চোখ কাটা

চোখ কাটা
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

চোখ আমাদের অত্যন্ত মুল্যবান অংগ। তাই আমাদের দুইটি চোখ দিয়েছেন সৃষ্টি কর্তা যেন এক চোখ নষ্ট হয়ে গেলেও আরেক চোখ দিয়ে দেখতে পারি। যারা এখন চোখে দেখেন তারা কি ভেবে দেখেছেন এখন থেকে চোখ দুটি অন্ধ হয়ে গেলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আপনার কেমন লাগবে? এই চোখ নানা কারনে অন্ধ হয়ে যেতে পারে। অন্ধের চিকিৎসা আবিষ্কার হওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষ অসহায় ভাবে বেঁচে থাকতো। আর এই চিকিৎসা বিদ্যা শিক্ষা দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা ডাক্তারদেরকে।

আমরা চোখ দিয়ে বস্তু দেখি। আলোর উৎস থেকে আলো বস্তুর উপর পরে প্রতিফলন হয়ে আমাদের চোখের উপর পড়ে। চোখের কয়েকটি অংশ থাকে। সামনে যে স্বচ্ছ পর্দাটি দেখা যায় এটি কর্নিয়া। এর পেছনে একটি কালোমতো ছিদ্র দেখা যায়। এটি পিউপিল বা চোখের মণি। এর পেছনে একটা স্বচ্ছ ক্রিস্টালের মতো লেন্স বা চাকতি আছে। লেন্সের পেছনে কিছু স্বচ্ছ তরল পদার্থ আছে। শেষে আছে একটি পর্দা যার নাম রেটিনা। আলো যখন লেন্সের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে তখন সবগুলি আলো জড়ো করে রেটিনার উপরে ফেলে। রেটিনার রড ও কোন নামে কনিকা আলোকে ইলেক্ট্রো মেগ্নেটিক ইম্পালসে রুপান্তরিত করে নার্ভ বা স্নায়ু নামে তার দিয়ে মস্তিস্কের পেছেনের দিকে দেখার সেন্টারে পাঠিয়ে দেয়। মস্তিস্কের মাধ্যমে তখন আমরা বস্তুর আকার আকৃতি ও রঙ দেখে চিনতে পারি। আলোর এই সিগ নাল প্রবাহিত হওয়ার পথে কোথাও বাধা পেলে আমরা চোখে দেখব না। তবে এই যাত্রা পথের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিষ হলো রেটিনা। সাধারণ মানুষ বেশী গুরত্ব দেয় চোখের মণির। কবিরা বলেন “তুমি আমার চোখের মণি।” বিজ্ঞানী কবি হলে লিখতেন “তুমি আমার চোখের রেটিনা। ” সন্ত্রাসীরা অনেক সময় মানুষের মাথার পেছনে আঘাত করে। মাথা ফেটে যায়। মস্তিস্কের পেছনের অংশের চোখে দেখার সেন্টার নষ্ট হয়ে যায়। তারা তখন চোখে দেখে না। তখন সামনে থেকে আপনি দেখবেন তার চোখ ভালো। কেউ যদি কারো কাছে এই অবস্থায় হাত পাতে তখন অনেকে চোখের দিকে তাকিয়ে বলে থাকেন “তোমার তো দুই চোখই ভালো আছে। হাত পাতো কেন।” আসলে আমরা না জেনে না বুঝে কত ভুলই না করি!

অনেক সময় দেখবেন কর্নিয়ার পাশ থেকে একটি পর্দা এসে চোখের মণি ঢেকে দিচ্ছে। এটার নাম টেরিজিয়াম। পুরাপুরি ঢেকে দিলে সেই চোখে আর আলো প্রবেশ করতে না পারার দরুন দেখবে না। এক চোখ ভালো থাকলে দেখতে পারবে। চোখের ডাক্তারগণ অপারেশন করে এই পর্দা কেটে দেন। তখন সে দেখতে পায়। আমরা অনেকে কানা ও অন্ধ বলতে একই মনে করি। আসলে কানা হলো যে এক চোখে দেখতে পায় না। আর অন্ধ হলো যে দুই চোখেই দেখতে পায় না। আপনি আমার লিখা গল্প পড়তে পারছেন। আপনি অন্ধ না। এটা সৃষ্টি কর্তার দয়া। আমি দেখে দেখে লিখতে পারছি। এটাও তার দয়া।

মানুষ সবচেয়ে বেশী অন্ধ হয় লেন্স ঘোলা হওয়ার কারনে। নানান কারনে বয়স্ক মানুষের লেন্স ঘোলা হতে পারে। লেন্স ঘোলা হয়ে চোখে কম দেখলে বা না দেখলে লোকে বলে ছানি পড়েছে। ডাক্তারগণ বলেন ক্যাটার‍্যাক্ট। আগের দিনে এই ক্যাটার‍্যাক্টের কারনে লাখো লাখো মানুষ অন্ধত্ব বরণ করতো। অন্ধত্বের এই অভিসাপ থেকে মুক্তি পেতে শুরু হয় আনুমানিক পাঁচ ছয় হাজার বছর আগে। প্রথম ক্যাটার‍্যাক্ট অপারেশন শুরু করে সুশ্রুত নামে এক বাঙালী এই উপমহাদেশ থেকেই। কারো কারো মতে তিনি ছিলেন ঢাকার অদুরে বিক্রমপুরের অধিবাসী। কেউ কেউ বলেন তিনি ভারতের বেনারস বাসী ছিলেন। যেখানের অধিবাসী হোক না কেন তিনি মানব জাতীর জন্য একটা বিড়াট পথ দেখিয়ে গিয়েছেন।
সুশ্রুত দেখতে পান অন্ধ লোকটির চোখের মণি সাদা। আর যারা দেখতে পান তাদের চোখের মণি কালো। আসলে কালো হলো রেটিনা। স্বচ্ছ মণি দিয়ে পেছনের কালো রেটিনা দেখা যায়। সুশ্রুত একটা পিন বা কাটা কর্নিয়ার পাশ দিয়ে ঢুকিয়ে সাদা জিনিষটা খোঁচা মারেন। সেটি খোঁচা খেয়ে চোখের ভেতরেই নিচের দিকে পড়ে যায়। তাতে বেশ কিছু আলো মণি দিয়ে প্রবেশ করে রেটিনায় পড়ে। অন্ধ লোকটি সাথে সাথে দেখতে পারে। এই সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সুশ্রুত ও তার বংশধরেরা বহু বছর এইভাবে ক্যাটার‍্যাক্টের চিকিৎসা করে অন্ধ মানুষককে আলো দেখান। তার এই আবিস্কারের কথা ইউরোপ আমেরিকার ডাক্তারদের কানে পৌঁছে। তারা এই দেশে এসে সুশ্রুতদের কাছ থেকে এই পদ্ধতি শিখে গিয়ে তাদের দেশে প্রচলন করে। তারা এই অপারেশনের নাম দেন কাউচিং। তারা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে এই কাউচিং করতেন। তাতে শতকরা ৩০/৩৫ জন লোক ভালো হতো।

লেন্সটা চোখের ভিতর সুন্দর ভাবে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। এটা নরম। ক্যাটার‍্যাক্ট হলে এটা ঘোলা ও শক্ত হয়ে যায়। কাউচিং পদ্ধতি তে পিন দিয়ে খোঁচা দিলে লেন্সটি নিচের দিকে পড়ে যায়। তাতে উপর দিকের সামান্য ফাক দিয়ে আলো ঢোকে। তাই রুগী কিছুটা দেখতে পায়।

কাউচিং পদ্ধতির উন্নতি সাধন করতে করতে বিজ্ঞানীরা আজকের এই আধুনিক পদ্ধতির ক্যাটার‍্যাক্ট সার্জারির প্রচলন করেছেন। আমি যখন খুবই ছোট তখন শুনলাম বিক্রমপুর থেকে এলাকায় একজন চোখ কাটার ডাক্তার আসবেন। তিনি ভালুকার মল্লিকবাড়ি এলাকায় চোখ কাটা ক্যাম্প করে আমাদের কালিহাতি এলাকায় এলেন। বেশ কয়েকজন রুগীর ছানি কাটলেন। তিনি ছানি কাটার আগে জিজ্ঞেস করতেন “এখানে কয়টা আংগুল?” রুগী বলতে পারতেন না। চোক কাটার পর আবার জিজ্ঞেস করলে রুগী বলতেন “এখানে দুইটি আংগুল। ” খুশী হয়ে রুগীর লোকজন বেশী বেশী টাকা দিয়ে দিতেন। চোখ কেটে ডাক্তার চলে গেলেন পাবনা অঞ্চলে। এদিকে চোখকাটা রুগীদের ৭৫% ই চোখে ঘা হয়ে চিরতরে অন্ধ হয়ে গেলো। যারা অন্ধ হলো না তারা খুশী। যাদের চোখ নষ্ট হলো তারা খুব্ধ। কিন্তু ডাক্তারকে ধরার উপায় ছিল না। তাদের কোন ঠিকানা ছিল না।

১৯৮৪ সনে এম বি বি এস চতুর্থ বর্ষে প্রফেসর ডাঃ শামসুদ্দিন স্যার ক্যাটার‍্যাক্ট পড়ানোর সময় বিক্রমপুরের সুশ্রুতদের কাউচিং পদ্ধতিতে ক্যাটার‍্যাক্ট চিকিৎসার ইতিহাস বললে আমি আমাদের এলাকার চোখ কাটার বেপারটা বুঝতে পারলাম। বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম “আগের দিনে গ্রামে এসে বিক্রম্পুরের ডাক্তার কিভাবে চোখ কেটেছিলেন?” বাবা বললেন “একটা পরিষ্কার খেজুরের কাটা চোখের কালো অংশের পাশ দিয়ে ঢুকিয়ে ছানিতে খোঁচা মেরে ছানি সরিয়ে দিতেন। ” আমি বুঝলাম এরাই সেই সুশ্রুতদের বংশধর। খেজুর কাটা থেকেই কিছু রুগীর চোখে ইনফেকশন হয়ে চোখ একেবারে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

প্রফেসর শামসুদ্দিন স্যারের সময় মেডিকেল কলেজে ক্যাটার‍্যাক্ট সার্জারি হতো ইন্ট্রাওকুলার লেন্স এক্সট্রাকশন করে চশমা লাগিয়ে দেয়া। মানে ছোট করে কেটে সেই ছিদ্র দিয়ে চিম্পটা দিয়ে ধরে লেন্স বের করে আনতেন। চশমাতে হাই পাওয়ারের লেন্স লাগিয়ে দিতেন ভালোভাবে দেখার জন্য। ১৯৮৪-এর দিকে প্রফেসর ডাঃ মুক্তাদির স্যার ইংল্যান্ড গিয়ে উন্নত প্রযুক্তির অপারেশন শিখে এসে আমাদের ক্লাশে বললেন। সেটা ছিল লেন্স এক্সট্রাকশন বাই ফ্যাকো ইমালসিফিকেশন। সংক্ষেপে ফ্যাকো সার্জারি। এই পদ্ধতিতে অতি সুক্ষ্ণ একটি ছিদ্র দিয়ে ইলেক্ট্রড ঢুকিয়ে লেন্সটাকে গুড়া করে সাকশন দিয়ে বের করা হতো। তারপর চশমা দেয়া হতো। এখন যেটা হয় সেটা হলো ফ্যাকো করে লেন্স বের করে আর্টিফিশিয়াল লেন্স বসিয়ে দেয়া হয় মূল লেন্সের স্থানে। যাকে বলা হয় লেন্স ইমপ্লান্টেশন। এই পদ্ধতিতে চশমার প্রয়োজন পড়ে না। তবে যাই করা হোক না কেন তার নাম হলো চোক কাটা। আর এই মহা উপকারী কাজটি করে থাকেন চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ সার্জনগণ।
২৬/৯/২০১৮ ইং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *