায়। কোন ঔষধ লাগে না। তবে ভিটামিন ও প্রোটিন জাতীয় খাবার খেলে তাড়াতাড়ি জোড়া লাগে। কোন কোন সময় মেটালের পাত স্ক্রু দিয়ে ভাংগা হাড়ের সাথে লাগিয়ে দেয়া হয় দ্রুত জোড়া লাগানোর জন্য। অর্থোপেডিএক্স বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগন হাড় ভাংগার চিকিৎসা করে থাকেন। আঘাত লেগে চামড়া ছিঁড়ে গেলে ভাংগা হাড়ে ইনফেকশন বা জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে। তখন এন্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয়।

আমরা ছোট বেলায় খেলাধুলা করার সময় ঘন ঘন হাত পা মস্কে যেতো। ঝাড়ফুঁক দিলেই ভালো হয়ে যেতো। মুরুব্বিরা মন্ত্র পড়ে ফু দিতেন। আমরা বলতাম ঝাড়া দেওয়া। দৈনিক একবার করে ঝাড়া দেওয়া হতো। কোন ক্ষেত্রে এক ঝাড়া, কোন ক্ষেত্রে দুই ঝাড়া, কোন ক্ষেত্রে তিন ঝাড়া লাগতো। আসলে ঝাড়া কিছু না। আঘাত লাগলে একুট ইনফ্লামেশন বা প্রদাহ হয়। শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতায়ই এই ইনফ্লামেশন তিন দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। ঝাড়া ফকিরের কেরামতি ছাড়া আর কিছু না। ছোট বেলায় আমি এই ঝাড়া শিখার জন্য খুব করে এক মুরুব্বিকে ধরলাম। তিনি আমাকে কাউকে না বলে দেয়ার সর্তে ঝাড়াটি শিখালেন। ঝাড়াটি আপনাদেরকেও শিখিয়ে দিলাম।
“পইড়া ভাংলো আড় গুড়,
আড় আহে অড় অড়াইয়া,
হউষা পড়ে ঝরঝরাইয়া,
দেবে থিকা আইলো চাটি,
ইন্দিরা থিকা তেল,
অমুকের আড়ে মাংশে জোড়া লাইগা গেল।। ফু….।”

আরেকদিন এক ফকিরের থেকে না বলে দেয়ার সর্তে সিঁধেল চোর ধরার মন্ত্র শিখেছিলাম। এই মন্ত্রটি সাতবার পড়ে ঘরের চতুরদিকে সাত বার ঘুরে শয়ন করলে চোর সিঁধ কাটার জন্য যেই সাবল লাগাবে অমনি সাবল ধরে শক্ত হয়ে মৃত মানুষের মতো সকাল পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকবে। কি মজা! মন্ত্রটি ছিল এইরকম
“আন্ধি ঘুন্ধি,
চোরের চোখ করলাম বন্ধি,
চোরের বেটা শয়তান,
শয়তানের বেটা চোর,
সারারাত্রি ঘোর।।”

আমাদের সখিপুর এলাকায় সাড়াসিয়া পাড়ায় থাকতেন মানিক ফকির। তিনি আমার চাচাতো বোনের শশুর ছিলেন। খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি হাড় ভাংগার ভালো চিকিৎসা জানতেন। মইকে এখানে চংগ বলা হয়। চংগ বাঁশের ফালি দিয়ে তৈরি করা হতো। কাঁদা ক্ষেতে মই দেয়ার সময় মইয়ের চিপায় মিহি আঠালো কাঁদা লেগে থাকতো। সেই মাটি শুকিয়ে গেলে ঝাকি দিয়ে বের করা হতো। এইটা হলো চংগের মাটি। কারো হাত পা ভেংগে গেলে চংগের মাটি নিয়ে মানিক তাঐর কাছে যেতো। মানিক তাঐ সেই মাটি পানিতে গুলে পেস্ট বানাতেন। তার উপর মন্ত্র পড়ে ফু দিতেন। তারপর ভাংগা অংশের উপর দিয়ে প্রলেপ দিতেন। কাঁদা শুকিয়ে শক্ত হয়ে প্লাস্টারের কাস্টের মতো হয়ে যেতো। তিনি একটা নির্দিষ্ট কাল প্রলেপ ভিজাতে নিষেধ করতেন। তাতে হাড় জোড়া লেগে যেতো। মানিক ফকিরের চিকিৎসা আধুনিক চিকিৎসার সাথে অনেকটা সামঞ্জস্যপুর্ণ। এখানে চংগের মাটি প্লাস্টার অব পেরিসের বিকল্প হিসাবে কাজ করতো। ঐ সময় টাঙাইল শহর ছাড়া আধুনিক হাড় ভাংগার চিকিৎসা ছিল না। তাই মানিক ফকিরের গুরুত্ব অনেক বেশী ছিল। প্রশ্ন করতে পারেন “চংগের মাটি ছাড়া অন্য মাটি হলে কেমন হতো?” উত্তরে আমি বলব “চংগের মাটি প্রলেপের জন্য রেডিমেড। চংগের চিপায় ঢোকার সময় আঠালো মাটির মিহিদানা শুধু লেগে থাকে। ময়লা ও কাকরদানা পৃথক হয়ে যায়। আপনি এমন মাটি কেমনে তৈরি করবেন?”
আমি যখন ১৯৭৭ সনে ডিসেম্বরের দিকে এসএসসি টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে অবস্থান করছি তখন হাড়ভাংগা চিকিৎসার একটা নতুন অভিজ্ঞতা হয়। তখন ধলিপাড়ার শামসুল হক ভাই ঢাকা মেডিকেল কলেজে এম বি বি এস খুব সম্ভব ফোর্থ ইয়ারে পড়েন। আমার দাদী অর্থাৎ বাবার চাচী, মানে আসাদ ও মরহুম কায়সারের আপন দাদীর পায়ের হাড় ভেংগে যায়। যাকে ডাক্তারগন বলেন ফ্রাকচার নেক অব ফিমার। কায়ছারের বাবা আমাদের ছোট কাক্কু মরহুম আব্দুস সালাম তালুকদার মায়ের জন্য শামসুল হক ভাইকে দাওয়াত করে আনলেন। আমি বললাম
– কাক্কু, তিনি তো ডাক্তার হন নি। এখনো ছাত্র।
– না হোক। ৭৫% ডাক্তার হয়ে গেছে।
সকালে শামসুল হক ভাই আসলেন। নাস্তা করলেন। দাদীকে দেখে বললেন “এখন অনেক বয়স হয়ে গেছে। চিকিৎসা করা একটু জটিল। পায়ে রশি দিয়ে টানা দিয়ে রাখলে কিছুটা ভালো হবে। ” কিন্তু দাদী টানা দিতে রাজি হলেন না। বাড়ির মা চাচীরা ছোট খাটো সমস্যার কথা হবু ডাক্তার ভাইকে জানাতে ছিলেন। এমন সনয় আরেকটা ঘটনা ঘটে গেলো।

আমি পাটি মেলে বাড়ীর দক্ষিণ খোলায় রৌদ্রে বসে পড়ছিলাম। আমার আশে পাশেই কায়সার ও হবি খের দিয়ে ফুটবল বানিয়ে খেলছিল। ওদের পূর্ণ নাম আনোয়ার হোসেন তালুকদার ও হাবিবুর রহমান তালুকদার। ওরা আমার থেকে আট নয় বছরের ছোট হবে। ওরা দুই জনই খুব ডানপিটে ছিল। লেখাপড়া বেশী করতো না। সারাক্ষণ খেলা করতো আর লড়াই করতো। আমার পড়ায় ডিস্টার্ব হচ্ছিল। ওদের প্রতি আমি বিরক্ত ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম কায়ছার মাটিতে পড়ে দাফ্রিয়ে কাঁধছে। হবি দৌড়িয়ে পালিয়ে গেলো। আমি মনে করলাম কায়সার মার খেয়ে ভঙ্গী করছে। এমন সময় কান্না শুনে নজরুল গেলো কায়সারের কাছে। আমি গুরুত্ব দিলাম না। নজরুল “মুকুল ভাই, মুকুল ভাই” বলে ডাকতে ডাকতে বাড়ির দিকে চলে গেলো। মুকুল হলো কায়সারের বড় ভাই আসাদুজ্জামান তালুকদার। নজরুল কায়সারের বাবাকে, মানে আমাদের ছোট কাক্কুকে নিয়ে এলো। কাক্কু কায়সারকে কোলে নিয়ে কাঁধতে কাঁধতে বললেন “মাইরা ফালাইছেরে, আমার বাজানরে মাইরা ফালাইছে। ” আমি চেয়ে দেখি কাক্কুর কোলে কায়সারের ভাংগা পা দোল খাচ্ছে। আমি হতভম্ব। বই ফেলে কায়সারদের বাড়ি চলে গেলাম। শামসুল হক ভাই বারান্দায় চেয়ারে বসা ছিলেন। পাশেই জল চৌকিতে কায়সারকে শোয়ানো হলো। শামসুল হক ভাই পাটা সোজা করে বললেন “কেউ এই পাটা সোজা করে ধরুন। হাটুর নিচে মাঝ বরাবর টিবিয়া ও ফিবুলার দুইটি হাড়ই ভেংগে খন্ড হয়ে গেছে। ময়মনসিংহ নিয়ে প্লাস্টার করতে হবে। ” ময়মনসিংহ যেতে হলে ৩০/৪০ কিলোমিটার পায়ের পথ তারপর কাডবডি বাস। রুগী ময়মনসিংহ যেতেই বারটা বেজে যাবে। তাই তিনি বললেন “যদি না যেতে পারেন তবে আমি বিকল্প চিকিৎসা দিতে পারি।” সবাই রাজি হলেন।

শামসুল হক ভাই একটা শুকনো তল্লা বাঁশ আনতে বললেন। আমার বড় ভাই আকবর হোসেন তালুকদার একটা বাঁশ আনলেন। শামসুল হক ভাই একটা পাট সোলা দিয়ে কায়সারের পায়ের মাপ নিলেন। সেই মাপ অনুযায়ী আকবর ভাই অনেকগুলি বাতি বানালেন। চেঁচে মসৃণ করলেন। শামসুল হক ভাই কার্পাস তুলা দিয়ে পা ঢেকে দিলেন। তার উপর বাঁশের বাতিগুলি সুন্দর করে সাজিয়ে বসালেন। সবাই দেখছে। যারা কান্না করছিলেন তারাও এই দৃশ্য দেখে কান্না ভুলে গেছে। আমি নিখুঁত ভাবে পর্যবেক্ষন করছি। পুরাতন শাড়ী কাপড় দিয়ে বাঁশের উপর দিয়ে ব্যান্ডেজের মতো করে পেঁচিয়ে বেঁধে দিলেন। বললেন “এই অবস্থায় নড়াচড়া না করে বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে দেড় মাস। রক্ত চলাচল করার জন্য সর্বদা পায়ের আঙুল নাড়াতে হবে। তারপর বেন্ডেজ খুলে দিতে হবে। তারপর আরো দেড়মাস পায়ে ভর দেয়া যাবে না। ”
কাদের তালুকদার জিজ্ঞেস করল
– প্রশ্রাব পায়খানা কেমনে করবে?
– বিছানায় শুয়েই করবে।
– বিছানায় শুয়ে কিসের মধ্যে করবে?
– মাটির ডুপিতে কচুর পাতা বিছিয়ে করবে। কচুর পাতাসহ মল ফেলে দিলেই হবে।
বিটলা পোলাপানরা হেসে দিলো।

যাহোক, এইভাবে একজন ডানপিটে ছেলেকে দেড়টি মাস অকেজো করে রাখা হলো। কায়সার সারাক্ষন চিৎকার করত। গান করতো। আর মাগো মাগো বলে ডাকতো। সেই মাগো বলে ডাকার অভ্যাস তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছিল। মুকুলরা সাত ভাই বোন। সারাজীবন ছয় ভাই বোনে যতবার মা বলে ডেকেছে কায়সার একাই তার হাজারগুণ বেশী ডেকেছে। ওরা সবাই যা খেয়েছে কায়সার একাই তার চেয়ে হাজারগুণ বেশী খেয়েছে। ওরা সবাই মিলে যত মাকে জ্বালাতন করেছে কায়সার একাই তারচেয়ে হাজারগুণ জ্বালাতন করেছে। কায়সার খাবার বসে টেংরা মাছ খেয়ে বলতো
– মা গো, একটা বড় গোলসা মাছ ছিল না?
কাক্কী তাকে বড় গোলসা মাছটি দিতেন।
– মা গো, এই মুরগীর আরেকটি রান ছিল না?
কাক্কী দুইটি রানই কায়সারের পাতে দিতেন।
এনিয়ে কায়সারের দুলাভাই মওলানা হাবিবুল্লাহ বাহারী ঠাট্টা করে বললেন “মাইনষে শুশুরবাড়ী গিয়ে বড় মাছ ও রান খায়। এই কায়সার শালার জন্য কিছুই খেতে পারি না। ”
কায়সার পছন্দ করে বিয়ে করে। বেকার ছিল। বেশীদূর পরে নাই। রাজনীতি করতো। কেউ অন্যায় কথা বললে মেরে বসতো। আমরা এনিয়ে বিব্রত বোধ করতাম। পা ভেংগে মাঠে পড়ে কান্না করার সময় আমি কাছে যাই নি তাই আমি সারাজীবন অনুশোচনায় ভোগতাম। এজন্য কায়সারকে বেশী বেশী আদর করতাম। বাড়িতে গেলে সারাক্ষণ কায়সার আমার কাছাকাছি থাকতো। আমাকে নিয়ে সখিপুর যেতো। সখিপুরের উন্নয়ন ঘুরে ঘুরে দেখাতো। নেতাদের সাথে আমাকে হাইলাইট করে পরিচয় করিয়ে দিত। গ্রামের সামান্য উন্নয়ন হলেও আমাকে জানাতো। কারো বদনাম করতো না। গ্রামে গেলে বেশীভাগ মানুষকে অন্যের বদনাম করতে দেখা যায়।

রাজনীতিতে বেশী জড়িয়ে পড়ায় আমরা তাকে সৌদিআরব পাঠিয়ে দেই। সেখানে গিয়ে সে ভালো চাকরি পেয়েছিল। আমাকে মাঝে মাঝে ফোন দিতো। তার সুখের কথা শুনাতো। আমিও খুশী হতাম।

একদিন ফোনে বললো
– ভাই, আমি খুব অসুস্থ।
– কি হয়েছে?
– আমার কিডনি সমস্যা। ডাক্তারের সাথে একটু কথা বলুন। বাংলাদেশের ডাক্তার। আপনাদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকেই পাশ করেছেন।
– হ্যালো। আমি ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার বলছি। আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। রুগী আমার ছোট ভাই।
– আপনি কত ব্যাচের ছাত্র ছিলেন?
– আমি এম ১৭ ব্যাচ।
– সাদেক, আমি তোমাদের আনোয়ার ভাই।
– কোন আনোয়ার ভাই?
– আনোয়ার – আসাদকে চেনেনা এমন কেউ কি তোমাদের ব্যাচের আছে?
– ও সরি ভাই। চিনেছি। কেমন আছেন ভাই? আমার ভাইয়ের কি হয়েছে?
ডাক্তার আনোয়ার ভাই বিস্তারিত বুঝিয়ে বললেন। কায়সারের দুইটি কিডনিই বিকল। ডায়ালাইসিস লাগবে।

যারা আশির দশকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়েছেন তারা অনেকেই আনোয়ার – আসাদ জুটিকে চেনেন। ডাঃ আসাদ ভাই ইন্তেকাল করেছেন। ডাঃ আনোয়ার ভাই সৌদিআরবে চাকরি করছেন।

এরপর অনেকদিন কায়সার অসুস্থ অবস্থায় প্রবাসে ছিল। আমাকে ঘন ঘন ফোন দিত। জানাতো আর বেশী দিন বাঁচা সম্ভব না। আমার অনুরোধে সে দেশে এসে পড়ল। আমি আমারই একজন প্রাক্তন ছাত্র এম ২৮ ব্যাচের কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ আসাদুজ্জামান রতনের দ্বারা তার চিকিৎসা করালাম। গত পাঁচটি বছর সে সপ্তাহে দুইবার করে ডায়ালাইসিস করতে ময়মনসিংহ এসেছে। আমার চেম্বারে বসে কত গল্প করেছে! শেষে সে গত ৩০ আগস্ট ২০১৮ ইং ময়মনসিংহ একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছে। তার দেহ নিয়ে আমি বাড়ি যাই। জানাজায় শত শত নামী দামী লোক শরীক হয়েছিল।

শামসুল হক ভাইয়ের ছাত্র জীবনেই চিকিৎসার দক্ষতা আমাকে প্রভাবিত করে ডাক্তার হতে। ডাঃ শামসুল হক ভাই চিকিৎসক হিসাবে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছেন। তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে এখন মধুপুরে প্রাক্টিস করছেন।

হাড় ভাংগার চিকিৎসা শেখানো হয় আমাদেরকে চতুর্থ বর্ষে। প্রশিক্ষণ নেই ইন সার্ভিস ট্রেনিং নেয়ার সময়। তখন শিখেছি শুধু প্লাস্টার করা। প্রাক্টিস জীবনে এটাই করেছি। ১৯৯২ সনে প্যাথলজির টিচার হিসাবে যোগ দেয়ার পর অন্য প্রাক্টিস করা হয় না। ইতি মধ্যে নেইল, প্লেট, স্ক্রু, নাট, বোল্ট দিয়ে আধুনিক অনেক পদ্ধতিতে হাড় ভাংগার চিকিৎসা হচ্ছে সেগুলির আমার অভিজ্ঞতা হয় নি।

১৯৯৭/৯৮ এর দিকে বাবার পা ভেংগে গেলো। ফ্রাকচার নেক অব ফিমার। সবাই বলছে শুকনা পরিষ্কার উঠোনে পড়ে গিয়ে তালুকদারের পা ভেংগে গেলো। আমি বুঝলাম বাবা পড়ে গিয়ে পা ভাংগে নি। ভেংগেই পড়ে গেছেন। অর্থোপেডিক্স বিশেষজ্ঞ ডাঃ মেজবাহ উদ্দিন স্যার বললেন “এই নাজুক স্বাস্থ্য নিয়ে অপারেশন করা ঠিক হবে না। পা টানা দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে।” তিন মাস টানা দিয়ে রেখে বাবার পা ভালো করা গেলো। আল্লাহর রহমতে বাবা সেই পা নিয়ে অনেক হেটেছেন। একদিন বাড়ি থেকে কালিহাতি প্রায় বিশ কিলোমিটার পথ ঐ পা নিয়েই হেটে আমার ছোট বোন শাহীনুরের বাসায় গিয়েছেন।

এরপর পা ভাংগার পালা আমার শুশুর সাহেবের। ডিডি হিসাবে রিটার্ড হবার পর ঢাকায় গিয়েছিলেন চোখ দেখাতে। বাসে উঠার সময় ওনার পা ভেংগে যায়। তিনি ঐ বাসেই টাংগাইলের বাসায় ফিরেন। অর্থোপেডিক্স বিশেষজ্ঞ ডাঃ আলমগীর ভাই ফোন করেন ওনার ফ্রাকচার নেক অব ফিমার। আমি ময়মনসিংহ এনে অর্থোপেডিক্স বিশেষজ্ঞ ডাঃ বেলায়েত ভাইকে দেখালাম। তিনি অপারেশন করে নেইল প্লেট লাগিয়ে দিলেন। আমি ওটিতে ছিলাম। এবার আমার আরেকটা অভিজ্ঞতা হল। বেলায়েত ভাই স্ক্রু লাগাচ্ছিলেন স্ক্রু- ড্রাইভার দিয়ে হাড়ের মধ্যে। তখন আমার ফইন্যা সুতারের কথা মনে পড়লো। সে দাঁত কিরমির করে এইভাবে কাঠের মধ্যে স্ক্রু ঢুকাতো। শুশুর সাহেবের হাড় অল্পদিনেই জোড়া লাগে।
শেষ অভিজ্ঞতা হল গত আড়াই বছর আগে। আমার শ্যালক সুমনের এস এস সি পড়ুয়া ছেলে সীয়াম আমার বাসা থেকে তাদের বাসায় যাচ্ছিল হেটে। পেছন থেকে একজন অর্থোপেডিক্স বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সীয়ামের ডান হাতে তার প্রাইভেট কার লাগিয়ে দিলেন। হাতের রেডিয়াস ও আলনা দুইটি হাড়ই ভেংগে খন্ড হয়ে গেলো। ডাক্তার সাব নিজেই চিকিৎসা করা শুরু করেছিলাম। আমি তাকে বললাম
– আপনি বাচ্চাটাকে লাগিয়ে দিলেন?
– কি করব, সারারাত ঘুমাতে পারিনি তাই চালাতে গিয়ে একটু এলোমেলো হয়েছে।
-ঘুমাতে পারলেন না কেনো?
– সারারাত অপারেশন করেছি, তাই।
সীয়ামের মা বলল “এমন ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করাবো না। ”
ডাঃ বেলায়েত ভাইর কাছে গেলাম। বেলেয়ায়েত ভাই বললেন “ইন্টারনাল ফিক্সেশন করতে হবে। আমাদের ভাতিজা তো। যাতে কাজটা সুন্দর হয় তা করতে হবে। আমার ছাত্র অর্থোপেডিক্স বিশেষজ্ঞ ডাঃ মতিউর রহমান (জুনিয়র) একাজে ভাল এক্সপার্ট। তার কাছে গিয়ে আমার সালাম দাও। ” আমি বললাম “সে তো আমারও ছাত্র ছিল। মেধাবী ছাত্র। তাহলে যাই। ”

মতিউর রহমান শিক্ষক হিসাবে আমাকে অনেক সম্মান করলো। তারই এক সিনিয়র কলিগ দ্বারা এক্সিডেন্ট হওয়ায় দু:খ প্রকাশ করলো। অথচ যে এক্সিডেন্ট ঘটাল সে কোন দু:খ প্রকাশ করল না।

ডাঃ মতিউর রহমানের ওটিতে আমি ঢুকলাম। সীয়ামের অপারেশন দেখলাম। আরো অভিজ্ঞতা হলো। মতিউর রহমান জানে যে আমি একটু ডিজিটাল ম্যান। সে বলল “ভিডিও করতে পারেন, স্যার। ” ভিডিও করার সুবাদে ভালো করে দেখতে পেলাম। কি সুন্দর ভাবে রেডিওর মেকানিকসের মতো করে ক্ষুত্র ক্ষুত্র স্ক্রু লাগিয়ে দিল প্লেটের সাথে। অল্প দিনেই ভালো হয়ে গেলো হাত। গত কিছুদিন আগে সেই প্লেট খুলে দিয়েছে। খোলার সময়ও আমি ওটিতে ছিলাম। আমার পড়ানো ছাত্রের হাতের নিখুঁত কাজ দেখে মুগ্ধ হলাম। ধীর্ঘ্যজীবি হও ডাঃ মতিউর রহমান।

সীয়াম খুব ভালো ক্রিকেট খেলোয়াড় ছিল। ক্রিকেট খেলা শিখতে ভর্তি হয়েছিল। এখন এই হাত নিয়ে ক্রিকেট খেলা নিষেধ। তাই সে, তার মা-বাবা ও আমরা সেই এক্সিডেন্ট ঘটানো ডাক্তারের প্রতি খুব্ধ।
২৩/৯/২০১৮ ইং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *