কিভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

কিভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

এলোপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতিতে কিভাবে রোগ নির্ণয় করা হয় তা নিয়ে সাধারণ ননমেডিকেল বন্ধুদের জন্য কিছু লিখতে চাই। রুগী ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে চেয়ারে বসার পর ডাক্তার সাহেব কলম হাতে নিয়ে প্যাডের দিকে তাকিয়ে বলে থাকেন “আপনার নাম কি?” কোন কোন রুগী ভেবে থাকেন “নাম দিয়ে কাম কি?” নাম দিয়ে কাম আছে। রোগ নির্নয়ের পড় এই প্যাডের কাগজেই ঔষধ লিখা হবে। প্রেস্ক্রিপশনে নাম না থাকলে কোনটি কার তা বুঝবে কেমনে? এরপর জিজ্ঞেস করা হয় “বয়স কত?” অনেকেই মনে করেন “বয়স জেনে ডাক্তারের কি হবে?” বয়স লিখার প্রয়োজন আছে রোগ নির্নয়ে। সব রোগ সব বয়সে হয় না। বয়সের সাথে রোগের সম্পর্ক আছে। যেমন, বংশগত রোগ গুলি সাধারণত অল্প বয়সে হয়। ক্যান্সার জাতীয় রোগ গুলি সাধারণত বৃদ্ধ বয়সে হয়। কাজেই ডাক্তারের কাছে সঠিক বয়সটি বলতে হয়। কোন কোন মেয়ে ইচ্ছাকৃত ভাবেই বয়স কম বলে থাকে। একজন স্যার বলতেন “মধ্য বয়সী মেয়েরা সাধারণত বয়স যা বলবে তার সাথে আরো ৫ বছর যোগ করে রোগ নির্নয় করবে।” গ্রাম এলাকার অশিক্ষিত রোগীরা বয়স সাধারণত সঠিকভাবে বলতে পারে না। অনেকেই ইম্পোরটেন্ট ইভেন্টের সাথে তুলনা করে বয়স হিসাব করতে বলেন। যেমন, বলেন “বয়স ত কপপামু না। সংগ্রামের বছর আমি ভালাই বুঝমান। ” মনে করুন রুগীর বয়স প্রকৃত পক্ষে ৮০ বছর। বেশী দুর্বল হলে বাড়িয়ে বলবে “বয়স ত কম অইল না, ১০০ ছাড়াইয়া গেছে। ” আর যদি শক্ত সামর্থ্য থাকে তবে বলবে “না, বয়স তেমন না, এখনো ৬০ অয় নাই। ” এই সব রুগী গুলা এই বয়সে আরেকটা বিয়ে করে থাকে বয়স কম বলে। এদের বয়স বের করার জন্য “বড় সন্তানের বয়স কত, মুক্তিযুদ্ধের সময় কতটুকু ছিলেন” ইত্যাদি প্রশ্ন করে বয়স নির্ধারণ করতে হয়। ডাক্তারদের রুগী রেজিস্টার খাতায় ৭০/৮০ বছরের রুগী কম দেখা যায়। হয় ৫০, ৫৫, ৬০ না হয় ৯০, ৯৫, ১০০ বছর।
এরপর ডাক্তার লিখেন সেক্স বা লিঙ্গ। মানে রুগী পুরুষ না মহিলা। পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে রোগ হওয়ার কিছুটা পার্থক্য লক্ষ করা যায়। কোন কোন রোগ ছেলেদের বেশী হয়, আবার কোনটা মেয়েদের। পরীক্ষা নিরিক্ষা করার ক্ষেত্রেও ছেলে মেয়ের মধ্যে পদ্ধতির পার্থক্য আছে। পরীক্ষার ফলাফলেও পার্থক্য আছে। কাজেই প্রেস্ক্রিপশনে সেক্স লিখতে হয়। সেক্স বা লিঙ্গ শব্দ দুইটি বিভ্রান্তিকর। অল্প বয়েসের এক ছেলে বাবার কাছে জানতে গিয়েছিল “বাবা, সেক্স কি?” বাবা এডাল্ট সেক্স বা যৌনমিলনের জ্ঞান ছেলেকে শিখিয়ে দিলেন। শেষে ছেলেটি বাবাকে বলল “তা তো বুঝলাম। আমি স্কুল থেকে দেয়া ফরম ফিলাপ করছি। সেক্স এর ঘরে কি লিখব?” বাবা বললেন “ও তাই? লিখ ‘পুরুষ’। ”

ডাক্তার জিজ্ঞেস করেন “আপনার কি কি সমস্যা?” সমস্যাগুলি গুরুত্ব অনুযায়ী একেক করে বলতে হয়। কেউ কেউ আছেন আসল কথা বাদ দিয়ে নানান সমস্যার কথা বলতে থাকেন। যেমন “সমস্যা অনেক। কয়ডা কমু। জুরান ডাকতরের ঔষধ খাইলাম। কাম অইল না। সখিপুরের সব ডাক্তার গুইলা খাইলাম। কিছুই অইল না। ” প্রশ্ন করে করে রুগীর আসল সমস্যা বের করতে হয়। সমস্যাগুলি কতদিন থেকে তাও বলতে হয় রোগ নির্নয়ের জন্য। কেউ কেউ বিরক্তিকর কথা বলেন “বড়া দিন থাইকা। ” মানে অনেকদিন থেকে। অনেকদিন বলতে ১০/১২ দিনও হতে পারে আবার ১০/১২ বছরও হতে পারে। বলতে হবে ১০/১২ দিন বা ১০/১২ বছর। কেউ কেউ বলে পরীক্ষার পর থেকে। পরীক্ষা বলতে বুঝায় রুগীর এস এস সি পরীক্ষা। কিন্তু কতদিন আগে এস এস সি পরীক্ষার হয়েছে ডাক্তার জানবেন কিভাবে? কোন কোন মেয়েরা বলে থাকেন “বিয়ের পর থেকে।” কবে তার বিয়ে হয়েছে ডাক্তার জানবে কি করে? ডাক্তার কি তার বিয়ের দাওয়াত খেয়েছে? তবে জিজ্ঞেস করে থেকেছি সাধারণত ছেলেদের থেকে মেয়েরা বিয়ের তারিখ বেশী দিন পর্যন্ত মনে রাখে। কারন, ঐদিন থেকে মেয়েটি তার বাবা-মাকে ছেড়ে শশুর শাশুড়ির বাড়িতে এসেছিল।

রুগীর সমস্যাগুলি জানার পর রগীকে রুগী দেখার টেবিলে শোয়ানো হয়। সাধারণ শারীরিক পরীক্ষাগুলি করার পর রুগীর বলা সমস্যা অনুযায়ী বিশেষভাবে সেই সমস্যার সাথে জড়িত অংগ ভালো করে পরীক্ষা করা হয়। রুগী মহিলা ও ডাক্তার পুরুষ হলে শারীরিক পরীক্ষার সময় একজন মহিলা এড়েন্ডেন্ট বা এসিস্টেন্ট সাথে রাখেন। তা না হলে রুগীর মাহরুম (স্বামী, বাবা, ছেলে, ভাই) সাথে রাখেন।
এরপর ডাক্তার সাহেব প্রাথমিক ভাবে একটি রোগ নির্নয় করেন। নিশ্চিত হওয়ার জন্য কিছু ইনভেস্টিগেশন করান। যেমন, এক্সরে, আলট্রাসনোগ্রাফী, প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা ইত্যাদি। রোগের সাথে মিল রেখে ডাক্তার পরীক্ষা লিখে থাকেন। কেউ কেউ মনে করেন “আমার গুটি অইছে গলায়, ডাক্তার আমার বুকের এক্সরে করায় কেন?” আসলে ডাক্তার সন্দেহ করেছে রুগীর রোগ আছে বুকে। সেখান থেকে গলায় ছড়িয়ে পড়েছে। কাজেই ডাক্তারের পড়ামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করাতে হয়। এক মহিলা রুগী তার শরীরে ক্যান্সার আছে কিনা জানার জন্য রক্তের কি কি পরীক্ষা আছে তা জেনে নেন ইন্টার্নেট থেকে। সেই অনুযায়ী ল্যাবে নিজে নিজেই পরীক্ষা করাতে দেন। রক্তের পি এস এ পরীক্ষাটিও তিনি করান। তিনি জানেন না যে এটি একটি পুরুষের প্রট্রেট ক্যান্সারের পরীক্ষা। মেয়ে হয়ে টাকা খরচ করে পুরুষের পরীক্ষা করালেন। ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় সেক্স উল্লেখ করা জরুরী। অনেকে মনে করেন নামেই তো বুঝা যায় ছেলে না মেয়ে। কিছু কিছু নাম আছে ছেলে মেয়ে উভয়েরই হয়। যেমন, বকুল, শাহীনুর, মুক্তা, কহিনুর, নার্গিস ইত্যাদি।

ডাক্তারের পছন্দমত ডায়াগ্নোস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করাই উত্তম। কারন, ডাক্তার যেমন ভাল মন্দ আছেন, প্যাথলজিস্টও তেমনি ভালো মন্দ আছেন। পরীক্ষার রিপোর্ট রুগীর নিজে নিজে বুঝতে না যাওয়াই ভালো। ডাক্তার সাহেব রুগীর সমস্যা, শারীরিক পরীক্ষার রেজাল্ট ও ডায়াগ্নোস্টিক ইনভেস্টিগেশন-এর রেজাল্ট যাচাই করে সর্বশেষ একটা সঠিক রোগ নির্নয় করেন। কাজেই তথ্য উপাত্বে ভুল হলে রোগ নির্নয়ও ভুল হতে পারে। রুগীর জন্য সঠিক ডাক্তার নির্বাচন, ডাক্তারের কাছে সবকিছু খুলে বলা, ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করা সঠিক রোগ নির্নয়ের জন্য আবশ্যক। সঠিক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন সঠিক রোগ নির্নয়।
২/১১/২০১৮ ইং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *