আমাদের রানার

আমাদের রানার
(মনে পড়ে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমাদের পোস্ট অফিস ছিল বড় চওনা। কিন্তু চিঠিপত্র পাঠানোর জন্য কচুয়ার পোস্ট অফিস বেশী ব্যবহার করতাম। কচুয়া পোস্ট অফিসের পোস্ট মাস্টার ছিলেন মরহুম আব্দুল লতিফ স্যার। তিনি একই সময় ঘোনার চালা ফ্রি প্রাইমারী স্কুলে আমার শিক্ষকও ছিলেন। আমরা স্যারকে পোস্টো স্যার বলে উল্লেখ করতাম। কচুয়ার ডাকপিয়ন ছিলেন মরহুম নওশের আলী চাচা। তিনি কচুয়া বাজারে চায়ের স্টলেও চা বিক্রি করতেন। তাকে অনেকে নওশের পিয়ন বলে উল্লেখ করতো। আরেকজন ছিলেন রানার। রানানের নাম আমার জানা নেই। গ্রামের লোকজন কাগজে চিঠি লিখে খামে ভরে ডাকবাক্সে ফেলে আসতো। খরচ কম বলে কেউ কেউ পোস্ট কার্ডেও চিঠি লিখতো। জামা কাপড়, বই পুস্তক অনেকে ডাক মার্ফৎ পার্শেল করে পাঠাতো। টাকা পয়সা পাঠাতো মানি অর্ডার করে। কোন কোন চিঠি রেজিস্ট্রি করে পাঠানো হতো। পোস্ট মাস্টার লেখালেখির কাজ ও হিসাবপত্র করতেন। চিঠি, পার্শেল ও মানি অর্ডারের টাকা বস্তায় ভরে সীল গালা করে দিতেন। রানার সেই বস্তা কাঁধে নিয়ে কচুয়া পোস্ট অফিস থেকে বড় চওনা পোস্ট অফিসে দিয়ে আসতেন। ফিরে আসতেন বড় চওনা থেক ফিরতি ডাকের বস্তা নিয়ে। পিওন চিঠি বিলি করতেন। বাড়িতে গিয়ে চিঠিপত্র দিয়ে আসার নিয়ম থাকলেও তারা তা করতেন না সাধারণত। হাটের দিন পরিচিত জনের কাছে চিঠিপত্র দিয়ে দিতেন প্রাপকের হাতে পৌছে দেয়ার জন্য। বাহক রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় চিঠি খুলে পড়ে সংগীদেরকে শুনাতে শুনাতে বাড়ি ফিরতেন। সেই চিঠির পড়া শুনে কেউ কেউ চিঠি দাতার প্রশংসা করতেন আবার কেউ কেউ চিরস্কার করতেন। আমার যখন ১৯৮৮ সনে বরিশালে মেডিকেল অফিসার হিসাবে প্রথম পোস্টিং হয় তখন মাসিক বেতন ছিল ১৮৫০ টাকা। দায়িত্ব মনে করে এই টাকা থেকে কিছু টাকা বাবাকে মানি অর্ডার করে পাঠাতাম। কিছুদিন পর পর বাবাকে কুশলাদি জানিয়ে চিঠি লিখতাম। এও লিখতাম “গত সপ্তাহে মানি অর্ডার করে এত টাকা পাঠিয়েছি। আশা করি পেয়েছেন। ” একসময় বাবা বললেন “তুমি চিঠিতে যা লিখ তা গ্রামের লোকেরা জেনে যায়। কারন, পিওন যার কাছে চিঠি দিয়ে দেয় সে চিঠি খুলে সাথের সবাইকে শুনায়। টাকার কথাটা না লিখাই ভালো। ”
-আমার লিখা চিঠি খুলবে কেনো?
-আরেক জনের চিঠি খোলা যে অন্যায় তা তারা বুঝতে পারে না। তোমার প্রতি তাদের বেশী আগ্রহ। তাই, কি লিখেছ তা তারা জানতে চায়। চিঠি পড়ে তারা তোমার প্রশংসা করে। মানি অর্ডার আসলে পিওন বাড়িতে এসে টাকা দিয়ে যায়। আমি তাকে বকশিশ দেই। দুপুরের খাবারও খাওয়াইয়ে দেই। খুব খুশী হন।
বাবা প্রতি মাসেই বাড়ির কুশলাদি জানিয়ে আমার কাছে চিঠি লিখতেন। ২৫ পয়সা দিয়ে ইনভেলাপ কিনে তার ভিতর ভরে নিজে অথবা কাউকে দিয়ে বড় চওনা পোস্ট অফিসের সামনে ঝুলানো ডাকবাক্সে ফেলে আসতেন। সকালবেলা পোস্ট মাস্টার সেই বাক্স খুলে চিঠি বের করে বস্তায় ভরে রানারের কাছে দিতেন। রানার দৌড়িয়ে গিয়ে সাগরদিঘী জোনাল পোস্ট অফিসে দিয়ে আসতেন এবং ফিরতি ডাক নিয়ে আসতেন। আরেক রানার নিয়ে যেতেন ঘাটাইল পোস্ট অফিসে। সেখান থেকে মেইল বাসে চলে যেতো ময়মনসিংহ। এখান থেকে মেইল ট্রেনে ঢাকায়। ঢাকা থেকে স্টিমার লঞ্চে বরিশাল। বরিশাল থেকে মেইল বাসে বাকেরগঞ্জ। বাকেরগঞ্জ থেকে রানার নিয়ে যেতেন চরামদ্দি পোস্ট অফিসে। চরামদ্দির ডাক পিওন আমার চেম্বার সহকারী আদম আলীর নিকট চিঠি দিয়ে দিতেন। বাবার দেয়া চিঠি ৩ দিনের মাথায় আমার হাতে পৌঁছতো। বাবা লিখতেন “…..আশা করি পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র কৃপায় ছহি সালামতে আছো। আমরাও আল্লাহ্‌র রহমতে ভালো আছি।…..।”
আসলে আমি আমাদের রানারের কথা লিখতে চেয়েছিলাম। অন্যদিকে চলে গেছি। কিছু মনে করবেন না। আমি যখন প্রাইমারী স্কুলে পড়তাম তখন প্রথম রানার দেখেছি। ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হয়েছিলাম ১৯৬৭ সনে ঘোনারচালা সরকারি ফ্রি প্রাইমারী স্কুলে। স্কুলের পাশ দিয়ে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর হালট ছিল গরুর গাড়ী চলাচলের জন্য। অনেকেই এই রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে যেতেন। হঠাৎ হঠাৎ দুই একটি মোটর সাইকেল চোখে পড়তো। কালিয়ার আলী আহমদ স্যার বংকি প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তিনি অবস্থাপপ্য ছিলেন। তিনি স্কুলের পাশ দিয়ে ভোঁ ভোঁ করে মটর সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতেন। এই রাস্তা দিয়ে বৎসরে দুই একবার শুকনো সিজনে জীপ গাড়ী যেতো। যাওয়ার সময় প্রচুর ধুলা উড়তো। জীপগুলির গুরুত্ব আমরা শিশুরা বুঝতাম না। আমাদের কাছে জীপগুলিকে অজানা জানোয়ারের মতো মনে হতো। তাই আমরা পিছন থেকে জীপকে উদ্যেশ্য করে ঢিল ছুড়তাম। কারন, এগুলি ধুলি দিয়ে আমাদের জামা ময়লা করে ফেলতো। বড় হয়ে জেনেছি এই গাড়িতে তৎকালীন টাংগাইলের মহুকুমা প্রশাসক যাতায়াত করতেন। তখনো টাংগাইল জেলা হয় নি। জেলা ছিল ময়মনসিংহ। রাস্তা তিন মাসই কর্দমাক্ত থাকত। গরুর গাড়ী যাতায়াত করাতে প্রচুর খাদের সৃষ্টি হয়েছিল। এই রাস্তা দিয়ে আমাদের রানার প্রতিদিন ডাকের বস্তা কাঁধে নিয়ে বল্লম হাতে দৌড়িয়ে একবার কচুয়া থেকে বড় চওনা এবং বড় চওনা থেকে কচুয়া রান করতেন। বাবার কাছে শুনেছি রানাররা খুব বিশ্বস্ত ও দায়িত্ববান। রানের সময় এদিক সেদিক তাকাবে না। কেউ টাকা ছিনিয়ে নিতে চাইলে বল্লম দিয়ে ঘাঁ দিয়ে ভুঁড়ি বের করে দিবে। জান দিবেন, তবু বস্তা দিবেন না। গায়ে থাকতো খাকি কালারের ড্রেস। পরনে খাটো খাকি পেন্ট। বল্লমের সাথে বাঁধা এক ঝোকা ঘুঙুর ঝম ঝম করে বাজতো তার চলার ছন্দে। আমি স্কুল মাঠ থেকে তার চলার গতি প্রত্যক্ষ করতাম। তার জন্য এক প্রকার মায়া লাগতো। বড় হয়ে রানার কবিতার সুর করা গানটি আমি যখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে শুনলাম তখন রানারদের জীবনের অজানা কষ্টের কথা জেনে গেলেম। গানটি শুনলে আমাদের রানারকে মনে পড়ে। মাঝে মাঝে ইউটিউব থেকে গানটি শুনি। চারিপাশে রানারের মতো জীবন যাপনকারী অনেক চাকরিজীবীর সাথে মিল পাই। তাই, বার বার শুনি।

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর, সময়টা আমি মনে করতে পারছি না, একবার আমাদের এলাকায় আর্মি এলো। সখিপুর তারা ক্যাম্প করলো। এলাকায় তাদেরকে ঘুরাফিরা করতে দেখেছি। সেই সময় একদিন আমাদের রানার আমাদের সামনে এসে থামলেন। আমরা অবাক হলাম। রানার তো থামবার কথা না! তিনি তার খাকি শার্ট খোললেন। পকেট থেকে বেদনানাশক একটি ইন্ডিয়ান বাম বের করে তার পিঠে লাগিয়ে দিতে অনুরোধ করলেন। দেখলাম তার পিঠ পিটুনির দাগে লাল হয়ে গেছে।
– ভাই, আপনাকে পিটিয়েছে কে?
-আমি ডাক নিয়ে আসছিলাম। পিছন থেকে তিনজন আর্মি সিপাহি আমাকে থামার জন্য নির্দেশ দেয়। আইনত আমি কারো ডাকে থামতে পারি না। তাই আমি থামি নি। এই আইনটি হয়ত তারা জানেন না। পিছন থেকে দৌড়িয়ে এসে বেধড়ক মারতে থাকে রোলার দিয়ে। আমি মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে যাই। তারা আমার পিঠে পিটাতে থাকে। তারপর বলে ‘এই বেটা থামলি না কেন?’ আমি বললাম আমাদের থামার নিয়ম নাই, তাই। তারপর তারা বুঝতে পেরে সরি বলে ছেড়ে দিয়েছে।
আমরা রানারের পিঠে মলম লাগিয়ে দিলাম। জামা গায় দিয়ে আবার রানার ছুটলো তার গন্তব্যের দিকে। আমি রানারের পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম দৃষ্টির গোচরে থাকা পর্যন্ত। আজো রানারের গান শুনতে শুনতে আমাদের রানারের কথা মনে করি। কষ্ট পাই। কারন, সে তো ছিল আমাদের রানার।
১৯/১১/২০১৮ ইং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *