Jaundice

জন্ডিস
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

জন্ডিস কিন্তু কোনো রোগের নাম না। অর্থাৎ জন্ডিস নামে কোন রোগ নাই। জন্ডিস হলো কয়েকটি রোগের লক্ষণ। চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়াকে জন্ডিস বলা হয়। যাদের গায়ের রং ফর্সা জন্ডিস হলে তাদের গায়ের রংও হলুদ হয়ে যায়। প্রশাবও হলুদ হতে পারে। কারো জন্ডিস আছে কিনা দেখার জন্য ডাক্তারের প্রয়োজন নেই। চোখের রং সবাই দেখতে পারে। রক্তের বিলিরুবিনের মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ২ মিলিগ্রামের বেশী হলে জন্ডিস দেখা যায়। বিলিরুবিনের কণা হলুদ। তাই শরীরের সবই হলুদ হয়ে যায়। কুপি বাতির আলোয় হলুদ রং সাদা দেখায়। তাই রাতে কুপি বাতির আলোয় জন্ডিস দেখা সঠিক নয়।

কেউ কেউ শরীর দুর্বল ও ক্ষুধামন্দাকে জন্ডিস মনে করে থাকেন। এটা সঠিক না। কেউ কেউ রক্তশুন্যতা হয়ে শরীর ফেকাসে হয়ে যাওয়াকেও জন্ডিস মনে করে থাকেন। এটাও সঠিক না। কোন কোন কবিরাজ এটাকে মাইট্টা জন্ডিস বলে ঝাড়ফুঁক দেন। এগুলির কোন ভিত্তি নেই। ঝাড়ফুঁক দেয়ার পর চিনির সরবত খাওয়ান। পানি পান করার পর প্রশ্রাবের বিলিরুবিন পাতলা হয়ে যায়। প্রশ্রাবের হলুদ রং কমে যায়। রুগী মনে করেন ঝাড়ফুকে জন্ডিস ভালো হচ্ছে।

কেউ যদি মোবাইলে আপনাকে বলে
“ভাই, আমার শরীর ভালো নেই, জন্ডিস হয়েছে। ” আপনি তাকে বলুন “কাউকে আপনার চোখের সাদা অংশ দেখায়ে জানুন হলুদ হয়েছে কি না। ” যদি বলে “হলুদ” তাহলে জন্ডিস হয়েছে। না হলে অন্য কিছু। যদি জন্ডিস হয়ে থাকে তাহলে রক্তের বিলিরুবিন মাত্রা দেখে নিশ্চিত হতে হবে। জন্ডিস নিশ্চিত হওয়ার পর এর কারন জানতে হবে চিকিৎসার জন্য। এখন বলতে পারেন তা হলে কি কি কারনে জন্ডিস হয়?

জন্ডিস দেখা দেয়া অর্থাৎ রক্তের বিলিরুবিনের মাত্রা বেশী হওয়ার অনেক কারন আছে। কোন কারনে বিলিরুবিন তৈরি বেশী হলে অথবা বিলিরুবিন শরীর থেকে বের হতে না পারলে অথবা লিভার খারাপ হয়ে বিলিরুবিন আত্ত্বিকরন হতে না পারলে বিলিরুবিন বেড়ে গিয়ে জণ্ডিস দেখা দেয়। এই বিলিরুবিন কিন্তু তৈরি হয় রক্তের লোহিত কণিকা থেকে। লোহিত কণিকাকে ডাক্তারগণ রেড ব্লাড করপাসল বা আরবিসি বলেন। আরবিসির রং লাল । তাই রক্ত লাল রং হয়। আরবিসির ভিতর থাকে হিম নামক লোহা জাতীয় কণা। আসলে এই হিমই হলো লাল কণিকা। আরবিসি তৈরি হয় হারের ভিতরের মুরমুরা লাল অংশ অস্থিমজ্জা থেকে। সাধারণত ১২০ দিন পর আরবিসি মারা যায়। মরা আরবিসি পেটের উপর দিকের বাম পাশে অবস্থিত স্প্লিন বা প্লিহার ভিতর দিয়ে পাস করার সময় আরবিসির খোসা পৃথক হয়ে পরে। হিম ও গ্লোবিন অংশ অস্থিমজ্জায় গিয়ে আবার নতুন আরবিসি তৈরি করতে ব্যবহারিত হয়। উচ্ছিষ্ট অংশ স্প্লিনের ম্যাক্রোফ্যাজ কোষে খেয়ে পরিষ্কার করে। কোন কারনে অতিরিক্ত আরবিসি নষ্ট হলে ম্যাক্রোফ্যাজ সেগুলি খেয়ে ফুলে উঠে। তাই স্প্লিন বড় হয়ে যায়। বাম পেটে চাকা অনুভুত হয়। তখন সাধারণ মানুষ বলে পেটে পীলা হয়েছে। ডাক্তারগণ বলেন স্প্লিনোমেগালী। অনেক রোগেই স্প্লিনোমেগালী হয়। যাহোক, অতিরিক্ত হিম লিভার বা যকৃত বা কলিজায় গিয়ে বিলিরুবিন তৈরি হয়। তারপর বিলিভার্ডিন হয়ে পিত্ত রসের সাথে পিত্তথলিতে জমা হয়। সেখান থেকে খাদ্যনালীতে প্রবেশ করে পরিবর্তন হয়ে স্টারকোবিলিন হয়। স্টার্কোবিলিন পায়খানার সাথে মিশে পায়খানার রং বাদামী করে। সাভাবিক পায়খানার রং তাই বাদামী হয়। পিত্ত নালী কোন কারনে বন্ধ হয়ে গেলে পায়খানার সাথে স্টারকোবিলিন না থাকার দরূণ পায়খানার রং কাদাটে হয়। কিছু কিছু বিলিরুবিন পরিবর্তন হয়ে ইউরোবিলিন আকারে প্রশ্রাবের সাথে বেড়িয়ে যায়। ইউরোবিলিন থাকার কারনে সাভাবিক প্রশ্রাব ক্ষরের পানির রংগের মতো হয়। বিলিরুবিন বেশী হলে ইউরোবিলিন হয়ে সারতে পারে না। তাই বিলিরুবিন আকারেই প্রশ্রাবের সাথে থেকে প্রশ্রাব হলুদ হয়।
কারন অনুসারে আমরা জন্ডিসকে তিন প্রকার বলতে পারি – হিমোলাইটিক, হেপাটোসেলুলার ও অবস্ট্রাক্টিভ। কোন কারনে আরবিসি বেশী বেশী ভাংলে বিলিরুবিন বেশী হয়ে যায়। আরবিসি ভাংগাকে হিমোলাইসিস বলা হয়। তাই এই কারনে জন্ডিস হলে তাকে হিমোলাইটিক জন্ডিস বলা হয়। থেলাসিমিয়া ও হিমোগ্লুবিন ই রোগে সাধারণত আমরা হিমোলাইটিক জন্ডিস পাই। লিভারের রোগে বিলিরুবিন আত্বিকরন হতে পারে না। তাই রক্তের বিলিরুবিন বেড়ে যায়। ভাইরাল হেপাটাইটিস রোগে সাধারণত আমরা হেপাটোসেলুলার জন্ডিস পাই। পিত্তনালী পাথর অথবা টিউমার/ক্যান্সার হয়ে বন্ধ হয়ে গেলে বিলিরুবিন পায়খানার সাথে পাস না হয়ে রক্তে বেড়ে যায়। নালী বন্ধ হয়ে যাওয়াকে অবস্ট্রাকশন বলা হয়। তাই এইভাবে জন্ডিস হওয়াকে অবস্ট্রাক্টিভ জন্ডিস বলা হয়।

কাজেই, কারন নির্ধারণ করে জন্ডিসের চিকিৎসা করতে হয়। কারো জন্ডিস হলে তার মাত্রা দেখার জন্য রক্তের বিলিরুবিন পরীক্ষা করতে হবে। মাত্রা ১.২ মিগ্রা/ডিএল এর বেশী এবং ২.০ মিগ্রা/ডিএল এর নিচে হলে বলা হয় সাবক্লিনিক্যাল জন্ডিস। এই অবস্থায় চোখে জন্ডিস দেখা দেয় না। কিন্তু এটা বিলিরুনের সাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশী। কাজেই মাত্রা ১.২ এর বেশী হলে কারন বের করার জন্য অন্যান্য পরীক্ষা নিরিক্ষা করতে হবে।

হেপাটাইটিস বি ইনফেকশন হয়েছে কিনা জানার জন্য HBsAg Test করতে হবে। নেগেটিভ হলে হেপাটাইটিস সি আছে কিনা জানার জন্য Anti- HVC Test করা যেতে পারে। এটাও নেগাটিভ হলে হেপাটাইটিস এ হতে পারে। তবে, বেশীভাগ রুগীর হেপাটাইটিস এ -এর জন্য হেপাটোসেলুলার জন্ডিস হয়। যাদের হেপাটোসেলুলার জন্ডিস হয় তাদের পেটের ডানপাসের উপরের অংশে ব্যাথা (দুক্কু) পায়। কারন, এখানেই লিভার থাকে। লিভার কেমন আক্রান্ত বা নষ্ট হয়েছে তা জানার জন্য রক্তের SGPT(ALT) পরীক্ষা করতে হয়। অবস্ট্রাক্টিভ জন্ডিসে রক্তের Alkaline Phosphatase level বেড়ে যায়। রক্তের PBF পরীক্ষা করে হিমোলাইসিস হচ্ছে কিনা তা জানা যায়। রক্তের Haemoglobin Electrophoresis পরীক্ষা করে থেলাসিমিয়া, হিমোগ্লোবিন ই ইত্যাদি রোগ নির্ণয় করা যায়। রোগের ইতিহাস, শরীর পরীক্ষা ও প্যাথলজিক্যাল ইনভেস্টিগেশন করে সঠিক রোগ নির্ণয় করার পর রোগের চিকিৎসা দিয়ে জন্ডিস ভালো করা হয়।

অজ্ঞতার কারনে মানুষ ফকিরের কাছে যায় জণ্ডিস চিকিৎসার জন্য। কেউ কেউ রুগীকে জীবিত গাছের লতা দিয়ে মালা পরিয়ে বসিয়ে রাখে। পানি ছেড়ে দিয়ে লতার মালা লম্বা হতে থাকে। এই কেরামতি দেখায়ে ফকির বলে যে আপনার জন্ডিস চিকিৎসা হচ্ছে। যে কোন ভালো মানুষ এমন মালা পরলে লম্বা হবে। আমার কথাগুলি আপনি বুঝে থাকলে আপনি কি এটা বিশ্বাস করবেন? কেউ কেউ ভোর বেলা হাতে চুন মেখে ফকিরের কাছে আসতে বলেন। ফকির কাচা গাছের শিকর/ছাল হাতে নিয়ে বদনার নাল দিয়ে ছালের উপর পানি ফেলেন। সেই পানি চুইয়ে রুগীর চুন মাখা হাতে পড়ে। চুন ও কাচা ছালের রসের সাথে বিক্রিয়া হয়ে পানি হলুদ রং ধারণ করে নিচে পড়তে থাকে। রুগী মনে করে তার জন্ডিস ঝড়ে পড়ছে। এরপর এক জগ চিনির সরবত খাইয়ে দেয়া হয়। তাতে প্রশ্রাব পাতলা হয়ে কিছুটা পরিস্কার হয়। তাতেও মনে হয় জন্ডিস ভালো হচ্ছে। নিশ্চয়ই, আপনি তা মনে করেন না। আরেক ধরনের ফকির আছে তারা তাবিজ গরম করে কপালে সেক দিয়ে ক্ষত করে দেন চিরদিনের জন্য। এটা কি অপরাধ নয়?

কাজেই, কারো জন্ডিস হলে রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করতে হবে।
৫/১০/২০১৮ ইং
ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
ভুল পেলে ক্ষমা করে কমেন্ট  লিখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *